বিবর্ণ জলধর পর্ব -০৯+১০

0
47

#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ০৯
_____________

আষাঢ়ের হাতে বাইনোকুলার। জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির ব্যালকনির উপর তার অবলোকন দৃষ্টি। বারান্দাতে এই মুহূর্তে নোয়ানা অবস্থানরত। তিন্নি ছিল সাথে, এই মাত্র ভিতরে ঢুকে গেল সে। আষাঢ়ের অধরে মুচকি হাসির রেখাঙ্কন। নোয়ানার মুখে ব্যালকনির গ্রিল ভেদ করে সোনালি প্রভাতকিরণের পরশ বিদ্যমান। নোয়ানা এখন দূরে, অথচ আষাঢ়ের মনে হচ্ছে নোয়ানা তার খুব কাছে। মুখটা কত কাছ থেকে দেখছে সে। ভাগ্যিস কারিব রাতের ভিতরে একটা বাইনোকুলারের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে। নয়তো সকাল রোদ্দুরের পরশ আঁকা নোয়ানার মায়াবী মুখটা এত ভালো করে দেখা হতো না তার। নোয়ানার নাকের নোজপিনটা চিকচিক করছে। তার হাতে একটা বই। বইয়ে দৃষ্টি রেখেই চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। মেয়েটা রোজ এই সময় এখানে বই নিয়ে বসবে। এটা তার অভ্যাস। আষাঢ় নোয়ানার এই অভ্যাসের সাথে পরিচিত হয়েছে গত কালকে। কালকেও নোয়ানাকে এই সময় বই নিয়ে বসে থাকতে দেখেছিল। ধারণা করেছিল আজকেও থাকবে। ঠিক তাই।

কারিব রুমে প্রবেশ করে আষাঢ়কে এখনও জানালার কাছে বাইনোকুলার নিয়ে দাঁড়ানো দেখলো। অজান্তেই ক্ষুদ্রশ্বাস ফেললো সে। নোয়ানার জন্য দুঃখ হচ্ছে তার। শেষ পর্যন্ত এ মেয়েটারও কপাল পুড়লো! মনে শঙ্কা হয়েছিল আষাঢ় কোনোরকম ভাবে নোয়ানার প্রতি আকর্ষিত হয়েছে। ঠিক তাই হলো। নোয়ানা সত্যি সত্যি আষাঢ়ের স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ড লিস্টে চলে এসেছে। একবার সে আষাঢ়ের প্রেমে ডুবলেই হয়েছে! পরে মেয়েটার দুঃখ করতে হবে এ নিয়ে। তবে কারিব আষাঢ়ের ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না। আষাঢ় নোয়ানার প্রতি ইন্টারেস্ট ফিল করতে পারে এর সম্ভাবনা খুব কম ছিল। তবুও সেই আষাঢ় নোয়ানার প্রতি ইন্টারেস্ট। যেন তা আবার একটু বেশিই। আষাঢ় যে কেন নোয়ানাকে নিজের স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ড বানাতে টার্গেট করলো সেটা কারিব ভেবে পাচ্ছে না। নোয়ানা পাশের বাড়ির মেয়ে, এরপর আবার আত্মীয় হতে চলেছে। ক’দিন পর কী করে ফাঁকি দেবে নোয়ানাকে? আর এ ব্যাপারে কবির সাহেবের কানে কিছু গেলে এর পরিণাম হবে অতি ভয়াবহ! আষাঢ় সব জেনে-শুনে কেন এই খেলায় নামলো? আষাঢ়কে কিছুটা সাবধান বাণী শুনিয়েছিল সে, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। আষাঢ় নিজ অবস্থানে অটুট রইল। সেও নিরুপায় আষাঢ়ের সব কথা শুনলো।

“ফোন নাম্বার এনেছো কারিব?”

আষাঢ়ের প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরলো কারিবের। আষাঢ়ের দিকে মনোযোগ দিলো সে। আষাঢ় প্রশ্নটা তার দিকে না ফিরেই করেছে। কারিব উত্তর দিলো,
“জি, এনেছি।”

“তাহলে দ্রুত দাও।”

কারিব আষাঢ়ের দিকে এগিয়ে এলো। আষাঢ় ঘুম থেকে উঠেই তাকে নোয়ানার ফোন নম্বর জোগাড়ের দায়িত্ব দিয়েছিল। কোত্থেকে নোয়ানার ফোন নাম্বার জোগাড় করবে বুঝতে পারছিল না। আষাঢ়ই তাকে উপায় বলেছিল। লায়লা খানমের ফোনে নিশ্চয়ই নোয়ানার ফোন নাম্বার থাকবে, সেখান থেকে কালেক্ট করতে বলেছে। কারিব টেকনিক খাটিয়ে লায়লা খানমের মোবাইল থেকে নোয়ানার ফোন নাম্বার কালেক্ট করেছে।

কারিবের কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে নিজের মোবাইলে সেভ করলো আষাঢ়। নতুন কোনো সিম কার্ড না ঢুকিয়ে নোয়ানার নাম্বার ওঠাতে দেখে অবাক হলো কারিব। নিজের স্থায়ী গার্লফ্রেন্ড ছাড়া সব স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ডদের সাথেই আষাঢ় নতুন সিমকার্ড ঢুকিয়ে কথা বলে। নোয়ানাকে নিজের স্থায়ী গার্লফ্রেন্ড বানাতে চাইছে না কি আষাঢ়? কারিব নিজেই নিজেকে মনে মনে শুধালো, এ্যাহ, এটা হতেই পারে না। সে তো আষাঢ়ের স্থায়ী গার্লফ্রেন্ডদের দেখেছে, কত সুন্দরী তারা! নোয়ানা তো তাদের মতো সুন্দর নয়। হয়তো আত্মীয় হতে যাচ্ছে বলে একটু সম্মান দেখিয়ে নিজের স্থায়ী যোগাযোগ মাধ্যমে স্থান দিয়েছে। হ্যাঁ, এটাই হবে। কারিব আরও অবাক হলো যখন দেখলো আষাঢ় নোয়ানার ফোন নাম্বার ‘Tulip’ লিখে সেভ করেছে। কারিবের সেদিনের কথা স্মরণ হলো। সেদিনও আষাঢ় টিউলিপ নিয়ে কথা বলেছিল।

“নাও।” কারিবের দিকে কারিবের ফোন এগিয়ে দিলো আষাঢ়।

কারিব কিছু না বলে ফোনটা নিলো।
আষাঢ় কল দিলো নোয়ানার নাম্বারে।
এখানে থাকা উচিত হবে কি না ভাবলো কারিব। যদিও গার্লফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলার সময় সে থাকলে তাতে কিছু যায় আসে না আষাঢ়ের। আষাঢ়ের কথা বলতে তাতে মোটেই অসুবিধা হয় না। তবুও কারিবের মনে হলো তার চলে যাওয়া উচিত। যদিও তার চলে যাওয়ার থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আষাঢ়ের কথাবার্তা শোনাটাই উচিত হবে, তাও সে কী কারণে যেন থাকতে পারলো না। আষাঢ় যখন নিজের স্থায়ী গার্লফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলে, তখনও সে অনেক থেকেছে আষাঢ়ের সাথে। কিন্তু আজকে তার কী হলো কে জানে। সে আষাঢ়কে বিরক্ত না করে চুপচাপ পিছন থেকে চলে এলো।

