বিবর্ণ জলধর পর্ব -০৫+৬

0
59

#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ০৫
__________________

মিহিক শ্রাবণকে বিয়ে করতে চায় না, এ ব্যাপারে হাফিজাকে জিজ্ঞেস করলে হাফিজা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে থতমত খেয়ে গেলেন,
“আসলে বুঝতেই তো পারছেন…মানে… মিহিক…”

“মিহিককে ডেকে দেন, ওর সাথে কথা বলি আমি।” হাফিজার থতমত ভাবকে কাটিয়ে দিতে সাহায্য করলেন লায়লা।

“কথা বলবেন?”

“হ্যাঁ, ডেকে দেন।”

“ঠিক আছে, আপনি বসুন, ডেকে দিচ্ছি ওকে। তবে মিহিক কিন্তু একটু জেদি মেয়ে।”

লায়লা খানম একগাল হেসে বললেন,
“আমার হবু বউমা তো, আমিই জেদটা বুঝে নেবো।”

হাফিজাও একটু হাসার চেষ্টা করে চলে গেলেন।

লায়লা খানম এসেছে সেটা মিহিক টের পায়নি। কানে ইয়ারফোন গুঁজে মোবাইলে মনোযোগী সে। তিন্নি, নোয়ানা এই মুহূর্তে কেউ বাড়িতে নেই। তিন্নি এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর নোয়ানা আছে এখন টিউশনিতে।

“তোর শাশুড়ি এসেছে, লিভিং রুমে আয়।” রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে কথাটি মিহিককে জানান দিলো হাফিজা।
মিহিকের মনোযোগ আকর্ষণ করা গেল। সে কান থেকে ইয়ারফোন সরিয়ে নিয়ে, গলায় বিস্ময় ঢেলে বললো,
“কে এসেছে?”

“তোর শাশুড়ি।”

“শাশুড়ি মানে?”

“লায়লা ভাবি এসেছে। তোর সাথে কথা বলতে চায়। জলদি আয়।”

অন্য সময় হলে লায়লা এসেছে জেনে খুশি হতো মিহিক। কিন্তু আজ কেন যেন পারলো না। উল্টো চিন্তা হচ্ছে। লায়লা আন্টি কেন এসেছে? মিহিকের মন বললো, বিয়ে নিয়েই কিছু বলতে এসেছে। যা-ই বলতে আসুক সমস্যা নেই। বিয়ে করবে না শ্রাবণকে, বলে দেবে এটা। ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে লিভিং রুমে উপস্থিত হলো মিহিক। হাফিজা কিছু নাস্তার ব্যবস্থা করতে গেছেন। লিভিং রুমে এখন তাই শুধু মিহিক এবং লায়লা খানম আছে। মিহিক রুম থেকে আগাম প্রস্তুতি নিয়ে এলেও, লায়লা খানমকে দেখার পর সব গুলিয়ে গেল। মিহিক হাস্য মুখে সালাম জানালো। লায়লা খানমও হাসি মুখে সালামের উত্তর দিলেন।
মিহিকের বিব্রত বোধ হচ্ছে। যাকে বিয়ে করবে না, তার মা বিয়ে সম্পর্কিত কথাবার্তা বলতে এসেছে, কেমন না ব্যাপারটা!

লায়লা খানম নিজের পাশে বসতে বললেন মিহিককে। মিহিক যথা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। লায়লা খানমের পাশে বসলে লায়লা খানম শান্ত স্বরে বললেন,
“শুনলাম, তুমি না কি আমার ছেলেকে বিয়ে করতে চাইছো না?”

লায়লা খানমের সরাসরি প্রশ্নে মিহিক ভড়কে গেল। এই প্রশ্ন তার অস্বস্তি, বিব্রত বোধ বাড়িয়ে দিলো কয়েক গুণ। থতমত খেতে হলো না চাইতেও। প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হওয়ার ক্ষণে লায়লা খানম হঠাৎ মিহিকের দুই হাত আঁকড়ে ধরলেন।
মিহিক চমকে তাকালো। লায়লা খানমের দুই চোখে আকুলতা।

“তুমি আমার ছেলেটাকে বিয়ে করো মা।” অনুরোধ প্রকাশ পেল লায়লা খানমের গলায়।

মিহিক স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

“আমার ছেলেটা কিন্তু খারাপ না। তুমি তো দেখেছো ওকে। ওকে কি খারাপ মনে হয় তোমার? আমি বুঝতে পারছি তোমাকে। আমার ছেলে রুমকির বিয়েতে ঝামেলা করেছে, রুমকিকে ভালোবাসে বলেছে, এমন একটা ছেলেকে বিয়ে করা হয়তো সব মেয়েদের কাছেই একটু ভাবনীয়। কিন্তু বোঝার চেষ্টা করো। আমার শ্রাবণ আসলে এমন নয়। জানি না হঠাৎ করে কী হয়েছে ওর। রুমকি হয়তো ওর মাথা খারাপ করে দিয়েছে। তুমি তো জানো রুমকি কেমন মেয়ে। রুমকি ওকে বশ করেছে। ও বুঝতে পারছে না রুমকি ওর জন্য ঠিক নয়। রুমকি শুধু ওকে ব্যবহার করছে। আমার ছেলেটা একটু অবুঝ। তুমি এমন অবুঝপনা করো না। রুমকির হাত থেকে আমার ছেলেটাকে রক্ষা করো। তুমি যদি ওকে বিয়ে করো তাহলে ও আর এমন থাকবে না। আমার ছেলেটা ভালো, খুব ভালো ও। ওকে বিয়ে করে আফসোস করতে হবে না তোমার। আমি ওর মা হয়ে বলছি, প্লিজ! তুমি বিয়ে করো ওকে।”

