বিবর্ণ জলধর পর্ব -৩৭+৩৮

0
48

#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ৩৭
_____________

গাড়ির ভিতরের বাতাসও যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে রইল। নোয়ানা অপলক দু চোখে বিস্ময় রাজ্য নিয়ে তাকিয়ে রইল আষাঢ়ের দিকে। ক্ষণকালের পিনপতন নীরবতা কাটিয়ে আষাঢ়ের কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো,
“ভয় পাচ্ছ টিউলিপ? বিয়ের কথা বলছি বলে?”

নোয়ানার চোখের পলক পড়লো। স্তব্ধ হৃদয় চলিত বাতাসে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাসের স্বাদ গ্রহণ করলো। অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিয়ে খানিক বাদে আবার তাকালো। এই চোখে এক ধারালো ব্যাপার আছে। এই চোখের রহস্য আষাঢ় আজও বুঝলো না। চোখ জোড়া হৃদয়ে কোমল অনুভূতির চাদর বিছিয়ে দেয়।

নোয়ানা স্পষ্ট গলায় বললো,
“আশা রাখি আপনি এতটাও পাগল নন।”

আষাঢ় ওষ্ঠ্য বাঁকিয়ে হাসলো। হাসতে হাসতে দৃষ্টি নত করে, এরপর আবারও চাইলো নোয়ানার চক্ষু পানে। কেমন মন্থর কণ্ঠে বললো,
“তোমার মাঝে কী আছে টিউলিপ? আমার এমন কেন মনে হয় যে তুমি জাদু করেছো আমায়? আমি এত কেন গাঢ় অনুভূতি অনুভব করি তোমার জন্য? তুমি কি সত্যিই জাদু করেছো? তুমি কি জাদুরানি?”

নোয়ানার মনে হলো সে কোনো উন্মাদের প্রলাপ বকা শুনছে। উন্মাদই তো! আষাঢ় তো উন্মাদের থেকে কোনো অংশে কম নয়। তবে প্রশ্ন– কেন এই উন্মাদের প্রলাপ বাক্য শুনে হৃদয় উথাল-পাথাল হচ্ছে? কেন হৃদয় হাহাকার করে মরছে? নোয়ানা নিজেকে শক্ত করে নিয়ে বললো,
“পাগলের পাগলামি করতে জাদুর প্রয়োজন হয় না।”

“এতবার পাগল শব্দটা উচ্চারণ করো না। আজকাল শব্দটা শুনতে কেন যেন কষ্ট হয়। আর শুধু আমার দিকটা না ভেবে নিজের দিকটাও ভেবো একটুখানি। আমি পাগল হলে, তুমিও তো পাগলি। তুমি কেন ভালোবাসো আমায়?”

“কে বলেছে আমি আপনাকে ভালোবাসি?”

“বাসো না?”

“না।” দৃঢ়তার সাথে প্রত্যুত্তর দিলো নোয়ানা। যদিও অন্তঃকরণে দৃঢ়তার লেশমাত্র নেই।

আষাঢ়ের দিক থেকে আর কোনো কথা শোনা গেল না। সে ঘাড় ফিরিয়ে সোজা হয়ে বসে সিটে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলো। মানুষের শান্তিপূর্ণ জীবন ক্ষণিকেই অশান্তিতে প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখে।

দীর্ঘ পথের পর যখন গাড়ি থামলো, নোয়ানা ব্যস্ত হলো আশপাশ পর্যবেক্ষণ করতে। জায়গাটা চেনা চেনা লাগছে একটু। আগে এসেছিল?

“নামো।”
নোয়ানার সিটের পার্শ্ব সিটের দিকে থাকা দরজা খুলে বললো আষাঢ়। নোয়ানা বিনা বাক্যে নামলো। হ্যাঁ এই জায়গা পরিচিত। সামনে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ।

“চিনতে পেরেছো জায়গাটা?”

“না।” চিনতে পেরেও অস্বীকার করলো নোয়ানা।

“তুমি ভুলে যাওয়ার পাত্রী নও। নিজের দুঃখী জীবনী শুনিয়েছিলে আমাকে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে।”

“আমার ওসব কিছুই মনে নেই। আপনারও ভুলে যাওয়া উচিত ছিল।”

“অভিনয় তুমি জানলেও, আমি জানি না।”

“এখানে নিয়ে আসার মানে কী?”

“কোনো মানেই নেই, ইচ্ছা হয়েছে তাই এনেছি। হাতের আংটি খুলে ফেলো।”

“হাতের আংটি খুলবো মানে?”

“নিজ থেকেই খোলো। আমার খুলতে হলে সেটা ভালো হবে না।”

“এটা অতিরিক্ত আষাঢ়। আপনার এমন করার কোনো মানেই নেই।” নোয়ানার কণ্ঠ ক্ষিপ্র হলো।

আষাঢ় সে ক্ষিপ্রতা গায়ে মাখলো না। এগিয়ে এসে নোয়ানার হাতটা হাতে তুলে নিলো। নোয়ানা রুষিত কণ্ঠে বললো,
“দিস ইজ টূ মাচ! লেট গো অব মাই হ্যান্ড রাইট নাও।”

আষাঢ় শুনলো না। আংটি খোলার জন্য উদ্যত হলেই নোয়ানা অন্য হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো। কারিব চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলো সব। নোয়ানা প্রায় চিৎকার করে বললো,
“আপনার এরকম করার মানে কী হিমেল? কেন করছেন আপনি এরকম? শুধু শুধু এরকম করা বন্ধ করুন। অশান্তির সৃষ্টি করবেন না দয়া করে।”

“আমি এরকম কেন করছি তুমি জানো না?”

