বিবর্ণ জলধর পর্ব -৪১+৪২

0
66

#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ৪১
_____________

লিভিং রুম থেকে তর্ক-বিতর্কের কিঞ্চিৎ আভাস নোয়ানা, তিন্নি বেডরুমে বসে শুনতে পাচ্ছে। নোয়ানা কর্ণ খাড়া করে রেখেছে। বিষয়ের সার্বস্তু ইতোমধ্যে ধরতে সক্ষম হয়েছে সে। মনের ভিতর শুধু একই প্রশ্নের ঘুরপাক হচ্ছে, ‘কী করে হলো এটা? কী করে?’

কবির সাহেব গতরাতে ইদ্রিস খানের সাথে বিষয়টা শেয়ার করেছেন। তারা চাইছেন আষাঢ়ের বিয়ে নোয়ানার সাথে দিতে। কবির সাহেব সবটা বুঝিয়ে বলেছেন, তাদের কোনো আপত্তি নেই। ইদ্রিস খানও সবটা ভেবে দেখেছেন। যদি কবির সাহেবেরা সবটা মেনে নিতে পারে, তাহলে তারা কেন নয়? শুধু একটা মাত্র সমস্যা, সেটা হলো নাঈমের সাথে নোয়ানার এনগেজড হয়ে গেছে। বিয়ের কথা পাকাপাকি। এখন সেখানে ‘না’ করে দিলে ব্যাপারটা মোটেই ভালো দেখায় না। কিন্তু কবির সাহেব এমন করে বলেছেন যে তার কথার উপরও না করে দিতে পারছেন না। এছাড়া তিনি নিজেও ভেবে দেখেছেন, নাঈমের সাথে বিয়েতে না করে দেওয়া যদি ভালো না হয়, তবে কি নাঈমের সাথে নোয়ানার বিয়ে দেওয়াটা খুব ভালো হবে? কবির সাহেব এমন করে বলার পরও যদি তাকে না করে দেওয়া হয় তাহলে সম্পর্কটা ক্রোধপূর্ণও হয়ে উঠতে পারে। আর কবির সাহেবের পরিবারে বিয়ে দিলে ভালোই হয়। ইদ্রিস খান কবির সাহেবের সাথে একমত পোষণ করেছে প্রায়, কিন্তু মধ্য দিয়ে বাধ সেধেছেন হাফিজা। তিনি তার বোনের পরিবারের অসম্মান কিছুতেই সহ্য করবেন না। তাকে কোনো কিছু বলেই বোঝানো যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ তর্ক-বিতর্ক চলার পর তিনি শান্ত হলেন। কিন্তু মনে মনে আষাঢ়ের সাথে নোয়ানার বিয়ের ব্যাপারটা কিছুতেই মানলেন না। তর্ক-বিতর্ক থামলে মিহিক বোনদের রুমে এলো। নোয়ানার বুক দ্রিমদ্রিম করছিল ভয়ে। বোনকে দেখে তার মাত্রা আরও বাড়লো। মিহিক নোয়ানার পাশে বসলো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল নোয়ানার দিকে। নোয়ানার মুখে উৎকণ্ঠার ছাপ। মিহিক শুধালো,
“আষাঢ়কে বিয়ে করতে আপত্তি আছে তোর?”

নোয়ানা চমকে গিয়ে বললো,
“কী বলছো?”

“সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নাঈমের সাথে তোর বিয়ে ক্যানসেল করে আষাঢ়ের সাথে সেটআপ করবে।”

নোয়ানা বিহ্বল চোখে তাকিয়ে রইল। একদফা বিস্মিত সে তখনই হয়েছিল যখন বুঝতে পেরেছিল আষাঢ়ের ফ্যামিলি মেনে নিয়েছে। এখন আরেক দফা বিস্মিত হলো যখন ‘সবাই’ শব্দটা শুনলো। নোয়ানাকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে মিহিক বললো,
“বিশ্বাস হচ্ছে না?”

নোয়ানার মাথা আপনা থেকেই না-সূচক নড়ে উঠলো। মিহিক হেসে বললো,
“বিশ্বাস করানোর জন্য কি আষাঢ়কে পাঠিয়ে দেবো?”

নোয়ানা বিশ্বাস করতে পারছে না, একদমই পারছে না। এটা স্বপ্ন তো নয়, তাই না? সবাই কী করে এটা চাইতে পারে? নোয়ানা কিছু না বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ বাদে মিহিক হঠাৎ প্রশ্ন করলো,
“আষাঢ়কে পছন্দ করিস কবে থেকে?”

