সবুজ খামে না বলা কথা পর্ব -০১

0
79

সে-বার পরীক্ষা শেষে দাদুর সাথে উনার বোনের মেয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। বৃষ্টিতে বাড়িতে ঢুকতে যাবো এমন সময় ধপাস করে পড়ে গেলাম উঠোনে। ফুফুটা( দাদুর বোনের মেয়ে) এগিয়ে এসে খুব দুঃখ করে ভেতরে নিয়ে গেলেন আমায়, কিন্তু দূর থেকে কারো যেন জোরে হাসির শব্দ শোনা গেলো। আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম কাউকে দেখতে ফেলাম না। তখন ফুফু বললেন, ”

এই হিমু একদম হাসবি না, দেখছিস মেয়েটা পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে, তুই আবার হাসছিস?”

তখন খেয়াল করলাম আমার ঠিক মাথার উপর পেয়েরা গাছের ডালে বসে হিমু ভাই হাসছে। উনার হাসি দেখে লজ্জায় মাথা কাটা গেছে আমার। ইচ্ছে করছিল ছুটতে চলে যাই। কিন্তু সবার সামনে তা করা গেল না। আমি এই বাড়িতে প্রায় পনেরো বছর পর এসেছি। যখন ৬বছর বয়স ছিল তখন নাকি একবার এসেছিলাম। আমার অবশ্য মনে নেই, দাদুর কাছে শুনেছি।

সে-বার এসে নাকি হিমালয় ভাইয়ার পিছু পিছু সারাক্ষণ থাকতাম। তাই উনি নাকি দুষ্টুমি করে বলতেন তুই আমার বউ। সেজন্য পেছনে পেছনে ঘুরিস! আমি নাকি সেদিন থেকে ভাইয়াকে বলতাম আমি তোমার বউ। যখন দাদু ফুফু এসব বলছিলেন এতো লজ্জায় ইচ্ছে করেছিল,ইচ্ছে করছিল মাটির ভেতর ফাঁক করে ঢুকে যাই।

না তা আর করা গেল না। বুকের ভেতরটায় শব্দের গতি যেন বেড়ে গেল হাজার গুণে। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে মাথা ধরেছে বলে শুয়ে পড়লাম আমার জন্য নির্দিষ্ট করা রুমে।

সারাদিনে একবারও বের হলাম না। রাতে খেতে ডেকেছে তখনও বের হতে চাইলাম না। মাথা ব্যাথার অজুহাতে শুয়ে রইলাম ঘর অন্ধকার করে। দাদু অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও আমাকে উঠাতে পারলেন না, অগত্যা উনাকে চলে যেতে হলো। রাতে আমার কাছে ঘুমাতে চাইলেন কিন্তু আমি বললাম,
“তুমি অনেক দিন পর এসেছো, আজ ফুফুর সাথে ঘুমাও, গল্প করো দাদু,আমার সাথে তো সবসময়ই ঘুমাও।”

আমার কথাটা মনে ধরলো দাদুর, উনি চলে গেলেন। সে রাতে আমার ঘুম হলো না। কোনো এক অজানা কারণে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম আমি। এই যে এতো গুলো বছর দেখিনি বলে কী আজ এতো কষ্ট হচ্ছে আমার? জানি না কেন বুঝ হওয়ার পর থেকে হিমালয় নামটার বাইরে আমি যেতে পারিনি। স্কুল কলেজে সুন্দরী বলে সবসময়ই আমার একটা প্রসংশা ছিল, অনেক প্রেমের প্রস্তাবও পেয়েছি। কিন্তু কখনো মন টানেনি, মনে হতো আমার মন তো অন্য কারো কাছে বাঁধা পড়ে আছে।

যার ছবি আমি বড় হয়ে দেখিনি পর্যন্ত। ভাবছেন তথ্য প্রযুক্তির যুগে একটা ছবি জোগাড় করা কী এমন কঠিন কাজ! ঠিকই বলেছেন।

আসলে আমি দেখতে চাইনি। সেই ছয় বছর বয়সের পর থেকে ইচ্ছে করে দেখিনি তাকে। চার পাঁঁচবার এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে আমিই দেখা দেইনি। অবশ্য উনিও যে আমাকে খুঁজেছেন তা নয়। এসেছেন দাদুর সাথে দেখা করতে আবার চলেও গেছেন।আমিও তাই সামনে যাইনি কিংবা যেতে চাইনি। তার কারণ না হয় একটু পর জানলেন!

সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙে দেখলাম সবাই আমার বিছানার পাশে বসে আছে, সকলের কপালে চিন্তার ভাব স্পষ্ট । অবাক হলাম আমি! “কী ব্যাপার সবাই এভাবে বসে আছে কেন? ”

আমি উঠে বসতে যাব এমন সময় বুঝলাম উঠতে পারছি না, পুরো শরীর ব্যাথা হয়ে আছে। তখন ফুফু বললেন,

“উঠিস নারে মা, সারারাত যেভাবে জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিলি, আমি তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। কীভাবে মরার মতো পড়ে ছিলি তুই, রাত পার হয়ে দিনের তিনটে বাজে তাও তোর ঘুম ভাঙছে না দেখে খালাম্মা কাঁদতে কাঁদতে শেষ। ভাগ্যিস হিমু ছিল বলে বাঁচা গেছে, নয়তো কি যে হতো আল্লাহই জানে। এত রাতে তো আর ডাক্তার পাওয়া যেত না৷ ওহ আপনাদের তো একটা কথা বলাই হয়নি, হিমু ভাই তখন ডাক্তারি পড়া শেষ করেছেন।

দাদু তো কেঁদে কেটে গাল ফুলিয়ে ফেলেছে। কান্না গলায় বললেন, ” তোর এখন কেমন লাগছে রে জোনাকি?” বেশি খারাপ লাগলে বল আমি তোকে ডাক্তার খানায় নিয়া যাব। কয়দিনের জন্য গ্রামে আসলি তাও যদি এমন হয় তোর বাবা তো চিন্তা করে মারা যাবে। হিমু দাদুভাই ছিল বলে রক্ষে, সেই তো সারারাত তোর মাথার কাছে বসে ছিল। আমাকে আর রেহেনাকে বসতেই দিল না। তোর মাথায় পানি দিয়েছে, একটু পর পর তুই পানি চাইতি পানি খাইয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তোমারে বাঁচাই রাখুক ভাই।” লাস্টের কথাটা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হিমু ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন দাদু।

সবটা শুনে আমার হার্টবিট আরও কয়েক হাজার গুণ দ্রুত গতিতে বেড়ে গেল। হিমু ভাই আমার টেক কেয়ার করেছে! এটাও সম্ভব! বিস্ফারিত চোখে আমি একবার তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সাহেব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফোন গুতাচ্ছেন, একটা বার ফিরেও তাকাচ্ছেন না। খুব রাগ হলো আমার তাই আবার চোখ বুজে গেলাম। দাদু আবার ভেজা গলায় বললেন, “কিরে জোনাকি আবার কষ্ট হচ্ছে তোর? চোখ বুজলি কেন?”

বিষন্ন মন নিয়ে চুপ করে রইলাম আমি কথা বলতে ইচ্ছেই করল না। অনেক বছরের অভিমান জমে আছে। টের পেলাম কেউ আমার হাত ধরেছে মনে হলো এটাতো দাদুর হাত না, এই উষ্ণ হাতের স্পর্শটা মনে হলো অনেক পরিচিত। চোখ খুলে দেখলাম ডাক্তার সাহেব আমার প্রেশার মাপার জন্য মেশিন “স্ফিগমোমানোমিটার” হাতে লাগাচ্ছে। হলুদাভ মুখে খোচাখোচা দাড়ি তীক্ষ্ণ নাকটায় বিন্দু বিন্দু শিশিরের মতো ঘাম জমেছে দেখতে যে কী ভীষণ সুখ সুখ মনে হলো! আমার কল্পনায় আঁকা সেই মানুষটির মতোই হুবহু মিলে গেল। যার ছবি এই পনেরো বছরে একটু একটু করে এঁকেছি আমার মনের আকাশে।
এক ফলক দেখে আবার চোখ বন্ধ করে ফেললাম। সে-তো আমার দিকে তাকাচ্ছে না, তবে আমি কেন তাকাব?

