বিবর্ণ জলধর পর্ব -০৩+৪

0
72

#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ০৩
______________

কয়েকদিন কবির সাহেবের বাড়িতে খুব ঝামেলা চললো। শ্রাবণ কিছুতেই বিয়ে করবে না বলে জেদ ধরেছে। কবির সাহেবও কম যান না। তিনিও শ্রাবণকে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এ বিয়ে করতেই হবে তাকে। যদি এই বিয়ে না করে, তাহলে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। কোম্পানি থেকেও চাকরিচ্যুত করবেন। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার সময় একটা টাকা দেবেন না সাথে। ভিখারির মতো বেরিয়ে যেতে হবে বাড়ি থেকে।
শ্রাবণ নিজের বাবাকে খুব ভালো করে চেনে। বাবা যা বলেছে সেটা করার ক্ষমতা সে রাখে। এমনটা করা তার কাছে কোনো কঠিন ব্যাপার না। বাবার দেওয়া এসব হুমকি-ধামকির পর শ্রাবণ একটু দমেছে। তবে একেবারে না। মনে মনে তার বিদ্রোহ চলছে। রুমকি ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না সে। রুমকি এখনও জানে না বাড়িতে শ্রাবণের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। শ্রাবণ এটা জানানোর সাহস পায়নি।
তাছাড়া কবির সাহেব জানিয়ে দিয়েছেন, রুমকির কানে যেন এ ব্যাপারে কিছু না যায়। রুমকি সেয়ানা মেয়ে। কবির সাহেব ছেলের বিয়েতে কোনো ঝামেলা চান না। যে ঝামেলা টাকা দিয়ে মিটিয়ে দিয়েছে, সে ঝামেলা উল্টো করে ঘুরে আবার ফিরে আসবে, এটা সে বরদাস্ত করবেন না। রুমকির ভূত অতি শীঘ্রই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হুকুম দিয়েছেন তিনি শ্রাবণকে।
শ্রাবণের জন্য পাত্রী ঠিক করার ব্যাপারটি সম্পন্ন হয়েছে। লায়লা খানম নিজে পছন্দ করেছেন মেয়েকে। কবির সাহেবকে বলার পর তিনিও অমত করেননি। বরংচ তার খুব পছন্দ হয়েছে এই সম্বন্ধ। পাত্রী ভালো। নম্র, ভদ্র। দেখতেও রূপসী। শ্রাবণের সাথে মানাবে খুব। মেয়েটার সাথে লায়লা খানমের ভালো সম্পর্ক। পাশের বাড়িতে থাকার কারণে মেয়েটার অনেক আসা যাওয়া হয়েছে তাদের বাড়িতে। মেয়েটার কথাবার্তা, চাল-চলন, আচার-আচরণ দেখে এ মেয়েকেই শ্রাবণের উপযুক্ত হিসেবে মনে হয়েছে তার। মেয়ে খুব পছন্দের লায়লার। প্রথম যেদিন দেখেছিল সেদিনই বেশ মনে ধরেছিল মেয়েটাকে। ছেলের বউ করে আনবেন এমনটা মনে আসেনি তখন। কিন্তু ছেলের বিয়ে নিয়ে কথা ওঠার পর এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা উদয় হলো। চিন্তা ভাবনা চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। মিহিকের সাথেই বিয়ে দেবেন শ্রাবণের। মিহিকের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাবও রেখেছেন ইতোমধ্যে। তার বিশ্বাস, এই প্রস্তাবে সম্মতি পাবেন তিনি।
কিন্তু তার ধারণা কিঞ্চিৎ ভুল। কারণ, যার সাথে ছেলের বিয়ে দেবেন বলে ঠিক করেছে, সেই মেয়েই বেঁকে বসেছে। মিহিক বিয়ে করতে চায় না শ্রাবণকে।

______________

মিহিক শ্রাবণের সাথে বিয়ের কথাটা শুনেই মা-বাবাকে বললো,
“কী? ওই পাগল শ্রাবণকে বিয়ে করবো আমি? তোমাদের কি মাথা খারাপ? যে ছেলে কিছুদিন আগে একটা মেয়ের বিয়ে ভেঙে দিয়েছে, বিয়েতে উপস্থিত এত এত মানুষের সামনে চিৎকার করে বলেছে সে রুমকিকে ভালোবাসে, রুমকির সাথে তার তিন বছরের প্রেম, তার সাথে কোন হিসেবে আমার বিয়ে দিতে চাইছো তোমরা? তোমাদের মাথা কি আসলেই খারাপ হয়ে গেছে?”

হাফিজা বললেন,
“রুমকি মেয়েটার সাথে শ্রাবণের কোনো প্রেম ছিল না, সেটা তো তুই নিজেই শুনেছিস। শ্রাবণ…”

“প্রেম ছিল, কি ছিল না সেটা তো মুখ্য বিষয় না। মুখ্য বিষয় হলো ওই শ্রাবণ। যে ছেলে একটা মেয়ের বিয়ে ভেঙে দিয়েছে, লোক সমাজে চিৎকার করে নিজের ভালোবাসার কথা বলেছে, সে ছেলে একটা অসভ্য, অভদ্র ছাড়া আর কী? আর তার চয়েজের প্রশংসাও তো না করে পারা যায় না। রুমকির মতো একটা লোভী, বাজে মেয়েকে তার পছন্দ। ছি! যেমন সে, আর তেমনি তার পছন্দ! এরকম একটা ছেলেকে বিয়ে করা ইম্পসিবল!”

ইদ্রিস খান বললেন,
“কবির ভাই, লায়লা ভাবি নিজ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের না করে দিই কী করে? শ্রাবণ ভালো ছেলে। কোনোদিন মাথা তুলে কথা বলেনি আমাদের সাথে। দেখা হলে ভদ্র ভাবে কত আন্তরিক হয়ে কথা বলে। রাস্তা-ঘাটেও কখনও কোনো বেয়াদবি করতে দেখিনি। কোনো মেয়ের সাথে কথা বলেছে, ঘোরাঘুরি করেছে এমনটাও নজরে পড়েনি। হ্যাঁ, এটা সত্য যে রুমকির বিয়েতে ও একটা ঝামেলা করেছে। কবির ভাইদের ধারণা শ্রাবণের মাথায় সাময়িক একটু গন্ডগোল দেখা দিয়েছে, যার জন্য অমন করেছিল। আমাদেরও তাই মনে হয়। তা না হলে শ্রাবণের মতো একটা ছেলে ওরকম করতে পারে না। সাময়িক প্রবলেম এটা। বিয়ের পর এসব ঠিক হয়ে যাবে।”

“কী ধরণের কথা বলছো বাবা? তুমি কি চাইছো ওই মাথা খারাপ ছেলেকে আমি সত্যিই বিয়ে করি?”

“বিয়ে করতে ক্ষতি কী?” হাফিজা বলে উঠলেন।
“কত বড়ো লোক ঘরের ছেলে। ছেলের মা-বাবা কত ভালো। এত বড়োলোক হওয়ার পরেও কোনো অহংকার নেই তাদের। সবার সাথে কত আন্তরিক তারা। এমন মানুষ আজকাল কম দেখা যায়।
শ্রাবণের ফ্যামিলি তো দেখেছিস। ফ্যামিলির একটা মানুষও কি খারাপ? বলতে পারবি এমনটা? কবির ভাইদের বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, এটা তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। সবার এই সৌভাগ্য থাকে না। ও ঘরে বিয়ে হলে অনেক সুখে শান্তিতে থাকবি। ধনী পরিবার, শ্বশুর-শাশুড়ি ভালো। একটা মাত্র ছোট ননদ। দেবর যেটা আছে সেটা তো দেশে থাকে না। সব মিলিয়ে খুব ভালো থাকবি তুই।”

“ধনী, একটা মাত্র ছোট ননদ, শ্বশুর-শাশুড়ি ভালো, সেসব তো বুঝলাম। কিন্তু মেইন কথা হলো আমি যাকে বিয়ে করবো সেই তো ভালো না। যেখানে হাসব্যান্ডই ভালো না, সেখানে আমি ভালো শ্বশুর-শাশুড়ি দিয়ে কী করবো? কতটা ভালো থাকবো?”