নোয়ানা হকচকিয়ে গেল। উত্তরটা দিতে না চেয়েও আবার দিলো,
“ওনাকে পছন্দ করি না আমি।”

“আষাঢ় খুব একটা ভুল বলেনি, তুই আসলেই বোকা।”

নোয়ানা দৃষ্টি নত করে ফেললো। এই মুহূর্তে সে দিগভ্রান্ত। কী করবে? খুশি হবে? না কি…
না কি’র পরে আর কিছু ভাবতে পারলো না। হৃদয়ে প্রলয়ঙ্করী ঝড় হচ্ছে। নোয়ানার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে মিহিক তিন্নিকে নিয়ে চলে গেল। একা থেকে কিছুটা সময় নিরিবিলি ভাবুক। ওরা চলে যাওয়ার পাঁচ ছয় মিনিটের মাথায় আষাঢ়ের কল এলো। নোয়ানা নাম দেখার আগেই ভেবেছিল এটা আষাঢ় হবে। সেদিন রাতে যে আষাঢ় কল দিয়েছিল, এরপর আর দেয়নি। এই প্রথম। নোয়ানার হৃদয় তখনও থরথর করে কাঁপছে। কল রিসিভ করে কানে লাগালো।

“তোমাদের বাড়ির বাকবিতন্ডা থামলো তাহলে!”

নোয়ানার কণ্ঠ দিয়ে আওয়াজ বের হতে চাইছে না, কষ্টসাধ্য হলেও বললো,
“আপনি কী করে জানলেন?”

“ছিলাম তোমাদের বাড়ির আশেপাশেই।”

নোয়ানার আর কিছু বলার রইল না। বলার মতো কিছু নেই তার মস্তিষ্ক ভাণ্ডারে। খানিকক্ষণ পর আষাঢ় বললো,
“ব্যালকনিতে এসো।”

“কেন?”

“দেখবো তোমায়।”

“কীভাবে দেখবেন?”

“তুমি ব্যালকনিতে থাকলে তোমাকে কীভাবে দেখি তা এখনও ধরতে পারোনি? আমি তো জানতাম তুমি খুব বুদ্ধিমতী।”

নোয়ানা কিছু বললো না। তবে একটু রাগ অনুভব হলো তার।

আষাঢ় বললো,
“তুমি সব কিছুকে যতটা জটিল ভাবো, আসলে কিন্তু সবকিছু এত জটিল নয়। তোমার অভিনয় কি বন্ধ করা উচিত নয় এখন?”

“আমি তো অভিনয় করছি না আপনার সাথে।”

“করোও না আর কখনও।”

“এটা কীভাবে হলো?”

“কোনটা?”

“সবাই মেনে নিলো কীভাবে?”

“সেটা তো আমার জানার কথা নয়। যা বলার ওই একদিনই বলেছিলাম, তারপর সব এমনি এমনিই ঘটেছে। কী বললাম? তুমি সবকিছুকে যতটা জটিল ভাবো, সবকিছু অতটা জটিল নয় আসলে। তুমিও জটিল আচরণ করো না আর। সরল থাকো আমার সাথে। দুজন একসাথে সহজ-সরল জীবন গড়ি।”

“আপনার তো সিনথিয়ার সাথে বিয়ের আলাপ হয়েছিল, সে ব্যাপারটার কী হলো? আপনার মা-বাবা সিনথিয়ার মতো মেয়েকে রেখে আমাকে মেনে নিলো? সত্যিই মেনে নিলো?”

“নিজেকে এত তুচ্ছ মনে করো কেন তুমি? তুমি আমার আম্মু-আব্বুকে চেনো না। তারা ওরকম মানসিকতার মানুষ নয়। আর সিনথিয়ার ব্যাপারটা যেরকম হওয়ার কথা ছিল সেরকমই হচ্ছে। সে সবার আগে আগেই মেনে নিয়েছে সবটা। কদিন পরেই ইন্ডিয়া চলে যাবে। তবে মিথ্যা বলবো না, সিনথিয়ার জন্য খারাপ লাগছে আমার। তুমি আবার এটা শুনে হিংসা করো না ওকে।”

“আমার ভিতর হিংসা নেই। আমি আপনার মতো হিংসুটে নই।”

