সবটাই_তুমিময় পর্বঃ২৬

0
268

সবটাই_তুমিময় পর্বঃ২৬
#লেখনিতে-মিথিলা মাশরেকা

সিডনি!শীতপ্রধান আবহাওয়ায় স্বল্প সময়ের অতিথি হয়ে আসা গ্রীষ্মটাকে এখানকার মানুষ একপ্রকার উৎসবমুখরভাবে উপভোগ করে।দিনের বেলায় আদুরে নম্র রোদের সাথে রাস্তাঘাটের কিছুটা দগ্ধতাই এখানকার লোকদের জন্য গ্রীষ্মের বিশেষত্ব।বাইরে থেকে,বিশেষত গ্রীষ্মপ্রধান জায়গাগুলো থেকে আসা মানুষজন এ রোদ্দুরে গ্রীষ্ম নয়,বসন্তের আমেজ খুজে পাবে।যেখানে হালকা রোদের সাথে শীতল বায়ুও শরীরমন ছুয়ে যায়।তবে রাতে এর চিত্র বেশ আলাদা।সুর্যের আলোর অনুপস্থিতি খানিকটা শীতের অনুভব এনে দেয়।অন্তত আমার কাছে রাতটা শীতশীত বলেই মনে হয়েছে।

বিলাসবহুল হোটেলের নবম তলার ব্যালকনিতে দাড়িয়ে আমি।সকালের মৃদ্যু রোদে নিজ নিজ কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরা ব্যস্ত শহরবাসীকে দেখছিলাম।সময়ের ব্যবধানে আমার ছোট্ট,স্বাভাবিক জীবনের সবটা অন্যরকম হয়ে গেছে।এখানে এসে পৌছেছি চারঘন্টা পেরিয়ে গেছে।আসার আগে মনিমার সাথে ফোনে কথা হয়েছে,কেনো যেনো দেখা করতে যাওয়ার সাহস হয়নি।বেরিয়েছিলাম আস্থার সাথে,তানহাকে ডাকিনি আর।আসার সময় অঙ্কুরের সাথেও কোনো কথা বলিনি।উনিও চুপচাপ শুধু আমার চলে আসাটা দেখেছেন।ও বাসা থেকে যাত্রাটা পুরোপুরি রোহান ভাইয়ার সাথে।তার পিএ হিসেবে।

রুমে পৌছে দিয়ে রোহান ভাইয়া বেরিয়ে গেছেন।তখন রাত প্রায় শেষের দিকে।এসেই ঘুমিয়ে পরেছিলাম।ঘুম ভেঙেছেও দেরিতে।হোটেল থেকে কিছুটা দুরে একটা সরু রাস্তা আছে।তার ওপাশে লেইক।সে সরু রাস্তাতে জগিং করতে থাকা নারীপুরুষ।কেউ সাইকেলিং করছে,কেউ পাশে দাড়িয়ে ব্যায়াম করছে,কেউ বসেছে আড্ডা দিতে,কেউ বা পাশের দোকান থেকে জুস কিনছে।সবাই যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত।

আমার চোখ আটকে গেলো বেবিহোল্ডার গলায় পেচিয়ে বাচ্চা নিয়ে আসা এক বাবার দিকে।উনি হাটছিলেন আর গলার সামনে ঝুলানো মাস পাঁচেকের বাচ্চাকে আদর করছিলেন,কথা বলছিলেন।বাচ্চার মা হয়তো অফিসে বা অন্যকাজে গিয়েছে।তবে মাকে ছাড়াও বাবার কাছেই বাচ্চাটা বেশ খুশি।ভেতরটা নিমিষেই ধক করে উঠলো আমার।এরমধ্যেই দরজা খোলার শব্দ।ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম টিশার্ট,প্যান্ট পরে চিকন গরনের বেশিই ফর্সা একটা মেয়ে।হয়তো হোটেলের সার্ভ গার্ল।ও এসেই হাসিখুশিভাবে বললো,

-গুড মর্নিং ম্যাম।

-মর্নিং।

মেয়েটা মুভিং টেবিল টেনে রুমে ঢুকেছে।ওতে দুটো ফ্লাক্স,অনেকগুলো মগ।ইংরেজিতে বললো,

-চা নাকি কফি?

