ভেতরে বাহিরে পর্ব -৩২

0
92

#ভেতরে_বাহিরে
পর্বঃ৩২
লেখিকাঃ #রুবাইদা_হৃদি

শুভ্র কুয়াশার চাঁদরে আচ্ছাদিত প্রকৃতি৷ আকাশের কালো রঙের মাঝে সাদা ধবধবে বিশাল চাঁদর দল বেয়ে নেমে এলো ধরণীর বুকে ৷ মৃদু হাওয়ার তালে দোল খাচ্ছে ঝুলানো আর্টিফিশিয়াল ফুল গুলো৷ মাধুর্য নির্বাকচিত্তে দাঁড়িয়ে আছে নাবিহার কথা শুনে৷ অবাকের রেশ তখনো তার কাটে নি৷ নাহিবা তাকে তাড়া দিয়ে বলল,

‘ ভাবী..জলদি করো৷’

‘ না..না নাবিহা তুমি ফাজলামো করছো৷’

‘ আরে বাবা! তিন সত্যি৷ আজ তোমার আর ভাইয়ার হলুদ,কাল বিয়ে আর বাসর তারপর রিসেপশন৷ নাবিহা বলে কিছুটা দম নিয়ে জিহবা কাটলো৷ মাধুর্য বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে ৷
এর মাঝেই ইরা রুমে ঢুকে তাড়া দিয়ে বলল,

‘ কী’রে নাবু,তোকে সেই কখন পাঠিয়েছি মাধুর্যকে নিয়ে নীচে নামার জন্য৷ ওইদিকে সব গেস্ট এসে পরেছে৷’

ইরার কথা শুনে ভাবশূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নির্বাক হয়ে৷ সব যেন ঘোলাটে৷

_______
আকস্মিক হাওয়ার তোড়ে বৃক্ষরাজি মাথা নোয়াচ্ছে৷ শীতের শুভ্র প্রহর মুক্তোর ন্যায় ঝড়ছে৷ কেঁপে উঠা ঠোঁট আর গায়ে থাকা চাদর টেনে মাহমুদ ধীরপায়ে ব্যাক ইয়ার্ডে এগিয়ে যাচ্ছে৷ হাতে ধোঁয়া উঠা কফির মগ৷
ঝিরিঝিরি বাতাস প্রবাহিত প্রকৃতিতে৷ সামনে থাকা সেগুনবাগিচা যেন দানবীয় বৃক্ষ দুঃখের সুর তুলছে৷ তাদের মন ভালো নেই৷ কথাটি আওড়াতেই নাজিফার দুচোখ বেয়ে অশ্রুবিন্দু টুপ করে ঝড়ে পড়লো৷ মাহমুদ অতি সপ্তপর্ণে কফির মগটা পাশে নামিয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল, ‘ তার মন ভালো নেই৷’
নাজিফা কয়েকদফা কেঁপে উঠে দমিয়ে রাখা কান্না গুলো বহিঃপ্রকাশ করতেই মাহমুদ নরম হাতে চোখ মুছিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

‘ শোনো নাজিফা,দিন দুনিয়া রসাতলে যাক আমার জীবনে তুমি’ই প্রথম তুমি’ই শেষ৷’

নাজিফা চোখ বোজে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো৷ এই মানুষটার ভালোবাসার ঋণ সে শোধ দিতে পারবে না৷ মাহমুদের বুকের বাঁ পাশে মাথা ঠেকিয়ে অম্লান কন্ঠে বলল,

‘ আমি মা ডাক শুনতে চাই মাহমুদ৷’

মাহমুদ লম্বা শ্বাস টেনে বলল, ‘ পিতামাতা হীন সন্তানের মা হবে নাজিফা? তাদের কোনো একজনকে আমরা সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিয়ে একটু সুখ খুজে নেই,কী বলো?’

নাজিফা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলো৷ সে জানে কলুষিত উচ্চাকাঙ্খী সমাজে পালিত সন্তানের অবহেলা কতোটা ভয়াবহ৷ কারণ সে নিজেও তথাকথিত পালিত সন্তান মাহফুজা আর নজরুলের৷ তবে তার ছোটবেলা জঘন্য হলেও তার ঘরে যে আসবে তাকে সে আগলে রাখবে,ভালোবাসবে৷ একটু না’হয় অসামাজিক হবে সমাজের প্রতি৷ তাতে ক্ষতি কী! ক্ষতি নেই বরং ভালোভাবে বেঁচে থাকা যাবে ৷