“আ… আন্টি…”

“আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি মিহিক। প্রথম দেখা থেকেই তুমি আমার পছন্দের পাত্রী। আমি চাই আমার ছেলের বিয়েটা তোমার সাথেই হোক। আমার ছেলেটা কিন্তু আসলেই খারাপ না। ভদ্র, শিক্ষিত। খুব ভালো ও। ঠকতে হবে না তোমাকে। তুমি ওর সাথে কথা বলে দেখো। তারপর তোমার যদি সত্যিই মনে হয় ও খারাপ, তাহলে এ বিয়ে করতে হবে না তোমাকে। তুমি ওর সাথে কথা বলো। দেখো আমার ছেলেটাকে।”

“আসলে আন্টি আমি…”

লায়লা খানম মিহিকের হাত দুটো আরও ভালো করে আঁকড়ে ধরে বললেন,
“প্লিজ! তুমি আর না করো না। তুমি আমার বাড়ির বউ হয়ে গেলে তোমাকে বউ মা না, নিজের মেয়ের মতো আদর-যত্নে রাখবো। ভাববো, জুন যেমন আমার মেয়ে, তুমিও তেমনি আমার আরেকটি মেয়ে। মেয়ের মতোই ভালোবাসবো তোমায়। তোমার যদি কখনও মনে হয় শ্রাবণকে বিয়ে করে তুমি আফসোসের শিকার, তাহলে আমি বলছি, আমি নিজে এর শাস্তি মাথা পেতে নেবো। তুমি অমত করো না আর। কালকে শ্রাবণের সাথে দেখা করো একবার। দেখা করলেই বুঝতে পারবে, আমার ছেলেটা খারাপ না। রুমকির বিয়েতে যা করেছে ওটা সাময়িক গন্ডগোলের জন্য। প্লিজ! না করো না তুমি। তাহলে কালকেই তোমরা দুজন দেখা করো, কেমন?”

মিহিক নির্বাক তাকিয়ে রইল। লায়লা খানম এমনভাবে বলেছে তাতে তার উপর কথা বলার আর কিছু পেল না সে।

লায়লা খানম মিহিকের মৌনতা দেখে খুশি হলেন। মুখে স্বস্তির হাসি ফুঁটিয়ে বললেন,
“আমার ছেলেটা খুব ভালো মিহিক!”

______________

আকাশের গায়ে অর্ধপূর্ণ একটি চাঁদ। চাঁদের ক্ষীণ আলোর সজ্জায় সজ্জিত শহরের বুক। এই শহরের বুকে থাকা কত মানুষের দুঃখ, কষ্ট মিলেমিশে একাকার। কারোরটা কারো চোখে পড়ে না। এগুলো দেখতে হলে হৃদয়ের চোখ লাগে। মন থেকে উপলব্ধি করতে হয়। শ্রাবণের দুঃখ বোঝার যেন এমন কেউ নেই। না তো মা বুঝতে চাচ্ছে তাকে, আর না তো বাবা। নিজেকে মনে হচ্ছে এই শহরের বুকে থাকা সবচেয়ে অসহায় একজন মনুষ্য। এত কষ্ট কেন এই পৃথিবীতে?

“তাহলে তোমরা চাইছো মিহিকের সাথে আমার বিয়েটা সত্যিই হয়ে যাক?” কষ্টের ক্ষুদ্র একটি পরিসর হিসেবে বুক চিরে প্রশ্নটা বেরিয়ে এলো শ্রাবণের।

লায়লা খানম ছেলেকে মানানোর চেষ্টা করে বললেন,
“মিহিক ভালো মেয়ে, লক্ষ্মী মেয়ে! ওকে বিয়ে করে তোমার কোনোদিন দুঃখ করতে হবে না। আমি মা বলছি। আমার কথা মিলিয়ে নিয়ো।”

“সম্ভব নয়। এটা সম্ভব নয় আম্মু। আমি…”

“কাল ওর সাথে দেখা করতে গিয়ে খুব ভদ্রভাবে থাকবে। আমি খুব গর্ব করে বলে এসেছি আমার ছেলে খুব ভালো, ভদ্র। মেয়েটার সামনে আমার মান নষ্ট করো না!”

“আমি কাল ওর সাথে দেখা করতে যাব না আম্মু। জোর করো না আমায়।” মিনতির সুরে বললো শ্রাবণ।

লায়লা ছেলের কাছে এগিয়ে এসে, ছেলের হাত দুটি আলতো করে ধরে বললো,
“এমন করো না বাবা! মাকে অপমানিত করো না। কাল ওর সাথে দেখা করে খুব ভালো আচরণ করবে। ওকে বোঝাতে হবে তুমি আসলেই আমার খুব ভালো ছেলে। দেখা করো কাল ওর সাথে। প্লিজ!”