“না, জানি না। আমাদের মাঝে তেমন কোনো সম্পর্ক নেই যাতে আপনি এরকম করবেন। আপনিই বলুন আছে আমাদের মাঝে তেমন কোনো সম্পর্ক?”

“তুমি বোকামি করছো টিউলিপ।”

“বোকামি আপনি করছেন। আপনি অবুঝ। আপনি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবছেন। বাকিদের নিয়েও ভাবা উচিত আপনার। আর কাউকে না, আপনি শুধু নিজের মা-বাবাকে নিয়ে একটু ভাবুন। আপনি যেরকম করছেন তাতে তারা কষ্ট পাবে। যেখানে তারা ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে ঠিক করেছে, সেখানে তাদের ছেলে অন্য একটা মেয়ের জন্য শুধু শুধু পাগলামি করছে। তাও আবার অনাথ একটা মেয়ে! এটা ভেবে নিশ্চয়ই তারা শান্তি অনুভব করবে না? আর কেনই বা তারা আমার মতো অনাথ-আশ্রিতা মেয়েকে গ্রহণ করবে?”

“তুমি বার বার অনাথ-আশ্রিতা শব্দ দুটোকে কেন হাইলাইট করো? এই শব্দ দুটো বড়ো পানসে। তোমাকে যদি নাঈমের মা-বাবা গ্রহণ করতে পারে, তাহলে আমার আব্বু-আম্মু কেন পারবে না? আমার আব্বু-আম্মুকে কী মনে হয় তোমার?”

নোয়ানার মুখ বেঁকে কান্না আসতে চাইছে। এত কেন কষ্ট হয় অন্তরে? কিছুক্ষণ কান্না করা প্রয়োজন এখন। কিন্তু এখানে আষাঢ়ের সামনে কান্না করা কি শোভা পায়? নোয়ানা বললো,
“নাঈমের সাথে আমার বিয়ে, এর কোনো নড়চড় হবে না।”

আষাঢ়ের রাগ ক্রমশ বেড়ে চললো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“আমি চাইলে হাজার বার হবে।”

বলেই এগিয়ে এসে নোয়ানার আঙ্গুল থেকে আংটি খুলে ফেললো, বাধা দিয়েও আর কাজ হলো না। আষাঢ় আংটি ছুঁড়ে ফেললো না, আংটিটা নোয়ানার হাতে গুঁজে দিয়ে বললো,
“এই আংটি যদি আবারও কখনও পরতে চাও, তাহলে তোমার আঙুল কেটে ফেলবো।”

নোয়ানার চোখের অশ্রু অবাধ্যর মতো চিকচিক করে চোখের কার্নিশে। আষাঢ় ওর দু চোখে চেয়ে বললো,
“এখনও কি বলবে ভালোবাসো না? ভালোই যদি না বাসো তাহলে কাঁদো কেন?”

নোয়ানা জলপূর্ণ চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। অতঃপর মাথা নত করে, চোখ মুছে, আংটিটা পরে নিলো আবার।

আষাঢ় বাকরুদ্ধ হয়ে দেখলো। মেয়েটা ইদানিং তার ধারণার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নোয়ানা চোখ তুলে তাকিয়ে বললো,
“এসব বন্ধ করুন। আপনার পাগলামি অহেতুক। এর ইতি ঘটান। আমি চাইছি না আমার বিয়েতে কোনো প্রকার ঝামেলা হোক।”

আষাঢ়ের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে। দুই হাত দিয়ে মাথার ছোট ছোট চুলগুলো আঁকড়ে ধরে কেমন অসহ্যকর একটা ভঙ্গি করে হাত নামিয়ে এনে বললো,
“উহ তুমি এত কেন বিরক্তিকর? বলো কেন এত বিরক্তিকর তুমি? আমি তো তোমার এমন রূপ দেখতে দেখতে প্রচণ্ড বিরক্ত। তুমি কি নিজেকে একটু অনুধাবন করে বুঝতে পারছো না তুমি কতটা বিরক্তিকর হয়ে উঠছো? নাঈমকে বিয়ে করার কথা চিন্তা করো কীভাবে? তুমি তো বেচারা নাঈমের জীবনটা নষ্ট করে দেবে। বিয়ে করবে ওকে, অথচ তোমার মনে তো আমি পড়ে থাকবো।”

নোয়ানা স্থির তাকিয়ে রইল, অশ্রু ল্যাপ্টানো চোখ জোড়া সরলো না আষাঢ়ের চোখ থেকে। কণ্ঠে জোর দিয়ে বললো,
“আমি এত পাগল নই যে স্বামী থাকতে অন্য কাউকে মনে রেখে বসে থাকবো। একেবারেই ভুলে যাব আপনাকে। আপনার এই পাগলামিগুলোও মনে পড়বে না আমার।”

নোয়ানার সাধারণ কথাগুলো অসাধারণ সুনিপুণ ক্লেশ বুনতে লাগলো আষাঢ়ের অন্তঃকরণে। সে আরক্ত কণ্ঠে বললো,
“কী বললে?”