আষাঢ় এক হাত দিয়ে ফোন আর একহাত দিয়ে বাইনোকুলার ধরে রাখলো। রিং হচ্ছে।
নোয়ানা চেয়ার ছেড়ে ভিতরে চলে গেল। হয়তো আগমনী কলটা রিসিভ করতেই গিয়েছে সে। আষাঢ় হাসলো।

অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এসেছে। নোয়ানা একটু সময় নিয়েই রিসিভ করলো। ফোনটা নিয়ে আবার ব্যালকনিতে ব্যাক করলো সে। চেয়ারে বসলো। ফোনের ওপাশটা নীরব দেখে সে নিজেই জিজ্ঞেস করলো,
“হ্যালো! কে বলছেন?”

“আমি কে সেটা জানা কি খুব জরুরি?”
আষাঢ়ের কথা শুনে চমকে উঠলো নোয়ানা।

আষাঢ় বাইনোকুলার দিয়ে প্রত্যক্ষ করলো নোয়ানার সেই চমকে যাওয়া ভাব।
নোয়ানা নীরব হয়ে গেল। মনে মনে যেন উত্তর হাতড়ে বেড়ালো, কে লোকটা? উত্তর পেল কি না ঠিক বোঝা গেল না। আবার জিজ্ঞেস করলো,
“কে আপনি?”

আষাঢ় একটু হেসে বললো,
“আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখো, থাকতেও পারি তোমার খুব কাছাকাছি।”

আষাঢ়ের কথায় সচকিত হয়ে উঠলো নোয়ানা। ব্যস্ত ভাবে একবার আশপাশে চোখ বুলালো নোয়ানা। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। ব্যর্থ হয়ে বললো,
“আপনি ঠিক কে বলুন তো?”

“আমি কে সেটা তোমার না জানলেও চলবে প্রিয়তমা! তবে তোমাকে জানার একরাশ তেষ্টা আমার মনে। কে তুমি?”

আষাঢ়ের বলা সব কথার মাঝে ‘প্রিয়তমা’ শব্দটি খুব করে লাগলো কানে। নোয়ানা কল কেটে দেওয়ার জন্য মোবাইলটা কান থেকে সরাতে উদ্যত হলো, আষাঢ় সেটা বুঝতে পেরেই বললো,
“এই না, কল কাটবে না। তোমার সাথে কথা শেষ হয়নি আমার।”

আষাঢ়ের কথা জাদুর মতো কাজ করলো, নোয়ানা চাইতেও কলটা কাটতে পারলো না।

আষাঢ় নীরব হাসে। বললো,
“যেখানে আমার সাথে মেয়েরা কথা বলতে চায় আর আমি তাদের সাথে কথা না বলে কল কেটে দিই, সেখানে আমি নিজ থেকে তোমাকে কল দিয়ে কথা বলছি। অথচ তুমি কল কেটে দিতে চাইছো? খুব খারাপ হবে কিন্তু। কতটা খারাপ হবে তুমি চিন্তাও করতে পারবে না। একেবারে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আসবো। আর তারপর… তারপর কী হবে বলো তো?”

নোয়ানা স্তব্ধ হয়ে শুনছে। অন্তঃকরণে রাগ জেগে উঠছে তার।

“কী হলো চুপ কেন? কী হবে জানো না তুমি? বিয়ে! বিয়ে হবে গো প্রিয়তমা!”

নোয়ানার আর সহ্য হলো না, সে ফোন কেটে দিলো। তারপর উঠে চলে গেল রুমের ভিতর।

আষাঢ় বাইনোকুলার নামিয়ে ফেললো। তার সারা শরীর আড়ষ্ট হয়ে আছে। অপমানে তিক্ত সে। নোয়ানা এভাবে ফোন কেটে দিলো? রাগ, জেদ সব চেপে বসলো তার মাথায়। সে আবার কল দিলো। বাইনোকুলারে চোখ দিয়ে আবারও তাকালো বারান্দায়। ওপাশ থেকে কল কেটে দেওয়া হলো।
অস্থির হয়ে পড়লো আষাঢ়। অপমানিত সে। নোয়ানা তাকে বিশাল আকারে অপমান করেছে। সে কোনো দিক ভেবে না পেয়ে কল দিলো কারিবের কাছে।

“কারিব, এক্ষুণি রুমে এসো। হারি আপ!”

কারিব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। আষাঢ়ের গলায় অস্থিরতা ছিল। কী হলো আষাঢ়ের?
“কী হয়েছে আষাঢ় ভাই?”

“মেয়েদের দেমাগ কীসে বিনাশ হয় জানো তুমি?”

“হঠাৎ করে এ প্রশ্ন কেন? কে আবার দেমাগ দেখিয়েছে আপনার সাথে?”

“যেখানে আমি মেয়েদের সাথে কথা বলতে বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিই, সেখানে নোয়ানা আমার মুখের উপর ফোন কেটে দিয়েছে! ভাবতে পারো তুমি?”

“সত্যি আষাঢ় ভাই?”

“নয়তো কি মিথ্যা? আমার গলা চিনতে পেরেও ও এমন করলো। কতটা খারাপ!”

কারিব আর কিছু না বলে চুপ মেরে গেল। আষাঢ় চোখ নামিয়ে ফেলে শূন্য দৃষ্টি স্থাপন করলো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে, আনমনে হেসে বলে উঠলো,
“দারুণ টিউলিপ ফুল! নতুন করে আবার প্রেমে পড়ছি কিন্তু তোমার। চিনতে পেরেও এত সুন্দর না চেনার ভাণ ধরলে? আমি তো মুগ্ধ! এত মুগ্ধতায় ডোবাও কেন আমায়? কিছুটা আগের মতোই আছো তুমি। পালিয়ে বেড়ানোর স্বভাব। এখন তো বড়ো হয়েছো, বুদ্ধি হয়নি? এখনও পালিয়ে বেড়াবে? ঠিক আছে, যত পারো পালাও তুমি। আমিও ছুটছি তোমার পিছন পিছন। ঠিকই ধরে ছাড়বো। পালিয়ে যেতে পারবে এ আশা করো না ভুলক্রমে।”

কারিব ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। আষাঢ়ের কার্যক্রম সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
আষাঢ় কারিবের দিকে চোখ তুলে চাইলো।
“আজকে কী প্ল্যান আমাদের?”

কারিব স্বাভাবিক করলো নিজেকে। জবাব দিলো,
“তেমন তো কোনো প্ল্যান নেই আজকে। কোনো গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করার নেই। ঝামেলামুক্ত সব।”

“বিয়ের শপিং আছে না আজকে? আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়? ব্রো বিয়েটা করবে?”

