মনের অন্তরালে পর্ব -০১

0
63

~Will you marry me মিস প্রহেলী সিকদার?
সামনে বসে থাকা যুবকটির এমন বেপরোয়া প্রশ্নে অনেকটাই হকচকিয়ে গিয়েছে প্রহেলী।সে নিজ কানকে বিশ্বাস করতে পারছেনা যে তার হবু বরের প্রাণ প্রিয় বন্ধুর মুখ থেকে এমন আপত্তিজনক প্রশ্ন শুনবে।প্রহেলী নিজের অশান্ত মনকে একটু শান্ত করে বললো,
~মিস্টার প্রলয়,আপনি কী ভুলে যাচ্ছেন আমি সম্পর্কে আপনার কী হতে চলেছি?
যুবতির প্রশ্ন শুনে যুবকের কোনো হেলদোল হলো না সে আগের মতো আয়েশ করে বসে চোখেচোখ রেখে বললো,
~আরে এতে ভোলার কী আছে আপনি আমার ভাবী হতে চলেছেন এখন পর্যন্ত হননি।
প্রলয়ের এমন কট্টরপন্থী কথা শুনে প্রহেলী রাগে ফুসছে কিন্তু পাবলিক প্লেস দেখে কিছুই বলছেনা।নিজেকে মজার পাত্রী বানাতে চায় না প্রহেলী নিজের ব্যাগটা পাশের চেয়ার থেকে নিয়ে বললো,
~আগে যদি বুঝতে পারতাম আপনি এতোটা নিচ তাহলে কখনো এখানে আসতাম না।
প্রলয় ঠোঁট উল্টে বললো,
~আমার প্রতি এতো রাগ কেন?
প্রহেলী চোখ বন্ধ করে জোরে নিশ্বাস ছেড়ে চোখ খুলে প্রলয়ের দিকে তাকালো প্রলয়ের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি দেখে প্রহেলীর রাগ আরো বেড়ে গেলো সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো রেস্টুরেন্টের আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত।প্রহেলী বললো,
~আমি চলে যাচ্ছি আর কোনোদিন আমার সাথে দেখা করার চেষ্টা করবেন না।
এতটুকু বলে প্রহেলী বাহিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই প্রলয় খপ করে তার হাত ধরে ফেলে।এতে প্রহেলী পিছন ফিরে চোখ বড় করে প্রলয়ের দিকে তাকালো।প্রলয় সেই চাহনি উপেক্ষা করে বললো,
~একবার ভেবে দেখতে পারো।আমার কাছে পরশের থেকেও বেশি টাকা আছে আর সমাজে আমার সম্মানটাই বেশি।
প্রহেলীর মাথায় এবার আগুন জ্বলে উঠলো কতক্ষণ ধরে আজেবাজে কথা বলছে নিজেকে আর কন্ট্রোল না করতে পেরে। প্রলয়ের থেকে নিজের হাত ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নিয়ে একটা থাপ্পর বসিয়ে দিলো প্রলয়ের গালে।
_____________

