বিবর্ণ জলধর পর্ব -০৭+৮

0
52

#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ০৭
_____________

“আমার হবু ভাবি আমাদের পাশের বাড়িতে থাকে এটা তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?”

“ভেবেছিলাম আপনি জানেন। যেহেতু…”
কারিবের কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলো না আষাঢ়, তার আগে ভাইকে বললো,
“ও কে ব্রো, আমি অবশ্যই হেল্প করবো তোমাকে। যেখানে তুমি বিয়ে করতে চাও না সেখানে আব্বু কেন বিয়ে দেবে তোমার? ডোন্ট ও্যরি, এ বিয়ে ভাঙা আমার কাছে কোনো ব্যাপারই না। আচ্ছা, মেয়ে কি আসলেই খুব সুন্দর?”

শ্রাবণ বললো,
“হ্যাঁ, অনেক সুন্দর।”

আষাঢ় উঠে দাঁড়ালো,
“তাহলে এ বিয়ে ভাঙা তো আমার কাছে আরও সহজ। চিন্তা করো না, তোমার হবু বউকে পটিয়ে ফেলবো আমি। এ কাজে আমি দারুণ পারদর্শী। কারিব লেট’স গো।”

কারিবও উঠে দাঁড়ালো। আষাঢ়কে বোঝানোর চেষ্টায় বললো,
“এটা করা উচিত হবে না আষাঢ় ভাই। আপনার আব্বু জানলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। আপনার ভাইয়ের মাথায় না হয় গন্ডগোল দেখা দিয়েছে, আপনার মাথায়ও কি দিয়েছে?”

“শাট আপ কারিব, কোনো কথা নয়। যেটা বলেছি সেটাই হবে। লেট’স গো।”

আষাঢ় বেরিয়ে গেল শ্রাবণের রুম থেকে। কারিব অসহায়! বাধ্য হয়ে তাকেও যেতে হলো পিছন পিছন।

“আপনি কি জানেন আপনার ভাই এই বিয়ে কেন করতে চাচ্ছে না? আপনার ভাই ওই…”

“আমার ভাই কেন বিয়ে করবে না, কী কারণ, এসব জেনে আমার লাভ নেই। ওটা তার পার্সোনাল বিষয়। আমি শুধু জানি সে এই বিয়েতে রাজি নয়, আমাকে এই বিয়েটা ভাঙতে অফার দিয়েছে। এ বিয়ে আমি ভাঙবোই। আর আমারও তো দেখতে হবে আমার বাড়ির পাশে কোন সুন্দরীর বসবাস!”
কথাটা বলেই আষাঢ় ফিক করে হেসে দিলো। কারিব বেশ বুঝতে পারছে, মিহিকের প্রতি আষাঢ় ভাইয়ের একটা ইন্টারেস্ট কাজ করছে। সে বললো,
“বড্ড ভুল করছেন কিন্তু আপনি। মামা-মামি খুব করে চায় এই বিয়েটা হোক। মামা যদি জানতে পারে আপনি ঝামেলা করেছেন, তাহলে শ্রাবণ ভাইয়ের সাথে সাথে আপনাকেও তেজ্যপুত্র করবে। এখানেই থেমে যান, ভালো হবে।”

“থামবো না। সুন্দরী দেখার তেষ্টা আমার একটু বেশিই। আমার ভাই যাকে না করে দিয়েছে তাকে দেখলে নিশ্চয়ই আমার অন্যায় হবে না?”

“হবে, অনেক অন্যায় হবে।”

“সুন্দরী দেখার অপরাধে যদি আমি অন্যায়ের সাগরে ভেসেও যাই, তাও মানতে রাজি।”

কারিব অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। আষাঢ়কে থামানো গেল না। সে ঠিকই এসে উপস্থিত হলো পাশের বাড়িতে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে দরজায় শব্দ করলো। কারিব দরজা থেকে ওদিকটায় সরে দাঁড়ালো। দরজার সামনে দাঁড়ানোর মুখ তার নেই। আষাঢ় ভাই কী থেকে কী করবে জানে না সে। সে শুধু ফিসফিস করে আষাঢ়কে হুঁশিয়ার বাণী শোনাতে লাগলো,
“আষাঢ় ভাই, এখনও সময় আছে, চলেন ফিরে যাই।”

“চুপ থাকো।” বিরক্তি কণ্ঠ আষাঢ়ের।

“আপনার সাথে সাথে আমারও গর্দান যাবে।”

আষাঢ় গরম চোখে তাকালো,
“চুপ থাকতে বলেছি তোমাকে?”

কারিব চুপ হয়ে গেল। মনে মনে দোয়া-দরূদ পড়তে লাগলো। খারাপ কিছু যেন না হয়!

আরও দুই বার নক করার পর দরজা খুললো। দরজার কপাটটি খুলে যেতেই চোখে ভাসলো হালকা শ্যামবর্ণের এক মেয়ে। মেয়েটির মুখ দেখেই থমকে গেল আষাঢ়। থমকে গেল তার মস্তিষ্ক, সেই সাথে হৃদয়। কেটে গেল তার চঞ্চলতা। এই মুখ…আষাঢ় কীয়ৎক্ষণ তাকিয়ে দেখলো মেয়েটিকে। শান্ত তীক্ষ্ণতা ভর করলো তার চোখে। মেয়েটির চোখ, ঠোঁট, নাক পুরো মুখ মন্ডলে দৃষ্টি বুলালো সে। মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি হলো। চোখে ভেসে উঠলো একটা মেয়ে মুখ আর এক গুচ্ছ টিউলিপ। ভাবনা সব জট পাকিয়ে উঠলো আষাঢ়ের। ভালো করে দেখতে লাগলো। মেয়েটি একটু শুকনো ধরণের। চেহারা গোলগাল। নাকে বসে আছে ক্ষুদ্র একটি নোজপিন। চোখের রং চাপা খয়েরি। আষাঢ়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেয়েটার চেহারা থেকে সরলো না। সে মেয়েটির চেহারাটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। খুব শান্ত ভাবে। বিশেষ করে মেয়েটার চোখ। যেন চোখ দেখেই সবকিছু ধরে ফেলবে।

আষাঢ়কে দেখে অবাক কারিব। হঠাৎ করে কী হলো আষাঢ় ভাইয়ের? যেরকম করে এসেছিল তাতে তো এমন থাকার কথা নয়!

