ভেতরে বাহিরে পর্ব -১৮+১৯

0
109

#ভেতরে_বাহিরে
পর্বঃ১৮
লেখিকাঃ #রুবাইদা_হৃদি
নিশুতি রাতের আঁধার৷ চারদিকে থমথমে পরিবেশ৷ ছোট একটা শব্দ ভয়ানক ঠেকছে মাধুর্যের কাছে৷ নাজিফা শক্ত করে চেপে ধরে আছে মাধুর্যের হাত৷ ভয়ে সে কাঁপছে অনবরত৷ মাধুর্যের ভেতরের শব্দ যেন ধুপধাপ শব্দ বিমোহিত করছে তার কান৷ ভয়ে ঘেমে উঠেছে সে! ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে ডানপাশের বড় রুম গুলোর দিকে৷ হলুদ,নীল বাতি জ্বালানো সারিবদ্ধভাবে৷ আবছা আলোয় অস্পষ্ট সব ৷ সাজানোর জন্য বিভিন্ন গাছগুলোকে কেমন নিষ্প্রাণ,বিমূঢ় লাগছে মাধুর্যের কাছে৷ কান্নার ক্ষীণ আওয়াজ এখনো আসছে৷ নাজিফা ভয়ে কেঁপে উঠে ফিসফিস করে বলল,

‘ ভাবী..আমার হাত ছাড়ো! আমি রুমে যাবো৷’

‘ নাফিজা ভয় পেয়ো না৷ নাবিহা আপুর রুমে গিয়েই ফিরে আসবো আমরা ৷ আমার মনে হচ্ছে,আপু অসুস্থ৷’

‘ আপু কাঁদবে কেন,ভাবী! আর অসুস্থ হলে মাহমুদ ভাই ফোন দিয়ে আমাদের জানাতো।ওকে দেখো না কেমন গম্ভীর থাকে৷ আমার মনে ওর কান্নার সিস্টেম অফ ৷ এইটা ভুত কাঁদছে৷ কেমন শীতল আওয়াজ৷ এমন আওয়াজ মানুষের হতে পারে না৷’

মাধুর্য থমকে দাঁড়ালো৷ নাজিফার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

‘ আপুর সাথে কখনো মন খুলে কথা বলেছো,নাজিফা!’

নাজিফা কিছুক্ষণ ভেবে মাথা চুলকিয়ে বলল,

‘ আপু কারো সাথে কথা বলে না৷ আমাদের বাসায় কখন আসে কখন যায় আমরা কেউ বুঝতেও পারি না৷ এসেই তার রুমে ঢুকে যায় ৷ মাঝেমধ্যে তো খাবার ও খায় না৷’

‘ কেন! মাহমুদ ভাইয়া নিতে আসে না?’

‘ আগে আসতো৷ তবে আপু দরজা খুলতো না৷ তখন ভাইয়া ফিরে যেতো৷ ভাইয়া আপুকে অনেক ভালোবাসে কিন্তু আমার আপু ভাইয়াকে একদম ভালোবাসে না৷’

নাজিফার কথায় চুপ করে রইলো মাধুর্য৷ তিন ভাইবোনের মধ্যে নাবিহা আপু সবার বড়৷ আগে তো চঞ্চল ছিলো৷ হাসি-খুশি ছিলো! কেন কাঁদবে সে।
আবারো কান্নার আওয়াজ নাজিফা ছুটে পালাতে চাইলে মাধুর্য আকড়ে ধরে অনুনয়ের সুরে বলল,

‘ প্লিজ! আমার সাথে চলো৷’

‘ ওকে! আমি আপুর রুমের বাইরে পর্যন্ত যাবো তারপর উল্টো দৌড় দিবো৷ আমার হার্ট কতো জোরে বিট করছে সেটা তোমার ধারণার বাইরে ভাবী৷ মনে হচ্ছে,পেছন থেকে ভুত এসে মেরে দিবে৷’

মাধুর্য কথা বাড়ালো না৷ এগিয়ে গেলো নাবিহার রুমের দিকে৷ যতো রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কান্নার আওয়াজ স্পষ্ট হচ্ছে৷ মাধুর্য ভাবছে,যে মানুষটা নিজেকে এতো গম্ভীর আর স্ট্রিক্ট দেখায় সে কেন কাঁদবে! আর মাহমুদ নিজেও নাবিহাকে প্রচন্ড ভালোবাসে যেটা মাধুর্য নিজ চোখে দেখেছে৷ বাড়ির সবার সাথে নাবিহার সম্পর্ক নেই বললেই চলে! বাড়ির বড় মেয়ে আসবে আর তার কেউ খোজ নেয় না! এইটা অদ্ভুত লাগলো মাধুর্যের ৷
দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা৷ মাধুর্য কান পাতলো দরজায়। নাজিফাও মাধুর্যের দেখাদেখি কান পেতে চুপ করে রইলো ৷ মাধুর্য ঠিক আঁচ করেছে! নাবিহা কাঁদছে৷ খুব করুন স্বরে কাঁদছে৷

