বিবর্ণ জলধর পর্ব -২৫+২৬

0
43

#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ২৫
_____________

আকাশে কালো মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি হবে আজ। সিনথিয়া নির্নিমেষ তাকিয়ে রাতের আকাশে তারা খুঁজে যাচ্ছে। হাওয়ার বেগ কিছুটা টালমাটাল। বাতাসে তার চুলগুলো মৃদু হেলে উঠছে। আজ তার মা-বাবা ইন্ডিয়া ব্যাক করেছে। সে যাবে আরও পরে। অন্তত এক মাসের আগে যাচ্ছে না। আষাঢ়ের মন জয় করার প্রকট তিয়াস তার অন্তঃপানে। আষাঢ় কোন কারণে তার মনের এত গভীরে এসে গেছে জানে না সে। আষাঢ়ের মনোগভীরতায় আদৌ সে পৌঁছতে পারবে কি না সে বিষয়ে শঙ্কিত সে। সিনথি ছাদের কর্ণারে দৃষ্টি নিলো। ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখাপাত ঘটলো। আষাঢ় দাঁড়িয়ে আছে তার চক্ষু দৃশ্যপটে। কোন এক গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছে। স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ডদের প্রতি ইদানিং কাল আষাঢ়ের আগ্রহ উঠে গেছে। স্থগিত হয়েছে তার স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ডের পালাক্রম। যার সাথে কথা বলছে সে স্থায়ী গার্লফ্রেন্ডদের একজন।
সিনথি মেয়েটার নাম মনে করার চেষ্টা করলো। কী নাম বলেছিল আষাঢ়? সু…হ্যাঁ, সুরাইয়া। ইরানি মেয়ে। আমেরিকার সিটিজেনশিপ।

সিনথি এখন ছাদে আছে আষাঢ়ের আহ্বানে। আষাঢ় নিজের সাথে ছাদে আসার আহ্বান জানিয়েছিল তাকে। এলো তো সাথে, কিন্তু তার হবু বর আসার পর ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজের গার্লফ্রেন্ড নিয়ে। কথা বলার পালা কবে শেষ হবে তা সে-ই ভালো জানে।
সিনথি আষাঢ়ের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ছাদ থেকে পাশের ছোট্ট বাড়িটা দেখা যায়। কৃত্রিম আলো জ্বলছে। সিনথির ভাবনা জুড়ে বিস্তর ঘটালো নোয়ানা। নোয়ানা মেয়েটা তার প্রতিদ্বন্দ্বী। মেয়েটার প্রতি তার রাগ, হিংসা-বিদ্বেষ হওয়া উচিত। কিন্তু সে মেয়েটার প্রতি এ সকল মনোভাব উপলব্ধি করছে না। ব্যাপারটা কিঞ্চিৎ আজব। আর চিরন্তন আজব পরিচয়ই বহনকৃত থাকবে বোধহয়। মেয়েটার প্রতি তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনোভাব গড়ে উঠবে না।
পাশে আষাঢ়ের উপস্থিতি টের পেয়ে পাশ ফিরলো সিনথি। আর তখনই আষাঢ়ের থেকে প্রশ্নটি পেল,
“কী দেখছো আমার ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি এবং আমার শ্বশুর বাড়ির দিকে তাকিয়ে?”

“তোমার শ্বশুর বাড়ি? হাসালে আমায়। কী দেখবো আর? বাইনোকুলার দিয়ে যা দেখার তা তো তুমি দেখো।”

“কোনো ছেলেকে দেখার প্রয়োজনে তোমার বাইনোকুলার লাগলে বলো, আমি কারিবকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবো ইন্ডিয়ায়। এটা আমি ফ্রি সার্ভিস দেবো আমার হবু বউকে।”

“তোমার ভিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই হবু বর। অনেক ছেলে আছে যাদের বললে দুইশ-তিনশ বাইনোকুলারে আমার ঘর ভরে যাবে।”

আষাঢ়ের ঠোঁটে তটস্থ হাসি। ডান হাত বাড়িয়ে হাত বুলিয়ে দিলো সিনথির মাথায়। নরম কণ্ঠে শুধালো,
“আমার হবু বউয়ের কণ্ঠে এমন ভারী ভারী কথা বড্ড মানায়। সব সময় এমন ভারী ভারী কথা বলবে।”

সিনথির মুখে তাচ্ছিল্য হাসি,
“সব সময় এরকম কথা বললে হজম করতে পারবে?”

আষাঢ়ের মুখ থেকে হাসি সরে গোমড়ামুখো হলো। সিনথির মাথা থেকে হাত সরিয়ে অদূরে দৃষ্টি রেখে বললো,
“হজম করতে কষ্ট হলে তাও কষ্ট করে গিলে নেবো।”

সিনথির চোখে-মুখে অদ্ভুত ভাবমূর্তির চিত্রাঙ্কন। এ ভাবমূর্তির ভাষা শুধু সে নিজে পড়তে সক্ষম। হঠাৎই এক হাত দিয়ে আষাঢ়ের অন্যদিকে দৃষ্টি রাখা মুখটা নিজের দিকে ঘুরালো। তাৎক্ষণিক এক চমকিত প্রতিবিম্ব ফুঁটে উঠলো আষাঢ়ের চেহারায়। সিনথির ঘনপল্লব ঘেরা চোখ জোড়া আষাঢ়ের গোটা চেহারায় পর্যবেক্ষণ দৃষ্টি চালিয়ে বললো,
“তুমি খুব সুন্দর আষাঢ়।”

সিনথির এহেন কাজকর্মে আষাঢ় খানিক বিচলিত। সিনথির হাত সরিয়ে দিয়ে বললো,
“জীবনে অনেক বার এই কথা শুনেছি মেয়েদের থেকে, নতুন কিছু থাকলে বলো।”

সিনথি সঙ্গে সঙ্গে রোবটের মতো বলে উঠলো,
“তুমি একটা আহাম্মক! একটা গাধা! কী দরকার ছিল প্রথম যেদিন এসেছিলাম সেদিন ওরকম করে মিষ্টি সুরে সালাম দেওয়ার? কী দরকার ছিল পরেরদিন সকাল বেলা রুমে গিয়ে গুড মর্নিং জানানোর এবং ওইসব কথা বলার? শোনো, আমি যে তোমার প্রতি লাভ ফিল করছি এর জন্য আমি দায়ী নই, তুমি দায়ী। দায়ভার মাথা পেতে নাও সসম্মানে।”