“আশা করি আপনিও আর মনে রাখবেন না আমায়।”

আষাঢ়ের বুকে কষ্ট কাঁটার মতো এসে বিঁধে বসলো। দু চোখে গাঢ় অভিমান, অবিশ্বাস জড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে বোঝাতে বোঝাতে সে ক্লান্ত হয়ে গেছে। সত্যি, বড্ড ক্লান্ত সে। সহসা নোয়ানার কপালে কপাল ঠেকালো। নোয়ানা চমকালো না, কিছু বললো না, এমনকি নড়লোও না।
আষাঢ় বললো,
“এটা কীভাবে বললে নোনা? ভুলে যাবে আমায়? কীভাবে ভুলবে? মানুষ মানুষকে কীভাবে ভুলে যায়? তুমি তো আমার মানুষ। আমার মানুষ হয়ে আমাকেই ভুলে যাবে?”

নোয়ানার দর্শনেন্দ্রিয় হতে টুপ করে জলধারা গড়িয়ে পড়ছে। এই মুহূর্তে তার হৃদয়ে প্রবাহমান কষ্টগুলো ব্যক্ত করার ইচ্ছা হলো আষাঢ়কে। কিন্তু গলার কাছে কিছু একটা বিঁধে আছে। বাতাসে বাতাসে সংঘর্ষ হয়ে যেন সাবধান করছে, দুর্বল হয়ে পড়ো না।
আসলেই, যারা নিদারুণ কষ্টের মাঝে থেকে বড়ো হয় তাদের কোনো কিছুর জন্য দুর্বল হয়ে পড়াটাও যেন একটা পাপ। এই পাপ থেকে বিরত থাকতে চায় সে।

আষাঢ়ের কণ্ঠ শোনা গেল ফের,
“আমি খুব ক্লান্ত নোয়ানা, খুবই ক্লান্ত। তুমি সবাইকে নিয়ে ভাবলেও আমাকে নিয়ে একদমই ভাবো না। বুকের বাম পাশটা স্পর্শ করে দেখো, আশা করি তুমি অনুভব করতে পারবে, আমি আসলেই কষ্টে আছি।”
একটু থেমে আবার বললো,
“তুমি সকলকে সুখী রাখতে গিয়ে একটা মানুষকে কিন্তু নির্মম কষ্ট দিচ্ছ! সবাই যতটা কষ্ট পেত, সকলের কষ্টের সমষ্টির দ্বিগুণ কষ্ট এখন শুধু এই একটামাত্র মানুষ পাচ্ছে। এটা ঠিক নয়। একদমই ঠিক নয়।”

নোয়ানা নীরব। আষাঢ়ের কথাগুলো কর্ণপাত হয়ে হৃদয় বিক্ষত করে তুলছে। আষাঢ় কপাল সরিয়ে নিলো কপাল থেকে। নোয়ানার দিকে তাকালো না একবারও।
কারিবের দিকে এগিয়ে এসে বললো,
“ওকে বাড়িতে নিয়ে যাও।”

কারিব সবকিছুর প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আষাঢ়ের কথায় সম্বিৎ ফিরলে বললো,
“আপনি বাড়ি যাবেন না?”

“যাব, একা একা। বিরক্তিকর মানুষটার সাথে যেতে ভালো লাগবে না। তাকে বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত আমি!”
বলে কারিবের পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
কারিব কথাটা অনুধাবন করার চেষ্টা করে নোয়ানার দিকে তাকালো। মেয়েটার চোখ জলে ভিজে আছে। কারিবের ইচ্ছা হচ্ছে নোয়ানাকে কঠিন কিছু বলতে। মেয়েটা আসলেই খুব বিরক্তিকর! কাঁদছে অথচ তাও মুখে একটু নরম হবে না। মেয়েরা আসলেই খুব কঠিন ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কথাটা হঠাৎ কেন মনে উদয় হলো জানে না, তবুও হলো।

_________________

তমসাচ্ছন্ন রাত্রি। ক্ষুদে বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে। বাগানের হাস্নেহেনা নিজের সুগন্ধ বিলিয়ে দিয়েছে বাতাসে।
মিহিকের গায়ে শাল জড়ানো। বাসার পাশের ছোট্ট বাগানে এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে। বিকেল থেকে গায়ে শাল জড়িয়ে হাঁটছে সে। আজ যে শ্রাবণের কারণে বৃষ্টিতে ভিজেছিল। জ্বর আসবে সেই আশঙ্কায় আছে। থার্মোমিটার দিয়ে অযথাই কয়েকবার তাপমাত্রা মাপা হয়ে গেছে। জ্বর আসেনি এখনও। সন্ধ্যার ঘটনাটা মাথা থেকে যাচ্ছে না। সে তখন লিভিং রুমে বসেছিল। সে সময় আষাঢ় এসেছিল বাইরে থেকে।
কোনোদিক দৃষ্টিপাত না করে আষাঢ় সোজা সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু অর্ধ পথে গিয়ে মিহিক সোফায় বসে আছে খেয়াল করলো। অতিক্রম করা পথ পিছু হটে এসে মিহিককে বললো,
“তোমার বোনের মতো হার্টলেস মেয়ে এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আর নেই বোধহয়!”