‘ ভাবী আপু কাঁদ..’ নাজিফা বলার আগেই মাধুর্য তার মুখে হাত দিয়ে চুপ থাকতে বলল৷ নাবিহা কান্নার সুরে কিছু একটা বলছে৷ মাধুর্য আবারো শোনার চেষ্টা করলো নাবিহা কী বলছে! নাবিহা কান্নার সুর সেই সাথে অস্পষ্ট ভাবে ভেসে এলো,

‘ আল্লাহ! আমার কী অপরাধ বলো? কেন আমায় এতোবড় শাস্তি দিলে ৷ মাহমুদকে আমি কোনোভাবেই কষ্ট দিতে চাই না! কিন্তু ও আমাকে কেন ছেড়ে দেয় না৷ কেন ও ওর বাবা-মায়ের কাছে চলে যাচ্ছে না৷ ও জানে আমি কখনো ‘ মা ‘ হতে পারবো না কখনো তাকে পিতৃত্বের অনুভূতি জাগানোর জন্য ছোট একটা প্রাণ দিতে পারবো না৷ তবুও,সে বুঝতে চায় না কেন! আমার সব থেকেও যে নেই,আল্লাহ৷ আমি সমাজের চোখে বন্ধ্যা নারী৷ আমি প্রতিনিয়ত তোমার দরবারে হাত তুলে কাঁদি তোমার মনে আমার জন্য করুনা হয় না,আল্লাহ? হয় আমাকে মেরে ফেলো নয়তো মাহমুদের জন্য এমন কাউকে পাঠাও যে তাকে সন্তান দিতে পারবে৷ নারী মানেই যে কারো মা,কারো বোন বা কারো স্ত্রী৷ সেই মা হওয়ার ক্ষমতা না থাকলে তাকে যে সবার কাছে হেয় হতে হয়৷ মাহমুদ আমার জন্য তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন৷ আমার জন্য আমার আম্মা সমাজে মুখ দেখাতে পারে না৷ আমি বাঁচতে চাই না আল্লাহ! নারী মানে শুধুই কী সন্তান জন্ম দেওয়ার একটা মাধ্যম? আমাকে নিয়ে কেন সবাই হাসাহাসি করে কেন অপমান করে! দিনের আলোয় আমি থাকলেও রাতের আঁধার যে আমার অক্ষমতা মনে করিয়ে দে…’

নাবিহার করুন কন্ঠের বলা অস্পষ্ট কথা শুলো শুনে মাধুর্য আর নাজিফা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ নাজিফা কাঁদছে! তারমানে তার আপু কাঁদতো এইসব কষ্ট লুকিয়ে৷ সে বোন হয়ে তাকে ভয় পেয়ে গেছে৷ কখনো তার ভেতরে কষ্ট দেখতে চেষ্টা করে নি! বাইরে থেকে এতো স্ট্রিক্ট মানুষটাকে দেখে কখনো তার মাথায় আসে নি তার আপু ভেতরে গুমরে মরছে৷ তাকে মানুষ পিষে ফেলছে সমাজের নিয়ম দেখিয়ে৷

‘ আপু কেন মা হতে পারবে না,নাজিফা?’

মাধুর্য কান্নাভেজা গলায় প্রশ্ন করলো৷ নাজিফা মুখে হাত দিয়ে কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা করে বলল,

‘ জানি না ভাবী! তবে আপু হাসিখুশি ছিলো জানো? হঠাৎ করে একদিন হসপিটাল থেকে আসার পর নিজেকে গুটিয়ে নেয়৷ মাহমুদ ভাইয়ার মা আপুকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়৷ তখন আমি খুব ছোট৷ তবে মাহমুদ ভাই তাদের ছেড়ে আপুকে নিয়ে অন্য জায়গায় বাসা নেয়৷ আমি এতোটুকু জানি৷ এরপর থেকে আপু কেমন হয়ে যায়৷’

মাধুর্য অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে৷ এর ভেতরে গুমরে মরছে এক নারী৷ মাধুর্য দরজায় হাত দিতে চেয়েও থমকে যায় ৷ নাজিফা আপ্লূত হয়ে ভেতরে যেতে চাইলে মাধুর্য বলল,

‘ আপুকে একা থাকতে দাও নাজিফা৷ হুট করে আমাদের দেখলে রাগ করতে পারেন৷ সে রাতের আঁধার বেছে নিয়েছে তার কষ্ট লুকাতে৷ আমরা যদি লুকায়িত জিনিস দেখে নেই তাহলে সে অপ্রস্তুত হয়ে যাবে৷’

