প্রেম এসেছিলো নীরবে পর্ব -২১

0
59

#প্রেম_এসেছিলো_নীরবে(২১)
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
বাস গিয়ে কিক্সবাজার থামলে।ওরা একদিনে কক্সবাজার কোন হোটেলে বিশ্রাম নেয় রাত্রিটা।পরেরদিন সকাল ৯টায় সমুদ্র জাহাজে করে টেকনাফ হতে সেন্টমার্টিন যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।প্রাহি তো খুশিতে আটখানা।কি সুন্দর দেখতে।চারদিকে শুধু পানি আর পানি।থেকে থেকে ওর ঝাঁক বেধে পাখিরা উড়ে যাচ্ছে।প্রাহি লাফাতে লাফাতে হেমন্ত’র কাছে গেলো।গিয়েই হেমন্তকে জড়িয়ে ধরলো।হেমন্ত ইশিকে প্রানভরে দেখছিলো তখনি প্রাহিকে এসে জড়িয়ে ধরায় ওর ধ্যান ভাংগে।প্রাহিকে এতোটা খুশিতে দেখে প্রানটা জুড়িয়ে যায় ওর।মুচঁকি হেসে বলে,
-” আমার বোনটা বুজি অনেক খুশি?”
প্রাহি প্রাণোজ্জ্বল একটা হাসি দিলো।বললো,
-” হ্যা হ্যা! এতোগুলা খুশি।ইসস,ভাইয়া দেখো কতো সুন্দর না চারপাশ দেখতে।কতো কতো পানি।ইসস,আমি যদি সারাজীবনের জন্যে এখানে থাকতে পারতাম।আমার যদি একটা বাড়ি হতো এখানে।তাহলে আমি প্রতিদিন সমুদ্র দেখতে পারতাম।”
হেমন্ত হেসে দিলো প্রাহির কথায়।বলে,
-” তুই আসলেই পিচ্চি।তুই এখানে থাকলে আমার ভাইটা তো মরে যাবে।তোকে ছাড়া থাকতে গিয়ে।”
হেমন্ত’র কথা শুনে প্রাহি চোখ পিটপিট করলো।বললো,
-” ইসস,ডং।সে তো খালি পারে আমাকে ধমক দিতে।আর থাপ্পড় মারতে।বদ লোক একটা।”
তারপর আবার রাগি চোখে হেমন্ত’র দিকে তাকিয়ে বললো,
-” দেইখো তোমার ভাইকে আমি একদিনে অনেক কাঁদাবো।সে আমাকে ধমক দেয় না।আমি না থাকলে তখন বুজবে।তখন অনেক কাঁদবে।কিন্তু আমি থাকবো না।”
হেমন্ত প্রাহির এমন কথায় ওর কলিজা কেঁপে উঠে।বোনটাকে অনেক কষ্টে খুজে বাহির করেছে।আবার হারিয়ে গেলে।এইবার ও নিজে আর বাড়ির লোকতো পাগল হবেই।সাথে ওর ভাইটা মরেই যাবে।হেমন্ত জলদি প্রাহিকে দু হাতে জড়িয়ে নিয়ে।মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
-” কেন এসব বেহুদা কথা বলছিস হ্যা?আমার সামনে বলেছিস। বলেছিস।কিন্তু ভাইয়ের সামনে ভুলেও এইগুলা উচ্চারন করিস না।তোকে তো মেরে ফেলবেই সাথে সে নিজেও মরে যাবে।”
প্রাহি বুজতে পারলো একটু বেশিই বারাবারি করে ফেলেছে।তাই হেমন্তকে ছেড়ে দিয়ে এককানে ধরে কিউটভাবে সরি বললো।হেমন্ত হেসে দিলো।তারপর বলে,
-” তা তোর সেই বদলোকটা কোথায়?”
প্রাহি মুখ ফুলিয়ে বলে,
-” আমি কি জানি।আমাকে বললো, এখানেই থাকবে হেমন্ত’র আশেপাশে আমি নিচ থেকে আসছি।সেই যে গেলো।আর কোন খবর নেই।”
-” আচ্ছা।আমি নিচে গিয়ে দেখছি।তুই হিয়া আর ইশির কাছে যা।ওদের কাছে কাছে থাকবি।জাহাজের রেলিং এর কাছে বেশি যাবি না।ঠিক আছে?”
