শর্বরী পর্ব ৭

0
115

#শর্বরী
অলিন্দ্রিয়া রুহি

(৭)

আজ অনেকদিন পর নুপুর পরেছে কুসুম। নুপুরের কলতানে বাতাস মুগ্ধ। পা ঝুলিয়ে ছাদে বসে রয়েছে সে। সদ্য যৌবনে পা রাখা কিশোরীর ন্যায় আগ্রহ সমেত আচার খাচ্ছে এক হাতে। পা নাচাচ্ছে এক মনে। ক্ষণে ক্ষণে আকাশে দেখছে কী যেন। তারপর পিছন ফিরে একবার তাকিয়ে আবার সামনে নজর ফেলল। অপেক্ষা করছে নেহালের। সে জানে,নেহাল চিঠিটা পড়া মাত্র ছাদে আসবে। যখন প্রথম নেহালের স্ত্রী হয়ে এই বাড়িতে পা রেখেছিল কুসুম, তখন প্রতি বিকেলে নেহাল ঘুমিয়ে যাওয়ার পর কুসুমকে খুঁজে পাওয়া যেতো ছাদে। বাতাসে উড়তো যেন! যেন একটি চড়ুই পাখি! নেহালও ঘুম বাদ দিয়ে ছাদে চলে আসতো। দু’জনে গল্প করত ঘন্টার পর ঘন্টা… সেই সব দিন ধীরে ধীরে ফিঁকে হলেও আবারও সতেজতায় ভরাতে কুসুমের সিদ্ধান্ত, সবকিছু আগের মতো করা। নতুন প্রেম, নতুন রূপে, পুরোনো ভালোবাসাই পারবে কুসুম আর নেহালের ভেতরকার সমস্ত জড়তা দূর করে তৃপ্তি নিয়ে আসতে।

পেছনে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে কুসুমের হৃদ স্পন্দন দ্বিগুণ হয়ে উঠল। এ যেন একেবারেই নতুন অনুভূতি! লজ্জারা ঘিরে ধরল চারপাশ দিয়ে। হাত-পায়ে অদ্ভুত শিরশিরানি। পেছন ফিরে তাকাতে চাইলেও তাকাল না কুসুম। অনুভূতির সাক্ষাৎ গুলো উপভোগ করতে লাগল। নেহালের ওষ্ঠদ্বয়ে মৃদু হাসির ঝলকানি। কুসুমের মনের ভাবনা বুঝতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। এরকম স্ত্রী বোধহয় খুব কমই আছে, যারা নিজের স্বামীর অনুতপ্ততা বুঝতে পেরে তাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিতে চাইবে! নেহাল একপ্রকার নিঃশব্দে কুসুমের পাশে গিয়ে বসল। লম্বা দম টেনে ফুসফুস ভরালো কুসুম। শরীরটা এরকম ঝনঝন করছে কেন! কীসে ছুটোছুটি লাগিয়েছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে? পাজরে অদ্ভুত কাঁপন! গাল জোড়া লাল বর্ণ ধারণ করেছে। নেহাল মুচকি হাসল। কে বলবে এরা স্বামী-স্ত্রী! সবাই বলবে,সদ্য প্রেমে পড়া দু’জন কিশোর-কিশোরী!

“আজকের আকাশটা খুব সুন্দর তাই না?”

প্রশ্ন করল নেহাল। ফিরে চাইলো আকাশের দিকে। আঁড়চোখে নেহালকে এক নজর দেখে নিয়ে কুসুম জবাব দিলো,

“হুঁ।”

“ঠিক তোমার মতো। স্বচ্ছ,ঝকঝকে.. ভেতরটা পরিষ্কার।”

নেহাল তাকাল কুসুমের দিকে। কুসুম লজ্জা পেয়ে আঙুলের ডগায় লেগে থাকা আচারের অবশিষ্টাংশ মুখে পুড়ে দিলো। এড়িয়ে গেল নেহালকে,নেহালের কথাকে। নেহাল হাসল ভেতরে ভেতরে। বাচ্চা বাচ্চা দেখাচ্ছে মেয়েটাকে!

“তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো শুনে খুব খুশি হয়েছি কুসুম।”

“জেনে রাখুন, আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। ভাগ্যের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কে শ্রদ্ধা করি। যা হয়েছে, একদিক থেকে ভালো হয়েছে। আমাদের বন্ডিং মজবুত হলো।”

নেহাল চমৎকৃত হলো। কত সুন্দর কথা!

“তুমি আমাকে যেভাবে ভালোবাসো, আমিও তোমাকে সেভাবেই ভালোবাসতে চাই। না, না, তার চাইতেও বেশি চাই। ভালোবাসার অধিকারটুকু নতুনভাবে আমাকে দেবে কী?”

করুণ শোনালো নেহালের কণ্ঠটা। কুসুম থমকে ফিরে চাইলো। ঠোঁটের কোণ প্রসারিত করে মাথা ঝাঁকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল,

“আমাকে ভালোবাসার অধিকার, আমার বাবা-মায়ের পর আপনারই…বরং আপনার সঙ্গে বাকিটা জীবন থাকার তৌফিকটুকু চাই আমি। পাবো কী?”

নেহাল বুক ভরে প্রশান্তির বাতাস টেনে নিয়ে কুসুমকে একহাতে নিজের কাছে টেনে নিলো। আঁটকে দিলো নিজের বাহুডোরে, যেখানে হৃদযন্ত্র নামক একটি যন্ত্রের বসবাস। যার উছিলায় বেঁচে থাকে প্রতিটি মানুষ, সেই খানে মাথা রাখলো কুসুম। কান পেতে শুনলো অন্তরের অদ্ভুত ধুকপুকানি। শুধু এইটুকু বুঝলো, এই ধুকধুক শব্দটা খুশির এবং আনন্দের। কুসুম ফিসফিস করে স্বগতোক্তি করল,

“আমাদের জীবন থেকে সমস্ত কষ্ট ক্লেশ চলে যাক। আনন্দ এবং ভালোবাসায় বাকী জীবনটা কাটুক।”

.

আশপাশের দুই,চার বাড়ি থেকে লোকজন এসে ঘরে ভীড় করে ফেলেছে। জয়নাল চেঁচিয়ে সবাইকে বেরিয়ে যেতে বললেও কারও মধ্যে হেলদোল দেখা গেল না। জয়নালকে একেবারেই উপেক্ষা করে সবাই ফুসুরফাসুর করে যাচ্ছে। কেউ কেউ জয়নালের মায়ের কানে মন্ত্র ঢালছে। কেউ কেউ অপমান করছে,কেউ মারছে খোঁটা! জয়নাল পুনরায় চেঁচালে কেউ কেউ উল্টো তার উপর চেঁচিয়ে উঠল। ধমকালো, আবার শিমুলকে জড়িয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলে তারপর একে একে সবাই বিদায় নিলো। নাক কাটা চোরের ন্যায় মাথানিচু করে ফেলল সে। ক্রোধ বাড়লো মনের ভেতর। নিজের বোনের জন্য যারা তাকে দেখলেও সালাম ছাড়া কথা বলত না,আজ তারাই অপমান করে গেল! সবাই বেরিয়ে গেলে দরজা ঠাস করে আঁটকালো জয়নাল। তার বাবা খেঁকিয়ে বলে উঠল,

“তেজ অন্য কোথাও গিয়ে দেখা। ঘরের ভেতর তোর তেজ দেখার জন্যে বসে রই নাই।”

জয়নাল বাপ বলে ছাড়ল না। পাল্টা জবাব দিয়ে দিলো।

“আমার তেজ দেখতে ভালো লাগে না কিন্তু মেয়ের নষ্টামি দেখতে ঠিকই ভালো লাগে। তাই না আব্বা?”

“চুপ কর তুই। তোর এসবে কোনো লেনাদেনা নাই। শিমুল আমাগো মাইয়া। ও কী করছে আর কী করতে হইবো, তা আমরা বুঝব। তোরে বুঝতে বলি নাই।”

“তাহলে মানুষ এসে আমাকে কথা শোনায় কেন?”

