মেঘভেলায় প্রেমচিঠি পর্ব -০২+৩

0
58

“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি”

২.

বিমুঢ় মুখে থম মেরে দুই মিনিট টানা টানা চোখে চিঠিটার দিকে তাকিয়ে খুবই সাধারণ ভাবে হাতের কাগজটা দুমড়ে মুচড়ে নিচে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে চলে গেলো রোদসী। প্রেম ভালোবাসায় খুব একটা আগ্রহী নয় সে। উদাসীন চিত্তে ভাবতে লাগলো, সকালের বইটা কয় পৃষ্ঠা পর্যন্ত যেনো পড়া হয়েছিলো?

বরাবরের মতোই স্নান সেরে এসে ফ্যানের নিচে বসলো রোদসী। গোসল করার পরও গরম লাগছে। অথচ বাহিরে বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব। গরম লাগার কারণ অবশ্য তাঁর নিজের চুলই। ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সামলাতে সামলাতে হাঁপিয়ে উঠতে হয়। চোখ বন্ধ করে বসে ছিলো সে। এমন সময় ভেতরে এলো আরু। হাতে অঙ্কের খাতা।
হয়তোবা কঠিন অঙ্কগুলো সমাধান করতে সক্ষম হয়নি বলেই ছুটে এসেছে। খাতাটা নিয়ে নিঃশব্দে সমাধান বের করে লিখে বুঝিয়ে দিলো রোদসী। যতটা কম শব্দ উচ্চারণ করা সম্ভব ঠিক ততটুকু। আরু কিছুক্ষণ নতুন বাসা নিয়ে বক্তব্য দিলো তারপর নতুন বন্ধু নিয়ে, আজ এই হয়েছে, ওই হয়েছে। রোদসীর নির্বাকতা দেখে এক সময় বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো।
এ তো রোজকার ঘটনা!

শনিবার আজ,ভার্সিটিতে ক্লাস আছে। তৈরি হয়ে নিচে নামলো সে। কেয়া পরোটা ভাজি দিয়ে মাখিয়ে অল্প একটু মুখে পুড়ে দিতেই পানি দিয়ে গিলে নিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করলো পেট ভরে গেছে। তারপরই ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। কেয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পথের দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘রোদির বাবা, কয়টা বছরে মেয়েটা কত বদলে গেছে না! কত কথা বলতো, অথচ এখন! ‘

মনিরুল হোসেন ব্যাথিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শুধু।
কেয়া ভারিক্কি শ্বাস ফেলতে ফেলতে কাজে মনোনিবেশ করলেন। প্রতিটি নিঃশ্বাসে হয়তো আত্মগ্লানি ও অপরাধবোধ মিলেমিশে একাকার।

‘এই যে এই,মিস ভাড়াটিয়া! ‘

ধুলোবালি দিয়ে ভরে আছে রাস্তাটা। মুখে মাস্ক চেপে দ্রুত পদে হেঁটে যাচ্ছিলো রোদসী। এলার্জি আছে এসব ধুলোয়। তা-ই যতসম্ভব গা বাঁচিয়ে চলতে পারলেই স্বস্তি পায়। এখানে থেকে পনেরো মিনিটের পথ ভার্সিটির। লেট হয়নি যদিও তবুও তাড়াহুড়ো করছে। সময়জ্ঞান একটু বেশিই কিনা!

নোটসগুলো কালেক্ট করে কিছু পড়ার বই কিনতে হবে। কত কাজ বাকি আছে! উফ। রুমাল বের করে কপালটা মুছে নিলো। তখনই পেছন থেকে ডাক এলো। এক পা বাড়াতে নিয়েও থেমে আছে। না দেখেই বুঝতে পেরেছে এটা কে। একবার ভাবলো, এড়িয়ে সামনে চলে যাবে। তারপর আবার মনে হলো, দেখি কী বলে বদ ছেলেটা!