মায়ের এমন নরম কণ্ঠের আবদার শ্রাবণের হৃদয় ভিজিয়ে দিচ্ছে। মাকে না বলে, মায়ের মনে কষ্ট দিতে তার মন তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

_____________

রাত তখন এগারোটা। আষাঢ়ের পাঁচ গার্লফ্রেন্ড তাকে ফোন দিয়ে আজ প্রায় কান্নাকাটি করেছে। ওকে ছাড়া তারা খুব লনলি ফিল করছে, এমন ধরণের আরও অনেক অনেক কথা বলেছে তারা। আষাঢ়ের মায়া ভরা মন। গার্লফ্রেন্ডদের সাথে যে রুড বিহেভ করতে চাইছিল তা তিন ভাগের এক ভাগও সম্ভব হয়নি তার দ্বারা। সে প্রত্যেক গার্লফ্রেন্ডের সাথে আজ এক এক করে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেছে। শুধু নিজের স্থায়ী গার্লফ্রেন্ডদের সাথে আষাঢ় এত নরম। স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ডদের সাথে পাঁচ মিনিট কথা বলতে গেলেও তার বিরক্তি ধরে যায়। এই পাঁচ জনের ক্ষেত্রে তা হয় না। এটাই বোধহয় পার্থক্য, স্থায়ী এবং স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ডদের মাঝে। পাঁচ গার্লফ্রেন্ডকে ফোনে বোঝাতে বোঝাতে আষাঢ়ের মাথায় পেইন উঠে গেছে। একটু ঘুমানোর চেষ্টা করেও সে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এর কারণ, পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা গানের ক্ষীণ সুর। গানের ক্ষীণ সুর তার মাথার পেইনকে দ্বিগুণ যন্ত্রণায় নিয়ে যাচ্ছে। আষাঢ় ধৈর্য ধরে আর শুয়ে থাকতে পারলো না। শোয়া থেকে উঠে তড়িৎ পায়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। বাড়ির সদস্যরা ইতোমধ্যে ঘুমে কাতর। আষাঢ় ছুটছে নিচ তলায় কারিবের রুমে। দশটার পর এভাবে উচ্চৈঃস্বরে গান বাজাচ্ছে কোন আক্কেলে? কোন আহাম্মক এই কাজ করছে? পাড়া প্রতিবেশীদের ঘুমে ডিস্টার্ব হচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই? কারিবের রুমের দরজা সবসময় আনলক থাকে। আষাঢ় ভেজানো দরজা খুলে রুমে ঢুকে প্রথমে লাইট জ্বালালো। বিছানায় কারিবের দিকে তাকালো। কারিব ঘুমে বিভোর। আষাঢ় কারিবের পিঠে জোরে একটা চাপড় মেরে বললো,
“ওয়েক আপ কারিব।”

আষাঢ়ের সজোরে মারা চাপড়ে কারিবের ঘুম ছুটে পালিয়েছে। সে ধড়ফড় করে উঠে বসে ব্যস্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো,
“কী হয়েছে আষাঢ় ভাই? কী হয়েছে?”

আষাঢ় চোখ মুখ খিঁচে কপাল চেপে ধরে বললো,
“পেইন।”

“পেইন?” অবাক প্রশ্ন করলো কারিব।

আষাঢ় চোখ খুলে বললো,
“হুম পেইন। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ না? পাশের বাড়ির কোন বেয়াদব যেন এই রাত্রি ক্ষণে উচ্চৈঃস্বরে গান বাজাচ্ছে। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ না সেটা?”

কারিব কান পাতলো। হ্যাঁ, পাশের বাড়ি থেকে গানের শব্দ ভেসে আসছে। তবে সেটা খুব ক্ষীণ সুরে। কারিব বললো,
“হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি।”

আষাঢ় তুমুল বিরক্তি কণ্ঠে বললো,
“এমনিতেই গার্লফ্রেন্ডদের বোঝাতে বোঝাতে আমার মাথায় পেইন উঠে গেছে, তার উপর এই গান আমার পেইনকে বিষে পরিণত করছে। দশটার পর এত উচ্চৈঃশব্দে গান বাজাচ্ছে কোন আক্কেলে? কোনো কমনসেন্স নেই? স্টপ দ্য সং কারিব, স্টপ দ্য সং ক্যুইকলি।”

“আমি? আমি কী করে এই গান বন্ধ করবো?”

“আমি কিছু শুনতে চাই না। তুমি ওই বাড়িতে গিয়ে এই গান বন্ধ করার ব্যবস্থা করো।”

কারিব অসহায়ত্ব ভাবে বললো,
“আষাঢ় ভাই, এটা করা কি উচিত হবে? গান তো খুব উচ্চৈঃস্বরে বাজছে না। আর তাছাড়া এখন তো ওনারা আমাদের…”

“কিচ্ছু শুনতে চাই না আমি। তুমি এই গান বন্ধ করবে এটাই শেষ কথা।”

আষাঢ় নিজের ভাইয়ের বিয়ে খেতে এলেও, ভাইয়ের ঠিক কার সাথে বিয়ে, কোথায় মেয়ের বাসা এসব কিছুই জানে না। এসবে তার ইন্টারেস্ট নেই। আর তাছাড়া বাংলাদেশ এসেই তো সে মেয়ে চক্করে ঘুরলো। এসব জানার সময়ও হয়নি তার। তাই পাশের বাসাটা যে তার হবু ভাবিদের এটা তার অজানা।

কারিব অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো আষাঢ়ের দিকে। আষাঢ় তা দেখে বললো,
“কী হলো? তুমি যাচ্ছ না?”