“বিয়ে করা ছাড়া তো উপায় নেই। কাল তো মামা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হয় বিয়ে, না হয় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হবে।”

আষাঢ় আনন্দিত হেসে বললো,
“এই বিয়েটা হলে সবচেয়ে কার বেশি ভালো হবে বলো তো?”

কারিব কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলো,
“কার?”

“আমার! নোয়ানার বোনের এ বাড়িতে বিয়ে হলে নোয়ানার আসা যাওয়া একটু বেশি হবে না? পাশের বাড়িতে বোন, যখন তখন এসে দেখা করবে। আর সেই দেখার ছলে আমার সাথেও বাক্যলাপ হবে, দেখা হবে, প্রেম হবে! সবকিছু হবে। এই জন্যই আমি এত করে চাইছি হবু ভাবির সাথেই আমার ভাইয়ের বিয়েটা হয়ে যাক।”

আষাঢ় খুশি মনে উঠে দাঁড়ালো। ওয়ার্ডোবের ভিতর থেকে চকলেট বের করে, একটা চকলেটের খোসা ছাড়িয়ে মুখে পুরলো।
কারিব পিছন থেকে জিজ্ঞেস করলো,
“নোয়ানার জন্য এত পাগল হলেন কেন আপনি?”

আষাঢ় কারিবের জন্য একটা চকলেটের খোসা ছাড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে এলো। চকলেটটা কারিবের মুখে পুরে দিয়ে বললো,
“কেন এত পাগল হলাম বুঝবে না কারিব। এটা বোঝার বয়স হয়নি তোমার। তুমি এখনও যথেষ্ট ছোট।”
বলে বেরিয়ে গেল আষাঢ়।

ছোট মানে? আষাঢ় ভাই তার বয়স ভুলে গেছে না কি? কারিব দুশ্চিন্তায় পড়লো। যেখানে সে আষাঢ়ের থেকে এক বছরের বড়ো, সেখানে আষাঢ় তাকে ছোট বললো?

_______________

বিয়েটা না করে আর উপায় নেই। বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে মিহিককে বিয়ে না করলে, এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। শ্রাবণ চাইছিল মা-বাবাকে বুঝিয়ে বলবে, কিন্তু হলো বিপরীত। বোঝাতে গিয়ে তাদের আরও ক্ষেপিয়ে দিলো। এখন বিয়েটা ছাড়া আর কোনো গতি নেই। না, এই জীবন আর রইল না সুষ্ঠ। আবার কাল রাতে মা’ও জানিয়ে দিয়েছে এ বিয়ে না করলে সে খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ করে দেবে। সেই দরুণ হিসেবে রাতে, সকালে কিছুই খায়নি সে। দুপুরে অনেক জোরাজুরির পরে খেয়েছে। এখন বিকেল চলে।
সব কিছু মিলিয়ে পাগল পাগল লাগছে শ্রাবণের। সে শত ভেবে ডিসিশন ফাইন্যাল করেছে। বিয়েটা চুপচাপ করে নেওয়াটা এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বিয়ের পর মিহিককে বুঝিয়ে ডিভোর্স দিয়ে দেবে মিহিককে। আর তাছাড়া মিহিক যেমন মেয়ে, এ বাড়িতে বউ হয়ে এলে তারপর সবাই বুঝতে পারবে মিহিক কতটা দজ্জাল! তখন হয়তো তারা নিজেরাই ডিভোর্স দেওয়ার কথা বলবে। হ্যাঁ, ভালো একটা সিদ্ধান্ত। কিন্তু সমস্যা হলো রুমকি। রুমকিকে কী করে বোঝাবে? এটা নিশ্চয়ই বেশিদিন চাপা থাকবে না রুমকির কাছ থেকে। বিয়ের কথা জানতে পেরে রুমকি আবার ব্রেকআপ করে চলে যাবে না তো?
শ্রাবণের চোখে একটা বীভৎস দৃশ্য ভেসে উঠলো, রুমকি তার সাথে ব্রেকআপ করে চলে যাচ্ছে। আর যাওয়ার আগে দুই গালে দুটো করে মোট চারটে চড় মেরেছে।
শ্রাবণ নিজের দুই গাল চেপে ধরলো। রুমকি তাকে ছেড়ে গেলে সে বাঁচবে না। রুমকিকে বোঝাতে হবে। বিয়েটা আগে হয়ে যাক। তারপর সে নিজেই বোঝাবে রুমকিকে।

“ভাইয়া, তোমার হবু বউ এসেছে। দেখা করবে না?” দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে খবরটা জানালো জুন।
শ্রাবণ নিজ কক্ষে শয়ন অবস্থায় ছিল। চকিতে উঠে বসলো সে।
“কে এসেছে?”

“আরে তোমার বউ।”

আষাঢ় আর কারিব শ্রাবণের রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। জুনের কথা তাদের কানে এসে পৌঁছলো। তারা বাইরে একটু ঘোরাঘুরি করবে বলে বের হচ্ছিল। জুনের কথা শুনে আষাঢ়ের চেহারা চকচক করে উঠলো। তারা প্রায় শ্রাবণের রুমের দরজা অতিক্রম করে ফেলেছিল, আবার ফিরে এলো জুনের কাছে।

“কে এসেছে?”

আষাঢ়ের প্রশ্নে জুন দীর্ঘ হাসির রেখা টেনে বললো,
“আমাদের হবু ভাবি। লিভিং রুমে বসে আছে।”

“সে একা?”

“না, সাথে তার বোনেরাও আছে।”

আষাঢ়ের মন বেজায় খুশি হয়ে উঠলো। সে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আরে ব্রো, তুমি এখনও বসে আছো? আমি যদি শুনতাম আমার হবু বউ আমাদের বাড়িতে এসে লিভিং রুমে বসে রয়েছে, তাহলে এক ছুটে গিয়ে এখনই তাকে জড়িয়ে ধরতাম। আর তুমি…চলো তাড়াতাড়ি।”

শ্রাবণের মনে হলো তার গায়ে জ্বর এসেছে। সে দুর্বল কণ্ঠে বললো,
“আমার গায়ে জ্বর এসেছে ভাই, আমাকে জ্বালাতন করিস না।”

কথাটা বলে শুয়ে পড়লো সে। জুন ভাইয়ের জ্বর এসেছে শুনে উতলা হয়ে রুমে ঢুকলো।
আষাঢ় দাঁড়ালো না। কারিবকে নিয়ে চলে এলো। সিঁড়িতে থাকতেই দেখতে পেল তিন বোন তাদের লিভিং রুমকে আলোকিত করে রেখেছে। সে কারিবকে নিচু স্বরে বললো,
“কারিব, তিন তিনটা চাঁদ জোৎস্না ছড়াচ্ছে আমাদের ঘরে, তুমি কি তা দেখতে পাচ্ছ?”

“এখন তো বিকেল টাইম, চাঁদ উঠবে কীভাবে? আর চাঁদ তো একটা হয়।”

“আমি তিনটা দেখতে পাচ্ছি।”

কারিব স্মিত হেসে বললো,
“কোন চাঁদটাকে বেশি সুন্দর মনে হচ্ছে?”