নাজিফা কথা বাড়ালো না৷ সে ফুঁপিয়ে কাঁদছে৷ তার খুব করে মনে আছে,একদিন তারা বাইরে গেলে এক মহিলা তার আপুকে অনেক কিছু বলছিলো৷ বারবার বলছিলো,’তুমি অপবিত্র৷ মাহমুদকে ছেড়ে যাও না কেন৷’
সে তখন অতশত না বুঝে নাবিহার দিকে তাকিয়ে দেখেছিলো নাবিহা টলমল চোখে কান্না লুকানোর চেষ্টা করছে৷
সে ছোট বলে কিছু জানার চেষ্টা করে নি৷ দিনের পর দিন তার আপু কেঁদেছে এই বদ্ধ রুমে সে বুঝে নি৷ এইজন্যই তো তার আম্মা আর ভাইয়েরা চুপ থেকে কথা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে৷ হয়তো নাবিহাকে ভালো রাখার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা৷

___________

প্রত্যুষের আলো ছুঁয়েছে ধরণী ৷ সোনালি আভা ফুঁটে উঠেছে নীলাভ শূন্যে৷ বৃষ্টির পর হিমশীতল বাতাসে গাছের পাতাগুলো ঝরঝর শব্দ তুলছে৷ ক্ষীণ আওয়াজে একটা পাখি ডাকছে ৷ কিচকিচ শব্দ ঘুরেফিরে ফিরে আসছে বারেবারে ৷ সকালের শুভ্র প্রহরের রেশ সদ্য ঘুমানো মাধুর্যের চোখেমুখে কোমল ভাবে উষ্ণতার ছোঁয়া দিচ্ছে ৷ কেঁপে ওঠা বিশাল পর্দাটার দাপট ছড়াচ্ছে ঘরের মাঝে৷ মাধুর্যের ঘুমের মাঝেই মনে হচ্ছে তাকে কেউ দেখছে৷ খুব গভীর ভাবে৷
কাল রাতে নাবিহার রুমের বাইরে থেকে ফেরার পর ঘুমের বিন্দুমাত্র রেশ তার চোখে ধরা দেয় নি৷ নাজিফা কাঁদতে কাঁদতে কিছুক্ষণ বাদেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলো ৷ এর পরেও কান্নার আওয়াজে মাধুর্য কেঁদেছে৷ ছুটে যেতে চেয়েছে নাবিহার কাছে৷ তবে রুমের বাইরে থেকে বারেবারে ফেরত এসেছে ৷ সবাই যখন ঘুমে মগ্ন থাকে নাবিহা নিজের কষ্ট তখন বিসর্জন দেয় ৷ হয়তো কাওকে দেখাতে চায় না বলেই! নানা কিছু ভেবে ভোরের আলো ফোঁটার সাথে সাথেই ঘুম ধরা দিয়েছেলিণমাধুর্যের চোখে৷ বিছানার সাথে হেলান দিয়েই বসে ঘুমোচ্ছে সে ৷ তবে ঘুমের মাঝেই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবে তার মস্তিষ্কে জানান দিচ্ছে,

‘ তোমায় কেউ দেখছে! তোমার দিকে সে তাকিয়ে আছে৷’

ঘুম ছুটে গেলো মাধুর্যের৷ পশ্চিমা জানালা দিয়ে শুভ্র রাশি ছুঁয়েছে তার মুখে৷ পিটপিট চোখে তাকালো সে৷ ঘুম চোখেই সামনে তাকিয়ে খুজলো কাওকে৷ কাওকে না দেখে আবারো চোখ বোজতেই সামনে থেকে ভেসে এলো,

‘ আমার ঘুম কেঁড়ে নিয়ে কেন ঘুমাচ্ছো,তুমি!’

ক্লান্ত কন্ঠস্বর।যেন হাজার টনেক ক্লান্তি ভর করে আছে কন্ঠে। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কন্ঠস্বরে হুড়মুড় করে উঠে বসলো মাধুর্য। ঠিক সামনেই সোফার বসে সামনে রাখা ছোট টেবিলের উপর পা দিয়ে কঁপালে হাত ঠেকিয়ে বসে আছে আবেশ। গায়ে তার ধূসর রঙের শার্ট।চুল গুলো অগোছালো হয়ে ছেয়ে আছে কপালে।চোখ লাল হয়ে আছে। মাধুর্য আবেশকে দেখে চোখ হাত দিয়ে মুছে আবার তাকালো। হ্যাঁ! এখন ঠিক দেখছে। আবেশ সত্যি’ই এসেছে।
তবে মাধুর্য মুখ ঘুরিয়ে বালিশ টেনে শুতে গেলেই আবেশ ক্লান্ত গলায় বলল,

‘ তুমি আমাকে উপেক্ষা করছো,মাধুর্য!’

‘ কাওকে উপেক্ষা করার শক্তি আমার নেই।আমার ঘুম পাচ্ছে আমি ঘুমাবো!’ মাধুর্য কাট কাট গলায় জবাব দিলো।আবেশ সোজা হয়ে বসে টাইয়ের নব ঢিলে করে বলল,

‘ এইযে এখনো তো করছো! আচ্ছা সমস্যা নেই,আগে বলো মেডিসিন নিয়েছো? খেয়েছো? ঘুমিয়েছো ঠিক মতো?’