কারিবের আর কিছু করার থাকলো না। আষাঢ় ভাইয়ের কোনো কাজে সে না করতে পারে না। কারিব বেড থেকে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়া দিয়েও, আবার ফিরে এলো। আষাঢ় বললো,
“আবার কী?”

“হাফপ্যান্ট পরে যাব? ভদ্র সমাজ বলে একটা কথা আছে না? একটা ট্রাউজার পরে যাই।”

আষাঢ় বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
“উহ! তুমি পারোও বটে।”

আষাঢ় কারিবকে ট্রাউজার পরার সময় দিলো না। ক্লোজেট থেকে একটা লুঙ্গি বের করে সেটা কারিবের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললো,
“জলদি যাও, জলদি। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। মাথাটা অবশ হয়ে যাচ্ছে।”

কারিব লুঙ্গিটা কোনো রকমে পরে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল। বাড়ি থেকে বের হলেও, পাশের বাড়িতে ঢুকলো না সে। এই রাতে প্রতিবেশীদের বাড়ি ঢুকে ডাকাডাকি করা অভদ্রতা ছাড়া আর কী? হোক তার আষাঢ় ভাই অবুঝ, সে তো আর অবুঝ নয়। তাছাড়া কবির সাহেব এটা জানতে পারলে রাগারাগি করবেন। কারিব কিছু সময় বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে আবার ফেরত এলো। আষাঢ় অস্থির হয়ে বসেছিল কারিবের রুমে। রুমের দরজায় কারিবকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল সে।

“তুমি চলে এসেছো অথচ গান থামেনি কেন এখনও?”

“বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করেছি অনেক। কিন্তু কারো সাড়া পেলাম না।”

“হোয়াট? উচ্চৈঃস্বরে গান বাজিয়ে প্রতিবেশীদের ঘুম হারাম করে এখন আবার দরজা আটকে বসে আছে? চলো। আমি দেখছি ব্যাপারটা। কী করে সাড়া পেতে হয় সেটা আমি খুব ভালো করে জানি। চলো…”

আষাঢ় দরজার দিকে এগোতে লাগলে কারিব হাত টেনে ধরলো।

“শান্ত হন আষাঢ় ভাই। এই রাত-বিরাতে মানুষের বাড়ি গিয়ে ঝামেলা করা ঠিক না। আপনার আব্বু জানতে পারলে রাগ করবে।”

“তাহলে আমাকে কী করতে বলছো? এই গানের শব্দে ঘুমাতে পারছি না আমি। তুমি তো জানো ঘুমে ডিস্টার্ব করা সবচেয়ে বেশি অপছন্দ আমার। এটা মোটেই সহ্য করতে পারি না আমি।”

“জানি আমি। কিন্তু ও বাড়িতে গিয়ে এখন ঝামেলা করা কি উচিত হবে? আপনিই বলুন।”

“হবে না?”

“না। আর গানের সাউন্ড তো খুব বেশি জোরালো না। রুমে গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। আশা করছি ঘুমাতে সক্ষম হবেন। সকাল সকাল উঠে আবার আমাদের সিলেট যেতে হবে, ভুলে গেছেন?”

“ভুলি নি। আষাঢ় কিছুই ভোলে না। পাঁচ বছর আগের অনেক গার্লফ্রেন্ডদের নাম এখনও মনে আছে আমার।”

কারিব স্মিত হেসে বললো,
“আপনি খুব ট্যালেন্টেড আষাঢ় ভাই।”

“ট্যালেন্টেড তো হতেই হবে, প্রেমিক পুরুষ বলে কথা। প্রেমিক পুরুষের কি আর প্রেমিকাদের নাম ভুলে গেলে হবে?”

“উহু, হবে না।”

আষাঢ় ঠোঁটের কোণে মিটি হাসি ফুঁটিয়ে কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।
কারিব বিমোহিত চোখে তাকিয়ে থেকে বললো,
“আসলেই খুব ট্যালেন্টেড!”