“বেশি সুন্দর তো আমার হবু ভাবি, তবে নোয়ানা নামের চাঁদটা বেশি ভালো লাগছে আমার।”

কারিব আষাঢ়ের এমন কথার জবাবে বলার কিছু পেল না।
আষাঢ় লিভিং রুমে নেমে বললো,
“আসসালামু আলাইকুম তিন বোন।”

তিন বোনের কারোর মনোযোগই আষাঢ়ের দিকে ছিল না, তারা লায়লা খানমের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল। লায়লা খানম বাড়ির উপর গিয়ে নিয়ে এসেছে তাদের। মিহিক আসতে চাইছিল না, কিন্তু লায়লা খানম ছাড় দেননি। পিঠা পুলির আয়োজন করা হয়েছে, সেজন্য তিন বোনকে পিঠা খাওয়াতে নিয়ে এলেন। তিন বোন একই সাথে আষাঢ়ের সালামের উত্তর দিলো।
আষাঢ় মুচকি হাসতে হাসতে মায়ের পাশে বসলো। কারিব দাঁড়িয়ে রইল। লায়লা খানম বললেন,
“তোমরা বোধহয় ওর সাথে পরিচিত না। বলেছিলাম না আমার ছোট ছেলে এসেছে? ও আমার ছোট ছেলে আষাঢ়। আসলে আমার ছেলেটা ঘোরাঘুরি করতে পছন্দ করে। বাংলাদেশ এসেই এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি শুরু করেছে। খুব একটা বাসায় থাকে না। যার কারণে ওকে দেখতে পাওনি তোমরা।”

“না, দেখা হয়েছিল তো।” আষাঢ় বলে উঠলো। নোয়ানার দিকে তাকিয়ে বললো,
“নোয়ানার সাথে দেখা হয়েছিল তো আমার।”

লায়লা খানম পুলকিত কণ্ঠে বললেন,
“তাই? কবে দেখা হয়েছিল?”

মিহিক বললো,
“আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল আষাঢ়। আমার সাথে দেখা করতে। তবে কোনো একটা কারণে দেখা না করেই চলে এসেছিল।”

লায়লা খানম ছেলেকে বললেন,
“দেখা করতে গিয়ে দেখা করোনি কেন বাবা?”

“দেখা না করে চলে এসে ভালো হলো না? সেদিন আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম, আর আজ হবু ভাবি নিজেই চলে এলো আমাদের বাড়িতে। নিজ বাড়িতে বসে হবু ভাবিকে দেখার মাঝে অন্য রকম একটা ব্যাপার আছে।”
কথাটা বলে নোয়ানার দিকে তাকালো আষাঢ়।
মিহিকের বিরক্ত লাগলো। বুঝে গেল এ ছেলেও শ্রাবণের মতো! খুব একটা ভালো নয়।

আষাঢ় অনেকক্ষণ বসলো এখানে। লায়লা খানমের সাথে কথা চলছিল তিন বোনের। আষাঢ়ের দিকে কারো তেমন দৃষ্টিপাত ছিল না। নোয়ানা অবশ্য আড় চোখে কয়েকবার দেখেছিল তাকে। আষাঢ় সেটা ধরতে পেরে হেসেছে মনে মনে। কথাবার্তার মাঝে আষাঢ়ের দৃষ্টি সকলের অগোচরে নোয়ানাকেই দেখেছে। নোয়ানার চোখ দুটো দেখছিল সে গভীর ভাবে। ওই চোখে কিছু একটা নেই আগের মতো। বিষণ্ণ, বিষাদের ছাপটা এখন অপরিলক্ষিত। তবুও যেন ভাসা ভাসা একটা ছাপ রয়ে গেছে। আষাঢ় মনে মনে বললো,
‘তোমার চোখ দুটোতে কেন আগে বিষণ্ণ আর বিষাদের ছাপ দেখতে পেতাম টিউলিপ ফুল?’

(চলবে)#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ১০
_____________

মিহিকের পরনে ভারী কাজের লাল লেহেঙ্গা। লাল টুকটুকে বউ সেজে আছে সে। শ্রাবণের বিবাহিতা স্ত্রী সে এখন। হুহ, বিয়েটা হয়ে গেছে শ্রাবণের সাথে। এইতো, সন্ধ্যার পরই তাদের বিয়ের কার্য সম্পন্ন হলো। বর্তমানে সে এখন শ্রাবণের রুমে অবস্থান করছে। সকাল নাগাদ মা-বাবাকে আরেক দফা বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে, কিন্তু লাভ হয়নি। কেউ বুঝলো না তাকে। যার দরুণ বিয়েটা করে নিলো।
শ্রাবণও নিজের পরিবারকে আরেক বার বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি। কবির সাহেবের এক কথা, বিয়ে না করলে বাড়ি থেকে বের করে দেবে, সেই সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করবে সারাজীবনের জন্য। রাত্র এখন এগারোটা চলছে। মিহিক বসে আছে বেডের উপর। ঘরটা তরতাজা ফুল দিয়ে সজ্জিত। রুপালি, জুন, কারিব এরা মিলে সাজিয়েছে রুমটা। বিয়েটা ঘরোয়াভাবে শুধু নিজস্ব মানুষদের নিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। বাহিরের কোনো মানুষদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এক রকম চুপিসারেই হয়েছে বিয়েটা। কবির সাহেব বিয়েটা নিয়ে কোনো প্রকার ঝামেলা চাননি। আগে শ্রাবণের মাথা থেকে রুমকির ভূত নামুক, তারপর জাকজমক আয়োজন করবেন।

মিহিকের ক্রুর দৃষ্টি এখন তার সদ্য বিবাহিত স্বামীর উপর। মেজাজটা বেজায় খারাপ হয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে সামনে কোনো এক সার্কাস সিন চলছে। আহা, কী মনোরম দৃশ্য! বাসর রাতে নতুন বউয়ের সামনে স্বামী মোবাইলে তার গার্লফ্রেন্ডকে বোঝাতে ব্যস্ত!

শ্রাবণ রুমের এ মাথা থেকে ও মাথা পায়চারি করছে আর রুমকিকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সে কিছুতেই চায়নি আজকে রুমকি তার বিয়ের খবরটা জেনে যাক। চেয়েছিল কালকে রুমকির সাথে দেখা করে নিজেই বিয়ের খবরটা জানাবে এবং রুমকিকে সব বুঝিয়ে বলবে। কিন্তু তা আর হলো না। রুমকি কীভাবে যেন তার বিয়ের খবরটা জেনে গেছে। এখন রুমকিকে বোঝাতে সে যারপরনাই ব্যস্ত।

“রুমকি…রুমকি তুমি বিশ্বাস করো…বিশ্বাস করো আমি…”

রুমকি হুংকার করে উঠলো,
“চুপ! একটা কথা বলবি না তুই। তুই আমার বিয়ে ভেঙে দিয়ে নিজে এখন ধেই ধেই করে বিয়ে করে নিলি? বেইমানের বাচ্চা! কী করে বিয়ে করলি তুই? যখন অন্য একজনকেই বিয়ে করবি তাহলে আমার বিয়ে ভেঙেছিলি কেন? বল কেন ভেঙেছিলি?”