কথাটা যখন বলেছিল মিহিক প্রত্যক্ষ করেছিল আষাঢ়ের মাঝে রাগ। এই একটা কথাই শুধু বলেছিল আষাঢ়। তারপর পায়ের গতি বাড়িয়ে গটগট করে চলে যায়। হঠাৎ আষাঢ় এরকম একটা কথা বললো কেন বুঝতে পারেনি মিহিক। এখনও বুঝতে পারছে না। কোন বোনের কথা বলেছে ভাবতে নোয়ানার নামটাই মনে এসেছিল প্রথমে। কী হয়েছে বিষয়টা যাচাই করতে নোয়ানাকে কল করেছিল। আষাঢ় এরকম একটা কথা কেন বলেছে জানতে চাইলে নোয়ান বলেছে,
“কেন এরকম কথা বলেছে সেটা ওনাকেই জিজ্ঞেস করো। আমি কিছু জানি না।”

এর বেশি কিছু আর বলেনি নোয়ানা। বিষয়টা কেমন যেন লাগছে মিহিকের। স্বাভাবিক লাগছে না ঠিক। ঘোলাটে ঘোলাটে! হঠাৎ করে আষাঢ় কেন এরকম একটা কথা বলবে? কারণ কী? ভেবে পাচ্ছে না। পায়চারি করতে শুরু করলো। বাগানের এ মাথা থেকে ও মাথা একবার হেঁটে আসতেই হুট করে শ্রাবণ উপস্থিত হলো। এসেই বিরক্ত ধরানো কথাটা বললো,
“আপনি এখনও শাল পেঁচিয়ে ঘুরছেন?”

মিহিক অসহ্য চাহনিতে তাকালো। এমনিতেই সে চিন্তাতে মগ্ন, মেজাজে কিছুটা বিঘ্ন ঘটিয়ে বললো,
“আমার জ্বর এলে এর জন্য আপনিই দায়ী থাকবেন। আপনি একজন অপরাধী, ভুলে যাবেন না।”

শ্রাবণ হাসলো। মিহিকের চিন্তারা টুপ করেই কেটে পড়লো। দৈবাৎ প্রশ্ন করলো,
“রুমকি খুব শীঘ্রই ওর স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়ি আসছে, জানেন?”

শ্রাবণের হাস্য আভা মুখে আঁধারের ঘনঘটার সৃষ্টি হলো। একটুখানি হয়ে গেল মুখ। রুমকি! শ্রাবণের মনে পড়ে যায় তার প্রথম প্রেমের মানুষটার নাম রুমকি ছিল। একটু কষ্ট অনুভব হয় হৃদয়ে।
মিহিক শ্রাবণের মুখ লক্ষ্য করে বললো,
“কী ব্যাপার? গার্লফ্রেন্ডের শোকে কাতর হয়ে উঠছেন?”

শ্রাবণের মুখ একটুখানিই হয়ে রইল। শুকনো মুখে বললো,
“সারারাত বাইরে থাকবেন না নিশ্চয়ই? ভিতরে আসুন।”

বলে ঘরের দিকে পা বাড়িয়ে দিলো। কয়েক পা হেঁটে আসতেই পিছন থেকে ডাকলো মিহিক,
“দাঁড়ান।”

শ্রাবণ দাঁড়ালো। পিছন ঘুরলেই দেখলো মিহিক একটা হাস্নেহেনা ফুল বাড়িয়ে আছে ঠিক তার মুখ বরাবর। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে মিহিক বললো,
“হাস্নেহেনা আমার প্রিয় ফুল!”

শ্রাবণের মুখে লজ্জার ছটা লাগলো। লজ্জায় দৃষ্টি নত হয়ে এলো। স্ত্রী তার দিকে নিজের প্রিয় ফুল বাড়িয়ে দিয়েছে। কী মিষ্টি একটা ব্যাপার, সেই সাথে দারুণ লজ্জার! ফুলটা গ্রহণ করা উচিত। শ্রাবণ লজ্জা ধামাচাপা দিয়ে ফুলটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালে ফুলটা ধরার আগেই মিহিক সেটা সরিয়ে নিলো। চুমু খেলো ফুলে, আর তারপর ফুলটা গুঁজে দিলো শ্রাবণের কানে। শ্রাবণ হতবিহ্বল হয়ে গেল।
মিহিক হাস্য মুখে বললো,
“প্রিয়র জন্য একটি প্রিয় ফুল!”

শ্রাবণ বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। মিহিকের কাছ থেকে প্রশ্ন এলো,
“আপনার প্রিয় ফুল কী?”

শ্রাবণ অপ্রস্তুত কণ্ঠেই উত্তর দিলো,
“কৃষ্ণচূড়া।”

“পরের বছর অপেক্ষা করে থাকবো, কৃষ্ণচূড়া উপহার দেবেন আমায়। ঠিক আছে?”

শ্রাবণ মাথা দোলালো। মিহিক মুচকি হেসে ঘরের অভ্যন্তরে চলে গেল।
#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ৩৮
_____________

চায়ের কেটলি হতে চা ঢেলে কাপ পূর্ণ করলো রুপালি। অতঃপর কাপটা এগিয়ে দিলো লায়লা খানমের দিকে। নিচু কণ্ঠে লায়লা খানমকে শুধালো,
“আপা, একটা কথা আছে আপনার সাথে।”

“বলো।”

রুপালি বসে পড়লো লায়লা খানমের পাশে। আগের মতো নিচু স্বরে বললো,
“শ্রাবণরে জ্বীনে ধরছে আপা।”

লায়লা খানম চমকে তাকায়। সম্মুখ সোফায় বসে পেপার পড়ছিলেন কবির সাহেব। তার পাশেই জুন। রুপালি নিচু স্বরে বললেও শুনতে পেয়েছে তারা দুজন। কবির সাহেব বললেন,
“কীসে ধরেছে শ্রাবণকে?”