_______________

আকাশের অবস্থা খারাপ। বৃষ্টি হতে পারে। ঘন কালো মেঘ জমেছে। শ্রাবণ গাড়ির উইন্ডো দিয়ে আকাশ পানে দৃষ্টি মেলে আছে। এই ঘন কালো মেঘ যেন তার মনের বার্তা বহন করছে। তার মনের অবস্থাও তো এমনই। কালো! শান্তির রোদটা বেশ কয়েক দিন যাবৎ কালো মেঘ গ্রাস করে রেখেছে। সে এখন নিজের গাড়ি নিয়ে মিহিকদের বাড়ির গেটের কাছে অপেক্ষারত। মায়ের কথা মতো আজ সে এবং মিহিক একে অপরের সাথে দেখা করবে, কথা বলবে। এখানে সটান বসে আছে প্রায় দশ মিনিট হলো। মিহিকের কোনো খবর নেই। এই মেয়ের কি সময়ের প্রতি কোনো যত্নশীলতা নেই? একটা লোক তার জন্য দশ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছে, অথচ সে আসছে না।

অবশেষে মিহিককে দেখা গেল। ভায়োলেট রঙের থ্রি পিস পরনে তার। শ্রাবণ একটু নড়েচড়ে বসলো। চোখ সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর মুখ করে রইল।
মিহিক গাড়িতে উঠে বসলো কোনো কথাবার্তা ছাড়া। শ্রাবণের সাথে দেখা করতে আসার কোনো ইচ্ছা তো তার ছিল না। কেবল লায়লা আন্টির কথা রক্ষার্থে এসেছে সে। তাও আসবে না ভাবছিল। কাল রাতে এ নিয়ে চিন্তায় ছিল অনেক। গান শুনে মাথাটা হালকা করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। শ্রাবণের সাথে দেখা করবে, কি করবে না ভেবে উঠতে পারছিল না। শ্রাবণের সাথে দেখা করবে এ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছে সকালে। যখন লায়লা আন্টি ফোন করে জানালেন শ্রাবণ নয় টায় অপেক্ষা করবে রাস্তাতে। তখন মনে হলো মানুষটা যখন এত করে চাইছে তার ছেলের সাথে দেখা করুক, তাহলে একবার দেখা করেই আসুক।

“কোথায় গেলে ভালো হবে বলুন তো? কোনো ক্যাফে…”

“ক্যাফেতেই চলুন।” স্পষ্টভাষী মিহিক থমথমে কণ্ঠের শ্রাবণের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললো।

শ্রাবণ কথা বাড়ালো না। কথা বলার মতো কিছু পাচ্ছে না, কথা বাড়াবে কী? তার অস্বস্তি হচ্ছে। জীবনে খুব কমই এসেছে এমন অস্বস্তিদায়ক মুহূর্ত। গাড়ি স্টার্ট করলো সে। মনে মনে মাকে স্যরি জানাচ্ছে। কারণ, মায়ের কথা রক্ষা করতে পারবে না সে। এ বিয়ে ভাঙতে মিহিকের সাহায্য তার একান্ত প্রয়োজন।
#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ০৬
__________________

আকাশ ছাপিয়ে বৃষ্টি ঝরছে। রিমঝিম একটা শব্দ তুলেছে প্রকৃতি। শ্রাবণ ক্যাফের কাচের জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখছে। কাচের উপর অজস্র পানি কণা ঝাঁপিয়ে পড়ে আবার গড়িয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি তার পছন্দ না। তার নামের সাথেও একটা বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব আছে। শ্রাবণ! মা-বাবা যে কেন ডাক নাম শ্রাবণ রাখলো সে আজও বুঝলো না। বৃষ্টির সময়ে জন্ম নিয়েছিল না কি? সেজন্যই কি নাম শ্রাবণ রাখলো? হতে পারে। বৃষ্টি পছন্দের না হলেও আজকে বৃষ্টি ভালো লাগছে শ্রাবণের। তার মনের অবস্থাও তো এই বৃষ্টির মতো জল থলথলে। খুব কষ্ট তার হৃদয়ে! অথচ এই কষ্ট দেখার মতো কেউ নেই। ক্ষুদ্রশ্বাস ফেললো শ্রাবণ। জানালা থেকে চোখ সরিয়ে এনে সামনে বসে থাকা মিহিকের দিকে তাকালো। তাকিয়েই একটু ঘাবড়ে গেল। মিহিক তার দিকে তাকিয়ে আছে। একদম ঠাঁয় তাকিয়ে আছে। সে তাকানোতেও কোনো ভাবান্তর হলো না মিহিকের। শ্রাবণ একটু নার্ভাস ফিল করলো। এ মেয়েটা এমন কেন? আগে কোনোদিন তো এমন দেখেনি।
মিহিক তাকিয়েই থাকলো। শ্রাবণের কিছু বলতেও অস্বস্তি হচ্ছে। অপরাধ বোধও হচ্ছে। মেয়েটাকে এভাবে বলাটা কি উচিত হবে? বলেই দিক। শ্রাবণ মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে বললো,
“আসলে আমি…আমি আপনাকে ঠিক বিয়ে করতে পারবো না মিহিক।”

মিহিক স্বাভাবিক। এমন কথা শুনে মিহিক স্বাভাবিক থাকবে এমনটা আশা করেনি শ্রাবণ। মিহিক শান্ত-স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কেন বিয়ে করতে পারবেন না?”

