বিবর্ণ জলধর পর্ব -৩১+৩২

0
38

#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ৩১
_____________

মানুষের চেতনা কি কিছুক্ষণের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে? পারে বোধহয়। এই যে মিহিককে সে বুকে জড়িয়ে রেখেছে, এটা তার নিজ চেতনায় করা কোনো কাজ নয়। তার চেতনা বশীভূত হয়েছে কিছুর দ্বারা। তা না হলে সে কখনোই মিহিককে বুকে টেনে নেওয়ার স্পর্ধা দেখাতে পারতো না। নিজ চেতনায় জাগ্রত হয়ে উঠলেই শ্রাবণ বিব্রত, বিভ্রান্ত অনুভব করলো। এমন বিব্রত, বিভ্রান্ত অনুভব জীবনে তার দ্বিতীয় কোনোদিন হয়নি। মিহিককে ছেড়ে দিয়ে কিছুটা পিছু হটে এলো সে।
মিহিক বিস্ময়ান্বিত ডাগর চোখ জোড়া মেলে চেয়ে রয়েছে তার দিকে। ওই দৃষ্টি তাকে লজ্জা দিচ্ছে, বুকে ভয়ের জন্ম দিচ্ছে, হৃদয় করছে তোলপাড়। কী বলা উচিত এখন? শ্রাবণের মুখে লজ্জার চিত্র। মস্তিষ্কে কোনো শব্দের আগমন ঘটছে না। শব্দহীন মস্তিষ্ক তাই মুখকে করে রেখেছে রুদ্ধ। কিছুক্ষণ সংশয় মন খানা নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকলো না। চলে গেল সে। রুমে দন্ডায়মান রেখে গেল তোলপাড়, আনন্দ আবহমান একটি মন। যে মনে আজকের এই ঘটনাটুকু সুন্দরতম স্মৃতি হয়ে জমা পড়ে রবে।

হৃদপিণ্ডের লাফ-ঝাঁপ তড়িৎ গতি সম্পন্ন। লাইব্রেরি রুমে প্রবেশ করে শরীর ছেড়ে দিলো দেয়াল ঘেঁষে রাখা ইজি চেয়ারে। বুকের বাঁ পাশে এক হাত রেখে হৃদয়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার বৃথা চেষ্টা প্রয়োগ করলো। শ্বাস-প্রশ্বাস এলোমেলো। এসব কী হচ্ছে তার সাথে? এটা কীভাবে করলো? মস্তিষ্কে সব কিছু প্যাঁচ খেয়ে যন্ত্রণার চাদর মেলে দিচ্ছে। দুই হাত দিয়ে মাথার চুল খামচে ধরলো। পাগল হয়ে যাচ্ছে কি সে? এই লজ্জিত মুখ কোথায় লুকাবে? কীভাবে দাঁড়াবে মিহিকের সামনে গিয়ে? অসহ্যকর আত্মগ্লানিতে ছেয়ে যাচ্ছে মাথার উপরের আকাশ। না, এটা ঠিক হয়নি। কেন হলো এমনটা? বুকের ভিতরে আবৃত হৃদয়কে বাইরে নিয়ে এসে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে ইচ্ছা হচ্ছে শ্রাবণের। আজকে যা ঘটলো তার জন্য হৃদয়ই দায় নয় কি?

ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে একটার ঘর ছুঁয়ে ফেলেছে। শ্রাবণ দোটানা মন নিয়ে লাইব্রেরি রুমেই অবস্থানরত। রুমে যাবে, কিন্তু মিহিক যদি এখনও জেগে থাকে? মিহিক জেগে আছে মনে হলে রুমে যাওয়ার ইচ্ছা বার বার দমে যায়। কিছুক্ষণ দোনা-মনা করে অবশেষে সে রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।
ঝাপসা আলোয় পথ চলে রুমে পৌঁছলো। রুমের দরজা ভেজানো, মৃদু হাতে ঠ্যালা দিতেই খুলে গেল। লাইট জ্বলছে। ধারণা বলছিল মিহিক জেগে থাকবে, কিন্তু মিহিক ঘুমন্ত। শ্রাবণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। যাক, মিহিকের মুখোমুখি হতে হলো না তার। রুমে প্রবেশ করে দরজা লক করলো। চোখ আপনা থেকে গিয়ে মিহিকের ঘুমন্ত মুখখানিতে নিবদ্ধ হলো। খাটের দিকে এগিয়ে এলো সে। ব্ল্যাংকেটটা মিহিক ফ্লোরে ফেলে রেখেছে। শ্রাবণ খাটের পাশে গিয়ে স্থির হলো। মেয়েটা বিছানার এক পাশে শুয়ে আছে। এ পাশটা উন্মুক্ত। মেয়েটা সব সময় বিছানার এক পাশে গিয়েই শুয়ে থাকে। এ পাশটা খালি রাখে। পুরো বিছানাই যখন তার নামে দেওয়া হয়েছে তখন এক কর্ণারে গিয়ে শুয়ে থাকার কী দরকার? মধ্যখানেই তো শুয়ে থাকতে পারে। শ্রাবণ বসলো। মিহিকের দিকে চেয়ে থেকে বললো,
“আমার সাথে সব কিছু অন্যরকম হচ্ছে মিহিক। এমন কেন হচ্ছে আপনি জানেন? এই অন্যরকম ব্যাপারটা কি আপনার জন্যই হচ্ছে?”

ঘুমন্ত মিহিক নিরুত্তর। শ্রাবণ চোখ সরিয়ে নিলো। বুক চেরা নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
“আমি জানি এটা আপনার জন্যই হচ্ছে। আপনিই এর পিছনে দায়ী। এটা খারাপ লাগছে না। কিন্তু অসহ্য রকম একটা ছটফটানি অনুভব হয় হৃদয়ে।”
শ্রাবণ আবারও তাকালো মিহিকের দিকে,
“আপনার কি এরকম হয় না? না কি এটা শুধু আমার সমস্যা? আপনি আমার এরকম অনুভূতির সঙ্গী হলে ভালো হতো। কিন্তু আপনার হৃদয়ের অবস্থা তো আমি জানি না। আপনি আপনার হৃদয় সম্পর্কে বলেননি, আর আপনার হৃদয় পড়ার সাধ্যিও আমার নেই! হয় আমার মতো এমন?”

_______________

মিহিকের তন্দ্রা ভাঙলো ফজরের আযানের সাথে সাথে। চোখ খুলেই যা দেখলো, তাতে সে অভিভূত!
তার সম্মুখে, তার পাশে ঘুমিয়ে আছে শ্রাবণ! রুমে লাইট জ্বলছে। লাইট অফ করে ঘুমায়নি শ্রাবণ। লাইটের আলোয় স্পষ্ট শ্রাবণের ঘুমে বিভোর চেহারা দেখতে পাচ্ছে সে।
মিহিকের হৃদয় সহসা আর্দ্র হয়ে উঠলো। শেষমেশ মানুষটা তার পাশে শুয়ে ঘুমিয়েছে! যদিও দুজনের মাঝে পার্শ্ববর্তী দূরত্বটা অনেক। শ্রাবণ মধ্যখানে অনেকখানি খালি জায়গা রেখে শুয়েছে। একেবারে বিছানার কর্ণারে গিয়ে এমনভাবে শুয়েছে যেন ও কাত ফিরলেই ধপাস করে পড়ে যাবে ফ্লোরে। মিহিক মুচকি হাসলো। এত কেন দূরত্ব রাখতে হবে মানুষটার? কাছে এগিয়ে এলো সে। একটা হাত বাড়িয়ে কি ছুঁয়ে দেবে ঘুমে বিভোর মুখখানি? ঘুম কি ভেঙে যাবে তার? ভাঙলে ভাঙুক।
মিহিক হাত বাড়িয়ে শ্রাবণের কপোল ছুঁয়ে দিলো। শ্রাবণের কোনো প্রতিক্রিয়া হলো না, না ভাঙলো ঘুম। এমন আলতো ভাবে ছুঁয়েছে যে ঘুম ভাঙারও কথা নয়। মুচকি হাসিটা মিহিকের অধর থেকে সরছে না। আজকের সকালটা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এমন একটা সকালের প্রতীক্ষায় ছিল সে। যেখানে ঘুম ভেঙেই প্রথমে স্বামীর চেহারাটা দর্শন হবে। মিহিক আধো কণ্ঠে বলে উঠলো,
“কে আগে প্রেমে পড়লো বলুন তো? মনে হচ্ছে আমিই প্রথম পড়েছি আপনার প্রেমে!”