‘ আস্তেধীরে এক এক করে বলুন। আমি যন্ত্র নয় যে সব উত্তর একবারে দিবো।’

মাধুর্যের কথায় থম মেরে রইলো আবেশ। তার গলায় তেজ।কেমন পরিবর্তন। আবেশ বেশ খুশি হলো মাধুর্যের পরিবর্তন দেখে। নিজের চুল গুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,

‘ কাল থেকে আমি ছিলাম না,মিস করো নি আমাকে?’

আবেশের এহেন কথায় মাধুর্য ভড়কে গেলো। শোয়া থেকে উঠে বসে এদিকওদিক তাকালো। আবেশ হুট করে এমন একটা প্রশ্ন করবে সে ভাবতেই পারে নি।
মাধুর্যের অস্থিরতা দেখে মৃদু হাসলো আবেশ। সাথে সাথে হাসি আড়াল করে উঠে দাঁড়ালো। ধীরপায়ে মাধুর্যের দিকে এগিয়ে গিয়ে পকেটে হাত গুজে দাঁড়িয়ে বলল,

‘ আই নো ইউ মিস মি!’

‘ কে বলেছে আপনাকে?’ মাধুর্য অন্যদিকে তাকিয়ে বলল। আবেশ আরো এগিয়ে গেলো মাধুর্যের দিকে। পাশে নাজিফা্র দিকে তাকিয়ে স্বস্তি নিয়ে দুইহাত রাখলো মাধুর্যের দুইপাশে। তার আর মাধুর্যের মাঝামাঝি দূরত্ব কয়েক ইঞ্চির। মাধুর্য ভড়কে গেছে। পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বুঝতে পারলো তার পেছনে জায়গা নেই!
ভয়ে মুখ ছোট করে কাঁপা কন্ঠে বলল,

‘ স.সরুন..কী করছেন! সামনে থেকে সরে দাঁড়ান।’

‘ ইউ মিস মি!’

‘ ন..না! আমি কাওকে মিস করি না। আমার সামনে থেকে সরুন আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।’

আবেশ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মাধুর্য তাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করছে। তবে সে হাল না ছেড়ে মাধুর্যের থুতনিতে হাত দিয়ে তার মুখ তার দিকে ঘুরিয়ে বলল,

‘ দশটার দিকে রেডি হয়ে থাকবে।তোমার জীবনের চলার পথে সব বাধা মুক্ত পাবে।বিশাল বড় একটা সারপ্রাইজ দিবে তোমায় তোমার সেই আবেশ যাকে তুমি ভয় পাও না,ঘৃণা করো না,একরাশ বিশ্বাস করো।’

চলবে….#ভেতরে_বাহিরে
পর্ব:১৯
লেখিকা: #রুবাইদা_হৃদি

‘ তুমি কাঁপছো কেন?’ আবেশ ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করলো। মাধুর্য ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে আবেশের একটু আগের বলা কথা শোনে। তবে মাত্র বলা কথা শোনে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল,

‘ ক..কই কাঁপছি !’

‘ কথা বলার সময় ও কাঁপছো।কাঁপাকাঁপি বন্ধ করে দ্রুত বিছানা ছেড়ে ওঠো।’

‘ কেন ! আমি এখন ঘুমাবো আমার ঘুম পাচ্ছে। লাগবে না কোনো সারপ্রাইজ।’

আবেশ আরো ঝুঁকে গেলো মাধুর্যের দিকে। চোখে চোখ রেখে বলল,

‘ তোমার জীবন সংক্রান্ত সারপ্রাইজ । সেটা তুমি না চাইলেও আমি দিবো।’

আবেশের কথায় কেমন ঘোর লেগে যাচ্ছে মাধুর্যের। প্রতিটা কথা বলার সময় আবেশ ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ছাড়ছে। বাইরে থেকে আসা হাওয়ার তোড়ে কড়া পারফিউমের সৌরভ নাকে লাগছে মাধুর্যের । আবেশের এতো কাছাকাছি আসাতে মাধুর্য নিজের খেই হারিয়েছে ৷ তার হৃৎপিন্ড দ্রিমদ্রিম আওয়াজ তুলছে৷ আবেশের কোনো ভাবান্তত নেই৷ সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাধুর্যের কেঁপে ওঠা চোখের দিকে,দোল খাওয়া চুলের দিকে ৷ মাধুর্যের গলা কাঁপছে৷ সে উপায় খুজছে কী ভাবে আবেশের সামনে থেকে সরে যাওয়া যায় ৷ আবেশের দৃষ্টিতে কেমন যে মাদকতা মেশানো! ঘোর লেগে যাচ্ছে মাধুর্যের৷
আবেশের ইচ্ছা হচ্ছে,মাধুর্যকে ছুঁয়ে দিতে ৷ তবে সে নিজের অনুভূতি দূরে ঠেলে দিয়ে ভাবলো,

‘ আজ মাধবীলতার চোখে অস্বস্তি,একদিন আসবে যেদিন এই চোখে থাকবে হাজার ভালোবাসার প্রজাপতি৷ যার ভেতরে বাহিরে সবটা জুড়ে থাকবো আমি শুধুই আমি৷’

‘ আ.আমি ওয়াশরুমে যাবো৷’ মাধুর্যের মিনমিনে কথা শুনে কপাল কুঞ্চিত করে আবেশ বলল,

‘ যাও ধরে রেখেছে কে!’