মিহিকের প্রশ্নে শ্রাবণ আরও অবাক হলো। মেয়েটা এত শান্তভাবে কী করে এই প্রশ্ন করছে? যাই হোক, সে উত্তর দিলো,
“কারণটা তো আপনি জানেন। আমি…মানে আমি রুম…”

“রুমকিকে ভালোবাসেন এই তো?” শ্রাবণের মুখ থেকে ছোঁ মেরে কথা কেড়ে নিলো মিহিক।

শ্রাবণ থমকে গেল। আজকে মিহিককে দেখে সে শুধু অবাকের উপর অবাক হচ্ছে।

“ঠিক আছে, এই কথাটা আপনার মা-বাবাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলুন। বলুন যে, আমি তোমাদের পছন্দ করা মেয়েকে নয়, আমার পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করবো। বলুন এটা।”

মিহিকের কথায় শ্রাবণ আহত হচ্ছে। মেয়েটার বলার ভঙ্গিমা কেমন শ্লেষপূর্ণ। শ্রাবণ সেসবে পাত্তা না দিয়ে বললো,
“আমি চাইছি এই বিয়েটা ভেঙে দিতে।”

“তাহলে দিন। কে নিষেধ করছে আপনাকে? যে ছেলে অন্যের বিয়েতে ঝামেলা করেছে, অন্য একটা মেয়েকে বিয়ের মজলিসে চিৎকার করে ‘ভালোবাসি’ বলেছে, সেই ছেলেকে আমার পক্ষেও বিয়ে করা সম্ভব নয়। আশা করছি এই বিয়েটা খুব দ্রুত ভাঙবেন আপনি।”
মিহিক উঠে দাঁড়ালো।

“আপনি চলে যাচ্ছেন? কোনো সাহায্য করবেন না এ বিয়ে ভাঙতে?”

মিহিক বিদ্রূপ চোখে তাকালো।
“সাহায্য? বিয়ে ভাঙতে আমার সাহায্য চাইছেন আপনি? কী করে ভাবলেন যে আমি আপনাকে সাহায্য করবো? বিয়ে করতে পারবে না এটা কে বলেছে আগে? আপনি। বিয়েটাও আপনিই ভাঙবেন। একা একা। আমার সাহায্য আশা করলে ভুল করবেন। আসছি।”

মিহিক দাঁড়ায় না আর। পাশের চেয়ার থেকে ব্যাগটা উঠিয়ে সোজা হেঁটে গেল। শ্রাবণ সেদিকে অপলক তাকিয়ে থেকে বললো,
“এই মেয়েটা এমন কেন? মা এই মেয়েকে লক্ষ্মী বলে? এর থেকে তো আমার রুমকি হাজার গুণ ভালো।”

তবে শ্রাবণের চিন্তা হচ্ছে। চাইছিল মিহিককে খুব ভালো করে সব বুঝিয়ে বলবে। কিন্তু বলতে তো পারলো না কিছু। আর মিহিকও দাঁড়ালো না। এখন এই মেয়ে যদি কোনো ঝামেলা করে তাহলে কী হবে?

________________

কবির সাহেবের মাথা প্রচণ্ড গরম। সন্ধ্যার পর ইদ্রিস খান নিজ বাড়িতে হালকা নাস্তা এবং খোশ গল্পের জন্য ডেকেছিল তাকে এবং তার স্ত্রীকে। সেখানে গিয়ে এমন একটা খবর শুনলো যাতে তার মাথা গরম না হয়ে পারলো না। এত বড়ো সাহস শ্রাবণের? মিহিকের সাথে দেখা করতে গিয়ে বিয়ে করবে না বলেছে? কবির সাহেব বাড়ি এসে কোথাও এক দণ্ড না দাঁড়িয়ে সোজা ছেলের রুমে এলেন। এত জোরে দরজাটি খুললেন যে রুমে থাকা শ্রাবণ আঁতকে উঠলো। মা এবং বাবার রাগে তপ্ত মুখ দেখে শ্রাবণের মন বলে উঠলো, লক্ষণ বেশি ভালো নয়!

ভয়ে শ্রাবণ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো,
“কী হয়েছে আব্বু?”

কবির সাহেব একেবারে ছেলের সামনে এসে থেমে প্রচণ্ড রাগের সাথে বললেন,
“এত বড়ো সাহস তোর? মিহিকের সাথে দেখা করতে গিয়ে ওকে বিয়ে করবি না বলেছিস? বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে, এক্ষুণি বেরিয়ে যা। তোর মতো একটা কুলাঙ্গার সন্তান আমার বাড়িতে বেমানান।”

ভয়ে শ্রাবণের বুক কাঁপতে শুরু করেছে। ঘামে সারা শরীর ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা তার বাবাকে জানিয়ে দিয়েছে সব? কেমন মেয়ে হলে এটা তার বাবাকে বলে দিতে পারে?

কবির সাহেবের গলা এত উচ্চ ছিল যে বাড়িতে এই মুহূর্তে উপস্থিত সবাই ছুটে এলো। বাতাসের বেগে শ্রাবণের রুমে এসে প্রবেশ করলো রুপালি এবং জুন। কারিব এবং আষাঢ় বাড়িতে নেই। সিলেট থেকে এখনও ফেরেনি তারা। এগারোটার আগে দেখা যাবে না তাদের।
“বিবেক বুদ্ধি সব হারিয়ে ফেলেছো? ওই রুমকি কি তোমার মগজ ধোলাই করেছে? কী দেখেছো তুমি ওর মাঝে? দিন দিন এত বেয়াদব হয়ে কেন উঠছো? নিজের হবুবউয়ের কাছে গিয়ে বলছো তুমি তাকে বিয়ে করবে না? কারণ, তুমি রুমকিকে ভালোবাসো? এত বেয়াদবি কোত্থেকে শিখেছো? এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তোমাকে?”