সিনথি আষাঢ়ের স্তব্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো ক্ষণকাল। তারপর মুখে ফুঁটালো এক নিভৃত মিটি হাসি। আষাঢ়ের গালে আলতো হাতের পরশ বুলিয়ে দিয়ে বললো,
“তুমি আসলেই খুব সুন্দর আষাঢ়। নোয়ানা তোমার সাথে এরকম ব্যবহার করে ভুল করছে।”

বলে আরও ক্ষণকাল তাকিয়ে থাকলো। তারপর শেষ সময়ে প্রসন্ন হাসি ফুঁটিয়ে চলে গেল।
আষাঢ় তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে ঘোর সম্বলিত কণ্ঠে বলে উঠলো,
“সাইকো লেডি!”
বলে ভারী একটা শ্বাস ফেলে রেলিংয়ের দিকে ঘুরলো। বিড়বিড় করতে লাগলো,
“আহাম্মক? গাধা? সে কী পেয়েছে? আমাকে কী মনে করে? আমি আহাম্মক, গাধা? উহ, অসহ্যকর!”
গালে সিনথির ছুঁয়ে যাওয়া স্থানে হাত রেখে বললো,
“আসলেই পাগল সে।”
কিছু সময় কাটলো ছাদে। ঘড়ির কাটা গিয়ে এগারোটা পঁচিশের ঘরে হানা দিলো। এবার ফেরার পালা।
কয়েক ধাপ সিঁড়ি অতিক্রম করে নামার পরে অবাক হলো আষাঢ়। সিনথি সিঁড়ির একটা ধাপে বসে আছে জড়োসড়ো হয়ে। ডান হাত দিয়ে বাম পায়ের গোড়ালি চেপে আছে।

“তুমি নিচে না গিয়ে এখানে বসে আছো কেন?”

সিনথি রাগী চক্ষু নিক্ষেপ করে বললো,
“তুমি কি অভিশাপ দিয়েছো আমায়?”

“অভিশাপ?”
ভ্রুকুটি হলো আষাঢ়ের।

“দিয়েছো বোধহয়। তা না হলে কেন হঠাৎ সিঁড়ি থেকে নামতে গিয়ে আমার পা মচকে যাবে? কেন আহত হবো আমি? দেখো, উঠে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছি না।”

আষাঢ় কণ্ঠে বিরক্ত ঝরালো,
“এই শোনো, রাত এখন সাড়ে এগারোটা বাজে, ড্রামা বন্ধ করে ঘুমাও গিয়ে।”

“তোমার মনে হয় আমি ড্রামা করছি? সত্যি সত্যি আহত আমি। দাঁড়ানোর শক্তি নেই আমার।”

“ঠিক আছে, দাঁড়ানোর শক্তি না থাকলে এখানে বসে থেকে রাত পার করো।”
আষাঢ় পাশ কাটিয়ে যাওয়া দিলে সিনথি ভরাট কণ্ঠে বলে উঠলো,
“কেমন মানুষ তুমি? একটা মেয়েকে এখানে ফেলে রেখে চলে যাবে? নিষ্ঠুর!”

আষাঢ় সিনথির দিকে ফিরে বললো,
“তাহলে কী করবো আমি?”

সিনথির চোখ নত হয়ে এলো। লজ্জামাখা মুখখানি দারুণ সৌন্দর্যে মহিমান্বিত হলো। গলার স্বর মিষ্টি করে বললো,
“কোলে তুলে নাও।”

আষাঢ় ঘোর বিরোধিতা করে বললো,
“অসম্ভব! তোমাকে দেখতেই মনে হচ্ছে তুমি অনেক ভারী। একটা শুকনো-পাতলা ছেলে আমি। তোমার মতো ভারী একটা মেয়েকে কোলে তোলার মতো শক্তি আমার নেই।”

সিনথি চোখ তুলে তাকিয়ে বললো,
“একটা মেয়েকে কোলে তোলার শক্তি নেই তোমার? কেমন পুরুষ মানুষ তুমি?”

আষাঢ় হাসলো। অধরের বাম কোণে গিয়ে হাসির রেখাটা ঠিকরে উঠলো। বললো,
“আমি এমনই পুরুষ মানুষ।”

কথাটা বলে এগিয়ে এলো আষাঢ়। দুই হাত দিয়ে পাঁজাকোলে তুলে নিলো সিনথিকে।
সিনথি একটু ঘাবড়ে গেল। ধারণা ছিল না আষাঢ় তাকে কোলে তুলে নেবে। ঘাবড়ানো ভাব কেটে গেলে হাসলো সে। বললো,
“দায়িত্বশীল ছেলে তুমি। তোমাকে স্বামী হিসেবে পেলে ধন্য হতাম।”

আষাঢ় শুধু তুচ্ছ হাসলো। সিঁড়ি পার হয়ে নামতে লাগলো। সিনথি মুগ্ধতা নিয়ে আষাঢ়ের দিকে তাকিয়ে রইল এক ধ্যানে। আষাঢ় অবশ্য সিনথির দিকে তাকিয়ে নেই। তাকানো না থাকলেও বুঝলো সিনথি তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাই বললো,
“এভাবে তাকিয়ে থেকো না। তোমাদের মেয়েদের চোখ বড্ড খারাপ। নজর লাগলে সৌন্দর্য থাকবে না আর আমার।”

সিনথি হেসে বললো,
“চোখ দিয়ে ঝলসে দেবো তোমায়।”

আষাঢ় তাকালো সিনথির দিকে। বিরক্তি নিয়ে বললো,
“তোমাকে বিয়ে করবো না আমি।”

“তোমাকে করতে হবে না, আমি করবো। আমি বিয়ে করবো তোমাকে।”

আষাঢ় তাকিয়ে থাকতে পারলো না সিনথির দিকে। বিরক্তি ঝাপটে ধরলো। চোখ সরিয়ে নিলো সে। চলতে চলতে হঠাৎ বললো,
“তুমি এখন আমার কব্জায় আছো, ফেলে দেবো এখানে?”

