সত্য ঘটনা অবলম্বনে এক্সট্রা পার্ট

0
74

বাসর রাতে জানতে পারলাম আমার বউ তরী কানে কম শুনে। কমশুনাতে সেটাতে আমার প্রবলেম নেই, কিন্তু প্রবলেম হলো তার উল্টা শুনাতে। এই উল্টা শুনার জন্য জীবন আমার সাদা-কালো টিভি হয়ে গেছে।

ফুলসজ্জার রাতে যখন ঘরে প্রবেশ করলাম, দেখতে পেলাম সে লম্বা ইয়া বড় গোমটা দিয়ে বসে আছে। আমি তার পাশে গিয়ে গোমটা উল্টিয়ে চেহারা দেখে বললাম,
“বাঃ তুমি কত নাইচ!”

কিন্তু পরক্ষণে তরী অভিমানী হয়ে বলল ,

” ছিঃ এসব কি কথা! শুরুতেই আপনি বউয়ের সাইচ জিজ্ঞাসা করছেন! হু! আপনি কেমন পুরুষ! এমন হলে কিন্তু আমি বাসর রাত থেকে উঠে বাইরে চলে যাবো, এই কিন্তু বলে দিলাম।”

আমি হালকা রাগান্বিতভাবে বললাম,

” আরে! আমি বলেছি নাইচ!

তরী এবার আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল,” আমার সাইচ হলো ৩৬,২৮, ৩৪। এবার, খুশিতো?”
তার কথা শুনে আমি তব্দা খেয়ে রইলাম। এই মেয়ে বলে কি! আমি বললাম নাইচ, সে বলে সাইচ! হৃদপিণ্ড অলরেডি কাঁপতে লাগল।

পাশের রুম থেকে ভাবীরা হেসে উঠল হা হা হা করে। ভাবীরা সবাই দেয়ালে কান পেতে বাসর রাতের আমাদের কথা শুনছেন। যাতে সকাল হলে আমাকে নিয়ে মজা করতে পারেন। তাই তাদের হাসির আওয়াজে আমি লজ্জা পেয়ে কথা আরো আস্তে বলার সিদ্ধান্ত নিলাম।
এদিকে তরীর নাইচকে সাইচ বলার জন্য ভাবাচ্ছে আমাকে। মনকে বুঝালাম হয়ত দুষ্টুমি করছে সে। বাসর রাতে অমন দুষ্টুমি বউরা একটু-আধটু করেই।

আমি আবার মুচকি হেসে আগামী জীবনের নির্দেশনা দিতে শান্তভাবে বললাম,” আমি সবসময় তোমার সাথে আছি৷ আমার মন যদি খারাপও থাকে, নিস্তেজ থাকে, তোমার মন ভাঙতে কখনই দিবো না আমি।”
তরী অভিমান স্বরে বলল,” ওমা এটা কেমন কথা! পাগল হয়েছেন না-কি?”

আমি না বুঝে বললাম,” মানে?”

তরী বলল,” আপনার ধন যদি খারাপ থাকে, নিস্তেজ থাকে, আমার ধন ভাঙতে দিবেন না এসব কি বলছেন! মদ-তদ খেয়েছেন না-কি?
নাকি গাঞ্জাও খেয়ে বাসর করতে এসেছেন? আপনার সাথে কোনো কথা নাই!

-নাউজুবিল্লাহ! বলে কি!
এই মেয়ের কথাশুনে বুকের দুইপাশে চিনচিন করছে। হার্টএটাক পাচ্ছে আমার। মাথা কেবল লাটিমের মতো চক্কর দিচ্ছে।
আমার অবাক হওয়া চাহনীর দিকে তাকিয়ে সে আবার নিজে নিজে বলতে থাকল,
-গাঞ্জা না খেলে এটাত জানার কথা পুরুষ মানুষের
-ধন থাকে আর মেয়েদের থাকে..
ওই দেখো, সব বলে দিচ্ছে!