“রুমকি তুমি বিশ্বাস করো…বিশ্বাস করো আমাকে! আমি নিজ ইচ্ছাতে এই বিয়েটা করিনি। আমার আব্বু জোর করে আমাকে…”

“আমার বিয়ে যখন ভেঙেছিলি তখন কি তোর বাপের পারমিশন নিয়ে ভেঙেছিলি? তাহলে এখন কেন তুই তোর বাপের কথায় বিয়ে করবি? কেন করবি?”

“এই বিয়েটা না করলে আব্বু আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতো, তেজ্যপুত্র করতো আমাকে।”

“তুই তোর নাটক থামা। আমি বেশ ভালোই বুঝতে পারছি সব কিছু। আমার জীবনটা শেষ করে দিয়ে, ও ওর নিজের নতুন জীবন শুরু করছে! এই শোন, কান খুলে শুনে রাখ। তোকে…তোকে আমি ছাড়বো না। চৌদ্দ শিকের ভিতরে ঢোকাবো তোকে আমি। জেলের ভাত খাওয়াবো তোকে। বেইমানের বাচ্চা! একদম মেরেই ফেলবো তোকে।”

রুমকি কথা শেষ করে ফট করে কল কেটে দিলো। শ্রাবণ এই মুহূর্তে কতটা অসহায়, কতটা কষ্টে আছে সেটা শুধু সে জানে। রুমকি কল কেটে দেওয়ায় তার ভিতরটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। খাঁ খাঁ মরুভূমি তার বুকে। পাগল প্রায় অবস্থা তার। কোনোদিক না ভেবে আবারও কল দিলো রুমকিকে। রুমকি কল কেটে দিলো। শ্রাবণ থামলো না, কল দিয়ে গেল। পাঁচ বারের বার রুমকি ফোন রিসিভ করলো।

শ্রাবণ ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠলো,
“প্লিজ রুমকি, প্লিজ কথা শোনো আমার। কল কেটে দিয়ো না দয়া করে। প্লিজ বিলিভ মি! আমি ইচ্ছা করে এই বিয়েটা করিনি। আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসি! বিলিভ মি প্লিজ!”

মিহিকের সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে। ইচ্ছা করছে এক ছুটে দূরে কোথাও চলে যায়। জীবনে কি ভেবেছিল এমন তামাশার সম্মুখীন হবে? ছি! বিয়ের পরেও এরকম করতে পারে কেউ? তাও আবার বউয়ের সামনে! এ বিয়ে তো টিকবে না। সত্যিই ডিভোর্স হয়ে যাবে মনে হচ্ছে! যা খুশি তাই হোক। পরিবার বুঝুক গিয়ে এখন।

রুমকি যেন একটু নরম হলো। শান্ত কণ্ঠে বললো,
“ঠিক আছে, বিশ্বাস করলাম। কাল সকালেই আমার সাথে একবার দেখা করবে। আর হ্যাঁ, বউয়ের ধারে কাছেও ঘেঁষবে না তুমি। তিন হাত দূরে থাকবে ওর থেকে।”

“তিন হাত কী? আমি তো তিনশ হাত দূরে থাকবো। তুমি রাগ করে থেকো না প্লিজ।”

“রাগ না করে থাকার উপায় নেই। রাগ আমি করবোই। কাল সকালে দ্রুত আসবে দেখা করতে।”

“হ্যাঁ, অবশ্যই আসবো। তুমি চাইলে তো আমি এখনই দেখা করতে পারি।”

“এখনের কোনো দরকার নেই। কাল সকালে। রাখছি। আবারও বলছি কিন্তু, মোটেই বউয়ের কাছে যাবে না, দূরে দূরে থাকবে। ঠিক আছে?”

“ও কে!”

“রাখছি।”

“হুম।”

কল কাটলো রুমকি। দীর্ঘ একটা শ্বাস বেরিয়ে এলো শ্রাবণের বুক চিরে। মাথা নিচু ভঙ্গিতে সে স্বস্তির শ্বাস ত্যাগ করতে লাগলো। যাক, রুমকি বুঝলো। রুমকি যে এত দ্রুত শান্ত হবে ভাবেনি।
শ্রাবণ অনুভব করলো তার মাথা থেকে যেন রাজ্যের একটা চাপ কমে গেছে। কিছুক্ষণ নীরব সময় পার করে পিছন ফিরে বেডে মিহিকের দিকে তাকালো। মিহিক অন্যদিকে তাকানো, তাও ঢের বুঝলো শ্রাবণ তাকিয়েছে তার দিকে। বুঝতে পেরেই মিহিক মুখ ভেংচালো। শ্রাবণের ভ্রু কুঁচকে গেল তা দেখে।

“কী ব্যাপার, ভেংচি কাটলেন কেন আপনি?”

মিহিক শ্রাবণের দিকে দৃষ্টি ফেলে বললো,
“আমার ইচ্ছা আমি ভেংচি কেটেছি, আপনি না দেখলেই পারেন। চোখ বুজে থাকেননি কেন?”

শ্রাবণ রেগে গেল। মুখে রাগের প্রলেপ এঁকে খানিক ক্ষণ নীরব থেকে বললো,
“খুব তো বলেছিলেন আমাকে বিয়ে করবেন না, তাহলে আবার কেন বিয়ে করলেন আমাকে?”

“আপনিও তো বলেছিলেন বিয়ে করবেন না, আপনি কেন করলেন?”

শ্রাবণ দমে গেল। প্রশ্নের জবাব দিলো না। ক্ষণিকের মৌনতা কাটিয়ে খুব শান্ত স্বরে বললো,
“দেখুন, এতক্ষণ যা হলো…মানে আমি যে রুমকির সাথে কথা বললাম এটা প্লিজ আমার মা-বাবাকে জানাবেন না। অন্য কাউকেও জানাবেন না এটা, প্লিজ! আমি জানি আপনি আমাকে পছন্দ করেন না, এই বিয়েটা আপনি করতে চাননি, তাও বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে। আমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সেম। আমার মা-বাবা আমার ব্যাপারটা বুঝতে চায়নি, কিন্তু আপনার তো বোঝার কথা। আমি রুমকিকে ভালোবাসি! এ ব্যাপারে তো আপনি আগে থেকেই অবগত।”

মিহিক বুক ভর্তি ঘৃণা নিয়ে স্বামী নামক ব্যক্তিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার হঠাৎ কান্না পাচ্ছে। তার স্বামী এমন অকপটে অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসে বলছে তার সামনে? হোক শ্রাবণ রুমকিকে ভালোবাসে, হোক সে আগে থেকেই জানতো শ্রাবণের এই ব্যাপারে, তাই বলে আজকের দিনে এরকম করে কথাগুলো বলবে? ইয়া আল্লাহ! জীবনে কি ভেবেছিল স্বামীর কাছ থেকে এই কথা শুনতে হতে পারে? ভিতরটা গুমরে গুমরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কী বড়ো ভুল করে ফেললো সে!

