সাঁঝেরবেলায় তুমি আমি পর্ব ১৬

0
66

#তাসনিম_তামান্না
#সাঁঝেরবেলায়_তুমি_আমি
#পর্ব_১৬

🍁🍁🍁

তেল নিয়ে আসার সময় ইটের মাঝ রাস্তায় একজন বয়স্ক মহিলাকে বসে থাকতে দেখ প্রমি এগিয়ে গিয়ে বলল

-একি আপনি এভাবে মাঝ রাস্তায় বসে আছেন কেনো? (প্রমি)

মহিলাটা মাথা তুলতেই। প্রমি থমকে গেলো? কাকে দেখছে ও? তাও এতো দিন পর? এ কি হাল ওনার? ও কি সত্যি দেখছে? কিন্তু প্রশ্ন হলো ওনি এখানে কি করছে?নিজের মনে প্রশ্নগুলো করলো কিন্তু একটার ও উত্তর মিললো না। প্রমির মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো

-দাদু… মনি (প্রমি)

পরক্ষণে ভাবলো ‘ওনি তো আমাকে চিনতে পারবে না সেই কতবছর আগে দেখ আর আমাকে মনে রাখার সময়ও নাই ওনার’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর করলো। অতঃপর নিজেকে সামলিয়ে বলল

-আপনি এখানে বসে আছেন কেনো? (প্রমি)

সাহেলা বেগম প্রমির দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে রাইলো। প্রমি অস্বস্তি নিয়ে বলল

-আপনার কোনো সমস্যা? পায়ে ব্যাথা পেয়েছেন? (প্রমি)

সাহেলা বেগম কোনা কথা না বলে প্রমির হাত ধরে চোখের পানি ফেলতে লাগলো। প্রমি কি হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছে না।

-একি আপনি কান্না করছেন কেনো? দয়া করে রাস্তা থেকে উঠুন! (প্রমি)

সাহেলা বেগম বিনাবাক্যে প্রমিকে ধরে দাড়ালো। প্রমি সাহেলা বেগমকে বন্ধ চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসালো।

-আপনি কোথায় যাবেন? (প্রমি)

সাহেলা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলল

-প্রমি দিদিভাই রে (সাহেলা বেগম)

প্রমি থমকে গেলো সাহেলা বেগমের সমধনে। মনে হাজারো প্রশ্নরা জল্পনা কল্পনা করছে। ওনি এখনো আমাকে মনে রাখছে? কিন্তু কেনো? এই মানুষটার প্রতি ওর ঘৃণা জন্মে আছে যা হাজার চেষ্টা করেও যেনো মুছে ফেলতে পারে না। কিন্তু এখন কেনো ওর সাহেলা বেগমকে দেখে মনের কোণে মায়া কাজ করছে? কেনো? প্রমি তাচ্ছিল্য হেসে বলল

-মনে রাখছেন তাহলে আমার কথা? আমি তো ভাবলাম আমাকে চিনতেই পারবেন না! যায় হোক আপনি থাকেন আমি যায়..(প্রমি)

প্রমি চলে আসতে গেলে সাহেলা বেগম প্রমির হাত ধরে আটকে দিয়ে গাঙ্গা গলায় বলল

-দিদিভাই আমি তোর লেইগা ঔ গ্রেরাম থেইক্কা হাইটা কষ্ট কইরা এইহানে আইছি রে বইন আমারে থুইয়া যাস না তোরে যে অনেক কথা কও ওনের আছে রে (সাহেলা বেগম)

প্রমি সাহেলা বেগমের কথা শুনে অবাক না হয়ে পারলো না! যেখানে ওনি এতো বছর খোঁজ নেই নি এমনকি তার ছেলেকেও আমার খোঁজ নিতে দেই নি সে কি না এখন ওর সাথে দেখা করতে আসছে আবার কাঁদছেও কেনো? এটা কি নতুন নাটক নাকি সত্যি। প্রমি মাথায় কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে যেনো সাহেলা বেগমের কথা কিছু বুঝতে পারছে না। প্রমি ভ্রু কুচকে বলল

-মানে আপনি কি বলতে চাইছেন? আর এতোদিন পরে কেনো আপনি আমার কাছে আসছেন আমার মাকে মেরে ফেলে শান্তি হয় নি আপনার এখন আমাকে মারতে চান? আচ্ছা আসেন আমাকে মেরে দেন আমি কিছু বলবো না। দয়া করে আপনার কুমিরের কান্না করা নাটক বন্ধ করেন (প্রমি)

সাহেলা বেগম কান্না করতে করতে বলল

-আমাকে ক্ষমা করে দে দিদিভাই আমাকে মাফ করে দে আমি যে অনেক বড় ভুল করেছি আমাকে মাফ করে দে

বলতে বলতে প্রমির পা ধরতে গেলো প্রমি বাঁধা দিয়ে বলল

-এসব কি করছেন আপনি? এইগুলা বেশি হয়ে যাচ্ছে না? (প্রমি)