প্রলয় থাপ্পড় দেওয়া গালে হাত দিয়ে দাড়িয়ে আছে কোনো লজ্জা নেই তার দুচোখে উল্টো তার ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে আছে।মানুষজন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে প্রহেলী আঙুল তুলে প্রলয়কে বললো,
~যে বন্ধু আপনাকে নিজ ভাইয়ের মতো ভালোবাসে তাকে ঠকাতে কলিজা কাঁপলো না আপনার।আর পরশের মাও আপনাকে কতোটা ভালোবাসে এতো ভালো মানুষদের সাথে এমন করতে আপনার লজ্জা লাগলোনা।
প্রলয় গাল থেকে হাত নামিয়ে বললো,
~থাপ্পড়টা একটু জোরেই দিয়েছেন এখনো জ্বলছে।
প্রহেলী আর কোনো কথার অপেক্ষা না করে হনহন করে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আসলো সে।প্রলয় প্রহেলীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
~তুমি একদিন আমার কাছে অবশ্যই আসবে।আর সেদিন আমি তোমায় নিজের করেই ছাড়বো।
প্রহেলী রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আসলো ঠান্ডা বাতাস প্রহেলীর শরীরে লাগতেই সে কেঁপে উঠলো।শরীরে দেওয়া চাদরটা আরো ঠিকভাবে নিয়ে সে হাঁটা ধরলো রিক্সার খোঁজে। পরশকে জানাতে হবে আজকের ঘটনা আগামীতে যদি অন্য কারো কাছ থেকে জানে তাহলে সেটা খারাপ দেখাবে।প্রহেলী নিজ ভাবনায় ব্যস্ত পরশ প্রলয়কে কতোটা ভালোবাসে কিন্তু প্রলয় তার সাথে এমন আচরণ করবে ভাবতেও শরীর গুলিয়ে আসে প্রহেলীর।পরশ কী তাকে বিশ্বাস করবে নাকি প্রলয়ের পাশে দাড়িয়ে তাকে প্রতারক বলে দূরে ঠেলে দিবে?
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রহেলী রিক্সা ডেকে তাতে উঠে বসলো তখনই প্রহেলীর ফোনটা বেজে উঠলো।প্রহেলী বিরক্ত হয়ে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখলো তার বাবা আমরুল সিকদার ফোন করেছে।প্রহেলী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে দিতেই অপরপাশ থেকে হুকার ছেড়ে বললেন,
~প্রহেলী,তুমি তোমার ছোট মায়ের সাথে আবারো বেয়াদবি করেছো।বেচারী কেঁদে কেটে নিজেকে কাহিল করে ফেলছে তোমার মা কী এই শিক্ষা দিলো তোমাকে?ভাবতেও লজ্জা লাগছে।
প্রহেলী বললো,
~তাহলে তো দাদীকে লজ্জা পাওয়া দরকার তার ছেলে ঘরে বউ থাকতেও পরনারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক করে ছিল।
প্রহেলীা এহেন কথায় আমরুল সিকদার অনেকটাই চুপসে গেলেন কিন্তু তা প্রকাশ না করে বললেন,
~একদম মায়ের মতো হয়েছো আজ আসো বাসায় মা মেয়ের খবর করে ছাড়বো।
প্রহেলী বললো,
~আমার মায়ের সাথে যদি কোনো ধরনের খারাপ আচরণ করেছেন তাহলে আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাবেন আর দোকান থেকেও নিজের সব কাজ গুছিয়ে বের হয়ে যাবেন।ভুলে যাবেন না যে দোকানের জন্য এতো বড়লোকগিরি দেখান সেই দোকানটা প্রহেলী সিকদারের।এ কথাটা মাথায় গেঁথে রাখবেন
প্রহেলী নিজ কথা শেষ করে খট করে ফোনটা কেটে দিলো।

_____________

আমরুল সিকদার মেয়ের এমন আচরণে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালেন প্রথম স্ত্রী আমিনা সিকদারের দিকে।একপাশে গুটিশুটি হয়ে দাড়িয়ে আছেন তিনি পাশের সোফায় বসে আহাজারি করে কাঁদছে আমরুল সিকদারের দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়া সিকদার সে বলছে,
~বুবু,তোমার মেয়ে আমাকে এভাবে অপমান করলো তুমি বসে বসে শুনলে তুমি যেটা করতে পারোনা।সেটা মেয়েকে দিয়ে করাও
আমরুল সিকদার বিরক্ত হয়ে মারিয়া সিকদারকে বললেন,
~এখন চুপ থাকো নাহলে আর এবাসায় থাকতে হবে না।
আমিনা সিকদার বললেন,
~দেখো মারিয়া,আমার মেয়ে কোনো ভুল কিছু বলেনি তুমি তার চরিত্র নিয়ে কথা বলেছো।সে এটার প্রতিবাদ করেছে
আমরুল সিকদার মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
~তুমি রুমে যাও।এখানে এক দন্ডও থাকবেনা
মারিয়া সিকদার চোখ মুছতে মুছতে নিজ রুমে চলে গেলো।আমিনা সিকদার রান্নাঘরে চলে এসে শাশুড়ির জন্য চা বানাতে শুরু করলো।
প্রহেলী দাড়িয়ে আছে “শান্তিনিকেতন” নামক বাড়ির সামনে।এ বাড়ির ৪তলায় তার ভবিষ্যৎ সংসার গড়ে উঠবে প্রহেলি মনে মনে ভাবলো তার বাবা জীবনে হয়তো একটিই ভালো কাজ করেছে।পরশের মতো জীবনসঙ্গী তার জন্য পছন্দ করেছে লোকটি তাকে আগলে রাখে অনুভূতি গুলো বুঝতে পারে।লোকটির প্রতি এক অন্য ভালোলাগা কাজ করে কিন্তু ভালোবাসাটা কাজ করে না এটি ভাবলেই প্রহেলির মন বিষাদে ভরে যায়।
প্রহেলি কিছু না ভেবে বাড়ির ভিতর ঢুকে পরলো। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো সে পরশকে সব জানাবে।প্রলয় যে কতোটা নিচ মানসিকতার মানুষ তা পরশের জানা উচিত।দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রহেলী নিজ গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