আমি তাড়াতাড়ি তরীর মুখ চেপে ধরলাম। এই মেয়ে
এগুলা কি বলে! আমি বললাম “মন”, ও বলে “ধন”। বাসর রাতকে দেখছি শোকসভা বানিয়ে দিবে ।

এদিকে, অপর পাশে থাকা ভাবীরা হু হু করে হাসতে হাসতে শেষ। পেটে খিল ধরে গেছে তাদের। তাদের হাসিতে খাট নড়ছে।

আমার চোখ দিয়ে পানি চলে এসেছে। কোনোমতে চেপে রেখে বললাম,” দেখো! এটা আমার দশটা না, পাঁচটা না একটামাত্র বাসর রাত!প্লিজ! সেটাতে এমন কথাবার্তা বলো না, যেটাতে লোকে হাসে। ”

তরী দেখি আমার সেক্সি ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছে। তার সহজ ভঙ্গিমায় তাকানোই আমি তার প্রেমে পড়ে গেলাম। সাথে সাথে আমার বাসর পেতে থাকল। আমি তাকে রোমান্টিক মুডে বললাম,
“এই! প্লিজ কাছে আসো।”

কিন্তু সে আমার টেনশন বাড়িয়ে বাসর রাতে হা হা হা করে হাসতে থাকল। সে শুনেছে, হাসো! তাই বাসর রাতে তার অট্টহাসি। হাসিতে পুরো ঘরের সবাই জাগ্রত হয়ে গেছে। অন্যরুম থেকে ছোটোবাচ্চার কান্নার আওয়াজো শুনা যাচ্ছে।

আমি হালকা দাঁত চেপে বললাম,” হাসো বলিনি, বলেছি কাছে আসো! তোমাকে আদর করব!”

তরী না বুঝে বলল,” হোয়াট…?”

আমি এবার দাঁত কটমট করতে করতে বললাম,” আদর করব, কাছে আয়!”

তরী রাগীভাবে বলল,” কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।”

-ওরে আল্লাহ! আমি কাছে আসতে বলেছি। আমি তোমাকে আদর করতে চাই!
তরী না বুঝে বলল,“মেয়েদের মতো মিনমিয়ে কী বলেন! পুরুষ মানুষ, পুরুষের মতো কথা বলেন!”
আমার এবার গেল মেজাজ বিগড়ে। আমি বাসর রাতে নিরব থাকার কথা ভুলে আমি চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম,” আমি তোরে আদর করব! তোর চৌদ্দ গোষ্ঠীরে আদর করব ! জড়িয়ে ধরব! সেক্স করব! তাই শালী কাছে আসার জন্য বলতেছি! আর তুই তো শুনতেসিস না! দেমাগ দেখাস না?”

কথাগুলা চিৎকার দিয়ে বলে আমি হাঁপিয়ে পড়েছি। তাই কুকুরের মতো খাটে বসে জিহবা বের করে হাঁপাতে থাকলাম।

কিন্তু পরক্ষণে মনে হলো হায়, হায়! করলাম কি! আমি তো বাসর রাতে আছি। বাসর রাতে চিৎকার করা যে মুরুব্বিদের নিষেধ আছে।

আমার চিৎকারে যে শুধু ঘরের সবাই শুনেছে তা শুধু নয়, বাড়ির আশেপাশে থাকা সব ঘরের জনতা শুনে গেছে। আমার মান-ইজ্জৎ গেলো বলে। সকালে মুখ দেখাবো কীভাবে!

আমার কথাশুনে বোধহয় ভাবীরা কেউ হার্টএটাক করেছে তাই এম্বুল্যান্স আসতে কেউ ফোনে বলছে। আমি ভয়ে ঢোক গিলতে থাকলাম। শেষে কথার জন্য খুনের আসামী যেন না হয়ে যায়।

কিন্তু এতকিছুর পর যখন তরী বলল,

,” হোয়াট…! কি বলছেন কিছুত শুনতে পাচ্ছিই না। আরো জোরে বলেন!”

আমি কথাটা শুনে ” ওমাগো!” বলে, কখন যে বাসর রাতে অজ্ঞান হয়ে পড়লাম বুঝতেই পারি নি।

এই মেয়ের কানে কমশুনা আমার জীবন জিন্দেগী বিষাদ করে দিয়েছে। তরীর রুপ, যৌতুক আর তার বাবার সরকারী চাকরী ধরিয়ে দেবার কথা শুনে, লোভে পড়ে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু কে জানত একটা মহাবধিরকে বিয়ে করব! কে জানত বধিরকে বিয়ে করে আমার পরিবারে অমাবস্যা নেমে আসবে।

