রক্ষিতা পর্ব -০৬

0
97

#রক্ষিতা
#আশুথিনী_হাওলাদার (ছদ্মনাম)
পর্ব-৬
__‘আপনি কি সত্যি’ই আমাকে কখনো বিন্দু মাত্র ভালোবাসেননি নিফান?
কথাটা বুকের ভিতর গিয়ে আঘাত করে নিফানের। শীতল চোখে কিচ্ছুক্ষন অর্ঘমার দিকে তাঁকিয়ে থাকে। মেয়েটা চোখে জল নিয়ে চাতক পাখির মতো তাঁকিয়ে আছে। ‘হ্যা’ শোনার জন্য। শুকনো ঢোক গিলে নিফান। নিজেকে সামলে চোয়াল শক্ত করে উত্তর দেয়,,
__‘না’
চমকায় অর্ঘমা। খুব খুব চমকায় পলকহীন ভাবে তাঁকিয়ে থাকে তার দিকে। অর্ঘমার মাথা ঘুরে উঠে। ব্যালেন্স রাখতে পাশের ফুলদানির টপ আকড়ে ধরে। ফুলদানি পরে ভেংগে যায়। অর্ঘমা বুকে হাত দিয়ে বসে পরে। তার শ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে নিফান নিস্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে অর্ঘমার সামনে। অর্ঘমা মাটিতে পরে বুকে হাত দিয়ে কাতরাচ্ছে। বুকে বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে শ্বাস আটকে যাচ্ছে। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে। ঘ্যাস নিতে হবে। অর্ঘমা ছাদের রেলিং ধরে উঠে রুমে যেতে চায় কিন্ত তার পক্ষে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। রেলিং থেকে পিছলে পরে যেতে নেয়। নিফান দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে। অর্ঘমা নিফানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। মৃদু কণ্ঠে বলে,,
__‘আমাকে স্পর্শ করবেন না’
অর্ঘমার অস্পষ্ট বলা কথা নিফানে বুকে গিয়ে বিধলো অসম্ভব যন্ত্রণা শুরু হয় সেখানে। সেটাকে পাত্তা না দিয়ে অর্ঘমাকে নিয়ে ব্যাস্ত হয় সে। অর্ঘমা জোড়ে শ্বাস টেনে তোলার চেষ্টা করছে কিন্তু সম্ভব হচ্ছেনা। ভয় হয় নিফানের অর্ঘমার হাত ধরে কাপা কাপা কন্ঠে ডাকে,,
__‘অর্ঘ’ এই অর্ঘ, চোখ খুলো চোখ বন্ধ করবেনা। তোমার কিচ্ছু হবেনা। আমার দিকে তাকাও।
অর্ঘমার রেসপন্স না পেয়ে নিফান তাকে কোলে তুলে নিয়ে হস্পিটালের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়।
এক হাতে ড্রাইভ করছে অন্যহাত দিয়ে অর্ঘমা কে ধরে রাখে।