ওপাশে অট্টহাসির শব্দ শোনা গেল। হাসি থামিয়ে বললো,
“হুম, আমি হিংসুটে, তোমার মতো উদার মনের হতেও চাই না কখনও। তোমার মতো উদার মনের হলে সব কিছু হারাতে হবে। তোমার তো কৃতজ্ঞ থাকা উচিত আমার প্রতি, আমি তোমার হারাতে নেওয়া সব কিছু আবার সহি সালামতে ফিরিয়ে এনেছি।”

অন্য সময় হলে আষাঢ়ের কথায় বিরক্ত-রাগ লাগতো নোয়ানার, কিন্তু আজ লাগলো না। বরং তার মুখে নীরবে মুচকি হাসির রেখাপাত ঘটলো। সত্যি তার মনে হচ্ছে এটা একটা স্বপ্ন। এটা কি আসলে বাস্তব? কীভাবে? বার বার সমস্তটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। মন এখনও বলছে এটা হতে পারে না।

“তুমি কি এখনও নাঈমের দেওয়া আংটি পরে আছো?”

নোয়ানা আঙুলের দিকে তাকালো। হ্যাঁ, সে পরে আছে।

“কী বলেছিলাম? ওর দেওয়া আংটি হাতে পরলে আঙুল কেটে দেবো তোমার। এতদিন কাটিনি, কিন্তু আজ সত্যি সত্যি কেটে দেবো। আজকের ভিতরই ওই আংটি খুলে ফেলো, কারণ এরপর থেকে আমার দেওয়া আংটি পরে থাকতে হবে তোমার। যে আংটি খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলে, সেই আংটি।”

“ফোন রাখছি আমি।”

“ওয়াও! নাঈমের জন্য এত দরদ?”

“এখানে তার প্রতি দরদের কী হলো?”

“কল কাটছি।”

“নিষেধ করেছে কে?”

“তোমার মন। মিথ্যা বলবে না, তোমার মন কি চাইছে না আরও কিছুক্ষণ আমার সাথে কথা বলতে?”

নোয়ানা উত্তর না দিয়ে কল কেটে দিলো। একহাত দিয়ে কপাল চেপে ধরলো। জ্বর জ্বর ঠেকছে তার। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না এসব। এতদিন পর আবার তার অন্তঃকরণ স্বাভাবিক। এতদিন কীসের ভিতর দিয়ে দিন যাপন করছিল সেটা শুধু নিজে জানে। নোয়ানার মানসপটে পনেরো বছরের সেই হাস্যজ্জ্বল কিশোরের মুখ ভেসে উঠলো। অস্ফুটে উচ্চারণ করলো,
“হিমেল!”

_________________

নাঈমের পরিবারে ঘটনাটা জানানো হলে তারা প্রথমে বেশ ক্ষেপে গিয়েছিল, অনেক রাগারাগি গেল ইদ্রিস খানের সাথে। পরে অবশ্য ধীরে ধীরে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। যখন এটা ঘটবে তখন এটা থামানোর সাধ্য কি তাদের আছে? হাফিজা এখনও রাগে ফুলে আছে। যেখানে নাঈমের বউ হওয়ার কথা ছিল নোয়ানার, সেখানে হবে কি না আষাঢ়ের বউ! তার বোন পছন্দ করে নোয়ানাকে ঘরের বউ করে নিতে চাইলো, আর নোয়ানা এখন যাবে আষাঢ়দের ঘরে! তার বোনদের এরকম অপমান সহ্যতুল্য নয় তার কাছে। তবুও মুখ বুজে সব সহ্য করছে। আসলে সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে। স্বামী অথবা মেয়ে কেউই তো তার পক্ষে নেই। একা একা কতক্ষণ প্রতিবাদ করা যায়? আর একার প্রতিবাদ কতটাই বা কার্যকর?