-কোনোটাই না।

ও এবার খাবারের মেনু এগিয়ে দিয়ে বললো,

-সকালে কি খাবেন ম্যাম?আপনার স্যার,মানে রোহান স্যার রিসেপশনে বলেছেন আপনার খাবার আগেআগে রুমেই পৌছে দিতে।

মৃদ্যু হেসে মেনু দেখে খাবারের নাম বলে দিলাম।মেয়েটা সৌজন্য হেসে চলে যাচ্ছিলো।পেছন থেকে ডাক লাগালাম।ও বললো,

-কোনো সমস্যা ম্যাম?

-আসলে এখানে পরিচিত কেউ নেই আমার।আর স্যারও তার বিজনেস নিয়ে ব্যস্ত।তাই…তাই আপনার সাথে পরিচিত হতে চাই।যদি আপনি কিছু মনে না করেন।

মেয়েটা আবারো হেসে এগিয়ে আসলো।গলার পাশের ছোট নেমপ্লেট দেখিয়ে বললো,

-আমি এলিনা।এখানকার স্থানীয়।আপাতত এ হোটেলের সার্ভগার্ল।তাছাড়া বিকেলে দু ঘন্টার আরো একটা চাকরি আছে আমার।টুরিস্ট গাইড।

-আমি আহানিতা।তুমি নাম ধরেই বলো আমাকে।যদি অনুমতি দাও,আমিও নাম ধরেই ডাকি তোমাকে?

-অবশ্যই।এরকম অনেকেই বেরাতে আসে এখানে।অনেকের সাথেই পরিচিত হতে পেরে ভালো লেগেছে।আশা করবো তোমারও এখানটা ভালো লাগবে আহানিটা।

ওর কাছে নামটা শুনে হেসে দিলাম।বললাম,

-হ্যাঁ,অবশ্যই।

-আমি এখন আসছি।দু ঘন্টা পর আমার ট্রিপ শেষ হবে,তারপর এসে বাকি কথা হবে কেমন?

-বেশ।অপেক্ষায় থাকবো তোমার।

ও চলে যাচ্ছিলো।তখনই রোহান ভাইয়া ভেতরে ঢুকলেন।এলিনা ওনাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।রোহান ভাইয়া বললেন,

-ঘুম হয়েছে ঠিকমতো?কোনো সমস্যা হয়নি তো তোমার আহানিতা?

-না।ঠিকাছি আমি।

-অঙ্কুরের ফ্লাইট টেকঅফ করেছে।

কিছু বললাম না।উনি বললেন,

-তুমি চাইলে এখানটা ঘুরে দেখতে পারো।জায়গাটা সুন্দর।

তাচ্ছিল্যে হেসে বললাম,

-নিজের দেশে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরায় আপনাদের সমস্যা।আর এখানে বিদেশের মাটিতে এসে বলছেন,ইচ্ছামতো ঘুরতে পারি?আপনারা দুজনেই আজব মানুষ।

-অঙ্কুরের এমনটা করার অবশ্যই কারন আছে আহানিতা।

-আছে তো!কারনটা এই,যাতে আমার আর তার সম্পর্কে কেউ কিছু জানতে না পারে।

-এরও কারন আছে।জানোতো তুমি।

-হ্যাঁ।অবশ্যই।দু বছরের এগ্রিমেন্টের বউ আমি তার,পাব্লিক জানলে তার ইমেজ নষ্ট হবে না?

রোহান ভাইয়া চুপ করে গেলেন।বললাম,

-আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না।অঙ্কুর বলেন নি আপনাকে?আমি তো বলেছি,তার কথার অবাধ্য হবো না।তার সব কথা মানবো।নিশ্চিন্ত থাকুন।এমন কিছু করবো না যাতে আমার জন্য আপনাদের কোনো ঝামেলা হয়।

-আমার মিটিং আছে।আসছি আমি।টেক কেয়ার।

রোহান ভাইয়া বেরিয়ে গেলেন।নিজের উপর তাচ্ছিল্যে হেসে আবারো বাইরে দৃষ্টি ছুড়লাম।

.

