মেঘভেলায় প্রেমচিঠি পর্ব -০৪+৫

0
49

“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি”

৪.

ঝিঁঝি পোকার ডাক ও সম্মোহনী আবছায়া ঠান্ডা বায়ু। কাঁচের জানালার ফাঁক বয়ে তাঁর পরশ ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে। একটুখানি মিটমিটে হাওয়া টুকুশ করে রোদসীর পিঠে এসে লাগতেই শিরশির করে ওঠে তাঁর সমস্ত দেহখানি। মাঝরাতে এমন হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বিরক্তির বোতল খুলে সবটুকু অংশ তাঁর মুখমন্ডলে ছড়িয়ে যায়। নরম তুলতুলে বিছানায় আরও কিছুক্ষণ নিজেকে গলিয়ে রেখে ঘুমকে টেনে আনার প্রচেষ্টা করলো। কিন্তু তা সম্ভব হলো না। বাহিরে হয়তো বৃষ্টি হয়েছে। তাই ঠান্ডা হয়ে গেছে পরিবেশ। ঘরেও ফুল স্পিডে ফ্যানের ঘূর্ণনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। এমতাবস্থায় কারো পক্ষেই ঠান্ডার প্রলেপ ঢেলে শুয়ে থাকা সম্ভব নয়। অতএব, রোদসী নামক উষ্ণপ্রিয় মেয়েটিও পারলো না। গ্রীষ্মে সূর্যের ক্রোধানলে জ্বলে পুড়ে যখন মানুষের মগজে আগুন তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে, তেমন সময়েও মেয়েটা দিব্যি মোটা বিশাল কম্বল টেনে মুখ গুঁজে আমোদে ঘুমিয়ে পড়ে। মায়ের খসখসে বকাঝকায়ও তাঁর কোনো ভাবাবেগ হয়না। অতিমাত্রায় ঠান্ডায় দুই পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে বালিশ থেকে মুখ উঠিয়ে বিছানায় বসে পড়ে সে। মুখে মৃদু হতাশাজনক ‘উহঃ’ শব্দ করে বসলো। চারদিকে আলোয় ভরপুর, তবুও কেমন যেন একটা ভয় ভয় জেগে ওঠে। সে ভয় কোনো ভূত বা প্রেতাত্মার মতো অদৃশ্য জিনিসে নয়। বরং রোদসীর করা এক ভয়েপ্রজ্জলিত অভিজ্ঞতার। সারাদিন অন্ধকার করে ঘরে একা বসে থাকতে পটু হলেও আকাশের বুকে অন্ধকার নামলেই জেঁকে বসে অন্য রকম ভয়। তাই হালকা বাতির একটা বাল্ব ড্রিম লাইটের জায়গায় লাগিয়ে রেখেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। ড্রেসিং টেবিল থেকে চুলের কাঁকড়াটা নিয়ে পিছনে বেঁধে নেয় কায়দা করে। নগ্ন পায়ে এগিয়ে এসে জানালাটা বন্ধ করে দেয়। বারান্দায় গিয়ে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে থেমে যায় আচমকা। বাহিরের চমৎকার পরিবেশ থামতে বাধ্য করে তাঁকে। মুগ্ধ নেত্রে ক্ষনিকের জন্য তাকিয়ে চোখ ফেরায়। লম্বা শ্বাস টেনে নেয়। আযান দেয়নি এখনো ফজরের। চারদিকে অন্ধকার। দুই একটা ঘুমভাঙানো পাখি কলকলিয়ে ডাকছে। সিদ্ধান্ত নেয়, সে এ সময়টা নিদ্রাহীন কাটাবে। দমবন্ধ জীবনটায় প্রকৃতি হয়ত এক চিমটি স্বস্তি দিবে। বাড়ির সামনে বিশাল একটা মাঠ। আর বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া একটা পেয়ারা গাছ। বাহির থেকে দেখতে কতটা সুন্দর দেখায় তা ভাবাও দূরহ।
মূলত রোদসী এরকমই একটা বাসা চাচ্ছিলো। তাই এ বাড়িটাতে ভাড়া নিবে ঠিক করে। মনিরুল হোসেনের অফিসটা এ জায়গা থেকে অনেকটা দূরে। কিন্তু তবুও মেয়ের ভালো লাগায় এখানেই ভাড়া নেন। আঁধার মোড়ানো মাঠের একপ্রান্তে শূন্যে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই হঠাৎ-ই কেঁপে কেঁপে ওঠে। অবাক হয়ে মাথা উঁচু করে রোদসী। উপর থেকে ভেসে আসছে গিটারের সুর। হা করে ভাবতে থাকে সে, এই এতো ভোরে কোন দুঃখে ছেলেটা গিটার বাজায়!