শ্রাবণ বলে চলেছে,
“আমাদের সম্পর্কটা হয়তো বাকি সব বৈবাহিক সম্পর্কের মতো হবে না। কিন্তু আমরা এটা এখনই বাইরে প্রকাশ করতে পারবো না। হয়তো কিছুটা সিনেমাটিক লাগছে আমার কথা, তাও বলছি, আমাদের মাঝে সম্পর্কটা যেমনই থাকুক, এটা এখন সকলের সামনে প্রকাশ করা অনুচিত হবে। সকলের সামনে আমাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক দেখাতে হবে। তারা এত করে চাইছিল এই বিয়েটা হোক, অনেক আশা ছিল তাদের এই বিয়েটা নিয়ে। এখন যদি জানতে পারে আমরা আসলে একে অপরের সাথে স্বাভাবিক নই, তাহলে খুব কষ্ট পাবে। আম্মু তো খাওয়া-দাওয়া-ই বন্ধ করে দেবে। অসুস্থ হয়ে পড়বে সে। আমি ছেলে হয়ে এটা সহ্য করতে পারবো না।”

শ্রাবণের এত কথার প্রত্যুত্তরে মিহিক শ্লেষপূর্ণ হেসে শুধু একটা বাক্যই বললো,
“তেজ্যপুত্র হওয়ার এত ভয়?”

মিহিকের কথার ঝাপটায় শ্রাবণের মুখের বুলি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। ভীষণ অপমানে রিক্ত হলো সে। কিছু বলার আর মুখ রইল না।

কেটে যায় সময়। কতটা সময় কাটলো? আধ ঘণ্টা? না কি এক ঘণ্টা? সঠিক সময়টা জানা নেই কারো। মিহিকের ওই কথার পর দুজনের মাঝে আর একবারও বাক্যলাপ হয়নি।
মিহিক ঠাঁয় এখনও বেডে বসে আছে।
শ্রাবণ বসে আছে জানালার ধারে। জানালার কাচ বন্ধ। বাইরে বৃষ্টি। যেন তেন বৃষ্টি নয়, একেবারে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। শ্রাবণ প্রত্যক্ষ করছে জানালার কাচে বৃষ্টির আছড়ে পড়া আবার গড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য। তার জীবনটাও এখন এমন আছড়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটার মতো। এক কষ্টদায়ক জীবনের মধ্যে আছে সে। রুমকির বিয়ের দিন থেকে তার জীবনটা খুব করে পাল্টে গেছে। এই পাল্টে যাওয়া জীবনে বেঁচে থাকার স্বাদ বড্ড নির্মম! আড় চোখে বার কয়েক মিহিককে দেখেছে সে। মিহিকের কোনো নড়চড় নেই, ঠিক একটা কাঠের পুতুল যেন। শ্রাবণের ভালো লাগছে না মিহিককে এরকম দেখতে। নতুন একটা বউ মুখ গোমড়া করে বসে আছে, এটা কি ভালো লাগে দেখতে? লাগে না। একদমই লাগে না। মেয়েটা হয়তো ভাবছে এই বিয়েটা তার জীবনে সবচেয়ে বড়ো ভুল। ভাবলে ভাবুক। এখানে তার কী করার আছে? নিজের জীবনেও তো এই বিয়েটা একটা ভুল ছাড়া আর কিছু না! নিজেও তো আছে বড্ড যন্ত্রণায়।
শ্রাবণের হঠাৎ ঘুমানো নিয়ে চিন্তা উদয় হলো। মিহিককে কিছুতেই নিজের বিছানায় ঘুমাতে দিতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু তাই বলে কি আর একটা মেয়েকে বলা যায়, তুমি নিচে ঘুমাও? বলা যায় এটা? যায় না। মেয়েদের প্রতি শ্রাবণের সম্মান আছে। বরাবর সে একটু বেশিই সম্মান করে মেয়েদের। এখন আবার এ মেয়ে তার বিবাহিত স্ত্রী। নতুন বউ! নতুন বউকে কি আর ফ্লোরে ঘুমাতে দেওয়া যায়? ভালো দেখায় এটা? আর মিহিক যেমন মেয়ে, মুখে কোনো লাগাম নেই। যদি নিচে ঘুমাতে বলে কী বলতে যে কী বলবে আল্লাহ মালুম! শ্রাবণের নিজেরও নিচে ঘুমানোর অভ্যাস নেই। ইচ্ছে তো করছে মিহিককেই নিচে ঘুমাতে বলে, কিন্তু এটা অন্যায়। এত বড়ো অন্যায় তো সে করতে পারে না। নিজের নিচে ঘুমানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। শ্রাবণ টুল ছেড়ে উঠে ক্লোজেটের কাছে এলো। তার রুমে এক্সট্রা তোষক আছে। তোষকের উপর একটা কম্বল বিছিয়ে বিছানা তৈরি করবে নিচে। এরপর সেখানেই ঘুমাবে। ক্লোজেটের ভিতর তোষক আর কম্বল ধরে টানাটানি করলেই মিহিক বললো,
“কী করছেন আপনি?”

শ্রাবণ ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে বললো,
“ঘুমাবো না আমি?”

“তো খাটে ঘুমান।”

মিহিকের কথায় শ্রাবণের অন্তঃকরণে যেন শৈতপ্রবাহ বয়ে গেল। থমকে গেল তার হৃদপিণ্ড। লজ্জায় মুখখানি লাল বর্ণ ধারণ করলো। মিহিকের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো সে। মেয়েটা কী বললো এই মাত্র? খাটে ঘুমান? নিজের সাথে খাটে ঘুমাতে বলছে? মেয়েটার কি লজ্জা শরম নেই?
শ্রাবণ পাথর হয়ে গেল। ক্লোজেট থেকে কম্বল, তোষক টেনে বের করার খেয়ালটুকু হারিয়ে ফেললো সে।
মিহিক বিছানা থেকে নেমে শ্রাবণের কাছে এগিয়ে এলো। শ্রাবণের পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে ক্লোজেট থেকে কম্বল আর একটা বেড শীট বের করে এনে বললো,
“আপনি উপরে ঘুমান। আমি নিচে শোবো।”

শ্রাবণের ভুল ভাঙলো। ভুল ভাঙতেই সে বললো,
“কোনো দরকার নেই, আপনি খাটে ঘুমান। আমার কোনো অসুবিধা হবে না।”

“আমি আপনার অসুবিধার কথা ভাবছি না, আমি নিজের অসুবিধার কথা ভাবছি। যে বিছানায় এত দিন একটা ছেলে ঘুমিয়ে এসেছে, সে বিছানায় আমি শুতে পারবো না। তাই আমি নিচে শোবো।”