এই জন্য কথায় আছে সস্তার তিন অবস্থা।

মূলত, অনেক মেয়েকে দেখেও আমার যখন পছন্দ হচ্ছিল না, তখন হঠাৎ তরীকে দেখে পছন্দ হওয়ার সাথে সাথেই বাবা কোনোকিছু না যাচাই করে কাজী এনে সাথে সাথে বিয়ে করিয়ে দেন। কিন্তু সে বিয়ে আমার জীবনের ধ্বংস করে দেবে, সেটা আমি বুঝিনি।

তো সেদিন আব্বাকেও তরী হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিলো। আব্বার এক বন্ধু এলে, আব্বা তরীকে ডাক দিয়ে বললেন,” মা! এদিকে আসো তো!”

তরী জোরে ডাক শুনে এলে সে আব্বার বন্ধুকে প্রথমে সালাম করে। তখন আব্বা বন্ধুকে বলেন,” এটা হলো আমার পুত্রের বউ!”

কিন্তু তরী অভিমানী হয়ে বলল,” আমি আপনার মূত্রের বউ! হুম! এগুলা কি বলেন! আপনি শাওনের বাবা, তাই বলে যা ইচ্ছা তা বলবেন সেটা কখনই আমি মেনে নিবো না। মূত্রের সাথে আমায় মেলাবেন না!”

বাবা দেখছি বুকে হাত দিয়ে রেখেছেন।
আব্বার বন্ধুর চোখ বড় দেখে আব্বা বললেন,” এটা আমার Luck এর দোষ!”

কিন্তু তরী চেঁচিয়ে বলল,” ছিঃ! কি সব কথা-বার্তা! এটা আপনার Fuck এর দোষ মানি! বৃদ্ধ বয়সে দেখছি বড়ই লুচু রয়ে গেছেন?”

বাবা ও তার বন্ধু বুকে হাত দিয়ে নীচে পড়ে গেছেন৷ মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। বোধয় বাঁঁচবেন না। আমি দৌড়ে গিয়ে তাদের দু’জনের পাশে গেলাম। দু’জনেই মৃগী রোগীর মতো মাটিতে পা বারি দিচ্ছে।

শেষে তাদের দু’জনকে হাসপাতালে নেয়া হলো। একটুর জন্য বেঁচে গেলেন।

এই মেয়ের কম শুনা আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কিছুত শুনেই না, আবার যেটা শুনে সেটা উল্টা শুনে। লজ্জাও নেই। তাই যা তা বলে বসে!

ওইদিন আমাদের ঘরে আমার পুলিশ বন্ধু এলো। তার একপ্রকার জোরাজুরিতে তরীকে ডাক দিলাম।
সে তরীকে দেখে বলল,”ভাবী দেখি অনেক সুন্দর।, ভাবীর গালটা লাল! ”

আমি তো আতঙ্কে গুজে থাকলাম। কি শুনে আল্লাহই ভালো জানেন!

কিন্তু তরী শুনলো, ভাবীর মালটা লাল।

তাই রাগে গিজগিজ করতে করতে বলল,” তোদের মতো লুচ্চা পুলিশের জন্য আজ দেশে এত ধর্ষণ! কুত্তারবাচ্চা! ”

বন্ধু বুকে একহাত দিয়ে আছে। শরবত খাচ্ছিল। তরীর কথাশুনে শরবত মুখ থেকে পড়ে গেল। তরী আবার বলল,

“তোর ঘরে মা-বোন নাই? হারামজাদা! লম্পট! মাল বলতে লজ্জা করে না। তাও ভুল বলিস। মালকে লাল বলিস! দাঁড়া!”

সে এবার জুতা দিয়ে বন্ধু, পুলিশ অফিসারকে দিলো গালে বারি। তার গাল, লাল হয়ে গেল।
সে জুতার বারি খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। শুনলাম, তরীর কথাশুনে না-কি আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার সময় নাকি তার কান থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। নিজের বন্দুক বের করে কানে গুলি খেয়েছে। এভাবে পুলিশ আত্মহত্যা করলে, জনগণ যাবে কার কাছে!
এই মেয়ের সামনে কিছু বলতে সাহস করি না। এদিকে ডিভোর্সও দিতে পারছি না। তাকে বলি ডিভোর্স দেবো, সে শুনে প্রপোজ দিবো। সে মুচকি হেসে চলে যায়। তাকে নিয়ে বের হওয়া তো দূরের কথা তার থেকেই ভয়ে ১০০ হাত দূরে থাকি।

সেদিন অফিসের বস্ এলেন আমার সাথে কথা বলতে। কিন্তু আমি আসার আগেই তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। শুনলাম, তার ৫বছরের জেল হয়েছে। পরে জেনেছিলাম তিনি আমাদের ঘরে এসে তরীকে বলেছিল, তুমি কি আজিজুল হক শাওনের বউ তরী?