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত মানুষটিকে ভ্রু কুঞ্চিত করে দেখছে নোয়ানা। লোকটা এমন করে দেখছে কেন তাকে? নোয়ানা প্রশ্ন করে উঠলো,
“কে আপনি?”

নোয়ানার প্রশ্নে আষাঢ়ের চোখের তীক্ষ্ণতা কমলো না। চোখ সরলো না নোয়ানার মুখ থেকে। তার চোখ নোয়ানার মুখে নিবিড় দৃষ্টি বুলিয়ে গেল। নোয়ানার চোখ, কথা বলার ধরণ গভীর ভাবে পরখ করতে করতেই জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কি আমার হবুভাবি?”

নোয়ানার কুঁচকানো ভ্রু জোড়া আরও বেশি কুঁচকে গেল।
“কী?”

আষাঢ়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জোড়া এবার স্বাভাবিক হলো। ঝলমল করে উঠলো মুখখানা। অধরে প্রশস্ত হাসি ফুঁটিয়ে বললো,
“আপনি কি আমার হবু ভাবি নন?”

“কে আপনি?”

আষাঢ়ের অধরের হাসি ধীরে ধীরে বিলীন হলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফিরে এলো আবার। নোয়ানার চোখ দুটোতে গভীর দৃষ্টি বুলাতে বুলাতে বললো,
“চিনতে পারছো না আমায়?”

আষাঢ়ের প্রশ্নে থমকে গেল নোয়ানা। থমকে যাওয়া ভাবটা স্পষ্ট ফুঁটে উঠলো তার মুখে। নোয়ানার চোখও তীক্ষ্ণতার আঁচড় কাটলো। চোখের কোটরে সৃষ্টি হলো নিবিড় পর্যবেক্ষণ। নিবিড় চোখ জোড়া প্রথমেই পর্যবেক্ষণ করলো আষাঢ়ের চোখ। নোয়ানাকে নিবিড় চোখ বুলাতে দেখে আষাঢ় হাসলো। নোয়ানার চোখ গেল আষাঢ়ের ঠোঁটে। তীক্ষ্ণ চক্ষুসে দেখলো আষাঢ়ের হাসি। এই হাসি পরিচিত কেন লাগছে? আষাঢ়ের চোখ, হাসির ধরণ সবকিছু গভীর ভাবে খেয়াল করলো। মস্তিষ্ক দ্বিধা জর্জরিত হয়ে পড়লো। এই মুখ চেনা চেনা লাগছে! নোয়ানার মাথায় হঠাৎ যন্ত্রণা শুরু হলো। চোখ বুজলো সে। কোথায় দেখেছে এই মুখ, এই হাসি? মনে করতে পারলো না নোয়ানা। চোখ খুললো সে। নিজের অভিব্যক্তি লুকানোর চেষ্টা করলো। জোর করে চেহারায় স্বাভাবিকতা আনলো। কিন্তু চোখ দুটোতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ স্থায়ী রয়েই গেল।

“আপনি কি ফেমাস কেউ?” প্রশ্নটা করতে করতেও নোয়ানা আষাঢ়ের চোখ দুটোতে নিবিড় দৃষ্টি বুলিয়ে যাচ্ছিল।

আষাঢ় হেসে ফেললো। তীক্ষ্ণ চোখ জোড়াকে স্বাভাবিক করে নিলো সম্পূর্ণ। হাস্য মুখে বললো,
“এক রকমের ফেমাসই বলা চলে। একটা ইংলিশ মুভিতে কাজ করেছি তো, এখন অনেকেই দেখলে বলে, ‘তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি’।”

নোয়ানা খানিক অবাক সুরে বললো,
“মুভিতে কাজ করেছেন? কোন মুভি?”

“সেটা জানা কি খুব জরুরি?”

“না, জরুরি নয়। কিন্তু আপনার পরিচয় কী? আমি আপনার হবু ভাবি কি না এটা কেন জিজ্ঞেস করলেন?”

“পাশের বাড়ি…পাশের বাড়িতে থাকি আমি। আনান ইসলাম ওরফে শ্রাবণ, আমার বড়ো ভাই। আমি হলাম আষাঢ়। এখন আমার যেটা জানা জরুরি সেটা হলো, আমার ভাই কি আপনার হবু বর?”

নোয়ানা ধরতে পারলো ব্যাপারটা। সলজ্জ হাসলো। আষাঢ়ের ভুল ভাঙিয়ে বললো,
“জি না, সে আমার হবু বর নয়। আমি আপনার হবু ভাবি নই। আমি নোয়ানা। আমার বড়ো বোন মিহিকের সাথে আপনার ভাইয়ের বিয়ে হওয়ার কথা।”

“ও আচ্ছা।” নিশ্চিন্ত হলো আষাঢ়। মনে মনে একবার আওড়ালো,
‘নোয়ানা?’