আষাঢ়ের ধারণা ছিল মেয়েটা একটু ভয় পাবে, কিন্তু মেয়েটা হাসলো। বললো,
“দাও ফেলে।”

“ফেলে দিলে ব্যথা পাবে, হাড় ভাঙবে।”

“ভাঙুক, পরোয়া করি না। তোমার কাছ থেকে একটু-আধটু আঘাত প্রাপ্ত হলে মেনে নেবো আমি।”

আষাঢ় মেয়েটার কথাবার্তা শুনে বিস্মিত। মেয়েটা কিছুতেই দমে না। সে সহাস্যে বললো,
“থাক, সুন্দরী একটা মেয়ে এখানে পড়ে ব্যথা পাবে, সেটা মানতে আমার হৃদয়ে ব্যথা হবে। মাফ করলাম এবারের মতো।”

আষাঢ় সিনথিকে লিভিং রুম পর্যন্ত নিয়ে এলো। বাড়ির কাউকে এ মুহূর্তে দেখা গেল না। ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে না কি সবাই? সিনথিকে সোফার উপর বসিয়ে দিয়ে আষাঢ় যাওয়া দিলে সিনথি বলে উঠলো,
“এখানে নামিয়ে দিলে? ভেবে তো ছিলাম একেবারে রুম পর্যন্ত দিয়ে আসবে।”

আষাঢ় ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন তাকালো।
“একটু বেশিই আশা করা হয়ে যাচ্ছিল না?”

“হচ্ছিল না কি?” ফিচেল হাসলো সিনথি। তারপর হুট করে নিজের বাম চোখ টিপলো।

“আমার আম্মু-আব্বু যদি জানতো তুমি এমন, তাহলে জীবনেও তোমাকে আমার বউ করতে চাইতো না।”

“তারা না জেনে আমাকে তোমার বউ করতে চাইছে বলেই তো আমি ধন্য। তোমার মা-বাবাকে সম্মান জানাই আমি!”

আষাঢ় তাকিয়ে আছে। দু চোখে চাপা আক্রোশ। বিরক্তি আর ধরছে না। বিরক্তি, রাগ দুটোর পালাই ক্রমাগত ভারি হচ্ছে। এ মেয়েটাকে কোনো কথা দিয়ে দমানো যায় না। সহ্যের বাঁধ ছাড়িয়ে যায় মেয়েটা। সে দ্রুত গতিতে এসে ঝুঁকে পড়লো সিনথির দিকে। এমন কাজেও সিনথির ওষ্ঠ্য থেকে হাসির দল পালালো না। তারা চিরস্থায়ী।
আষাঢ় সিনথির দু চোখে দৃষ্টি বুলাতে বুলাতে চোয়াল শক্ত করে চাপা স্বরে বললো,
“তোমাকে সত্যিই বিয়ে করবো না আমি। ইউ আর অ্যা সাইকো। ইয়াহ, ইউ আর অ্যা ভেরি ডেঞ্জারাস সাইকো!”

সিনথি কিছু বললো না। শুধু তার হাসির রেখাটা আরও চওড়া হলো।
আষাঢ় কেটে পড়লো। দ্রুত পায়ে ছুটতে লাগলো নিজের রুমে। রুমের দরজা আটকে বিছানায় শরীর ছেড়ে দিলো। দরদর করে ঘাম ছুটলো শরীর থেকে। সে ভেবে পাচ্ছে না, মেয়েটা আসলে কী? একটা এলিয়েন? উহ, মাথা ব্যথা করছে সিনথির চক্করে তার। ভাবতে চাইলো না ওসব নিয়ে। সিনথিকে কী করে যে কোলে করে সিঁড়ি বেয়ে নামলো সেটাই ভাবছে। মেয়েটাকে কোলে করে নামিয়েছে ভাবতেও গায়ে জ্বালা ধরে যাচ্ছে এখন। আষাঢ় মাথা থেকে আউট করে দিতে চাইলো সিনথিকে। পকেট থেকে মোবাইল করে কল করলো নোয়ানাকে। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো দেরিতে। ভেসে এলো ঘুম ঘুম আবেশী এক মেয়ে কণ্ঠ,
“হ্যালো!”

“যখন তুমি এমন ঘুম ঘুম কণ্ঠে কথা বলো না, হৃদয়ে ঝড় বয়ে যায় আমার। এই ঝড় লন্ডভন্ড করে দেয় আমাকে। আমাকে লন্ডভন্ড করে কী পাও তুমি?”

নোয়ানার কণ্ঠ কঠিন হলো,
“আপনি?”

“নাম না দেখে কল রিসিভ করো কেন? এরপর থেকে দেখে কল রিসিভ করবে। এখন এই কলারটা যদি আমি না হয়ে অন্য কেউ হতো? যদি ওই নাঈম হতো? তখন? তোমার ঘুম ঘুম কণ্ঠের ঝড়ে তো সে লন্ডভন্ড হয়ে যেত। তাকে সেরে তোলার খরচ দিতো কে? তোমার কাছে কি আর লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া কাউকে সারিয়ে তোলার টাকা আছে?”

আষাঢ় না দেখলেও ধারণা করতে পারলো নোয়ানা কল কেটে দিতে উদ্যত হয়েছে। সে তো চেনে নোয়ানাকে। তাই বলে উঠলো,
“এই না, কল কেটে দিয়ো না। তোমাকে একটা কথা বলার জন্য কল দিয়েছি। কথাটা শুনে তারপর কল কেটো।”

নোয়ানা কল কাটলো না।
আষাঢ় বুঝলো তার কথা শোনার জন্য নোয়ানা ধৈর্য ধরেছে। বললো,
“আজ আমি…না মানে এই মাত্র। এইমাত্র আমি সিনথিয়াকে কোলে করে সিঁড়ি বেয়ে নেমেছি।”

নোয়ানার বক্ষ মৃদু কম্পমান হলো। মুখ ফুঁটে বের হলো না একটি শব্দও।

আষাঢ় বলে চলেছে,
“যখন ওকে কোলে নিয়ে নামছিলাম তখন মনে হয়নি কাজটি ভুল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ঘোরতর অন্যায় করেছি। করেছিই তো। করেছি না? আচ্ছা, তুমি কি খুব বেশি রাগ করেছো? আমি প্রমিজ করছি, আজকের পর থেকে সিনথিয়া কেন? তুমি ছাড়া আর কোনো মেয়েকে স্পর্শ করবো না। মিথ্যা বলছি না, সত্যি। কারো হাতও ধরবো না।”

“হাত কেন? হাত, পা, মাথা সব ধরে বসে থাকুন আপনি। এই ফালতু কথা বলার জন্য এত রাতে আমার ঘুম না ভাঙালেও পারতেন মি. প্লে-বয়।”

আষাঢ় হেসে ফেললো সশব্দে,
“সত্যি অনেক রেগে আছো তুমি। তবে মি. প্লে-বয় ডাকটি খুব সুমধুর শোনালো তোমার কণ্ঠে। এত হাইপার হয়ো না টিউলিপ। আচ্ছা, কীভাবে তোমার রাগ ভাঙাবো বলো? তোমাকে কোলে নিয়ে যদি পাঁচতলা সিঁড়ি বেয়ে উঠি তাহলে হবে?”