মাথায় ঢোকে না তাঁর। তবে, ছেলেটা মন্দ বাজায় না।
কিন্তু যখনই গিটারের সঙ্গে নিজের গলা চালানো শুরু করে তখনই রক্ত গরম হয়ে যায় রোদসীর। ভাবতে ভাবতেই, সাথে সাথে ভেসে আসে শহরের পুরুষালী গলা। ‘অভিমান’ গানটা গাচ্ছিলো সে। দুই মিনিটের মাথায় তিতুস রেগেমেগে কিচিরমিচির শব্দ করে ওঠে।
বড্ড ঘুমকাতুরে তিতুস। অন্য পাখিরা যেখানে পাতা পড়ার আওয়াজ শুনলেই উঠে যায়। সেখানে দিনের বেশিরভাগই তিতুস ঝিমতে থাকে। কখনো চিতপাত হয়ে খাঁচার ভেতরের ডাল থেকে লটকে পড়ে, তো কখনো আবার মানুষের মতো চিৎ হয়ে শোয়। শৌখিন পাখি বটে। তিতুস সদ্য ঘুম ভেঙে রোদসীর দিকে তাকিয়ে থাকে। রোদসীর তাঁর দৃষ্টি বোঝে। অবুঝ পাখিটাও বিরক্ত হয়ে ইশারায় বোঝাতে চাচ্ছে,

‘কোন হতচ্ছাড়া এমন ভোরে ঘুম ভাঙাচ্ছে!’

রোদসী বিরস মুখে তাকিয়ে থাকে। রাগে খিটমিট করে বলে,

‘বেয়াড়া ছেলেটা ভালো হবে নারে, তিতু! ওটাকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে বুঝলি! ‘

তিতুস কী বুঝলো কে জানে! সে আপনমনে কর্কশিয়ে বলে উঠলো,

‘বেয়াড়া ছেলে, বেয়াড়া ছেলে। ‘

যেহেতু চারপাশে তখনও নিস্তব্ধতা বিরাজমান। তাই সহজেই তিতুসের গলাটা উপরে নিশ্চিন্ত মনে গিটার বাজাতে থাকা শহর শুনতে পেলো। তবে, সে রাগলো না। যেনো সে জানে এটা স্বাভাবিক। গিটারটা গলা থেকে নামিয়ে সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

‘শুনছেন, মিস ভাড়াটিয়া! ‘

রোদসী ভেঙচিয়ে দিলো। বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

‘যে গলা শুনিয়েছেন, তাতে আগামী এক মাসেও মনে হয় না আর কিছু শুনতে পারবো। ‘

শহর হো হো করে হাসে। হাসির তীব্র আওয়াজে রাগ বাড়ে রোদসীর। তাঁর আদুরে তিতুসের ঘুম ভাঙিয়ে এখন হাসছে অভদ্রটা! কত দুঃসাহস! এরই মধ্যে শহর আবারও বলে,