“আসলে আপনাকে কোনোদিন দেখিনি, তাই চিনতে পারিনি। শুনেছিলাম আপনি বিদেশে থাকেন। আপুর সাথে দেখা করতে এসেছেন? আসুন, ভিতরে এসে বসুন।”

আষাঢ় মুচকি হেসে বললো,
“থাক, বসবো না। আমার ভাইয়ের সাথে আপনার বোনের বিয়েটা জোরদার করতে এসেছিলাম। মনে হচ্ছে বিয়েটা হয়েই যাবে। এই বিয়েটা অবশ্যই হতে হবে।”
বলে হাসে আষাঢ়। কারিবের দিকে তাকিয়ে বললো,
“কারিব, চলো। এখানে থেকে চলে যাওয়াই উত্তম।”

নোয়ানা কারিবকে দেখেনি। দরজা থেকে ওদিকে সরে থাকায় দেখতে পায়নি। তাই একটু অবাক হলো। উঁকি দিলো।
নোয়ানা তাকাতে কারিব একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলো।
আষাঢ় স্মিতহাস্য মুখে বললো,
“আশা করছি আপনার সাথে আরও অনেকবার দেখা হবে আমার।”

নোয়ানা তাকালো। নিবিড় দৃষ্টি চলে গেল আষাঢ়ের কালো নেত্রতে। একটু হাসার চেষ্টা করে বললো,
“নিশ্চয়ই।”

আষাঢ় হাসির রেখা দীর্ঘ করলো। নোয়ানার মুখখানি আরও একবার ভালো করে দেখে নিয়ে, কারিবকে নিয়ে চলে গেল।
ওরা চলে যেতেই নোয়ানার চেহারায় জোর করে এনে রাখা স্বাভাবিকতা কেটে গেল। কালো, গম্ভীর, চিন্তিত আভা ফুঁটে উঠলো থমথমে মুখখানিতে। আষাঢ়কে এর আগে কোথায় দেখেছে সে? আষাঢ়ের সাথে এর আগে দেখা হওয়া তো অসম্ভব! তারা এ বাড়িতে ভাড়া থাকছে দু বছর চলছে এখন। এই দুই বছরের ভিতরে আষাঢ় বাংলাদেশ আসেনি। এই প্রথম দেখা আষাঢ়ের সাথে। তাহলে চেনা চেনা লাগছে কেন?

_______________

ব্যাপারটা কী হলো কিছুই ধরতে পারলো না কারিব। আষাঢ়কে কখনও এমন দেখেনি সে। নোয়ানাকে দেখার সাথে সাথেই কেমন যেন পাল্টে গেল আষাঢ়। গিয়েছিল মিহিকের সাথে দেখা করার জন্য, বিয়ে ভাঙার জন্য, মিহিককে পটানোর জন্য। অথচ মিহিকের সাথে দেখা না করেই চলে এলো! কাহিনীটা কী? আবার খুব খুশি খুশিও দেখাচ্ছে তাকে। মুচকি একটা হাসি ফুঁটে আছে তার ওষ্ঠতে। নোয়ানার প্রতি আকর্ষণ বোধ করছে না কি আষাঢ়? না এটা হওয়া সম্ভব নয়। আষাঢ়ের কেবল সুন্দরী মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ। নোয়ানা তেমন একটা সুন্দর নয়। নোয়ানার প্রতি আকর্ষণের সৃষ্টি হতে পারে না আষাঢ়ের মাঝে। তাহলে আসল রহস্য কী?

“আপনার কী হয়েছে আষাঢ় ভাই?” কারিব জানার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারলো না।

আষাঢ় হেসে বললো,
“খুব শীঘ্রই তোমার বিয়ে দেবো কারিব।”

“কী?” কারিব বিস্ময়াবিষ্ট। সে কী জিজ্ঞেস করলো, আর এ কী বললো তার আষাঢ় ভাই?

আষাঢ় মিহিকদের বাড়ি থেকে ফিরে ভাইয়ের রুমে এলো প্রথমে। বাইরে এখন সকালের ঝলমলে রোদ। শ্রাবণ জানালার ধারে টুলে বসে রুমকির সাথে চ্যাটিং করছিল, কারিব আর আষাঢ়কে দেখে এগিয়ে এলো সে। তার মুখটা খুশিতে ঝলমল করছে।

“কাজ হয়ে গেছে?” হাসি মুখে জানতে চাইলো শ্রাবণ। তার মনে চাপা উত্তেজনা।

আষাঢ় তার হাসি মুখকে গুঁড়িয়ে দিয়ে বললো,
“এই বিয়েটা তোমাকে করতে হবে ব্রো।”

“কী?” আননে আঁধার ছেয়ে গেল শ্রাবণের।

“হ্যাঁ, এ বিয়ে ভাঙতে পারবো না আমি। আব্বুর কথার অবাধ্য হওয়া একদম উচিত হবে না। আব্বু তেজ্যপুত্র করবে তোমাকে। সাথে আমাকেও। কারিবেরও গর্দান যাবে। এত লোকের সর্বনাশ কেন করবে তুমি? বিয়েটা করে নাও চুপচাপ। তোমার বউ তো খুব সুন্দর। এত সুন্দর মেয়েকে বউ করতে সমস্যা কী?”

“এসব কী বলছিস? তোকে এত ভরসা করলাম আমি, আর তুই…”

“তোমার হবু বউকে বিয়ে করতে সমস্যা কী তোমার? বিয়ে করবে না কেন? তোমার হবু বউ তো মাশাআল্লাহ খুব লক্ষ্মী, সুন্দর, শিক্ষিত, ভদ্র। এতটা ভদ্র মেয়ে এই প্রথম দেখলাম আমি। আমার সাথে মাথা তুলে পর্যন্ত কথা বলেনি সে। আমার ভাবি হিসেবে সে একদম পারফেক্ট। তোমার সাথে খুব মানাবে তাকে।”

কারিব থ। মাথা ভনভন করছে তার। কথা বলা তো দূরের থাক, যে মেয়েকে এক সেকেন্ডের জন্য একটু চোখের দেখাও দেখলো না, সে মেয়ের সম্পর্কে হঠাৎ এত ভালো ভালো বাণী শোনাচ্ছে! হচ্ছেটা কী ঠিক?