মিহিকের কথায় শ্রাবণ আহত হলো। এই মেয়েটা এমন কেন? একটা ছেলে মানে? সে তো এখন তার হাসব্যান্ড। হাসব্যান্ডের বিছানায় শুতে অসুবিধা? শ্রাবণ বললো,
“ও কে! আপনার মর্জি সব।”

শ্রাবণ আগে ফ্রেশ হয়ে নিলো। মিহিক তার পরে। মা সব প্যাকিং করে দিয়েছিল ব্যাগের ভিতর। থ্রি পিস, টপস, স্লিপিং স্যুট ইত্যাদি সব কিছুই আছে। মিহিক থ্রি পিস পরলো। ভারি লেহেঙ্গা ছেড়ে এখন যেন একটু শান্তি। কথা মতন শ্রাবণ উপরে খাটে শুলো, আর মিহিক নিচে। রুমে এখন শুধু ক্ষীণ আলোয় একটা ড্রিম লাইট জ্বলছে। মিহিকের চোখ ভরে উঠছে অশ্রুতে। কোণ বেয়ে টুপ করে অশ্রু ধারা নামতে লাগলো। ভিজে যেতে লাগলো বালিশ। শ্রাবণকে বিয়ে করা কতটা ভুল হয়েছে এখন বুঝতে পারছে। জেদ ধরে বিয়েটা করা একেবারে উচিত হয়নি। শুধু শুধু একটা সম্পর্কের নাম সৃষ্টি হলো তাদের মাঝে। এই সম্পর্কের তো কোনো গতি নেই। শ্রাবণ যেসব করছে তাতে এই সম্পর্কে ভাঙন ধরবে খুব শীঘ্রই!

শ্রাবণের ঘুম আসছে না, শুয়ে থাকতেও ভালো লাগছে না। একটু পর পর ফ্লোরের উপর বিছানা পেতে শুয়ে থাকা মিহিকের দিকে তাকাচ্ছে। একটা মেয়ের দিকে চুপিসারে তাকিয়ে থাকা কি ঠিক? শ্রাবণের মন বাধা দিচ্ছে। তারপরও চোখ বার বার কেন যেন চলে যাচ্ছে মিহিকের উপর। তবে মিহিকের দিকে তাকালেও এখন অন্যায় হবে না, কারণ মিহিক এখন তার স্ত্রী।
একটা মেয়ে তার রুমে ফ্লোরে শুয়ে আছে এটা শ্রাবণের ঠিক ভালো লাগছে না। তার অপরাধী মন বার বার প্রতিবাদ জানাচ্ছে, এটা অন্যায়। হলে হোক অন্যায়। তার সাথেও তো অন্যায় করা হয়েছে। এ বিয়ে সে করতে চায়নি, তারপরও করতে হয়েছে। শ্রাবণ মিহিকের দিকে তাকালো আবার। ড্রিম লাইটের আলোয় মিহিকের অবয়ব দেখতে পাচ্ছে সে। মেয়েটার জন্য কেন যেন তার কষ্ট অনুভব হচ্ছে। নিজের কষ্ট বোঝার কেউ নেই, অথচ সে অন্যের জন্য কষ্ট অনুভব করছে! শ্রাবণ চোখ ফিরিয়ে নিলো। অন্য পাশ ফিরে শুলো। ভাবতে লাগলো কাল রুমকিকে কী কী বলে বুঝ দেবে? এ মুখ নিয়ে রুমকির সামনে দাঁড়াতেও যে লজ্জা করবে। জীবন এত কঠিন, নির্মম হয়ে উঠলো কেন? শ্রাবণের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। চোখের পাতা এক করে আবার খুললো। ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও একবার মিহিককে দেখলো। মেয়েটার জন্য সত্যিই তার খারাপ লাগছে। মিহিকের দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। বড়ো করে শ্বাস ত্যাগ করে চোখ বুজলো। না, ঘুম বোধহয় আজ আর ধরা দেবে না চোখে।

__________________

আষাঢ়ের ঘুম আজ একটু দেরিতে ভাঙলো। তখন ঘড়ি সাতটা পনেরো ছুঁই ছুঁই। ঘুম থেকে উঠেই সে জানালার কাছে এসে দাঁড়ালো। এটা তার নিত্য দিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সকালে একবার এখান থেকে পাশের বাড়ির ব্যালকনিতে না তাকালেই নয়। নোয়ানাকে দেখতে পাচ্ছে। আরও ভালো করে দেখার জন্য বাইনোকুলার ধরলো চোখে। আজ নোয়ানার হাতে কোনো বই নেই। আনমনা বসে আছে। আষাঢ় ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফোঁটালো। বেড সাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা নিয়ে এসে কল করলো নোয়ানার নাম্বারে।

হাতে থাকা ফোন মৃদু সুরে বেজে উঠে নোয়ানার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটালো। মোবাইলে দৃষ্টিপাত করতেই ইংলিশে লেখা ‘Himel’ নামটা ভেসে উঠলো। আষাঢ়ের কল আসায় সে কিঞ্চিৎ বিরক্ত, আবার কিঞ্চিৎ খুশিও হলো। চারদিন ধরে রোজ সকালেই আষাঢ় এমন সময়ে একবার কল দেবে। প্রথম যে বার কল দিয়েছিল, সে বার কল রিসিভ করেছিল। পরের দুই দিন আর রিসিভ করেনি। কিন্তু আজকে বিনা আপোষেই রিসিভ করে ফেললো। ও প্রান্ত থেকে আষাঢ়ের গলা শোনা গেল,
“ও মা! প্রিয়তমা আজ কল রিসিভ করেছে দেখছি!”

আষাঢ়ের কথা কেমন ঢংপূর্ণ লাগলো নোয়ানার। কিছু বললো না সে। চুপচাপ শুনলো।

“তোমার ওই সুন্দর মুখখানিতে রোদের আনাগোনা কিন্তু একদম ভালো লাগছে না আমার। তবে লাল থ্রি পিসে তোমাকে দেখতে দারুণ লাগছে।”

আষাঢ়ের কথায় নোয়ানা সচকিত চোখ বুলিয়ে নিলো আশেপাশে। কোথায় কাউকে না দেখতে পেয়ে বললো,
“আপনি কি আমায় দেখছেন? জানেন কী করে আমার পরনে লাল থ্রি পিস না কি? কোথায় বসে দেখছেন?”

আষাঢ় হাসলো। দোতলার এক জানলা দিয়ে সে যে নোয়ানাকে দেখছে, এটা নোয়ানার জানার কথাও না। বললো,
“হুম দেখছি তো। তুমি খুব কাছে আমার। হাত বাড়ালেই আমি ছুঁয়ে দেখতে পারি তোমাকে।”

“তাই?”

“হ্যাঁ।”

নোয়ানা হেসে ফেললো। তার হাসিও যে আষাঢ় খুব ভালো করে দেখতে পাচ্ছে বাইনোকুলারের সাহায্যে এটা হয়তো তার অজানা। সে বললো,
“আপনি ঠিক কে বলুন তো?”

