বিবর্ণ জলধর পর্ব -০২

0
79

বিবর্ণ জলধর (০২)
লেখা: ইফরাত মিলি
__________________

রুমকিকে শ্রাবণের গালে চড় মারতে দেখে রুপালি এক ছুটে চলে এলেন লায়লা খানমের রুমে। কিচেনের দরজায় লুকিয়ে ছিল শ্রাবণ আর রুমকির কথাবার্তা শোনার জন্য। কিন্তু কিছু শুনতে পেলেন না, সবকিছু স্বচক্ষেই দেখলেন। লায়লা খানমের রুম নিচ তলাতে। রুপালি দরজা খুলে ঢুকেই বললো,
“আপা, লক্ষণ বেশি ভালো না। ওই খবিশ্যা ছেমড়ি আইছে।”

লায়লা কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে বললেন,
“কার কথা বলছো?”

“আর কার কথা কমু আপা, রুমকি ছেমড়ির কথা কই। দরজা খোলা পেয়ে হুড়মুড় করে ঘরের ভিতর ঢুকে গেছে। আর শুধু ঢোকেইনি, শ্রাবণের গালে জোরে একটা থাপ্পড়ও মারছে!”

লায়লা গর্জে উঠলেন,
“কী?”

“হ।”

লায়লা প্রথমে গর্জে উঠলেও, পরে আবার নিভে গিয়ে বললেন,
“ঠিকই তো আছে। মেয়েটার বিয়ে ভেঙে দিয়েছে শ্রাবণ। থাপ্পড় যে মারবে সেটাই তো স্বাভাবিক।”

“এটা আপনি কী বললেন আপা? বাড়ির উপর এসে বাড়ির পোলার গায়ে হাত তুলছে! এইটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয় ক্যামনে? আপনি চলেন। গিয়া ওই ছেমড়িরে কিছু কন।”

“কী বলবো রুপালি? কিছু বলার মতো মুখ কি আর আছে আমাদের?”

“তাই বলে যাবেন না? এখন তো শুধু একটা থাপ্পড় মারছে, আরও যদি কেনু-গুঁতা দেয় তখন? আমি কী করমু? আমারও কি ওই খবিশ্যা ছেমড়ির গায় হাত তোলা উচিত?”

“তোমার কিছু করতে হবে না। ওদের ঝামেলা ওরা নিজেরা মিটাক। তুমি যে কাজ করছিলে সেই কাজ করো। আর হ্যাঁ, তোমার স্যারকে কিছু বলার দরকার নেই। তিনি জানতে পারলে রাগারাগি করবেন।”

“কিন্তু আপা…” রুপালি কিছু বলতে গিয়েও আবার বললো না। অসন্তুষ্ট মন নিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে এলো লায়লার রুম থেকে। নিজের আগের জায়গায় ফেরত এলো আবার। কিচেনে দাঁড়িয়ে সমস্ত মনোযোগ ফেললো লিভিং রুমে।

শ্রাবণ মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রুমকি আক্রোশ পূর্ণ গলায় কথা শুনিয়ে যাচ্ছে তাকে।

“তোর সাথে তিন বছরের প্রেম আমার? তিন বছরের? আরে তিন বছর কী, তোর সাথে কি আমি তিন ঘণ্টা প্রেম করছি কোনোদিন? বল, করছি?”

শ্রাবণ নত অবস্থায় ভীত স্বরে জবাব দিলো,
“না।”

“তাহলে তুই কেন বললি তোর সাথে আমার তিন বছরের প্রেম? তুই কেন ভাঙলি আমার বিয়ে? আমাকে ভালোবাসিস সেটা বলার আর সময় পেলি না? আমার বিয়ের দিনেই কেন বললি? তোকে তো আমি ছাড়বো না। তোকে পুলিশে দেবো আমি। তোর চৌদ্দ গোষ্ঠীকে আমি জেলের ভাত খাওয়াবো।”

রুমকির এই কথা শুনে রুপালি ভিতরে ভিতরে ভীষণ ক্ষেপে উঠলো। মনে মনে বললো,
‘এ আইছে! জেলের ভাত খাওয়াইবো! আরে তুই ক্যান, তোর চৌদ্দ গোষ্ঠীর ভিতর কারো ক্ষমতা আছে এই বাড়ির একটা মানুষরে জেলে ঢুকানোর?’