‘ আপনি৷’

মাধুর্য নীচু গলায় জবাব দিলো৷ আবেশ সামনে থেকে না সরেই বলল,

‘ আমি তোমাকে ছুঁয়েছি ? আমি কি তোমার হাত ধরে রেখেছি?’ আবেশ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলো ৷ মাধুর্য নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো মাথা দুইদিকে হেলিয়ে বলল,

‘ না তো৷ ‘

‘ তাহলে বললে কেন,আমি ধরে রেখেছি! ‘

‘ আমি কখন বললাম৷ ‘

মাধুর্যের কথা শুনে হাসি পাচ্ছে আবেশের৷ সেই ছোট বেলার মতো তোতলানোর স্বভাব এখনো যায় নি তার ৷ মাধুর্যের ভেতরে বাচ্চাসুলভ এক খোলস আছে৷ যা ঢাকা পড়ে গিয়েছে অতল গহব্বরে৷ আবেশ হেয়ালি করে বলল,

‘ তুমি’ই তো বলেছো৷ আমি না’কী তোমায় ধরে রেখেছি ৷’

‘ আমি ওইভাবে বলি নি ৷’ মাধুর্য কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলো৷ আবেশ পাশে রাখা হাত গুলো মাধুর্যের হাতের উপর রাখতেই মাধুর্য কুঞ্চিত হয়ে উঠলো ৷ শিরশির করে উঠলো তার শরীর৷ দম যেন আটকে আটকে আসতে চাইছে তার৷ আবেশ হাত আলতো ভাবে তার হাতের উপর রেখেই বলল,

‘ তাহলে কীভাবে বলেছিলে,মাধবীলতা ! ‘

মাধবীলতা ডাকটা যেন মাধুর্যের হুশ ফেরালো ৷ মনে পড়লো সেদিন রাতের কথা যেদিন রাতে আবেশ তার না দেওয়া চিঠির কথা বলেছিলো ৷ আবেশ রেগে যখন তাকে বলেছিলো,

‘ তুমি মিথ্যাবাদী মাধুর্য! যার কোনো ক্ষমা নেই৷ সেই সাথে তুমি জঘন্য চরিত্রের অধিকারী ৷ অতোটুকু বয়সে প্রেমিক বানিয়েছিলে তার সাথে মেলামেশা করেছো ৷ তাকেই না’কী বিয়ে করবে৷ আমাকে তোমার ভয় লাগে কারণ শহরে যারা থাকে তাদের চরিত্রে সমস্যা থাকে ৷ তোমার নাম ধরে উচ্চারণ করতেও আমার মুখে আটকায়৷’

যদিও এরপর আবেশ নিজের মতো সব বুঝে তাকে বিশ্বাস করে নিয়েছে৷ কিন্তু কিছু কথা আর অপমান এতো সহজে ছুড়ে ফেলা যায়! না যায় না! মাধুর্যের মনে গভীর ভাবে দাগ কেটেছে সেইসব কথা৷ মাধুর্য হুট করেই হিংস্র হয়ে উঠলো ৷ নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো আবেশের হাতের নীচে থেকে ৷ আবেশের বুকের উপর ধাক্কা দিয়ে বলল,

‘ আমার নাম ধরে উচ্চারণ করতে আপনার মুখে আটকায়,আবেশ! সেই কথা কী ভুলে গেছেন? আমি বলছি,আপনি আমার সামনে থাকলে আমার অসহ্য লাগে,বিরক্ত লাগে ৷ সবকিছু মনে পড়ে যায়৷ তাদের ও আমি ছাড়বো না যারা আমার জীবন বিষাক্ত করেছে ৷ যারা আমায় ভুল বুঝে ঘৃণা করেছে৷’

বলেই মাধুর্য চলে যায় আবেশের সামনে থেকে৷ আবেশ স্তব্ধ,নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে৷ তবে তার ভালো লাগছে মাধুর্যের স্পৃহা দেখে৷ যার মনে এখন ভয় নেই আছে ভালো ভাবে বেঁচে থাকার আগ্রহ ৷ তবে আবেশের বুকের ভেতরে কেমন অস্থিরতা কাজ করছে ৷ মাধুর্য তার কথায় যে অনেক আঘাত পেয়েছে সে ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে৷ সেও তো নিরুপায় ছিলো,সেটা কেন মাধুর্য বুঝতে পারছে না!