সে ঠোঁট দেখে হালকা বুঝে বলল,” হুম!”

কিন্তু যখন স্যার বললেন, “চমৎকার! কাছে আসো! ” কিন্তু তরী শুনেছিল, বলাৎকার! পরে তাই তরী, অফিসের বস্-কে ৯৯৯তে কল দিয়ে ফোন দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছিল। তিনি যেতে যেতে বলেছিলেন, আমি সাখাওয়াত স্যার! কিন্তু তরী শুনেছিল ডাকাত স্যার। বলাৎকারের পাশাপাশি, ডাকাতি মামলাও দিয়েছিল তাকে। হাজতে স্যারের সে কি কান্না!

হায়রে, বেচারা!

এই মেয়ে যেভাবে এগোচ্ছে, মনে হচ্ছে পুরো দেশের সবাইকে হাসপাতাল ও থানায় পাঠিয়ে দেবে। কি যে করি একদম বুঝি না!

এই মেয়েকে নিয়ে আমি শান্তিতেই থাকতে পারছি না। সেদিন তার কানের সমস্যার জন্য ডাক্তারের কাছে বাধ্য হয়ে তরীকে নিয়ে গেলাম। ডাক্তারকে বললাম, আপনি তরীর যেটা-ইচ্ছা সেটা পরীক্ষা করতে পারেন, কিন্তু খবরদার তার সামনে কোনো কথা বলা যাবে না। একদম চুপ থাকবেন।”

কিন্তু ডাক্তার ভুলে তরীকে জিজ্ঞাসা করল,” মা! প্রবলেম কিসে! তোমার কি শুনায় সমস্যা!”

কিন্তু সে শুনল “সোনায়” সমস্যা! এমন জোরে ডাক্তারকে থাপ্পড় দিলো যে ডাক্তার অজ্ঞান হয়ে কাঁত হয়ে গেছেন। জ্ঞান ফিরল কয়েকঘণ্টা পরে।

কানের ডাক্তারের কানে সমস্যা হয়ে গেল! আমি বললাম,” ভালো লাগছে এখন স্যার!”

কিন্তু ডাক্তার বলল,” কালো কেন লাগবে! এখন তো দিন!”

আমি মনে মনে বললাম,” শালা তো দেখছি নিজেই কালা হয়ে গেছে!” তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে এলাম।

এই মেয়েকে নিয়ে কি যে করব বুঝতে পারছি না।

তার পরিবারকে জানানো দরকার! তাই অভিযোগ দিতে তার বাবার কাছে গেলাম। তার বাবাকে বললাম,” আপনার মেয়েকে নিয়ে আসেন! নইলে তরীকে খুন করব আমি!”

কিন্তু বাবা উত্তর দিলো,” হোয়াট? কিছু শুনছি না। আরো জোরে বলো!”

আমি মিনমিনিয়ে বললাম,” শালা দেখছি নিজেই কালা!”

আমি উপায়ন্তর না দেখে, শাশুড়িকে ডাক দিয়ে বললাম,” মেয়েকে আনবেন না-কি মান হারাবেন?”

কিন্তু শাশুড়ি রোমান্টিক গান গেয়ে উঠল,” ওগো তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার।”

হারামজাদি বাক্যটা শুনেছে,” মেয়েকে আনবেন না-কি গান গাইবেন!”

আমি নিজের গালে থাপ্পড় খেতে খেতে চলে এলাম। যার পরিবারই এমন, সে তো এমন হবেই। কোন পাগলে যে বলল, বিয়ে করতে!