কেমন গম্ভীর গলায় ফুফুকে বললেন খাবার নিয়ে আসতে। ফুফু খাবার নিয়ে এসে আমাকে ওঠাতে চেষ্টা করলেন, আমি খাব না বলায় একটা চিৎকারে সব ব্যাথা ভুলে আমি দপ করে বসে পড়লাম। তাকিয়ে দেখলাম হিমু ভাই আমাকে বলছেন, “এই মেয়ে তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও, তুমি কী মনে করেছো সারাদিন আমার কোন কাজ নেই? বসে বসে তোমার সেবা করব? তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও”।

এতো জোরে ধমক আমার বাবা-মাও কখনো দেয়নি। অভিমানের সাথে কষ্ট যোগ হলো। তার ফলস্বরূপ চোখে নোনা জল ঝরতে লাগল। ফুফু খাইয়ে দিবেন বলে যেই আমার কাছে আসছিলেন, হিমু ভাই বলল, ” আমার কাছে দাও মা, দেখো কীভাবে খাওয়াতে হয়,তোমারা আসলে আদর করে করে বাচ্চাদের বাঁদর বানিয়ে ফেলো। উত্তম-মধ্যম কয়েকটি পড়লে তবেই এরা ঠিক হবে। অবাক হলাম আমি একুশ বছরের একটা মেয়েকে কি-না বাচ্চা বলছে?

সেই প্রথম এক প্লেট ভাত খেলাম আমি। আমার মাও জীবনে এতোটা শাসন আমায় করেনি। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে দাদু ও ফুফু দুজন সেখান থেকে চলে গেলেন। কেউ কিছুই বললেন না! মনে মনে ভাবলাম কেন যে এখানে এসেছি! একে-তো পড়ে অসুখ বাধিয়েছি তার উপর এমন ধমকাচ্ছে, ইচ্ছে করছে বেটার ঘাড় মটকে দেই। এমন সময় ডাক্তার সাহেব বলল, “মনে মনে আমাকে গালি দিচ্ছো দাও, তবে এখানে যতদিন আছো ঠিকমতো খেয়ে নিবে। যদি তা না করো বুঝবো তোমার আমার হাতে খেতে ইচ্ছে করছে বুঝলে?
আমি ভাত ভর্তি মুখ নিয়ে উপর-নিচ মাথা নাড়ালাম।

সাহেব হাত ধুয়ে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে চলে গেল। জানি না কেন আমার জ্বরটা একদম চলে গেল। একটু আগে যে রাগ-অভিমান, কষ্ট হয়েছিল তা এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেল। সন্ধ্যার দিকে অনেকটাই সুস্থ অনুভব করলাম আমি। সবাই উঠানে বসে নানা গল্প করছিলো। ওসব সাংসারিক গল্প আমার ভালো লাগছিল না, তাই আমি ছাদে চলে গেলাম, এসেছি পর্যন্ত ঘর থেকে আর বেরুতে পারিনি। এখন শীতল বাতাসে অনেকটা ভালোই লাগছে।