একগুচ্ছ বিরক্তি ফুটিয়ে পেছনে ফিরে তাকালো রোদসী। ইতিমধ্যে শহর দৌঁড়ে তাঁর দুই হাত দূরে এসে দাঁড়িয়েছে। রোদসী কিঞ্চিৎ অবাকই হয় ভেতরে ভেতরে। এই যে, কালকে রাগের মাথায় কী জোরেই না ছেলেটার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো। অথচ, ছেলেটা এমন করে এসে একগাল হেঁসে দাঁড়িয়েছে মনে হয় রোদসীর কত চেনা পরিচিত। শ্যামবর্ণের দেখতে ছেলেটা। মুখের সাথে চোখদুটোও যেনো দুষ্টুমি করে হাসে। রোদসী ভেবে পায় না, একটা ছেলে এতোটা দুষ্ট কী করে হয়! তাঁর মতে ছেলেরা হবে গম্ভীর, ব্যাক্তিত্বসম্পূর্ণ। কিন্তু এই ছেলেটা সম্পূর্ণ বিপরীত।
অবাক হওয়াটা প্রকাশ করে না সে। চোখ ছোট ছোট করে বলে,

‘বলুন, বাড়িওয়ালার ছেলে। ‘

শহর ভ্রু উঁচিয়ে হাসে। প্রতি দিনের মতোই ব্যাটটা হাতে। দাঁড়িয়ে আছে বাচ্চাদের পা ছড়িয়ে। ঠোঁটের উপরে ছোট একটা তিল। হাসির দমকে ঝুমঝুমিয়ে উঠছে। বাম হাতের বলটা হাওয়ায় ছুঁড়ে বলে,

‘বাড়িওয়ালার ছেলে আবার কেমন কথা? আমার নাম হচ্ছে শহর। শহর ইন্দেজার। ‘

‘বেশ। তাহলে মেয়েদেরও যে একটা নির্দিষ্ট নাম থাকে তা জানেন না আপনি?’

‘হ্যা, জানবো না কেনো?’

‘তবে, আমাকে মিস ভাড়াটিয়া, মিস ভাড়াটিয়া করছেন কেনো! নাকি বোঝাতে চাচ্ছেন, ভাড়া দিয়ে যারা থাকে তারা গরীব। গরীব বলতে চান আমাকে? ‘

শহর জিহ্বা কেটে দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলল,

‘ছি! তা কেনো বলবো! ‘

‘তাহলে কী বলতে চান?’

শহর উপর দিকে মাথা উঠিয়ে কিছু একটা ভাবে। ফিক করে হেঁসে বলে,

‘আপনি অনেক রাগী। ‘

স্পষ্ট কথায় থতমত খেয়ে যায় রোদসী। ছেলেটা তো বেশ ঠোঁটকাটা! রাগে খিটমিট করে তাকায় সে। সন্দিহান মুখে বলে,

‘বেয়াদব ছেলে! আমার সময় নষ্ট করার জন্য ডেকেছেন তাই না?’

‘না। আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে। ‘

‘একটু আগে তো তুমি করে বললেন, এখন আপনি বলছেন কেনো?’

‘আগে তো দূর থেকে একটা গলুমলু মেয়ে মনে হচ্ছিলো। যে রাগ দেখালেন, মুখ ভয়ে তুমি বলতে পারছে না। ‘

হা করে তাকিয়ে রইলো রোদসী। কী বলবে বুঝতে পারছেনা। তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে হাতঘড়ি দেখে বলল,

‘আজাইরা কাজ করার সময় নেই আমার। আমি ভার্সিটি যাচ্ছি। ‘

সোজাসাপটা কথাটা বলে এগিয়ে গেলো রোদসী। পেছনে পেছনে দেহরক্ষীর মতো শহরও এগিয়ে আসলো। রোদসী মুখ খিঁচে মৃদু চেঁচিয়ে বলল,

‘আমার পিছে পিছে আসছেন কেনো বেয়ারা ছেলে! ‘

‘আপনার গায়ের সুগন্ধি আমার ভালো লেগেছে। এটা রজনীগন্ধার স্মেল। আপনার ঘ্রাণ আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমার তো দোষ নেই। ‘

‘বাজে বকা বন্ধ করে চলে যান তো! ‘

‘পরিচিত হতে সমস্যা কী?’