“শোন, তোর মতো একটা বলদের সাথে আমি আর কথা বাড়াতে চাই না। তুই আর জীবনেও আমার আশেপাশে ঘেঁষবি না। আমার আশেপাশে যদি তোকে দেখছি, তাহলে তোকে খুন করে ফেলবো। একদম খুন করে ফেলবো।”

রুমকির আর এখানে দাঁড়ানোর ধৈর্য হলো না। যেমন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এসেছিল, তেমনি আবার রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গটগট করে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

শ্রাবণ রুমকির যাওয়ার পানে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
ভুল হয়ে গেল না কি মস্ত বড়ো? শ্রাবণ হাত বাড়িয়ে চড় খাওয়া গালটা স্পর্শ করলো। গালটা ব্যথায় ভরে গেছে। রুমকির হাতে যে এত জোর আছে সেটা আজ টের পেল। মেয়েটার হাতে এত জোর এলো কোত্থেকে?

_____________

রুমকি বাড়ির উপর এসে শ্রাবণকে থাপ্পড় মেরেছে, এটা কবির সাহেবের কানে গেল না। তবে কারিবের কানে গিয়েছে। লায়লার কথা মতো কবির সাহেবকে না জানালেও, কারিবকে না জানিয়ে থাকতে পারলো না রুপালি। কারিবকেও সে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে, যাতে এটা কবির সাহেবের কানে না যায়। কারিব রুপালির কথা রক্ষা করেছে। কবির সাহেবকে জানায়নি কিছু।

কবির সাহেবের আজকের দিনটা খুব চিন্তায় চিন্তায় কেটেছে। হঠাৎ করে তার ছেলের কী হলো সেটা তিনি এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না। তার ধারণা সাময়িক গন্ডগোল দেখা দিয়েছে শ্রাবণের মাথায়। এই গন্ডগোল তিনি বেশিদিন স্থায়ী দেখতে চান না ছেলের মাঝে। ছেলের মাথা থেকে রুমকির ভূত নামানোর জন্য মনে মনে একটা প্ল্যান কষেছেন তিনি। ঠিক করেছেন শ্রাবণের বিয়ে দেবেন অতীব শীঘ্রই। দ্রুত মেয়ে দেখাশোনার কাজ চালু করবেন। তিনি কিছুতেই চান না রুমকির মতো একটা মেয়ে তার ছেলের মাথায় বাসা বাঁধুক। একমাত্র বিয়েই হবে এর যুক্তিযুক্ত সমাধান। এতদিন জানতেন তার ছোট ছেলের মাঝে একটু সমস্যা আছে। বোনের কাছ থেকে এই ব্যাপারে খবর পেয়েছিল তিন বছর আগে। ছোট ছেলেকে নিয়ে চিন্তায় ছিলেন তিনি। কিন্তু বড়ো ছেলেটাও যে এরকম করে মুখে চুনকালি মাখিয়ে দেবে, এ ছিল তার ধারণার বাইরে। এই চুনকালি আরও গাঢ় হওয়ার আগেই ছেলের বিয়ে দিতে হবে তাই। নয়তো তার ছেলে কোথা থেকে কী করবে সেটা হয়তো সে ঠাহর করতে পারছে না। নিজের স্ত্রীকেও রাতে তিনি ছেলের বিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানালেন। লায়লা খানম কথাটা শুনে খুশি হলেন। ছেলের জন্য একটা সুন্দরী লক্ষ্মী বউ ঘরে আনতে চায় সে। তবে লক্ষ্মী মেয়ে খুঁজে পাওয়া কি সহজ কাজ হবে?

______________

দু’দিনেই শ্রাবণ কেমন উদাসী, মনমরা হয়ে গেছে। অফিসে যায়নি। বাড়িতেই কাটিয়েছে পুরো সময়। বাইরে পা ফেলে দেখেনি একটু। বাড়ির সদস্যদের সামনেও পড়েনি খুব একটা। বাবার সামনে তো পড়তেই পারেনি। বাবাকে দেখলে সেখান থেকে সোজা আবার নিজের রুমে ফিরে এসেছে। খাওয়া-দাওয়ারও বেহাল দশা। ঠিকঠাক ভাবে না খাওয়ার ফলে শরীরটা একটু দুর্বল হয়ে পড়েছে। মনটাও ভীষণ রকম দুর্বল। আর এই দুর্বল মনে লেপ্টে আছে রুমকির হাতে চড় খাওয়ার সেই ঘটনাটি! রুমকির হাতে চড় খাবে এমনটা কি ভেবেছিল কোনোদিন? পরিস্থিতি এমন একটা ঘটনার সাথেও সাক্ষাৎ ঘটালো। প্রথমে মনে হয়েছিল সে যা করেছে ঠিক করেছে। কিন্তু রুমকি এসে ওসব বলে যাওয়ার পর মনটা অপরাধী হয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে রুমকির বিয়েতে ওই কাণ্ড ঘটানো বড্ড ভুল হয়ে গেছে। বড্ড!
কী করে এই মুখ দেখাবে এখন রুমকিকে? রুমকির সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহসটুকুই যে অবশিষ্ট নেই আর। শ্রাবণ দুই হাতে মাথা চেপে ধরলো। মাথাটা ভার, ব্যথিত!