“শ্রাবণকে খারাপ ছেলে ভাবছিস? ও তো খারাপ না। দুই বছর ধরে দেখছিস ছেলেটাকে। কখনও কোনো খারাপ আচরণ করেছে তোর সাথে? খারাপ চোখে তাকিয়েছে কোনোদিন? কারো কাছ থেকে কখনো কোনো খারাপ কথা শুনেছিস ওর সম্পর্কে?”

মায়ের কথায় মিহিক একটু মুষিয়ে পড়লো। শ্রাবণ কখনও খারাপ চোখে তাকায়নি ওর দিকে, খারাপ আচরণ তো দূরের থাক। কখনও কোনো খারাপ কথাও শোনেনি তার সম্পর্কে। মিহিক বললো,
“না, খারাপ আচরণ করেনি, খারাপ চোখেও তাকায়নি। আর খারাপ কিছু শুনিওনি তার ব্যাপারে। কিন্তু ওটা তো তার বাইরের বৈশিষ্ট্য। তার ভিতরে কী আছে সেটা কী করে জানবো? ভিতরের বৈশিষ্ট্য যা একটু প্রকাশ করেছে, তাতে বোঝা যায় সে একটা অভদ্র। তার ভিতরে রুমকির বসবাস। যে ছেলের ভিতরে অন্য একটা মেয়ে বাসা বেঁধে আছে, তার সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে চাও কোন আক্কেলে?”

“বোঝার চেষ্টা কর মিহিক। শ্রাবণরা উচ্চবিত্ত ফ্যামিলি। তারা নিজ থেকে তোকে বউ করে নিতে চাইছে। অনেক আন্তরিক ভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। লায়লা ভাবির তো তোকে অনেক পছন্দ। এই বিয়ের প্রস্তাব যদি আমরা এখন ফিরিয়ে দিই, তাহলে কেমন হবে বুঝতে পারছিস? তাদের তো মনোক্ষুণ্ন হবে আমাদের উপর। তাদের সাথে আমাদের সম্পর্কও আর আগের মতো থাকবে না। তোর বাবা শ্রাবণদের অফিসে চাকরি করে। অফিসেও তোর বাবাকে কত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে চাকরির ক্ষেত্রেও একটা জড়তা সৃষ্টি হবে। তোর বাবা হয়তো ওই কোম্পানিতে চাকরিই করতে পারবে না আর। তুই কি বুঝতে পারছিস না? কবির ভাইয়েরা তো জীবনেও রুমকিকে বাড়ির বউ করে ঘরে তুলবে না। তোকে তাদের খুব পছন্দ। ছেলের মা-বাবা পছন্দ করে তোকে ছেলের বউ করছে। তাদের কাছে কতটা আদর যত্নে থাকবি ভেবে দেখেছিস?”

হাফিজার কথায় মিহিক দমতে গিয়েও দমলো না। হার না মানা গলায় বললো,
“কিন্তু স্বামী? স্বামীকে কী করবে? সে তো রুমকিকে ভালোবাসে…”

মিহিক আর কিছু বলার আগেই ইদ্রিস খান মেয়ের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললেন,
“বললাম না, ওটা একটা সাময়িক গন্ডগোল। বিয়ের পর ওসব থাকবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“সব ফ্যামিলিরাই বিয়ের আগে বলে এটা। বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে কিছুই ঠিক হয় না।”
মিহিক উপরে কাঠ গলায় এটা বললেও, মনে মনে দ্বিধায় ভেঙে পড়লো। যদি এ বিয়ে না হয়, তাহলে কি লায়লা আন্টিদের সাথে তার ফ্যামিলির সম্পর্ক ক্ষুণ্ন হবে?

______________

মৃদু মন্দ হাওয়ায় হাস্নাহেনা ফুলগুলো দুলে দুলে উঠছে। বারান্দায় এই একটি মাত্র ফুল গাছই আছে। গাছটি নোয়ানার লাগানো। মিহিক হাত বাড়িয়ে একটা দুটো ফুল ছিঁড়ছে। মিহিকের সামনে ভ্রু কুঞ্চিত করে চেয়ে আছে নোয়ানা, তিন্নি। মিহিকের সাথে শ্রাবণের বিয়ের প্রস্তাব এসেছে এটা তারা জানতো না। বাড়ি ফেরার পর জেনেছে। মিহিককে জানালো হয়েছিল আজ সকালে। আর তারা দু বোন জানলো সন্ধ্যায়।
মিহিক অনেকক্ষণ নীরব থেকে বোনদের উদ্দেশ্যে বললো,
“আমার কী করা উচিত বলতো? পাগল শ্রাবণকে বিয়ে করা কি উচিত হবে?”

তিন্নি জোর দিয়ে বলে উঠলো,
“আলবদ উচিত হবে। কত উচ্চ ঘরে বউ হয়ে যাবে বলো তো? এটাও তো একটা সম্মানের ব্যাপার। আর সেদিন তোমার কথার খেই ধরে ওই কথা বলেছিলাম। কিন্তু শ্রাবণ ভাই আসলেই ভদ্র মানুষ। অভদ্র নয়।”

মিহিক বিরক্ত নজরে তাকালো তিন্নির দিকে। কণ্ঠে বিরক্ত মিশিয়ে বললো,
“উচ্চ ঘর ধুয়ে ধুয়ে কি আমি পানি খাবো? শ্রাবণকে বিয়ে করা আমার চরম ভুল হবে আসলে। শ্রাবণকে বিয়ে করলে পরে আমাকে আফসোস করতে হবে, পস্তাতে হবে!”

নোয়ানা বললো,
“ধুর আপু! এমন কেন ভাবছো তুমি? আমার তো তা মোটেই মনে হয় না। শ্রাবণ ভাইয়ার সাথে খুব ভালো থাকবে তুমি। শ্রাবণ ভাইয়া এবং তোমাকে খুব ভালো মানাবেও।”

মিহিক অপদ দৃষ্টি জোড়া নোয়ানার উপর ফেলে বললো,
“শ্রাবণকে পছন্দ করিস, তারপরও এই কথা বলছিস? তোর পছন্দের মানুষের সাথে আমার বিয়ের কথা হচ্ছে। অথচ তুই সেই আমাকেই বুঝ দিচ্ছিস তাকে বিয়ে করার জন্য?”

হঠাৎ মিহিকের এই কথায় নোয়ানা হকচকিয়ে গেল। হকচকিয়ে যাওয়া ভাবটা গিলে নিয়ে বললো,
“তুমি এরকমটা কেন ভাবো বলো তো? আমি সত্যিই পছন্দ করি না শ্রাবণ ভাইয়াকে। তার প্রতি আমার সেরকম কোনো ভালো লাগা নেই। ট্রাস্ট মি!”