‘আমার সাধ জাগেনি তো এতো রংঢং করার। কিছু বলবো না আমি!’

‘বেশ, আপনাকে বলতে হবে না। আমি বলছি। ‘

রোদসী খিঁচড়ে যাওয়া মনমেজাজে পা ফেলে চলেছে। পিছনে নিজের মন মতো করে বলেই যাচ্ছে শহর।

‘বুঝতে পারছেন, আমি হলাম আমার বাবা মায়ের দুইমাত্র ছেলে। আমি বড়,শহর ইন্দেজার। ছোট ভাইয়ের নাম শিশির। আমার মায়ের নাম তো জানোই তাইনা! বাবার নাম বলি, শওকত। আমার চাচী, আর একটা পুঁচকেও আছে। আমার পরিবারে কোনো মেয়ে নেই বুঝেছো। মাস্টার্সে পড়াশোনা করছি। ‘

কানে তালা লেগে যাওয়ার উপক্রম রোদসীর। সে একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বলল,

‘চুপ করুন! আমি কী জানতে চেয়েছি, আপনার ফ্যামিলি হিস্ট্রি আপনার কাছেই রাখুন। ‘

শহর তবুও হাসলো ৷ রোদসী বেখেয়ালি হয়ে রাস্তার সাইড দিয়ে যেতেই পাশ থেকে শাঁই করে একটা বাইক গেলো। আচমকা তাল হারিয়ে ফেললো সে। এই বুঝি পড়ে গেলো! কিন্তু দুটো হাত তাঁর পিঠ আঁকড়ে টান দিতেই ধাক্কা খেয়ে শহরের হাত শক্ত করে ধরে রাখলো। ভীত চোখে শহরের দিকে তাকালো। একটুর জন্য এক্সিডেন্ট হয়নি। উত্তপ্ত শ্বাস ফেলছে সে অনবরত। শহরের মুখে তখনও বিস্তর হাসি। সে
রোদসীর উজ্জ্বল শ্যামলা চেহারার দিকে ঝুঁকে গিয়ে বলল,

‘ম্যাডাম, ভয় পেয়েছো? এখন আবার ছোট ছোট লাগছে তোমাকে।’

শুকনা ঢোক গিলে সরে গেলো রোদসী। বড় করে শ্বাস ফেলে ভার্সিটির ভেতর ঢুকে গেলো। পেছনে একবার তাকিয়ে দেখলো শহর এখনও দাঁড়ানো। হাঁটতে হাঁটতে বুকের বা পাশটা চেপে ধরে সে। এত জোরে ধুকপুক করছে কেনো! কী যেনো কিছু একটার পরশ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ফু দিচ্ছে। মেঘের শতদল মনগহীনে কিছু একটার জায়গা তৈরির চেষ্টা করছে! কিন্তু কী হলো এটা!

মনের আকাশ পাতাল চিন্তা ভাবনা সেখানেই স্থগিত করে ক্লাস রুমে গিয়ে বসলো। চুপটি করে বইটা নিয়ে চোখ বুলিয়ে নিলো। আশেপাশের মেয়েরা গল্পগুজবে ব্যস্ত। সেসব দেখে কী একটা ভেবে হাসে রোদসী। এক সময় তাঁর জীবনটাও ছিলো সুন্দর, রঙিন, চঞ্চলে। জলন্ত ফানুসের ন্যায় চকচকে। কিন্তু ফানুস যেমন কিছুক্ষণ পরই অন্ধকারে মিশে যায়, ঠিক তেমনই তার শৈশবের রঙিন আলোটাও নিভে ম্লান হয়ে গেছে। কিছু একটার তীব্র জ্বলুনি ও আক্রোশপ্রসূত মনোভাব তৈরি হয় অন্তকরণে। চোখের কোণে অজান্তে জমা জলটুকু মুছে বইয়ের দিকে তাকায়। বইটাই এখন তাঁর একমাত্র বন্ধু। আগের বন্ধু, সম্পর্ক গুলো কী কুৎসিত ভাবেই না হারিয়েছে!

