মেঘভেলায় প্রেমচিঠি পর্ব -২২+২৩

0
44

“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি ”

২২.

‘হেলো,সূর্য মাহতাব স্পিকিং। ‘

স্পষ্ট কন্ঠস্বরের কাছে একটু ঠুনকো মনে হলো নিজের গলাকে। রোদসী আমতা আমতা করে বলল,

‘ইয়া..মানে’

‘জ্বি? ‘

‘আসলে আমি রোদি। ‘

‘সরি, কোন রোদি?’

রোদসী বুঝতে পারলো, সে বোকামি করে ফেলেছে।
স্যার কীভাবে তার এই নাম জানবে! উফ, নিজের উপর বিরক্ত হলো কিছুটা। গলা পরিষ্কার করে বলল,

‘স্যার, আমি ক্লাস টেনের রোদসী বলছি। আমি, আপনার কোচিং এ পড়তে চাই। ‘

‘ওহ আচ্ছা। তাহলে, আজ সন্ধ্যায় একবার এসে ভর্তি হয়ে যাও। কাল থেকে ক্লাস করবে। ‘

‘জ্বি জ্বি, ধন্যবাদ স্যার। আমি আজই আসছি। ‘

রোদসী কল কেটে হাফ ছাড়লো। তারপর বাসায় এসে কোচিং এর কথা মা’কে জানালো। তিনি আপত্তি করলেন না ৷ যদি এবার একটু ভালো রেসাল্ট করতে পারে!

সন্ধ্যায় সোহাকে আর রিম্মিকে ফোন করে বলে দিলো কোচিং এর কথা। নিজেও সাজগোছ করে বের হলো। রোদসী বরাবরই একটু সাজতে পছন্দ করে। হাতের কবজিতে সবসময়ই দুই মুঠো জামার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে চুড়ি পড়ে। মাথায় একটু ডিজাইন করে দুটো লম্বা বেণী করে রাখে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের ছিমছাম পাতলা শরীর। যদিও চিকন হওয়ায় মাঝে মধ্যেই বন্ধু মহলে ঠাট্টা করা হয়। তবে, ওসব গায়ে থোরাই না মাখে রোদসী! সেসবে কান দেয়না সে। সারাদিন সেজেগুজে এদিকে ওদিকে ঘুরে দুষ্টুমি করাই প্রধান কাজ তাঁর। অবশ্য এর পেছনে একটা কারণ আছে। প্রথমত নানাবাড়িতে যেমন সে আদরিনী। তেমন, এখনের বাড়িটাতেও আহ্লাদী। বয়স সাত কিংবা আট হবে, তখন থেকে মনিরুল হোসেনের এই কেনা ফ্ল্যাটটাতে এসে থাকছে। পুরো বাড়িতে প্রতি ঘরে শুধু ছেলে। নয় তলা বাড়ির এই বিল্ডিংটায় একমাত্র মেয়ে রোদসী। আর বাড়ির বেশিরভাগ সদস্যরাই খুব আন্তরিক। তাই, বলতে গেলে সারাদিন ও বাসা এ বাসা করে লাফিয়ে বেরায়। চঞ্চলে ধাঁচের মানুষ হওয়ায় সবার সাথেই দ্রুত মিশে যায়। তবে, এই আহ্লাদের কারণে, অনেকেই ফার্মের মুরগী বলে ডাকে তাঁকে। কারণ, একটুতেই সে অসুস্থ হয়ে যায়। আবার হুটহাট, এদিকে ওদিকে আছাড় খেয়ে পড়ে ঠুসঠাস । এই যেমন কয়েক দিন স্বভাববশত গান শুনতে শুনতে ঘর মুছছিলো শখ করে। বলা যায়, কেয়া হোসেনের বকাঝকায়। রোদসী প্রমাণ করতে গেছিলো, সেও খুব কাজের। মোটেও অকর্মা নয়। আর যা হওয়ার তাই!
কীভাবে যেন পা পিছলে ঠাস করে পড়ে গেলো। মাথায় আঘাত পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান। পুরো বাড়ির মানুষ হাসপাতালে ছুটলো। আর কোনোদিন ভয়ে কেয়া ওকে কাজ করতে পাঠান না। ওহ! শুধু মাঝে একদিন চুলায় রান্না বসিয়ে একটু ছাদের কাপড় আনতে গেছিলেন, সেদিন ওকে বলেছিলেন যাতে ডালটা একটু নেড়ে দিয়ে বাটিতে ডাল ঢেলে রাখতে। রোদসী তারপর ডাল পাতিল থেকে নামিয়ে বাটিতে রেখে, বোকার মতো খালি পাতিলটা চুলায় রেখে দিলো। চুলার দিকে খেয়ালও করলো না। অনেকক্ষণ পর কেয়া এসে দেখেন অল্পের জন্য পাতিলে আগুন ধরেনি। রোদসী শিশুসুলভ ভাবে বলল,