গতকাল নাঈম নোয়ানার কাছে কল দিয়েছিল। কলটা রিসিভ করতে নোয়ানার নিজের সাথে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে। নাঈম কী বলবে এই ভয়ে অন্তর আঁধারে তলিয়েছিল। নাঈম প্রথমেই বলেছিল,
“অন্য কাউকে পছন্দ করো এটা আগে কেন বলোনি নোয়ানা? এমনটা করে কতটা আঘাত করেছো আমায় জানো? যাকে আংটি পর্যন্ত পরিয়েছিলাম সে এখন আমার স্ত্রী না হয়ে অন্য কারো স্ত্রী হবে, এটা কতটা অপমান এবং লজ্জাজনক ব্যাপার সেটা কি জানো তুমি? তোমাকে পছন্দ করতাম বলেই তো বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন তুমি সেই পছন্দটাকে উবে দিয়ে ঘৃণার জন্ম দিচ্ছ মনে।”

নাঈমের কথা শুনে কেঁদে ফেলেছিল নোয়ানা। নাঈম একাই বলেছিল যত কথা, সে কিছু বলেনি। নীরবে শুধু নয়ন জলে ভেসেছিল। সব কিছু ঠিক রাখতে যা করেছিল, তা সব কিছু এখন বেঠিক মনে হচ্ছে। তবে এখন শান্ত নীরব সব। ঝামেলা শেষে পরিবেশ যেন তার স্বস্তিভাব ফিরে পেয়েছে খানিকটা।

ওদিকে সিনথিয়ার ইন্ডিয়া যাওয়ার ফ্লাইট পড়েছে আগামীকাল। চলে যাবে ভাবতে তার মনটা দুঃখী। তার থেকেও মন বেশি দুঃখী হচ্ছে আষাঢ়ের বিয়ে নোয়ানার সাথে হবে ভেবে। যদি নোয়ানা না থাকতো তাহলে আষাঢ়ের বিয়ে কি তার সাথে হতো না? হুম, তার সাথেই তো হতো। এটা ভেবে বার বার দীর্ঘশ্বাস ফেলছে সে।

এদিকে শ্রাবণ একটা বিষয় খেয়াল করেছে। চারিদিকের ঝামেলার প্রকোপে মিহিক তাকে একেবারে অগ্রাহ্য করে ফেলে রাখছে। কথা বলে না তার সাথে। নিজে কিছু একটা বললে তার উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। এরকম অবহেলা শ্রাবণের একদম ভালো লাগছে না। আজ সে এটা নিয়ে কথা বলবে মিহিকের সাথে। যত্রতত্রই সে নেমে এলো নিচ তলায়। মিহিক কিচেনে। আর কেউ নেই। এটাকে দারুণ সুযোগ বলেই মনে হলো। মিহিক মিল্কসহ আরও কীসব উপাদান যেন বেলেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিচ্ছে। শ্রাবণ মিহিকের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো,
“আপনি কি আমাকে ভুলে গিয়েছেন মিহিক?”

মিহিক একবার চোখ তুলে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“আপনাকে কেন ভুলে যাব আমি?”

“আমার তো মনে হচ্ছে আমি আপনার মনে নেই কিছুদিন ধরে। একবারের জন্য আমাকে মনে পড়েনি আপনার।”

“যে মানুষটাকে চোখের সামনেই দেখতে পাই সে মানুষটাকে আলাদা করে মনে করার কী আছে?”

“নেই কিছু?”

“আমি কিছু খুঁজে পাচ্ছি না, আপনি যদি কিছু খুঁজে পান তবে বলুন।”

মিহিক ব্লেন্ডার বন্ধ করে দিলো। সব মনোনিবেশ শ্রাবণের উপর দিয়ে দাঁড়ালো।
শ্রাবণ কেমন ইতস্তত বোধ করছে। মিহিকের দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। ক্ষণকাল নীরব রইল সে। মিহিকও কিছু বললো না। শ্রাবণ এক সময় লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে বললো,
“চোখ বন্ধ করুন।”
কথাটা মিহিকের দিকে না তাকিয়েই বললো।

মিহিক চমকালো শ্রাবণের কথায়,
“কেন? চোখ বন্ধ করবো কেন আমি?”

“একটু সময়ের জন্য শুধু।”

“আপনাকে ভয় হচ্ছে আমার। কী করতে চাইছেন আপনি?”

শ্রাবণ এবার বিরক্ত হয়ে মিহিকের মুখে দৃষ্টিপাত করে কঠিন সুরে বললো,
“চোখ বন্ধ করবেন না?”

“আপনাকে বুঝতে পারছি না আমি।” বলে মিহিকও বিরক্তি দেখিয়ে চোখ বন্ধ করলো।

শ্রাবণ মুচকি হেসে মিহিকের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“আপনার স্বামী আপনাকে ভালোবাসে মিহিক!”