শ্রাবণ বললো,
“তোর হয়েছে কী? যেখানে তাকে তোর নিজের জন্য পছন্দ করার কথা, সেখানে আমার জন্য পছন্দ করে এসেছিস মানে? সে সুন্দরী সেটা তো আমি জানি-ই। সুন্দরী বলেই তো গেলি তাকে নিজের জন্য পটাতে। এখন এসব কী বলছিস?”

“উহ ব্রো, তুমি বুঝতে পারছো না। সবাই এক হয় না। অনেকে আছে যাদের দেখলে ভিতর থেকে সম্মানবোধ আপনা থেকেই জেগে ওঠে। সেও হলো সেই দলেরই একজন। তাকে দেখেই মনে হয়েছে সে আমার বোন।”

কারিবের মাথাটা এখনও ঘুরছে। কীসব হচ্ছে বুঝতে পারছে না সে। শ্রাবণও বুঝতে পারছে না। কথা ছিল এক, হলো এক। সে বললো,
“তাহলে তুই-ও চাইছিস আমি বিয়েটা করি?”

“হ্যাঁ অবশ্যই। যে মেয়ে এত ভালো সে মেয়েকে বিয়ে করতে আপত্তি কোথায়? অন্য কাউকে পছন্দ করো তুমি? যদি করে থাকো তাহলেও লাভ হবে না! আমি তো বলবো, হবু ভাবিকেই বিয়ে করে নাও ভালোয় ভালোয়। এতে তোমারও মঙ্গল, বাকি সবারও মঙ্গল! আচ্ছা, যাকে তুমি পছন্দ করো সে কে? তোমার যদি মনে হয় তোমার বিয়ের পর সে মেয়ে ঝামেলা করবে, তাহলে এটা আমার উপর ছেড়ে দাও। আমি দুদিনে তাকে তোমার দিক থেকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে নিয়ে আসবো। কে সে?”

কারিব ঝটপট উত্তর দিলো,
“রুমকি।”

আষাঢ় চমকে উঠলো,
“রুমকি?”

“হ্যাঁ, আপনার ভাই রুমকির প্রেমেতে ডুবে আছে।”

আষাঢ় অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো ভাইয়ের দিকে।
“এটা কি সত্যি ব্রো? তুমি রুমকির প্রেমে দিওয়ানা?”

শ্রাবণের থেকে কোনো উত্তর এলো না।

আষাঢ় বললো,
“রুমকি একটা ডেঞ্জারাস মেয়ে! ও আমাকে পর্যন্ত পটানোর চেষ্টা করেছিল। ওর হিস্ট্রি জানি বলে ওর দিকে পা বাড়াইনি আমি। অথচ এখন শুনলাম আমার নিজ ভাই ওর প্রেমে দিওয়ানা। ওহ ব্রো, কী হয়েছে তোমার? যেখানে রুমকি আমার টাইপের না, সেখানে ও তোমার টাইপের হয় কী করে? তুমি কি অবুঝ?”

“অবুঝই হয়ে গেছে শ্রাবণ ভাই। ওনাকে বুঝিয়ে লাভ নেই।” কারিব বলে উঠলো।

আষাঢ় কারিবের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ব্রো যদি অবুঝ হয়, তাহলে আমার আব্বু হলো অবুঝদের বোঝানোর ওস্তাদ। ব্রোকে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেবে সে। এ নিয়ে আমার এবং তোমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই। আমরা শুধু বিয়ে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করবো। বিয়েতে এনজয় হবে খুব।”

আষাঢ় ভাইয়ের দিকে তাকালো। ভাইয়ের মুখে অসহায়ত্ব, সাথে রাগও দেখা যাচ্ছে। রুমকিকে নিয়ে এভাবে বলায় রাগ তো হবেই তার। শত হলেও পছন্দের মানুষ!
আষাঢ় সেসব গ্রাহ্য না করে কারিবকে নিয়ে চলে এলো।

_______________

নিশুতি রাত। খোলা জানালা দিয়ে চন্দ্রমা আলো প্রবেশ করেছে রুমে। কারিব ওয়ার্ডোব ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আষাঢ়ের থেকে দূরে। আষাঢ় বেডে বসা। সেই কখন থেকে কারিব দেখছে আষাঢ়কে। আষাঢ় হাসছে। মিটিমিটি হাসছে তখন থেকে। কিছু বলছে না, কোনো দিকে দৃষ্টিপাত করছে না। কারিবের মনে ভয় ভয় হচ্ছে। পাগল হয়ে গেল না কি আষাঢ়? সে কখনও আষাঢ়কে এমন করতে দেখেনি। সে তাকিয়ে থাকলো রুদ্ধ চোখে। আর আষাঢ় হেসে গেল। অনেকক্ষণ পর কথা বললো আষাঢ়। ভাবুক বেশে, অন্যমনা হয়ে বললো,
“টিউলিপ ফুল কি আমায় সত্যিই চিনতে পারছে না? না কি না চেনার ভাণ করছে?”

কারিব শুনলেও কিছু বুঝতে পারলো না। জিজ্ঞেস করলো,
“কী?”

কারিবের কথা আষাঢ়ের কান অবধি এসে পৌঁছলো না। তার ধ্যান এখন শুধু নিজেকে ঘিরে এবং টিউলিপ ফুলকে ঘিরে। অন্যদিকে মনোযোগ ফেললো না সে। আগের মতো আনমনা ভাবে বললো,
“যদি চিনেও না চেনার ভাণ করে তাহলে এটা পছন্দ করি আমি, আর যদি সত্যিই না চিনে থাকে তাহলে আরও বেশি পছন্দ করি।”

কারিব বোকা হয়ে তাকিয়ে থাকলো। আষাঢ় কী বলছে এসব?