মিহিক চোখ সরিয়ে নিলো। নোয়ানা শ্রাবণকে পছন্দ করে কি না সে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলো না। মাথাটা হেলিয়ে দিলো চেয়ারে। নিবিড় ভাবনায় ডুব দিয়ে বললো,
“বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে কি লায়লা আন্টি, কবির আঙ্কল কষ্ট পাবেন? তাদের সাথে কি আমাদের সুসম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে? আমার ফ্যামিলির জন্য কি ভালো হবে না ব্যাপারটা? আমি আসলে চাই না রে এরকমটা হোক। আবার শ্রাবণকে বিয়ে করবো এমনটাও চাই না। কী করবো আমি তাহলে? কোনটা করা ঠিক? আর কোনটা বেঠিক?”

______________

আজ কারিবের জীবনে ভীষণ খুশির একটা দিন। তার অতিপ্রিয় একটা মানুষ বিদেশ থেকে দেশে আসছে আজ।

কারিব এগারো বছর বয়স থেকে কবির সাহেবদের বাড়িতে আছে। এগারো বছর বয়স থেকে তার থাকা, খাওয়া, লেখাপড়া, বেড়ে ওঠা সব কবির সাহেবদের বাড়িতেই হয়েছে। কবির সাহেবরা খুব ভালো মানুষ। উদার মনের ব্যক্তি। তার কোনো কিছুতেই হেলাফেলা করেনি তারা। কারিবের আপন বলতে শুধু তার মা আছে। সে থাকে গ্রামে। বাবাকে হারিয়েছে আট বছর বয়সে। কারিবদের পারিবারিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না বলে কবির সাহেব মায়া করে কারিবকে নিজের সাথে ঢাকা নিয়ে এসেছিল। সেই আসা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বলতে গেলে সে খুব সুখে শান্তিতেই আছে। কবির সাহেবদের কোম্পানিতে চাকরিরত আছে সে। ভালো পরিমাণ টাকাই ইনকাম তার। গ্রামে মায়ের কাছে টাকা পাঠিয়ে দেয় মাসে মাসে। দুই, তিন মাস অন্তর নিজে গিয়েও দেখা করে মায়ের সাথে। গ্রামে গেলে মা আর আসতে দিতে চায় না। কিন্তু ওখানে থেকে যাওয়ার জো তো আর তার নেই। কয়েকদিন গ্রামে থেকেই আবার ঢাকা কবির সাহেবের বাড়িতে ব্যাক করতে হয় তাকে। মাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিল ঢাকায়। কিন্তু সে স্বামীর ভিটে-মাটি ছেড়ে নড়বে না।

কবির সাহেবদের বাড়িতে থাকার সুবাদেই ওই অতিপ্রিয় মানুষটির সাথে দেখা হয়েছিল তার। মানুষটি যে তার কতটা প্রিয় সেটা সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না। খুব ভালোবসে সে তাকে। তার প্রিয় মানুষটা দশ বছর বয়স থেকে আমেরিকাতে থাকে। এখন তার বর্তমান বয়স পঁচিশ। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে আমেরিকার মাটিতে বসবাসরত সে। আমেরিকাতে ফুফুদের কাছে থাকে। ফুফু নিঃসন্তান। মূলত তারা সন্তানহীন বলেই অনেক আবদার করে নিজেদের সাথে তাকে আমেরিকা নিয়ে গেছে। তাকে আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার পর, তার ফুফুরা আরও একটি সন্তান এডপ্ট নিয়েছে। যার নাম, ঝুম। তার বয়স আঠারো।

প্রিয় মানুষটির সাথে কারিবের দেখা হয়েছিল ষোলো বছর বয়সে। তখন তার প্রিয় মানুষটির বয়স পনেরো। দুই মাসের জন্য বাংলাদেশ বেড়াতে এসেছিল সে। প্রথম সাক্ষাতেই মানুষটিকে বেশ ভালো লেগে যায় কারিবের। মানুষটি খুব অমায়িক, মিশুক! প্রিয় মানুষটি দেশে এলে কারিবের খুব ভালোই হয়। সে যতদিন বাংলাদেশে থাকে, ততদিন কারিব একেবারে ফ্রি। কোনো কাজকর্ম করতে হয় না তার। কবির সাহেব সবসময় কারিবকে তার প্রিয় মানুষটির সাথে সাথে থাকার নির্দেশ দেয়। নির্দেশটা আগে শুধু সঙ্গ দেওয়ার প্রয়োজনার্থে থাকলেও, দুই বছর আগে কারিবের প্রিয় মানুষটি যখন বাংলাদেশ এলো, তখন কারিবকে তার সাথে সাথে থাকতে দেওয়ার উদ্দেশ্য পরিবর্তন হলো। কবির সাহেব কারিবকে চব্বিশ ঘণ্টা বডিগার্ডের মতো লাগিয়ে রেখেছিল সেবার তার পিছনে। বডিগার্ডের মতো লাগিয়ে রাখার কারণও ছিল অবশ্য।
এতক্ষণ কারিবের যে প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে কথা হলো, সে আসলে কবির সাহেবের ছোট ছেলে আষাঢ়। আষাঢ়ের মাঝে একটু সমস্যা আছে। সমস্যাটা কোনো গুরুতর কিছু না। সমস্যাটা সামান্য। আর এই সামান্য সমস্যাটুকু হলো, আষাঢ়ের মেয়েদের প্রতি ঝোঁক আছে। ঝোঁকটাও সাংঘাতিক নয়। হালকা। কবির সাহেব ছেলের এই সমস্যার ব্যাপারে একটু আধটু জেনেছে তিন বছর হলো। এর আগে তিনি অবগত ছিলেন না। আর এটা জানতে পারার পর আষাঢ় যখন দুই বছর আগে বাংলাদেশ এসেছিল, সেবার কারিবকে সর্বক্ষণ আষাঢ়ের সাথে সাথে থাকার হুমুক দিয়েছেন। কড়া নজর রাখতে বলেছেন ছেলের উপর। তার ছেলে কখন কী করে সেই বিষয়ে সকল ইনফরমেশন তার কাছে দিতে বলেছিল।
কবির সাহেব আষাঢ়ের এই সমস্যার ব্যাপারে মাত্র তিন বছর ধরে অবগত হলেও, কারিব এ ব্যাপারে জানে অনেক আগে থেকে। আষাঢ়ের মাঝে প্রথম প্রথম যখন এই সমস্যার উদ্ভাবন ঘটেছিল, তখনই ধরতে পেরেছিল। কারণ, আষাঢ় ফোনে কথা বলতে এলেই বিভিন্ন মেয়েদের গল্প জুড়ে দিতো তার সাথে। প্রথম প্রথম তার কাছে এটা মোটেও ভালো লাগতো না। কিন্তু ধীরে ধীরে এসবের সাথে মানিয়ে গেল সে। আষাঢ় আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ এলে মেয়েদের প্রতি আষাঢ়ের এই ঝোঁক নিজ চোখেই প্রত্যক্ষ করেছে সে। কাউকে জানায়নি এ ব্যাপারে।
কিন্তু তিন বছর আগে কবির সাহেবের বোন মিসেস আইরিন, ভাইয়ের কাছে ব্যাপারটা শেয়ার করলেন। যদিও সব খোলাসা করে বলেনি। আংশিক একটু বলেছে। বাস, তাতেই কবির সাহেব ছেলের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। এরপর আষাঢ় বাংলাদেশ আসলে কারিবকে চব্বিশ ঘণ্টা আষাঢ়ের সাথে লাগিয়ে রাখলেন। কারিবকে কবির সাহেব খুব বিশ্বাস করেন। কারিব যা বলে তা নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করে নেন। কিন্তু কবির সাহেব কারিবকে চিনতে ভুল করেছেন। তিনি হয়তো জানেন না, কারিব আষাঢ়কে এতটাই ভালোবাসে যে, আষাঢ়কে দোষ মুক্ত রাখতে তার কাছে মিথ্যা বলতেও বাধে না কারিবের।
অন্য সবকিছুর বেলাতে কারিব একটা খাঁটি মানুষই। কবির সাহেবের কাছে কখনও মিথ্যা বলে না। কিন্তু এই আষাঢ়ের বেলাতে সে খাঁটি থাকতে পারে না, ভেজাল পূর্ণ হয়ে যায়।