কানে ফোনের রিংটোন এসে কড়া নাড়লো। শ্রাবণ ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানায় তাকালো। জানালার ধারে টুলের উপর বসে আছে সে। টুল ছেড়ে বিছানার কাছে এসে মোবাইল তুলে নিলো হাতে। রুমকির নাম দেখে ভয় পাক খেয়ে উঠলো। ধুকপুক করতে লাগলো বুক। রুমকি?
রিংটোন বাজতে বাজতে কেটে যাওয়ার পথে এলে শ্রাবণ দ্রুত রিসিভ করে ফোনটা কানে লাগালো। নীরব থেকে ওপাশ থেকে রুমকি কী বলবে সেটা শোনার অপেক্ষায় থাকলো।

“আমার সাথে এখনই দেখা করো। কৃষ্ণচূড়া গাছের ওখানে ওয়েট করবো।”
এতটুকু বলে রুমকি কল কেটে দিলো।

শ্রাবণ ঢোক গিললো। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে লাগলো কপালে। নার্ভাস হয়ে পড়লো সে। রুমকি কেন ডাকছে তাকে? নিজেই তো বলে গিয়েছিল ওর আশেপাশে যেন না ঘেঁষে সে। তাহলে এখন কেন আবার নিজে ফোন করে ডাকছে? শ্রাবণের হাত অজান্তেই গালে চলে গেল। আবারও চড় মারার শখ জেগেছে না কি রুমকির?
শ্রাবণ আর ভাবতে চাইলো না। চড় মারার জন্য ডাকলেও আপত্তি নেই তার। রুমকিকে চোখের দেখা তো দেখতে পারবে। শ্রাবণ টি-শার্টের উপর একটা শার্ট চাপিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। লিভিং রুম অতিক্রম করে আসার সময় জুন প্রশ্ন করেছিল,
“কোথায় যাচ্ছ?”

শ্রাবণ জুনের প্রশ্ন এড়িয়ে এসেছে।
পড়ন্ত বিকেলের মৃদু আলো গায়ে মেখে এগিয়ে চলছে কৃষ্ণচূড়া গাছের স্থানটির দিকে। জায়গাটি বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। হেঁটে যেতে দশ-এগারো মিনিটের মতো লাগে। শ্রাবণ হেঁটে যাবে। দ্রুতপদে পা ফেলতে লাগলো সে।
দূরে থাকতেই দেখতে পেল কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে রুমকি। ওর গায়ে লাল রঙের ফোরাক এবং জিন্স। চুলগুলো কাঁধ দিয়ে সামনে ফেলে রেখেছে। শ্রাবণ মুগ্ধ নয়নে দেখলো রুমকিকে। গাছে ফুঁটে থাকা লাল কৃষ্ণচূড়ার নিচে, লাল ড্রেস পরিহিত রুমকিকে তার কাছে হঠাৎ ‘পরি’ মনে হলো। রুমকির সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই। রুমকির এই অপরূপ সৌন্দর্যেই তো প্রথমে আকর্ষিত হয়েছিল সে রুমকির প্রতি। আজ আবার নতুন করে আকর্ষিত হলো। আচ্ছা, রুমকিকে আজ এত সুন্দর লাগছে কেন? ব্যাপারটা ধরতে পারলো না শ্রাবণ। রুমকির উপর দৃষ্টি স্থির রেখে তার সামনে এসে থামলো। ভয়টা আগের মতো এখন নেই মনে। হালকা হয়েছে।
রুমকি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো বোকা-সোকা মুখ করে রাখা শ্রাবণের দিকে। তারপর হঠাৎ বললো,
“আমার সাথে প্রেম করবে তুমি?”