“আপনি কী বলছেন, কী করছেন আমি কিছু বুঝতে পারছি না আষাঢ় ভাই!”

আষাঢ় তাকালো কারিবের দিকে। সবদিকে মনোযোগ ফিরে এসেছে তার। বেড থেকে নেমে কারিবের কাছে এসে বললো,
“ইউ নো কারিব? আমেরিকায় আমি একটা পাখি পুষতাম। কিন্তু দুঃখের কথা হলো পাখিটা কয়েক মাস পরই আমার কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। উড়ে চলে গিয়েছিল আমার থেকে! পাখিটাকে আমি খুঁজিনি কখনও, পাখিটাও নিজ থেকে আর ধরা দেয়নি। কিন্তু অনেক বছর পর আমি আবার সেই পাখির সন্ধান পেয়েছি। তোমার কী মনে হয়? কী করা উচিত আমার? পাখিটাকে খাঁচায় বন্দি রাখা উচিত? না কি আগের মতোই মুক্ত? যাতে সে আবারও হারিয়ে যেতে পারে আমার থেকে?”

বেশ ভাবনার কথা! ভাবনায় পড়লো কারিব। একটু ভেবে বললো,
“পাখি খাঁচায় আটকে রাখা তো বেআইনি। আপনার মুক্ত রাখা উচিত। পাখি উড়ে গেলে কী আর করতে পারবেন? পাখি উড়বে সেটাই তো স্বাভাবিক। ওড়াই তো পাখির ধর্ম।”

আষাঢ় ঘুরে দাঁড়ালো। জানালার দিকে যেতে যেতে বললো,
“নো কারিব, এটা পারবো না আমি। এবার আর পাখিকে মুক্ত রাখবো না কিছুতেই। হোক বেআইনি, পাখিকে আমি খাঁচাতেই বন্দি রাখবো। উড়াল দেওয়ার সুযোগ দেবো না।”

আষাঢ় জানালার কাছে এসে থামলো। তার রুম থেকে ইদ্রিস খানের বাড়িটা দেখা যায় না ভালো করে। বিশেষ করে মিহিকদের রুমের সাথের ব্যালকনিটা দেখা যায় না। একপাশ দেখা যায় শুধু, না দেখার মতো। আষাঢ় সেদিকটায় তাকিয়ে থেকে অস্ফুট স্বরে বললো,
“চাঁদ আমার বাড়ির ঠিক পাশটাতে অবস্থান করছে, অথচ সেই চাঁদের আলো আমার কাছে এসে পৌঁছচ্ছে না? এ তো চলবে না। ওই চাঁদের আলোতে শুধু আমিই শোভা পাবো। চাঁদটা একান্ত আমার! বহু বছর পর চাঁদটার সাথে দেখা, জোৎস্না না মেখে তো থাকবো না আমি।”

আষাঢ়ের কথা ঠিকভাবে শুনতে পেল না কারিব। কী বললো আষাঢ় বিড়বিড় করে?
#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ০৮
_____________

তিনদিন পর শ্রাবণের সাথে বিয়ে, কথাটা শুনে মিহিক প্রচণ্ড রকমের ক্ষুব্ধ। তার অনুমতি ব্যতীত মা-বাবা বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে ফেললো? আরও একদফা কথা কাটাকাটি হলো মা-বাবার সাথে মিহিকের। মা-বাবা খুব সুন্দর করে বুঝ দিয়েছে তাকে। এ বিয়ে হওয়া জরুরি, এ বিয়ে না হলে দুই পরিবারের সম্পর্ক বিনষ্ট হবে, পরিবারের খারাপ হবে ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু বুঝিয়েছে। মিহিক তাও মানতে নারাজ। মা-বাবার সাথে তর্কের পালা শেষ হলে রুমে এলো সে। দিশেহারা অবস্থা তার। মাথা তালগোল। সেন্টার টেবিলের পাশের আর্মচেয়ারে মাথা নুইয়ে বসে রইল সে।

সকাল এখন সাতটা বিশ। রোদের আলো উত্তাপহীন। ব্যালকনিতে উত্তাপহীন রোদ মেখে দাঁড়িয়ে আছে নোয়ানা। অন্যমনস্ক সে। মাথায় ঘুরছে আষাঢ়ের চিন্তা। চিন্তাতে ব্যাঘাত ঘটলো মিহিকের ডাকে,
“নোয়ানা!”

“জি আপু।” ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সাড়া দিলো নোয়ানা।

“এদিকে আয়।”

নোয়ানা রুমে এলো। নোয়ানাকে দেখেই মিহিক শক্ত মুখে বললো,
“ভাবছি বিয়েটা করে ফেলবো আমি।”

নোয়ানার মুখে অবাক স্ফূর্ত ভাব খেললো। তিন্নি পড়ার টেবিলে পড়ায় মনোযোগী ছিল, মিহিকের কথা মন আকর্ষণ করলো তার। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে বোনের দিকে তাকালো সে।
দু বোনের অভিব্যক্তি দেখে মিহিক বললো,
“ইয়েস, আমি বিয়ে করবো শ্রাবণকে। মা-বাবা যে কতটা ভুল করছে বোঝাতে হবে না আমাকে? বিয়ের পর যখন দেখবে মেয়ে শান্তিতে নেই, তখন আফসোসে আফসোসে শেষ হবে। মনে মনে ভাববে, মেয়ের কথাই শোনা উচিত ছিল। আমি এই ভাবনাটা উদয় করতে চাই তাদের মাঝে। বিয়ের পর শ্রাবণের সাথে ডিভোর্স হয়ে গেলে কোনো অসুবিধা নেই আমার। কোনো মাথা ব্যথা নেই এ নিয়ে। পিনিকটা মা-বাবার মাথায় উঠুক সেটা চাই আমি।”

তিন্নি জানে তার বোন বড্ড জেদি। বললো,
“তুমি কি প্রতিশোধ নিচ্ছ না কি?”