আষাঢ়ের কথা ভাবতে ভাবতে এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেল কারিব। আষাঢ়কে সে একাই নিতে এসেছে। আষাঢ় বাংলাদেশ এলেই কারিবের নিজেকে সেক্রেটারি সেক্রেটারি মনে হয়। আষাঢ়ের একান্ত সেক্রেটারি যেন সে। আষাঢ়ের সবকিছু করে দেওয়ার দায়িত্ব যেন তার। আষাঢ়ের মেয়েদের প্রতি ঝোঁক থাকার ব্যাপারটিতে কারিবের একটুও খারাপ লাগে না। বরং এটা এখন তার কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হয়। বিদেশে নানান মেয়ের মাঝে ফ্রি ভাবে থাকতে থাকতে আষাঢ়ের মাঝে এই বাজে অভ্যাসটা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া তার ফুফুরা যদি একটু কড়া থাকতো তাহলেও এমন হতো না। কিন্তু ফুফুরা যে আষাঢ়ের প্রতি ভীষণ নরম। তাদের লাই পেয়ে পেয়েই ছেলেটা আদরে আদরে বাঁদর হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ানোর একটু সময় পরই আষাঢ়কে দেখতে পেল কারিব। আষাঢ়ের পিঠে একটা ব্যাগ, হাতে একটা লাগেজ। চোখে কালো সানগ্লাস। পরনে যে পোশাক আছে তাও কালো।
আষাঢ় কারিবের দিকে এগিয়ে আসছে পায়ে পায়ে। আষাঢ়কে দুই বছর পর সামনা সামনি দেখতে পেয়ে কারিবের অনুভূতি সব উপচে উঠলো। কিছুক্ষণ মায়া নিয়ে তাকিয়ে থেকে আদুরে কণ্ঠে ডেকে উঠলো,
“আষাঢ় ভাই!”

কারিব বয়সে আষাঢ়ের থেকে এক বছরের বড়ো হয়েও আষাঢ়কে সবসময় ‘ভাই’, ‘আপনি’ বলেই সম্মোধন করে। আষাঢ়ের প্রতি তার তীব্র শ্রদ্ধা থেকেই বোধহয় ভিতর থেকে ‘তুমি’ এবং কেবল ‘আষাঢ়’ বলে সম্মোধনটা তার মুখ থেকে বের হয় না।
কারিবের ডেকে ওঠায় আষাঢ় একটু হাসে। কারিব মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে সেই হাসিটুকু মানসপটে এঁকে নিলো। আষাঢ়ের হাসি তার মারাত্মক রকমের প্রিয়। শুধু হাসি কী, গোটা মানুষটাই তো তার প্রিয়। মানুষটির চোখ, কান, নাক, ঠোঁট, হাত, পা, গলা সবই তার পছন্দ! আষাঢ়ের গায়ের বর্ণ একটু শ্যামলা। গায়ের রং শ্যামবর্ণ হলে হবে কী? সৌন্দর্য ধারালো। এই রূপেই কতশত রমণী পাগল হলো তার জন্য! কারিব একটা জিনিস খেয়াল করেছে, শ্রাবণ উজ্জ্বল ফর্সা, হ্যান্ডসাম হলেও আষাঢ়ের মতো এত সুদর্শন লাগে না তাকে। আষাঢ় শ্যামলা হয়েও দারুণ সুদর্শন।

আষাঢ় কাছে এসে হাগ করলো কারিবকে। জড়িয়ে রেখে বললো,
“ওহ মাই ডিয়ার! আমি দীর্ঘ সময় ধরে মিস করেছি তোমাকে।”

“আমিও আপনাকে অনেক মিস করেছি আষাঢ় ভাই।”

আষাঢ় কারিবকে ছেড়ে দিয়ে নিজের হাসি মুখখানা আরেকবার দেখালো। আষাঢ়ের হাসির জুড়ি নেই। হাসতেই যেন বেশি ভালোবাসে সে।

আষাঢ় আশেপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে বললো,
“তুমি একা? আমি তো আশা করেছিলাম আমাকে নিতে আরও মানুষজন আসবে।”

“এবার আসতে পারলো না তারা। ব্যস্ত তো তাই। আপনি চিন্তা করবেন না, আমি তো আছি। আপনার সেবায় সর্বক্ষণ নিয়োজিত আমি।”

আষাঢ় মুচকি হেসে দু আঙুলে আলতো করে কারিবের গাল টেনে দিয়ে বললো,
“তুমি আমার সাথে থাকলেই হয় সবসময়। কিন্তু আমার বাড়ির লোকের এত ব্যস্ততা কীসের বলো তো? বিয়ের দিনই না কি ধার্য হয়নি এখনও। এখনই সব আয়োজন শুরু করে দিয়েছে না কি?”

আষাঢ়ের বাংলাদেশ আসার বন্দোবস্ত সব আগে থেকেই করাছিল। গ্রাজুয়েট শেষ। এমনিতেই বাড়িতে বেড়াতে আসবে ভাবছিল, এর উপর দশ পনেরো দিন আগে খবর পেল তার ভাই কার বিয়েতে যেন গেঞ্জাম করেছে। এখন ভাইয়ের বিয়ে দেওয়া হবে তাড়াতাড়ি। ভাইয়ের বিয়ে খেতে আসাটাই মূলত মুখ্য বিষয় এখন। এছাড়াও বাংলাদেশ আসার আরেকটা কারণ আছে। সেটা এখন উহ্য থাক।

কথা বলতে বলতে আষাঢ় এবং কারিব এয়ারপোর্ট থেকে বের হলো। কারিব আষাঢ়ের লাগেজটা পিছনে রেখে ড্রাইভিং সিটে এসে বসলো। আষাঢ় তখন সিটবেল্ট বাঁধছিল। মাথাটা সিটের সাথে হেলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে বললো,
“কাল তুমি এবং আমি দুজন মিলে কক্সবাজার যাব।”

“কেন আষাঢ় ভাই? কক্সবাজারে কী কাজ আমাদের?