“জ্বীনে স্যার, জ্বীনে।”

জুন হেসে ফেললো,
“কী বলছো রুপ খালা? জ্বীনে ধরেছে ভাইয়াকে?”

“হ।”

জুন যেন একটু ক্ষেপলো ভাইয়ের সম্পর্কে এমন বলায়,
“আজগুবি কথা বলো না রূপ খালা।”

“আজগুবি কথা কী? শ্রাবণরে সত্যিই জ্বীনে ধরছে। আমি নিজ চোখে দেখছি।” রুপালি লায়লার দিকে মনোনিবেশ করে বললো, “আপা, আমি সত্যি বলতেছি। শ্রাবণরে জ্বীনে ধরছে। গত রাত্রে শ্রাবণ কানে ফুল গুঁইজা বাগানে ঘুরছে। এমনকি ঘরে যখন ঢুকছে তখনও কানে ফুল ছিল। আমি ঘরে বসে সবই দেখছি। আপনিই বলেন, যদি জ্বীনেই না ধরবে তাইলে কানে ফুল গুঁজবে কেন?”

“কী বলছো রুপালি? শ্রাবণ কানে ফুল গুঁজবে কেন?”

“সেটাই তো, জ্বীনে না ধরলে কেউ এই কাজ করে?”

লায়লা খানম ঈষৎ চিন্তার ছাপ ফেললেন মুখে। শ্রাবণকে জ্বীনে ধরেছে এটা সে বিশ্বাস করেনি, কিন্তু শ্রাবণ কানে ফুল গুঁজে ঘুরেছে ব্যাপারটা একটু চিন্তারই বটে।
কবির সাহেব আর জুন নীরব তাকিয়ে আছে। রুপালি বললো,
“শুধু তো কানে ফুল গুঁজছে, ভবিষ্যতে যদি কাঁচা মাছ-মাংস খাওয়া শুরু করে তখন কী করমু আমরা? শেষ পর্যন্ত আমাগো বাড়ির পোলারে জ্বীনে ধরলো!”

কবির সাহেব কিঞ্চিৎ বিরক্তির সুরে বললেন,
“আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে মারা বুদ্ধিমানের কাজ নয় রুপালি। কানে ফুল গুঁজলেই কি তাকে জ্বীনে ধরেছে?”

রুপালি জবাব দিলো,
“মেয়ে হয়ে কানে ফুল গুঁজলে তো সমস্যা ছিল না, কিন্তু শ্রাবণ তো মেয়ে না। সে হইলো পোলা। পোলা মানুষ হয়ে ফুল কানে গোঁজা কী কোনো স্বাভাবিক ঘটনা স্যার? জীবনে কখনও আর শ্রাবণরে এমন কাজ করতে দেখি নাই। হঠাৎ করে কেন করবে এরকম কাজ? আমার মন বার বার কইতেছে শ্রাবণের উপর জ্বীনের আছড় হইছে। আমি শুনছিলাম, হারুনের মেয়েরে জ্বীনে ধরছিল গতমাসে। সেই একই জ্বীন বোধহয় শ্রাবণরেও ধরছে।”

রুপালির কথা বিশ্বাস করার ধারে কাছ দিয়েও গেল না কেউ। পরিবেশ ক্ষণিকের জন্য নীরবতা পালন করলো।
শ্রাবণের পদচারণ লিভিং রুমে পড়তে সেই নীরবতা ভাঙলো। কবির সাহেব সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
“কাল রাতে কি তুমি কানে ফুল গুঁজে বাগানে ঘুরেছো শ্রাবণ?”

বাবার প্রশ্নের সম্মুখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো শ্রাবণ। কাল রাতের দৃশ্যটা মনে পড়লো। মিহিক কানে ফুল গুঁজে দেওয়ার পর আর সেই ফুল কান থেকে সরায়নি। ঘরেও প্রবেশ করেনি। অনেকক্ষণ যাবৎ বাগানে ছিল। এক রকম বলা চলে সে কানে ফুল গুঁজে ঘুরছিল। কিন্তু বাবা সেটা টের পেল কীভাবে? কালকে তো কোথাও কাউকে ওই সময় দেখতে পায়নি। শ্রাবণ এক মুহূর্তের জন্য মহা ঝামেলা জিনিসটার স্বাদ অনুভব করতে পারলো। স্ত্রী কানে ফুল গুঁজে দিয়েছে সেটা মা-বাবা, বোনের সামনে বলা অতি সহজ কোনো ব্যাপার নয়। এটা কঠিনের চেয়েও অধিক মজবুত বিষয়। শ্রাবণ ইতস্তত কণ্ঠে বললো,
“কানে ফুল গুঁজে ঘুরবো কেন? আমি কি পাগল?”