মাঝে একটা দিন,দুটো রাত কেটে গেছে।মোটামুটি হোটেলের ঘরেই।নিজের ইচ্ছায় বেরোই নি।মনিমা,তানহার সাথে কথা হয়েছে।আস্থাও ফোনে ওর উদ্ভট কথায় রাগানোর চেষ্টা করেছে।স্বাভাবিক থেকে হ্যান্ডেল করেছি সবটা।রোহান ভাইয়া দিনে কয়েকবার এসে জানিয়ে গেছেন,অঙ্কুর এখানে পৌছেছেন,সেইম ফ্লোরে রুম তার,প্র্যাকটিস নিয়ে ব্যস্ত,ইত্যাদি ইত্যাদি।কেনো যেনো ক্ষনে ক্ষনে তাকে দেখার ইচ্ছা হয়েছে,তার আওয়াজ শুনতে ইচ্ছা করেছে,তার গভীর চাওনির সে চোখজোড়া দেখার ইচ্ছা করেছে,ভ্রুর পাশের ওই লালচে তিলটা যেনো কোনো অভ্যাস হয়ে দাড়িয়েছে আমার।

এলিনার সাথে অনেক ভাব হয়ে গেছে আমার।ওর সাথে দুবার বেরিয়েছিও।ও যেহেতু এখানকার টুরিস্ট গাইড হিসেবেও কাজ করেছে,তাই রোহান ভাইয়া কিছুই বলেননি।সকালের খাবারটা শেষ করে আবারো ব্যালকনি দিয়ে শহর দেখায় ব্যস্ত রাখতে চাইছিলাম নিজেকে।এরমাঝেই দরজা খোলার শব্দ।পেছন ফিরলাম।অঙ্কুর!পুরো দুদিন তিনরাত পর দেখলাম তাকে।একদম অগোছালো লাগছে মানুষটাকে।কিছু বুঝে ওঠার আগেই উনি একছুটে এসে জরিয়ে ধরলেন আমাকে।বললেন,

-আর কিছু মুহুর্ত।তারপর…তারপর আর কোনো বাধাই আটকাতে পারবে না আমাকে।

কিছুই বুঝিনি।কিন্তু ওইযে,প্রশ্ন করা বারন!ওনাকে ছাড়িয়ে দিলাম।অঙ্কুর একটু ভ্রুকুচকে তাকিয়ে আবারো মন খারাপ করে ফেললেন।কপালটা ডলে জিভ দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে বললেন,

-কেমন আছো?

-যেমন দেখছেন।

-আমি কেমন আছি জানতে চাইবে না?

-যেমন দেখছি,তেমনি আছেন।আলাদাভাবে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে হয়নি।আমার প্রশ্ন করাটা পছন্দ হবে না আপনার।

-আজ আমার ম্যাচ অদ্রি।

মৃদ্যু হাসলাম।ওনার আজ ম্যাচ এটা জানি।তবে এটাও জানতাম,ম্যাচের আগে উনি আসবেন একবার আমার কাছে।কেনো জানতাম,তা জানিনা।পেছন ফিরে বললাম,

-জানি তো।যে খবর পুরো পৃথিবীই জানে,তার খবর না হয় আমিও রাখলাম কিছুটা।

-কিছু বলার নেই তোমার?

-আমি কিছু বললে আপনি অবশ্যই জিরো রানের জায়গায় দুটো রান বেশি করে আউট হবেন না।

-অদ্রি?

-যতোদুর জানি,এই ম্যাচই হারবেন বলে আপনি ডিল করেছিলেন প্রদীপ সরকারের সাথে।তারপরও কতো শো অফ!প্র্যাকটিস!ব্যস্ততার অভিনয়!

-অভিনয় এতোটাও সোজা বিষয় নয়।তা তোমার থেকে ভালো কে জানে?

আবারো তারদিক ফিরলাম।বললাম,

-হ্যাঁ।তবে যে সৎ,অভিনয়ের চেয়ে কাউকে ঠকানোটা তার কাছে আরো বেশি কঠিন!আর আপনি ঠকাচ্ছেন।একজনকে নয়,হাজারজনকে।এতোগুলো মানুষের বিশ্বাস,ভরসা,নিজের ক্যারিয়ার,সবকিছু থেকে ওই কয়েকটা টাকাই বেশি আপনার কাছে অঙ্কুর।একটাবারও ওই মানুষগুলোর কথা ভাবেন নি,যারা এএসএ’র সেঞ্চুরী আর জয়ের পর সেলিব্রেশনের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে।যারা ভরসা করে আপনাকে।ভালোবাসে আপনাকে।একবারও মনে করেন নি,কতোবড় পাপ করছেন আপনি।

-এই মুহুর্তে দাড়িয়ে এতো কঠিন কথাগুলো বলতে তোমার কষ্ট হলো না অদ্রি?অবশ্য ঠিকই আছে।এই মুহুর্তে তোমার এমনটাই মনে হবে।যাই হোক,যাদের ভালোবাসার কথা বলছো,তাদের ভালোবাসার দাম অঙ্কুর দিয়েছে,দেবে।কিন্তু আমার ভালোবাসা?তার কি?

