বিবর্ণ জলধর পর্ব -১১+১২

0
54

#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ১১
_____________

“পনেরো বছর বয়সে আমার চেহারা যেমন ছিল, এখন কি তেমন নেই? খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে কি আমার চেহারায়?”

প্রশ্নটা করতে করতে এক টুকরো পরোটা মুখে পুরলো আষাঢ়।

কারিব জুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললো,
“চেহারা পরিবর্তন হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। চোখ, কান, নাক চেহারার গঠন সবই তো আগের মতো।”

“এক্সাক্টলি, সবই তো আগের মতো। পরিবর্তন হলে একটু আধটু হয়েছে। তাই বলে কি আমাকে চেনা যাবে না? আমার যখন পনেরো বছর বয়স সে সময় যদি তুমি আমাকে দেখে থাকো, আর এতগুলো বছরে যদি আমাদের আর দেখা না হয়, তাহলে তুমি কি আমাকে চিনতে পারতে না?”

“হ্যাঁ, চিনতাম না কেন? অবশ্যই চিনতাম। আপনার চেহারার তো খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। পনেরো বছর বয়সে যেমন ছিলেন, এখনও তো তেমনই ছাপ আছে আপনার চেহারায়। কিন্তু হঠাৎ করে এরকম একটা প্রশ্ন কেন করলেন?”

আষাঢ় জবাব দিলো না। স্থিরভাবে ভাবতে লাগলো। তার থেকেও নোয়ানার চেহারায় বেশি পরিবর্তন হয়েছে। এমনকি নোয়ানা আগে ফর্সা ছিল। এখন একটু কালো হয়েছে। এত পরিবর্তনের পরও সে চিনে গেল, অথচ নোয়ানা চিনতে পারলো না? আসল কথা হলো নোয়ানা চিনেও না চেনার ভাণ করছে। দারুণ অভিনেত্রী!

“আমিও দেখবো তুমি কতটা ভালো অভিনয় করতে পারো!” মুখে বিড়বিড় করে আরেক টুকরো পরোটা মুখে পুরলো আষাঢ়।

কারিব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। কোনো একটা ঘাপলা উপলব্ধি করছে সে আষাঢ়ের মাঝে। আষাঢ় তার থেকে কোনো কথা গোপন রাখে না। অথচ এই ঘাপলাটা সম্পর্কে সে জানে না।

ডাইনিং টেবিলে এখন শুধু আষাঢ় আর কারিব আছে। বাকিদের নাস্তা শেষ। তারা দুজন একটু লেট করেই ব্রেকফাস্ট করে। আষাঢ় আসলে কারিবের ক্ষেত্রে এই লেট ব্যাপারটা হয়। এমনিতে সে তাড়াতাড়িই ব্রেকফাস্ট করে সকলের সাথে।
কিছুক্ষণের নীরবতা কাটিয়ে আষাঢ় প্রথমে বললো,
“বুঝলে কারিব, ভাবছি ঢাকার ভিতরই কিছু মেয়েদের সাথে কন্টাক্ট করবো। দূরে দূরে গিয়ে মেয়েদের সাথে দেখা করতে ভালো লাগছে না আর। দুই তিন দিন গিয়ে সেখানে থাকা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।”

“কিন্তু এই রিক্স নেওয়া কি ঠিক হবে? আপনার মুখে তো আগে জীবনেও এরকম কথা শুনিনি। নিজের সেইফটি নিয়ে তো আপনি বেশ সচেতন।”

“আমাদের থানাটা লিস্টে না থাকলেই হলো। অন্য থানার মেয়েদের সাথে দেখা করলে সমস্যা হবে না। আজকে রাতে মতিঝিলের একটা মেয়ের সাথে চ্যাটিং হয়েছে ইন্সট্রাগ্রামে। ভাবছি কয়েকদিন পর ওর সাথে মতিঝিল গিয়ে দেখা করবো।”

“ঠিক আছে, আপনি যা চান।” আষাঢ়ের কথায় অমত করার জো পেল না কারিব।

_________________

শ্রাবণ রুমকির বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করে অপেক্ষা করছে চল্লিশ মিনিট হলো প্রায়। রুমকি কি এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি? কল দিলো, তাও রুমকির ফোন বন্ধ। শ্রাবণের একটু ভয় ভয় করছে। রুমকিকে কী বলে বোঝাবে? মনে মনে সবটা ঠিক করে সাজিয়ে নিতে চাইলেও পারেনি। খুব দুর্বিষহ অবস্থায় আছে সে। চিন্তায় চিন্তায় মস্তিষ্কে যন্ত্রণা ধরে আছে। রুমকিকে গেট থেকে বের হতে দেখে শ্রাবণের অপেক্ষার অবসান ঘটলো। সে গাড়ির গ্লাস নামিয়ে ফেললো।

রুমকি শ্রাবণকে দেখতে পেয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে এলো। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে বসলো। শ্রাবণ প্রথমে কী বলবে বুঝতে পারলো না। তোতলাতে তোতলাতে এক সময় বললো,
“তো…তোমার ফোন বন্ধ কেন?”

রুমকি স্পষ্ট উত্তর দিলো,
“নষ্ট হয়ে গেছে।”

“নষ্ট হয়ে গেছে সেটা তো আমি জানি। সে জন্যই তো তোমাকে নতুন একটা মোবাইল কিনে দিয়েছি। সেটার কী হলো?”

“সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে।”

“সেটা কী করে নষ্ট হতে পারে? মাত্র পাঁচদিন আগেই তো কিনে দিলাম।”

“কাল রাতে এতটাই ক্ষুব্ধ ছিলাম যে, মোবাইলটা ফ্লোরে ছুঁড়ে মেরেছিলাম, তারপর থেকেই নষ্ট। তবে মেকানিকে দিলে ঠিক হয়ে যাবে।”

রুমকি ফ্লোরে মোবাইল ছুঁড়ে মেরেছে শুনে শ্রাবণের একটু ভয় হলো। সেটা অপ্রকাশ্য রেখে বললো,
“কয়দিন লাগবে ঠিক হতে?”

