সতীত্ব পর্ব শেষ

0
105

গল্পঃ সতীত্ব। ( দ্বিতীয় এবং শেষ পর্ব )

বাসর রাতে স্বামীর বলা বেশ্যা কথাটি ধারালো ছুরির মতো আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে আনিসার হৃদয়।

কাঁদতে কাঁদতে রাত ভোর, সকালে আনিসার স্বামী রুবেল কোথায় যেন চলে গেল। আনিসা ফ্যানের সাথে ওড়না পেচিয়ে গলায় ফাঁসি দিবে এমন সময় কেউ এসে বাইরে থেকে দরজার কড়া নেড়ে বললো,– ভাবী আপনার আব্বা আসছে, তারাতাড়ি আসেন।

বাবা আসার কথা শুনে আনিসা যেন হারানো শক্তি ফিরে পেয়েছে আবার, আত্মহত্যা করার ভাবনা গায়েব। বাবার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই কষ্টগুলো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। বাবা মানেই এক পৃথিবী ভরসা, বাবা মানেই সাহস। মেয়েরা যদি কাউকে সবথেকে বেশি ভালোবাসে, সে হলো বাবা। আর বাবাদের কাছে মেয়েরা তার রাজ্যের রাজকন্যা।

আনিসা রুম থেকে বেরিয়ে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লো। বাবা তো আর এতকিছু জানেনা, বাবা আনিসার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,– এত ভেঙে পড়লে চলবে মা! একটা বয়সে সব মেয়েদেরই মা-বাবা ছেড়ে স্বামীর সংসারে চলে যেতে হয়, সেখানে প্রতিটি মেয়ে নিজের একটা পৃথিবী সাজায়। কিন্তু তোর জন্য মনটা ভীষণ ছটফট করছিল মা, জানিনা কেন! তাই কোনো খবর না দিয়েই চলে এলাম।

আনিসা চোখের জল মুছে বললো,– চলো বাবা, আমি তোমার সাথে এক্ষুনি বাড়িতে যাবো।

আনিসার বাবা থতমত খেয়ে বললো,– গতকাল এলি আজ যাবি মানে! জামাই কিনা আবার রাগ করে বসে!

আনিসা বললো,– তোমার জামাই যেতে অনুমতি দিয়েছে আব্বা, ওসব নিয়ে টেনশন করতে হবেনা, তুমি চলো।

আনিসা তার বাবার সাথে বাড়িতে চলে আসলো। মেয়েকে বিধ্বস্ত মনমরা দেখে মা জিগ্যেস করলো কি হয়েছে।

আনিসা মায়ের কাছে সবকিছু খুলে বললো।

রাতে আনিসার বাবা বাজার থেকে ফিরতেই আনিসার মা আনিসার বাবার কাছে এই বিষয়ে খুলে বললো সবকিছু। আনিসার বাবার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

এমন হবারই কথা, কারণ যে মেয়ের গায়ে হাত তোলা তো দূর, চোখ গরম দিয়ে কখনো কথা বলেনি, সেই মেয়ের ওপর দিয়ে এত ঝড়ঝাপটা বয়ে গেল, এতে বাবার মনটা দুমড়েমুচড়ে যাবারই কথা।

দেখতে দেখতে অনেকদিন হয়ে গেল, রুবেল একবারও যোগাযোগ করেনি এপর্যন্ত।

বাইরের রান্নাঘরে মনমরা হয়ে বসে সবজি কুটছে আনিসা, পেছন থেকে কেউ বললো,– আনিসার শেষের আকার বাদ দিলে থাকে আনিস, আমার জন্য এক গ্লাস পানি সাথে কয়টা মুড়ি আনিস।

আনিসা ঘাড় ঘুরিয়ে মজনুকে দেখে হেসে ফেলে বললো,– সোজাসুজি বললেই পারতি পানি আর মুড়ি আনতে, নিরীহ নামটা নিয়ে টানাটানি করার কি দরকার।

মজনু রান্না ঘরের খুঁটির সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে বললো,– নাম নিয়ে টানাটানি না করলে তোকে হাসাতে না পারার ব্যর্থতা বক্ষে লইয়া চলিতে হইতো আজন্মকাল, তাই ওটা তোকে হাসানোর চেষ্টা ছিল।