‘আমার কী দোষ! তুমিই তো বললে, ডালটা বাটিতে রাখতে। তাই আমি ডাল রেখে পাতিল চুলোয় রেখেছি। ‘

কেয়া হা হুতাশ করতে লাগলেন। এর কীভাবে বকবক কমিয়ে একটু বুদ্ধিমান বানাবেন সেই চিন্তায় রইলেন। রোদসী নিজের দোষ আগেই বুঝতে পেরেছে। কিন্তু দোষটা নিজের মাথায় নিতে হবে , আরও বকা খেতে হবে ভেবে চুপচাপ সটকে পড়ে।

রিকশা ভাড়া দিয়ে সামনে তাকালো রোদসী। ঠিক সামনেই সাইনবোর্ড টানানো আছে। সেখানে লেখা,
সূর্যপ্রতীক একাডেমিক কোচিং সেন্টার। রোদসী ভেতরে ঢুকে গেলো। তেমন কেউ এখনো আসেনি।
ধীরে ধীরে গিয়ে দেখলো, একটা স্টুডেন্টকে বড় রুমে বেঞ্চ বসানো জায়গায় উল্টো পিঠে বসে কিছু বোঝাচ্ছে। রোদসী পেছনে থেকে ডাক দিতেই তিনি ফিরে তাকালেন। উঠে দাঁড়িয়ে কাছে আসলেন। রোদসী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। সূর্য স্মিত হেঁসে বললেন,

‘রোদসী? ‘

রোদসী কোনো রকম হেঁসে বলল,

‘জ্বি স্যার। ‘

‘বুঝেছি, এসো। ‘

বলে সূর্য তাঁকে অফিস রুমে নিয়ে গেলো। ফর্ম পূরণ করে দিলো রোদসী। সূর্য স্যারকে যদিও আগে দুইবার দেখেছে কিন্তু তেমন কোনো কথা বলেনি। ছয় সাত যাবৎ স্কুলে জয়েন করেছে। ওদের ক্লাস নেয় মাঝে মধ্যে। ফর্সা দেখতে, খুব বেশি লম্বা নয়। স্বাস্থ্যবান বলা চলে। খারাপ লাগলো না ওর। পরদিন থেকে তিনজন কোচিং এ গেলো। ধীরে ধীরে রোদসীর সরল মনে লাগলো, সূর্য মানুষ হিসেবে খুব ভালো। মন খারাপ করার কোনো সুযোগ নেই। মনে মনে অত্যন্ত শ্রদ্ধাবোধ হলো। সঙ্গে তীব্র বিশ্বাস। এমনকি স্কুলের ক্লাসেও খুব হাসিঠাট্টা করে লোকটা। কোচিং এ আসার প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। একদিন কোচিং-এ পড়ার মধ্যেই হঠাৎ একটা সুন্দরী একটা মেয়ে এসে দাঁড়ালো। রোদসী চিনতে পারেনি। তাই সোহাকে বলল,

‘এটা কে?’

সোহা বললো সেও চিনেনা। কিছুক্ষণ পর একটা স্টুডেন্ট বলল,এটা তাঁর বউ। সবাই অনেক অবাক হলো। আজ পর্যন্ত এমন কোনো কথা হয়নি, বা স্যার বলেনি সে বিবাহিত। প্রায় সবাই তাঁকে অবিবাহিত বলেই চেনে। রোদসী স্যারের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘বাহ! স্যার বিবাহিত!’

সূর্য একটু জোর করে হেঁসে বলল,

‘ওই আরকি। ‘

সূর্যের বউ নদী তখন পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা হাসতে হাসতে বলল,

‘ওমা! তোমরা জানতে না? ‘

রোদসী সহ সবাই মাথা নাড়িয়ে না বললো। কথায় কথায় নদী বলল, সেও এক সময় এখানে স্টুডেন্ট ছিলেন। তারপর তাদের প্রেম, বিয়ে। নদী মেয়েটাকে দেখে বোঝা গেলো, সে সূর্যকে খুব ভালোবাসে। সবকিছুর মধ্যে একটা জিনিস একটু খটকা লাগলো রোদসীর। সূর্য নিজের বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে এতো ইতস্তত কেনো?
“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি ”

২৩.