“এটাকে প্রতিশোধ না, এটাকে শিক্ষা বলে। দুই পরিবারকেই শিক্ষা দেবো আমি। তারা বুঝতে পারবে তারা কত বড়ো ভুল করছে।”

মিহিকের কথা উন্মাদের মতো ঠেকলো নোয়ানার কাছে। সে বললো,
“শিক্ষা দেওয়ার জন্য তুমি বিয়েটা করো না আপু। যদি করো মন থেকে করো।”

“ওই শ্রাবণকে বিয়ে করবো সেটাই বেশি, আবার মন? হুহ্! ওসব পারলে তুই পারিস। তুই মন উজাড় করে ভালোবাসিস তাকে।”

নোয়ানা আর কোনো কথা বললো না, চুপ হয়ে গেল। ধীর পা ফেলে আবারও চলে এলো ব্যালকনিতে। কে কী করছে, কী করবে, না করবে এসবে কথা বলার তার কোনো অধিকার নেই। এমনকি নিজের ব্যাপারেও সে স্বাধীনতাহীন। তার জীবন বাকি সবার মতো নয়। তার জীবন ঠুনকো। খুব একটা শক্তপোক্ত নয়। হয়তো ঠুনকো জীবনটা আগের থেকে কিছুটা শক্ত হয়েছে। তবে পুরোটা নয়। আর হবেও না কোনোদিন। আল্লাহ তার জীবনকে এমনই রেখেছে! বাস্তবতা মেনে নিতে হবে তার।

________________

দুটো কক্ষকে ওলট-পালট করে ফেলছে আষাঢ়। মানে তার বেড রুমের যাবতীয় সব কিছু সে লাইব্রেরি রুমে স্থানান্তর করছে। আর লাইব্রেরি রুমের যাবতীয় সবকিছু নিজের রুমে। সকাল থেকে এ কাজ করছে সে। কারিব এবং বাইরে থেকে দুজন সাহায্যকারী নিয়ে এ কাজ করছে। এটা কোনো সহজ কাজ নয়। লাইব্রেরি রুমটাকে নিজের রুম, আর নিজের রুমটাকে লাইব্রেরি রুম তৈরি করা বেশ কষ্ট সাাধ্য। অনেক পরিশ্রম করতে হচ্ছে আষাঢ়কে। ক্লান্তি লাগছে তার, শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। তবুও ক্ষান্ত নয় সে। কবির সাহেব ছেলের এ কাজ প্রত্যক্ষ করলেও কিছু বললেন না। যা করছে করুক। ছেলে তার কতদিনই বা বাড়িতে থাকে! ইচ্ছা খুশি মতো চলুক না।
আষাঢ় যেন একটু বেশিই প্রিয় কবির সাহেবের। আষাঢ়কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন তিনি। ছেলে দূরে চলে যাওয়ার পর ভালোবাসা যেন আরও বেশি করে অনুভব করছেন। লায়লা খানমও তাই! আষাঢ়ের প্রতি সে খুব আবেগ প্রবণ। এইতো তার ছেলে সেই থেকে কাজ করে যাচ্ছে, সে একটু বিশ্রাম নিতে বলছে, অথচ আষাঢ় কোনো বিরতি নিচ্ছে না। তার পুরো কাজ শেষ না করে সে থামবে না। লায়লা খানম লেবুর শরবত বানিয়ে নিয়ে এসেছে ছেলে, কারিব এবং সহকারী দুই ব্যক্তির জন্য। কিন্তু শরবত পান করার তাগিদ কারো মাঝে লক্ষ্যণীয় নয়। আষাঢ় কাজ করে যাচ্ছে, তাদের কি আর শরবত পান করা চলে?

“এত কাজ করো না আব্বাজান, দেখো তো কেমন ঘেমে যাচ্ছ! একটু বিরতি নাও।”

আষাঢ় নিজের রুম থেকে একটা আর্মচেয়ার বয়ে এনে লাইব্রেরি রুমে ঢুকতেই কথাটা বললেন লায়লা খানম।

আষাঢ় ঘেমে একাকার। আজকে গরমও পড়েছে খুব। গায়ের স্যান্ডো গেঞ্জি ঘামে চুপচুপ তার। সে আর্ম চেয়ারটা যথা স্থানে রাখতে রাখতে বললো,
“আমি কাজের মানুষ আম্মু, কাজ ছাড়া এক সেকেন্ডও থাকতে পারি না। কাজ না করতে পারলে মনে হয়, ‘শেষ হয়ে যাব’।”
কথাটা বলার সময় ঘন শ্বাস পড়ছিল আষাঢ়ের।

বেডরুম থেকে আরও কিছু নিয়ে আসার জন্য যাওয়া দিলে লায়লা খানম ছেলের হাত টেনে ধরলেন। জোর করে ছেলেকে চেয়ারে বসিয়ে আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে দিতে লাগলেন।
কারিব এ সময় একটা টি টেবিল নিয়ে প্রবেশ করলো। তার অবস্থাও করুণ! টি শার্ট ঘামে ভেজা। জানে না আষাঢ় কেন নিজের বেডরুম এখানে ট্রান্সফার করছে। জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলেনি আষাঢ়। সে এ বিষয়ে অজ্ঞ থেকেই তার দায়িত্ব পালন করছে। আষাঢ় ভাইয়ের সব কিছু দেখা শোনার দায়িত্ব তো তার। আষাঢ়ের প্রতি লায়লা খানমের দরদ প্রত্যক্ষ করে সে বললো,
“আষাঢ় ভাইয়ের ঘাম তো মুছে দিচ্ছেন মামি, আমার কী হবে? আমার যত্ন কে নেবে?”