মিহিক সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুললো। তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ বললো,
“এই কথাটার জন্য হলেও দিনে অন্তত একবার মনে করবেন আমায়।”
বলে একটু থামলো। তারপর কেমন একটা ভাব নিয়ে মিহিকের চোখে চেয়ে বললো,
“বাই দ্য ওয়ে, আপনি কী আশা করেছিলেন? কী করতাম আমি? ঠিক কী ভেবেছিলেন?”

শ্রাবণের কথায় লজ্জার পাশাপাশি থতমত খেয়ে গেল মিহিক।
“ক্ক…কী আশা করেছিলাম? কিছুই আশা করিনি আমি।” মিহিক কথাটা বলতে তোতলালো একটু। তার দৃষ্টি শ্রাবণের চোখ থেকে সরে এসে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

“কিছু আশা করছিলেন না?”

“না।”

“ঠিক আছে, যাচ্ছি তাহলে।”

শ্রাবণ দরজার দিকে পা বাড়িয়ে দিলো, গেলও কয়েক পা। সহসা আবার পিছন ফিরে এসে হুট করে চুমু খেলো মিহিকের গালে।
ঘটনার আকস্মিকতায় মিহিক বরফের ন্যায় জমে গেল। শ্রাবণ হেসে বললো,
“এটাই আশা করেছিলেন আপনি। ভুল বললাম কি?”
#বিবর্ণ_জলধর
#লেখা: ইফরাত মিলি
#পর্ব: ৪২
_____________

আজ সিনথিয়ার চলে যাওয়ার দিন। এক ঘণ্টা পরই সে প্লেনে করে উড়াল দেবে ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে। তাকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত দিয়ে আসবে লায়লা খানম এবং শ্রাবণ। আষাঢ় যাবে না। সকল কিছু গোছগাছ করা শেষ। টুকটাক যা বাকি আছে তা গুছিয়ে নিচ্ছে। গতরাত থেকে হৃদয় পাথরের ন্যায় কঠিন রাখার চেষ্টায় আছে সে। কিন্তু কঠিন হৃদয়ে খানিকক্ষণ পর পরই কষ্ট আতশবাজির মতো গর্জে উঠছে। আষাঢ় সিনথিয়ার রুমে এসেছে কিছুক্ষণ হলো। সিনথিয়াকে দেখছে। মেয়েটার মুখে গাম্ভীর্য, অন্ধকার ছেয়ে আছে! কেন খারাপ লাগছে মেয়েটাকে এমন দেখতে? আষাঢ় বসা থেকে উঠে এগিয়ে এলো। সিনথিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
“সব রকম চেষ্টা করেছিলাম যাতে তোমার মনে আমার জন্য কোনো অনুভূতি না আসে। কিন্তু ব্যর্থ হলাম। সব জেনে শুনেও নিজের মনে জায়গা দিয়েছো আমায়। এতে আমার কোনো দোষ নেই। তাও স্যরি বলছি। স্যরি আমি!”

সিনথিয়া মলিন হেসে তাকালো,
“স্যরি বলার দরকার নেই। দোষ আমার। জানতাম তো তুমি নোয়ানারই থাকবে, তাও…”
কথা শেষ না করে দুই পাশে মাথা নাড়তে নাড়তে আষাঢ়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলো সিনথিয়া। ব্যাগের চেন টেনে দিয়ে পিঠে নিলো ব্যাগটা। লাগেজ নামালো খাট থেকে। লাগেজ হাতে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে আবার থামলো। পিছন ফিরে আষাঢ়ের শ্যাম বর্ণের মুখটা দেখলো ভালো করে।

আষাঢ় বললো,
“তাকিয়ে থেকো না এরকম।”

“শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছি। বাধা দেওয়ার অধিকার তোমার নেই।”

“এরকম করে বলো না, নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।”

সিনথিয়া প্রত্যুত্তরে বিষণ্ন হাসলো।

“তোমার বিয়েতে দাওয়াত দিয়ো।” বললো আষাঢ়।

“তোমার বিয়ে না খেয়ে চলে যাচ্ছি, আমার বিয়েতে এমন করে দাওয়াত চাইতে পারো কী করে? তোমার তো লজ্জা নেই।”

আষাঢ় হেসে ফেললো। হাসিটা প্রাণবন্ত নয়। বললো,
“এই নির্লজ্জটাকে মনে রেখে শুধু শুধু নিজের মনকে কষ্ট দেবে না, বুঝেছো?”