____

সুগন্ধী রজনীগন্ধার সৌরভে মাতোয়ারা হয়ে আছে সর্বকোনাচে। আবেশ সাদা আর হলুদ মিশ্রিত পাঞ্জাবি পরে বাগানের ঠিক মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। আর নির্বাকচিত্তে হাত ঘড়ি দেখে কপাল কুঁচকে ফেলছে। সুঠাম দেহে আঁটসাঁট পাঞ্জাবিতে তাকে সুপুরুষের কাতারে অনায়াসে ফেলা যায়। শ্যাম বর্ণ কপালে ছেয়ে আছে কয়েকটা চুল। বক্র দৃষ্টি যেন ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে। বিরক্ত রেশে চেয়ে পরিবর্তন মুখমণ্ডল যেন আরো আকর্ষণীয়। গম্ভীর মুখমণ্ডল হ্ঠাৎ করেই নম্রতা ঘিরে ধরলো। চোখে উঁপচে পড়ছে খুশির রেশ । চিকচিক করছে সেই দৃষ্টি। অবশেষে অপেক্ষার অবসান।
নাবিহা গাড়ি থেকে নেমেই শাড়ি গুছিয়ে নিলো সযত্নে। কয়েকগোছা চুল কানের পিঠে গুজে দিয়ে হাসিমুখে বলল,

‘ সামনে তোমার রাজকুমার দাঁড়িয়ে আছে,ভাবী।’

নাবিহার কথার সুর যেন হু হু করে মাধুর্যের কম্পনের মাত্রা তীব্র হারে বাড়িয়ে দিলো। অর্ধেক খোলা জানালা দিয়ে মুখ উঁচিয়ে সামনে তাকালো সে। ফোন হাতে আবেশ জানালার দিকেই তাকিয়ে আছে। মাধুর্য সাথে সাথেই দৃষ্টি নামিয়ে মৃদু হেসে উঠলো। বিড়বিড় করে বলল,

‘ মাধুর্য এবার হয়তো তোর সমস্ত দুঃখ সুখ পাখি হবে।’

‘ ভাবী দ্রুত নামো।’ মাধুর্যের ভাবনার মাঝেই নাবিহা দ্রুত ভাবে বলল।

মাধুর্যের মুখের ভাষারা আজ নির্বাসন গিয়েছে। তার শুধু মনে হচ্ছে সব স্বপ্ন। এই বুঝি চোখ খুললে স্বপ্নরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।
দুরুদুরু মনের কোঠা।সব যেন ঘুমন্ত রাজ্যের স্বপ্ন। আবেশ ইতিমধ্যে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। নাবিহাকে দেখে নাকমুখ কুঁচকে বলল,

‘ এমন ভুত সেজেছিস কেনো।’

‘ ছোট ভাইয়া ! তুমি সব সময় এমন করো।’ নাবিহা গাল ফুলিয়ে বলতেই আবেশ তার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,

‘ ভাগ এখান থেকে।’

নাবিহা মুখে দুষ্টুমির হাসি টেনে বাঁ ভ্রু উঁচিয়ে কিছু একটা বলতে নিলেই আবেশ দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলল,

‘ উল্টাপাল্টা কোনো কথা না। ডিরেক্ট বাসার ভেতর ঢুকে যাবি।’

আবেশের হুমকি কর্ণকুহরে পৌঁছুতেই নাবিহা লেহেঙ্গা হাতের মুঠোয় ধরে বাসার ভেতরের দিকে অগ্রসর হয়।
আবেশ বিনাবাক্যে গাড়ির কাঁচে মৃদু টোকা দিয়ে মাথা সামনের দিকে নত করে সুমিষ্ট কন্ঠে বলল,’ আমার সাম্রাজ্যে নতুন নিয়মে,নতুন রুপে স্বাগতম আমার রাণী।’
আবেশের কন্ঠ যেন শিরশিরে অনুভূতিতে গ্রাস করে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা রাখে। মাধুর্য জমে আছে মূর্তির ন্যায়। এক হাতের তালুতে আরেক হাতের তালু ঘষছে অনবরত। ঠোঁট কেঁপে উঠছে বারেবারে। সে স্থবির হয়ে গাড়ির সিটে ঠাই বসে রইলো। আবেশ বুকের বাঁ পাশে হাত দিয়ে মৃদু হাঁসছে।
চারদিকে আলোকচ্ছটার ছড়াছড়ি। বাগানে মানুষের সমাগমে মুখরিত। তবুও মাধুর্যের মনে হচ্ছে, সব থমকে গেছে। সে শুকনো ঢোক গিলে মাথা কিছুটা উঁচু করতেই আবেশের মুখোমুখি হলো। ইতিমধ্যে আবেশ গাড়ির দরজা খুলে কখন যে তার সামনে মুখ বাড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে খেয়াল করে নি।
তার হৃৎপিন্ড ক্রমাগত দ্রিমদ্রিম আওয়াজ তুলছে। ওষ্ঠদ্বয় কম্পয়মান মাধুর্যের। কন্ঠনালী দিয়ে মৃদু আওয়াজ তুলে বলল,