“তোমাকে তো আগেই বলেছি প্রিয়তমা, আমি কে সেটা জানার প্রয়োজন নেই তোমার। তুমি কে সেটাই হলো ইম্পরট্যান্ট।”

“আপনি কি আষাঢ়?”

“ওপস! ধরা খেয়ে গেলাম কী করে?”

“তাহলে এটা সত্যিই আপনি? পরিচয় গোপন রেখেছিলেন কেন?”

“আমি পরিচয় গোপন রাখিনি প্রিয়তমা, আমার পরিচয় প্রকাশ্যেই ছিল। তুমিই না চেনার ভাণ করেছিলে।”

আষাঢ়ের মুখের প্রিয়তমা ডাকটি একবারও শুনতে ভালো লাগেনি নোয়ানার। ডাকটি তার কাছে বিরক্তির কারণ বৈ কিছুই না। সে রাশভারী কণ্ঠে জবাব দিলো,
“আমি কেন আপনাকে না চেনার ভাণ করবো? কী কারণ আমার?”

“সেটা তো তুমিই ভালো জানো। তুমি চিনেও কেন আমাকে না চেনার ভাণ করছো নোনা?” শেষের কথাটা কেমন আকুল পূর্ণ আষাঢ়ের।

‘নোনা’ ডাকটি শুনে নোয়ানার হৃদয় কম্পিত হয়ে ওঠে। আজ অনেক বছর পর কেউ তাকে আবার ‘নোনা’ বলে ডাকলো। কিছু স্মৃতি হুড়মুড় করে জেগে উঠলো মনে। নিজেকে কাঠিন্য করলো নোয়ানা। শক্ত কণ্ঠে বললো,
“আমি ‘নোনা’ নই, আমার নাম ‘নোয়ানা’!”

“নোয়ানা নামটা কঠিন লাগছে আমার কাছে, তাই ছোট করে নোনা ডাকলাম। ভেবেছিলাম নোনা ডাকলে তুমি মাইন্ড করবে না। কিন্তু তুমি তো মাইন্ড করলে। তোমাকে নোনা বলে ডাকাটা কি এতটাই দোষের?”

“আপনি আর ফোন করবেন না আমাকে।”

“কিন্তু ফোন না করে যে আমি থাকতে পারবো না।”

“আপনি ফোন করলে আমি বিরক্ত বোধ করি।”

“আনন্দ বোধও তো করো।”

“ভুল ধারণা আপনার।”

“শুধু একবার চিনতে পারো আমায়, সকল ভুল কাটিয়ে সঠিক করে নেবো আমি।”

“আমি চিনি না আপনাকে। আপনি আষাঢ়, আপনি কবির আঙ্কলের ছেলে এটাই জানি আমি।”

নোয়ানার অকপটে মিথ্যা বলায় হাসলো আষাঢ়।
“তাই? ঠিক আছে, চিনতে হবে না আমায়। নতুন করে আবার চেনা জানার শুরু হোক তাহলে।”

কথাটা শেষ করে কল কেটে দিলো আষাঢ়। নোয়ানার থমথমে মুখটা দেখতে পাচ্ছে সে। ফিচেল হেসে বললো,
“তুমি এখনও একই রকম আছো লাভলি বার্ড!”

আষাঢ় ভালো করে খেয়াল করে দেখলো, স্বভাব একই থাকলেও চেহারায় হালকা পরিবর্তন এসেছে নোয়ানার। গায়ের রংও আগের থেকে একটু কালো পূর্ণ হয়েছে। এটার কারণ কী? তার প্রিয়তমার গায়ের রং কালচে হয়েছে কেন তার মতো? বাংলাদেশের ওয়েদার এর পিছনে দায়ী না কি? আষাঢ়ের রাগ হলো। আবহাওয়াও আজকাল মানুষের রূপ পরিবর্তন করে দিচ্ছে?

_________________

জগিংএ যাওয়ার সময় মিহিককে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছিল শ্রাবণ। আর জগিং থেকে ফিরে মিহিককে একদম পরিপাটি অবস্থায় দেখলো। পরনে থ্রি পিস নেই, একটা সবুজ কাতান শাড়ি পরে আছে। ফ্লোরে থাকা বিছানাপত্রও নেই। সবকিছু একেবারে গোছগাছ। শ্রাবণের মনে হলো মিহিক মেয়েটা গোছানো স্বভাবের। শ্রাবণ সে নিয়ে অহেতুক না ভেবে নিজ কাজে মন দিলো। তার রেডি হয়ে দ্রুত রুমকির সাথে দেখা করতে যেতে হবে। জানে রুমকি আটটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না, তাও সে আগে ভাগেই রেডি হচ্ছে। গিয়ে অপেক্ষা করবে। রুমকির ঘুমে ডিস্টার্ব হোক সেটা সে চায় না।
মিহিক নিচে চলে গেছে ততক্ষণে। মিহিকের সাথে কোনো কথা হয়নি তার। অনেক বার ভেবেছে মিহিককে ‘গুড মর্নিং’ জানাবে, কিন্তু জানাতে পারেনি। জড়তা কাজ করছিল। মিহিক এখন তার বউ, তার বউ পরিচয়ে এ বাড়িতে ঘুরে বেড়াবে, ব্যাপারটা ভাবতে কেমন যেন লাগছে শ্রাবণের। যেখানে রুমকির তার বউ পরিচয়ে থাকার কথা, সেখানে মিহিক তার বউ পরিচয়ে আছে, এ সবটাই বাবার দোষ। রুমকির সাথে তার বিয়েটা দিলে কী এমন ক্ষতি হতো? শ্রাবণ এরকম নানান চিন্তা ভাবনা করতে করতে রেডি হয়ে নিচে নামলো। সোজা বাইরে বেরিয়ে যেতে চাইছিল, মা ডাইনিং থেকে ডাকলেন,
“কোথায় যাচ্ছ শ্রাবণ?”

শ্রাবণ ঘাবড়ালো না। আগে থেকে উত্তর তৈরি করে রেখেছে সে। মায়ের দিকে তাকালো। মায়ের পাশেই আবিষ্কার করলো মিহিককে। আর কেউ না জানলেও মিহিক জানে সে কোথায় যাচ্ছে। মিহিকের সামনে মিথ্যা বলতে বাধলো শ্রাবণের। তাও বললো,
“আমার খুব জরুরি একটা কাজ আছে আম্মু।”

“কী এমন জরুরি কাজ? নাস্তা করে যাও।”

“সময় হবে না।” শ্রাবণ আর দাঁড়ালো না। মিহিকের উপর শেষ বার দৃষ্টি বুলিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।

মিহিকের নিজের কপাল নিজের চাপড়াতে ইচ্ছা করছে। ভুল! বড্ড ভুল হয়ে গেল শ্রাবণকে বিয়ে করা। ইচ্ছা করছে এ বাড়ি থেকে এক্ষুণি চলে যেতে। কিন্তু যাবে কোথায়? নিজের বাড়ি? না, ওখানে তো যাবে না আর। একটা বার পা দেবে না ও বাড়িতে।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here