“আপনি আর ফোন করবেন না আমাকে।”

“হবে না? দশতলা তাহলে?”

“আপনি একটা বাজে মানুষ।”

“বাজে মানুষটাকে ভালো করার দায়িত্ব হাতে তুলে নাও তাহলে। দেখি কতটুকু পারো। পারবে বোধহয়, তোমার সেই ক্ষমতা আছে। ইতোমধ্যে স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ডদের উপর থেকে মন উঠিয়ে ফেলেছো আমার।”

“আপনি আমার সাথে এরকম করা বন্ধ করুন। আমি একটা সহজ-সরল স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে চাইছি।”

“আমিও স্বাভাবিক ভাবে তোমাকে আমার বউ করতে চাইছি। সতীনের সংসার করতে পারবে তুমি? ভাবছি, সিনথিয়াকে বিয়ে করার পর তোমাকে দ্বিতীয় স্ত্রী করবো। আর তোমাকে যখন বিয়ে করবো তখন, ভেরোনিকাকেও বাদ দিতে চাইছি না। ভেরোনিকাকে তৃতীয় স্ত্রী করবো। তারপর আরও ভালো দেখে কোনো এক সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করে চার বিয়ে সমাপ্ত করবো।
ভেবে দেখো, আমার চার বিয়ে কিন্তু তোমার হাতে। তুমি সম্মতি দিলে চার বিয়ে পূর্ণ হবে আমার। ভালো করে ভেবে দেখো। এখন রাখছি। শুভ রাত্রি।”

আষাঢ় মিষ্টি সুরে ‘শুভ রাত্রি’ জানিয়ে কল কেটে দিলো। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা নোয়ানা অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো,
“শালা পাগল!”

কথাটা বলে নোয়ানা হতবাক হয়ে গেল।
আজ পর্যন্ত কাউকে সে এমন করে বলেনি। আর যখন বললো তখন সেই মানুষটা আষাঢ় হলো? আষাঢ়কে সে ‘শালা পাগল’ বলেছে! ভাবা যায়?

__________________

কারো হাতের মৃদু ঠ্যালায় শ্রাবণের ঘুম ভাঙবো ভাঙবো করছে। ড্রিম লাইট এবং বেড সাইড টেবিলের উপর জ্বলতে থাকা ল্যাম্পশেডের আলোয় দেখা যাচ্ছে একটি মেয়ে শ্রাবণকে জাগ্রত করার চেষ্টায় আছে।
শ্রাবণের স্বপ্ন ক্যানভাসে এই মুহূর্তে রুমকির অস্তিত্ব ছিল। সে দেখছিল সকালের কাঁচা রোদ মেখে সে আর রুমকি লেকের পাড় ধরে হাঁটছে। রুমকি দুই হাত দিয়ে তার হাত জড়িয়ে রেখেছে। তাদের গন্তব্য উদ্দেশ্যহীন। তারা শুধু হাঁটছে। স্বপ্নে আরও ভালো কিছু বোধহয় আসতে চলছিল, কিন্তু ঘুমটা অসময়ে ভেঙে গেল। ঘুমের পর্দা ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে এলে জেগে উঠলো শ্রাবণ। বুক ধক করে উঠলো তার। ধড়ফড় করে উঠে বসলো। তার ঠিক পাশেই মিহিক বসে আছে। শ্রাবণ ল্যাম্পশেডের সোনালী আলোকচ্ছয় দেখতে পেল মিহিকের ক্লান্ত মুখ। ওই মুখে যেন হাজার বছরের ক্লান্তি ভিড় করেছে। ভীষণ দুর্বল একটি মুখ। ঘামে ভিজে একাকার। চোখ দুটো নিভু নিভু। চোখ মেলে আছে কি বুজে আছে বোঝা মুশকিল। মিহিকের থেকে ভাঙা ভাঙা অতি দুর্বল কণ্ঠ ভেসে এলো,
“প্লিজ, সাহায্য করুন! ভী…ভীষণ অসুস্থ বোধ করছি। মরে যাচ্ছি বোধহয়! সাহায্য করুন প্লিজ!”

শ্রাবণের বুক ভয়ে তোলপাড় হচ্ছে। ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে তার বক্ষ পিঞ্জরে থাকা সমস্ত কিছু। দ্রিম দ্রিম একটা শব্দ হচ্ছে তার বুকে। মাথা ঘুরছে। সে একটুখানি মিহিকের কাছে এগিয়ে এসে এলোমেলো কণ্ঠে বললো,
“মি…মিহিক, কী হয়েছে আপনার? এরকম দেখাচ্ছে কেন আপনাকে?”

“প্লিজ, সাহায্য করুন!” মিহিকের অতি দুর্বল, ক্লান্তিগ্রাস কণ্ঠ। কথাটা বলার পরপরই সে ঢলে পড়লো শ্রাবণের বুকে।
শ্রাবণের হৃদপিণ্ড নিজের সকল কার্য গুটিয়ে হৃদস্পন্দন বন্ধ করে ফেললো ক্ষণকালীন সময়ের জন্য। শরীরে বয়ে যাচ্ছে ভয়ের স্রোতধারা। হাত পা হিম হয়ে এলো। দুরবস্থার উত্তপ্ত মরুভূমির মধ্যিখানে হুমড়ি খেয়ে পড়লো তার সকল চিন্তা-চেতনা। কম্পমান স্বরে ডাকলো,
“মিহিক…”
#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ২৬
_____________