________________

পরপর চার বার কলিং বেল বেজে উঠলো। রুপালি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো দরজা খুলতে। দরজা আসলে ভেজানো। আগন্তুক দরজায় ঠ্যালা দিলেই দরজা খুলে যেত। যাই হোক, দরজার কপাট খুলে দিতেই সুন্দরী এক মুখশ্রী নজরে এলো। মেয়েটার পরনে ওয়েস্টার্ন ড্রেস। খোলা চুলে কেমন একটা হেয়ার স্টাইল করেছে। মেয়েটা অপরিচিত, স্বাভাবিক অর্থেই রুপালি প্রশ্ন করে ফেললো,
“আপনি কে?”

মেয়েটা হেসে উত্তর দিলো,
“আমি সাদিয়া জামান।”

“কারে চান?”

“এটা হিমেলের বাসা না? হিমেল আছে?”

রুপালির চোখ স্ফূর্ত হয়ে উঠলো। আষাঢ়ের কথা কেন জিজ্ঞেস করছে এই মেয়ে? মন খচখচ করে উঠলো তার। মেয়েটার আগমনে বড়ো রহস্য রহস্য গন্ধ আছে। সে কোনো জবাব না দিয়ে সোজা দৌঁড় দিলো লায়লা খানমের রুমে।

কারিব এক প্রকার দৌঁড়াতে দৌঁড়াতেই এসে উপস্থিত হলো আষাঢ়ের রুমে। এত জোরে দরজাটা খুললো যে ভারি একটা শব্দ হলো ঘরময়। আষাঢ় এখনও ঘুমিয়ে আছে। তার ঘুমে ভাঙন সহজে ধরবে না। কারিব দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে এসে দুই হাতে আষাঢ়কে মৃদু ঠ্যালা দিয়ে ব্যস্ত গলায় বললো,
“আষাঢ় ভাই, ওঠেন…ওঠেন।”

ধাক্কার কারণে আষাঢ়ের ঘুমে ভাঙন ধরলো সহজেই। কিন্তু এই ভাঙনে কাজ হলো না। আষাঢ়ের ঘুম ভাঙলো ঠিকই, কিন্তু তার চক্ষু মুদিত রইল, জাগতিক হুঁশে ফেরানো গেল না তাকে। সে ডুবে রইল গলা পর্যন্ত ঘুম জলে। ঘুম আচ্ছন্ন কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠলো,
“ওহ কারিব, হোয়াট’স ইওর প্রবলেম ডিয়ার? কেন তুমি মাঝে মাঝে আমার ঘুমে বিরক্ত করো? বিরক্ত করো না প্লিজ। স্বপ্নে তোমার ভাবি আর আমি স্নো ফল জমা পথ দিয়ে হাঁটছি। স্বপ্নের মাঝে এভাবে ব্যাঘাত ঘটালে দুজনেই পা পিছলে পড়ে যাব। বিরক্ত করো না। পথটা শেষ হতে দাও।”

বিড়বিড় করে বললেও কারিব অনেক কথাই বুঝলো। এতে সে শান্ত হলো না। তার ভিতরে অশান্ত দুশ্চিন্তা। আবারও ব্যস্ত কণ্ঠে শুধালো,
“ঘুমালে হবে না আষাঢ় ভাই। দ্রুত ওঠেন। ওদিকে সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে।”

আষাঢ় আগের মতো বিড়বিড় করলো,
“হু সর্বনাশ! তোমার টিউলিপ ভাবি আমার হৃদয়ের সর্বনাশকারী। আমার হৃদয় হরণকারী। বাস্তবে এত কঠিন কেন সে? স্বপ্নে তো মোটেই এমন নয়। রোমান্টিক দেখাচ্ছে তাকে। সকল কথা হেসে হেসে বলছে।”

কারিবের এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সে পাগল হয়ে যাবে। ওদিকে সর্বনাশী তান্ডবে সব লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে, আর এদিকে আষাঢ় নিজের স্বপ্ন নিয়ে পড়ে আছে। সে আরও কয়েকবার ধাক্কা দিয়ে বললো,
“ওঠেন, তাড়াতাড়ি ওঠেন। আপনার গার্লফ্রেন্ড এসেছে বাড়িতে।”

আষাঢ়ের চোখ জোড়া আচমকা খুলে গেল। কারিবের কথা কর্ণ থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়েছে তার। দ্রুত উঠে বসে বললো,
“কে এসেছে?”

“আপনার স্বল্প সাময়িক গার্লফ্রেন্ড, সাদিয়া।”

“মিরপুর?”

“হ্যাঁ, মিরপুর।”

আষাঢ় রাগ, বিরক্তিতে মুখে আজব একটা শব্দ করে উঠলো। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে নেমে লম্বা পা ফেললো।

______________

“হিমেলের কাছে এসেছো…হিমেলকে কীভাবে চেনো তুমি? তোমাদের সম্পর্কটা কী?”
দুরুদুরু বুক নিয়ে প্রশ্ন করলেন লায়লা খানম। মন বলছে ভালো কিছু হতে চলছে না সামনে। সিনথিয়া, মিহিক বসে আছে তার সাথে, এই মেয়ে যদি এখন অপ্রীতিকর কিছু বলে তাহলে এই মুখ কোথায় রাখবে সে! মেয়েটা যদি বলে ফেলে সে আষাঢ়ের প্রেমিকা, তাহলে তিনি কী জবাব দেবেন সিনথিয়াকে? আষাঢ় এমন কেন করলো?

মেয়েটা লায়লা খানমের দুশ্চিন্তার কারণ মতো কিছুই বললো না। শুধু বললো,
“আগে হিমেল আসুক, ওর সাথে দেখা করা খুব প্রয়োজন আমার।”
একরাশ জড়তা মেয়েটার কণ্ঠে।

লায়লা খানমের চিন্তা হচ্ছে সেটা ঠিক, কিন্তু সে কৌতূহল থেকে পিছু হটতে পারেন না। সত্য থেকেও না। মেয়েটাকে আশ্বস্ত করে বললেন,
“তুমি বলো মা, কোনো সমস্যা নেই। আমার ছেলে আর তোমার মাঝে সম্পর্কটা কী? তোমরা কি বন্ধু, না কি…”
লায়লা খানমের কণ্ঠ রোধ হয়ে এলো। মেয়েটা আষাঢ়ের প্রেমিকা এমন সংশয় যে শুধু তার হচ্ছে সেটা নয়। সিনথিয়া, মিহিক, রুপালি এদেরও সংশয় হচ্ছে। সিনথিয়া আসলে কনফার্ম এই মেয়ে আষাঢ়ের প্রেমিকা। সে তো আষাঢ়ের জীবনবৃত্তান্ত জানে। আর মেয়েটা যেভাবে এসেছে, এখন যেরকম করছে তাতে এ সন্দেহ যে কারোরই হবে। মিহিকও বলতে গেলে কনফার্মের আশেপাশে অবস্থান করছে। তার মনে বার বার একটা কথা বেজে উঠছে,
‘দুই ভাইয়ের এক ভাইও ভালো নয়। ভাই তো, একজনের খারাপ আরেকজনের মাঝে ট্রান্সফার একটু হলেও হবেই।’