আইসিউর সামনে কাউচে মাথার চুল খামচে ধরে বসে আছে নিফান। বিধ্বস্ত চেহারা তার। বারবার চোখের সামনে অর্ঘমার অসুস্থ মুখখানা সামনে ভাসছে। শ্বাস টেনে তুলতে পারছিলনা। আচ্ছা? অর্ঘমার এই অবস্থা কী তার জন্য? আইসিউর ভিতরে অর্ঘমার দিকে তাকায় নিফান মুখে অক্সিজেন লাগানো। এখনো কেমন শ্বাস টেনে টেনে তুলছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিফান। ডক্টর এর কেবিনে যায়।
“ডক্টর আকবর” অর্ঘিমার রিপোর্ট নিয়ে ঘাটছিলেন এমন সময় নিফান কে দেখে বলেন,
__‘মি.আহমেদ আমি আপনাকেই ডাকতে যাচ্ছিলাম। আপনি এসেছেন ভাল হয়েছে। আপনি এখানে বসুন মিসেস.আহমেদের ব্যাপারে কিছু কথা ছিল।
মনে কামড় দেয় নিফানের। অর্ঘমার বড় কিছু হলোনা তো। নিফান ভিয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে,,
__‘ডক্টর অর্ঘর কিছু হয়নি তো। ও ঠিক হয়ে যাবে তো?
__‘মি.আহমেদ চিন্তার কিছু নেই। তবে আমার মনে হচ্ছে এই সমস্যাটা ওনার এর আগেও বহুবার হয়েছে। আপনি এ ব্যাপার কিছু জানেন।
গলা শুকিয়ে যায় নিফানের। এরকম আগেও হয়েছে তার অর্ঘ এত কষ্ট অর্ঘ আগেও পেয়েছে। কই তার সাথে কাটানো গত দু’বছর এমন দেখেনি সে। তাহলে সে চলে যাওয়ার পর থেকে এমন হয়েছে। সেটা কি তার জন্য? জীভ দিয়ে ঠোঁট ভিজানোর চেষ্টা করে নিফান বলে,,
__‘আমি কখনো ওকে এভাবে দেখেনি। সেও আমায় কখনো এ ব্যাপারে বলেনি।
কথাটা বলে নিফান ভাবে, সে কি কখনো জানতে চেয়েছিল। বোঝার চেষ্টা করেছিল অর্ঘমাকে?
ড.আকবর রিপোর্ট একবার চোখ বুলিয়ে বলেন,
__‘আমার মনে হচ্ছে উনি খুব মানসিক যন্ত্রণায় আছে। আর এই বুকের ব্যাথার সাথে শ্বাস কষ্ট স্বাভাবিক না। ওনাকে সাবধানে রাখবেন। আমি ঘ্যাস দিচ্ছি আবার এমন হলে নিতে হবে। আর হ্যা ওনাকে সাবধানে রাখবেন এসবে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
‘দু’দিন পর অর্ঘমাকে নিয়ে হস্পিটাল থেকে ফেরে নিফান। সম্পুর্ন সুস্থ না হলেও কিছুটা সুস্থ অর্ঘমা তবে এই দু’দিনে সে নিফানের সাথে কোনো কথা বলেনি। নিফান চেষ্টা করেছিল কথা বলার কিন্তু অর্ঘমার মুখ বা কন্ঠ থেকে কোনো শব্দ বের হয়নি। কেমন নির্জীব হয়ে গিয়েছে। শুধু একটা ‘না’ তে আজ অর্ঘমার এ অবস্থা। আচ্ছা অর্ঘমা যদি তাকে কখনো বলে ‘আমি আপনাকে ভালোবাসি না’ তারও ঠিক এভাবেই যন্ত্রণা হবে বুকে। অর্ঘমার দোষ নেই আজ অর্ঘনার এই নিশ্চুপতার কারন সে। অর্ঘমাকে শাস্তি দিতে গিয়ে সে নিজে শাস্তি পাচ্ছে।