অবাক হলাম।তার ভালোবাসা মানে?সে প্রশ্নের জবাবও তো উনি দেবেন না।তাই তাচ্ছিল্যে হেসে বললাম,

-ভালোবাসা কথাটা আপনাকে মানায় না।

-চাও না আমি মানিয়ে নেই?

আরো বিস্ময়ে তাকালাম।উনি উত্তরের জন্য অপেক্ষায়।বললেন,

-বলো অদ্রি?চাও না আমি মানিয়ে নেই এ শব্দটা আমার সাথে।এমনটা হোক,ভালোবাসা মানে অঙ্কুরকে বুঝতে শিখুক সবাই।তুমি শেখো।চাওনা এমন?

নিজেকে শক্ত করে বললাম,

-আপনার এইসব কাজের পর,চাই না।ভালোবাসা নিয়ে সত্যি কোনো কথা মানায় না আপনাকে অঙ্কুর।নাই বা বললেন কিছু,ভালোবাসা নিয়ে!

পানিতে ভরে উঠেছে আমার চোখ।একপলক অঙ্কুরের দিকে তাকালাম।তারও একই অবস্থা।নিজের হাতদুটো মুঠো করে নিয়ে উনি জোরে শ্বাা ছাড়লেন উনি।শান্ত গলায় বললেন,

-বেশ।বলবো না ভালোবাসি।

ভেতরের কলিজাটা যেনো আচড়ে ধরলো কেউ।অঙ্কুর আমার দিকে একপা এগিয়ে এসে বললেন,

-তুমিও বলবে না তো?

টুপ করে পানি বেরিয়ে এলো চোখ দিয়ে।চোখ সরিয়ে নিলাম।উনি আবারো বললেন,

-বলো?বলবে না তো,ভালোবাসো?

উত্তরটা না।কেনো বলবো ভালোবাসি?যখন শুধু অপমান ছাড়া কিছুই পাইনি,কেনো বলবো?যতই দুর্বল হই না কেনো,আপনার ‌মতো কাউকে বলা যায় ভালোবাসি?অঙ্কুর বললেন,

-উত্তর দিতে পারলে না তো?

…..

-শুনে রাখো অদ্রি।আর অল্প কিছুক্ষন সময়ের ব্যবধানে তোমার সবটা পাল্টে যাবে।তখন কিন্তু তোমার এই নিস্তব্ধতা,এই মৌনতা মানবো না আমি!

….

-আপাতত অল দ্যা বেস্টও বলবে না?

চোখের পানি মুছলাম।বিছানার পাশে রাখা ব্যাগটা থেকে ছোট একটা গিফটবক্স বের করে এনে ধরিয়ে দিলাম তার হাতে।উনি বিস্ময়ে একবার আমার দিক,তো আরেকবার বক্সটার দিকে তাকাচ্ছেন শুধু।বললাম,

-খুলে দেখতে পারেন।

বিস্ময় নিয়েই উনি আস্তেআস্তে খুলে ফেললেন র ্যাপিং পেপার।ওটা দেখে একরকম আটকে গেলেন অঙ্কুর।আঙুলের সমান দুটো ছোটছোট মুর্তি।কাপল।কোটসুট পরা ছেলেটা ব্যাকলেস গাউন পরা মেয়েটার দুগাল ধরে কপালে চুমো দিচ্ছে।ধীর গলায় অঙ্কুরকে বললাম,

-অল দ্যা বেস্ট।হেরে আসুন।

অঙ্কুরের চেহারায় খুশির ঝলক।উনি বললেন,

-আমি অলরেডি জিতে গেছি অদ্রি।আর আমার বিশ্বাসও জিতে গেছে।আসছি।

উনি বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে।উচ্ছাসিতভাবে চলে যাওয়া দেখলাম তার।পরপরই চোখ বন্ধ করে নিজেকে শক্ত করে নিলাম।আপনি জিতুন বা হেরে যান,সত্যিটা সামনে আসবেই অঙ্কুর।আর এবার হয়তো সেটা আপনি স্বীকার করার আগেই!

#চলবে…

[ পরের পর্বে ধামাকা আসছে।সিটবেল্ট বেধে বসিয়েন।🙆 ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here