দোটানা, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুহূর্ত। কেউই আর কোনো কথা বললো না। কিছুক্ষণ বাদে সিঁড়িতে দ্রুতগামী পদধ্বনির শব্দ পুরো লিভিং রুমের নিস্তব্ধতাকে কাঁপিয়ে তুললো। সবার চোখ পড়লো আষাঢ় আর কারিবের দিকে। সদ্য ঘুম থেকে ওঠায় আষাঢ়ের মুখ ক্লান্ত। কিন্তু তার ক্লান্ত চেহারাটা ঢাকা পড়েছে বিরক্ত, আর ক্রোধের ছায়ায়। তার মুখ দেখলে বিরক্ত আর ক্রোধই সবার চোখে পড়বে। চোখ জোড়া দাবানলের ন্যায় ক্ষিপ্ত।
আষাঢ়কে দেখে সাদিয়ার ঠোঁটে হাসি ফুঁটলো। ওই হাসি আষাঢ়ের কাছে বিষ তুল্য। সে লিভিং রুমে নেমে সোজা সাদিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। কোনো ভণিতা ছাড়াই, নিজের বিরক্তি আর ক্রোধ না ঢেকেই দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“আমার সাথে চলো সাদিয়া।”

সাদিয়া বসা থেকে দাঁড়িয়ে মৃদু কণ্ঠে ডাকলো,
“হিমেল…”

এ তো ডাক নয়, সয়ং তীর এসে কান ছিদ্র করে দিচ্ছে। আষাঢ় আগের মতোই ভণিতাহীন বললো,
“চুপচাপ চলো। আমি তোমাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছি না।”

পরিস্থিতি এমন যে কেউ কোনো কথা বলতে পারছে না। সবটা কান দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে নাড়া দিচ্ছে শুধু।

সাদিয়াকে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আষাঢ়ের মেজাজ চরমে উঠলো। সাদিয়াকে টেনে নেওয়ার মতো কাজ সে আসলেই করতে চায়নি। কিন্তু সে উপায়হীন। সাদিয়ার এক হাত শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে নিলো। নিজ সঙ্গে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
সবাই থ হয়ে ঘটনাটা অবলোকন করলো। যা হচ্ছে সব মাথার উপর থেকে ধোঁয়াশার মতো অতিবাহিত হচ্ছে। শুধু সিনথিয়ার মাঝে তেমন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য হচ্ছে না।
এদিকে কারিবের অবস্থা বেগতিক। মনে হচ্ছে হাত-পায়ে কাঁপন উঠবে তার। হঠাৎ তিন জোড়া বিস্ময়ে ঢাকা চোখ তার উপর এসে পড়লো। সে ঘাবড়ে গেল। গলা শুকিয়ে এলো। উপায়ন্তর না পেয়ে সেও প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।
আষাঢ় বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় এনে সাদিয়ার হাত ছেড়ে দিলো। রাস্তায় তেমন মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ছে না। সে রাগে কটমট করে বলে উঠলো,
“আর ইউ ক্রেজি? আমার বাসায় এসেছো কেন তুমি? কোথায় পেয়েছো আমার বাসার ঠিকানা? কে দিয়েছে তোমায়?”

সাদিয়া আষাঢ়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললো,
“হঠাৎ করে তুমি এমনভাবে উধাও হয়ে গিয়েছিলে কেন হিমেল? কত বার কল করেছি তোমায়। কিন্তু কোনো সংযোগ পাচ্ছিলাম না। কোথায় থাকো কিছু জানি না। পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম আমি।”

“আর তুমি এভাবে আমার বাড়িতে এসে আমায় পাগল করে দিয়েছো। দেখতে পাচ্ছ, আমি কেমন উন্মাদের মতো ছটফট করছি? বলো কোথায় পেয়েছো আমার ঠিকানা? বলো সাদিয়া।”

আষাঢ়ের এই কণ্ঠ, এই ব্যক্তিত্ব অপরিচিত সাদিয়ার কাছে। তার হঠাৎ ভয় করছে আষাঢ়কে। সে গটগট করে সব বলে দিলো,
“আমি অনেক খোঁজ করেছি তোমার। অবশেষে এই এলাকায় বসবাসরত এক আত্মীয়র কাছ থেকে তোমার ঠিকানা মিললো। আমার সে আত্মীয় চেনে তোমাকে। সে-ই বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে।”

“ড্যাম ইট! তোমার আত্মীয়র নাম কী?”

“তুহিন রহমান।”

আষাঢ় কারিবের দিকে তাকালো,
“তুহিন রহমান কে?”

কারিব চেনে। জবাব দিলো,
“শপিং মলের মালিক। বিরাট শপ তার।”

“আমি চিনি না অথচ সে আমায় চিনে বসে আছে। আর চিনে এতবড়ো সর্বনাশ করলো আমার। পারলে ব্যাটার শপ উঠিয়ে নিতাম আমি।”
আষাঢ় সাদিয়ার দিকে মনোযোগ দিলো,
“শোনো সাদিয়া, যা হওয়ার হয়ে গেছে। তোমার সাথে একটা রিলেশনশিপ ছিল আমার। কিন্তু ওটা সেরকম কোনো গুরুতর রিলেশনশিপ ছিল না। আমাদের শুধু ইনস্টাগ্রামে কথা হতো। দেখা হয়েছিল মাত্র দুই দিন। মাত্র দুই দিনের দেখায় তোমার নিশ্চয়ই আমার জন্য পাগল হয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাও হয়েছো। খুঁজতে খুঁজতে বাসা পর্যন্ত চলে এসেছো। এটা ঠিক করোনি। আজকাল রিলেশনশিপের এমন বিচ্ছেদ অহরহ হচ্ছে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমি চাইছি না এটা নিয়ে তুমি ঝামেলা করো। এমনিতেই যে ঝামেলা করেছো তা সামাল দিতে দিতে আমার খবর হয়ে যাবে। তুমি প্লিজ চলে যাও। ভিতরে একটা মেয়েকে দেখেছো? সাদা ড্রেস পরা? ও আমার হবুবউ। ভীষণ সুন্দরী না? হ্যাঁ, ভীষণ সুন্দরী। ওর সাথে আমার বিয়ে আর মাত্র দশদিন পর। এমন সময় তুমি ঝামেলা করো না। কত মানুষের বছরের পর বছর করা প্রেমের সম্পর্কও টেকে না, সেখানে আমার করা কাজটা কোনো কাজই নয়। আমি প্রতারণা করিনি তোমার সাথে। বলতে পারো আমি তোমায় আগাম একটা প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করেছি। পরবর্তীতে
যখন তোমার ব্রেকআপ হবে, তখন তুমি মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকবে এটার কারণে। তখন আমাকে মনে পড়বে তোমার। ভাববে, হিমেল ছেলেটা আসলেই আমার উপকার করেছে। কী বলেছি বুঝেছো?”