“বেশি না, পাঁচ ছয়দিন।”

“পাঁচ ছয় দিন?” কেমন লম্বা করে টেনে বললো শ্রাবণ।
তার পক্ষে এতদিন রুমকির সাথে কথা না বলে থাকা পসিবল নয়। সে বললো,
“মোবাইল আর মেকানিকে দিয়ে ঠিক করার দরকার নেই, একটা নতুন মোবাইল কিনে দেবো আমি।”

রুমকির ভিতরটা প্রশান্তি পেল। শ্রাবণের কাছ থেকে এরকম কথাই আশা করেছিল সে।

“রাতে কোথায় ছিলে?” গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করে রুমকি।

“কেন বাড়িতে।”

“গাধা! কোথায় ঘুমিয়েছো সেটা জিজ্ঞেস করেছি?”

“আমার রুমে।” খুব স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিলো শ্রাবণ।
তবে তার এই স্বাভাবিক কণ্ঠের জবাবে রুমকির চোখ কপালে উঠলো,
“তুমি নিজের রুমে ওই ডাইনিটার সাথে ছিলে?”

মিহিককে ‘ডাইনি’ ডাকার ব্যাপারটা শ্রাবণের ভালো লাগলো না।
“তুমি ওকে ডাইনি বলছো কেন?”

“ডাইনি নয়তো ও কী? একদম সহ্য হয় না আমার ওকে। বদ একটা! ডাইনিটা আমার বয়ফ্রেন্ডের বউ, ভাবতেও গা জ্বলে যাচ্ছে। তোমার বাবা কি আর কোনো মেয়ে খুঁজে পায়নি তোমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য? ওকেই কেন পছন্দ করতে হলো?”

শ্রাবণ এ নিয়ে কথা বাড়াতে চাইলো না। কিছু না বলে গাড়ি স্টার্ট করলো। রুমকি বললো,
“এক খাটে ঘুমিয়েছিলে মিহিকের সাথে?”

“অবশ্যই না, একটা মেয়ের সাথে কী করে আমি এক খাটে ঘুমাবো? ফ্লোরে…”

“ফ্লোরে ঘুমিয়েছো সারারাত? তুমি কেন ফ্লোরে ঘুমাবে? মিহিককে ফ্লোরে ঘুমাতে বলতে পারলে না?”

“মিহিকই ফ্লোরে বিছানা পেতে ঘুমিয়েছে, নিজ ইচ্ছায়। আমি খাটে শুয়েছি।”

“ও। এই একটা ব্যাপার তো অন্তত ভালো করেছে ডাইনিটা। তা কদিন নিজের বউ পরিচয়ে রাখবে ওকে? ডিভোর্স দেবে না?”

শ্রাবণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। ডিভোর্স নিয়ে সে এখনও ভাবেনি কিছু। তবুও বললো,
“দেখি, কবে ডিভোর্স দেওয়া যায়!”

শ্রাবণ এ নিয়ে মোটেই কথা এগোতে চাইলো না আর, সে জন্য দ্রুত সং প্লে করে দিলো।
মার্কেটে নিয়ে এসে রুমকিকে নতুন একটা মোবাইল কিনে দিলো শ্রাবণ। দামি মোবাইল-ই কিনে দিয়েছে। আগেরটার থেকেও বেশি দামি। রুমকির সাথে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর সোজা বাড়ি ফিরলো সে। বাড়িতে যে তার নতুন বউ আছে সেটা ভুলেই গিয়েছিল। মনে ছিল না যে গতকাল তার বিয়ে হয়েছে। মনে পড়লো রুমে প্রবেশ করার পর। যখন মিহিককে বসা দেখলো জানালার কাছে টুলে। শ্রাবণের মনে পড়লো এই মিহিক মেয়েটা এখন তার বউ। শ্রাবণের হঠাৎই অপরাধ বোধ হলো। ঘরে তার বউ অথচ সে গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করে এসেছে? শ্রাবণের মনটা বড্ড অপরাধী বনে গেল।

দরজা খোলার শব্দে মিহিক তাকিয়েছিল শ্রাবণের দিকে। এখনও তার দৃষ্টি শ্রাবণের উপর নিবদ্ধ। শ্রাবণের এটা খেয়াল ছিল না। খেয়াল হতে সে চোখ সরিয়ে নিলো। হেঁটে রুমে ঢুকে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো। ঘড়ি খুলে রাখলো হাত থেকে। নিজের অপরাধ বোধকে কাটিয়ে নিলো। বোঝাতে লাগলো নিজেকে, না কোনো অপরাধ সে করছে না। রুমকি তার ভালোবাসা! পুরোনো ভালোবাসা। অনেক আগে থেকে তার মনে রুমকির জন্য প্রেম জমাট। মিহিকের সাথে তার বিয়েটা অনিচ্ছা সত্ত্বে হয়েছে। এখন মিহিককে রেখে রুমকির সাথে দেখা সাক্ষাৎ করা নিশ্চয়ই অন্যায় বলে গণ্য হবে না। শ্রাবণ মনে মনে নিজেকে এসব বুঝ দিতে লাগলেও, তার মন ঠিক মানছে না। তার অপরাধ বোধ স্থায়ী। অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে। আড় চোখে একবার মিহিকের দিকে তাকালো। মিহিক জানালা দিয়ে এক মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে কেমন গম্ভীরতা, কেমন কষ্ট, কেমন অভিমানের ছাপ দেখা যাচ্ছে। শ্রাবণ বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না ওই মুখে। অপরাধ বোধ আরও বেড়ে যাচ্ছে। চোখ সরিয়ে নিলো। আয়নাতে তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখলো। কী পাপি একটা মুখ!