জানালা গলিয়ে ঢোকা সকালের ঝরঝরে রোদে বসে আছে আষাঢ়। তার বসার চেয়ারটি জানালার একেবারে দ্বার প্রান্তে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে অবলোকন করছিল একটা চড়ুই পাখিকে। চড়ুই পাখিটা উড়ে গিয়ে আবার বার বার ফিরে আসছিল। কিন্তু এবার যাওয়ার পর আর ফিরে আসেনি। আষাঢ়ের মন খারাপ হলো। পাখিটার আসা-যাওয়ার দৃশ্য তার ভালোই লাগছিল।
কারিব আষাঢ়ের অসন্তুষ্ট মুখখানি দেখছে। সে বসে আছে আষাঢ়ের সামনের চেয়ারে। তার আজকে গ্রামে যাওয়ার কথা ছিল। যাওয়া ক্যানসেল করেছে। ক্যানসেল করার বিশেষ কোনো কারণ নেই। এমনিই, আষাঢ় আছে বলে গেল না।
অনেকক্ষণ হলো দুজন চুপচাপ বসে আছে এখানে। কথার সূত্রপাত ঘটলো ফ্যামিলি ডক্টরকে বাড়িতে অনুপ্রবেশ করতে দেখে। তারা দুজন বসে আছে লিভিং রুমের জানালার কাছে। যেখান থেকে স্পষ্ট দেখা গেল ডাক্তার শফিক আনোয়ার এসেছে।

আষাঢ় চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“বাড়িতে ডক্টর কেন কারিব? কার কী হয়েছে?”

“আমিও ঠিক জানি না আষাঢ় ভাই। মামা-মামি সবাইকে তো সুস্থই লক্ষ্য করলাম।”

শফিক আনোয়ার রুপালির সাথে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। আষাঢ় উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“একবার গিয়ে দেখি চলো।”

গতরাতে মিহিক বুকের উপর পড়ে যাওয়ার পর শ্রাবণ অনুভব করেছিল মিহিকের শরীর খুব উষ্ণ। তার বুঝতে সমস্যা হয়নি যে এটা তীব্র জ্বরের ফল। মেয়েটার এত জ্বর অথচ একবার জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি কাউকে। শ্রাবণ এও বুঝতে পারলো জ্বর জ্বর ভাব থাকার কারণে মিহিক দুই দিন বেশির ভাগ সময় বিছানায় শুয়ে ছিল। অথচ জিজ্ঞেস করলে বলতো, তার কিছু হয়নি, শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে বলে শুয়েছে। মেয়েটা আগে থেকে না বলে-কয়ে তার অবস্থা খারাপ করেছিল। জীবনে এতটা জ্বরে কাবু মানুষ দেখেনি সে। দিগভ্রান্ত অবস্থায় পড়েছিল সেই সময়। গভীর রাতে কী করবে, কাকে ডাকবে কিছু মাথাতে আসছিল না। হাত-পা কাঁপছিল যেন রীতিমতো। কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পরও যখন মিহিক সাড়া দিলো না ভয় কামড়ে ধরলো তখন। মিহিককে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ছুটে গেল মাকে ডাকতে। আর কী-ই বা করবে। এত জ্বরে আক্রান্ত মানুষকে তো তার পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়। এমনিতেই তার বুক ভয়ে ধক ধক করছিল।
লায়লা খানম এসে দেখলেন মিহিকের পরিস্থিতি খুব একটা ভালো না। হাত রাখলে হাত যেন পুড়ে উঠছে। মিহিককে কোনো রকম সামলিয়ে ঔষধ খাওয়ালেন, জল পট্টি দিলেন।
ওদিকে দিগভ্রান্ত অবস্থার কারণে শ্রাবণের ফ্লোর বিছানার কথা মনে ছিল না। মা-বাবা দেখলে যে সর্বনাশ হয়ে যাবে, ভাবনাতে ছিল না একদম। প্রথম দিকে ফ্লোর বিছানার দিকে খেয়াল করেনি কেউ। শ্রাবণ চাইছিল বিছানাটা পা দিয়ে ঠেলে খাটের নিচে ঢুকিয়ে রাখবে। কিন্তু সেটা কি সম্ভব? লায়লা খানমের যখন খেয়াল হলো ফ্লোরে বিছানা পাতা, তখন কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করলেন,
“ফ্লোরে বিছানা কেন শ্রাবণ?”

শ্রাবণ ঘাবড়ালো না। জানতো এমন একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া তার শিরোধার্য। গোছানো প্রশ্নের উত্তর খুব সুন্দর ভাবে দিলো সে,
“এটা মিহিকের কাজ। সন্ধ্যায় এখানে বিছানা করে শুয়েছিল। আমি বিছানায় বসে কিছু জরুরি ফাইল চেক করছিলাম। ভেবেছিল সে পাশে থাকলে আমার ডিস্টার্ব হবে। তাই এই কাণ্ড করেছে। আমি অবশ্য বলেছিলাম সে বিছানায় থাকলে সমস্যা হবে না কোনো। তাও সে আমার কাজ শেষ না হওয়া অবধি ফ্লোরে বিছানার উপর ছিল।”

কথা আগে থেকে সাজিয়ে রাখলেও বলতে গিয়ে কিঞ্চিৎ গলা কাঁপলো শ্রাবণের। মা-বাবা কথাগুলো বিশ্বাস গেল কি না বুঝতে পারলো না। মিহিককে নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে বিষয়টা সহজে এড়ানো গেল।
রাতের থেকে মিহিকের অবস্থা এখন অনেকটা ভালো। রাতে যে অবস্থায় ছিল তাতে শ্রাবণের আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছিল। রাতে তো কোনো কথাই বলছিল না মিহিক। এখন বলছে। তবে খুব অল্প পরিমাণ। কথা বলতে গিয়ে যেন তার অর্ধ শক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে। গতরাত থেকে শ্রাবণের কিছু একটা হয়েছে। মন কেমন করছে। বার বার মিহিকের তার বুকে ঢলে পড়ার দৃশ্যটি মনে ভাসছে। এমন অসুস্থ কেউ তার বুকে ঢলে পড়েনি কখনো। হৃদয় স্তব্ধ করে দিয়েছিল ওই ক্ষণটা। সারা রাত দু চোখের পাতা এক ছিল না। মিহিকের জ্বরে কাবু অসুস্থ মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ভোর হয়েছে। মিহিকের গোল মতোন ক্লান্ত মুখ দেখে শ্রাবণের মায়া অনুভব হয়েছে, অনুভব হয়েছে হৃদয়ে ব্যথা। এক বিষাক্ত ব্যথা তার হৃদয় কামড়ে ধরেছিল। এখনও সে ব্যথার যন্ত্রণা কমেনি। কাল রাতে সে মিহিকের এক হাত আঁকড়ে ধরে বলেছিল,
“আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন মিহিক।”