আষাঢ় হাসলো। হাসিটা ঠোঁটের এক কোণে বেশি প্রশস্ত হলো। এটাকে কিছুটা মুখ বাঁকিয়ে হাসা বলা চলে। সে কেমন গলা ছেড়ে দিয়ে বললো,
“যেখানে সুন্দরী রমণীদের ভিড়, সেখানেই তো প্রেমিক পুরুষের যাতায়াত থাকবে কারিব।”

কারিবের বুঝতে অসুবিধা হলো না। সেও একটু হেসে গাড়ি স্টার্ট করলো। আষাঢ়ের সাথে থাকাকালীন সময়ে সে কেমন যেন হয়ে যায়। নিজের মতো থাকে না। অন্য মানুষ বনে যায়। আষাঢ়ের সব কাজে তার সঙ্গ থাকে। কাজটা ঠিক না বেঠিক, তা নিয়ে সে ভাবে না। তার ধারণা তার আষাঢ় ভাই আর যাই করুক খারাপ কিছু করে না। তার এ ধারণা শুধু আষাঢ়ের বেলায়। আষাঢ়ের মতো যদি অন্য কেউ করতো তাহলে হয়তো সে তা সহ্য করতো না।
#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ০৪
__________________

বাংলাদেশ আসার পরদিন আষাঢ় কারিবকে নিয়ে কক্সবাজার ছুটে গেছে। তিনদিন কাটিয়েছে সেখানে। কবির সাহেব এ নিয়ে ক্ষুব্ধ। ছেলেটা বাংলাদেশ এসেই কক্সবাজার ছুটে গেল কেন?
কক্সবাজার থেকে আষাঢ়, কারিব ফিরে আসার পর, কবির সাহেব কারিবের কাছ থেকে এ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে কারিব বললো,
“আষাঢ় ভাইয়ের মাঝে হঠাৎ দেশপ্রেম জেগে উঠেছিল। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দেশের কোনো এক সুন্দর জায়গা ঘুরতে যাবেন। সমুদ্র সৈকতের মতো সুন্দর জায়গা কি আর দ্বিতীয়টি হয়? সে জন্য তিনি ঠিক করলেন, সমুদ্র ঘুরতে যাবেন। এই যা।”

কবির সাহেব সহজে বিশ্বাস করলেন না,
“এর মাঝে অন্য কোনো কিন্তু নেই তো?”

“বিলকুল না মামা। আষাঢ় ভাই শুধু সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতেই গিয়েছিলেন। আর কিছু না।”

কবির সাহেব বিশ্বাস করতে পারলেন না। কিন্তু কারিব তাকে মিথ্যা বলবে এমনটাও ভাবলেন না তিনি। অর্ধ বিশ্বাস এবং অর্ধ সন্দেহ নিয়ে থাকতে হলো তাকে।
______________

বিছানার নরম কোলে গা ডুবিয়ে ঘুমিয়ে আছে আষাঢ়। উপুড় হয়ে শোয়া। সারা বিছানা ছেড়ে বিছানার এক কর্ণারে এসে পড়ে রয়েছে। মুখটা কাত হয়ে থাকায় একপাশ সদৃশ্যমান। বাইরে বৃষ্টির রিমঝিম ধারা ঝরছে অনর্গল। কাচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরের পরিবেশে ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা ভাব। গতকাল সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই ঘুম দিয়েছে আষাঢ়। আর সেই ঘুম এখনও অটল। কারিব দাঁড়িয়ে আছে আষাঢ়ের থেকে একহাত পরিমাণ দূরত্ব রেখে। কিছুক্ষণ আষাঢ়ের ঘুমন্ত মুখখানিতে তাকিয়ে থেকে অতি মৃদু, আদুরে কণ্ঠে ডাকলো সে,
“আষাঢ় ভাই! আষাঢ় ভাই, উঠবেন না?”

আষাঢ় কোনো সাড়া দিলো না। আষাঢ়ের কানে তার ডাক পৌঁছেছে কি না সে বিষয়েই দ্বিধান্বিত কারিব। সে আরেকটু নিকটে এসে দাঁড়িয়ে ফের ডাকলো,
“আষাঢ় ভাই, ওঠেন। দেখা করতে যাবেন না?”

আষাঢ়ের থেকে এবার ঘুমু ঘুমু আহ্লাদী কণ্ঠ ভেসে এলো,
“উহ কারিব, ডোন্ট ডিস্টার্ব মি প্লিজ। আমাকে ঘুমাতে দাও। বিরক্ত করো না।”

আষাঢ়ের ঘুমু ঘুমু আহ্লাদী কণ্ঠ শুনে কারিব একটু হাসলো। হাস্যজ্জ্বল মুখে বললো,
“ঘুমালে হবে না তো আষাঢ় ভাই। আপনার গার্লফ্রেন্ড এসে তো অপেক্ষা করছে। তার সাথে দেখা করতে যাবেন না?”

আষাঢ় আগের ন্যায় কণ্ঠের রেশ রেখে বললো,
“তুমি যাও কারিব। গিয়ে বলো, ‘তোমার প্রেমিক পুরুষ ঘুমাচ্ছে’।”

কারিব হাসিটা আগের থেকে আরেকটু চওড়া করে বললো,
“আমি গেলে কি হবে? আপনাকেই যেতে হবে। আজ আপনি আপনার গার্লফ্রেন্ডের সাথে লাস্ট মিট করবেন, ভুলে গেছেন?”

বন্ধ আঁখির ঘুমে মত্ত আষাঢ় এবার নড়েচড়ে উঠে বসলো। নিভু নিভু চোখ মেলে তাকালো কারিবের দিকে।

কারিব হাতের ঘড়ি দেখে নিয়ে বললো,
“আমাদের দেখা করতে যাওয়ার কথা ছিল ন’টায়। এখন দশটা পাঁচ বাজে। আমরা অনেক লেট করেছি। আপনার গার্লফ্রেন্ড হয়তো ক্ষুব্ধ।”

আষাঢ় বেড থেকে নামতে নামতে বললো,
“ক্ষুব্ধ? আমাকে দেখার পর ওর ওই ক্ষুব্ধ মুখ আর থাকবে না কারিব। হাসির ঝিলিক খেলবে ওর মুখে। কিন্তু ওর হয়তো জানা নেই, ওর ওই হাসির ঝিলিক ঘেরা মুখটা আমি আঁধারে ছেয়ে দেবো। ওর আঁধারে ছেয়ে যাওয়া মুখের জন্য ও নিজেই দায়ী। আমার প্রতি এত পাগল হওয়া উচিত হয়নি ওর।”

______________

আজকে শুক্রবার। কবির সাহেব বাড়িতে আছেন। ল্যাপটপে মনোযোগ তার। সিঁড়ি থেকে কারিব এবং আষাঢ়ের নেমে আসার গটগট শব্দ হতে তিনি চশমার ভিতর থেকে আড়চোখে তাকালেন একবার। দেখেই বুঝলেন ওরা দুজন বাইরে যাচ্ছে।

“কোথায় যাচ্ছ তোমরা?”

কবির সাহেবের প্রশ্নে হোঁচট খেলো কারিব। জায়গাতেই তার পা স্থির হয়ে গেল। কারিবের চেহারায় ক্ষণিকের জন্য বিচলিত একটা ভাব দেখা দিলেও, আষাঢ়ের চেহারাতে তা দেখা গেল না। আষাঢ় ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে কেমন টানা টানা সুরে বললো,
“কারিব, আমরা যেন কোথায় যাচ্ছি?”

কারিব একগাল হাসলো। মনে মনে কথা সাজিয়ে নিয়েছে সে। কবির সাহেবকে উত্তর দিলো,
“আমরা চিড়িয়াখানা যাচ্ছি মামা।”

“চিড়িয়াখানা?” কবির সাহেবের কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়লো।

“হ্যাঁ মামা। চিড়িয়াখানায় নতুন একটা বাঘ এসেছে। আষাঢ় ভাই গত রাতে বললেন, সে নতুন বাঘটা দেখতে চায়। তাই এখন বাঘ দেখার উদ্দেশ্যেই যাচ্ছি আমরা।”

কারিবের কথা শুনে মনে মনে হাসলো আষাঢ়। কারিব বুদ্ধিমান একটা ছেলে। এই জন্যই কারিবকে তার এত পছন্দ। এত সুন্দর করে মিথ্যা বলতে পারে ছেলেটা! সত্যিই মনোমুগ্ধকর! আষাঢ় সিঁড়ির অবশিষ্ট ধাপগুলো পার করে লিভিং রুমে পা রাখলো। কারিবও তার পা দুটো সচল করে ওর পিছন পিছন নেমে এলো।

“বাঘ আবার দেখতে যাওয়ার কী আছে? জীবনে কি আর চিড়িয়াখানা গিয়ে বাঘ দেখেনি?”