রুপালি অবাক। শ্রাবণ মিথ্যা কথা বলছে। সে আরও এক ভাগ নিশ্চিত হলো শ্রাবণকে আসলেই জ্বীনে ধরেছে। সে হা হয়ে দেখতে লাগলো জ্বীনে ধরা শ্রাবণকে।

“কানে ফুল গুঁজে ঘুরেছো কেন? জ্বীনে ধরেছে তোমায়?” কবির সাহেব বললেন।

শ্রাবণ হঠাৎ মুখ টিপে হেসে উঠলো,
“জ্বীন?”

“রুপালি তো সন্দেহ করছে তোমাকে জ্বীনে ধরেছে!”

শ্রাবণ রুপালির দিকে তাকিয়ে মজার ছলে বললো,
“হুম, আছে আমার সাথে জ্বীন। দশ-বারোটা পুরান ঢাকার জ্বীন ঘোরে আমার সাথে। সেদিন হাসিবের সাথে পুরান ঢাকা গিয়েছিলাম, সেখান থেকেই সাথে এসেছে বোধহয়।”

শ্রাবণ মুচকি হাসতে হাসতে সদর দরজার দিকে ধাবিত হলো।
এদিকে রুপালির চেহারা দেখার মতোন। ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে একটুখানি। সে লায়লা খানমের দিকে তাকিয়ে বললো,
“দশ-বারোটা জ্বীন তাড়াবেন কীভাবে?”

বাইরে সোনালি রোদ্দুরের ছড়াছড়ি। সুন্দর একটি দিন আজকে। প্রতিটা দিনই নিজ সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়। শ্রাবণের মেজাজ কিছুটা ফুরফুরা ধরণের। এর কোনো কারণ নেই। তবে ফুরফুরা লাগছে। গেট পেরিয়ে বের হওয়ার পর মিহিককে দেখতে পেল। মিহিক গিয়েছিল বান্ধবীদের আমন্ত্রণে দেখা করতে। শ্রাবণের মুখে একফালি হাস্য রশ্মি ছড়িয়ে পড়লো। সে এগিয়ে এসে বললো,
“আপনার জন্য তো আমাকে জ্বীনে ধরা লোক মনে করছে বাড়ির সবাই।”

মিহিক ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো,
“কীসে ধরা লোক?”

“জ্বীনে ধরা। চেনেন না?”

“কেন মনে করছে?”

“সেটা জানতে হবে না, শুধু জেনে রাখুন আপনিই এর জন্য দায়ী।”

মিহিক মুখে বিরক্তির একটা ভঙ্গি করলো। শ্রাবণ হেসে বললো,
“নয়টা ত্রিশে ফেরার কথা ছিল আপনার, কিন্তু এখন দশটা বাজতে আর মাত্র চার মিনিট বাকি।”

“তো? এখন কি আমাকে সময় মেপে মেপে পা ফেলতে হবে?”

শ্রাবণ দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলো,
“না।”

“আর কিছু বলবেন?”

“না।”

মিহিক গেটের দিকে পা বাড়ালো। গেট দিয়ে ঢুকতে যাবে এমন সময় আবার শ্রাবণ ডাকলো,
“শুনুন।”

“কী?”

শ্রাবণ এগিয়ে এলো। মিহিকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বললো,
“আমাকে জ্বীনে ধরেনি, তবে অন্য কিছুতে ধরেছে। কীসে ধরেছে সেটা বুঝতে পারছি না। শুধু বুঝতে পারছি এটার জন্যও আপনিই দায়ী।”

মিহিক কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর আরও এক কদম সামনে এগিয়ে এসে মুখটা খানিক শ্রাবণের কানের কাছে নিয়ে বললো,
“আপনি না জানলেও আমি কিন্তু জানি কীসে ধরেছে আপনাকে।”

“কীসে?”

“বললে লজ্জা পাবেন। আপনার লজ্জা যে একটু বেশি সেটা এতদিনে বুঝতে পেরে গেছি।”

“আমি লজ্জা পাই না।”

“হ্যাঁ, আপনি যে নির্লজ্জ সে প্রমাণও আমাকে দিয়েছেন।”

শ্রাবণের সম্মানে আঘাত হানলো মিহিকের কথাটা। করলার মতো তেতো হয়ে গেল তার মুখ। তেতো মুখ রেখেই বললো,
“আমাকে কি প্রেমে ধরেছে?”

মিহিক কেমন এক ভঙ্গিমায় হেসে বললো,
“আসলেই আপনি নির্লজ্জ। লজ্জা তো আমি পাচ্ছি।”

“আপনি একা নন, আমিও লজ্জাবোধ করছি।”

বলে শ্রাবণ আর দাঁড়ালো না। যাওয়ার জন্য উল্টোদিকে পা বাড়িয়ে দিলো।
মিহিক দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না শ্রাবণ চোখের আড়াল হয়ে গেল। মানুষটা তার হৃদয় আরও শক্ত শিকড় দিয়ে আঁকড়ে ধরছে।

