সুপ্ত অনুভূতি পর্ব অন্তিম

1
96

#সুপ্ত_অনুভূতি
#মেহরাফ_মুন(ছদ্মনাম)
#পর্ব ৭(অন্তিম পর্ব)

লিয়া স্তব্ধ, আদ্রিয়াও তাঁকে এভাবে ছেড়ে চলে যাবে তা সে ভাবেনি। সে আদ্রিয়ার দিকে এক নজর তাকিয়ে দুহাতে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কেন হলো এমন? মুন আপুর মত আদ্রিয়াও দুইদিনের মধ্যেই এভাবে ছেড়ে চলে যাবে!
পাশেই আদ্রাফ দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না বাচ্চাটি কে হয়তো বা লিয়ার হতে পারে। আদ্রাফের ভীষণ খারাপ লাগছে এত্তো ছোট বাচ্চাটি সবাইকে ছেড়ে এভাবেই চলে যাবে।
তখন আদ্রাফ ক্যাবিনের সামনে এসেই দেখল লিয়া বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে কান্না করছে এরপর খুব দ্রুতই ডাক্তারের কাছে ছুটল। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই ‘দুঃখিত’ বলে দিল। প্র্যাগনেন্সি চলাকালীন সময়ও অনেক জার্নি আর অন্যান্যর জন্য বাচ্চাটিরও মায়ের মত অবস্থা।

লিয়া আদ্রিয়াকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষন এক নজরে তাকিয়ে রইল আদ্রিয়ার মুখের পানে। নীরবে চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে সে। কিছুসময় বাদে লিয়া আদ্রাফের সামনে গিয়ে আদ্রিয়াকে আদ্রাফের কোলে তুলে দিল। লিয়া আদ্রিয়ার দিকেই তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,

-‘শেষবারের মত আপনার শেষ অস্তিত্বকে দেখে নিন ভাইয়া।’

আদ্রাফ বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে চলে গেল। সে কোনোমতেই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠলো,
-‘শে শেষ অস্তিত্ব মানে?’

-‘মুন আপুর শেষ অস্তিত্ব,আদ্রিয়া ‘,লিয়া কোনোরূপ ভঙ্গিমা ছাড়াই বলল।

আদ্রাফ স্তব্ধ। এটা তাঁর মেয়ে? তাঁরই কলিজার টুকরো! তাঁদেরই ভালোবাসার টুকরো। তাঁর কলিজার টুকরোটা আর নেই, কী আফসোস! বাবা হয়ে তাঁর কলিজার নিথর দেহ হাতে। আদ্রাফ আদ্রিয়ার ছোট্ট দেহটা বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলো। তাঁর ছোট্ট কলিজাটা আর নেই এটা যেন আদ্রাফের বিশ্বাসই হতে চাইছে না। আদ্রাফ এক দৃষ্টিতে আদ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কী সুন্দর মায়াবী মুখশ্রী! একদম মুনের মতোই। মুনের কথা মনে পড়তেই আদ্রাফ চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল। মুনকে কোথাও না দেখে আদ্রাফ লিয়ার দিকে তাকালো।

-‘মুনপাখি,, মুনপাখি কই?’কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল আদ্রাফ।

লিয়া কোনো কথা না বলে আদ্রাফের কাছে গিয়ে বলল,’ভাইয়া উঠুন, আমার সাথে আসুন।’

আদ্রাফ লিয়ার কথা ভালোভাবে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

-‘মুন আপুকে দেখতে চেয়েছিলেন না? আসেন আমার সাথে।’

আদ্রাফ আদ্রিয়াকে বুকে জড়িয়েই হাটতে লাগলো। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না আদ্রিয়া আর নেই, তাঁর মনে হচ্ছে এইতো ঘুমিয়ে আছে তাঁর পরীটা।


আদ্রিয়াকে দাফনের পরেই আদ্রাফ ভীষণভাবে ভেঙে পড়লো।
লিয়া আদ্রাফকে নিয়ে আশ্রমের গেট দিয়ে ঢুকতেই কতগুলো বাচ্চা লিয়াকে এসে ঘিরে ধরলো।

-‘আমাদের বোন কই? লিয়া আন্টি।’ সবাই সমচ্চরে বলে উঠলো।

লিয়া হাটু মুড়ে বসেই কান্নায় ভেঙে পড়লো আর বলল,
-‘সেও তোমাদের মুন মার কাছে চলে গিয়েছে।’