বাবার কথার জবাবটা এবার আষাঢ় নিজে দিলো,
“অনেক দেখেছি আব্বু, কিন্তু সেটা ছোট বেলায়। ছোট বেলায় বাঘ দেখা, আর বড়ো হয়ে বাঘ দেখার মাঝে অনেক পার্থক্য। এটা তুমি বুঝবে না।”
আষাঢ় কারিবকে তাগাদা দিয়ে বললো,
“কারিব, দ্রুত চলো। তাড়াতাড়ি না গেলে হয়তো ক্ষুব্ধ বাঘটা আরও বেশি ক্ষেপে যাবে।”

দুজন বেরিয়ে গেল।
রুপালি সব কথোপকথন শুনেছে দূরে দাঁড়িয়ে। সে কবির সাহেবের নিকটে এসে জানান দিলো,
“স্যার, আপনারে মিছা কইছে ওরা। আমি শিওর ওরা কোনো বাঘ দেখতে যাচ্ছে না। অন্য কোথাও যাচ্ছে।”

“অন্য কোথাও আর কোথায় যাবে রুপালি? কারিব কি আর মিথ্যা বলবে আমাকে?”

“আপনি তো কারিবরে চিনেন-ই না। ও হলো শয়তানের ছুডুু ভাই। ওর ভিতরে ভিতরে শয়তানি। আষাঢ়েরে নিয়া অন্য কোথাও যাচ্ছে ও। ও আপনার অনুগামী না, ও আপনার ছেলের অনুগামী।”

রুপালির কথা ভালো লাগলো না কবির সাহেবের। কারিব তাকে মিথ্যা বলবে এটা তার কাছে বিশ্বাস করা কষ্টকর। ছোট বেলা থেকে কারিব তার সব কথা শোনে। সে যেটা করতে নিষেধ করেছে, কারিব সেটাই করা বন্ধ করেছে। দুই ছেলের থেকে কারিব তার বেশি বাধ্য ছিল, এবং এখনও আছে। কবির সাহেব রুপালির কথার কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে রুমের দিকে গেলেন সোজা।

______________

নিজের এমতা অধঃপতন দেখে কারিব মনে মনে লজ্জিত। আষাঢ়ের জন্য সে এরকম মিথ্যা আরও অনেক বলেছে। মাঝে মাঝে তার খুব অবাক লাগে! প্র্যাকটিস ছাড়াই এত সুন্দর মিথ্যা বলতে কী করে শিখলো? প্র্যাকটিস ছাড়াও যে এত সুন্দর করে কিছু আয়ত্ত করা যায়, এটা জানতো না সে।

বৃষ্টি থেমে গেছে কিছুক্ষণ আগে। বৃষ্টি থামার পর প্রকৃতি ঝকঝকে হয়ে উঠেছে। আকাশের গুরুগম্ভীর ভাব কেটে গিয়ে এখন রূর্যকিরণের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। কারিবদের গাড়িটা এখন মিরপুরের দিকে এগিয়ে চলছে। আষাঢ়ের গার্লফ্রেন্ড সাদিয়া মিরপুরের অধিবাসী। মিরপুরের একটা ক্যাফেতে আজ দেখা করার কথা। সামনা সামনি এর আগে শুধু একবার দেখা হয়েছিল দুজনের। যেদিন প্রথম বাংলাদেশ এসেছিল সেদিন মিরপুরে গিয়ে দেখা করেছিল কারিবকে সাথে নিয়ে। আমেরিকা থাকতে ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল সাদিয়ার সাথে। পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে এটা প্রণয়ের দিকে গড়ায়। আজ দ্বিতীয় দেখা সাদিয়ার সাথে, আর এটাই শেষ। সাদিয়া এটা আজ ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না যে তার প্রেমিক আজ শেষ দেখা করতে এসেছে তার সাথে। টেরটা ধীরে ধীরে পাবে। যখন ফোনে পাবে না প্রেমিককে, কোনো খোঁজ থাকবে না প্রেমিকের, তখন দিশেহারা হয়ে পড়বে। প্রেমিকের বাড়িতে এসে যে প্রেমিকের খোঁজ নেবে সেটাও পারবে না। সে পথ খোলা রাখেনি আষাঢ়। সে এত বোকা নয় যে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে বাড়ির ঠিকানা দেবে।

“কক্সবাজারের মেয়েগুলো খুব জ্বালা দিচ্ছে কারিব। কালকে বাসায় ফেরার পর তিন জনের একাধিক বার কল দেওয়া হয়ে গেছে। ওরা এতটা ত‍্যাদড় জানলে কক্সবাজার পা রাখতাম না আমি। গত রাতে আমার শান্তির ঘুমটাকে বিনষ্ট করেছে ওরা।”

কারিব ঠোঁটে মুচকি হাসি ধরে তাকালো আষাঢ়ের দিকে, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার সৌভাগ্য হলো না। দ্রুত আবার সামনে দৃষ্টি ফেলতে হলো। বাংলাদেশ আসার পরের দিন আষাঢ়ের কক্সবাজার যাওয়ার মূল কারণ ছিল ‘রাহমা’। ইন্সট্রাগ্রামে প্রথম পরিচয় হয়েছিল রাহমার সাথে। রাহমাকে সামনা সামনি দেখার জন্য কক্সবাজার গিয়েছিল। কক্সবাজার গিয়ে রাহমার পাশাপাশি আরও দুই সুন্দরীকে ভুলিয়েছে নিজের প্রেমে। তিন দিনে রাহমাসহ তিন প্রেমিকা তৈরি করেছে। কিন্তু এখন যে এই তিন প্রেমিকার প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছে আষাঢ়ের জীবনে, সেটা খুব সহজে ধরতে পারলো কারিব। তবে আষাঢ়ের প্রতি একটা বিষয়ে সে খুব গর্বিত। আষাঢ়ের মেয়েদের প্রতি ঝোঁক থাকলেও কোনো মেয়ের সাথে আজ পর্যন্ত খারাপ কিছু করেনি। ফোনে একটু-আধটু কথা বলা, চ্যাটিং করা, দেখা করা এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কারিব নরম কণ্ঠে জানতে চাইলো,
“এখন কী করবেন? ওই তিন প্রেমিকার জ্বালা থামাবেন কী করে?”

আষাঢ় মোবাইল থেকে সিম কার্ড বের করে দুই আঙুলে সিমটা চাপ দিয়ে মাঝখান থেকে ভেঙে ফেললো। তা লক্ষ্য করে কারিব বললো,
“এতটা রুড সাজা কি ঠিক হলো আষাঢ় ভাই? শত হলেও ওনারা আপনার প্রেমিকা ছিল। ফোন করে আপনাকে না পেলে তো ওনাদের মানসিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।”

“উহ কারিব প্লিজ! ওদের জন্য দরদ দেখিয়ো না তুমি। ওরা আমার ঘুমে ডিস্টার্ব করেছে। জানোই তো, যার তার ডিস্টার্ব আমি সহ্য করতে পারি না। আমার ঘুমে ডিস্টার্ব করার জন্য এই শাস্তিই প্রাপ্য ছিল ওদের।” আষাঢ়ের কণ্ঠে কিছুটা রাগ, কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ পেল।
আষাঢ়ের বিরক্তি মেশানো কথা শুনে কারিব হাসলো। আষাঢ় যখন বিরক্তি নিয়ে কিছু বলে ভালোই লাগে তার।