জোরে বাতাস বইছে দেখে মন আনন্দে নেচে উঠল,বরাবরই আমি প্রকৃতি প্রেমী, প্রকৃতি আমাকে পাগল করে দেয়। তাই দুহাত উঁচু করে কিছুটা সময় ঘুরতে লাগলাম, মনটা কেমন শান্ত হয়ে যাচ্ছিলো, নিজেকে মুক্ত পাখি মনে হচ্ছিল, কিন্তু বিপত্তি ঘটলো যখন ব্যালেন্স ঠিক রাখতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু খানিক বাদে বুঝলাম আমি পড়িনি কারো বুকের সাথে লেপ্টে আছি। সেই আগুন্তকের শরীর থেকে খুব সুন্দর পারফিউমের গন্ধ নাকে এসে লাগছে, চেনা পারফিউমের গন্ধ মনে হচ্ছে , দুপুরে যখন হিমু ভাই খাইয়ে দিচ্ছিলেন তখন লেগেছিল। কেমন যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো আমার। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেলো হাজার গুণে। মনে হলো এবার বোধহয় আমি অজ্ঞান হয়ে যাব। কীভাবে শক্ত করে ধরেছেন লোকটা আমাকে। এখন আমি যদি মরে যাই তিনিই তার জন্য দায়ী থাকবেন।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে আমি কেমন একটা সুক্ষ্ম সুখ অনুভব করতে লাগলাম। জানি না সে সুখের নাম কী! শুধু মনে হচ্ছিলো সময়টা এখানেই থেমে যাক। আমি এভাবেই থাকি অনন্ত কাল। কিন্তু না, আমার ভাবনায় কেরোসিন ঢেলে দিয়ে হিমু ভাই ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন আমায়। পুরাই বোকা হয়ে গেলাম আমি। আমি তো তাকে ধরতে বলিনি! ধরছেই যখন এভাবে ছুড়ে ফেলে দেয়ার কী মানে! রাগে, দুঃখে আমার কান্না পেয়ে গেল। কিন্তু তার সামনে যতটা সম্ভব কান্না চেপে রাখলাম। তিনি আমাকে বললেন, “ঠিক করে হাঁটতেও শিখনি? ধুমধাম পড়ে যাচ্ছো?”

নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না আমি বললাম, “আমি হাঁটতে না পারলেই বা আপনার কী? আপনাকে কেউ বলেনি আমাকে ধরতে।”

আমার কথা শুনে আগুন চোখে তাকালো সে আমার দিকে। চাঁদের আলোতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। ঝলঝল করছে তার আগুন লাগা চোখ দুটি! উঁহু মায়াবী চোখ দুটি!

আমাকে অবাক করে দিয়ে সেদিন তিনি আমার হাত দুটি পেছন থেকে মচকে ধরলেন। ব্যাথায় কুকড়ে গেলাম আমি। কিন্তু কোনো শব্দ করলাম না। এতক্ষণ আগে যে চেষ্টাটা করেছিলাম চোখের জল আটকে রাখতে, সেটা আর করা গেলো না। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। তিনি বুঝেছেন কি-না জানি না। তার এমন কান্ডে আমি খুব অবাক হলাম। এমনটা উনি কেন করলেন? কিছুই বললেন না তিনি। চুপচাপ নেমে গেলেন ছাদ থেকে। অপমানে, কষ্টে কেঁদেছি বসে আমি।

যে মানুষটাকে এতো বছর ধরে ভালবেসে আসছি। সে আমার সাথে এরূপ আচরণ কেন করছে? ভেবেছিলাম এখানে এসে তাকে আমার মনের কথা জানাব কিন্তু না, সে আর পারলাম কই! আমার সাথে কথা পর্যন্ত বলে না সে। তাই মনে মনে ঠিক করলাম তাকে আর কিছুই বলব না। যে আমার প্রতি এতটা উদাসীন তার কাছে ভালবাসার কথা প্রকাশ করে দুঃখ বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই হবে না। সেদিনও গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়লাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি হিমু ভাই আমার পাশে বসে আছেন। সময় দেখার জন্য ফোন খুঁজছিলাম। দেখলাম তখন রাত দুটো। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে! কি ব্যাপার কেন এসেছেন তিনি আমার কাছে!

#সবুজ_খামে_না_বলা_কথা

#প্রজ্ঞা_জামান_দৃঢ়তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here