“কিছু বুঝিনি। শুধু বুঝলাম তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করছো।”

“আরে পাগল মেয়ে, আমি কি এখন তোমাকে প্রত্যাখ্যান করছি? প্রত্যাখ্যান তো করেছি সেই অতীতেই। তুমি কখনও আমার ভালোবাসা ছিলে না। আমি কি একবারও বলেছিলাম আমি তোমাকে ভালোবাসি? বলিনি। যে তোমাকে ভালোবাসেনি তার জন্য পাগল হয়ে ঝামেলা করো না। আর এমনিতেও আমি মানুষটা কিন্তু ভালো নই। এমন ছেলেকে কোনো মেয়েই লাইফ পার্টনার হিসেবে চাইবে না। হ্যাঁ, দুজন আছে অবশ্য যারা আমাকে লাইফ পার্টনার হিসেবে চায়। কিন্তু ওটা ব্যাপার না। আমি যে পরিমাণ খারাপ তাতে কোনো মেয়ে বিয়ে করবে না আমায়। এমন একটা মানুষের জন্য পাগলামি করবে তুমি? করো না। লক্ষ্মী মেয়ের মতো বাসায় চলে যাও।”

কারিব কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আষাঢ়ের কথা শুনছিল এবং মুগ্ধ হয়ে দেখছিল মানুষটাকে। মানুষটা কি আর সাধেই তার এত প্রিয়? কীভাবে মেয়েদের মানিয়ে ফেলে কে জানে! কত সুন্দর করে বুঝ দিয়ে ঠিকই সাদিয়া নামক সর্বনাশকে তাড়িয়ে দিলো। হ্যাঁ, সাদিয়াকে বুঝিয়ে শুনিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে আষাঢ়। মেয়েটা এমনিতেই বেক্কল, আর অধিক কৌতূহলী। তা না হলে কি এরকম করে বাসা খুঁজে চলে আসে?
আষাঢ় কারিবের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি দিয়ে বললো,
“কী কারিব? কেমন?”

“ছেলে না হলে নির্ঘাত আপনার প্রেমে পড়তাম।”

আষাঢ় হেসে ফেললো কারিবের কথায়। কারিবও হাসলো। হাসতে হাসতেই বললো,
“আপনি অনন্য আষাঢ় ভাই। অন্যরকম এক ক্ষমতা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছেন।”

“এটা প্রশংসা না কটাক্ষ বুঝতে পারছি না কারিব। আমার ক্ষমতা তো মেয়ে ভোলানো। এটা কি প্রশংসার যোগ্য?”

“নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।”

আষাঢ় জোরে হেসে উঠলো। কারিবও আষাঢ়ের সঙ্গ দিয়ে হেসে উঠেছিল, কিন্তু গেটের কাছে নোয়ানার মুখটা দেখে তার হাসি থেমে গেল। আষাঢ়কে বললো,
“আষাঢ় ভাই, ভাবি দাঁড়িয়ে আছে।”

আষাঢ় গেটের দিকে তাকালো। উচ্চ হাসিটা নম্র হয়ে এলো। সে দৌঁড়ে নোয়ানার কাছে গেল।

“কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছো টিউলিপ ফুল? দেখতে পাইনি তো তোমায়। গেটের এখানে না দাঁড়িয়ে থেকে আরেকটু বাইরে নেমেই তো দাঁড়াতে পারতে।”

নোয়ানার বিরক্তবোধ হলো,
“সেটা আমি বুঝবো। ওই মেয়েটা কে ছিল?”

“সাদিয়া? কে হতে পারে ধারণা করো।”

“ইচ্ছা নেই ধারণা করার।”

নোয়ানা চলে যেতে পা বাড়ালো। আষাঢ় বলে উঠলো,
“দাঁড়াও।”

নোয়ানা থামলো। নিজ থেকে পিছন ফিরতে হলো না, তার আগেই আষাঢ় হাত ধরে টান দিয়ে নিজের দিকে ফেরালো। একটু ঝুঁকে, দুই জোড়া চোখ মিলিত করে বললো,
“ওই মেয়েটা কেউ ছিল না, কেউ না। এখানকার হস্তক্ষেপ তো শুধু তোমার।”
একটা হাত বুকের বাঁ পাশে নিয়ে বললো আষাঢ়।

নোয়ানা আষাঢ়ের চোখে শিথিল দৃষ্টি স্থায়ী রেখে বললো,
“কিন্তু আমি আপনার ওই স্থানটি ত্যাগ করতে চাইছি। ওই স্থান থেকে আমাকে বর্জন করুন। এটা সবদিক থেকে ভালো হবে।”

আষাঢ় হাসলো। হাসি আর সরলো না ঠোঁট থেকে। বললো,
“আমাকে হাসিয়ো না নোয়ানা। স্বপ্নে তুমি দারুণ সুন্দর ছিলে। বাস্তবে তাহলে কেন তুমি এমন? এটাই বোধহয় পার্থক্য বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝে। স্বপ্নে খুব দুষ্টুও ছিলে তুমি। দুষ্টু মেয়ের মতো চুমু খেয়ে বসেছিলে আমার ঠোঁটে। ইশ, কী লজ্জাটাই না পেয়েছিলাম আমি তখন! অমন ভাবে চুমু খাওয়া উচিত হয়নি তোমার। যে লজ্জা পেয়েছি তার শোধ দেবে কীভাবে?”
#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ৩২
_____________

আষাঢ়ের কথায় নোয়ানা রাগে ফুঁসে বললো,
“যদি পারতাম তাহলে আপনাকে চড় মেরে আপনার গাল লাল বানিয়ে ফেলতাম।”

নোয়ানার কথার প্রতিক্রিয়ায় আষাঢ়ের মাঝে কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলো না। হাস্য মুখে বললো,
“চড় মেরে গাল লাল বানিয়ে ফেলো তাতে সমস্যা নেই। তবে এই লাল কাটিয়ে দেওয়ারও ব্যবস্থা রেখো। শুধু একটা…”
আষাঢ়ের পরবর্তী কথা তার কণ্ঠতেই থমকে গেল। নোয়ানা আষাঢ়ের অধরে তর্জনী ঠেকিয়ে থামিয়ে দিয়ে বললো,
“চুপ করুন। একদম চুপ হয়ে যান। আপনার এরকম কথা শুনতে শুনতে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি।”
নোয়ানা আঙুল নামিয়ে নিলো।

“আমি কি বলতে চাইছিলাম সেটা কি তুমি জানো?”

“জানি। আপনার কথাবার্তার ধরণ মুখস্থ হয়ে গেছে আমার।”

“তাই? তো বলো তো, কী বলতে চাইছিলাম আমি?”

“বড়ো হয়ে আপনি এমন অসভ্য একজন মানুষ হয়ে উঠবেন এ বিষয়ে আমি অজ্ঞ ছিলাম। সত্যিই বুঝতে পারিনি। আপনি কি জানেন আপনি একজন পাগল?”

“আমি অসভ্য? পাগল?”

“এ বিষয়ে সন্দেহ আপনার মাঝে মানায় না।”

নোয়ানা ঘুরে দাঁড়িয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। বাড়ির ভিতরে ঢুকে সশব্দে বাড়ির গেট বন্ধ করে দিলো। তার পা দুটো বন্ধ গেটের ওপাশেই স্থির দণ্ডায়মান হলো। হৃদয়ে কষ্ট হচ্ছে। আষাঢ়ের সাথে দেখা, কথা হওয়ার পরই তার অন্তঃকরণে একটা চাপা মর্মান্তিক কষ্ট অনুভব হয়। শুধু শুধু কেন এই কষ্টের আগমন? আঁখি কোটর থেকে জল গড়িয়ে পড়লো তার। ওড়না দিয়ে মুছে নিলো। ইদানিং যেন তার মনটা নরম হয়ে উঠছে, আবেগি হয়ে উঠছে। কিন্তু এমনটা তো সে চায় না। নরম, আবেগি মন সে বরাবরের মতো মাড়িয়ে আসতে চায়।

“ভাবির সাথে কী কথা হলো আপনার? উনি আপনার ঠোঁটে এরকমভাবে আঙুল ছোঁয়ালো কেন?”