‘আমি তো ভাবছিলাম, আপনি বুঝি আমার গলার গান শুনে ইম্প্রেস হয়ে গেছেন। ‘

রোদসী ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে,

‘ইম্প্রেস তো দূর, মনে হচ্ছে আমার কানটাই নষ্ট হয়ে গেলো। ‘

‘আর আমারও মনে হয় বয়ে গেছে, আপনাকে ইম্প্রেস করতে! শুনুন, আমার শখ গান গাওয়া। আমি গেয়েই যাবো। আপনার কানে তুলো গুঁজে রাখুন বরং। ‘

ফুঁসে ওঠে রোদসী। গমগমে আওয়াজে বলল,

‘কেনো কেনো! ভাড়া দিয়ে থাকি, কিন্তু এতোটাও অসহায় নই, যে আপনার টর্চার সহ্য করে যাবো দিনের পর দিন! গান বন্ধ করবেন আপনি, কাল থেকে আর যেনো আপনার কাকের গলা শুনতে না পাই, নাহলে আমি’

শহর ফিক করে হেঁসে, রোদসীকে আরেকটু জ্বালিয়ে বলে,

‘নাহলে আর কী! সহ্য করে যাবেন। ‘

‘আমার কী ঠ্যাকা পড়েছে? ‘

‘হ্যা, পড়েছে তো! ‘

‘কীসের ঠ্যাকা? ‘

‘ওই যে, আপনি ভাড়াটিয়া তাই। ‘

এহেন গা জ্বালিয়ে দেয়া কথাবার্তায় মাথা ভর্তি রাগ নিয়ে একবার তিতুসের খাঁচাটাই উঠিয়ে আছাড় দিতে নিলো। কিন্তু তিতুসের চো চো করায় ধ্যান ভেঙে ঠাস করে রেখে হনহন পায়ে ঘরে ঢুকে গেলো। শুধু একবার উপরের দিকে চেঁচিয়ে বলল,

‘অভদ্রলোক! আপনাকে আমি দেখে নিবো। ‘

পরিবর্তে উপর থেকে শোনা গেলো শহরের আরেক দফা দুষ্ট হাসি। পুনরায় নিঃশব্দ হয়ে গেছে বারান্দা।
মাঝে মধ্যে বিরক্ত তিতুসের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। সূর্যের মিষ্টি নরম আলো পৃথিবীর বুকে এসে লুটিয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে।

চোখে চশমাটা লাগিয়ে কোনোরকমে দৌড়ে দৌড়ে নিচে নামলো রোদসী। কোন কুক্ষণে যে সে বিছানায় আবারও গা এলিয়েছিলো কে জানে! আজকে তো আটটা থেকে ক্লাস। অথচ, ঘুমিয়ে টেরই পায়নি, কীভাবে যেন সারে সাতটা বেজে গেলো। তাড়াহুড়োয় পানির বোতলটা পর্যন্ত বাড়িতে ফেলে এসেছে ভেবেই আরও একটা বার নিজেকে গালমন্দ করে নিলো। আজকের দিনটা বড়ই বিস্বাদ লেগে গেলো তাঁর। রাত্রির ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তৈরি হওয়া তরল কাঁদায় পা দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে গা গুলিয়ে আসলো তাঁর। চেপে চেপে সাইড দিয়ে আসতেই ভাবলো, ‘আজকে বরংচ বাসে করে চলে যাই, এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। ‘

মেইন রোডে এসে দাঁড়িয়ে আছে। মিহি রোদ চোখে মুখে লাগছে। বাসের আশায় অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো। কিন্তু, রোদসীর দুর্ভাগ্য, বাস তাঁর আসার আগেই ছেড়ে গেছে। দুঃখে বেদুইন হয়ে গেলো যেনো মুখমন্ডল। বিরহীনির ন্যায় উল্টো পথ ধরে সে। স্কুল, কলেজ সব খানেই শতভাগ এটেন্ডেন্স ছিলো তাঁর। দেরি করে গেলে রোদসী কেমন যেন বিব্রত হয়ে পড়ে। তাই, ওই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ার চেয়ে ভাবলো বাড়ি ফিরে যাওয়াই উত্তম।