শ্রাবণের ভয় করছে। তার বাবা রগচটা মানুষ। কিন্তু ভয় পেয়ে মুখ বুজে থাকলে হবে না। বলতে হবে। অনেক কিছু বলতে হবে তাকে। এটাই বলার মতো একটা সময়। শ্রাবণও জেদি গলায় বলে উঠলো,
“মিহিককে বিয়ে করতে পারবো না আমি। রুমকিকে বিয়ে করবো আমি। আমি রুমকিকে ভালোবাসি। রুমকি আমার সব। আমার স্ত্রী হলে ও-ই হবে।”

“শ্রাবণ…” কবির সাহেব হুংকার দিয়ে উঠলেন।
লায়াল খানম স্বামীর হাত ধরে বললেন,
“শান্ত হন আপনি। শান্ত হন একটু।”

“শান্ত কী করে হবো লায়লা? তোমার ছেলে কেমন বেয়াদবি করছে দেখতে পাচ্ছ না?”
কবির সাহেব ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,
“রুমকিকে বিয়ে করবি, তাই না? কর, এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর। রুমকি জীবনে আমার বাড়ির বউ হয়ে আসবে না।”

“মিহিক আসতে পারলে, ও কেন আসতে পারবে না? কী দোষ ওর মাঝে?”

“চুপ একদম চুপ। আর একবার ওর নাম মুখে আনলে, তোকে সত্যি সত্যি বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো। মিহিকের সাথে আর চার দিন পর তোমার বিয়ে হবে। এটাই শেষ কথা। এর উপর কথা বলার চেষ্টা করলে তেজ্যপুত্র করবো তোমায়। তাহলেই তোমার মাথার গন্ডগোল ভালো হয়ে যাবে।”
কবির সাহেব এতটাই রাগান্বিত যে আর এখানে থাকতে পারলেন না, বেরিয়ে গেলেন।

শ্রাবণ রিক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। অসহায় লাগছে তার। খুব অসহায় লাগছে। মায়ের দিকে তাকিয়ে আকুল কণ্ঠে বললো,
“মিহিককে করবো না আমি বিয়ে, করবো না আম্মু।”

লায়লার কষ্ট লাগছে। ছেলের এমন অবস্থা সহ্য করতে পারছে না সে। কিন্তু তাই বলে তো রুমকির সাথে বিয়ে দেওয়া যায় না শ্রাবণের। শ্রাবণের মাথায় হঠাৎ এত রুমকির ভূত চেপে বসলো কেন? লায়লা খানম অতি নরম কণ্ঠে বললেন,
“এমন করো না বাবা। মিহিককে বিয়ে করো। সুখী হবে তুমি। রুমকি তোমার সাথে মানানসই নয়। রুমকি ভালো নয়। রুমকি ভালো হলে আমরাই রুমকির সাথে তোমার বিয়ে দিতাম, অমত করতাম না। কিন্তু ও তো ভালো নয়, এটা কি তোমাকে বার বার বুঝিয়ে বলতে হবে?”

“রুমকি খারাপ নয়, ও অবশ্যই ভালো। আমি চিনি ওকে। আমি কিছুতেই মিহিককে বিয়ে করতে পারবো না। প্লিজ! আব্বুকে একটু বুঝিয়ে বলো তুমি।”

“তোমার আব্বুকে বোঝানোর সাধ্যি আমার নেই। আর আমার ইচ্ছাও নেই তাকে বোঝানোর। তোমার আব্বুকে তো তুমি চেনো। উনি যা বলেছেন উনি তা অবশ্যই করতে পারেন। মিহিককে বিয়ে না করলে উনি তোমাকে সত্যি সত্যি বাড়ি থেকে বের করে দেবে। এত বছর ধরে তোমাকে আদর যত্ন দিয়ে আগলে রেখেছি আমরা, এখন তোমার যদি মনে হয় আমাদের থেকে রুমকি তোমার বেশি প্রিয়, তাহলে তোমার বাবার কথা মতোই চলে যেতে পারো!”

“আম্মু…” অসহায় কণ্ঠে ডাকলো শ্রাবণ।

লায়লা খানমের চোখে জল চিকচিক। সে বললো,
“আমি এখনও বলছি, মিহিককে বিয়ে করো তুমি। সুখী হবে। রুমকিকে ভুলে যাও। যদি তুমি ভেবে থাকো তুমি আসলেই রুমকিকে বিয়ে করবে, তাহলে আগেই বলে দিই, এটা না তোমার বাবা মানবে, আর না আমি।”

লায়লা খানম আর দাঁড়ালেন না। অশ্রুসিক্ত চোখে বেরিয়ে গেলেন।

শ্রাবণ পড়লো মহা বিপাকে। এ কোন পরিস্থিতিতে এসে পড়লো সে? এ কেমন কঠিন সময়? মাথাটা ব্যথা করছে। পাগল পাগল লাগছে। শ্রাবণ মাথা চেপে দাঁড়িয়ে রইল। রুমকিকে ভুলতে পারবে না সে। আর না তো মা-বাবার মনে আঘাত হানতে পারবে।