সিনথিয়া কিছু বললো না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, এগিয়ে এসে আষাঢ়ের ডান হাত হাতে তুলে নিলো। আষাঢ়ের হাতে ওষ্ঠ্য স্পর্শ করে চোখে চোখ রেখে বললো,
“সেদিন যখন সকলের সামনে নোয়ানাকে বিয়ে করবে বলেছিলে, সেদিন রুমে এসে কেঁদেছিলাম আমি। আমি কিন্তু সহজে কাঁদি না।”
বলে তাকিয়ে রইল আষাঢ়ের চোখে। সিনথিয়ার ছলছল চোখ থেকে আষাঢ়ের দৃষ্টি নড়লো না। প্রথমে চোখ সিনথিয়াই সরিয়ে নিলো। আর এক দণ্ড দাঁড়ালো না এখানে। দ্রুত পায়ে রুম ত্যাগ করলো।

আষাঢ় দাঁড়িয়ে রইল বিমূঢ় হয়ে। কিছুক্ষণ যেন সিনথিয়ার কথাটার ভাবনাতেই পড়ে রইল। এরপর পা বাড়ালো জানালার দিকে। একটা বড়ো করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মনে মনে একটা কথাই আওড়াতে লাগলো, তার কোনো দোষ নেই। সত্যিই তো দোষ নেই। সিনথিয়া তো আগে থেকেই সব জানতো। নোয়ানার বিষয়টার পাশাপাশি অগণিত গার্লফ্রেন্ডের ব্যাপারও তার অজানা ছিল না। আষাঢ় দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে।
মোবাইলে কল এলো এর মাঝে। এই সময়ে কে কল দিতে পারে? হবে লিন্ডা অথবা জেনির মাঝে কেউ। আষাঢ় একেবারেই গায়ে লাগালো না। মোবাইল পকেটেই পড়ে রইল। মনেতেই শান্তি নেই গার্লফ্রেন্ডদের সাথে কী কথা বলবে!
গার্লফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলা হচ্ছে না আজ বহুদিন হলো। এই যে কল দিয়ে পাচ্ছে না, সে রিসিভ করছে না কল, এতে গার্লফ্রেন্ডরা কী ভাববে সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সকল ভ্রুক্ষেপ হবে একেবারে বিয়ের পর। নিশ্চিন্ত মনে। আষাঢ় আবারও বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এতদিন সিনথিয়ার নামে থাকা রুম থেকে বের হলো।

_________________

ফজরের নামাজ পড়ে নোয়ানা আবার শুয়েছিল বিছানায়। কখন যেন চোখ লেগে আসায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম যখন ভাঙে সূর্য ততক্ষণে উদ্বেলমান। চোখ খুলেই আচমকা একটা মনুষ্যমুখ সামনে দেখতে পেয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল সে। কিন্তু চিৎকারের আগেই আষাঢ় তার মুখ চেপে ধরলো।

“শসস…চিৎকার করছো কেন? হবু বরকে দেখে চিৎকার করা আবার কোন ধরণের কাজ তোমার?”

নোয়ানা প্রথমে বুঝতে পারেনি এটা আষাঢ়। বেখেয়ালেই চিৎকার করে উঠছিল। আষাঢ়কে দেখে দারুণ বিরক্ত হলো। হাত সরিয়ে দিয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসলো। পাশে তাকালো। তিন্নি নেই। কখন ঘুম থেকে উঠলো?

“তিন্নি জুনের সাথে হাঁটতে বের হয়েছে।” শুধালো আষাঢ়।
নোয়ানা মুখ বিকৃত করে তাকালো। কাঠিন্য কণ্ঠে বললো,
“ভূতের মতো তাকিয়ে ছিলেন কেন আমার দিকে?”

“ভূত? কত মায়া নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম আমি, আর তুমি ভূ…”

“এখানে এসেছেন কীভাবে?” আষাঢ়ের কথার মাঝেই প্রশ্ন করলো নোয়ানা।

“কেন, তোমাদের বাড়িতে কি দরজার অভাব?”

“দরজা দিয়ে এসেছেন আপনি?”

“এলে সমস্যা কী?”