শ্রাবণের দু চোখ থেকে মুগ্ধতা কেটে গিয়ে বিস্ময়ের ঝাপটা এসে লাগলো। হৃদপিণ্ড ক্ষণিকের জন্য যেন ঝিম মেরে গেল। যা শুনেছে সেটাকে ভুল ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারলো না। আসলেই ভুল কি না সেটা যাচাইয়ের জন্য বললো,
“কী?”

“আমার সাথে প্রেম করবে? তুমি তো আমাকে ভালোবাসো। ভালোবাসো বলে আমার বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে দিয়েছো। তাহলে আমার সাথে প্রেম করতে কি তোমার এখন আপত্তি আছে?”

“কী বলছো তুমি?” শ্রাবণ নিজের কানকে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। রুমকির মাথা খারাপ হয়ে গেল? না কি তার? এটা কি শোনার ভুল? না কি মনের ভুল? না কি কোনো সুমধুর দিবাস্বপ্ন?

রুমকি শ্রাবণের নিকটে এগিয়ে এসে, শ্রাবণের হাত ধরে বললো,
“চলো, প্রেম করা যাক!”

শ্রাবণ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে যা ঘটছে তা সত্যি। কিন্তু এটা সত্যি কী করে হয়? মাথায় সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এটা কি আসলেই সত্যি? না কি কোনো সুমধুর দিবাস্বপ্নই?

_______________

শ্রাবণ আর রুমকির মাঝে প্রেমটা সত্যি সত্যিই হয়েছে। শ্রাবণের কাছে এখনও অবাস্তব মনে হয় সবটা। কিন্তু এটা অবাস্তব নয়। সত্যি। রুমকি সত্যিই তার সাথে প্রেম করছে। রোজ দেখা করছে, ফোনে কথা বলছে। এ সবটাই সত্যি। রুমকি যে এমন করতে পারে শ্রাবণের ভাবনায় আসেনি। বিয়ে ভাঙার পরের দিন এসে রুমকি কত কী বলে গেল। থাপ্পড় মারলো। আর এর দুই দিন পর ফোন করে ডেকে নিয়ে বললো, ‘আমার সাথে প্রেম করবে তুমি?’ আসলেই অবিশ্বাস্য! বিস্ময়কর!

শ্রাবণ এবং রুমকির ব্যাপারে কিঞ্চিৎ আভাস কবির সাহেবের কানেও এসে লেগেছে। ব্যাপারটা মূলত রুপালির কাছ থেকে ছড়িয়েছে। রুপালি নজর রাখছিল শ্রাবণের উপর। আর এই নজরদারি থেকে বুঝতে পারলো শ্রাবণ এবং রুমকির মাঝে কিছু একটা চলছে। খবরটা দ্রুত লায়লা খানমকে জানালেন। লায়লা খানমের সাথে সাথে কারিব এবং জুনও অবগত হলো। কারিব বললো কবির সাহেবের কাছে। ব্যাপারটা জেনে কবির সাহেব রেগে গেলেন। যে ঝামেলা টাকার মাধ্যমে মিটমাট হয়ে গেল, সেই ঝামেলা আবার উল্টো ফিরে এসেছে। শ্রাবণকে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার চিন্তা ভাবনা আরও জোরালো হলো তার।
লায়লা খানম তো ছেলের জন্য মেয়ে বাছাইয়ের কাজ অনেক আগে থেকেই শুরু করে দিয়েছে। মনে মনে একজনকে ঠিক করেছে তার শ্রাবণের জন্য। এখন কবির সাহেব মত দিলেই হয়।

প্রথম দিকে শ্রাবণ জানতো না তার ফ্যামিলি তাকে বিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। জানতে পারলো পরে। এটা জানার পরই চিন্তা আষ্টেপৃষ্ঠে ঝাপটে ধরলো তাকে। তার বাবা এমন করতে পারে এটা তার অভাবনীয় ছিল। বাবা যে সহজে দমবে না এটা জানে শ্রাবণ। কিন্তু তাকে দমাতে যে হবেই। রুমকিকে ছাড়া অন্য কাউকে কী করে বিয়ে করবে সে? এটা অসম্ভব। রুমকি তার ভালোবাসা! রুমকি তার সব। বিয়ে করলে রুমকিকেই করবে সে। আর কাউকে না।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here