___________

ঘড়িতে সকাল ০৯ঃ২২৷ আকাশ আজ উজ্জ্বল৷ মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসের সাথে ৷ রোদের সাথে মিষ্টি বাতাস বাইরে প্রবাহিত হচ্ছে ৷ মাহফুজা বাড়ির সব পর্দা টেনে দিলেন৷ সাথে সাথেই একঝাঁক উড়ো বাতাস হামলে পড়লো এহসান বাড়ির দুয়ারে ৷
মাধুর্য এসে দাঁড়ালো মাহফুজার ঠিক পেছনে৷ আলতো স্বরে ডেকে বলল,

‘ নাবিহা আপু ঘুম থেকে উঠেছে? ‘

‘ নাবিহা কখন এসেছে!’

মাহফুজা অবাক হয়ে বললেন৷ মাধুর্য মাহফুজার থেকে বেশি অবাক হলো ৷ মাধুর্য অবাকের সুরে বলল,

‘ কাল এসেছে! নাবিহা আপু রাতভর কান্না করে সেই আওয়াজ কী তোমাদের কাছে পৌছায় না,আম্মু’মা৷’

মাহফুজা চমকে তাকালো৷ তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো বিষাদের শ্বাস ৷ বিষাদমাখা গলায় বলল,

‘ পৌছায়৷ তবে আমার মেয়েটা উন্মাদ হয়ে গেছে৷ একা থাকে,একা বাঁচে৷ তার ধারণা আমরা তাকে করুণা করছি ৷ আমাদের কাছে আসে না৷ আমাদের বাড়িতে আসলেও তার রুমে নিজেকে বন্ধ করে রাখে৷ মাহমুদের সাথেও কথা বলে না বেশি৷’

‘ তোমরা গা ছাড়া ভাব করে কেন আছো! আপুকে হাসিখুশি রাখো ৷ একটা সন্তান কী সব?’

‘ তুই বুঝবি না মাধুর্য! যা খেয়ে নে৷ আবেশ তোকে নিয়ে কোথাও একটা যাবে, বলল৷’

মাহফুজা বলে চলে যেতে চাইলে মাধুর্য হাত ধরে ফেলে বলল,

‘ নাবিহা আপুকে কেন বুঝাতে চাও না তোমরা! কেউ তার সাথে কেন মেশো না? এই সময়ে তোমরা পাশে না থাকলে সে যে আরো ভেঙ্গে যাবে৷’

‘ আমি একজন মা হিসেবে সন্তানকে আগলে রাখতে পারি নি৷সেই কষ্ট থেকেই আমার সাথে কথা বলে না আমার মেয়েটা৷’

‘ আগলে রাখতে পারো নি!’মাধুর্য প্রশ্নসূচক চোখে তাকিয়ে বলল৷ মাহফুজা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

‘ আমাদের সমাজ নির্ধারিত নিয়ম আছে মাধুর্য! সেই নিয়ম অনুসারে সমাজের মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়৷ একজন মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবার পর সন্তান জন্মদানে অক্ষম হলে সমাজ তাকে অপবিত্র বলে ৷ মাহমুদের বাড়ি থেকে যখন বাচ্চা চাই বলে ওদের চাপ দেয় তখুনি নাবিহা জানতে পারে সে কখনো মা হতে পারবে না৷ আমার মেয়েটা এতো বড় শাস্তি কী’জন্য পেয়েছে আমি জানি না! ডাক্তার বলে কী যেন সমস্যা আছে নাবিহার ৷ এরপরেই মাহমুদের মা ছেলের বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে।নাবিহাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় ৷ কারণ তার বংশধর চাই৷ যে মেয়ে তার বংশ রক্ষার জন্য কাউকে আনতে পারবে না তাকে বাড়িতে রেখে কী হবে! নাবিহাকে যখন বাড়ি থেকে বের করে দেয় আমি আর তোর আঙ্কেল নিরুপায় ছিলাম ৷ কারণ আমরা মেয়ের মা ৷ মেয়ের পরিবারের কথা চলবে না ৷ তোমার মেয়ে সন্তান দিতে পারবে না তাই তোমাদের মানতে হবে সব৷ আমরা যখন প্রতিবাদ করতে গেলাম এইটা বলে দিলো সবাই৷ তখন তোর আঙ্কেল সবেমাত্র ব্যাবসায় হাত দিয়েছে৷ টাকার অভাব ছিলো সব সময় ! মেয়েকে চাইলেও বাঁচাতে পারি নি সমাজের মানুষের তোপের মুখে থেকে ৷ সবাই যখন ওকে কথা শোনাতো আমরা তখন মুখ বুজে সব সহ্য করতাম ৷ মাহমুদের মা এর মাঝেই আবারোছেলের বিয়ে দিবে বলে উঠেপড়ে লাগে তবে মাহমুদ কখনো নাবিহাকে ছেড়ে দেয় নি! আমরা ছেড়ে দিয়েছিলাম ওকে৷ কিন্তু সে ছাড়ে নি৷ আমাদের থেকে ভরসা না পেয়েই মেয়েটা গুটিয়ে গিয়েছে ৷ যখন সব হলো তখন আমি আমার মেয়েটাকে হারিয়েছি ৷ আমি আমার পাপের শাস্তি পাচ্ছি মাধু ৷ তোকে যদি আরো ভালো ভাবে খুজতাম তাহলে পেয়ে যেতাম৷ মেহরুনের সম্পদ দিয়ে সুখের সাম্রাজ্য গড়লেও হারিয়েছি নাবিহার সুখ তুই হারিয়েছিস তোর জীবনের অনেক গুলো বছর ৷’