________________

সকাল থেকে এ যাবৎ মিহিককে অসংখ্য বার কল দিয়েছে তার মা, বোনেরা। মিহিক কারো কল রিসিভ করেনি। বুকে তার অভিমানের গাঢ় কালি লেপ্টে আছে। বার বার মনে হচ্ছে জীবনে খুব বড়ো একটা ভুল করে ফেলেছে। এ ভুলের চিহ্নটা আজীবন থেকে যাবে। বিয়ের আগে থেকে জানতো শ্রাবণের মনে রুমকির বসবাস। তাই বলে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও শ্রাবণ রুমকির জন্য এত দিওয়ানা থাকবে ভাবেনি। বউয়ের সামনে প্রেমিকার সাথে কথা বলছে, বিয়ের পরদিন প্রেমিকার সাথে বাইরে থেকে ঘুরে এসেছে, কতটা নীচ হলে কেউ এমন করতে পারে! ছি! এমন একটা লোককে বিয়ে করেছে ভাবতেও ঘৃণায় বুক ভেসে যাচ্ছে।

মিহিক এখন শ্রাবণদের বাড়ির বিশাল ছাদটার দোলনাতে বসে আছে। তার পরনে ডার্ক ব্লু রঙের একটা শাড়ি। শাড়িটা ব্রেকফাস্টের পর তার শাশুড়ি রুমে এসে দিয়ে গিয়েছিল। শুধু একটা শাড়ি না। ছয়টা শাড়ি এবং ছয়টা থ্রি পিস দিয়ে গেছে। এগুলো আগেই কিনে রেখেছিল তারা মিহিকের জন্য। শাড়ি-থ্রি পিস যখন যা ইচ্ছা হবে তখন তা পরতে বলেছে। মিহিকের মনে হয়েছে আজকে থ্রি পিসের থেকে শাড়ি পরলে ভালো হবে। তাই শাড়ি পরলো। শ্বশুর-শাশুড়ি হিসেবে যে লায়লা খানম এবং কবির সাহেব খুব ভালো সেটা মিহিক একটুতেই বুঝে গেছে। তারা দুজন যে সব সময় এমন ভালো শ্বশুর-শাশুড়ির পরিচয় দেবে এটা একেবারে নিশ্চিত। কিন্তু আসল সমস্যা হলো স্বামী। শ্রাবণের কর্ম কাণ্ডে মিহিকের ইচ্ছা করছে এখান খুব দূরে কোথাও চলে যেতে। কাল থেকেই এমনটা ইচ্ছা হচ্ছে তার। চলে তো যেতেই হবে। শ্রাবণের যে কর্ম কাণ্ড তাতে কি আর এখানে থাকা যাবে? এসব সহ্য করে থাকা তার পক্ষে দুষ্কর। শ্রাবণের সাথে সকাল থেকে একটা কথা হয়নি তার। শ্রাবণ একটা কথা বলেনি, আর সেও ফিরে তাকায়নি শ্রাবণের দিকে। ভালোই হয়েছে! শ্রাবণের সাথে কথা বললেই ঝগড়া লাগতে পারে তার।

রুফটপে কারো পদধ্বনির শব্দ শুনতে পেয়ে মিহিক সেদিকে দৃষ্টি দিলো। বিকেলের আলো মেখে শ্যামবর্ণের একটা ছেলে এগিয়ে আসছে তার দিকে। মিহিকের সব কিছুই বিতৃষ্ণা লাগছে। এই মুহূর্তে আষাঢ়ের আগমনও তার কাছে বিতৃষ্ণার কারণ ছাড়া আর কিছু হলো না। সে চোখ সরিয়ে নিয়ে বসে রইল। আষাঢ় এসে তার পাশে দূরত্ব রেখে দোলনায় বসে বললো,
“কেমন আছেন ভাবি সাহেবা?”

‘ভাবি সাহেবা’ ডাকটা মিহিকের কাছে বিষের মতন ঠেকলো। এই ছেলেটা তাকে সকালেও একবর ভাবি সাহেবা বলে ডেকেছে। ডাকটা এমন ছিল,
‘ব্রেকফাস্ট করেছেন ভাবি সাহেবা?’
বিরক্তিকর!

“তুমি আমার বড়ো ভাবি হলেও বয়সে আমার থেকে প্রায় এক বছরের ছোট। আমার কাউকে আবার আপনি করে সম্মোধন করার অভ্যাস নেই। আমার থেকে বয়সে ছোটদের তো নয়ই। তাই তোমাকেও তুমি করে বলছি। তুমি আবার মাইন্ড করো না!”

“মাইন্ড করিনি। তবে যেহেতু আমি সম্পর্কের দিক থেকে তোমার বড়ো, সেহেতু আপনি করে বললে বেশি খুশি হতাম।” গুরু গম্ভীর কণ্ঠে আষাঢ়ের কথার প্রত্যুত্তর করে মিহিক।

“ওহ স্যরি! ভাবির খুশিটা ধরে রাখতে পারলাম না।”

মিহিক বিরক্ত। বললো,
“তুমি কি কিছু বলবে?”

“বলবো বলেই তো এসেছি, তাই না? কিছু বলার না থাকলে কি আসতাম?”

আষাঢ়ের এমন প্যাঁচানো কথা শুনতে ধৈর্য হচ্ছে না মিহিকের, সে সরাসরি বললো,
“যা বলবে দ্রুত বলো। আমি বিরক্ত বোধ করছি।”

আষাঢ় স্পষ্টভাষী মিহিকের কথা শুনে হেসে বললো,
“এই তোমার মতো মেয়েদের আমার খুব ভালো লাগে। ওরা সবকিছু স্ট্রেইট বলে দেয়। আমি খুব পছন্দ করি মেয়েদের এই স্বভাব। তবে তোমার মেজো বোনটাকে মোটেই তোমার মতো লাগে না।”

“আমার বোনদের সম্পর্কে আমার খুব ভালো জ্ঞান আছে। তোমাকে নতুন করে কিছু বলতে হবে না।” কিছুটা রাগই হলো মিহিকের।

আষাঢ় আবারও হেসে বললো,
“তুমি সত্যিই মনোমুগ্ধকর একটা মেয়ে। তবে আমার ভাই’ও কিন্তু কম না। আমার ভাই হলো নম্র একটা মানুষ। কতটা ভালো সেটা বললে বুঝবে না। তার সাথে থাকতে থাকতে টের পাবে এটা। সে হলো অমায়িক, একজন উদারশীল ব্যক্তি! তার মনটা একেবারে তুলোর মতন নরম। ওই মনের যত গভীরে যাবে, ততোই কোমলতা দেখতে পাবে।”