মিনিট দশেক পরেই ক্লাস টিচার এসে পড়েন। বিনয়ী মুখে বসে রোদসী। তাঁর পাশে কেউ বসেনি। বলতে গেলে সে নিজেই একা বসেছে। দুইটা মেয়ে তাঁর পাশে বসতে চাইলে সে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু কোনো কথা বলেনি। কিন্তু অন্য মেয়েরা তো আর বোবা হয়ে বসে থাকবে না। যেখানে মনের সুখে আনাচে-কানাচের গল্প শুনতে পাওয়া যায় সেখানেই দৌড়ে গিয়ে বসেছে। তাই রোদসী একাই সবার প্রথম বেঞ্চে। সাধারণত ঐখানে বসতে কেউই আগ্রহ দেখায় না। কারণ, ওখানে বসলে কথা বলা যায় না। তেমন কারো নজরে পড়েনি তখনও সে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে যা হলো, তাতে সকলের নজরটা ঠিক সামনের বেঞ্চে বসা গুরুগম্ভীর মেয়েটার উপর গিয়েই ঠেকলো!
“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি”

৩.

‘তুমি তো সেই মেয়েটা না? যে এইচএসসি তে ঢাকা বোর্ডে টপ করলে? ‘

মাথা তুলে একবার তাকালো রোদসী। খুব একটা ভাবান্তর দেখা গেলো না তাঁর মাঝে। তাই ধীরস্থির ভাবে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলল। মুখে নুন্যতম পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু আশেপাশের অনেকের ভাবমূর্তিতে তখন অবাক হওয়ার রেশ। কেউ কেউ হা করে দেখছে। যেন কোনো চিড়িয়াখানার প্রাণী সে। রোদসীর কিঞ্চিৎ অস্বস্তি হওয়ায় সে মাথা নিচু করে বসে থাকলো। সাধারণত ভালো স্টুডেন্টদের টিচাররা বেশি গুরুত্ব দেয় তাই স্যার একটু পরপরই পড়ার মধ্যে তাঁর খোঁজ নিচ্ছে। এতে একটু বিরক্তই হচ্ছে রোদসী। সে চায়নি কেউ অতিরিক্ত কিছু করুক তাঁর জন্য। তা-ই কারোও সাথে কোনো রকম কথা বলেনি। কিন্তু না চাইতেও তাই হলো। ঘুরে ফিরে সবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাঁর দিকেই আবদ্ধ হলো। সাংঘাতিক রকমের মেজাজ গরম হলো তাঁর। বাসায় থাকলে এই মুহূর্তে হাতের কাছে কিছু পেলে হয়তো আস্ত থাকতো না। নীরসতা নিয়ে কলম কামড়ে পড়াগুলো দেখে নিলো।