‘ বা…বাসায় যাবো।’

‘ আগে তোমাকে দেখবো।’ আবেশ স্বভাবসুলভ হেসে বলল। মাধুর্য পিটপিট চোখে তাকিয়ে লজ্জায় আবৃত হয়ে ঠায় বসে রইলো। আবেশ মুগ্ধ চোখে দৃষ্টি বোলাচ্ছে তার প্রেয়সীর স্নিগ্ধ মুখমণ্ডলে। কাঁচা হলুদ শাড়িতে অপরুপা লাগছে তার মাধবীলতাকে।
মাধুর্যের কপালে ছড়িয়ে থাকা চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে আলতো ভাবে ঠোঁটের পরশ দিতেই মাধুর্যের চোখ বেয়ে নোনাপানি টুপ করে ঝড়ে পড়ে। এযেন অনাবৃত সুখ !
আবেশ তার গালে হাত রেখে রাশভারী গলায় বলল,

‘ সুখ তোমার হোক।আমি দায়িত্ব নিলাম আমার সুখ তোমায় যেন মুড়িয়ে রাখে। সমস্ত কালো অধ্যায়ের সৃতি দিনের আলোর ন্যায় প্রস্ফুটিত হয়ে পিষে যাক অতল গহব্বরে।’

আবেশের কথা অনুভব করার পূর্বেই বাড়ির ভেতর থেকে ডাক আসে ভেতরে যাওয়ার। আবেশ সপ্তপর্ণে মাধুর্যের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে এগিয়ে গেলো ভেতরে। আজ মাধুর্যের চারদিকে কেমন সুখ সুখ অনুভূত হচ্ছে। এই বুঝি সব বলল,’ মাধুর্য তোর সুখ তো উঠানে। পা বাড়িয়ে কুড়িয়ে নেওয়ার সময় এসেছে যে।’

___

নতুন রঙ,নতুন দিন,সুখেরা আজ নীড়
ভালোবাসি..ভালোবাসি সখী

‘এরপর কী? ‘ মাধুর্য হুট করেই প্রশ্ন করে বসলো৷ আবেশের মুখভঙ্গি দেখার মতো৷ সে নিজ মনে ছন্দ প্রস্তুতে ব্যস্ত ছিলো ৷ তবে মাধুর্য মাঝে থেকে প্রশ্ন করে সব ছন্দ গুলিয়ে দিয়েছে৷
মাধুর্যের উৎসাহ আকাশসম৷ সে পিটপিট চোখ করে অবলোকন করছে আবেশের কাটা কাটা চেহারা,কপালের ভাজ৷

প্রায় দীর্ঘসময় তারা হলুদের অনুষ্ঠান থেকে মুক্তি পেয়ে খোলা আকাশের নীচে তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে একাকী ৷ এই সুযোগ ফয়েজ নিজে করে দিয়েছে৷ এইজন্য আবেশ পারলে ফয়েজকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে নেয়৷
ইদানীং তার কিশোর হতে ইচ্ছা হয়৷ যে বয়সের প্রেমে মাদকতা আছে,আছে সুদূর খামখেয়ালি চিন্তা৷ আর অঢেল ভালোবাসা সাথে প্রেয়সীকে আগলে রাখার হাজারো বাহানা ৷ যেইসব দিন যেন মধুর৷ এখন দায়িত্বের সাথে ভালোবাসা৷ যা রক্ষা করা বড্ড কঠিন৷
আবেশকে চুপ থাকতে দেখে মাধুর্য ভড়কে গেলো৷ কম্পয়মান সরু কন্ঠে বলল,’ আপনি রাগ করেছেন?’
মাধুর্যের স্বর আবেশের কর্ণগোচর হতেই সে বিনাবাক্য মাধুর্যের কপালে নিজের অধর ছুঁয়ে গাঢ় চুম্বন এ লিপ্ত হয়৷ মাধুর্য নির্বাক,হতভম্ব৷ তার হৃদয় থমকে আছে৷
আবেশ ততোক্ষণে কিছুটা দূরত্ব রেখে সরে দাঁড়িয়েছে৷ মাধুর্যের অধরে স্মিত হাসি ৷ এ হাসি যেন প্রাণনাশের ৷ এ হাসি যেন সুখের৷ তবে বুঝি সুখেরা নীড়ে ফিরলো?

চলবে….

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here