আষাঢ়ের মুখে শ্রাবণের সম্পর্কে এরকম শুনতে মিহিকের পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। শ্রাবণের মতো খারাপ একটা মানুষকে তার কাছে প্রশংসায় ভাসানো হচ্ছে! মিহিকের বলতে ইচ্ছা করছে,
‘তোর ভাইকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। শালা বদের হাড্ডি! পৃথিবীতে খারাপ মানুষদের ভিড়ে তোর ভাইকে খুঁজলে সেরা দশের মধ্যেই সন্ধান পাবি নিশ্চিত।’
কিন্তু মিহিকের মনের কথা মনে রইল।

আষাঢ় বলে চললো,
“আর আমিও কিন্তু কম ভালো না। খুব নিষ্পাপ একটা ছেলে আমি। আমি বিদেশের মাটিতে বড়ো হলেও, দেশি কালচারে বেড়ে উঠেছি। আমেরিকাতে তো ছেলে-মেয়েদের একসাথে চলাচল কোনো ব্যাপারই না। তবে আমি মেয়েদের সংস্পর্শ একদম পছন্দ করি না। মেয়েদের সাথে ঘোরাঘুরি জাস্ট বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। এমনকি মেয়েদের সাথে হ্যান্ডশেক পর্যন্ত করি না আমি। আমার এই হাত যে কতটা পবিত্র সেটা তুমি বুঝবে না। আমি আর কী ভালো? আমার ভাই এর থেকে আরও বেশি ভালো। এক টুকরো সাদা কাগজের মতো নিষ্পাপ সে। আমার ভাইকে বিয়ে করে তুমি অনেক লাকি!”

মিহিকের কাছে আর সহ্য তুল্য হলো না। সে বিরক্তি ঝরিয়ে বলে উঠলো,
“তোমার আর তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে বায়োডাটা বলা কি হয়ে গেছে?”

“হয়নি। বললে তো আজকে রাতের ভিতরও শেষ করতে পারবো না। ঠিক আছে, তুমি যখন বোরিং ফিল করছো তখন আর না বলি কিছু।”

আষাঢ় বসা থেকে উঠে বললো,
“যাচ্ছি ভাবি সাহেবা।”

আষাঢ় হাঁটা দিলো। হঠাৎ করে একটা বিষয় মনে পড়াতে আবার দাঁড়ালো। পিছন ফিরে বললো,
“ওহ, আরেকটা কথা ভাবি সাহেবা। তোমরা কি আমেরিকাতে গিয়েছিলে কখনো?”

আষাঢ়ের এই প্রশ্ন মিহিককে অবাক করে দিলো।
“এটা কেন জানতে চাইছো?”

“যদি তুমি আমেরিকাতে থাকতে তাহলে তো টিউলিপ ফুলের পাশাপাশি তোমাকেও দেখতে পেতাম। কিন্তু তোমাকে তো কখনো দেখিনি আমি।”

মিহিকের ভ্রু কুঁচকে গিয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে গেল। সে কণ্ঠে ভারী বিস্ময় ধরে বললো,
“টিউলিপ ফুল, আমেরিকা কীসব বলছো তুমি?”

মিহিকের প্রশ্নের উত্তর দিলো না আষাঢ়, নিজের মতো করে বললো,
“ডোন্ট ও্যরি, সকল প্রশ্নের উত্তরই জেনে নেবো আমি। শুধু লাভলী বার্ডকে একবার ক্যাচ করে নিই। সবকিছুই জানবো আমি।”

আষাঢ় ঘুরে দাঁড়ালো। অনেক ভাবনাই তার এলোমেলো। সবচেয়ে ভাবনার বিষয় নোয়ানার ফ্যামিলি। নোয়ানার ফ্যামিলিতে থাকা ইদ্রিস খান, হাফিজা, মিহিক, তিন্নি এদের কাউকেই আমেরিকা দেখেনি কখনও। একবারের জন্যও না, এক সেকেন্ডের জন্যও না। একই এলাকায় থাকার সুবাদে অন্তত নোয়ানার বাবাকে তো একবার হলেও দেখা উচিত ছিল। নোয়ানাকে দেখতে পাওয়া গেলেও তাদের কেন দেখতে পায়নি? আর আগে কেন নোয়ানার মুখে অত গাঢ় বিষণ্ন, বিষাদের ছাপ দেখা যেত? নোয়ানার হাতের ওই ক্ষত…
আষাঢ়ের চোখে পুরোনো দিনের একটা ছবি ভেসে উঠছে।
আমেরিকার সামারের কোনো এক বিকেল বেলা। সে পনেরো বছরের এক কিশোর ছেলে তখন। উষ্ণতম দিন হওয়ার কারণে তেমন পুরু কিছু নেই পরনে। একটা টি-শার্ট আর জিন্স শুধু। তার শান্তময় দৃষ্টি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দশ বছর বয়সী এক ভীতু মেয়ের উপর। মেয়েটা তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার চেহারা ভীতগ্রস্ত। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভিতর যে মেয়েটার হৃদপিণ্ড লাফাচ্ছে ভয়ে সেটা না চাইতেও টের পাওয়া যায়। মেয়েটার একটা হাত আটক। একটা ব্যাগ দেখা যাচ্ছে হাতে। এই মাত্র গ্রোসারি শপ থেকে বের হয়ে সে বাড়ির উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল, কিন্তু মাঝ পথেই তাকে আটকে দিলো পনেরো বছর বয়সী চঞ্চল আষাঢ়। আষাঢ়ের চোখ মেয়েটার মুখ থেকে নেমে মেয়েটার বাম হাতের উপর নিবদ্ধ হলো। মেয়েটার হাতে ব্যান্ডেজ। আষাঢ়ের মন খচখচ করছে। তার মনে হচ্ছে এটা স্বাভাবিক কোনো এক্সিডেন্ট থেকে পাওয়া ক্ষত নয়। সে হঠাৎ মেয়েটার আহত হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নিলো। মেয়েটা শিউরে উঠলো আকস্মাৎ। চোখ তুলে তাকালো একবার। লাল দুটি আঁখি। ব্যান্ডেজ কব্জির ঠিক নিচে। আষাঢ় টানা টানা ইংলিশে মেয়েটিকে বললো,
“হেই, আঘাত পেয়েছো কীভাবে?”