মাহফুজা কাঁদছেন ৷ মাধুর্য কাঁদছে না আজ৷ সে ভাবছে,নাবিহার কথা৷ যখন তার পাশে সবার দাঁড়ানো উচিৎ ছিলো তখন সবাই গা ঢাকা দিয়ে ছিলো ৷ নাবিহার পাশে মাহমুদ থাকলেও সব কষ্ট কী সামলে উঠতে পেরেছিলো সে! হয়তো না! এইজন্যই নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে ফেলেছে নাবিহা ৷ সবার জীবনের ভেতরের টানাপোড়েন আটকা পড়ে বাইরের হাসি বা গম্ভীর মুখের আড়ালে ৷ ভেতরে-বাইরে সমান না! কখনো সমানতালে অগ্রসর হয় না৷।

___________

‘ তোমাকে রেডি হতে বলেছিলাম,মাধুর্য৷’

আবেশ রুমে ঢুকেই বলল ৷ মাধুর্য সকালের নাস্তা খেয়ে সবেমাত্র এসেছে ঘরে ৷ এরমাঝে আবেশ কোথাও একটা গিয়েছিলো৷ আবার হুট করেই এসে প্রশ্ন করে বসলো ৷ মাধুর্য নিজের জামাকাপড় গোছাচ্ছিল৷ আবেশের প্রশ্ন শুনে আড়চোখে একবার তাকিয়ে আবারো নিজের কাজে মন দিলো৷ আবেশের মেজাজ খারাপ হচ্ছে ৷ এইদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে আর এই মেয়ে তার কথা কানে তুলছে না ৷ কিছুক্ষণ মাধুর্যের গতিবিধি লক্ষ্য করে ক্ষিপ্র কন্ঠেই বলল,

‘ কী সমস্যা তোমার! বললাম না রেডি হয়ে থাকতে৷’

‘ কোথায় যাবো! ‘ মাধুর্য বারান্দায় যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আবেশ হাত টেনে ধরলো মাধুর্যের ৷ মাধুর্য ক্ষীণ গলায় বলল,

‘ হাত ছাড়ুন ৷ আর আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না৷’

‘ তোমার ডিসিশন আমি জানতে চাই নি ৷’

আবেশ মাধুর্যের হাত শক্ত করে ধরে রেখেই বলল ৷ মাধুর্য উত্তর দিলো না। আবেশ রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

‘ তোমার রেডি হতে হবে না,এমনি চলো৷’

বলেই হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো ৷ মাধুর্য অবাক হয়ে দেখছে ৷ আপাতত সে বাধা দিচ্ছে না! চুপ করেই আবেশের সাথে নীচে নেমে এলো ৷ ইরা তাদেরকে দেখেই জিগ্যেস করল,

‘ কোথায় যাচ্ছো,আবেশ৷’

‘ মাধুর্যের স্বপ্নের একটা ধাপ পূরণ করতে ভাবী৷ কাল তোমায় বলছিলাম তো৷’

আবেশ থেমে দাঁড়িয়ে বলল ৷ ইরা মাধুর্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

‘ বেস্ট অফ লাক মাধুর্য ৷ আমার দেবর কিন্তু তোমার সব যত্ন নিচ্ছে৷ একটু বেশি ভালোবাসা কিন্তু আমার দেবরের প্রাপ্য৷’

ইরার বলা কথা শুনে রাশি রাশি লজ্জা ভাব মাধুর্যের মুখে দৃশ্যমান হলো ৷ আবেশকে বাধা দিতে আপাতত একদম ইচ্ছা করছে না তার ৷ আবেশ ইরার থেকে বিদায় নিয়ে মাধুর্যকে নিয়ে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে ৷
গাড়ির সামনে গিয়ে রোদচশমা চোখে পরে মাধুর্যকে উদ্দেশ্য করে বলল,

‘ গাড়িতে ওঠে বসো ৷ আর একটা কথাও বলবে না৷ আমি কোনো সাউন্ড চাই না৷’

মাধুর্য সত্যি সত্যি মানা করতে চেয়েছিলো৷ তবে আবেশের বলা কথায় মিইয়ে গেলো ৷ সে যতোটা স্ট্রোং থাকতে চাইছে তবে পেরে ওঠছে না৷ এতো সহজে কী সব পারা সম্ভব?