“এটা মিথ্যা স্বপ্ন বলার ফল কারিব। কখনো কাউকে মিথ্যা স্বপ্ন বলেছো?”

কারিব না সূচক মাথা নাড়লো।

“ভিতরে চলো। সবাইকে মানাতে হবে।”

লিভিং রুমে এখনও হতভম্ব সবাই বসে আছে। এদের ভিতর সিনথি অনুপস্থিত। মেয়েটা যেমন সাইকো, তাতে এটা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে অন্য একজন যোগ হয়েছে, জুন। আষাঢ়কে দেখে লায়লা খানম দাঁড়িয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“ওই মেয়েটা কে আষাঢ়?”

“কেউ না।”

“কেউ না মানে কী? এভাবে বাড়িতে এসে তোমার খোঁজ করলো কেন? তুমিই বা ওর সাথে এরকম আচরণ কেন করলে?”

“ও এর থেকে ভালো আচরণ পাওয়ার যোগ্য ছিল না।”

“শুকরিয়া করো যে তোমার আব্বু বাড়িতে ছিল না। না হলে আজ অনর্থক হয়ে যেত।”

আষাঢ় নিরুত্তর রইল।

“সিনথিয়াকে কী বলবো আমি? ও কী মনে করলো আজ এই ঘটনা থেকে?”

“সিনথিয়াকে আমি মানিয়ে নেবো। এটা নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না আম্মু।”

আষাঢ় কারিবকে ইশারা করলো নিজের সাথে আসতে। কাউকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে উপরে চলে গেল তারা।

রুপালি লায়লা খানমকে হুঁশিয়ার করে বললো,
“দ্রুত সিনথিয়ার সাথে আষাঢ়ের বিয়া দিয়ে দেন আপা। সবে তো একটা মেয়ে আসছে, ভবিষ্যতে যদি আরও মেয়েরা আসা যাওয়া শুরু করে তখন কী করবেন?”

রুপালির কথায় অপ্রস্তুত বোধ করেন লায়লা। এখানে মিহিক উপস্থিত আছে। বাড়ির বউয়ের সামনে তার ছেলেকে নিয়ে এমন একটা কথা বলতে পারে কী করে রুপালি? মাথায় কিছু নেই ওর? সে রুপালির কথা শুনে চুপচাপ থাকলেও, জুন ভাইয়ের সমন্ধে এমন কথা সহ্য করলো না। প্রতিবাদ করে বললো,
“আমার ভাইকে দোষ দেওয়ার চেষ্টা করো না রূপ খালা। সব দোষ ওই মেয়েটার। একশ পার্সেন্ট দোষী ওই মেয়ে।”

মিহিক ঘটনার কালচক্রে ভিতরে ভিতরে ক্লান্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। আজকের দিনটা বড়ো ক্লান্তিময় লাগছে তার। তবে খুশির একটা রেশও ছাপিয়ে আছে সেই ক্লান্তির মাঝে।

_________________

চোখ খুলে যদি দেখা যায় এক জোড়া চোখ তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে, তাহলে কেমন লাগে তখন? অন্য কারো কেমন লাগবে জানে না, কিন্তু শ্রাবণের কাছে ঘটনাটা বিব্রতকর ছাড়া আর কিছুই লাগলো না। শোয়া থেকে দ্রুত উঠে গেল সে। আর মিহিক তখনই বললো,
“আপনিও এত ঘুমাতে পারেন? রোজ তো আজানের সাথে সাথেই ওঠেন। তাহলে আজ এত ঘুমে পেল কেন আপনাকে?”

শ্রাবণ আড়ষ্ট গলায় বললো,
“কয়টা বাজে?”

“বাইরের রোদ দেখে কি মনে হচ্ছে এখন সকাল পাঁচটা বাজে? সাড়ে দশটা বাজে এখন।”

“সাড়ে দশটা?” শ্রাবণের কপালে ভাঁজ পড়লো। এত বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছে? অবশ্য এটাই কি স্বাভাবিক নয়? ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমালে সেই ঘুমের রেশ কখন কাটবে সেটা কে জানে? কিন্তু এলার্ম তো বাজার কথা। না কি বেজেছিল? সে টের পায়নি? গতরাতে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমানোর কারণ, আসলে সে জানতো রাতে তার ঘুম আসবে না। পুরো রাত জুড়ে চেতনা বিলুপ্ত কাজটা তার মাথা খাবে, সেজন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া। ইতস্তত কণ্ঠে বললো,
“সাড়ে দশটায় ঘুম থেকে উঠলেও তো সমস্যা নেই। আজ তো ছুটির দিন। শুধু নামাজটা কাযা গেল! আপনি ডেকে তোলেননি কেন আমাকে?”

মিহিক জবাব দিলো না। খানিকক্ষণ নীরব তাকিয়ে থেকে বললো,
“বিছানার এত পাশ ঘেঁষে কোনো মানুষ শোয়? ভেবে তো ছিলাম ধপাস করে ফ্লোরে পড়ে যাবেন।”

মিহিকের কথায় শ্রাবণ একটুখানি লজ্জা পেল। মাথা নুইয়ে রাখলো।
মিহিক বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিন।”
যাওয়া দিয়ে আবার দাঁড়িয়ে বললো,
“ওহ হ্যাঁ, আপনার ভাইয়ের খোঁজে আজ একটা মেয়ে এসেছিল বাসায়।”

শ্রাবণ চমকে গিয়ে বললো,
“কোন মেয়ে?”

“ধারণা বলছে মেয়েটা আপনার ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড ছিল।”

“আব্বু কি মেয়েটাকে দেখেছে?”

“না, তিনি বাসায় ছিলেন না সে সময়।”

শ্রাবণ স্বস্তি অনুভব করলো।

মিহিক বললো,
“আপনার জন্য না খেয়ে বসে আছি। যান, তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হন গিয়ে।”

শ্রাবণ অবাকপ্রায় হয়ে তাকালো।
মিহিক মুচকি হেসে বললো,
“বউ মানুষ তো, তাই অপেক্ষা করলাম স্বামীর জন্য।”

শ্রাবণের দু চোখে বিস্ময় তরান্বিত। মনের মাঝে খুশির একটা হাওয়া কি বইছে না? হ্যাঁ, বইছে। টের পাচ্ছে সে। বেখেয়ালে প্রকাশ্যেই হেসে ফেললো মিহিকের সামনে।

_________________

“তুমি এত কাঁচা প্লেয়ার আমি আশা করিনি আষাঢ়। তোমার গার্লফ্রেন্ড বাড়ির উপর কীভাবে চলে এলো? তুমি না একটা প্লে-বয়? প্লে বয়দের এমন হলে চলে না।”

পিছনে সিনথির তাচ্ছিল্য কণ্ঠের কথাগুলো শুনে থেমে গেল আষাঢ়। হাতের চকলেটের প্যাকেটটা যথাস্থানে রেখে দিয়ে পিছন ফিরে বললো,
“তোমার মস্তিষ্ক কী দিয়ে তৈরি ভাবলে আমি মাঝে মাঝে কনফিউজড হয়ে যাই সিনথিয়া। তোমার হবু বরের গার্লফ্রেন্ড বাড়ি পর্যন্ত এসে গেছে, আর তুমি এরকম কথা বলছো? আচ্ছা, সত্যি করে বলো তো, তুমি আসলে কী? তুমি মেয়ে তো?”