মেয়েটা ভীতগ্রস্ত চোখ নামিয়ে ফেললো। চোখ জলে থলথল করে উঠলো। সে অশ্রু চেপে রেখে কাঁপা কাঁপা স্বরে আষাঢ়ের মতো ইংলিশে উত্তর দিলো,
“প…পড়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই আঘাত পেয়েছি।”
কথাটা বলেই মেয়েটা নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো। তারপর দ্রুত পা ফেলে হেঁটে যেতে লাগলো ওয়াকওয়ে ধরে। আষাঢ় পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললো,
“ইউ’আর লাইয়িং টিউলিপ! আমি জানি তুমি পড়ে গিয়ে আঘাত পাওনি। কীভাবে আঘাত পেয়েছো বলো আমাকে। কেউ তোমাকে মেরেছে?”

মেয়েটির কোনো হেরফের হলো না। সে দ্রুতগামী পা ফেলে চলে গেল।
আষাঢ়ের চোখ থেকে পুরোনো স্মৃতিটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে উঠলো। বেরিয়ে এলো সে অতীতের খোলস ছেড়ে। মেয়েটার হাতে সেই ক্ষতর চিহ্ন এখনও খুব ভালো করে ফুঁটে আছে। সে দেখেছে সেই দাগ স্পষ্ট। আষাঢ়ের এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো মেয়েটার হাতের ওই ক্ষত মেয়েটা নিজেই সৃষ্টি করেনি তো? #বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ১২
_____________

দু’দিন পর মিহিক এবং শ্রাবণকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মিহিকের বাবা এলেন। মিহিকের যাওয়ার মন নেই। যে বাড়ির লোকেরা তাকে বুঝলো না সে বাড়িতে পা রাখতে ইচ্ছা করছে না তার। সে শাশুড়িকে বললো,
“আম্মু, পাশাপাশিই তো বাড়ি। না গেলে হয় না?”

লায়লা খানম বললেন,
“না মা, না গেলে হয় না। একটা নিয়ম আছে না? কয়েক দিন থেকে তারপর আবার আসবে।”

মিহিক আর বলার কিছু পেল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল ক্ষুণ্ন মন নিয়ে।
লায়লা খানম মিহিকের ব্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছেন। বউমার জন্য এ কদিনে অনেক পোশাক-আশাক কিনে সে জড়ো করেছে। তার ভিতর থেকে সবচেয়ে সুন্দরগুলো সে প্যাকিং করে দিচ্ছে। বার কয়েক সে মিহিককে দেখলেন। বুঝতে পারছেন তিনি মেয়েটার অবস্থা। মেয়েটা সব কিছুর সাথে এডজাস্ট করে নিতে পারছে না। মুখের উপর কেমন একটা অসুখী ভাব। তবে ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে তার আশা। ছেলেটা তো তার। তিনি জানেন তার ছেলে ঠিক কেমন। শ্রাবণের সাথে থেকে মিহিক নিজেকে একদিন ভাগ্যবতী মনে করবে। লায়লা খানম হঠাৎ নিজের কাজ রেখে মিহিকের হাত দুটি আলতো করে ধরে বললেন,
“আমার ছেলেটা ভালো মিহিক। ওর মাথা থেকে একবার রুমকি চলে গেলেই বুঝতে পারবে ও কতটা ভালো। তুমি আমার ছেলেটার মাথা থেকে রুমকির ভূত তাড়াতে সাহায্য করো মা।”

শাশুড়ির আকস্মাৎ এই কাণ্ডে মিহিক হতবিহ্বল হয়ে গেল। স্তব্ধ আঁখিতে কীয়ৎক্ষণ শাশুড়ির মুখপানে চেয়ে রইল। তার আবারও মনে হলো, এই বিয়েটা একটা চরম ভুল তার জীবনে!

_______________

মিহিকের বাড়ি থেকে লোক আসবে শুনে আষাঢ় খুব খুশি খুশি মুডে ছিল। কিন্তু তার আনন্দে ভাঁটা পড়লো, যখন দেখলো নোয়ানা আসেনি। ইদ্রিস খান এবং তিন্নি এসেছে শুধু। আষাঢ় নোয়ানার না আসার কারণটা তিন্নিকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারলো, নোয়ানা অসুস্থ বোধ করছিল সেজন্য আসেনি। আষাঢ় ভালো করেই বুঝতে পেরেছে নোয়ানার ওসব অসুস্থ বোধ কিছু না। নোয়ানা আসলে তার কাছাকাছি আসতে চাইছে না। কিন্তু না এসে থাকবে কতদিন?

মিহিক আর শ্রাবণকে নিয়ে ইদ্রিস খান বিকেলে চলে গেলেন। সাথে জুনও গিয়েছে। আষাঢ় আর কারিবের যাওয়ার কথা উঠলে আষাঢ় বললো, সে এবং কারিব আগামী কাল দুপুরে তাদের ওখানে গিয়ে খেয়ে আসবে।

শ্রাবণ মিহিকদের বাড়িতে গিয়ে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, কিছুক্ষণ পরই আবার বাড়ি চলে এলো। একেবারে পাশাপাশি বাড়ি। আসা যাওয়া কোনো ব্যাপার না। লায়লা খানম ছেলেকে বাড়ি দেখে বললেন,
“এ কি! তুমি এখানে কেন?”

“ও বাড়িতে থাকতে ভালো লাগছিল না আম্মু। অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই চলে এলাম।”

“বলছো কী তুমি? ভালো লাগছিল না মানে? তাই বলে চলে আসবে? যাও, এক্ষুণি ফেরত যাও।”

“প্লিজ আম্মু! এরকম করো না। বাড়িতে কিছুক্ষণ থাকি। তারপর না হয় আবার যাব।”

রুপালিও উপস্থিত আছে এখানে। সে মুখ বুজে থাকলো না। বললো,
“ওই বাড়িতে গেছো এক ঘণ্টাও হয় নাই, এর মাঝেই চলে আসছো? ভাগ্যিস স্যার এখন বাড়িতে নাই, বাড়িতে থাকলে খুব রাগারাগি করতেন। তুমি এখনই ওই বাড়িতে ফেরত যাও। জামাই মানুষ এত ঘোরাঘুরি করা ঠিক না। মানুষ খারাপ ভাববো। যাও, ফেরত যাও।”

শ্রাবণের আর বাড়িতে থাকার সৌভাগ্য হলো না। লায়লা খানম আর রুপালি মিলে নানান কথা বলে আবার ফেরত পাঠিয়ে দিলো তাকে। শ্বশুর বাড়িতে এসে প্রথমে দেখা হলো মিহিকের সাথে। দরজা অতিক্রম করে রুমে ঢুকতেই মিহিক প্রশ্ন করলো,
“কোথায় গিয়েছিলেন?”