ডিভোর্স যে দিবো, সে খুদরতও নেই। ২০ লাখ টাকা কাবিন। যেগুলা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, ঘরে তরীর সামনে পরিবারের সবাই কানে তুলা দিয়ে রাখব৷ বিষয়টা হাস্যকর হলেও, এই ছাড়া আর উপায় নেই। কিছু শুনবোই না, তাই কিছু হবেই না।

এই প্রথম ঘরের বউয়ের ভয়ে কানে তুলা গুজে দিয়ে আছে কোনো পরিবার। আমরাও যেন বধির।

যাক! এখন আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমরা হাতের ইশারায় সব কথাবার্তা বলতাম। শান্তিতেই জীবন এগোতে থাকল।
কিন্তু ওইদিন,বাড়ির মালিক এসে সমস্যাটা আবার দেখা দিলো। পরহেজগার বাড়ির মালিক। তিনি এসে সালাম দিয়ে তরীকে বললেন,” তোমার ভাড়াটা বের করে দাও তো!

কিন্তু তরী শুনল,” তোমার বাড়াটা বের করে দাও তো!”
এমন জোরে পরহেজগার চাচাকে থাপ্পড় দিলো যে, গাছের পাখ-পাখালিও উড়তে থাকল। আরো বলল,” তোদের মতো বাড়ির মালিকদের জন্য ভালো ভাড়াটিয়ারা থাকতে পারে না। হুজুর সাজিস আরো! হারামজাদা! যা এখান থেকে!”

চাচা, গালে হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিজের বাড়িতেই ঝুলে আত্মহত্যা করলেন। চাচীর সে কি কান্না!

তার আত্মহত্যার পর মেজাজ আমার এতই বিগড়ে গেল যে সিদ্ধান্ত নিলাম তরীকে খুন করব। কারণ, কেউ যদি তরীকে ফিস দিতে বলে, তখন দেখা যাবে তাকে বিষ মিশিয়ে দিবে।

না, এই মেয়েকে ঘরে আর রাখা যাবে না৷ তাকে সাজেকে নিয়ে গিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে রাতেই মেরে ফেলে দিবো। আমি বের করে দিলেও সে যার সাথে কথা বলবে, তারও জীবন শেষ হয়ে যাবে। তার চেয়ে মেরে ফেলায় ভালো।।

তাই রাতের বাসে করে সাজেকে যাওয়ার জন্য রওনা দিলাম। বাসের জানলার পাশে বসলাম।আমার যখন ঠাণ্ডা লাগছিল সে আমার গায়ে নিজের গায়ের চাদর জড়িয়ে দিলো। ভাবতে থাকলাম, আজ সে কালা বা বধির না হলে, সে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো স্ত্রী হত। কিন্তু আমার যে কিছু করার নেই। এই সমাজের অসহায় মানুষকে তরীর হাত থেকে বাঁচাতেই হবে। আমি যে আলোর দিশারি হয়ে এসেছি তাদের জন্য। আমি যে তাদের বেঁচে থাকার পথপ্রদর্শক।

তার চোখে জল!

সে হয়ত বুঝেছে তাকে আমি খুন করার জন্যই নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু সে হেসে, না জানার মতো চলতে থাকল। এমন মেয়ে সত্যি তুলনা হয় না।
হয়ত সেও মেনে নিয়েছে তার মৃত্যু হওয়াই শ্রেয় বলে। তার কানে কম শুনার জন্য সে নিজেও বিরক্ত।

খুব খারাপ লাগছে কেন যেন! পথ যতই এগোচ্ছে ততই বিষন্ন হতে থাকলাম।

হঠাৎ ধড়াম করে একটা শব্দ হলো। বাস নষ্ট হয়ে গেল। কন্ট্রাক্টর বাইরে নামতেই, মোটা রাইফেলের নল তার কানে ঠেকালো কেউ।

ডাকাত!

কালো ড্রেস পরিহিত সকলে। সবাই বাসে প্রবেশ করল৷ সব শেষে কান কাঁটা সানোয়ার উঠল। যে দেশের শ্রেষ্ঠ ডাকাত! যাকে ধরার জন্য ১টা দেশের পুলিশ খুঁজছে। পত্রিকায় প্রতিদিন তার ছবিসহ ডাকাতির খবর শুনা যায়। আমি তাকে দেখে ভয়ে ঢোক গিলতে থাকলাম। যাকে ধরিয়ে দিলে ৫০ লাখ টাকা পুরুস্কার সরকার দিবে। ধরিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, কেউ তার ডাকাতির সামনে পড়লে বেঁচে ফেরে না। বউকে মারতে এসে, এখন দেখছি নিজেই মারা পড়ব।
সে বাসের সিটের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,” আমি হইলাম শীর্ষ ডাকাইত, কান কাঁটা সানোয়ার। আমারে খুঁজতাছে ১টা দেশ! আমি যে বাসে উঠি, সে বাসে ডাকাতি করি। আর আমার স্টাইল হলো যাওয়ার সময় ফ্রিতে সবাইরে মাইরা থুইয়া রাখি। আজ তোগো মৃত্যু অবধারিত। হা হা হা!”