“আর তাছাড়া তুমি তো জানোই, বাংলাদেশের মেয়েদের বেশিদিন নিজের প্রেমিকা পরিচয়ে রাখা পছন্দ করি না আমি।”

“কিন্তু ওনাদের ক্ষেত্রে সময়টা খুব কম হয়ে গেল না? মাত্র তিনদিন। কম করে হলেও তো পাঁচ দি…”

“নতুন সিম কার্ড দাও আমাকে।” কারিবের কথার মাঝে কথা বলে কারিবকে থামিয়ে দিলো আষাঢ়।

কারিব একহাত স্টিয়ারিংএ রেখে আর একহাত দিয়ে পকেট থেকে একটা ছোট বক্স বের করে আষাঢ়ের দিকে বাড়িয়ে দিলো। আষাঢ় বক্সটি খুললো। বক্সের ভিতর গ্রামীণ, বাংলালিংক, রবি, এয়ারটেল ইত্যাদি সিম আছে। আষাঢ় একটা রবি সিম তুলে নিলো। সিমটা ঢুকালো মোবাইলে। আষাঢ় বাংলাদেশ আসার আগেই কারিব আষাঢ়ের জন্য একাধিক সিম কার্ড কিনে রাখে। আষাঢ় বাংলাদেশ এসে ক্ষান্ত থাকে না। বিভিন্ন অঞ্চলের মেয়েদের নিজের প্রেমিকা বানানোতে ব্যস্ত হয়। তবে এই প্রেমিকারা আষাঢ়ের জীবনের খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ। প্রেমিকা বানানো, প্রেমিকাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করা, এসব তার কাছে টাইম পাসের একটি মাধ্যম ছাড়া আর কিছু না। বাংলাদেশি কোনো প্রেমিকাই আষাঢ়ের দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারো সাথে পাঁচদিন, কারো সাথে দশ দিন, আর যারা একটু বেশি সুন্দরী তাদের সাথে বড়ো জোর পনেরো দিন রিলেশন থাকে তার। এরপর কেউ আর তাকে খুঁজেও পায় না। আষাঢ়ের এ যাবৎ যত গার্লফ্রেন্ড ছিল বা আছে তারা সবাই-ই ঢাকার বাইরের। ঢাকার ভিতর দুই কি তিনজন মেয়ে তার প্রেমিকা লিস্টে আছে। এর ভিতর দুজনের সাথে তার সম্পর্ক গত হয়েছে। বর্তমানে একজন আছে, সাদিয়া। সাদিয়ার সাথেও আজকে সব শেষ।
আষাঢ় ভুল করেও আজ পর্যন্ত কোনো গার্লফ্রেন্ডকে বাড়ির ঠিকানা বলেনি। কোন বিভাগ, কোন জেলা, কোন এলাকা কিছুই না। যারা জানতে চেয়ে একটু বেশিই আগ্রহ দেখিয়েছে তাদের সাথে ওখানেই সম্পর্ক স্থগিত করে দিয়েছে। আমেরিকাতেও আষাঢ়ের গার্লফ্রেন্ডের অভাব নেই। সেসব গার্লফ্রেন্ডদের সাথেও তার সম্পর্ক টিকে অল্প সময়ের জন্য। তবে বাংলাদেশি মেয়েদের থেকে একটু দীর্ঘ সময়। স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ডের পাশাপাশি আষাঢ়ের স্থায়ী গার্লফ্রেন্ডও আছে আমেরিকাতে। খুব বাছাই করে স্থায়ী গার্লফ্রেন্ড তৈরি করেছে সে।
আষাঢ়ের সবচেয়ে বড়ো গুণ হলো সে অল্পতেই মেয়েদেরকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে ফেলার ক্ষমতা রাখে। যেসকল মেয়ে আষাঢ়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়, সেসব মেয়েদেরকে কারিবের কাছে বড্ড বোকা মনে হয়। কারণ, আষাঢ় যেভাবে মেয়েদের সাথে ভাব জমায়, তাতে বোঝাই যায় ওটা প্রকৃত কোনো অনুভূতি থেকে করে না সে। পুরোটাই ফেইক। তবুও মেয়েরা কেমন যেন অবুঝের মতো পটে যায়। ওইসব মেয়েদের জন্য কারিবের খুব আফসোস হয়। এখনই সে মনে মনে একবার আফসোস প্রকাশ করলো। তারপর বললো,
“আপনি তো বলেছিলেন আগের থেকে এবার বেশিদিন থাকবেন বাংলাদেশ। ঠিক কত দিন থাকবেন সেটা বলেননি। কতদিন থাকবেন এবার?”

আষাঢ় স্পষ্ট উত্তর দিলো,
“ছয় মাস।”

কারিবের দু চোখে হঠাৎ বিস্ময় প্রবাহমান হলো। পাশ ফিরে বিস্ময়ান্বিত চোখ দিয়ে আষাঢ়কে দেখে নিলো একবার। আষাঢ় এর আগে বাংলাদেশ এসে তিন মাসের বেশি থাকেনি। কারণ, সে বাংলাদেশ এলে ওদিকে আমেরিকাতে তার গার্লফ্রেন্ডদের হায়-হুতাশ শুরু হয়ে যায়। গার্লফ্রেন্ডদের রেখে বাংলাদেশ এসে বেশিদিন থাকে না তাই।

“আপনি তো বলেন বাংলাদেশ এলে আপনার স্থায়ী গার্লফ্রেন্ডরা আপনাকে খুব মিস করে, পাগল প্রায় হয়ে যায় আপনার জন্য, আপনিও ওনাদের কষ্ট হয় বলে তিন মাসের বেশিদিন থাকেন না বাংলাদেশ। তাহলে এবার ছয়মাসের এত দীর্ঘ মেয়াদে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে?”

“গার্লফ্রেন্ডদের জন্যই তো থাকবো কারিব। আমার ওই পাঁচ স্থায়ী গার্লফ্রেন্ডকে শিক্ষা দেবো আমি।”

কারিব অবাক হয়ে বললো,
“গার্লফ্রেন্ডদের শিক্ষা দেবেন মানে?”

“হ্যাঁ, শিক্ষা দেবো। দুই তিন মাস ধরে আমি লক্ষ্য করছি আমার পাঁচ স্থায়ী গার্লফ্রেন্ড আমার কথার অবাধ্য হয়ে পড়েছে। আমি যেটা বলি তারা কেমন যেন তার বিরুদ্ধে কথা বলে। ঠিক এই কারণে…এই কারণে আমি এবার ছয়মাস থাকবো বাংলাদেশ। ওই পাঁচ প্রেমিকাকে মজা বোঝাবো আমি। ফোন করে যখন আমেরিকা ফিরে যাওয়ার জন্য আকুতি-মিনতি করবে, তখন একটিবার ওদের আকুতি-মিনতিতে সায় দেবো না। দীর্ঘ ছয়মাস আমাকে ছাড়া কাটাক ওরা। তাহলেই একটা শিক্ষা হবে। আমার জন্য কান্নাকাটি করবে ওরা। তবুও ফিরবো না আমি। উচিত একটা শিক্ষা হবে।”

“এতটা কঠিন হবেন আপনি? ওনারা তো আর আপনার স্বল্প সাময়িক প্রেমিকা নয়। স্থায়ী। স্থায়ী প্রেমিকাদের সাথে কি এতটা কঠিন হওয়া উচিত?”

“অবশ্যই উচিত।”

“হোক আপনি তাদের মন থেকে ভালোবাসেন না। কিন্তু এত বছরের রিলেশন…আমার মনে হয় তাদের প্রতি এতটা রুড হওয়া উচিত হবে না আপনার।”

“বলছো?”