বাচ্চাগুলো কী বুঝলো বোঝা গেল না। ওরা পথ ছেড়ে দিয়ে চলে গেল।

লিয়া উঠে দাঁড়িয়ে চোখ মুছে বলল,
-‘জানেন ভাইয়া? এটা আমাদের মুন আপুর আশ্রম। আপনাকে সারপ্রাইস দিবে ভেবেছিল কিন্তু আফসোস!’ লিয়া একটা মলিন হাসি দিল।

আদ্রাফ লিয়ার কথা কিছুই বুঝতে পারলো না। তাঁর
মাথায় কিছুই ঢুকছে না। মাথা ব্যথাটা আবার বাড়ছে। তাঁর চাঁদ কই! তাঁর এখন চাঁদকে ভীষণ প্রয়োজন।

লিয়া একটা রুমের ভেতর ঢুকে আদ্রাফের হাতে একটা চিঠি তুলে দিল। আদ্রাফ চিঠিটা হাতে নিয়েই বলল,’কী এটা? আর আমার চাঁদ কই?’

-‘আপনার চাঁদ আর নেই, মুন আপু এখন আকাশের চাঁদ হয়ে গিয়েছে, মুন আপু আপনার জন্য রেখেছিলো এটা ।’ লিয়া বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

আদ্রাফ থমকে গেল। কী বলছে লিয়া এটা! পাগল হয়ে গিয়েছে না কি? তাঁর এখন কেন জানি ভীষণ ভয় করছে। আদ্রাফ কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল,

‘প্রিয় আদ্রাফ,
নিশ্চই ভাবছেন এত কিছুর পরও প্ৰিয় কেন বললাম, তাই তো? আমি আপনাকে কোনদিন ভুল ভাবিনি আর ভাববোও না। সবকিছুর পরেও আপনি আমার প্রিয়ই থাকবেন অন্তত এই তিনবছরের জন্য হলেও। আপনার সাথে কাটানো এই তিন বছর আমার জীবনে সেরা দিন ছিল। অনেকদিন আপনাকে ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমি বরাবরই ব্যর্থ আদ্রাফ। আপনাকে আমি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারিনি তাই তো আজ অনেকদিন পর এসে চিঠি লিখতে বসলাম কারণ কেন জানি মনে হচ্ছে আমি আর আপনার সাথে সেই সুখের দিনগুলোর মত আর কোনো সময় পাবো না। আপনি হয়তো বা ভালোই আছেন তাই আর আলাদা করে জিজ্ঞেস করিনি। জানেন? ডাক্তার বলেছেন আমার একটা ফুটফুটে মেয়ে হবে। আমি তো সেই খুশি হয়েছি খবরটা শুনে কিন্তু এরপর বলেছেন এভাবেই যদি চলতে থাকি তাহলে আমার রিস্ক আছে। কিন্তু কী করব বলেন? আমি এত মাসুম বাচ্চাগুলোর মা হয়েছি মাঝপথে ওদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য না কি? আমি যদি চাকরি না করি তাহলে তারা কীভাবে চলবে? আচ্ছা এসব বাদ দেন, বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, অনেকদিন আপনার সাথে কথা হয়নি তাই ইচ্ছে করছে ডাইরি নিয়ে সব লিখে ফেলি। আচ্ছা আপনার কী আমাকে মনে পড়ে আদ্রাফ? আমার ভীষণ মনে পড়ে আপনাকে। আমার হৃদয়ে যে শুধুই আপনার নাম কোদায় করা ‘মুনের-আদ্রাফ ‘। জানেন? আমি আমাদের মেয়ের জন্য একটা নাম ঠিক করেছি, সেটা হলো ‘আদ্রিয়া’। নামটা সুন্দর না? আপনার আদ্রাফের সাথে মিল রেখে এই নামটা। আজকে ভীষণ দুর্বলতা গ্রাস করেছে, ঝাপসা ঝাপসা লাগছে সব। ইদানিং বাচ্চাগুলোর সাথেও তেমন কথা বলতে ইচ্ছে হয় না, তারা তো বেজায় রাগ কারণ তাঁদের মুন মা না-কি তাঁদের আর দেখতে পারে না। আচ্ছা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম এই আশ্রমটা করার পিছনে পুরো ক্রেডিট কিন্তু আপনার।’ফারহান আদ্রাফের’ উড়ফে ‘মুনের আদ্রাফের’। ভেবেছিলাম এই আশ্রমটা করার কয়েকদিন পর আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে আপনাকে সারপ্রাইস দিব। যখন বাচ্চাগুলো দেখবেন তখন আমাদের মধ্যে আর অপূর্ণতা অপূর্ণতা লাগবে না। অনেক বেশি বলে ফেলেছি আজ। ইদানিং যেদিকেই তাকাই আপনার প্রতিচ্ছবি ভাসে চোখের সামনে তাই লিখছি। ইদানিং ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে আপনার কাছে গিয়ে আপনার বুঁকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। কতদিন আপনাকে দেখা হয়না, কতদিন আপনার মুখ থেকে চাঁদ শোনা হয় না। জানি না এটা আপনার হাতে পড়বে কী না! আর যখন পড়বে তখন হয়তো আমি আর থাকবো না। এই কাঁদবেন না একদম আমার জন্য। আপনি কাঁদলে আমি কিন্তু ওই দূর আকাশ থেকে দেখবো, তখন আমার ভীষণ খারাপ লাগবে। আমার আদ্রিয়া মাকে দেখে রাখিয়েন। আশ্রমের বাচ্চাগুলোকেও দেখিয়েন একটু। আপনাদের উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই, ক্ষমা করে দিয়েছি। আমার ভালোবাসায় হয়তো কোনো ঘাটতি ছিল তাই অপূর্ণই থেকে গেল। ভালো থাকবেন, নিজের যত্ন নিয়েন প্ৰিয় আদ্রাফ।