-না রে দিদিভাই তুই ক আমি কি করলে তুই আমাকে ক্ষমা করে দিবি আমি তাই করবো (সাহেলা বেগম)

প্রমি অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল

-আমার মাকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন? (প্রমি)

সাহেলা বেগম এবার নিরবে কান্না করতে লাগলেন। কি বলবে ভাষা খুঁজে পেলো না। প্রমি সেটা দেখে বলল

-জানি পারবেন না হাহ যাকে মেরে ফেলেছেন তাকে কি ভাবে ফিরিয়ে দিবেন আমার কাছে! মৃত মানুষেরা তো ফিরে আসে না তাই আপনাকে ক্ষমা করার প্রশ্নই আসে না (প্রমি)

সাহেলা বেগম কোনো কথা বললেন না মাথা নিচু করে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলো। কিছুক্ষন নিরবতা কাটিয়ে প্রমি বলল

-আপনি বাসায় চলে যান (প্রমি)

সাহেলা বেগম এবার মুখ খুললো বলল

-তোর লগে আমার মেলা কথা আছে! একটু শুনবি দিদিভাই? (সাহেলা বেগম)

-আপনার কথা শুনার আমার ইচ্ছে বা শখ কোনো টাই নাই আপনি আসতে পারেন (প্রমি)

-শুন না দিদিভাই মৃত পথযাত্রীর কথা না শুনলে যে আমি মরেও শান্তি পাবো না (সাহেলা বেগম)

সাহেলা বেগমের কথা শুনে প্রমির বুকটা ধক করে উঠলো। প্রমি আতংকিত হয়ে প্রশ্ন করলো

-মানে (প্রমি)

-হ রে মুই আর বেশি দিন বাচুম না ডাক্তারে কইছে আমার অনেক বড় অসুখ হইছে

-কি হইছে আপনার

-রক্ত ক্যান্সার

প্রমি কি বলবে কিছু খুঁজে পেলো না। তাই কিছুক্ষণ নিরব থেকে বলল

-আসুন আমার সাথে
.
.
প্রমি যখন সালেহা বেগমকে নিয়ে বাসায় আসছিলো তখন টুম্পা রেগে সালেহা বেগমকে যা নয় তাই বলেছে। প্রমি আটকানোর চেষ্টা করছে কিন্তু সফল হয় নি সালেহা বেগমের সাথে প্রমিকের অনেক কথা বলেছে। সালেহা বেগমকে দেখা মাত্রই চাঁদনী বেগমের মধ্যে প্রমিকে ভয়েরা হানা দিয়েছে। প্রমি আসশ্বাস দিয়ে ও কাজ হয় নি। চাদনী বেগম সেই থেকে প্রমিকে চোখের আড়াল করে নি। সবসময় চোখে চোখে রেখেছে।
.
প্রমি এক আকাশ বিরক্ত আর কৌতুহল নিয়ে বসে আছে সালেহা বেগমের সামনে সাথে চাঁদনী বেগম।সালেহা বেগম কিছুক্ষণ নিরাবতা পালন করে বলতে শুরু করলো

-আমি জানি আমি অনেক বড় পাপ কইরাছি যে পাপের কোনো ক্ষমা হয় না তবুও ক্ষমা চাইতাছি। আমি জানি তোর মাকে কেনো মাইরাছি সেটা তুই জানিস না কিন্তু বিশ্বাস কর আমার কোনো হাত ছিলো না প্রিয়াকে(প্রমির মা) মারার আমি…. (সালেহা বেগম)

-আপনি কি বলতে চাইছেন আপনি আমার মাকে মারেন নি? এসব ভুল ভাল বুঝিয়ে লাভ নাই আমি জানি। চাচু আমাকে বলেছে আপনি আমার মাকে মারছে তাও আগুনে পুড়িয়ে (প্রমি)

শেষের কথাটা বলতে গিয়ে প্রমির গলা কাপলো। কান্না গুলা দলা পাকিয়ে আসছে।

-তোরে কি কইছে হৃদয় (প্রমির চাচা) যা কইছে সব মিছা কথা

-হ্যাঁ হ্যাঁ সব মিথ্যা। আপনি আমার মাকে মেরেছেন সেটাও মিথ্যা (প্রমি)

-প্রমি দিদিভাই আমার কথা কান শোন। হৃদয় আমাকে আর তোকেও সব ভুল ভাল বুঝিয়েছে তাই তো এতো বড় ক্ষতি হইলো (সালেহা বেগম)

-মানে কি বলতে চাইছেন আপনি?

-শোন আমি যে গুলা কমু তুই মন দিয়া শুনবি কোনো কথা কবি না।….আমি মানছি আমি প্রিয়াকে পছন্দ করতাম না কেনো যানিস তোর দাদা আর তোর বাপ পছন্দ করে নিয়ে আসছিলো তাই আমার কেনো জানি পছন্দ হই নাই। তার জন্য তোর মার লগে আমি খারাপ ব্যাবহারও করছি। কথায় কথায় খোঁটা দিয়াছি আমি মানছি এগুলা করছি কিন্তু বিশ্বাস কর আমি তোর মাকে মারি নি এসব হৃদয় করছে আমি এমন কিছু জানতাম না কিন্তু সেদিন যখন হৃদয় ফোনে কথা বলছিলো….