“হুম।”

কারিবের কথা আষাঢ়কে ভাবনায় ফেললো। মন থেকে প্রেমিকাদের ভালো না বাসলেও, এই পাঁচ স্থায়ী প্রেমিকাদের প্রতি তার আলাদা মায়া আছে। প্রেমিকাদের কষ্ট দিতে তার নিজেরও কষ্ট হয়। যদিও প্রেমিকাদের সব বাসনা সে পূর্ণ করে না। তাও প্রেমিকাদের টানা একটা দিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে সে মানিয়ে ফেলে। কিন্তু এবার কী করবে? যদি ছয় মাসের আগে ফিরে যায় তাহলে তো প্রেমিকারা আবার মাথায় উঠে যাবে। না, সে তো ফিরবে না ছয় মাসের আগে। শুধু ফোনে যতটা রুড ভাবে কথা বলতে চাইছিল, সেটা কমিয়ে দেবে।

_______________

রুমকির সাথে শ্রাবণের সব রকম দেখা সাক্ষাৎ, যোগাযোগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বাবাকে শ্রাবণের খুব ভয়। ভয়ে পড়ে আজ পর্যন্ত বাবা যা বলেছে সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। কিন্তু এটা পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হলো না। সকলের অগোচরে আজ রুমকির সাথে দেখা করতে এসেছে সে। এ ক’দিনে রুমকির সাথে দেখা হয়নি তার। ফোনে কথাও হয়েছে খুব কম। রুমকি ফোন দিতো অনেক, কিন্তু সে বলার মতো পেতো না কিছু। অনেক সময় কল রিসিভও করতো না। এ নিয়ে রুমকি খুব রাগ। শ্রাবণের বিয়ের কথাবার্তা চলছে বাড়িতে এটা এখনও জানে না রুমকি। শ্রাবণ জানানোর সাহস পায়নি। মিহিকের বাড়ি থেকে এখনও সরাসরি কোনো উত্তর আসেনি। তারা ভেবে দেখার জন্য সময় চেয়েছে। মিহিকের ফ্যামিলি হ্যাঁ বলে দিলেই বিয়ে হয়ে যাবে শীঘ্রই। এই বিয়ে বিয়ে নিয়ে চিন্তায় চিন্তায় শ্রাবণের অবস্থা খুব খারাপ। মানসিক অবস্থা শঙ্কিত। কোনো কিছুতেই মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না সে। এই তো এখনই, রুমকির সাথে দেখা করতে এসে পাণ্ডুরে মুখ করে, শূন্য দৃষ্টিতে চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে।
শ্রাবণকে এরকম দেখে রুমকি প্রচণ্ড রাগান্বিত। শ্রাবণের ফ্যাকাসে মুখের দিকে কিছুক্ষণ নীরব তাকিয়ে থেকে বললো,
“তোমার হয়েছে কী?”

রুমকির প্রশ্নে শ্রাবণের ভাবনার খুঁটি নড়লো। শুকনো মুখে বললো,
“না, কিছু হয়নি।”

“সত্যি করে বলো কী হয়েছে? কদিন ধরেই দেখছি তোমার এমন অবস্থা। ফোন দিলে ফোন ধরো না, দেখা করো না আমার সাথে। এরকম কেন করছো? আমাকে ভালোবাসার হাউশ কি মিটে গেছে তোমার?”

রুমকির কথায় শ্রাবণ ভীষণ রকম আহত হলো। আহত কণ্ঠে বললো,
“তুমি এমন করে কেন বলছো?”

“তো কী রকম করে বলবো? শোনো, আমার সাথে এরকম ভাবে থাকবে না একদম। গম্ভীর মানুষ আমার দুই চোক্ষের বিষ। কী হয়েছে সেটা খোলাসা করে বলো।”

বলে দেবে না কি রুমকিকে? না, পারবে না। রুমকিকে নিজের বিয়ের কথা বলার সাহস তার নেই। আর তাছাড়া বাবাও নিষেধ করে দিয়েছে। এখন রুমকিকে বলে দিলে রুমকি যদি কোনো ঝামেলা করে, তাহলে রুমকির তো কিছু হবে না। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া তো হবে তাকে। না বলবে না রুমকিকে। রুমকি এটা জানার পর শান্ত থাকবে না। এই বিয়ে ভাঙতে অন্য কোনো পথ অবলম্বন করতে হবে। আর এ পথ একা নিজেরই খুলতে হবে।

“আবার কোন ভাবনায় ডুবে গেছো তুমি?”

রুমকির কণ্ঠ বজ্রপাতের মতো এসে কানে লাগলো। শ্রাবণ অতি কষ্টে মুখে হাসি ফুঁটিয়ে বললো,
“না, কিছু না। চলো, বাড়ি ফিরি এখন।”

“পার্কে এসে বসেছি আধ ঘণ্টাও হয়নি। এখনই বাড়ি চলে যাব? বাড়ি নয়, শপিংএ চলো।”

শ্রাবণ এমনিতেই কোনো কিছুতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না, শপিংএ যাওয়া এখন তার পক্ষে সম্ভব নয়। বললো,
“আমি এখন শপিংএ যেতে পারবো না, আমার জরুরি কাজ আছে। তুমি একা চলে যাও।”

শ্রাবণ রুমকির হাতে শপিং করার টাকা দিয়ে চলে গেল।

________________

মিহিক শ্রাবণকে বিয়ে করতে চায় না, এ কথাটা কালক্রমে এসে লায়লা খানমের কানে পৌঁছেছে। রুপালি তাকে জানিয়েছে কথাটা। রুপালি সবার উপরই নজর রাখে। সব বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ একটু বেশি। মিহিকের বাড়ির উপরও সে নজর রাখছিল। ওই বাড়ির মানুষদের যাচাই করছিল। তাতেই বুঝলো।

কথাটা জেনে লায়লার খারাপ লেগেছে খুব। যদিও মিহিকদের বাড়ি থেকে বিয়ের ব্যাপারে সরাসরি হ্যাঁ অথবা না কোনো উত্তরই আসেনি। তারা ভাবার জন্য সময় চেয়েছে। কিন্তু যেখানে মেয়ে রাজি নয়, সেখানে কি মেয়ের ফ্যামিলি বিয়ে দেবে?

মিহিককে মন থেকেই ঘরের বউ করে আনতে চায় লায়লা। রুমকির হাত থেকে ছেলেকে বাঁচাতে হলে মিহিকের সাথে শ্রাবণের বিয়ে হওয়াটা খুব জরুরি। না, মিহিকের সাথে শ্রাবণের বিয়েটা ভেঙে যেতে দিতে পারে না সে। বোঝাতে হবে। মিহিক শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী মেয়ে। বোঝালে নিশ্চয়ই বুঝবে।

লায়লা বিকেলে একবার মিহিকদের বাড়িতে গেলেন। উদ্দেশ্য, তার ছেলেকে যেন বিয়ে করে সেজন্য মিহিকের কাছে আবদার করবে। রুমকি ভালো মেয়ে নয়। ও মেয়ের সাথে তার ছেলে কোনোদিন সুখী হতে পারবে না। অমন মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে হোক জেনেশুনে এটা কোনো মা-ই চায় না। মিহিককে সে ছেলের বউ হিসেবে পছন্দ করেছে। শ্রাবণের বিয়ে মিহিকের সাথে হোক এটাই তার চাওয়া। কিন্তু মিহিককে বোঝানোটা সহজ হবে কি না এ নিয়ে চিন্তিত সে।

(চলবে)
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here