ব্যাগ কাঁধে উঠিয়ে পিপড়ার মতো পিলপিল করে হাঁটা ধরলো। তবে, তাঁর পথ রোধ করে ক্রিং ক্রিং শব্দে সামনে এসে দাঁড়ালো একটা সাইকেল। রোদসী ভ্রু কুঞ্চন করে তাকালো। শহর সাইকেলের সিটে বসে বেল বাজলো। কলারটা উঁচু করে একটু ভাব নিয়ে বলল,

‘মিস ভাড়াটিয়া যদি চায়, তো আমি তাঁকে বাড়ির মতো আমার সাইকেলটাও ভাড়া দিতে পারি। ‘

রোদসী আড়চোখে একবার তাকিয়ে নিজের হাতঘড়ি দেখে নিয়ে মনে মনে বলল, ‘এখনও ক্লাস শুরু হতে পনেরো মিনিট বাকী। সাইকেলে গেলে হয়ত বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু, এই অভদ্র ছেলেটার সাথে যাওয়াটা কী ঠিক হবে? ‘ দ্বিধাবোধ করে সে। হঠাৎ শহর আরেক বার বেল বাজিয়ে বলে,

‘এই যে,কোন ভাবনায় পড়লে? না গেলে বলো, আমি চলে যাই। ‘

বলেই সাইকেলের প্যাডেল চালানো শুরু করলো সে।রোদসী তাড়াতাড়ি করে বলল,

‘এই না না! আমি যাবো। ‘

‘তাহলে, না উঠে কার অপেক্ষা করছেন! মেয়েরা সব জায়গাতেই ঢিলা। ‘

যদি এটা অন্য কোনো সময় হতো তাহলে রোদসী ধপ করে রেগে একটা ধারালো বাক্য ছুঁড়ে দিতো। কিন্তু এখন যেহেতু তাঁর বিপদের সময় তাই কথাটাকে ঢোক গিলে হজম করে মনে মনে বলল,

‘শান্ত হ, রোদি শান্ত! বিপদের সময় অপমান গায়ে মাখতে নেই। ‘

আড়ষ্টতা নিয়ে চেপে চেপে পেছনে বসলো সে। শহর পেছনে তাকিয়ে বলল,

‘ধরে বসো। ‘

রোদসী ধরলো না। সে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল,

‘আপনি কোনো বাইক চালাতে যাচ্ছেন না, যে আমাকে নায়িকাদের মতো আপনাকে পেছনে জড়িয়ে ধরতে হবে। ‘

‘বাই এনি চান্স, আপনি কী আমাকে অপমান করলেন? ‘

রোদসী কিছু বললো না। চুপ করে বসে রইলো। শহর সাইকেল চালাতে চালাতে এত স্পিডে শুরু করলো যে সেটা প্রচন্ড দ্রুত হয়ে গেলো। রোদসী হতবুদ্ধি হয়ে গেছে। সে সাইকেল নিয়ে অপমান না করলেও ভাবছিলো, শহর এত জোরে চালাবে না অথবা জোরে চালাতে অক্ষম হবে। কিন্তু রোদসী সে সম্পর্কে একটুও অবগত ছিলো না যে শহর নামের হালকা পাতলা ছেলেটা সাইকেল রেসে কতগুলো মেডেল পেয়েছে!
তাই আকস্মিক ঘটনায় সে আচমকাই পেছনে থেকে জাপ্টে ধরলো শহরকে। চোখ বন্ধ করে দোয়া পড়তে থাকলো। কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছে সাইকেল থামালো। কিন্তু তাতেও ভয়ে ছাড়লো না রোদসী। সিটিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখলো। শহর ফিক করে হেঁসে বলল,

‘নায়িকার মতো জড়িয়ে ধরলেন কেনো এখন! ‘

রোদসী হুঁশে ফিরে পেয়ে তাকালো। সামনেই ভার্সিটির গেট দেখে একপ্রকার লাফিয়ে নামলো। কটমট করে তাকিয়ে বলল,

‘এটা রাস্তা! পাইলটের মতো আকাশে প্লেন চালাচ্ছিলেন না আপনি, সাইকেল কেউ এভাবে চালায়?’