____________

পরশ মাত্র শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আসলো।টাওয়ালটা বিছানায় ফেলে আয়নার সামনে দাড়িয়ে কালো রঙের শার্টটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে তার বোতাম গুলো লাগাতে ব্যস্ত তখনই রুমে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করলো পরশের মা রুমানা তালুকদার।পরশ মাকে চিন্তিত দেখে ভ্রুকুচকে বললো,
~কী হয়েছে?মা সব ঠিক আছে?
পরশের কথায় শুকনো ঢোক গিলে বললেন,
~প্রহেলী এসেছে।
পরশ রুমানা তালুকদারের কথা শুনে মেকি হেঁসে বললো,
~তো এতে চিন্তার কী আছে?
রুমানা তালুকদার নিশব্দে রুমে ডুকে বললেন,
~বিয়ের আগেই এভাবে মেয়ে হবু শশুড় বাড়ি এসে পরেছে বিষয়টা চিন্তার ব্যাপার পরশ।প্রহেলী কী আমাদের গোপন কথাটা জেনে গিয়েছে?
রুমানা তালুকদারের কথায় পরশ বললো,
~প্রহেলী চালাক বটে কিন্তু আবেগের কাছে বোকা বনে যায়।তুমি চিন্তা করোনা সে কিছুই জানে না চুপচাপ ওর ওপর নজর রাখো।
রুমানা তালুকদার মাথাদুলিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসলেন।লম্বা নিশ্বাস নিয়ে রান্নাঘরে চলে আসলে
পরশ শার্টটা ঠিক করে হাতে ঘড়িটা পরে মোবাইল হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসতে নিবে তখনই তার মোবাইলটা বেজে উঠলো।পরশ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রলয়ের নামটা ভেসে উঠছে স্ক্রিনে।
পরশ হালকা হেসে ফোনটা রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে প্রলয় বলে উঠলো,
~কী রে কোথায় তুই?
পরশ বললো,
~এই তো বাসায়।
প্রলয় বললো,
~তোর আমার সাথে দেখা করার কথা ছিল।
পরশ মাথা চুলকে বললো,
~আসলে প্রহেলী এসেছে তুই বাসায় চলে আয় একসাথে আড্ডা হয়ে যাবে।
প্রলয় বললো,
~জোরু কা গোলাম এখন থেকেই শুরু হয়ে গেলো।
পরশ হেসে বললো,
~সময় আসলে দেখা যাবে নে কে জোরু কা গোলাম হয়?
প্রলয় হেসে বললো,
~আমি আসছি।
প্রহেলী হলরুমে বসে আছে তখনই তার রুম থেকে বের হয়ে আসলো প্রহেলীর দিকে নজর পরতেই তার ঠোঁটের হাসিটা আরেকটু চওড়া হয়ে যায়।মেয়েটি তার প্রতিটি সাক্ষাতে এক নতুন চমক দেয় দেখা যাক এইবার কী হয়?
পরশ আলতো পায়ে হেঁটে প্রহেলীর কাছে চলে আসলো।প্রহেলী পরশকে দেখে উঠে দাড়ালো পরশ দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে হাত দুটো বুকে গুজে বললো,
~হবু বউয়ের কী অপেক্ষা করতে সমস্যা হচ্ছে?বিয়ের আগেই শশুড় বাড়িতে এসে পরেছে।
পরশ যে প্রহেলীর সাথে মজা করছে তা সে খুব করে বুঝতে পারছে।প্রহেলী লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে বললো,
~আপনার সাথে কিছু কথা আছে।
পরশ প্রহেলীর একদম কাছে গিয়ে তার দুগালে হাত রেখে বললো,
~বলো কী বলবে?
প্রহেলী কিছু বলতে যাবে তার আগেই রুমানা তালুকদার সেখানে উপস্থিত হয়ে পরে।পরশ প্রহেলীর গাল থেকে হাত সরিয়ে একটু দূরে সরে দাড়ালো।