নোয়ানা কিছু বললো না, রাগে মুখ ফুলিয়ে রাখলো। আষাঢ় হেসে বললো,
“হবু জামাই, জামাই তো হয়ে যাইনি এ বাড়ির। যখন তখন তাই এ বাড়ির দরজা খোলা থাকবে না আমার জন্য। জানালা দিয়ে ঢুকেছি। জানালা তো খুলেই রেখেছে আমার উপকারী শালিকা।”
বলতে বলতে আষাঢ় বিশাল জানালাটা দেখিয়ে দিলো।

নোয়ানা বিদ্রুপ কণ্ঠে বললো,
“আগে গেট টপকে ঢোকা হতো আমাদের বাড়ি, আর এখন জানালা টপকে সোজা রুমের ভিতর ঢুকে যাচ্ছেন! চোরের খাতায় নাম লেখালে ভালো করতে পারবেন।”

“ছি, নিজের হবু বরকে চোরের খাতায় নাম লেখাতে বলছো? কেমন হবু বউ তুমি?”

“এই ‘হবু বর’ আর ‘হবু বউ’ কথা দুটো ফের আর বলবেন না, বিরক্ত লাগে শুনতে।”

“আমার তো লাগে না।”

“কিন্তু আমার লাগে। বলবেন না আর।”

আষাঢ় আচমকা নোয়ানার এক হাত ধরে টান দিয়ে সামান্য নিকটে নিয়ে এসে বললো,
“তাহলে কী বলবো? প্রেমিক পুরুষ হিমেলের প্রকৃত প্রেম?”

নোয়ানার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
আষাঢ় হঠাৎ নোয়ানার চোখে থমকে গিয়ে আঁতকে ওঠার মতো করে বললো,
“এটা কি টিউলিপ? তুমি কি চোখ দিয়ে আমাকে ভৎস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছো?”

“পাগল!” বিরক্ত জড়ানো কণ্ঠে বললো নোয়ানা।

আষাঢ় হেসে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
“যাচ্ছি। জানি চাইছো যাতে আরও কিছুক্ষণ থাকি এখানে, কিন্তু সম্ভব না। আমার কাজ আছে।”
কথাটা বলে আষাঢ় কাছে এসে হঠাৎ ঝুঁকে পড়লো নোয়ানার দিকে।
নোয়ানা আঁতকে উঠে দূরে সরে গিয়ে বললো,
“হোয়াট আর ইউ ডুয়িং?”

“আংটি পরানোর পর হাতে একটা চুমু খাওয়া আবশ্যক, জানো না?”

“আংটি?”

প্রশ্ন করে হাতের দিকে তাকালো নোয়ানা। অনামিকায় একটা আংটি নিজের উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে। শুনতে পেল আষাঢ়ের কথা,
“একটু বেশি দেরি করেই পরালাম। আসলে এমন ভাবেই চাইছিলাম পরাতে, যখন তুমি ঘুমিয়ে থাকবে। এমন করে কাউকে পরাতে দেখেছিলাম বোধহয়। মনে পড়ছে না। তুমি কি জানো এমন করে কে পরিয়েছিল নিজের প্রিয়তমার হাতে আংটি?”

নোয়ানা আষাঢ়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“জানি না। তবে আজ জানলাম। প্রেমিক পুরুষ হিমেল ইসলাম আমার হাতে আংটি পরিয়ে দিয়েছে, যখন আমি ঘুমাচ্ছিলাম।”

আষাঢ় হেসে বললো,
“অভিনয়ের খোলস তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছে বোধহয়।”

বলে জানালা দিয়ে যেভাবে এসেছিল সেভাবে চলে গেল।
নোয়ানা হাতের আংটিটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। সেই রাতটার কথা মনে পড়লো। যেদিন আষাঢ় প্রথম আংটি পরিয়েছিল তার হাতে। নোয়ানা মনে মনে বললো,
“আপনার সাথে দেখা হওয়াটা এখন আর ভুল মনে হয় না হিমেল।”

________________

মিহিক গুনগুন করে গান গেয়ে ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শ্রাবণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছে ওকে। মিহিকের পরনে জলপাই রঙের একটা শাড়ি। সন্ধ্যা বেলায় হুট করে শাড়ি পড়েছে সে। আগে থ্রি পিস পরা ছিল। শ্রাবণের বিরক্ত লাগছে মিহিকের চুলগুলো। চুলগুলো খুলে রেখেছে। কেমন পাগল পাগল লাগছে শ্রাবণের কাছে। অনেকক্ষণ যাবৎ চুপ থেকে বললো,
“চুল খোলা রেখে যে এরকম হাঁটছেন, ভূতেরা বাসা বাঁধবে তো আপনার চুলে।”

মিহিক হাঁটতে হাঁটতে একবার তাকালো শ্রাবণের দিকে। হাসলো। চোখ অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে বললো,
“ভূতেরা বাসা বাঁধলে আপনি ওদের পিটিয়ে বাসা ছাড়া করবেন। পারবেন না?”