শহর সাইকেলে উঠে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

‘আমি চালাই। তুমি উঠেছো, এটা তোমার প্রবলেম। এবার মানে মানে আমার ভাড়াটা বের করো। ‘

রোদসী চোখ বড়বড় করে বলল,

‘মানে? ‘

‘এভাবে তাকাচ্ছো কেনো? আমার প্রাপ্য ভাড়াটা। রিকশায় এলেও তো দিতে হতো। আর আমার কী ঠ্যাকা পড়লো তোমাকে ফ্রি-তে সাইকেল চড়িয়ে আনবো। ‘

রোদসী দাঁত কিড়মিড় করে ব্যাগ থেকে একশো টাকার নোটটা বের করে শহরের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল,

‘নিন, আপনার ভাড়া। ‘

‘ওরে বাবা! তুমি তো ভালোই বড়লোক। কিপ্টে সেজে থাকো। তবে, শোনো কিপ্টের ধন পিঁপড়া খায়। মাঝে মাঝে ট্রিট দিতে পারো। আমি কিছু মনে করবো না। ‘

চোখ টিপে হাসতে হাসতে সাইকেল নিয়ে চলে যায় সে। রোদসী মাথায় হাত দিয়ে ভাবে, ‘একটা ছেলে এতোটা কথা কী করে বলে! ‘ ভার্সিটির দিকে যেতে যেতে নিজমনে হেঁসে ফেলে বলে উঠে, ‘বেয়াড়া হলেও মনটা ভালোই। ‘
“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি”

৫.

অন্ধকারে ঘেরা ঘরটায় ফ্লোরে পড়ে গোঙানির তীব্র শব্দে ফেটে চৌচির মেয়েটি। দুর্বল শরীরে করুণ আর্তনাদ করে ওঠে কন্ঠস্বর। কী বিভৎস রকমের দমবন্ধ আঁধার! শুঁকনো মরুভূমির ন্যায় গলাটা ঢোক গিলে একটু ভিজিয়ে নেয়। লাভ হয়না, দুইদিনের ক্ষুধার্ত পেট আর ক্লান্ত দেহে জ্ঞান যায় যায় তাঁর।
রুমের দরজাটা খুলে কেউ ভেতরে প্রবেশ করলো।
আলোর দিশারি ছুটে নিক্ষেপ হলো সঙ্গে সঙ্গে। এক রত্তি আলোয় তেমন কিছু দেখা যায় না। চোখ টেনে টেনে খুলে দেখার চেষ্টা করে মেয়েটি ৷ দরজাটা আবারও বন্ধ হয়, তিমিরে ডুবে যায় কক্ষ। দুই তিন সেকেন্ডের মাথায় শরীরে কারো ছোঁয়া অনুভব হয় তাঁর। আত্মচিৎকারে থমকে দাঁড়ালো, বৈরী হলো বাতাস। হঠাৎ আক্রমণে নিজেকে বাঁচাতে উদ্বীগ্ন হয়ে উঠলো মেয়েটি। সামনের ব্যাক্তির নোংরা দৃষ্টি আর হাসিটা ধীরে ধীরে আরও এগিয়ে আসছে।