হালকা হরিদ্রাভ মেঘ পেঁজা তুলোর মতো নেচে-কুঁদে
সুরেলা করছে ঝলমলে আকাশ। বাতাসে হেমন্ত হেমন্ত ঘ্রাণ। শরতের শারদীয় কাশফুলের সময় প্রায় শেষ। কাশফুল শেষ! ভাবতেই মনের অতল গহ্বরে মন খারাপের তামাটে বর্ণ ঝরে পড়ে। এক সময় রোদসী দু চোখ ভরে স্বপ্ন দেখতো কাশফুলের নবরূপে সে মেতে উঠেছে। কিন্তু সেগুলোতেও এখন মাটি চাপা দিয়ে যান্ত্রিক হয়ে গেছে। ফুটপাত ধরে ছন্দ মিলিয়ে হাঁটছে রোদসী। আকাশের অনিন্দ্য রহস্যময় রূপে কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। নাকের ডগায় এঁটে থাকা নীল ফ্রেমের চশমাটা খুলে ব্যাগ থেকে বক্সটা বের করে রেখে দিলো। ব্যাগটা আবারও কাঁধে তুলে ফুটপাত থেকে নিচে নামলো। বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছে। এটা মাঠ, কিছুটা সামনেই দুটো বাড়ি। কিন্তু মাঠের উপর দিয়ে আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখজোড়া বড় বড় হয়ে যায় তাঁর। দুই কদম সচল হয়ে যেতেই দেখে দশ পনেরো জন বাচ্চা জড়ো হয়ে কোনো একটা খেলা খেলছে। হতবাক হয়ে সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে যায় রোদসী। কী হচ্ছে কী বুঝতে পারছে না। কিন্তু খুব কৌতূহল হচ্ছে জানার। শহরে এরকম করে খেলার সুযোগ না পাওয়ায় নামটাও জানেনা। হাতে হাত রেখে মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো। ভ্রুকুটি করেও যখন ওর কিছুই বোধগম্য হলো না তখন মুখটা অসহায় হয়ে এলো। সামান্য একটা জিনিস সম্পর্কে সে জানেনা, ব্যাপারটা ক্লাস টপার রোদসী কিছুতেই মানতে পারে না। এখন আর উনিশ থেকে বিশ হলেই রাগে ফসফস করে ওঠে। “হেরে যাওয়া ” শব্দটা ঘষে ঘষে উঠিয়ে দিয়েছে পুরোপুরি। সেটার মুখ দেখতেও নারাজ ও। হেরে মুখ উল্টো করার অভ্যাসটা বিয়োজন করেছে জীবনের হালখাতা থেকে। এখন পুরোটা জায়গা জুড়েই শুধু জিত আর জিত। নিজের কাছে কতটুকু জিতেছে সেই উত্তরটা বারংবারই এড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে আনে। মাথা বাকিয়ে খেলার জায়গাটায় মনোযোগী হলো। হঠাৎ করেই ওড়নায় টান অনুভব হয়। নিচে তাকিয়ে দেখলো একটা ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রোদসী হাত দিয়ে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে?

মেয়েটা ডিলিক দিয়ে মাটি থেকে খানিকটা উঁচু হয়ে বলল,

‘তুমি খেলবে আমাদের সাথে? ‘

রোদসী সামনে একবার তাকিয়ে বলল,

‘কী খেলছো তোমরা? ‘

ছোট মেয়েটা যেনো আমোদ খুঁজে পেলো কথাটায়। খিলখিল করে হেঁসে বলল,

‘তুমি এতো বড় হয়েও জানো না! আমরা গোল্লাছুট খেলছি। ‘

কথায় কিছুটা নাক ফুলিয়ে নিলো রোদসী। রোদের তীর্যক প্রলেপ। লাল হয়ে যাওয়া মাঝারি নাকে ছোট একটা নাকফুল। চকচক করছে রোদে। সে মাথা নাড়িয়ে বলল,

‘নাহ। আমি যাবো না। ‘

‘কিন্তু তোমাকে তো ভাইয়া ডেকেছে! ‘

‘কোন ভাইয়া? ‘

‘ঐ যে, কিউট ভাইয়াটা! ‘

রোদসী বুঝতে পারলো মেয়েটা শহরের কথা বলছে। ও আগেই খেয়াল করেছে শহর আজ ক্রিকেট না খেলে বাচ্চাদের সঙ্গে অন্য কিছু খেলছে। রোদসী মনে মনে ভাবে, ছেলেটার নাকি সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা! তাহলে এমন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরছে কেনো! আনমনেই বিরবির করে বলে, কাজকর্ম না হলে যা হয় আরকি! ফেল করবে যখন, তখন ঝাড়ুদার হয়ে সাধ মিটবে। আসুক একবার ঝেড়ে দেবো একদম।