প্রাহি ঘার কাত করে সায় দিলো,
-” আচ্ছা।”
হেমন্ত চলে যেতেই প্রাহি গিয়ে হিয়া আর ইশির কাছে গেলো।ইশি প্রাহির গাল টেনে দিলো।ইশির নাকি প্রাহির ছোট্ট পুতুলের মতো লাগে।তাই সদা ওর গাল টেনে দেয়।ইশি বলে,
-” কোথায় ছিলে প্রাহি?”
প্রাহি হিয়ার বাহু জড়িয়ে ধরে ওর বললো,
-” হেমন্ত ভাইয়ার কাছে ছিলাম।”
হিয়া বললো,
-” কেন অর্থ ভাইয়া কোথায়?”
প্রাহি নাক মুখ কুচকে ফেললো।বললো,
-” আচ্ছা,একটা কথা বলবা।তোমরা উনার কথা শুধু আমার কাছে জিজ্ঞেস করো কেন?আমি কি তার সিসি টিভি ক্যামেরা যে,উনি কোথায় কোথায় কি করেন তা সব আমি দেখি।”
হিয়া আর ইশি একে-অপরের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে দিলো।
প্রাহি গুমড়া মুখ করে বলে,
-” হাসছো কেন তোমরা?”
হিয়া কিছু বলবে তার আগেই ওর ফোনে মেসেজ আসলো আরাফের।আরাফ ওকে ওর কেভিনে দেখা করতে যেতে বলছে।হিয়া লজ্জায় লাল হয়ে গেলো।এই লোকটাও না।একটু আগেই তো দেখা করে আসলো।এখন আবার ডাকছে।হিয়া, প্রাহি আর ইশিকে বলে চলে গেলো নিচে।ইশি আর প্রাহি নানান রকম কথা বলতে লাগলো আর চারপাশ দেখতে লাগলো।ওরা জাহাজের দোতলায় সবার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।প্রাহি আর ইশির কথার মাজে হঠাৎ ইলফা আসলো সেখানে।এসেই ন্যাকামি স্বরে বললো,
-” হেই ইশি, আন্টি ইজ লুকিং ফোর ইউ।”
ইশি বলে,
-” কেন?”
-” আমি কিভাবে জানবো?তুমি গিয়ে দেখে আসো।”
ইশি ভ্রু-কুচকে প্রাহির হাত ধরে বলে,
-” আচ্ছা! প্রাহি চল।”
প্রাহি ভয়ে আড়ষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে আছে।ইলফা প্রাহির দিকে তীক্ষ্ম নজরে তাকিয়ে বললো,
-” কেন? ও কেন যাবে?”
ইশি ভ্রু-কুটি করে বললো,
-” মানে ও যাবে না কেন?আমি কি ওকে একা ফেলে যাবো না-কি?”
ইলফা বোধহয় একটু ঘাবড়ে গেলো।আমতা আমতা করে বলে,
-” না মানে।আমি আছি তো এখানে।আবার আমি ওকে চিনিও না।শুনলাম অর্থ নাকি ওকে ভালোবাসে।তাই একটু কথা বলতে আসলাম।”
ইশি না চাওয়া সত্তেও ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-” পরে কথা বলে নিও।এখন প্রাহিকে আমার লাগবে।”
ইশি প্রাহিকে নিয়ে চলে গেলো।পিছনে ওদের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুসছে ইলফা।এই মেয়েটা এখন ওর পথের কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কি আছে এই মেয়েটার মাজে?আনস্মার্ট,ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়ে।ও দেখতে এই মেয়ের থেকে হাজার গুন বেশি সুন্দর,স্মার্ট,ম্যাচিউর্ড,শিক্ষিত একটা মেয়ে।তাহলে কেন বার বার অর্থ ওকে ফিরিয়ে দেয়।নাহ,ও কিছুতেই অর্থকে নিজ হতে দূরে সরতে দিবে না।অর্থ ওর হবে মানে হবেই।যদি ওকে প্রাহিকে খুন করে হলেও সরাতে হলে সরাবে।বাট অর্থকে ওর চাই চাই।ইলফা চিৎকার করে বলে,
-” অর্থ ইজ মাইন।হি উইল বি মাইন এট এনি কস্ট।”
——
মাথা নিচু করে অর্থ’র সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রাহি।আর অর্থ নেশাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রাহির দিকে।সাদা রাউন্ড ফ্রোক,মাথায় সুন্দরভাবে হিজাব বাধা।শুভ্রতায় ঘেরে কোন এক স্নিগ্ধপরি লাগছে দেখতে প্রাহিকে অর্থ’র কাছে।অর্থ বললো,
-” নিচে কেন আসলে?আমাকে মিস করছিলে বুজি?”