শ্রাবণ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো,
“একদমই পারবো না। আপনার জন্য শুধু শুধু ভূতের সাথে শত্রুতা করবো কেন?”

মিহিক তেড়ে এলো শ্রাবণের দিকে,
“পারবেন না? ঘাড় মটকে দেবো আপনার।”

“মনে তো হচ্ছে ভূত আপনার চুলে নয়, আপনার মাথায় বাসা বেঁধেছে।”

“কী বললেন?”

“কাল বাদে পরশু আপনার বোন আর দেবরের বিয়ে, আজকে দিনেই আপনাকে ভূতে ধরতে হলো! ভূতেরা বোধহয় আপনার মাধ্যমে বিয়ে এনজয় করতে চাইছে।”

“আপনি আমার রাগ বাড়াবেন না।”

“বাড়ালে কী হবে?”

“তুই-তোকারি শুরু করবো।”

“তাহলে মুখ সেলাই করে দেবো।”

“এত বড়ো সাহস?”

“সাহসের কী দেখেছেন?”

“আপনার সাহস দেখতেও চাই না আমি। রুমকি আজ এসেছে না বাবার বাড়িতে? ওর কাছে গিয়ে সাহস দেখান।”

“কথার মাঝে রুমকিকে টানার অভ্যাসটা পাল্টান। ভালো লাগে না এটা।”

মিহিক ভেংচি কেটে দূরে সরে পড়লো।
শ্রাবণের মেজাজে পরিবর্তনের আভা লেগেছে। গুমোট একটা ভাব জমলো। খবর পেয়েছিল আজ বিকেলে, রুমকি না কি বাড়িতে এসেছে স্বামী নিয়ে। খবরটা রুপালি দিয়েছিল। শ্রাবণ চায় রুমকির সাথে তার আর একটা সেকেন্ডের জন্যও দেখা না হোক কখনও। শ্রাবণ আর ছাদে থাকতে পারলো না। নেমে এলো ছাদ থেকে। করিডোরে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল লিভিং রুমে কী যেন আলোচনা চলছে মা আর বাবার মধ্যে। রুপালিও আছে সাথে। বিয়ে সংক্রান্তই আলোচনা হবে। শ্রাবণ রুমে ঢুকে গেল। তার হাতে আপাতত কোনো কাজ নেই। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কেটে গেল কিছু মুহূর্ত। হঠাৎ বেড সাইড টেবিলের উপর ফোনটা বেজে উঠলো। শ্রাবণ হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা আনলো। আননোন নাম্বার দেখে কুঁচকে উঠলো ভ্রু। তার কাছে খুব একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে না। শ্রাবণ কল রিসিভ করবে না ভাবলো। কিন্তু কী ভেবেই আবার রিসিভ করে ফেললো।

“হ্যালো!”

“কেমন আছো?”

পরিচিত কণ্ঠটা চিনতে শ্রাবণের খুব একটা কষ্ট হলো না। এই কণ্ঠ তার পরিচিত। মধ্য থেকে অনেকদিন না শোনায় মরীচিকা ধরেছে আর কী! শ্রাবণের মনে ক্রোধের একটা নহল ক্রমশ উন্মোচিত হতে লাগলো। সে চোয়াল শক্ত করে উত্তর দিলো,
“ভালো আছি।”

“মনে আছে আমায়? আমি তো ভেবেছিলাম বউয়ের প্রেমে দিওয়ানা হয়ে আমাকে ভুলে যাবে।”

“ভুলেই গিয়েছি। চিনি না।”

শ্রাবণ কথাটা বলেই কল কেটে দিলো। সাথে সাথে নাম্বারটা এড করলো ব্লকলিস্টে। ক্ষণকাল তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে রইল। এতদিন পর আবার সেই মানুষটার সাথে কথা হলো তার, যাকে কি না প্রথম প্রেম বলে জানতো। হুহ, এটা রুমকি ছিল!

(চলবে)

_____________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here