“সেটা তাদের সাথে বোঝ গিয়ে। ঘরে থাকলে চোখ, কান, সব তালা দিয়ে থাক। আর থাকতে না মন চাইলে বাইর হইয়া যা।”

তিনি ভেতরের ঘরে গটগট করে চলে গেলেন। জয়নাল।হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। জীবনে এই প্রথমবার কোনো বাবা-মাকে তাদের মেয়ের নষ্টামির সাপোর্ট করতে দেখল সে। উপরন্তু ছেলেকে বলছে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে! যেখানে এই ছেলেই কী-না পরিবারের হাল ধরেছে! মাথা ঘুরছে জয়নালের। এসব হচ্ছে টা কী! সে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। এক হাত দিয়ে কপালটাকে চেপে ধরল। বুঝতে চেষ্টা করল, তাদের পরিবারে হচ্ছেটা কী। তখনি কারও উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলে তাকাল জয়নাল। শিমুল একটা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখাচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরী নারী। চিকন গাল দুটোয় গোলাপী আভা, চোখে গাঢ় কাজল টানা। ঠোঁট জোড়া লাল টুকটুকে, লিপস্টিকের ছোঁয়া। জয়নালের মনে হলো, এই সুন্দর রূপটি শুধু উপরেরই। ভেতরটা নর্দমার চাইতেও বেশি অপরিষ্কার। তার এই বোনটি যদি স্বভাবে এবং আচরণে ভালো হতো, তাহলে খুব সুখেই থাকতে পারতো। জয়নালের বুক ফুঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। শিমুল হাসছে, ঠোঁট চিঁড়ে বিদ্রুপের হাসি। জয়নালের রাগ লাগলো। নর্দমায় নামলে নিজেকেই নোংরা হতে হবে- তাই শিমুলের সঙ্গে একটা টু শব্দও উচ্চারণ করল না জয়নাল। হন্য পায়ে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। মাথার উপর উত্তপ্ত সূর্য। মস্তিষ্ক গলিয়ে দিবে যেন! এই সময়ে ফ্যানের শীতল বাতাসের নিচে আরাম করে গা এলিয়ে দিতে পারলে ভালো লাগতো। তা করছে না জয়নাল। সোজা রাস্তা ধরে নিরবে হাঁটছে সে। মাথায় চলছে অজস্র ভাবনার লুটোপুটি।

.

একটা বেঞ্চের উপর চুপচাপ বসে রয়েছে নয়ন। জট পাঁকানো মাথা আর দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে একের পর এক সুখ টান দিচ্ছে সিগারেটে। নিকোটিনের ধোঁয়ায় আশপাশ ধূমায়িত। আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। এই ভরদুপুরে কেউ থাকবে বলেও আশা রাখা যায় না। যে গরম পড়েছে! ঘেমে জবজবে হয়ে উঠেছে সে। শরীরটা চিটচিট করছে। বাসায় গিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে একটা লম্বা গোসল শেষে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে পারলে বেশ হতো। একটা রিফ্রেশ ঘুমের পর মন,মগজ দুটোই ঠান্ডা হবে। তখন ভাবা যাবে আগামী নিয়ে। যেই ভাবা সেই কাজ। নয়ন সিগারেট শেষ করে ফিল্টারটুকু ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজেই আঁতকে উঠল। কেননা ফিল্টারটা গিয়ে পড়েছে একটা মেয়ের গায়ে। ফিল্টারের গোড়ায় এখনও আগুন জ্বলছে। মেয়েটা ছ্যাঁকা খেল নাকি! চিন্তিত হয়ে উঠল নয়ন। এগিয়ে যাওয়ার আগেই শুনলো,একটা তীর্যক কথার বাণ তাকে এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে।

“ওই ব্যাডা, চক্ষু নাই আপনের? দিলেন তো গলায় ছ্যাঁক দিয়া। উঁহু রে… জ্বইলা গেল রে!”

নয়ন হতচকিত হয়ে তাকিয়ে রইলো। আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করল, ‘সরি’ কিন্তু মেয়েটির ভয়ানক চেহারা দেখে গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোলো না। মেয়েটি আপন মনে কী কী যেন বকবক করে গেল। অগ্নি চোখে নয়নের দিকে একটা চাউনি ছুঁড়ে দিয়ে চলে গেল আপন গন্তব্যের দিকে। রেখে গেল থমথমে একটি মুখ। যে মুখের অধিকারী মেয়েটিকে আরও একবার দেখার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে হঠাৎই!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here