প্রাহি হালকা করে ঘার উঁচু করে বলে,
-” ইসস,আপনাকে মিস করতে আমার বয়েই গেছে।আমি তো ইশি আপুর সাথে নিচে এসেছে।আর আপনি অসভ্যলোকের মতো সবার সামনে দিয়ে আমার হাত টেনেটুনে এখানে নিয়ে এসেছেন।”
অর্থ ভ্রু-কুচকে বলে,
-‘ আমি অসভ্য?”
-” হ্যা! সাথে ঘাড়ত্যাড়াও।বদলোক।”
অর্থ ওর ঘাড়ে হাত বুলালো।ঠোঁটে ঠোঁট চিপে বলে,
-” তোমার কি মনে হয়?তোমার সাহসটা একটু বেশিই হয়ে গেলো না।আমাকে অসভ্য, ঘাড়ত্যাড়া আবার বদলোকও বললে।”
প্রাহি হালকা ঘাবড়ে গেলো।এখন কি এসব বলার কারনে লোকটা ওকে জাহাজ থেকে ফেলে দিবে? ও তো সাতার জানে না।তাহলে ওর কি হবে?ও তো মরে যাবে।কিন্তু প্রাহি তো এতো তাড়াতাড়ি মর‍তে চায়না,কিছুতেই না।প্রাহি ভয়ে ভয়ে তাকালো অর্থ’র দিকে।সাথে সাথে অর্থ ওর কোমড় জড়িয়ে ধরে প্রাহির মাথাটা ওর বুকে চেপে ধরলো।প্রাহিও চোখ বুজে ফেললো।এতোক্ষন যাবত ইলফাকে নিয়ে মনের ভীতরে যেই খচখচানিটা ছিলো সেটা যেন এক নিমিষেই গায়েব হয়ে গেছে।ভালোলাগে এই লোকটার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকতে।শান্তি পায় খুব।অর্থ প্রাহিকে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজেই বলে,
-” প্রাহি।আমি জাস্ট থাকতে পারছি না তোমাকে ছাড়া।আর একমাস পর তোমাত সতেরো বছর পূর্ণ হবে।আমার আরও একবছর অপেক্ষা।ইসস,তুমি এতো ছোট কেন হলে প্রাহি?তুমি এতো ছোট না হলে তো আমাকে ক্ষনে ক্ষনে এই অপেক্ষার দহনে পুড়তে হতো না।”
প্রাহি বোকার মতো বললো,
-” আমি বড় কিভাবে হবো আজব?আমি মেজিক বল যে আমাকে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে আমি বড় হয়ে যাবো।”
অর্থ হাসবে না কাঁদবে বুজতে পারছে না।ও কি সুন্দর করে আবেগপ্রবন কথাগুলো বললো।আর এই মেয়ে কিসের ভীতরে কিসের কথা বলে।আসলেই ওর কপালে দুঃখ আছে বহুত।এই বাচ্চা বউ নিয়ে।অর্থ প্রাহির গাল টেনে ধরলো।বলে,
-” এতো বোকা কেন তুমি?”
প্রাহি মুখ গুমড়া করে রাখলো।অর্থ হেসে দিলো।তারপর হঠাৎ কিছু একটা ভেবে সিরিয়াস ভঙিতে বলে,
-” লিসেন প্রাহি।আমি বিয়ের আয়োজনের জন্যে ব্যস্ত থাকবো।তাই তোমার খেয়াল হয়তো ঠিকভাবে রাখতে পারবো না।কিন্তু তুমি নিজের সর্চোচ্চ খেয়াল রাখবে।হিয়া আর ইশির সাথেই বেশি থাকবে বুজেছো।তুমি তো জানো তোমার কিছু হলে আমি পাগল হয়ে যাবো।আর ইলফা এন্ড ওর মায়ের থেকে দশহাত দূরে থাকবা।ডাকলেও যাবে না।ঠিক-আছে?”
প্রাহি মাথা দুলালো।অর্থ মুচঁকি হেসে প্রাহির কপালে চুমু দিয়ে ওকে একপাশ হতে জড়িয়ে ধরে সমুদ্র দেখতে লাগলো।

#চলবে________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here