সিনথি দুর্বোধ্য হাসলো,
“মানে কী? আমাকে ছেলে মনে হয় তোমার?”

“ছেলে নয়। তোমাকে যে আমার ঠিক কী মনে হয় আমি নিজেই সেটা বুঝে উঠতে পারি না। অক্টোপাসের চোখ!”

সিনথির ভ্রু কুণ্ঠিত হলো,
“কী? অক…অক্টোপাসের চোখ মানে?”

আষাঢ় উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলো। সিনথির প্রশ্নের জবাব দিলো,
“কিছুই না। আমি মাঝে মাঝে অর্থহীন সব শব্দের ব্যবহার করি কথার মাঝে। কারিব জানে এটা। জানো না কারিব?”

সামনে চলিত কারিবকে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে আষাঢ়। কারিব দু পায়ে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে বললো,
“হ্যাঁ জানি।”

সিনথি পিছনে সবার অগোচরে মিটিমিটি হাসলো। তারা এখন শপে আছে। কিছু খাদ্য, যেমন- চকলেট, চিপস, বিস্কুট, আইসক্রিম ইত্যাদি কিনতে এসেছে। বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। সিনথিয়ার পরনে সিলভার রঙের একটা হিজাব গাউন। আজ শখ করে পরেছে গাউনটা। সন্ধ্যার পর যখন আষাঢ় এবং কারিব বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিল, তখন একপ্রকার জোর করেই তাদের সঙ্গে এসেছে সে। আষাঢ় কিছুতেই সিনথিকে নিজেদের সঙ্গে আনতো না। কিন্তু সিনথি তাদের সাথে আসার আবদারটা করেছিল লিভিং রুমে বসে। লিভিং রুমে জানালার কাছে চেয়ারে বসে ছিলেন কবির সাহেব। আষাঢ় যখন সিনথিকে নিজের সাথে নিতে অমত করেছিল, তখন তিনি কাঠ স্বরে বলেন,
“সিনথিয়াকে তোমাদের সাথে নিয়ে যাও। কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখাও।”

বাবার কথার উপর কথা বলার উপায় পায় না আষাঢ়। বাধ্যতামূলক সিনথিয়াকে নিজেদের সাথে আনতে হয়েছে। এখানে কেনাকাটা করতে এসেছে ঠিকই, কিন্তু আষাঢ়ের মনোযোগ এখানে নেই। তার চিন্তায় নোয়ানা বিরাজ করছে। বিরাজ করছে সুন্দর একটা প্রোপোজ। কীভাবে নোয়ানাকে প্রোপোজ করবে? সে হঠাৎ পিছন থেকে কারিবকে ডাকলো,
“কারিব…”

কারিব থামলো। আষাঢ় গুটি গুটি পা ফেলে কারিবের কাছে এগিয়ে এসে তার সঙ্গ নিলো। কারিবের ঘাড়ের উপর থেকে একহাত ফেলে ফিসফিস করে বললো,
“তোমার টিউলিপ ভাবিকে প্রোপোজ করতে চলেছি আমি আজ।”

কারিব থেমে গেল। অকস্মাৎ পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। সিনথির ধ্যান তাদের দিকে ছিল না, কিন্তু সে তাকানোতে সিনথির মনোযোগ পড়লো। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন চোখে তাকালো সে। কারিব চোখ সরিয়ে আনলো। আষাঢ়কে নিচু স্বরে বললো,
“আপনার হবু বউ আছে এখানে। তার উপস্থিতিতে এই বিষয়ে এখানে কথা বলা কি ঠিক?”

আষাঢ় চাপা স্বরে বললো,
“ঠিক নয় কেন? সে শুনলেই বা কী? তাকে পরোয়া করে কে? আর আমি তো কথাগুলো ফিসফিস করে বলছি তোমাকে।”

আষাঢ়ের কথায় যুক্তি খুঁজে পেল কারিব। আগের মতো নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কীভাবে প্রোপোজ করবেন আজকে? এখন তো রাত। টিউলিপ ভাবিকে তো বাইরে পাবেন না।”

“বাইরে পাওয়ার কী দরকার? সেদিনের মতো গেট টপকে ঢুকবো চোরের মতো। তারপর তোমার ভাবির সম্পূর্ণ মনটা চুরি করবো।”

কারিব হাসলো। সিনথি পিছনে থেকে আষাঢ় এবং কারিবের কথা বলার সারবস্তু ধরতে পারলো না। আসলে সে ধরার প্রয়োজন বোধ করলো না। তবুও হঠাৎ তার মুখটা বৃষ্টি হবার আগ ক্ষণের মতো মেঘলা রূপ ধারণ করলো।
কেনাকাটা হলো, বাড়ি ফেরা হলো।
যাবতীয় সকল কাজ সেরে ঘুমাতে যাওয়া হলো। আষাঢ়ের চোখ ঘুমহীন। কারিবও জাগ্রত আষাঢ়ের সাথে। আষাঢ় সবটা মনে মনে সাজিয়ে নিচ্ছিল। সবকিছু ঠিকঠাক করে রাত বারোটায় সে ঢুকলো ইদ্রিস খানের বাড়ির গেট টপকে। কারিবকে সাথে আনলো না। বাড়িতেই থাকতে বললো ওকে। ইদ্রিস খানের বাড়িতে ঢুকে প্রথমে সে কল করলো নোয়ানাকে। কয়েক বার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ হলো। ঘুম ঝাড়া কণ্ঠে নোয়ানা, ‘হ্যালো’ বললো।

“কলটা কি আজ বেখেয়ালে রিসিভ হলো?” প্রশ্ন করে আষাঢ়।

বিপরীতে নোয়ানার লঘু কণ্ঠ শোনা যায়,
“এত রাতে কল করে আমার ঘুম ভাঙালেন কেন?”

“অনেক রাতের ঘুম কাড়া অপরাধী তুমি! অন্য মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়ে যে অপরাধ করেছো, সে সকল অপরাধের দায়ভার নিয়ে এত নিশ্চিন্তে ঘুমাও কী করে? ঘুম ছাড়ো। এখনই উঠে এসো। তোমার বাড়ির লনে দাঁড়িয়ে আছি।”

“কী?”

“বাংলা তো স্পষ্টই বোঝো। তাহলে দুবার বলে বোঝাতে হবে কেন? তোমার বাড়ির লনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনই ঘর ছেড়ে বের হয়ে দেখা করো আমার সাথে। হারি আপ!”

“আপনি আবার চোরের মতো গেট টপকে আমাদের বাড়িতে ঢুকেছেন?”

“ঢুকতে হলো। কী করবো আর? তুমি তো আমার জন্য গেট খুলে দেবে না। সুতরাং বাধ্য হয়ে চোরের মতোই ঢুকতে হলো।”

“যেমন চোরের মতো এসেছেন, তেমন চোরের মতোই বেরিয়ে যান।”

“বেরিয়ে যেতে তো আসিনি। তোমার সাথে দেখা করবো বলে এসেছি। দেখা করো আমার সাথে।”

“আমি কি পাগল? না কি বোকা? রাত বারোটায় কেউ একজন আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, ‘আমার সাথে দেখা করো’ আর আমিও পাগলের মতো তার সাথে দেখা করবো? আপনি এক্ষুণি চলে যান।”

“তার মানে দেখা করবে না?”