“বাড়িতে।”

“বাড়িতেই যখন গিয়েছিলেন তখন আবার ফেরত এলেন কেন? ওখানেই থাকতেন। এখানে আসার আবার কী দরকার ছিল?” রুক্ষ-তিক্ত কণ্ঠ মিহিকের।

শ্রাবণের যা শুনতে ভালো লাগলো না। সে বললো,
“আপনি আমার সাথে এরকম করে কথা বলেন কেন?”

“তাহলে কেমন করে কথা বলবো আমি তোর সাথে?”

শ্রাবণের রুহু কেঁপে উঠলো। ওষ্ঠদ্বয় নিজ শক্তিতে আলাদা হয়ে যায়। কণ্ঠে অবিশ্বাস ধরে বললো,
“আপনি তুই-তোকারি করছেন?”

“হ্যাঁ করছি, কী করবি তুই?”

“আপনি দেখছি অন্য সব বউদের মতো করছেন। বাবার বাড়িতে এসে আপনার পাওয়ার বেড়ে গেল?”

“আমার পাওয়ার সম্পর্কে তোর কোনো ধারণা নেই, ধারণা দিতেও চাই না। আজ দিনের ভিতর যদি একবারও দেখেছি রুমকির সাথে ফোনে কথা বলছিস, তাহলে একেবারে শ্বশুর আব্বুর কাছে বলে দেবো।”

“আপনি হঠাৎ ডাকাতদের মতো বিহেভ করছেন কেন? আপনার কি জ্বর এসেছে? দেখি…”

শ্রাবণ মিহিকের কপালে হাত দিয়ে জ্বর পর্যবেক্ষণ করতে চাইলে, মিহিক পিছিয়ে গিয়ে বললো,
“খবরদার! আমাকে স্পর্শ করবেন না। রুমকি আপনার সব না? ওর কপালে হাত রেখেই জ্বর এসেছে কি না চেক করুন।”

মিহিক আর দাঁড়ালো না, লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
শ্রাবণ স্তব্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ করে কী হলো মিহিকের? দজ্জাল মেয়ে একটা! রুমকিকে হিংসা করছে?

_______________

রাতে আবারও শ্রাবণ বাড়ি এলো। লিভিং রুমে লায়লা খানম, রুপালি, কারিব, আষাঢ় সবাই মিলে গল্প-গুজব করছিল। এমন সময়ে শ্রাবণকে দেখে সবাই অবাক হলো। কারিব বললো,
“শ্রাবণ ভাই, আপনি এসময় এখানে কেন?”

দিনের বেলা মিহিকদের বাড়িতে থাকা সম্ভব হলেও, রাত্রি ক্ষণে ওখানে থাকা সম্ভব হলো না শ্রাবণের পক্ষে। কিছুতেই থাকতে পারবে না সে ওখানে মিহিকের সাথে। মিহিক যে খারাপ ব্যবহার করলো আজ, এছাড়াও তাদের যে রুমে থাকতে দেওয়া হয়েছে সেখানে এক্সট্রা কিছু আছে বলে মনে হয় না। রুমে আছে একটা ছোট ওয়ার্ডোব, একটা আলনা, দুটো আর্ম চেয়ার, একটা র‍্যাক, একটা খাট। খাটের উপর বিছানা। এক্সট্রা তোষক বা চাদর থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। একটা মানুষ বিছানায় ঘুমালে আরেকটা মানুষ ঘুমাবে কোথায়? তাই চলে আসাটাই সঠিক মনে হলো। বাড়িতে এসে কী বলবে সেটা আসতে আসতেই ঠিক করে রেখেছে। তাই সহজেই উত্তর দিতে পারলো।

“আসলে ও বাড়িতে খুব গরম। গরম আমি সহ্য করতে পারি না। তাই চলে আসতে বাধ্য হলাম।”

লায়লার হৃদপিণ্ড ভয়ে ধকধক করছে। কবির সাহেব বাড়িতে আছেন এখন। লাইব্রেরি রুমে কী যেন কাজ করছেন। সে যদি টের পায় শ্রাবণ রাতের বেলা শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে এখানে এসেছে তাহলে বড্ড রেগে যাবেন। লায়লা খানম ছেলেকে বললেন,
“ও বাড়িতে গরম এসেছে কোত্থেকে? ও বাড়িতে কি ফ্যান নেই?”

“ফ্যান আছে, তবে এসি নেই। আর যে ফ্যান আছে তাতে খুব কম বাতাস হয়। গায়ে লাগার মতো নয় সে বাতাস। আমার পক্ষে এত গরম সহ্য করে থাকা সম্ভব নয়। আজকে রাতে আমি এখানেই থাকবো।”

শ্রাবণের বানোয়াট কথা সবাই-ই ধরতে পারলো। আষাঢ় বলে উঠলো,
“তুমি তোমার বউকে বাবার বাড়িতে ফেলে রেখে এখানে থাকবে? এটা কেমন ধরণের আচরণ ব্রো?”

আষাঢ়ের কথার পরপর লায়লা খানম বললেন,
“তুমি কি তোমার আব্বুর হাতে আবার থাপ্পড় খেতে চাও শ্রাবণ? কোন আক্কেলে এখন তুমি এখানে থাকতে এসেছো? তোমার শ্বশুর বাড়ির লোকদের কি জানিয়ে এসেছো এসব?”

“না, তাদের কিছু জানাইনি।”

লায়লা খানম স্বস্তি পেলেন। বললেন,
“তোমার আব্বু কিছু টের পাওয়ার আগে ওখানে ব্যাক করো। নয়তো এর ফল ভালো হবে না। মিহিককে আমি খুব আহ্লাদ করে আমার বাড়িতে বউ করে এনেছি, তুমি তার মান রাখছো না। মেয়েটাকে কষ্ট দিলে তুমি নিজের কষ্টও হিসাব করে উঠতে পারবে না। শ্বশুর বাড়িতে ফেরত যাও। এসব কর্ম কাণ্ড বন্ধ করো। রুমকিকে ঝেড়ে ফেলে দাও। আমার ছেলে বিয়ের পর এমন করবে এটা আমার আশা যোগ্য ছিল না। মনে হচ্ছে মিহিকের জীবনটাই নষ্ট করে দিলাম!”