জুন ভাইয়ের এমন দুর্বিষহ অবস্থা দেখে বললো,
“মিহিক আপুকেই বিয়ে করে নাও ভাইয়া। তোমাদের দুজনকে খুব ভালো মানাবে। মিহিক আপু খুব ভালো।”

“ভালো না ছাই। কতটা ভালো সেটা তো দেখলামই।” বলে শ্রাবণও বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

দাঁড়িয়ে রইল জুন এবং রুপালি। একে অপরের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হলো তাদের। রুপালি বললো,
“আসলে শ্রাবণের সাথে মিহিকরেও মানাইবো না আর রুমকিরেও মানাইবো না। মিহিক হলো রাগী, জেদি আর রুমকি হলো খারাপ।”

জুন শুকনো মুখে বললো,
“তাহলে কার সাথে ভাইয়াকে মানাবে বলে তোমার মনে হয় রূপ খালা?”

“নোয়ানা! নোয়ানার লগে মাইনাইবো শ্রাবণরে।”

“নোয়ানা আপু? নোয়ানা আপুর সাথে কী করে মানায় আমার ভাইয়াকে? নোয়ানা আপু তো আমার ভাইয়ের মতো এতো সুন্দর না।”

“আরে, আমি কি সুন্দরের কথা কইছি না কি? আমি তো কইছি মনের কথা। নোয়ানার মন খুব ভালো। খুব ভদ্র মেয়ে। ওর সাথেই মানাইতো শ্রাবণরে।”

জুন মানতে পারলো না। সে বললো,
“ভুল বললে রূপ খালা ভুল। ভদ্রতার দিক দিয়েই যদি বিচার করো তাহলে আমার ভাইয়ের সাথে নয়, কারিব ভাইয়ের সাথে মানাবে নোয়ানা আপুকে। কারিব ভাইও তো নোয়ানা আপুর মতো কত ভালো, কত ভদ্র! হ্যাঁ, কারিব ভাইয়ের সাথেই সবচেয়ে ভালো মানাবে নোয়ানা আপুকে। একদম পারফেক্ট ম্যাচ দুজনের।”

জুনের মুখে কারিবের কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো রুপালি,
“কারিবের কথা কও না কি? ও ভালো? ও হইলো একটা মিচকা শয়তান। ওর সাথে যে মেয়ের বিয়ে হবে সে মেয়ের দুঃখের সীমা থাকবে না। ওর সাথে নোয়ানারে মিলিয়ো না। শুধু শুধু মেয়েটার জীবনে দুঃখ নামিয়ে দিয়ো না।”

জুন রুপালির কথা কানে না তুলে বললো,
“কারিব ভাইয়ের সাথে নোয়ানা আপুর বিয়ে হলে দারুণ হতো!”

_______________

শ্রাবণ সোজা ছাদে চলে এসেছে। আবহাওয়ার একটু খারাপ অবস্থা। দমকা হাওয়া বইছে। বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব। শ্রাবণ আষাঢ়ের কাছে ফোন দিলো। এই মুহূর্তে তার আষাঢ়কে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। শ্রাবণের অস্থির ভাব। কয়েকটা রিং হওয়ার পর কল রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে আষাঢ়ের আহ্লাদী কণ্ঠ শোনা যায়,
“হোয়াট’স আপ ব্রো? ছোট ভাইটির এত কম খোঁজ খবর নাও যে এখন? হবু বউ পেয়ে ভাইকে ভুলে গেলে না কি?”
কথাটা বলে ফিচেল হাসে আষাঢ়। শ্রাবণ না দেখেও বুঝতে পারে সেটা। সে কথা না পেঁচিয়ে বললো,
“তোকে আমার খুব দরকার। এক্ষুণি বাসায় চলে আয়, দ্রুত।”

“আই অ্যাম স্যরি ব্রো! আজ রাতে আমরা বাসায় ফিরতে পারবো না। এখানে আমাদের অনেক ইম্পরট্যান্ট কাজ পড়ে আছে। ফেরা সম্ভব নয়। কী কারিব? ফেরা কি সম্ভব?”
আষাঢ় তার পাশে থাকা কারিবকে প্রশ্ন করে।

কারিব বললো,
“সম্ভব নয়।”

শ্রাবণ বললো,
“ঠিক আছে, রাতে ফেরা সম্ভব না হলে ভোরেই চলে আসবি। তোকে আমার খুব দরকার।”

আষাঢ় হেসে বললো,
“এতদিন তো জানতাম আমি শুধু মেয়েদের দরকারি। এখন আবার আমার ভাইয়েরও দরকারি হয়ে উঠলাম? ওয়াও! দারুণ!”

শ্রাবণের কথা বলতে ভালো লাগছে না, সে ‘তাড়াতাড়ি আসিস’ বলে কল কেটে দিলো। ঠিক করেছে বিয়ের এই ঝঞ্ঝাট আষাঢ়ের মাধ্যমেই কাটাবে সে।

(চলবে)
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here