“পাগল আপনি হতে পারেন, আমি নই।”

“যদি দেখা না করো তাহলে সেটা ভালো হবে না কিন্তু। তোমার বাড়ির সামনে সিনক্রিয়েট করবো আমি। তুমি বেশ ভালো করেই জানো এটা আমার কাছে কঠিন কিছু নয়।”

“হুমকি দিয়ে লাভ নেই, চলে যান।”

“যদি এখনই ঘর থেকে বের না হও, তবে জোরে একটা চিৎকার করে তোমার বাড়ির লোকদের ঘুম থেকে জাগ্রত করবো। এমনকি তাদের এটাও বলে দেবো, আমি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি। আর শুধু এটুকুই বলবো না। আপনার মেয়ে আমাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে এটাও বলবো। ভালো কি হবে সেটা?”

নোয়ানা বিভ্রান্ত অবস্থায় পড়লো। আষাঢ় যে একটা পাগল জানে সে। পাগলের ডাকে সাড়া দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু পাগলের পাগলামিরও কোনো সীমা নেই। পাগলরা সবই পারে।

“কি আসবে?” প্রশ্ন করলো আষাঢ়। গলায় এমন ভাব যেন সে নিশ্চিত নোয়ানা আসবে।

নোয়ানা কিছু না বলে কল কাটলো। আষাঢ় মুচকি হেসে বললো,
“তুমি কিন্তু বোকাই টিউলিপ!”

নোয়ানাকে দেখা গেল কিছুক্ষণ বাদে। তিন্নি হঠাৎ জেগে যাবে কি না সেই নিয়ে সে সংশয়ে ছিল। কথা বলার শব্দে তিন্নির ঘুম হালকা হয়েছে কি না যাচাই করছিল। মনে হয়নি কথা বলা, বা কল আসার শব্দ তিন্নির ঘুমে কোনো প্রভাব ফেলেছে। মেয়েটা ঘুমিয়ে গেলে দুনিয়ার হুঁশ খেয়াল থাকে না। আষাঢ়কে দেখতে পেল উঠোনের চেয়ারে বসে আছে। কী নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে তাকে।
নোয়ানা নিকটে এসে গেলে আষাঢ় বসা থেকে দাঁড়িয়ে বললো,
“দেখা করতে আসার জন্য ধন্যবাদ।”

নোয়ানা আগুন চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আজকে আবার কেন চোরের মতো আমাদের বাড়িতে এসেছেন? সমস্যা কী আপনার?”

“আমার সমস্যার শেষ নেই নোনা। হৃদয়ে সারাক্ষণ সমস্যা লেগেই থাকে। এই সমস্যার প্রতিকার চাই আমি।”

“চলে যান।”

“দেখতে এসেছি তোমায়। এটুকু দেখায় মন ভরেনি। আরও কিছুক্ষণ দেখতে চাই।”

আষাঢ় কাছে এগিয়ে এলো। নোয়ানার বুক ধুকপুক করছে ভয়ে। কী দরকার ছিল আষাঢ়ের কথা মতো এত রাতে এখানে আসার? ভুল হয়ে গিয়েছে, চরম ভুল।

“হাত দাও।”

নোয়ানা ভিতরে ভিতরে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল। কাঠিন্যতা হারিয়ে যাচ্ছিল তার মাঝ থেকে। কিন্তু সে হারাতে দিলো না। কণ্ঠে কাঠিন্য বিরাজ রেখে বললো,
“কেন?”

“বলছি তাই।”

“আপনি বললেই সেটা কেন করতে হবে আমাকে? কেন দেবো হাত?”

“তোমার পালানোর রাস্তায় দ্বিগুণ সিকিউরিটি লাগাবো তাই।”
বলে হেসে হাতের মুঠোয় থাকা রিংটা দুই আঙুল দিয়ে সামনে তুলে দেখালো।

আষাঢ়ের হাতে আংটি দেখে নোয়ানার বুক ধক করে উঠলো। বিস্ময় অবান্তর চোখ জোড়া আষাঢ়ের হাত থেকে মুখে গিয়ে ঠেকলো। আষাঢ়ের ঠোঁটে মৃদু হাসি। আষাঢ়কে অবলোকন করতে লাগলো সে। আষাঢ়ের মাঝে এই মুহূর্তে পাগলামির ছাপ দেখতে পাচ্ছে না। আষাঢ়ের মাঝে নমনীয়তা।
হৃদস্পন্দন তড়িৎ গতি সম্পন্ন হয়ে এলো নোয়ানার। মাথার ভিতর ঝিমঝিম করে উঠলো সূক্ষ্ম ব্যথাদ্বয়। নিঃশ্বাস হয়ে এলো এলোমেলো। কোনো দিক বিবেচনা না করেই সে বিপরীতে ঘুরে ঘরের দিকে ছুটে এলো। কিন্তু বেশিদূর আসতে পারলো না। একটা হাত পিছন থেকে তার হাতকে কব্জা করে নিলো। অসহায়ের মতো থেমে যেতে হলো তাকে।
আষাঢ় খানিক অবাক সুরে প্রশ্ন করলো,
“হোয়াট’স ইওর প্রবলেম টিউলিপ? এরকম করলে কেন তুমি?”

নোয়ানার দু চোখ লাল হয়ে উঠেছে। লাল চোখ আবার অশ্রুসিক্ত। আষাঢ়ের হাত থেকে নিজের হাতকে মুক্ত করে নিতে ব্যস্ত হয়ে বললো,
“ছাড়ুন আমায়।”

আষাঢ় তো হাত ছাড়লোই না, বরং আরও শক্ত করে হাতটা চেপে ধরে নিজের দিকে ফেরালো নোয়ানাকে। আষাঢ় এই মুহূর্তে রাগান্বিত। নোয়ানার কাছ থেকে এমনটা আশা করেনি সে। শক্ত কণ্ঠে বললো,
“তুমি আমার। তোমাকে ধরে রাখবো, কি ছেড়ে দেবো সেটা একান্ত আমার ব্যাপার।”

নোয়ানার মুখমন্ডল কাঁপছে। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো জলধারা। বললো,
“আমি আপনার নই।”

“অবশ্যই তুমি আমার। সব সময়ের জন্যই আমার। মৃত্যু পর্যন্ত আমারই থাকবে।”

“আপনি যেটা করতে চাইছেন সেটা ভুল।”

“আমি নিশ্চিত, এই ভুল করে কখনও আফসোস করতে হবে না আমার। সুতরাং আমি এই ভুল করবো।”

আষাঢ় নোয়ানার হাতে রিং পরিয়ে দিতে উদ্যত হলো। নোয়ানা হাত ছাড়িয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু সে ব্যর্থ। আষাঢ় শক্ত বাঁধনে তার হাত আঁকড়ে ধরে আছে। নোয়ানা গলায় জোর দিয়ে বললো,
“হাত ছাড়ুন আষাঢ়।”

আষাঢ় শুনলো না। নোয়ানা হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকায় রিং পরাতে কিছুটা বেগ পেতে হলো। শেষ পর্যন্ত সে সকল বেগ কাটিয়ে জোর করে রিং পরিয়েই দিলো। দেওয়ার পর নোয়ানার হাতটাও ছেড়ে দিলো।
নোয়ানা স্থবির হয়ে গেল। তার দৃষ্টি এখন নিজ হাতের অনামিকায়। যেখানে একটি রিং উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ রিংটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে আষাঢ়ের দিকে দৃষ্টি দিলো। দৃষ্টিতে কোনো আনন্দ নেই। গাঢ় কালো রং ছুঁয়ে আছে আঁখিতে। অভিমানের আঁচড় টানা। টপটপ করে জল পড়ছে শব্দহীন। বহু কষ্টে ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে বললো,
“আপনি পাগল, বদ্ধ উন্মাদ হিমেল!”