কথাটা হয়তো মিহিকের অবচেতন মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারেনি। যদি করতো তাহলে বুঝতো
তার স্বামী আসলেই তার প্রতি কেয়ারিং।

আষাঢ় ডাক্তারের পিছন পিছন এসে পুরো বিষয়টি পরিলক্ষিত করেছে। মিহিকের জ্বর এসেছে দেখে তার মনে খুশির হাজারো ঝিলমিলে প্রজাপতি ডানা মেলে দিলো। খুশিতে হাসি পাচ্ছিল। হাসি চেপে রেখে বেরিয়ে এলো ভাইয়ের রুম থেকে। তার পিছন পিছন কারিবও বের হলো। রুম থেকে বের হয়ে আষাঢ় আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারেনি। ফিক করে হেসে দিলো সে। কারিব আষাঢ়কে হাসতে দেখে অবাক সুরে বললো,
“আপনার ভাবির জ্বর এসেছে আর আপনি হাসছেন?”

“হাসবোই তো কারিব, ভাবির জ্বর এসেছে বলে আমি খুব খুশি। জ্বরটা বড়ো উপকার করলো আমার।”

কারিবের ওষ্ঠদ্বয় আলাদা হয়ে গেল,
“আপনি খুশি? একটা মানুষের অসুস্থতাতে আপনি কীভাবে খুশি হতে পারেন আষাঢ় ভাই? এত পাশবিক আচরণ কীভাবে সম্ভব?”

“কারিব, তুমি বুঝতে পারছো না। চিন্তা করে দেখো। আমার ভাবি অসুস্থ। আর আমার ভাবি কে? তোমার টিউলিপ ভাবির বোন। বোন অসুস্থ। বোনকে দেখতে আসবে না টিউলিপ? অবশ্যই আসবে। আর বোনকে দেখতে আসলে আমার সাথেও দেখাটা হয়ে যাবে। এবার বুঝতে পেরেছো আমার হিসেবটা?”

কারিব খুশি হতে পারলো না। আষাঢ়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ফুঁটলো না তার অধর কিনারায় হাসির রেখাপাত। শুকনো বদনে বললো,
“আপনার হিসেবের তারিফ করছি, কিন্তু তাই বলেও আপনার একজনের অসুস্থতা নিয়ে খুশি হওয়া উচিত নয়। আপনার ভাবীর জ্বর এসেছে, আপনার দুঃখ প্রকাশ করা উচিত।”

“বোকা ছেলে! এটা ঠিক যে ভাবির জ্বর এসেছে বলে আমি খুশি, দারুণ খুশি। তাই বলে এটা সেরকম খুশি নয়। এটা অন্যরকম খুশি। চলো এখন।”

“চলো মানে? কোথায় যাব?”

“মার্কেটে। ভাবীর জ্বরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে হবে না?”

“বুঝলাম না আষাঢ় ভাই। ভাবির জ্বরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা… মানে কী এটার?”

আষাঢ় কারিবের প্রশ্নে কর্ণপাত না করে বললো,
“আচ্ছা, কোন ফুল ভালো হবে বলো তো? গোলাপ? না কি কৃষ্ণচূড়া?”

“গোলাপ দেন।”

“উহু, আমার মনে হচ্ছে কৃষ্ণচূড়া দিলে ভালো হবে।”

কারিব ইতস্তত কণ্ঠে বললো,
“শুভেচ্ছা জানাবেন…কৃষ্ণচূড়া দিলে কেমন না?”

“এটাই ভালো হবে। আমার ভাইয়ের প্রিয় ফুল।”

__________________

অফিসে যাওয়ার মন নেই, তবুও রেডি হতে হচ্ছে। রেডি হওয়ার ফাঁকে পিছন ফিরে বার বার দেখছে মিহিককে। মিহিকের আঁখি জোড়া মুদিত। ঘুমাচ্ছে। মেয়েটার হঠাৎ জ্বর আসার উৎস খুঁজে পাচ্ছে না শ্রাবণ। আগের চেয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরালো সে। চুলগুলোয় আরেকবার চিরুনি চালানোর সময় শুনতে পেল পিছনে মিহিকের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর,
“অফিস যাচ্ছেন?”

শ্রাবণ পিছন ঘুরে প্রলুব্ধ কণ্ঠে বললো,
“ওহ, জেগে গেছেন আপনি?”

“জেগেই ছিলাম আমি।”

শ্রাবণের বাক বন্ধ হয়ে গেল মিহিকের কথার ঝঞ্ঝায়। মিহিক ক্ষণকাল চেয়ে থেকে দুর্বল কণ্ঠে বললো,
“কাছে আসুন।”

শ্রাবণ এগিয়ে গেল। মিহিক বসতে বললে বসলো পাশে।
“কিছু বলবেন?” প্রশ্নটা স্বাভাবিক ভাবে এসে গেল শ্রাবণের মুখে।

মিহিকের চোখ দুটি লাল। মুখে ক্লান্তি ছেপে আছে। লাল চোখ দুটো শ্রাবণের চোখে নিবদ্ধ করে বললো,
“বলতে তো চাই অনেক কিছু, কিন্তু বললে আপনি বুঝবেন না। আপনি খুব বোকা শ্রাবণ।”

‘বোকা’ শব্দটা শ্রাবণের আত্মসম্মানে এসে আঘাত হানলো না। বোকা বলার জন্য মিহিকের উপর হলো না কোনো রাগ বোধ। বরং এক তিক্ত অপরাধ বোধে ছেয়ে গেল তার ভিতর। এই কথায় কেন এই অপরাধ বোধের আগমন বোঝা কঠিন। তার মনে সব সময়ই একটা অপরাধ বোধ ছেয়ে থাকে। কখনো বা চাপা, কখনো বা মিহিকের কথায় এটা জ্বলে
ওঠে। মিহিকের কথার প্রত্যুত্তর দেওয়ার কোনো শব্দ, বাক্য খুঁজে পেল না শ্রাবণ।

মিহিক নিরুত্তর শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে থাকে কীয়ৎক্ষণ। ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুঁটে ওঠে। হাত বাড়িয়ে শ্রাবণের একটা হাত মুঠোয় তুলে নেয়। হাতটা কপালে ঠেকিয়ে বললো,
“আমি অসুস্থ বলে আপনার খারাপ লাগছে শ্রাবণ?”