বলতে বলতেই শহর এসে হাজির। রোদসীকে তোয়াক্কা না করে হাতের মুঠোয় থাকা পানির বোতলটা উপুড় করে নিজের মাথায় ঢেলে দেয়। খেলতে খেলতে মাথার তালু গরম হয়ে গেছে। ভেজা জবজবে শরীর আর ঘেমে যাওয়া গলা দেখে দু কদম ছিটকে দূরে সরে রোদসী। মুখে হাত চেপে চেঁচিয়ে বলে,

‘অভদ্র বেয়াদব ছেলে! আচ্ছা আপনার কী নুন্যতম কমনসেন্সটুকুও নেই? উহহু! গা থেকে গন্ধ আসছে আপনার! ‘

শহর হাসি একখানা দিয়ে বলল,

‘এখানে কমনসেন্স না থাকার কী হলো! আর আমার গা থেকে গন্ধ আসছে তা এতো দূরে দাঁড়িয়ে বুঝলে কী করে তুমি! ব্যাপার কী বলো তো? ‘

রোদসী কথায় থতমত খেয়ে নাক ছিটকে বলল,

‘যত্তসব ফালতু কথা! ‘

‘আচ্ছা, আমি তো ফালতুই বলি। তুমি দাঁড়িয়ে এখানে কী দেখছিলে? শুনেছি তুমি তো নাকি আবার বইপোকা। সারাদিন ধরে বসে বসে নাকি শুধু একদিকে তাকিয়ে থাকো! চশমাটা দেখি। ‘

বলেই টান দিয়ে চশমাটা নিয়ে গেলো শহর। রোদসী কিড়মিড় করে চিল্লিয়ে বলল,

‘এই এই! চশমা দিন আমার। ‘

শহর চশমা পড়ে স্টাইল করে ছবির পোজ করলো। যেনো চলচ্চিত্রের নায়ক সে। রোদসী জোর করে টেনে নিলো চশমা। চোখে পড়ে নিয়ে ভেঙচি কেটে বলল,

‘যেই না চেহারা, তাঁর নাম আবার পেয়ারা! ‘

শহর হাসি থামিয়ে চট করে বলল,

‘কী বললে তুমি? ‘

‘আয়নায় দেখে নিয়েন একবার। চেঙ্গিস খানকেও ছাড়াবেন কয়দিন পর। আমার থেকেও কম ওজন হবে আপনার। ছি ছি! ছেলেরা এতো চিকন হয় নাকি! ‘

রোদসী বুঝতে পারলো শহর কিছুটা রেগে গেছে। ভেবে পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করলো। তারমানে চিকন ব্যাপারটা নিয়েই একমাত্র রাগানো যায় বেয়ারা ছেলেটাকে। রোদসী মনে মনে শয়তানি হেঁসে বলল,

‘এবার বুঝবে তুমি চান্দু! কথায় কথায় মুখে হাসি ভেটকানো বের করবো তোমার। ‘

রোদসী এরকম চিকন নিয়ে আরও কয়েকটা বাক্য ছুঁড়ে দিয়ে জিহ্বা দেখিয়ে গেট খুলে বিল্ডিং-এ ঢুকে গেলো। কেয়া হোসেন দরজা খুলে দিলেন৷ রোদসী ভেতরে ঢুকেও মিটমিট করে হাসতে লাগলো। অনেকটা বেশি অবাক হলেন৷ কতদিন পর মেয়েটা এভাবে হাসলো! নিজের পরিবর্তনটা টের পায়নি মেয়েটা হয়ত।

শহর গমগমে মুখে কলিং বেল বাজালো। দিলারা চটে রোজকার মতো করে বললেন,

‘ওরে আমার সোনা বাবারে! আসেন, আপনার জন্যই তো ফুলের মালা সাজিয়ে রেখেছি। ‘

শহর মুখ কালো করে জুতো খুললো। প্রতিউত্তর না করায় দিলারা ছেলের কপাল ছুঁয়ে বললেন,

‘কীরে! এতো ভদ্রলোক হলি কবে? কথা মাটিতে পড়ার আগেই খই ফুটাস। জ্বর ট্বর হলো নাকি বাপ? ‘