লায়লার চোখে পানি দেখা গেল।
মায়ের চোখে পানি দেখে শ্রাবণের ভিতরটা অপরাধে অভিযুক্ত হলো। সে কিছুক্ষণ নীরব দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ বললো,
“শ্বশুর বাড়িতে ব্যাক করছি আমি। মিহিককে রেখে এখানে আসা উচিত হয়নি আমার।”

কথাটা বলেই শ্রাবণ চলে গেল।

আষাঢ় ভাইয়ের কাণ্ড দেখে হেসে ফেললো। কারিবের হাতে থাকা প্লেট থেকে একটা পাকোড়া উঠিয়ে সেটাতে কামড় বসিয়ে বললো,
“কিছু বুঝলে কারিব?”

কারিব পাশ ফিরে আষাঢ়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“কী বুঝবো?”

“আমার ভাই বড়ো-সড়ো প্রেমে ডুববে। রুমকির জন্য ওরকম প্রেমে না, সত্যিকারের গভীর প্রেমে ডুববে।”

রুপালি আষাঢ়ের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো। ক’দিন ধরে সে আষাঢ় আর কারিবের উপর খুব ভালো করে নজর রাখছে। আষাঢ় আর কারিব চুপিচুপি কী করে বেড়ায় এসব জানার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। আষাঢ় এবং কারিব দুজনই খুব চতুর!

______________

শ্রাবণ শ্বশুর বাড়িতে ব্যাক করে লিভিং রুমে একই সাথে তিন বোনকে বসা দেখলো। তারা নিজেদের মাঝে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল। শ্রাবণের আগমন তাদের থামিয়ে দিলো। নোয়ানা জিজ্ঞেস করলো,
“কোথায় গিয়েছিলেন ভাইয়া?”

শ্রাবণ হাসার চেষ্টা করলো। এখানে তিন বোনের সাথে তার বসা ঠিক হবে কি না ভাবলো। বসলো সে। বললো,
“বাইরে গিয়েছিলাম একটু।”
বলতে বলতে তার চোখ গেল একবার মিহিকের উপর। মিহিকের মুখে রাগের লেপন লক্ষ্য করলো সে। যখন লিভিং রুমে এসে প্রথম পা রেখেছিল তখন রাগের কোনো চিহ্ন ছিল না মেয়েটার মুখে। হাসছিল মেয়েটা। মিথ্যা বলবে না, মেয়েটার হাসি মুখ তার ভালো লেগেছিল। কিন্তু সে আসাতে মেয়েটার মুখ এখন কেমন গম্ভীর, রাগী দেখাচ্ছে। শ্রাবণ মিহিকের এই মুখের সামনে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারবে না। সে নিজের শালিকাদের উদ্দেশ্যে বললো,
“ঠিক আছে, তোমরা বোনেরা মিলে গল্প করো। আমি একটু ক্লান্ত বোধ করছি। রুমে গিয়ে রেস্ট নিচ্ছি আমি। আর জুনকে দেখছি না যে, জুন কোথায়?”

তিন্নি বললো,
“জুন রুমে শুয়ে আছে।”

শ্রাবণ কথা বাড়ালো না, উঠে দাঁড়ালো। শেষবার একবার মিহিকের দিকে তাকিয়ে সোজা চলে গেল। সে চলে যেতেই মিহিক বোনদের উদ্দেশ্যে বললো,
“ওনার বাইরেটা দেখে ভিতরটা কেমন সেটা যাচাই করতে পারবি না। ওনার বাইরেটা মিঠা হলেও, ভিতরটা লবণ তিক্ত শরবত। লবণ তিক্ত শরবত কেউ মুখে তুলতে পারে না, আমিও পারছি না।”

নোয়ানা বোনকে একটু একটু বুঝতে পারছে। মিহিক কিছুই খোলাসা করে বলেনি তাদের, বললে হয়তো পুরোটাই বুঝতে পারতো। যা বুঝেছে তার দরুণ হিসেবে বললো,
“আশা করছি শ্রাবণ ভাইয়া খুব ভালো একজন স্বামী হয়ে দেখাবে তোমাকে।”

মিহিক শ্লেষের সাথে হেসে উঠলো।
“সে আর ভালো স্বামী! হুহ! বাদ দিয়ে রাখ।”

নোয়ানা আর তিন্নি বোনের কষ্টটা উপলব্ধি করতে পারছে। তারা মিহিকের দিকে তাকিয়ে রইল। আর মিহিক অন্যদিকে।
টি টেবিলের উপর থাকা নোয়ানার মোবাইলটা টিং করে বেজে উঠে জানান দিলো ম্যাসেজ এসেছে। আর কারো মনোযোগ সেদিকে না পড়লেও নোয়ানার মনোযোগ মোবাইলে গিয়েই আটকালো। সে মোবাইল তুলে নিলো হাতে। আষাঢ় ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। এই প্রথম ম্যাসেজ পাঠালো।

‘আজকে তুমি এলে না কেন? দুঃখ পেয়েছি তো। দুঃখ কাটানোর জন্য তাই কাল নিজেই চলে আসছি তোমাদের বাড়ি। খুব সুন্দর করে সেজে থেকো, ও কে?’