সবাই কাঁপতে কাঁপতে শেষ।

কিন্তু সর্দারের কথাটা শুনে তরী হাসতে হাসতে একাকার! সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। সিরিয়াস কন্ডিশনে মেয়ে হাসে, স্ট্রেঞ্জ!

সে পেট ধরে খিলখিল করে হাসছে। তার হাসিতে ডাকাত সকলে, বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। আমি ভয়ে কালো ব্যাগের চেন্ট খুলে সেখানে মাথা ঢুকিয়ে রাখলাম। যদি জিজ্ঞাসা করে, মেয়েটা কার কে। আমি বলব চিনি না! ওর জন্য আমি মরতে পারব না!

তরীর সামনে এসে সর্দার মোটাকণ্ঠে বলল,” ও মাইয়া! হাসতেছ কেন? তোমার কি ডর-ভয় নাই!”
তরী বলল,” এটা কেমন নাম বাল চাটা জানোয়ার!”

বাসের সবাই মৃত্যু হবে জেনেও ফিক করে হেসে দেয়।

ডাকাত বাহিনীর অন্যরাও হাসতে থাকে।

এদিকে, আমি ভয়ে কাপড় ব্যাগের ভিতরে দুয়া-কলমা পড়তে থাকলাম। না জানি কি হয়!

কান কাঁটা সানোয়ার, ” চুপ!” বললে সবাই চুপ হয়ে যায়। সে আমতা আমতা করে বলল,” কানে সমস্যা না-কি? আমার নাম হলো ডাকাত সানোয়ার। যাকে ১ টা দেশ খুঁজছে৷ ”

তরী, আবার হাসতে হাসতে বলল,” ওমাগো! হাসতে হাসতে মারায় যাবো! ডাকাত জানোয়ার! হা হা হা,,,”

এবার, ডাকাত সর্দার দাঁত চেপে বলল,” জানোয়ার নয় সানোয়ার!

তরী বলে,” জানোয়ার নয় জানোয়ার! হা হা হা!”

ডাকাত সর্দার বলল,” আমার নাম সাইদুর সানোয়ার!”

তরী বলল,” আপনি হলেন ইদুর জানোয়ার!” হা হা হা.. হাসি কেমনে থামাই!”
ডাকাত সানোয়ারের প্রেস্টিজ পুরাই ফাংচার।

এদিকে, আমার চোখ থেকে পানি পড়ছে ব্যাগে। আজ না জানি, সানোয়ার ভাই বোমা দিয়ে তরীর জন্য পুরো বাসই উড়ায় না দেয়। তাই আল্লাহ আল্লাহ জপতে থাকলাম।

এদিকে, ডাকাত সর্দার নিজের চুল নিজে ছিঁড়তে থাকেন। তরীকে মেরে ফেললে তার সম্মান কমে যাবে। যে করে হোক তরীকে ভয় লাগাতেই হবে।

তাই ডাকাত সর্দার বন্দুক খুঁজতে লাগল। বন্দুক নিয়ে তরীকে সামনে আসার জন্য ইশারা করলে সে সামনে গেলে তিনি বললেন,” ওই বেটি! নাম ঠিক ভাবে বল। আমার নাম কি!”

– “বাল চাটা জানোয়ার!”
সবাই হা হা হা করে হাসছে।

ডাকাতের মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। সে বাসের জানলা বরাবর গুলি চালিয়ে দিলো! সবাই ভয়ে কাঁপছে। অথচ তরীর কোনো ভয় নেই। যে শুনেই না
তার আবার কিসের ভয়!