চিৎকার দিয়ে ঘুম ভেঙে গেলো রোদসীর। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো, কী হচ্ছে আশেপাশে। চোখ কচলে নেয়। নাহ, কিছু হয়নি তাঁর। হাত পা ঠিক করে দেখে। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। বাসের লোকজন হা করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। অপ্রস্তুত হয়ে উঠে বাস থেকে নামে। আজ হাঁটতে ভালো লাগছিলো না বলে, সে বাসে করে বাসায় যাচ্ছিলো। কীভাবে যেন ঘুম এসে গেলো চোখে। জানালায় মাথা ঠেকাতেই চোখ আপনাআপনি লেগে আসে। তারপরই খারাপ একটা স্বপ্ন দেখে। ফস করে নিঃশ্বাস ফেলে রোদসী মনে মনে ভাবলো, ‘স্বপ্নটা কেনো আমার পিছু ছাড়ে না! না জানি আর কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে এসব। ‘ কপালের ঘাম মুছে নিয়ে বিষাদে ভরা মুখটা নিয়ে বাসায় আসে। কিন্তু তৎক্ষনাৎ মুখের আদল পরিবর্তন হয়ে যায়। একি! বজ্জাত ছেলেটা তাঁর বাসায় কী করছে! ডাগর চোখে সন্দিগ্ধ হয় সে। তারপরই বুঝতে পারে নিশ্চয়ই ছেলেটা নিজেই কোনো কান্ড ঘটিয়েছে। রোদসী কানের পিঠে চুল গুঁজে জুতাজোড়া খুলে কোমরে হাত রেখে সোফার সামনে এসে দাঁড়ায়। শহর তখন গুণগুণ করে কেয়ার হাতের মিষ্টি দই খাচ্ছে। মিষ্টি জাতীয় জিনিস তাঁর অবশ্য খুব প্রিয়। সে আট দশটা রসগোল্লা এক বসাতেই শেষ করে দিতে সক্ষম। মিডিয়াম সাইজের শরীরটা দেখলে মোটেও তা আন্দাজ সম্ভব নয়। রোদসী প্রথমে খকখক করে হালকা কেশে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলো৷ কিন্তু শহর জনাব এতোটাই মগ্ন সে খেয়াল করেনি। রোদসী চট করে হাত থেকে বাটিটা টান দিয়ে নিতেই ভ্রু কুঞ্চন করে তাকায় শহর। মুখের পাশে লাগা দইটুকু মুছে উঠে দাঁড়ায়। রোদসী খোঁচা দিয়ে বলে,

‘সকালে একশো টাকা নিয়ে পেট ভরেনি, এখন এসেছেন আমার বাড়ির দই খেয়ে টাকা উসুল করতে!’

শহর মুখ ভেঙচিয়ে দিলো। নাক উঁচু করে বলল,

‘আমার সাইকেলে বসার মতো সৌভাগ্য যে তোমার হয়েছে, তাই তো বেশী! তাঁর জন্য এক হাজার টাকা দিলেও কম হবে। ‘

রোদসী আঙুল উঁচু করে কিছু বলতে নিলেই সেখানে কেয়া এসে দাঁড়ালেন৷ রোদসী আর শহরকে দেখে বললেন,

‘এই রোদি,তোর হাতে ওর বাটি কেনো? ছেলেটার কাছ থেকে কেঁড়ে নিয়েছিস তুই! ‘

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো রোদসী। শহর ঠোঁট উল্টে নিষ্পাপ ভঙ্গিতে বলল,

‘আন্টি, ও বোধ হয় আমার আপনাদের বাসায় আসাটা পছন্দ করেনি। তাই খাবারটা এভাবে নিয়ে নিলো। আমি বরং আসি আন্টি। ‘

কেয়া উত্তেজিত হয়ে বললেন,

‘দাঁড়াও দাঁড়াও বাবা! তুমি বসো। এই রোদি, ছেলেটা তো আমার জন্যই এসেছে। ঘরের রিমোটটা কতদিন ধরে নষ্ট। তোরা সবাই তো বই মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকিস। আমি সারাদিন বসে কী করবো! ছেলেটা কত ভালো, বাসায় এসেই রিমোটটা ঠিক করে দিলো। লক্ষ্মী একটা ছেলে। এমন একটা ছেলে যদি আমার হতো! ‘