‘ গাড়িতে ওঠো! ওকে ফাইন ৷ আমি অন্য ট্রিকস কাজে লাগাচ্ছি৷’

মাধুর্য অবাক হয়ে তাকিয়ে কিছু বলতে নিলেই আবেশ মাধুর্যের একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কোলে তুলতে নেয় ৷ মাধুর্য দু পা পিছিয়ে বলল,

‘ আপনার শক্তি আছে সেটা বারবার প্রমাণ করতে হবে না৷ উঠছি তো৷’

‘ দ্রুত ৷ তোমার জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে৷’

‘ এতো যখন দেরি হচ্ছে আমাকে রেখেই যেতে পারেন৷’ মাধুর্য নীচু গলায় বলল ৷ আবেশ কপাল কুঞ্চিত করে বলল,

‘ কিছু বললে? ‘

মাধুর্য জবাব না দিয়ে উঠে বসলো গাড়িতে ৷ আবেশ হাফ ছেড়ে বাঁচলো ৷ লম্বা একটা শ্বাস টেনে উঠে বসলো মাধুর্যের পাশে ৷ অন্যসব সময় হলে দু একটা ধমক দিতো৷ তবে এখন নিজেকে সংযত করার তীব্র চেষ্টায় আছে সে ৷

__________
গাছের পাতা গুলো ঝরঝর শব্দে কম্পিত হচ্ছে৷ বাতাসের দাপটে শিঁউরে উঠছে প্রকৃতির রূপ৷ সাঁই সাঁই শব্দ আছড়ে পড়ছে গাড়ির কাচে৷ ফুলস্পিডে ড্রাইভ করে চলেছে আবেশ ৷ মাধুর্য কেমন শিঁউরে উঠছে ৷ বিন্দু বিন্দু ঘামের অস্তিত্ব ফুঁটে উঠেছে ফর্সা গালে৷ আবেশ ড্রাইভিং এর ফাঁকে তাকালো মাধুর্যের দিকে৷ মাধুর্যের ঘেমে উঠা মুখ দেখে শাসনের সুরে বলল,

‘ গরম লাগছে সেটা বলতে হয় ৷ না বললে বুঝবো কী করে? নিজের অধিকার,চাওয়া-পাওয়া বলতে শেখো৷’

আবেশের কথা শুনে পাশ ফিরে তাকালো মাধুর্য ৷ আবেশের দৃষ্টি তখন সামনে৷ ডান হাত জানালার কাচ নামানোর জন্য নিয়োজিত ৷ মাধুর্য আবেশের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো৷ আবেশের দিকে তাকালে তার কেমন যেন লাগে৷ রাগ হয় আবার অন্য অনুভূতি গ্রাস করে৷ এই অনুভূতি নাম না জানা।

‘ আমাকে দেখা শেষ হলে গাড়ি থেকে নামো৷’

আবেশ গাড়ি পার্ক করে বলল। কখন তারাএসেছে সেটা একদম খেয়াল হয় নি মাধুর্যের৷ তার এহেন কাজে নিজেই অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে সিটবেল না খুলেই নামতে গেলে আবেশ আটকে দিয়ে বলল,

‘ আরে সব ছিড়ে টিড়ে বের হবে না-কি তুমি! সিট বেল তো খুলো আগে৷’

‘ খুল..খুলছি৷’ মাধুর্য অপ্রস্তুত হয়ে জবাব দিলো৷ আবেশ দুইদিকে মাথা ঝাকিয়ে বলল,

‘ কিছু হবে না তোমায় দিয়ে৷ চুপ করে বসো আমি খুলে দিচ্ছি৷’

আবেশ আবারো ঝুঁকে এলো৷ ঠিক সকালে মতো৷ মাধুর্য ভয়ে চোখমুখ খিঁচে পেছনে ঠেস দিয়ে বসলো৷ আবেশ যত্ন করে খুলে দিয়ে বলল,

‘ নামো৷’

মাধুর্য দ্রুত চোখ খুলে নেমে দাঁড়ালো৷ তার কাজে আবেশ হাসছে৷ মাধুর্য নেমে দাঁড়িয়ে একদফা অবাক হলো ৷ মেডিকেল কলেজের সামনে তারা দাঁড়িয়ে আছে ৷ মাধুর্য অবাক হয়ে আবেশের দিকে তাকাতেই আবেশ সামনের দিকে দেখিয়ে এগিয়ে যেতে বলল ৷ মাধুর্য অবাক হচ্ছে৷ আবারো আবেশের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই আবেশ বলল,

‘ সাইকোলজি নিয়ে পড়ার ইচ্ছা আছে কি-না বলো! যদি ইচ্ছা না হয় তাহলে চলো ফিরে যাই৷’

চলবে……

[যাদের কাছে গল্পটা পৌছাবে এবং যারা পড়ছেন তারা অবশ্যই রেসপন্স করবেন৷]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here