সোহার ডাকে পেছনে ফিরে এক ঝলক হাসি দিয়ে তাকালো রোদসী। দুপুরের কটকটে তাপ থেকে নিজেকে আড়াল করতে হাত মাথার উপরে রাখলো। টিংটিংএ শরীরটা নিয়ে দৌড়ে এলো। সোহার কাছে এসে দাঁড়াতেই সোহা ঝাড়ি দিয়ে বলল,

‘রোদের বাচ্চা! সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি আমি তোর জন্য, এই সময় হলো আসার! ‘

রোদসী জিহ্বা কাটে, ফিক করে হেসে বলে,

‘সরি সরি, তুই সকালে হঠাৎ করেই বললি মার্কেট যাবি আমি তাড়াতাড়ি করেই সব কাজ শেষ করলাম কিন্তু শেষ টাইমে আরুকে খাইয়ে দিতে গিয়ে লেট হলো। ‘

‘হুহ! ‘

‘আচ্ছা, এখন তোর দেরি হচ্ছে না? ‘

‘ওহ হ্যা হ্যা, চল। আমার বড় বোনের জন্মদিন দুইদিন পর। কেনাকাটা করতে হবে। তুইও আসবি কিন্তু। ‘

রোদসী আর সোহা নানান কথা বলতে বলতে মার্কেটে ঢুকলো। শাড়ির দোকানে গিয়ে শাড়ি দেখতে দেখতে দরদাম করছে রোদসী। সোহা বা রিম্মি দুজনেই কেনাকাটার সময় রোদসীকে সঙ্গে নিয়ে আসে। কারণ সে ভালো দরদাম করে। বাজেটের ভেতরেই সব কিনতে পারে। সব কিছু টিপটিপ ফিটফাট রাখতে রোদসীর হাত দুটো বেশি চলে ৷ জহুরির চোখের মতো ভালো সুন্দর জিনিস গুলোই কিনে। পড়াশোনায় এভারেজ, তবে অন্য জিনিস গুলোতে বেশ রুচিশীল। তাই কেনাকাটার কথা মাথায় এলেই সবার আগে রোদসীর কথা মনে পড়ে। রোদসী জলপাই সবুজ রঙের একটি শাড়ি হাতে নিয়ে দেখছিলো পছন্দ হতেই নিয়ে নিলো নিজের জন্য। তারপর সোহার সাথে যাবতীয় জিনিস পত্র নিয়ে মার্কেট থেকে বের হলো।
কপালে ওড়না দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই পেছনে থেকে এক গুরুগম্ভীর কন্ঠ শুনে থেমে গেলো। সোহার কর্ণকুহর হতেই পেছনে ফিরে দেখে সূর্য স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। সোহা ভ্রু উঁচিয়ে রোদসীকে ফিসফিস করে বলল,

‘এই রোদ, দেখতো এটা সূর্য স্যার না! ‘

রোদসী পেছনে তাকিয়ে দেখলো সত্যিকারেই সূর্য স্যার দাঁড়িয়ে আছে। গোছানো ইন করা শার্ট আর হাত দুটো পকেটে ঢুকানো। সূর্য দেখতে অনেকটাই সুদর্শন।
রোদসীর দেখা মাত্রই এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে এলো সূর্য। হাসিমুখে বলল,

‘তোমরা এখানে যে, কেনাকাটা করতে এসেছো! ‘

সোহা হাসি দিয়ে কিছু বলার আগেই রোদসী বলল,

‘এমা! মার্কেটে কী কেউ ঘুমাতে আসে নাকি! ‘

রোদসীর এই মুখের উপর বলে দেয়ার স্বভাবের কারণে অনেকেই তাঁকে ঠোঁটকাটা বলে ডাকে। রোদসীর একপ্রকার অভ্যাস, কেউ অযৌক্তিক কথা বললে সাথে সাথে ধরিয়ে দেয়া। এই যেমন, সূর্য স্যারের সামনে বললো। মার্কেটে যে সবাই কেনাকাটার জন্যই আসে, এটাই স্বাভাবিক। অহেতুক কথার প্রতিত্তুর করায় সূর্য একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

‘উহ! রোদসী, তোমার এই স্বভাব কবে বদলাবে! ‘

তিনজন কথা বলতে বলতে বাইরে এসে দাঁড়ালো।
হঠাৎ-ই সোহার ইমারজেন্সি কল আসে বাসা থেকে।সোহা রোদসীকে বলল,