শহর মিটমিট হাসলো। প্রশংসায় পঞ্চমুখ কেয়া হোসেন। রোদসী বুঝতেই পারছে না, এমন একটা শয়তানকে কী করে কেউ ভালো বলে! কেয়া আরও বললেন,

‘শহর বাবা, দই মনে হয় একটু কম হয়ে গেছে। রোদি যা তো ফ্রিজ থেকে আরও দই এনে দে। আমার রান্না পুড়ে যাচ্ছে। ‘

রোদসী রাগে দুঃখে থম মেরে যায়। কোথায় তাঁকে বসিয়ে একটু পানি এনে দিবে। তা না, তাঁকে উল্টো অর্ডার দিচ্ছে। আবারও ধমক দিতেই রোদসী ক্ষিপ্ত হয়ে দই এনে শহরকে দেয়। কেয়া বকতে বকতে চলে যেতেই শহর গর্বে বুক ফুলিয়ে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বলে,

‘এই যে রোদচশমা! একটু পানি দিও তো। গলাটা বড্ড শুকিয়ে গেলোরে! ‘

রোদসী খোমা কালো করে বিরবির করে বলে,

‘ওরে পোলারে! জীবনে মনে হয় পানি খায়নি। ইচ্ছে তো করছে জন্মের মতো পানি খাইয়ে দেই। ‘

জোরজার করার মতো করে পানির গ্লাসটা ঠাস করে সামনে রেখে হনহনিয়ে রুমে চলে গেলো। বাহির থেকে আওয়াজ আসে, শহরের উচ্চশব্দের হাসির।

পরদিন ছাঁদ থেকে ঘুরে এসে ঘরে বসে বসে শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ বইটা পড়ছিলো। বইয়ের ভেতরে যখন সে নাকমুখ লাগিয়ে অপূর্ব শব্দের মাঝে বিলীন হচ্ছে তখন হঠাৎ-ই তাঁর রুমে আসেন দিলারা। রোদসী ভদ্রতাসূচক বইটা টেবিলে রেখে সালাম দিয়ে বসতে বলে। তিনি সন্তষ্ট চিত্তে হেঁসে পাশে বসলেন। রোদসী বুঝতে পারলো মায়ের সঙ্গে গল্প করছিলেন কিছুক্ষণ আগেই এসেছেন। আচমকা এক আবদার করে বসলেন,

‘রোদসী মা, তোমাকে একটা কথা বলতে এলাম। ‘

‘বলুন আন্টি। ‘

‘তুমি যদি আমার ছোট ছেলে শিশিরকে একটু সময় করে পড়াতে তাহলে খুশি হতাম৷ ‘

অপ্রস্তুত হয়ে তাকালো রোদসী। অন্য কিছু বলতে নিলেই পাশে কেয়া এসে বলেন,

‘এতো বলার কী আছে আপা! কাল থেকেই রোদি গিয়ে পড়িয়ে আসবে! ‘

রোদসী দিলারার আড়ালে করুণ দৃষ্টিতে তাকায় কেয়ার দিকে। তিনি কড়া চোখে তাকিয়ে শাসিয়ে দিলেন। দিলারা বেতনের কথা বলে বাসায় চলে গেলেন। রোদসী হতাশ চোখে তাকিয়ে রইলো। ঘর থেকে বের হওয়াই তো কষ্টের তাঁর কাছে! তাঁর উপর আবার বাড়িতে ওই শয়তান ছেলেটাও তো থাকে!

পরদিন শিশিরকে পড়ানোর জন্য উপরের ফ্ল্যাটটায় গিয়ে কলিং বেল চাপতেই একজন দরজা খুলল।কিন্তু রোদসী যা দেখলো তাতে হকচকিয়ে গেল সে।

চলবে –
লেখিকা-নাঈমা হোসেন রোদসী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here