“কোনো সমস্যা নেই। আমার মতো পাগল, বদ্ধ উন্মাদের সাথে থাকতে পারবে তুমি।”

“আপনার পাগলামি বাস্তব জগতের সাথে মানানসই নয়। আপনি পাগলামি করতে পারেন, কিন্তু এটা মানুষ মানতে পারে না। যেখানে আপনার ঘরে আপনার হবু বউ আছে, সেখানে আপনি অন্য একজনকে কীভাবে আংটি পরিয়ে দিলেন?”

“যেভাবে দেখেছো, সেভাবেই। তবে আমি জোরপূর্বক আংটি পরাতে চাইনি। আমি শান্তভাবে আংটি পরাতে চেয়েছিলাম।”

নোয়ানা চোখ বুজে ফেললো। নিজেকে ধাতস্থ করে ক্ষণিকের ভিতর আবার চোখ খুলে বললো,
“দেখুন, আপনার পাগলামি থামান। আপনার মা-বাবা পছন্দ করে সিনথিয়াকে নির্বাচন করেছে। সুষ্ঠুভাবে বিয়েটা করে নিন।”

“সম্ভব নয়। আমি যে পণ করে ফেলেছি, বিয়ে করলে তোমাকেই করবো।”

নোয়ানা অতিষ্ঠ হয়ে বলে উঠলো,
“আপনি কি বুঝতে পারছেন না? আপনি যেটা করছেন সেটা পাগলামি ছাড়া কিছু নয়! আমাকে বিয়ে করবেন বলছেন এটাও আপনার পাগলামি। দয়া করে এটা বন্ধ করুন। আপনি আমাকে বিয়ে করবেন বলছেন। কিন্তু আপনার একার কথায় তো কিছু যায় আসে না। আপনার মা-বাবা কেন আপনার পাগলামিতে সামিল হবে? কেন আমার মতো অনাথ, আশ্রিতা একটা মেয়েকে ছেলের বউ করবে তারা? যেখানে তারা সিনথিয়ার মতো সুন্দর একটা মেয়েকে আপনার জন্য পছন্দ করে রেখেছে!”

“সিনথিয়া কোনো ব্যাপার নয়, সে খুব দ্রুত ইন্ডিয়া ব্যাক করবে, আর আমার হবু বউ সিলটাও উঠে যাবে তার থেকে। আর বাকি রইল আমার মা-বাবা। তুমি তো অনাথ, আশ্রিতা নও। সবকিছুই আছে তোমার। মা-বাবা না থাক, মা-বাবার মতো চাচা-চাচি আছে তোমার। বলতে গেলে মেয়ের মতোই আছো তাদের কাছে। তুমি অনাথ এটা কোনো ফ্যাক্ট নয়। আমার মা-বাবা এমন মানসিকতার নয় যে একটা অনাথ মেয়েকে ছোট করে দেখবে তারা। আমি যদি বলি তোমাকে বিয়ে করবো তাহলে তোমার সাথেই বিয়ে দেবে।”

নোয়ানা তাচ্ছিল্য হাসলো,
“আপনি অনেক কিছুই জানেন না আষাঢ়। ভাবছেন আপনার মা-বাবা আপনার পাগলামি মেনে নেবে, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তারা মানবে না। কারণ, এটাই বাস্তবতা। আপনি বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। আপনার বসবাস পাগলামির রাজ্যে। যেখানে শুধু পাগলামি করে বেড়ান আপনি। যদি বাস্তব জগতে পা রাখেন তাহলে দুরূহ অবস্থায় পড়বেন। সুতরাং এই পাগলামির এখানেই ইতি ঘটান।”

“এটা পাগলামি নয়।”

“আমি পাগলামি ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছি না।”

“ঠিক আছে ধরে নিলাম আমি পাগলামি করছি। আমি একটা বদ্ধ উন্মাদ। তো এখন তোমার খবর কী? তুমি কি বিয়ে করতে চাও না এই উন্মাদকে? ভালোও কি বাসো না?”

নোয়ানা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো এই প্রশ্নের সামনে। হৃদয় দগ্ধ হচ্ছে। পুড়ে পুড়ে নিঃশেষ হচ্ছে। অতি কষ্টে নিজেকে কঠিন রাখার চেষ্টা করে ধীর কণ্ঠে বললো,
“পাগল আপনি হতে পারেন, আমি না। আপনার পাগলামির সাথে সামিল হলে জীবন চলবে না আমার।”

বলে হাতের আংটিটা খুলে ছুঁড়ে ফেললো ঘাসের উপর।
এই মুহূর্তে আষাঢ়ের নিঃশ্বাস আটকে এলো। হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হলো। রক্ত ক্ষরণ হয়ে যেন তলিয়ে যাচ্ছে তার বুক। অতলস্পর্শে কী এক নিদারুণ কষ্ট! মুহূর্তেই চোখ ফেঁটে জল এলো তার। রক্তলাল চোখে এমন জলের আগমন শেষ কবে ঘটেছিল? হৃদয় হাহাকার করে উঠলো। ঘাসের উপরে পড়ে থাকা আংটির উপর থেকে চোখ সরিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিষ্ঠুর মেয়েটার দিকে তাকালো। চারটি অশ্রুপূর্ণ চোখ একসাথে মিলিত হলো। ক্ষণকাল একসাথে মিলিত হয়ে রইল। প্রথমে চোখের এই মেলবন্ধন ভাঙলো নোয়ানা। ঘুরে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো ঘরের দিকে। আর তখনই আষাঢ় পিছন থেকে বলে উঠলো,
“তোমার ব্যবহারে আজ আমি খুব কষ্ট অনুভব করলাম টিউলিপ। বিশ্বাস করো, একদম হৃদয়ে এসে লেগেছে। এত সুন্দরভাবে হৃদয়ে আঘাত করতে কীভাবে শিখলে?”

আষাঢ়ের কণ্ঠ কানে আসায় দাঁড়িয়ে গেল নোয়ানা। তার হৃদয়ে কি কষ্ট হচ্ছে না? হু, হচ্ছে। কিন্তু এই কষ্টকে তোয়াক্কা করলে হবে না। কষ্টকে চাপা দিয়ে শীতল গলায় বললো,
“এখন শুধু আপনি একা কষ্ট পাচ্ছেন, কিন্তু আপনার এই পাগলামিতে সবাই কষ্ট পেতো। একা কষ্ট পেয়ে অন্যদের কষ্ট না পেতে দেওয়াই ঠিক কাজ।”

আষাঢ়ের হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হচ্ছে। এই ভীতু মেয়েটা এভাবে কষ্ট দেবে সত্যি জানতো না সে। এই রাত্রি হাওয়াও যেন আজ বিক্ষিপ্ত। পরতে পরতে করুণ সুর তুলছে। হৃদয়ের হাহাকার পূর্ণ কষ্ট মুখ ফুঁটে শুধু একটা বাক্য স্বরূপই বেরিয়ে এলো,
“তোমার মতো এত হার্টলেস মেয়ে আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি টিউলিপ!”

বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না আষাঢ়। ঘাসের উপর থেকে রিংটা তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল গেটের দিকে।
নোয়ানা পিছন ফিরে তাকালো না। আজকের এই অভিমানী আষাঢ়কে পিছন ফিরে দেখলো না একবার। কষ্টকে তোয়াক্কা না করে পারছে না সে। হৃদয় ভার হয়ে আছে কষ্টে। কষ্ট করে হলেও পা দুটো টেনে এগিয়ে যেতে লাগলো ঘরের দিকে।

(চলবে)
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here