“পরের দিন অর্ঘমা চারটি এসাইনমেন্ট এর খাতা লিখে দেয়। মৃদু হাসে নিফান। এমন পাগল মেয়ে সে আগে কখনো দেখেনি। ভাব নিয়ে বলে অর্ঘমা,
__‘আপনি এসাইনমেন্ট করতে বলছেন আমি করেছি। এখন চট জলদি আমার প্রোপজ এক্সেপ্ট করুন।
অর্ঘমার বলা কথায় হাসে নিফান।
এসাইনমেন্ট গুলো হাতে নিয়ে স্টেশনের দিকে হাটে নিফান। সাথে অর্ঘমা তার ব্যআগ দু’কাধে ঝুলিয়ে ফিতে দু’হাত দিয়ে ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে হেটে চলে। সাথে তার বকবক তো আছেই।
হাটার মাঝে আড়চোখে তাকায় নিফান। পিচ্চি মেয়ে দেখে বুঝায়না অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট। জিন্স আর শার্ট পরা চুল গুলো উপরে জুটি করে বাধা। ফর্সা মুখ। লাল গাল, গোলাপি ঠোট পুতুলের মতো দেখতে। মৃদু হেসে শাটল ট্রেনে উঠে বসে নিফান। অর্ঘমাও তার পাশে গিয়ে তার গা ঘেসে বসে। নিফানের দিকে ঝুঁকে তার শরীরের স্মল নেয়। হঠাৎ অর্ঘমা তার দিকে ঝুঁকে আসায় হতবম্ব হয়ে তাঁকায় নিফান। অর্ঘমা চোখ বন্ধ করে নাক টেনে কিছুক্ষন নিফানের শরীরের স্মল নিয়ে। চোখ খুলে দেকগে নিফান তার দিকে হতবম্ব হয়ে তাঁকিয়ে আছে। অর্ঘমা ভ্রু নাচিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে,‘কি’। নিফান মাথা ঝাঁকিয়ে কিছু না বলে। অন্যদিকে তাকায়। মেয়েটা পাগল। একটু বেশি’ই পাগল মনে হচ্ছে৷ মাত্র কয়েক দিনের পরিচয়ে কাউকে এভাবে ভালবাসা যায় আজব। বয়স ১৯ হলেও এখনো বাচ্চা। ট্রেন গিয়ে বটতলী রেল স্টেশনে গিয়ে থামে। অর্ঘমা দরজা দিয়ে না নেমে জানালার ফাক দিয়ে নামে। নিফান ‘হা’ করে তাকিয়ে থাকে অর্ঘমার কান্ডে। মেয়েটা সত্যি সত্যি পাগল তো। এখন’ই লেগে যেত। অর্ঘমা নিফানের হাত ধরে বলে,,
__‘চলুন আমরা রিয়াজুদ্দিন বাজারে যাবো’
নিফান অর্ঘমার হাত ছাড়িয়ে বলে,
__‘কেন? ওখানে তো আজেবাজে বাজার আমি যাবো না তুমি যাও।
অর্ঘমা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে,
__‚আপনিও যাবেন আমিও যাবো। জানেন? ওখানে অনেক অনেক মাছের শুটকি আছে।
মাছের শুটকির কথা শুনে মনে হলো। শুটকির গন্ধ তার নাকে এসে লাগলো৷ নিফানের বমির বেগ পায়। কোনো মতে অর্ঘমাকে বলে,
__‘হোয়াট? শুটকি ইয়াক তুমি যাও আমি না। আমি ওসব খাইনা।
অর্ঘমা কোমড়ে হাত দিয়ে বলে খান না তাতে কি হয়েছে এখন খাবেন। শুটকির বাজারে কি সুন্দর ঘ্রান। আহা শুনলেই খেতে ইচ্ছে করে।
নিফানের ইচ্ছে করছে অর্ঘমাকে শুটকির ভিতর ডুবিয়ে মেরে দিতে। শুটকির আবার ঘ্রান তা আবার শুনে পাগল মেয়ে।
__‘আমার দাদুন খুব সুন্দর শুটকির ভর্তা বানাতে পারে। আমি আপনাকে এক সময় খাওয়াবো। এখন চলুন তো।
অর্ঘমা নিফানের হাত টেনে নিয়ে যায়। সোজা রাস্তায় না গিয়ে বাঁকা ত্যারা রাস্তায় নিয়ে তাকে ড্রেনের বাজে গন্ধ গিলিয়েছে। সেদিন শুটকির বাজারে গিয়ে নিফান সত্যি সত্যি বমি তে ভাসিয়ে দেয়। অর্ঘমা তখন কানে হাত দিয়ে ইনোসেন্ট মুখ করে বলে,,
__‘আমি ভাবছি আপনি এমনি এমনি বলছেন তাই আমি জোড় করে নিয়ে আসছি। কিন্ত্য আপনি চিন্তা করবেন না। শুটকির ভর্তা একবার খেলে আপনার সারাজীবন মনে থাকবে।
অর্ঘমা তার কথা রেখেছিল। বাড়িতে গিয়ে তার দাদির হাতের বানানো শুটকি ভর্তা নিয়ে এসে নিফান কে দিয়ে চেপে ধরে খাইয়ে ছিল।

নিফানের হঠাৎ মনে হলো অর্ঘমার বাবা-মা কোথায়। ওর ভাই ও বা কোথায় যাকে শাস্তি দেয়ার জন্য অর্ঘমার এমন অবস্থা করেছে। সে কোথায়?

চলবে
(গঠন মূলক মন্তব্য করলে খুশি হবো(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here