#ফ্ল্যাসব্যাক

-আইচ্ছা শোন যখন দেখবি আগুন লেগে গেছে ভালো ভাবে তহন আগুন আগুন কইয়া চেঁচাবি তার আগে না বুঝলি আর শোন রান্নাঘর ছাড়া বাড়িতে আগুন লাগার আগে পানি নিয়ে আসবি ঠিকাছে সব রেডি কইরা রাখছোস তো? (হৃদয়)

-হ্যাঁ আপনি টেনশন কইরেন না ওস্তাদ…….(চেলা)

ফোন রেখে পিছনে ফিরতেই সালেহা বেগমকে দেখে চমকে গেলো হৃদয়। আমতা আমতা করে বলল

-আম্মা তুমি এইহানে কি করো (হৃদয়)

-তুই কার লগে কথা কইতাছিলি সত্যি কইরা ক আমি কিন্তু সব শুনছি আগুন কি করবি (সালেহা বেগম)

-আম্মা তু তুমি…

-কইতা কইছি ক

হৃদয় শুকনো ঢোক গিলে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল

-আম্মা শোনো তুমি যহন অর্ধেক শুনাই ফেলছ তো শুরাডা শুনো… আম্মা ঔ চেয়ারম্যানের মাইয়া আছে না? ঔ মাইয়া রিয়াদ ভাইরে (প্রমির বাবা) মেলা ভালোবাসে গো আর কইছে যদি রিয়াদ ভাইয়ের সাথে ঔ মাইয়ার বিয়া দিতা পারি তাইলে মেলা টাহা দিবো। আর তুমি তো প্রিয়া ভাবিরে পছন্দ করো তাই ভাবছি প্রিয়া ভাবি রে মাইরা দিবো….. (হৃদয়)

-কি সব কইতাছোস তুই না না এইডা অপরাধ আর প্রিয়া মইরা গেলে প্রমির কি হইবো রিয়াদের কি হইবো ছেলেডা প্রিয়ারে খুব ভালোবাসে না না এসব কিছু করবি না তুই টাহার দরকার নাই (সালেহা)

-আম্মা তুমি প্রমি রে লাইয়া টেনশন কইরো না আর রিয়াদ ভাই রে আমার চেনা আছে নতুন বউ পাইলে পুরান বউরে ভুইলা যাইতে সময় লাগবো না। (হৃদয়)

-তাই বলে মাইয়াডারে মারার দরকার নাই (সালেহা বেগম)

-আম্মা তুমি বুঝতাছ না ভাবি রে বাচাই রাখলে ভাবি কোনো দিনও ভাইরে ছাইড়া সুখের সংসার ছাইরা যাইবো না। আর ভাবি না গেলা ভাই রে চেয়ারম্যানের মাইয়ার লগে বিয়াও দিতে পারবো না। আর তহন এতো গুলা টাহাও আসবো না

হৃদয় সালেহা বেগমকে আরো বুঝালো সালেহা বেগম সামনাসামনি রাজি হলেও মনের মধ্যে রাজি নয়।
.
হৃদয় কালরাতে সারা রান্না ঘরে কেরচিন দিয়ে রাখছিলো। আর কাঠও ছিলো। তাই আগুন ধরতে সময় লাগলো না। প্রিয়া রান্না জন্য আগুন জালাতে চারিদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়লো। প্রিয়া রান্নাঘর থেকে বের হওয়ার অনেক চেষ্টা করছিলো কিন্তু সফল হয় নি।

প্রমি স্কুল থেকে বাসায় আসতে দেখতে পাই নিজের মায়ের সাদা কাফনে মুড়ানো শরীর।

#বর্তমান

-বিশ্বাস কর আমি এমনটা করে নিজেই পরে বুঝতে পারলাম কতবড় পাপ কইরা ফেলছি যখন জানতে পারলাম হৃদয় জানতো প্রিয়ার কিছু হলে রিদয় আধমরা হইয়া যাইবো তখন ও নিজের নামে সব সম্পত্তি লিখে নিবে। আমি জানতাম না রে বইন আমাকে মাফ কইরা দে।

কথাগুলা বলে সালেহা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লো। প্রমির চোখ দিয়েও পানি পড়ছে। প্রমি বুঝতে পারছে চাচা সেদিন কান্না করে সালেহা বেগমের নামে মিথ্যা বলে প্রমির কানে বিষ ডুকিয়ে ছিলো আস্তে আস্তে সব পরিস্কার হতে লাগলো।

#চলবে
#Tasnim_Tamanna

[ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠন মূলক কমেন্ট করবেন। রি-চেক করি নাই ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here