লায়লা খানম কিছু উত্তর দেওয়ার আগে আষাঢ় বললো,
“একটা বিয়ে করে নাও কারিব। যখন কাজ করে ঘেমে যাবে, বউ আদর করে ঘাম মুছে দেবে তোমার।”

আষাঢ়ের কথা শুনে বেশ লজ্জায় পড়লো কারিব। তার মনে পড়লো গতকালও আষাঢ় তার বিয়ের কথা বলেছিল। লজ্জাটা তাড়াতাড়ি কাটিয়ে নিয়ে বললো,
“আমি বিয়ে করলে আপনার পর করবো আষাঢ় ভাই। আগে আপনার বিয়েটা খাই, তারপর নিজের বিয়ে।”

“তাহলে তোমার চিরকুমার থাকতে হবে কারিব। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিয়ে করবো না। বুঝে শুনে ডিসিশন নিয়ো, আমার পথে হাঁটবে? কি হাঁটবে না?”

লায়লা খানম গম্ভীর স্বরে বললেন,
“বিয়ে করবে না মানে? আমার কত শখ আহ্লাদ তোমার জন্য আমি পুতুলের মতো একটা বউ আনবো! তুমি…”

“ওটা তো মজা করে বলেছি আম্মু। বিয়ে তো অবশ্যই করবো। তবে তোমার শখ আহ্লাদে একটু পরিবর্তন আনতে হবে। আমি পুতুলের মতো না, ফুল-চাঁদ সংমিশ্রিত বউমা আনবো তোমার জন্য। পুতুলের মতো বউ কারিবের জন্য এনে শখ পূরণ করো। কী কারিব, পুতুলের মতো বউ চাই তোমার?”

ছেলেটা কী সহজ ভাবে মায়ের সামনে বিয়ে নিয়ে কত কথা বলে ফেললো, একটু লজ্জার ছিঁটে ফোঁটা দেখা গেল না। লাজ লজ্জা যা ছিল তা সব দেখা গেল কারিবের মাঝে। সে কিছু না বলে লজ্জা মুখ নিয়ে বেরিয়ে গেল। আষাঢ়ও মায়ের সান্নিধ্য হতে কাজে ছুটলো আবার। লায়লা খানম পড়লেন শঙ্কায়, ফুল-চাঁদ মিশ্রিত বউ আবার কী জিনিস?

__________________

বিকেলের আলো পড়ে গেলে বাড়ি ফিরলো শ্রাবণ। হাতে তার একটি গোলাপ। এটা রুমকি দিয়েছে। রুমকির সাথে দেখা করেছে আজকে। খুব শীঘ্র বোধহয় আর দেখা হবে না তাদের মাঝে। এই বিয়ের চক্করে তার জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে করা ছাড়া কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছে না সে। বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিলে, তেজ্যপুত্র করলে কোথায় যাবে সে? যাওয়ার তো কোনো জায়গা নেই। তাছাড়া মা, বাবা, বোনকে ছেড়ে থাকাও সম্ভব নয়। বিয়েটা করাও তার পক্ষে এক প্রকার অসম্ভব। আজ রাতে মা-বাবার সাথে শেষবার কথা বলবে সে। যদি কোনো কাজ হয়! রুমকির সাথেও মন খুলে কথা বলতে পারে না। রুমকির কাছে প্রাণ খুলে যে বলবে তার জীবন দুর্বিষহের কথা, তাও পারছে না। কদিনই বা লুকিয়ে রাখতে পারবে এই বিয়ের কথা রুমকির কাছ থেকে? রুমকি জানলে যে কী করবে কে জানে! ভাগ্য ভালো যে এই বিয়ে বিয়ে ব্যাপারটা শুধু দুই ফ্যামিলির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। আশেপাশের মানুষদের যদি জানিয়ে দেওয়া হতো তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যেত! রুমকি জানলে নিশ্চয়ই হটিস্টিক দিয়ে মারধর করবে। না জানানো যাবে না রুমকিকে। রুমকি জানার আগে বিয়েটা ভাঙতে হবে। শেষ চেষ্টা করতেই হবে একবার। ঘরে ঢুকে লিভিং রুমে সোফায় জুনের সাথে আষাঢ় আর কারিবকে বসা দেখে বেজায় রাগ হলো শ্রাবণের। কত ভরসা করেছিল সে আষাঢ়কে, অথচ আষাঢ় তাকে এভাবে ধোঁকা দিলো!

ভাইয়ের হাতে ফুল লক্ষ্য করে আষাঢ় বললো,
“ওয়াও ব্রো! তুমি তো দেখছি বেশ রোমান্টিক মুডে আছো। বিয়ের রং লেগেছে না কি মনে?”

আষাঢ়ের সাথে কারিব ও জুনও একসঙ্গে হেসে উঠলো। রাগান্বিত শ্রাবণ আরও রেগে গেলে। কটমট করে বললো,
“এই ফুল পিষে শরবত বানিয়ে খাওয়াবো তোকে!”

বলে সিঁড়ির দিকে দ্রুতগামী পা বাড়ালো।

_______________

তমসা ঘেরা শহরের বুকে চন্দ্র তার রোশনাই বিছিয়ে দিয়েছে। খোলা জানালা দিয়ে অনেকখানি চন্দ্র রোশনাই প্রবেশ করে রুম দখল করেছে আষাঢ়ের। লাইব্রেরি রুমকে পুরো দমে নিজ বেডরুম বানিয়ে ফেলেছে আষাঢ়। তার রুমে যা ছিল সব এনে পরিপূর্ণ করেছে এই রুম। কারিব এখনও অবধি জানতে পারেনি আষাঢ়ের নিজ রুম ছেড়ে এ রুমে স্থানান্তর হওয়ার কারণ। প্রশ্ন করেও উত্তর মেলেনি আষাঢ়ের কাছ থেকে। সে শেষ বারের মতো জিজ্ঞেস করবে ঠিক করলো। আষাঢ় এই মুহূর্তে আয়নার সামনে অবস্থান রত। কারিব চেয়ারে বসা। সে শেষ বার প্রশ্ন করে ফেললো,
“আপনার এখানে শিফট করার কারণ কী আষাঢ় ভাই? আমাকে কি বলবেন না কারণটা?”