__________________

নোয়ানা কবির সাহেবের বাড়িতে যাবে না বলে বাহানা ধরেছে। আজ কবির সাহেবের বাড়িতে সপরিবারে নিমন্ত্রণ আছে। কবির সাহেব এরকম নিমন্ত্রণ মাঝে-সাঝেই করেন। নোয়ানা আগের পন্থা কাজে লাগাতে চেয়েছিল, মাথা ব্যথা করছে বলে বাড়িতেই থাকবে। কিন্তু হাফিজা শুনলেন না। নানান কিছু বলে শেষমেশ রাজি করালো।
ও বাড়িতে যেতেও নোয়ানার বুক ধুকপুক করছে। মনে মনে প্রার্থনা করছে যেন আষাঢ় আজ বাড়িতে না থাকে।
ইদ্রিস খান আর হাফিজা আগেই চলে এসেছিল। নোয়ানা আর তিন্নি এলো একটু পরে। মনে মনে যে প্রার্থনা করেছিল তা আর কবুল হলো না। বাড়িতে ঢুকেই প্রথমে দেখতে পেল আষাঢ়কে। সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। নোয়ানার একবার চোখ পড়তেই বুক কেঁপে উঠলো। ভয় করছে তার। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এরকম অনুভূতি আগে কখনও হয়নি। ওরা যখন কাছে এসে গেল তখন আষাঢ় তিন্নির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“কেমন আছো?”

তিন্নি সহাস্যে উত্তর দিলো,
“জি, ভালো। আপনি?”

“হুম, আমিও ভালো। কখনোই খারাপ থাকি না।”
আষাঢ় নোয়ানার দিকে দৃষ্টি দিলো। নোয়ানা একবারও কি তাকিয়েছে তার দিকে? তাকিয়েছিল বোধহয় একবার। আষাঢ় দৃষ্টি নত করে রাখা নোয়ানার উদ্দেশ্যে বললো,
“আপনি ভালো আছেন তো?”

নোয়ানা খেয়াল করলো আষাঢ় তাকে আপনি সম্মোধন করেছে। যেটা বেমানান লাগলো আষাঢ়ের কণ্ঠে। হঠাৎ আপনি সম্মোধন করছে কেন? বিষয়টা যেন পছন্দ হলো না নোয়ানার। না তাকিয়েই উত্তর দিলো,
“হ্যাঁ।”

আষাঢ় শ্লেষের সুরে বললো,
“ভালো তো থাকবেনই, বিয়ে করতে চলেছেন না কিছুদিন পর!”

নোয়ানার মুখ আরক্ত হয়ে উঠলো। আষাঢ়ের কথার ধরণটা অসহ্যকর ছিল। হঠাৎ এমন করে কথা বলার মানে কী? সে-ও কাঠ কাঠ গলায় প্রত্যুত্তর করলো,
“আপনিও তো বিয়ে করতে চলেছেন, আপনার ভালো থাকার কারণও কি সেটাই?”

“কারণ হিসেবে ধরা যেতে পারে এটাকে।”

নোয়ানার অসহ্য লাগলো। আষাঢ় নোয়ানার মুখ দেখেই উপলব্ধি করতে পারলো এটা। নোয়ানা তিন্নিকে ভিতরে প্রবেশের জন্য তাগাদা দিলো,
“চল।”

তিন্নি মান্য করলো। ঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো। নোয়ানা ঢুকতে যাবে এমন মুহূর্তে আষাঢ় তার একটা হাত টেনে ধরলো। নোয়ানা ঘটনাটার বিমূঢ়তায় সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরলো। এই সবে আর একবার তাকালো আষাঢ়ের দিকে। আষাঢ় বিনম্র কণ্ঠে বললো,
“বিয়ের জন্য অভিনন্দন!”

“আপনাকেও।”

আষাঢ় হাসলো। এই হাসি সোজা হৃদয়ে আঘাত করে। সেই আঘাতে কষ্টরা সব উন্মোচিত হওয়ার প্রতিবাদে নামে।
আষাঢ় হাসির রেশ ওষ্ঠ্যতে স্থায়ী রেখে বললো,
“তুমি আমার জীবনের একটা স্বার্থকতা!”

“এটা কি আমার মতো হার্টলেস মেয়ে আর দ্বিতীয়টি দেখেননি সে ব্যাপারে?”

“হুম।” আষাঢ়ের সরল স্বীকারোক্তি।

“তবে আপনি আমার জীবনের কোনো স্বার্থকতা নন। আমার নিরর্থক জীবনে একটা নিরর্থক বিষয় আপনি।”

“স্বার্থক কিন্তু হতে পারতাম, তুমিই বুঝলে না। ভীতু একটা! তোমাকে চাঁদ বলে ভুল করবো না আর, তুমি হলে সূর্য। যে সূর্য অনেক দূর থেকেও আমাকে ঝলসে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু তুমি কাছে এসেই খুব যত্ন করে ঝলসে দিচ্ছ আমার হৃদয়।”

“আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে আসিনি।”

“আমিও তোমাকে আটকে রাখিনি। হাত অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি।”

নোয়ানার চোখ নিজের হাতের দিকে চলে গেল। কিছু না বলেই মর্ম বিদারক কষ্ট নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো।
আষাঢ় বিড়বিড় করলো,
“আমি পাগলামি করি তাই না টিউলিপ? আজ পাগলামিই দেখাবো তোমায়। আমি নিশ্চিত, এত সুন্দর পাগলামি তুমি আর কখনও দেখোনি।”