শ্রাবণ বিচলিত হলো। তটস্থ কণ্ঠে জবাব দিলো,
“হ্যাঁ, লাগছে।”

মিহিকের ম্লান হাসি সুপ্ততা ছড়ায়,
“আপনি ভালো। একটু বোকা আছেন, আর একটু অসুন্দর। কিন্তু আপনি ভালো।”

“আমি অসুন্দর নই।”

শ্রাবণের কথায় মিহিক হেসে ফেলে। ক্ষণস্থায়ী হাসিটা সরিয়ে নিয়ে বললো,
“আমি সুন্দর বানাবো আপনাকে, কোনো চিন্তা নেই।”

শ্রাবণ তাকিয়ে রইল। হতবুদ্ধি চাহনি।

রুমের দরজা খুলে গিয়ে দেখা গেল আষাঢ়ের মুখ। তার পিছনে কারিবকেও আবিষ্কার করা গেল। আষাঢ় দরজা খুলেই বলে উঠলো,
“ওপস স্যরি, রোমান্টিক ক্ষণে ঢুকে গেলাম। আজ একদম নক করতে খেয়াল ছিল না।”

মিহিক বিরক্তিতে মুখ বিকৃত করলো। সরিয়ে দিলো কপাল থেকে শ্রাবণের হাত।
শ্রাবণের এই মুহূর্তে ঘাবড়ানোর কথা ছিল, কিন্তু আজবভাবে সে ঘাবড়ালো না। এ ব্যাপারে সে নিজেই অবাক। আষাঢ় ভিতরে প্রবেশ করলো। প্রবেশ করলো কারিবও। আষাঢ় প্রসন্ন হাসি উপহার দিলো।

“জ্বর কেমন?”

“আগের থেকে ভালো।” উত্তর দিলো মিহিক।

আষাঢ় এগিয়ে এসে মিহিকের হাতে কিছু কৃষ্ণচূড়া ফুল গুঁজে দিয়ে বললো,
“তুমি আমার বড্ড উপকার করলে ভাবি। উপকার করার সৌজন্যে এই ছোট্ট শুভেচ্ছা তোমার জন্য।”

আষাঢ়ের কাণ্ড-কলাপ আর তার কথা শুনে মিহিক, শ্রাবণ দুজনই অবাক। মিহিকের ভ্রু বিস্ময়ে কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে। শ্রাবণ বললো,
“উনি কী উপকার করেছে তোর?”

“করেছে ব্রো, করেছে। কী উপকার আপাতত সেটা গোপন থাক। জ্বরের জন্য শুভকামনা ভাবি।”
কথাটা বলে আষাঢ় হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল।
শ্রাবণ মাথা-মুন্ডু কিছু বুঝলো না। কারিবকে প্রশ্ন করলো,
“ও কী বললো এসব?”

“আমিও কিছু বুঝতে পারছি না শ্রাবণ ভাই। তার মাথায়ও বোধহয় আপনার মতো অন্য ধারার গন্ডগোল দেখা দিয়েছে।”
কারিবও দাঁড়ালো না। চলে গেল।
শ্রাবণের ঘোর কাটলো মিহিকের কথায়,
“আপনারা দুই ভাই এত পাগল কেন?”

“একটু আগে বোকা বলেছেন, এখন আবার পাগল বানিয়ে দিলেন?”

“যারা বোকা হয়, তারা পাগলও হয়।”

মিহিক চোখ বুজলো। কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না তেমন। গায়ের জ্বর যেন আবার বেড়ে যাচ্ছে। অনেকটাই কমে এসেছিল। শ্রাবণ মিহিককে চোখ বুজতে দেখে আর বললো না কিছু। অসুস্থ একটা মানুষের সাথে কি আর তর্ক করা সাজে?

_______________

“শ্রাবণ ভাইয়া কি তোমার সাথে এখনও ঝগড়া করে?”
মিহিকের দিকে কিছুটা ঝুঁকে গিয়ে প্রশ্ন করলো তিন্নি। মিহিকের অসুস্থতার খবর পেয়ে সকালে এসেছিল তারা। বিকেলে বাসায় গিয়ে রাতে আবারও এসেছে।

মিহিক বললো,
“আরে না, তেমন কোনো ব্যাপার না। শ্রাবণ ভালো মানুষ। ঝগড়া করা তো দূর, ঝগড়া কীভাবে করতে হয় সেটাও বোধহয় সে জানে না।”

“কিন্তু তুমি যে বলেছিলে তাকে বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না আসলে তার ভিতরটা কেমন?”

“ওটা অন্য অর্থে বলেছিলাম।”

“কোন অর্থে?”

“জানতে হবে না তোকে।”

“আমি তো ভেবেছিলাম তার সাথে ঝগড়া করতে করতে তোমার জ্বর এসেছে।”

মিহিক তিন্নির কথায় হাসলো। হাসলো নোয়ানাও। রুমে শুধু মিহিক, নোয়ানা এবং তিন্নি আছে। একটু আগে আরও মানুষজন ছিল। হাফিজা, লায়লা খানম, রুপালি, আষাঢ়, সিনথিয়া, জুন। সবাই চলে গেছে। এবার তিন্নির মাঝেও চলে যাওয়ার একটা তাগিদ লক্ষ্যনীয় হলো। বললো,
“আমি জুনের কাছ থেকে একটু ঘুরে আসি।”

তিন্নি মিহিকের পাশ থেকে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। এমন সময় দরজা দিয়ে প্রবেশ করছিল কারিব এবং আষাঢ়। কারিব আষাঢ়ের পিছনে ছিল। দরজার ভিতর থেকে তিনটা মানুষের আসা যাওয়ার দরুন দুর্ঘটনা বশত তিন্নির একটুখানি ধাক্কা লাগলো কারিবের সাথে। আষাঢ় ততক্ষণে দরজা অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করেছে। তিন্নি, কারিব জায়গাতেই স্থির হলো। ধাক্কা লাগায় তিন্নি চড়া গলায় বলে উঠলো,
“কী মিস্টার কারিব, চোখে দেখেন না?”