এর পরই আবার একটা ম্যাসেজ এলো,
‘আচ্ছা, তোমাদের ব্যালকনিতে লাইট নেই কেন? একটা লাইট লাগাতে পারো না? দ্রুত একটা লাইট লাগিয়ে নিয়ো ব্যালকনিতে। নয়তো নিজেই লাইট লাগানোর ব্যবস্থা করবো।’

শেষের ম্যাসেজটা দেখে নোয়ানার ভ্রু কুঁচকে গেল। মোবাইলটা দ্রুত অফ করে আবার রেখে দিলো টেবিলের উপর। ভাবনা চলতে লাগলো মনে।

__________________

রাতে কে কোথায় ঘুমাবে এ নিয়ে গভীর ভাবনা চলছিল শ্রাবণের মনে। এখন ঘুমানোর সময়। ডিনার শেষ করেছে প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। এই এক ঘণ্টা ধরে সে একলা রুমে। মিহিক এখনও নিজের বোনদের সাথে বোনদের রুমে আছে। শ্রাবণ রুমটার উপর চোখ বুলাচ্ছে। দুটো আর্ম চেয়ারের বদলে একটা সোফা থাকলে কী ক্ষতি হতো?
যদিও সোফাতে ঘুমানো অসম্ভব শ্রাবণের কাছে। সোফায় ঘুমালে রাতে এক কাত থেকে আরেক কাতে ফিরলে পড়েও যেতে পারে। সেজন্য সোফাতে ঘুমানোর দুঃসাহস কখনও দেখায়নি সে। অবশ্য দেখানোর প্রয়োজনও পড়েনি। কিন্তু আজ এমন একটা দুঃসময়ে সে সোফার কথা ভাবতেও ভুললো না। দুজনের একজনকে এখন এই আর্ম চেয়ারে বসে রাত্রি যাপন করতে হবে। কিন্তু কে করবে এই কাজ? সে? না কি মিহিক? শ্রাবণের মনে ভয় হলো। তার মন বললো, মিহিক তাকেই আর্ম চেয়ারে ঘুমাতে বলবে। অসম্ভব! এটা কিছুতেই পারবে না সে। না তো সারারাত এই আর্ম চেয়ারে বসে বসে ঘুমাতে পারবে, আর না তো মিহিকের পাশে এক বিছানায় শুতে পারবে। মিহিকের পাশে এক বিছানায় ঘুমানোর কথা দুঃস্বপ্নেও ভাববে না সে, তাতে যদি সারারাত দাঁড়িয়েও কাটাতে হয়, তাও শান্তি।

শ্রাবণের শেষ ভাবনার সাথে সাথে রুমের দরজাটা খুলে গেল। তার চোখ চলে গেল দরজার দিকে। দরজায় মিহিককে দেখতে পাওয়া গেল। মিহিক ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো। শ্রাবণ মিহিককে আগে প্রশ্ন করে দেখলো,
“আচ্ছা, আমরা কে কোথায় ঘুমাবো?”

“বিছানায় ঘুমাবেন, আর কোথায় ঘুমাতে চান?”

“আর আপনি?”

“চেয়ারে ঘুমাবো।”

মিহিকের কথা শুনে খুশি হওয়ার কথা ছিল শ্রাবণের। কিন্তু সে খুশি হতে পারলো না। মিহিককেও তার চেয়ারে ঘুমাতে দিতে ইচ্ছা করছে না। একটা মেয়ে সারারাত বসে বসে পার করবে আর সে শুয়ে থাকবে? না এটা বড্ড বেমানান দেখায়।

“আপনি বিছানায় ঘুমান, আমি চেয়ারে বসে দেখি ঘুমানোর চেষ্টা করা যায় কি না।” শ্রাবণ নিজের প্রতি নিজে অবাক। এটা কী বললো সে? সে বললো? না কি তার অপরাধী মন বললো?

মিহিক বিরক্ত হলো না খুশি হলো বোঝা গেল না। তার মুখটা কাঠিন্য। বললো,
“আমি আপনার বউ না, আমার প্রতি আলগা দরদ দেখাবেন না। ওসব দেখাতে হলে রুমকির কাছে যান।”

“রুমকিকে টানেন কেন বার বার? আমাকে যা বলার বলুন, ওকে টানবেন না দয়া করে। আর আপনি আমার বউ না তো কী? তিনবার কবুল বলে আমাকে বিয়ে করেছেন আপনি।”

মিহিকের বেজায় রাগ হলো।
“দেখুন, আমি আপনার সাথে ঝগড়া করতে চাইছি না।”

“সে আমিও চাইছি না।”

মিহিকের রাগের তীব্রতা বেড়ে গেল। গটগট করে জানালার দিকে হেঁটে গেল সে।

শ্রাবণ পিছন থেকে অস্ফুট স্বরে বললো,
“দজ্জাল মেয়ে!”

মিহিকের কানে কিঞ্চিৎ সাউন্ড এসে লাগলো। শ্রাবণ কী বলেছে ঠিক বুঝলো না। পিছন ফিরে গম্ভীর স্বরে বললো,
“কী বললেন আপনি?”

“আপনার আম্মু তো খুব ভালো মানুষ, আপনি তার মেয়ে হয়ে এমন হলেন কেন?”

“হোয়াট ডু ইউ মিন? কেমন হয়েছি আমি?” জ্বলে উঠলো মিহিক।

শ্রাবণ উত্তর দিলো না। বললো,
“একটু ভালো আচরণ করুন।”

মিহিক কটমট করে বললো,
“লবণ তিক্ত শরবত!”

“কী বললেন? কীসের শরবত?”

“দশ চামচ লবণ দিয়ে শরবত গুলে খাওয়াবো আপনাকে।”

শ্রাবণের অন্তর কেঁপে উঠলো। কী সাংঘাতিক কথা! সে এটা নিয়ে আর একটাও টু শব্দ করলো না। মাথা নিচু করে গম্ভীর মুখ নিয়ে বসে রইল। এ সময় তার নজরে পড়লো বিছানার উপর একটা কাঁথা রাখা আছে। এটা তো আগে একদম খেয়াল করেনি। সে চকচকে মুখ নিয়ে মিহিকের দিকে তাকালো।

“আপনাকে চেয়ারে বসে বসে রাত কাটাতে হবে কেন? এই তো একটা কাঁথা আছে। এটা নিচে বিছিয়ে শুয়ে পড়ুন। চেয়ারে বসে রাত্রি যাপনের চেয়ে এটা বেটার অপশন।”

শ্রাবণের কথা শুনে মিহিকের মুখ অগ্নিমূর্তি ধারণ করলো। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে এলো শ্রাবণের দিকে। বিছানা থেকে ভাঁজ করা কাঁথাটা উঠিয়ে, সেটাকে মেলে দিয়ে দিলো শ্রাবণের মাথায়।

(চলবে)

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here