দুপুরে দুই বাড়ির সদস্যদের এক সাথে খাওয়া সম্পন্ন হলো। আষাঢ় বসেছিল ঠিক নোয়ানার চেয়ার বরাবর সম্মুখ চেয়ারটায়। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে নোয়ানাকে শীতল দৃষ্টিতে দেখছিল। নোয়ানা না তাকিয়েও উপলব্ধি করতে পেরেছে এটা। অন্য সদস্যরা যদি কেউ বিষয়টা লক্ষ্য করে থাকে তাহলে কী ভেবেছে তারা? নোয়ানা জানে না, জানতেও চায় না। সব কিছু নিয়ে ভাবনা স্থগিত করে দিতে ইচ্ছা হয়।

খাওয়া শেষে দুই পরিবার লিভিং রুমে বসেছে খোশগল্প করার জন্য। সবাই-ই এখানে উপস্থিত। শ্রাবণ মাত্রই রুমে চলে গেছে একটা কল আসায়।
কারিব আজ সকাল থেকে আষাঢ়কে লক্ষ্য করছে। আষাঢ়ের মাঝে সে আজ কেমন একটা ছায়া দেখতে পাচ্ছে যেন। ছায়াটা ভালোর পরিচয় বহন করছে, না কি খারাপের বুঝতে পারছে না। সে আর আষাঢ় বসার আসন থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। আষাঢ় দূর থেকে নোয়ানার দিকে তাকিয়ে হাসছে মিটিমিটি। এরকম হাসছে অনেকক্ষণ ধরে। এরকম ভাবে হাসার কারণে কিছুটা পাগল পাগল মনে হচ্ছে তাকে।
আষাঢ়ের এই বিষয়টা আর কেউ লক্ষ্য না করলেও সিনথিয়া করছে। আষাঢ়ের হাসিতে তার হৃদয়ে বিষাদের বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ইন্ডিয়া ব্যাক করতে তার আর বেশিদিন বাকি নেই। অল্প কিছুদিন আছে বাংলাদেশ। জানে না আষাঢ় তার হৃদয়ে এত গভীরভাবে কীভাবে গেঁথে গেল। জীবনে কম ছেলে দেখেনি সে। সেসব ছেলেদের মাঝ থেকে আষাঢ়ের মতো এমন একটা ছেলেকে মনে লেগে যাওয়া আজব একটা ব্যাপার। আসলে ব্যাপারটা আজব নয়, আসল আজব ব্যাপারটা হচ্ছে মন। এই আজব মন ব্যাপারটা অতি সাংঘাতিক জিনিস। সিনথিয়া গোপনে দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগ করলো।

“কারিব, বাড়ির সবাই কি এখানে উপস্থিত আছে?”
অকস্মাৎ প্রশ্ন করলো আষাঢ়।

“কী করবেন সবাইকে দিয়ে?”

“আছে কি না একবার চক্ষু বুলিয়ে দেখো।”

কারিব আষাঢ়ের কথা মতো চক্ষু বুলিয়ে দেখে বললো,
“শ্রাবণ ভাই নেই। উনি তো উপরে গেলেন।”

“ডেকে আনো।”

“কেন?”

“দরকার আছে মাই ডিয়ার। যাও, ডাকো।”

“আপনি কী করতে চাইছেন বুঝতে পারছি না আমি।”

“এই কথা তোমার মুখে বেমানান। আমাকে তুমিই সবচেয়ে ভালো বোঝো।”

কারিব কথা বাড়ালো না। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল শ্রাবণকে ডাকতে।
শ্রাবণকে নিয়ে ফেরত এলো কিছুক্ষণের মধ্যেই।

“ডেকেছিস কেন?” প্রশ্ন করলো শ্রাবণ।

“পাগলামি করবো আমি। আর তুমি এবং তোমরা সবাই আমার সেই পাগলামি দেখবে। আমি চাইনি কেউ আমার এই পাগলামি মিস করুক।”

এই বলে আষাঢ় বসার আসনের দিকে পা বাড়ালো। সকলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে উচ্চ গলায় ঘোষণা দিলো,
“আমি এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় এনাউন্স করতে চলেছি।”

আষাঢ়ের এমন কথায় সবাই-ই একটু আধটু বিস্মিত। কবির সাহেব বললেন,
“অতি গুরুত্বপূর্ণ কী এনাউন্স করবে তুমি?”

আষাঢ় অধর কোণে বক্র হাসি ফুঁটিয়ে তেরছা চোখে তাকালো নোয়ানার দিকে।
ওই তাকানোয় আঁতকে উঠলো নোয়ানার বক্ষৎপঞ্জর। থমকে গেল যেন তার পুরো বিশ্ব। ডাগর ভয়ার্ত দুটি চোখ সবিস্ময়ে স্থির হয়ে রইল আষাঢ়ের উপর। আশঙ্কা খারাপ কিছুর ইঙ্গিত করছে। নোয়ানার হৃদয় থরথর করে কাঁপতে লাগলো। সে আষাঢ়ের দৃষ্টি পড়তে পারছে। নিজের দৃষ্টিতেও ঠিকরে ওঠাতে চাইছে সাবধান বাণী,
‘না হিমেল, না। একদমই করবেন না এটা।’

আষাঢ় যেন নোয়ানার চক্ষু ভাষা পড়তে পেরে তাচ্ছিল্য হাসলো। সে চোখ সরিয়ে আনলো নোয়ানার থেকে। সকলের উদ্দেশ্যে সে উচ্চ কণ্ঠে তার চূড়ান্ত ঘোষণাটা শোনালো,
“আমি কাল অথবা পরশুর ভিতরই বিয়ে করতে চলেছি।”

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here