‘মিস্টার কারিব’ শব্দ দুটো ভালো লাগলো না কারিবের। মেয়েটা তাকে প্রথম পরিচয় থেকে মিস্টার কারিব বলে ডাকে। আর প্রথম থেকেই এই ডাকটা অপছন্দনীয় তার। সে অনেক বার বলেছে মেয়েটাকে তাকে ‘কারিব ভাই’ বলে ডাকতে। কিন্তু মেয়েটা ডাকবে না। ঘাড় ত্যাড়া মেয়ে।
কারিব কাঠ গলায় বললো,
“এই প্রশ্ন তো আমিও করতে পারি, তুমি চোখে দেখো না?”

তিন্নি অপ্রস্তুত বোধ করে। কিন্তু দ্রুত প্রত্যুত্তর করতে ভোলে না,
“এই জন্যই আপনাকে আমার পছন্দ নয়, আর পছন্দ নয় বলেই আপনাকে ভাই বলে ডাকি না। মানুষের সাথে আপনার আচরণ খুব বাজে। আপনার স্বভাব একেবারে ভালো নয়।”

তিন্নির কথা আষাঢ়ের কানে পৌঁছলো। আর পৌঁছনোতে সে কারিবেরও আগে তেড়ে এলো। কারিবের সামনে দাঁড়িয়ে কারিবকে আড়াল করে বললো,
“শোনো ভাবির ছোট বোন, কারিব আমার একান্ত প্রিয় মানুষ। ওর স্বভাব ভালো কি খারাপ সেটা আমি বুঝবো আর ও বুঝবে। তোমরা তিন বোন তোমাদের স্বভাব আগে ঠিক করো। তোমাদের কারো স্বভাবই ভালো নয়।”

“আপনি…” তিন্নি তুমুল বেগে গর্জে ওঠা দিয়েও আবার নিভে গেল। চোখ গেল দেয়াল ঘেঁষে রাখা আর্মচেয়ারে বসা নোয়ানার দিকে। নোয়ানার চোখ-মুখ যেন তাকে চুপ করে যেতে বলছে। তিন্নি নিজেও ভেবে দেখলো, আষাঢ়ের সাথে ঝগড়া করা তার উচিত হবে না। শত হলেও তার দুলাভাইয়ের ছোট ভাই। তিন্নি শান্ত অথচ আক্রমণাত্মক ভাবে বললো,
“মিস্টার কারিব আপনার একান্ত মানুষ, আমরা তিন বোন আপনার একান্ত নই। তাই আমাদের স্বভাব ভালো কি খারাপ তাতে আপনারও নাক গলানো উচিত নয় দুলাভাইয়ের ছোট ভাই।”

তিন্নি ভেংচি কাটার মতো করে পাশ কাটিয়ে গেল। আষাঢ়ের ভিতরে একটা অবিশ্বাসের নিঃশ্বাস না পড়লেই নয়। সে দরজার কাছে থেকে সরে ভিতরে প্রবেশ করে বললো,
“তোমাদের ছোট বোন একটু বেশি ত্যাদড়।”

মিহিক চাপা রাগ স্বরে বললো,
“আমাদের বোন কেমন সেটা আমরা বুঝবো, সেই নিয়ে তোমাকে না ভাবলেও চলবে।”

আষাঢ় আর তিন্নিকে নিয়ে থাকলো না, আড় চোখে একবার নোয়ানার দিকে তাকিয়ে বললো,
“হুম, ভাবছি আমি। কিন্তু আমি যদি ভাবনা থামাতে চাই তাও এ ভাবনা থামবে না। ভাবতে না চাইলেও ভাবনা এসে যাবে আমার মাঝে। তাই আমাকে ভেবে যেতে হবে। সে যেন এটা না ভাবে তার ভাবনা আমি থামিয়ে দেবো। তাকে ভাবতে আমার একটু বেশিই ভালো লাগে।”

আষাঢ়ের কথাগুলো যে নোয়ানার জন্য ছিল তা মিহিক বুঝতে না পারার কারণে মিহিকের কাছে কথাগুলো তালগোল লাগলো। কিন্তু নোয়ানা এবং কারিব সহজে ধরতে পারলো এটা। আষাঢ় মিহিকের মন থেকে তালগোল লাগাটা মুছে দিতে বললো,
“আমার ভাই এখনও আসেনি?”

“আসলে তাকে নিশ্চয়ই দেখতে পেতে?” বললো মিহিক।

বলার সাথে সাথে রুমের দরজায় শ্রাবণের মুখ দর্শন পাওয়া গেল। শ্রাবণ দরজাতেই থমকে গেল। রুমের ভিতর এত মানুষ থাকবে বুঝতে পারেনি। সে এতক্ষণ বাইরে ছিল। আসলে হঠাৎ করে তার রুমকির কথা মনে পড়েছিল। রুমকিকে সেই থেকে এখনও অবধি ফোনে পাচ্ছে না। এমনকি রুমকিকে কোথাও দেখতেও পাচ্ছে না। এলাকার ভিতর বা বাইরে কোথাও রুমকির সাথে এক সেকেন্ডের জন্য দেখা হয়নি। রুমকির বাড়ির সামনে দিয়ে খুব সময় নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে গেলেও কোথাও দেখা যায় না রুমকিকে। রুমকি এতটাই রাগ করেছে যে এভাবে ফেরারি হলো? রুমকির বাড়ির আশেপাশেই ছিল কিছুক্ষণ। সেখান থেকেই ফিরেছে। ভুলক্রমেও একবার দেখা পায়নি রুমকির। এতটা রাগ করছে কেন রুমকি? সেদিন কী-ই বা এমন হয়েছিল যার কারণে দিনের পর দিন এভাবে যোগাযোগ রাখবে না? রুমকি যোগাযোগ না করায় যে শ্রাবণের কষ্ট হচ্ছে তেমন না। খারাপ লাগছে তেমনও নয়। তার শুধু চিন্তা আর রাগ হচ্ছে। রুমকির এরকম রাগ কি অতিরিক্ত নয়?

(চলবে)
_________________

(খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা হয়েছে আজকের পর্বটা। জানি না কেমন হয়েছে!)
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here