আনিসা আবারও মুচকি হেসে উঠে ঘরে গেল মজনুর জন্য পানি ও মুড়ি আনতে।

মজনু হলো আনিসার খালাতো ভাই, দুজন একই বয়সী, আনিসার চেয়ে তিন দিনের বড়ো মজনু। মজনু খুবই হাসিখুশি আর বুদ্ধিমান। ছোটবেলা থেকে একসাথে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ালেখা করেছে দুজন। ভাইবোনের পাশাপাশি দুজন ভালো বন্ধু।

আনিসা একগ্লাস পানি ও বাটিতে করে মুড়ি এনে মজনুর সামনে রেখে চেয়ার ঠেলে দিয়ে বললো,– খেয়ে নে।

আনিসা আবার সবজি কুটতে মনোযোগী হলো।

মুড়ি চিবাতে চিবাতে মজনু বললো,– আনিসা, আজকে তরকারিতে লবন মরিচ দিবিনা, অন্য সব মসলা দিস সমস্যা নেই।

আনিসা অবাক হয়ে বললো,– প্রেম বিরহে কি তোর মাথাটা পুরোপুরি গেছে না কি! লবন মরিচ না দিলে তরকারির কি আর তরকারি হবে! তোর প্রেমের স্বাদহীন শ্রাদ্ধ হবে।

মজনু চেয়ারের হাতলে চাপড় দিয়ে বললো,– একদম তাই, সুস্বাদু তরকারি রান্না করতে যেমন সবধরনের মসলার দরকার, ঠিক তেমনই পরিপূর্ণ একটা জীবন মানেই দুঃখ, সুখ, হাসি, কান্নার সংমিশ্রণ। এই সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, পাওয়া, না পাওয়া, এগুলো জীবন নামক তরকারির মসলা। এগুলো ছাড়া জীবনের পরিপূর্ণ স্বাদ পাওয়া সম্ভব না। ভাঙ্গাগড়া জীবনে থাকবেই, তাই বলে ভেঙে পড়লে চলবে না, সবকিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যাবার নামই জীবন। কারো জন্য জীবন থেমে থাকেনা, কারও জন্য সময়ও থেমে থাকেনা। অতীত নিয়ে ভেবে বর্তমানের সময় নষ্ট করা বোকামি, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাব অতীত ভুলে।

আনিসা বললো,– হঠাৎ এসব কথা কেন?

মজনু মিষ্টি হেসে বললো,– তোর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমি শুনেছি আনিসা, এখন বিষয় হলো তোর সতীত্ব প্রমাণ করার কোনো দরকার নেই একটা অমানুষের কাছে, নিজেকে প্রমাণ কর, আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে সবকিছু ভুলে নতুন করে এগিয়ে চলার চেষ্টা কর।

আনিসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

মজনু আবার বললো,– এই ছেলেরাই মেয়েদের প্রেমে ফেলে বাধ্য করে শারীরিক মেলামেশা করতে, খোলা বুকের ছবি দিতে। একটা মেয়ের নগ্ন ছবি চাইতেও বিবেকে বাঁধে না। আর মেয়েগুলোও প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে, বিশ্বাস করে, এবং কথার অবাধ্য হয়ে প্রেম হারানোর ভয়ে প্রেমিকের চাওয়া অনিচ্ছা সত্ত্বে হলেও পুরণ করতে বাধ্য হয়। আবার ঐসব প্রেমিকই দিনশেষে নিজের স্ত্রীকে সন্দেহ করে কারণ কথায় আছে– যে যেমন, তার কাছে পুরো পৃথিবীর মানুষ তেমন।

আনিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,– আমি ডিভোর্সের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অমানুষের সঙ্গে সংসার করার চেয়ে আজীবন একা থাকা অনেক ভালো।

মজনু বললো,– গুড, নিজেকে শক্ত রাখ, সময় হলে তোর জীবনে পার্ফেক্ট কেউ আসবেই, ততদিন অপেক্ষা। আর রুবেলের মতো অমানুষের যাদের ভেতরে বিবেকের নেই অস্তিত্ব, তাদের কাছে সবই এক, যেমন পাড়ার দেহ ব্যবসায়ী এবং সতী মেয়ের সতীত্ব।

সমাপ্ত।

লেখাঃ ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here