_____________

রুমানা তালুকদার হাতের ট্রেটা টেবিলে রেখে প্রহেলীর হাত ধরে সোফায় বসিয়ে বললো,
~প্রহেলী,তোমার মা আমাকে বলেছিল তুমি নুডুলস পাকোরা অনেক পছন্দ করো।আমি নিজ হাতে বানিয়েছি একটু টেস্ট করে বলবে কেমন হয়েছে?
রুমানা তালুকদারের কথা শুনে প্রহেলী প্লেট থেকে একটা পাকোরা উঠিয়ে মুখে পুরে নিলো।প্রহেলী মুখের খাবার শেষ করে বললো,
~আন্টি, অনেক ভালো হয়েছে।
রুমানা তালুকদারের চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠলো যেমন একথাটাই সে শুনতে চেয়েছিলেন।
প্রহেলীকে তার অনেক পছন্দ ছেলের বউ হিসেবে সে প্রহেলীকেই চায়।আর তার ছেলেও যে প্রহেলীর জন্য পাগল তা সে খুব ভালো করেই জানে।
পরশ এতক্ষণ দাড়িয়ে তার মায়ের সব কাজ পর্যবেক্ষণ করছিল।পরশ বললো,
~প্রহেলী,কিছু বলতে এসেছিলে তুমি?
প্রহেলী পরশের দিকে তাকিয়ে বললো,
~আসলে
প্রহেলী নিজ কথা শেষ করার আগেই কলিংবেল বেজে উঠলো।পরশ দরজার দিকে তাকিয়ে বললো,
~আমি দেখছি।
পরশ দরজার কাছে চলে আসলো তারপর দরজা খুলে দিলো।কিন্তু আশ্চর্য বাহিরে কেউই নেই পরশ ভ্রুকুচকে দরজার বাহিরে চলে গেলো তখনই প্রলয় এসে পরশকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।তা বুঝতে পেরে পরশ বললো,
~পিঠের পিছে কাজ করা তুই বন্ধ করলিনা।
প্রলয় বাঁকা হেসে বললো,
~তুইও তো করিস।
পরশ বললো,
~ভিতরে চল।
পরশ আর প্রলয় একসাথে বাসায় প্রবেশ করলো প্রহেলী প্রলয়কে দেখে হাত মুঠো করে নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে লাগলো।রুমানা তালুকদার প্রলয়কে দেখে অনেক খুশি হলেন সে প্রলয়ের কান টেনে বললেন,
~মায়ের কথা মনে পরলো তোর?
প্রলয় কান ছাড়িয়ে বললো,
~জরুরি কাজ ছিল এতোদিন।
প্রহেলী এসব দেখে আরো বেশি ফুসছে সে বসা থেকে দাড়িয়ে বললো,
~আমি আসি বাসায় যেতে হবে।
প্রহেলীর কথা শুনে প্রলয় বললো,
~কী ভাবি,আমি আসলাম আর আপনি চলে যাবেন।
It’s not fair say something পরশ।
পরশ প্রহেলীর হাব-ভাব দেখে বুঝতে পারলো প্রহেলী রেগে আছে।তাই পরশ বললো,
~থাক প্রলয় ওকে যেতে দে।তুই মায়ের সাথে থাক আমি ওকে দিয়ে চলে আসবো
প্রলয় একবার প্রহেলীর দিকে তাকিয়ে বললো,
~Ok bye.My sweet little angel.
প্রহেলী পরশের সাথে বাসার বাহিরে চলে আসলো সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই প্রহেলী বললো,
~আপনার বন্ধু অনেক বিশ্রী মানুষ।
প্রহেলীর কথা শুনে পরশের পা থমকে গেলো সে পিছনে ঘুরে দেখলো প্রহেলী ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। পরশ কাছে এসে প্রহেলীর হাত ধরে গাড়ির সামনে নিয়ে এসে তাকে গাড়িতে বসিয়ে দিলো।

চলবে

#গল্পের_নাম_মনের_অন্তরালে
#লেখনীতে_Alisha_Rahman_Fiza
পর্বঃ১

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here