‘দোস্ত, আমার এখনই যেতে হবে। ‘

‘আচ্ছা, আমিও যাবো তোর সাথে। আমাদের বাসা তো কাছাকাছি। ‘

‘না না থাক, তুই বরং সূর্য স্যারের সঙ্গে আসিস। আমার পার্লারে একটা কাজ আছে। ‘

সোহা বলেই একটা রিকশা নিয়ে চলে গেলো। এমন আচরণের মানে খুঁজে পেলো না রোদসী। রাগ উঠে গেলো প্রায়। যার জন্য সাত সকালে ঘুম ভেঙে এলো, সে কিনা ওকে ফেলেই চলে যায়। রোদসী বিরবির করে গালি দেয় সোহাকে। আজ ওর জন্য এতো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। জীবনেও একা সূর্য স্যারের সঙ্গে যাবে না রোদসী৷ ভেবে সূর্য স্যারকে বলল,

‘আমি আসি স্যার। ভালো থাকবেন। ‘

সূর্য উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

‘কেনো! একা যেতে হবে না। চলো আমি দিয়ে আসি তোমাকে। ‘

রোদসী বেজায় বিরক্ত হয় মনে মনে। এভাবে কোন পুরুষ মানুষের সাথে একা যেতে ইচ্ছে করেনা। তবুও, অগত্যা শিক্ষক মানুষ বলে বাধ্য হয়ে রাজি হয়। সূর্য হেসে রিকশা ডাকে। রোদসী উঠে বসতেই ওর পাশে ধপ করে বসে। গায়ে ঘেঁষা লাগতেই সংকুচিত হয়ে চেপে যায় রোদসী৷ সূর্য কথার ঝুলি খুলে বসে। নিজের স্কুল লাইফ সম্পর্কে নানান কথা বলতে থাকে, কখনোবা রোদসীকেও জিজ্ঞেস করছে। রোদসী মাথা নাড়িয়ে শুধু হ্যা, না বলছে। বাসার কাছে আসতেই রোদসী হাফ ছাড়লো। দ্রুত পদে নেমে সালাম দিয়ে বাসায় চলে যায়। পেছনে থেকে সূর্য হয়তো আরও কিছু বলছিলো, কিন্তু রোদসী সেদিকে কর্ণপাত করেনি।

দেখতে দেখতে এসএসসির আর দুই দিন বাকী আছে। যে যেমন স্টুডেন্টই হোক, সারারাত দিন বই হাতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিকেলের দিকে রোদসী ধ্যান জ্ঞানের সবটুকু দিয়ে বই পড়ছে। এমন সময় রিম্মি কল করে বলল,

‘রোদ, দুইদিন পরেই পরীক্ষা, চল আজকে অনেকক্ষণ পড়বো কোচিং-এ। ‘

রোদসী দোনোমোনো করে বলে,

‘বাসায় পড়ছি আমি, ভালো লাগছে না। তোরা যা। ‘

রিম্মি জেদ করে বলে,

‘দেখ, এভাবে বাসায় পড়লে আমরা কখনো ভালো রেজাল্ট করতে পারবো না। তুই চলতো। আমিও যাচ্ছি। ‘

‘সোহাও আসবে? ‘

‘হ্যারে বাবা হ্যা। ‘

‘আচ্ছা তাহলে আসছি আমি। তোরা আসিস কিন্তু। ‘

মোবাইল রেখে থম মেরে বসে কিছুক্ষণ। রোদসীর মন টানছেনা কেনো জানি। গত কয়েক দিন যাবৎ সূর্য স্যারের আচরণ ওর কাছে অন্য রকম লাগছিলো। কথায় কথায় হাত ধরা। অতিরিক্ত ভাব জমানোর চেষ্টা। তাই, সামনে পরীক্ষা হওয়া সত্ত্বেও বাসায় বসেই পড়াশোনা করছিলো। কিন্তু এখন না চাইতেও উঠে রেডি হয়। কোচিং এর ভেতর ঢুকে অনেকটাই চমকে উঠলো রোদসী। একটা মানুষও নেই। কী আশ্চর্য! সোহা, রিম্মি কেউই নেই। রোদসী বের হওয়ার জন্য উদ্যত হলো। কিন্তু একজোড়া হাত তাঁকে পেছনে থেকে টেনে নিলো। কানের কাছে মুখ গুঁজে বলল,

‘জান, অবশেষে তুমি এলে। ‘

চলবে-
চলবে-

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here