আষাঢ়ের চুলে চালিত হাতটা থেমে গেল। পিছন ফিরে কারিবের দিকে চাইলো একবার। মুহূর্তে কেমন অন্যরকম হয়ে গেল সে। অন্যমনা, কেমন একটু খুশি খুশি। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো বিশালাকার খোলা জানলার দিকে। জানালার কাছে এসে থামলো। জোৎস্না স্নান করিয়ে দিচ্ছে আষাঢ়কে। তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো পাশের বাড়ির ব্যালকনিতে। ব্যালকনিটা এখান থেকে খুব ভালো করে দেখা যায় দিনের বেলা। রাত থাকায় অবশ্য ব্যালকনিতে যে একজন মেয়ে মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে সেটা বুঝতে খুব একটা সমস্যা হলো না আষাঢ়ের। চাঁদের আলো পড়ায় ওখানে যে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা পরিলক্ষিত। মেয়েটা কে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। হতে পারে ওটা মিহিক, আবার হতে পারে নোয়ানা, আবার ওটা তিন্নিও হতে পারে। আষাঢ়ের মনে হলো ওখানে তার প্রিয়তমাই দাঁড়িয়ে আছে। সে চন্দ্র জ্যোতিতে তার প্রিয়তমার অবয়বের দিকে তাকিয়ে অবশেষে কারিবের প্রশ্নের উত্তর দিলো,
“আমার রুম থেকে আকাশের চাঁদটা ভালো করে দেখা যায় না কারিব। সেজন্য এখানে শিফট হয়েছি।”

কারিব মনে করার চেষ্টা করলো। বললো,
“কিন্তু কাল যখন আমি আপনার রুমে ছিলাম তখন তো বেশ ভালোই চাঁদের আলো ছিল আপনার রুমে। চাঁদটাকে তো দেখা যায় আপনার রুম থেকে। আমি তো দেখলাম কালকে।”

আষাঢ় প্রিয়তমার উপর দৃষ্টি স্থির রেখে জবাব দিলো,
“না কারিব, দেখা যেত না ভালো করে। চাঁদের আলো আমার কক্ষে এসে পৌঁছতো না ঠিকঠাক ভাবে। এখন দেখতে পাচ্ছি আমি। ভালো করেই চাঁদটাকে দেখা যাচ্ছে এখন। কিন্তু এই দেখায় যে আমার মন ভরবে না। এতদূর থেকে দেখে শান্তি পাচ্ছি না। কাল একটা বাইনোকুলার কিনে আনবে আমার জন্য। ওটা খুব প্রয়োজন আমার।”

কারিব কিঞ্চিৎ বিরক্ত বোধ করলো। যদিও তা প্রকাশ করলো না বাইরে। নরম কণ্ঠে বললো,
“আষাঢ় ভাই চাঁদ দেখা কি এতটাই জরুরি?”

“যে একবার চাঁদে’তে মজে সেই বোঝে, চাঁদ দেখা কতটা জরুরি তার। বাইনোকুলার দরকার আমার। কালকে সকাল সাতটার ভিতরই বাইনোকুলারের ব্যবস্থা করবে।”

“এত সকালে বাইনোকুলার পাবো কোথায় আমি?”

“দরকার হলে এখন গিয়ে কিনে আনো।”

“এখন?”

“হুহ, যাও। বিরক্ত করো না আর। আমার গার্লফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলবো আমি।”

“কোন গার্লফ্রেন্ড? সিলেটের?”

আষাঢ় বিরক্ত বোধ করে। সাধারণত সে তার পাঁচ স্থায়ী গার্লফ্রেন্ডদের সাথে নিজ থেকে কথা বলে। এটা কারিব জানে, তারপরও অহেতুক প্রশ্ন করছে। সে উত্তর দিলো,
“নো কারিব বেবি! আমি ক্যারি, ভেরোনিকা, সুরাইয়া, লিন্ডা এবং জেনির কথা বলছি। সিলেটিকে তো কালকেই ভ্যানিশ করেছি লিস্ট থেকে। তাকে আর লিস্টে রাখার প্রয়োজন মনে হয়নি।”

কারিব কথা বাড়ালো না, মৌনতা বিরাজ করলো তার মাঝে। নীরব রুমে হঠাৎ নিচ থেকে কবির সাহেবের উচ্চ কণ্ঠ ভেসে এলো। আষাঢ় চকিতে পিছন ঘুরে বললো,
“আব্বুর কী হলো?”

“আপনার ভাই বোধহয় আবার শুরু করছে।”
কথাটা বলে ব্যস্ত পা ফেললো কারিব। কারিবের পিছন পিছন আষাঢ়ও ছুটে এলো নিচে।
যা ভেবেছিল তাই। শ্রাবণ বিয়ে করবে না বলে আবার জেদ ধরেছে। আষাঢ়ের এসবে আগ্রহ বাড়লো না। সে নিস্তেজ। কারিবের অবশ্য উৎকণ্ঠা ছিল। কিন্তু সে থাকতে পারলো না। আষাঢ় তাকে বাইনোকুলারের ব্যবস্থা করতে পাঠিয়ে দিলো বাইরে।

(চলবে)
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here