ডাকাত তব্দা খেয়ে গেল। ভাবছে হয়ত এই মেয়েটার সাহস আছে।

কিছুক্ষণ বাদে আবার সর্দার বলল,” প্লিজ একবার বল! আমার নাম কান কাঁটা সানোয়ার! যা তোরে ছাইড়া দিমু!”

তরী বলল,” হোয়াট!”

ডাকাত হালকা জোরে বলল,” কান কাঁটা সানোয়ার বলতে বলছি!”

কিন্তু তরী কিছু শুনছেই না। গুলির শব্দে যেটা ছিল সেটাও বোধহয় গেছে। সে বলল,” আপনি কিসের ডাকাত এত আস্তে বলেন!”

ডাকাতের কথাটা তার এটিটিউডে লাগল। তিনি জোরে শক্তি দিয়ে চিৎকার দিয়ে বললেন,” আমি ডাকাত কান কাঁটা সানোয়ার!”

তরী বলল,” হোয়াট! শুনছি না তো…”

ডাকাতের চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল। এটা তার জন্য একটা লজ্জার বিষয়। হাঁপাতে
হাঁপাতে সে শরীর সমস্ত শক্তি নিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
” আমি আমিই ডাকাত কান কাঁটা সানোয়ার! যাকে ১টা রাষ্ট্র খুঁজছে!”

তার আওয়াজে পুরো বাসই কেঁপে উঠল। জানলার কাঁচও ভেঙ্গে গেল।

ডাকাত স্যার নাম বলেই দুর্বল হয়ে পড়ল। তার শরীরে কোনো শক্তি নেই। গ্লুকোজ খাওয়ানো দরকার।

কিন্তু যখন তরী বলল,” মেয়েদের মতো এগুলা কি বলেন! আপনার হাতে চুড়ি পরা দরকার! কিছুই বুঝা যায় না। শালা, না-কি আবার ডাকাত!”

সে কথাটা শুনে নিজের মাথায় রাইফেল দিয়ে বারবার বারি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। যেখানে ডাকাতের সম্মানই নেই সেখানে সজাগ থেকে কি লাভ!

অন্য সদস্যরা ডাকাত সর্দারের দুঃখে অবিরত বিলাপ করে কাঁদতে থাকে।

এদিকে, ডাকাত সর্দারের চিৎকারে এক কিলোমিটার দূরের থানা থেকে পুলিশ এসে কান্নারত অবস্থায় সবাইকে ধরে ফেলল। কান কাঁটা সানোয়ারকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হলো। আমি ব্যাগ থেকে মাথা বের করলাম!
ওমা একি! তরীর সাহসিকতার জন্য সবাই তাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে!

যে মেয়ের উল্টা শুনার জন্য কয়েকজন মারা গেল, সে মেয়ের উল্টা শুনার জন্যই একবাসের যাত্রীরা বেঁচে গেল। পৃথিবী বড়ই অদ্ভুত।

আমি দৌড়ে গিয়ে কখন তাকে জড়িয়ে ধরলাম বুঝতে পারলাম না। বাসের সবাই আমাদের কান্না মাখা জড়িয়ে থাকার অপরুপ দৃশ্যদেখে হাততালি দিতে থাকল।

আমি তার চেহারার সামনে কথা ছাড়া ঠোঁট নাড়িয়ে বললাম,” আই লাভ ইউ!”
তরীও বলল,” আই লাভ ইউ টু!”
সে আমার কথা বুঝতে পেরেছে। তাই আনন্দে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।

কয়েকদিন পর তরীর সাহসিকতা পত্রিকায় উঠে যায়। কান কাঁটা সানোয়ারকে অজ্ঞান বানানোর জন্য সরকার থেকে আমরা পুরস্কৃত হই। ৫০ লাখ টাকা পাই। সে সাথে আমি আর তরী হয়ে যাই দেশের নাম করা সেলেব্রেটি।

তরীকে আর খুন করিনি। তরীকে নিয়ে এখন সমস্যাও হয় না। সরকারী খরচে আমেরিকা থেকে তার কানের চিকিৎসা করেছি। কানের মেশিনে এখন তাকে আরো বেশী সুন্দর দেখায়।

শুনেছি, কান কাঁটা সানোয়ার পাবনায় ট্রিটমেন্টে আছে, সে শুধু এক বাক্যই বলছে,” আমিই কান কাঁটা সানোয়ার! আমিই…

হা হা হা!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here