শহর কিছুটা মুখ ফুলিয়ে রেখেছে। প্রথম দিন যখন শুনলো তাদের বাড়িতে যে নতুন মেয়েটা এসেছে, সে বেশ বুদ্ধিমান। সারাদিন নাকি বইয়ের সাথে লেগে থাকে। শহরের এদিকে আবার অনেক এলার্জি। সে সারাদিন ঘুরবে ফিরবে তারপর টইটই করে ইধার উধার করে দুনিয়া কাঁপাবে। সন্ধ্যার পর বাসায় মায়ের বকুনি খেয়ে অলস হয়ে বিছানায় শুয়ে রবে। কিন্তু কী এমন আছে, ওই মেয়েটার মধ্যে যার জন্য মায়ের টিটকারি সহ্য করতে হচ্ছে। তা দেখতেই তাঁর যত কৌতূহল। গতকাল তো চাচাতো বোন, তাঁকে ইরামিও পঁচিয়ে দিলো। সে যখন খেতে বসলে তখনই দিলারা রসিয়ে চাচীকে বললেন,

‘জানিস রুমা,আমাদের দোতলায় যে ভাড়াটিয়া এসেছে, তাদের মেয়েটা পড়ায় কত ভালো! আমার একটা অকর্মা হয়েছে। হ্যারে! আমি বেয়ারাটা হওয়ার সময় কী খেয়েছিলাম? শহরকে ওই মেয়েটার পা ধোয়া পানি এনে খাওয়ালে কী ছেলেটা সুস্থ হবে আমার! ‘

তখন চাচী রুমানা, ছোট ভাই শিশির আর থ্রিতে পড়া ছোট ইরামিও একচোট হেঁসে নিলো। ইরামি ফোকলা দাঁতের হাসি ফুটিয়ে বলল,

‘আমার স্কুলের স্যার বলে, শয়তানে ধরলে পানিপড়া এনে খাওয়ালে ভালো হয়ে যায়। বড় আম্মু,ভাইয়াকে তুমি ওই আপুটার কাছ থেকে পানিপড়া এনে খাওয়াও।’

শহরের মেজাজটাই তিরিক্ষি হয়ে গেলো। কোন এক মেয়ের জন্য তাঁকে এভাবে অপমান হতে হচ্ছে !

শহর এসেই পায়ের মোজা নিয়ে সোফায় বসে পড়ে।
মেয়েটাকে রোজ জ্বালাতে ভালোই এন্টারটেইন হয়। আর আজ কিনা ওই মেয়েটাও তাঁকে চিকন বলে অপমান করলো! সে উঠে দাঁড়িয়ে চিল্লিয়ে মাকে বলল,

‘আম্মা! চারটা ডিম সিদ্ধ করো। পরোটা বানাও। ঘি দিয়ে যেনো হয়। বেশি বেশি করে দিবে! মোটা হতে চাই আমি। ‘

দিলারা, রুমা দুজন দুজনকে বড় বড় চোখ করে দেখছে। যে ছেলেকে গুঁতিয়ে একবেলা বেশি খাওয়ানো যায় না সে নিজে খাওয়ার কথা বলল! তাও আবার সবচেয়ে অপছন্দের ডিম!

দিলারা মাথায় হাত দিয়ে বললেন,

‘হায় হায়! এ আমার কী সর্বনাশ হলো গো! আগে থেকেই ছেলেটা বান্দরে,তা নাহয় মেনে নিলাম। এখন পাগলও হয়ে গেলোরে! সব শেষ আমার সব শেষ! ‘

শহর সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,

‘কোনো কথা শুনতে চাইনা! মোটা হবো। তারপর আমার মোটা পেট দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ওই চশমা ওয়ালিকে উড়িয়ে দেবো! আমি চেঙ্গিস খান নই, ওই মেয়েটাকে বুঝিয়ে দেবো। ‘

চলবে –
লেখিকা-নাঈমা হোসেন রোদসী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here