মুন’

চিঠিটা পড়েই আদ্রাফ স্তব্ধ। মনে হচ্ছে যেন সবকিছু থমকে গেল আদ্রাফের। তাঁর মুনপাখি আর নেই! আদ্রাফ হাটু মুড়েই বসে পড়লো। কান্নায় ভেঙে পড়লো। কাকে সে ‘চাঁদ’ বলে ডাকবে? এভাবেই অভিমান করে চলে গেল। আদ্রাফ যা কিছু সামনে পাচ্ছে সবকিছুই ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে। তাঁর চাঁদ যে তাঁকে এভাবে একা করে দিয়ে চলে যাবে তা কোনোদিন কল্পনাও করেনি আদ্রাফ। মুণপাখির এত তাড়া ছিল যে সত্যিটাও জেনে গেল না! ভীষণ মাথা ব্যথা করছে। একসময় আদ্রাফ ওখানেই চিঠিটা হাতে মুঠোবন্দী করেই লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। লুটিয়ে পড়ার পরও এক দৃষ্টিতে তাঁর হাতের চিঠিটার দিকেই তাকিয়ে রইল। চোখ দিয়ে অঝোরো ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে। একসময় স্থির হয়ে গেল, আঁখিযুগল বন্ধ হয়ে গেল আদ্রাফের।

———————–

কেটে গেল একটি বছর। সময় নিজ ধাপেই বহমান। কারো জন্যই থেমে থাকে না। লিয়া দাঁড়িয়ে আছে আদ্রাফ, মুন আর আদ্রিয়ার কবর থেকেই একটু দূরে। সেদিন আদ্রাফ চিঠিটা পড়েই সেন্স হারিয়ে ফেলেছিলো। ডাক্তাররা তাঁকে বেশি চাপ নিতে বারণ করেছিল কারণ কিছুদিন আগেই তার অপারেশন হয়েছিল। অবস্থা খারাপ দেখে সাথে সাথে হাসপাতালে এডমিট করা হয়েছিল আদ্রাফকে। সেই রাতেই সে সব ছেড়ে তার মুণপাখির কাছে পাড়ি জমায়। এত ভালোবাসা তাঁদের দুজনের মধ্যে অথচ কেউ কারোরটা জানতো না। দুজন দুজনকে দুমেরু থেকেই ভালোবেসে গিয়েছিল। লিয়ার চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছে। অদূরেই ওদের কবরের সামনে লিয়ার স্বামী শুভ্র দাঁড়িয়ে জিয়ারত করছে। লিয়ার স্বামী এসে ডাক দিতেই লিয়া ফিরলো। শুভ্র মুচকি হেসেই বলল,

মুন আপু আর আদ্রাফ ভাইয়ার ভালোবাসা খাঁটি বলেই ওরা একজনের কাছ থেকে আরেকজন আলাদা থাকতে পারেনি। দেখো, কী সুন্দর ঘুমিয়ে আছে তিনজনই একসাথে।
মুন আদ্রাফ এই দুটো নর-নারীর ভালোবাসা মানে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছে। ভালোবাসা হচ্ছে আফসোস, ভালোবাসা হচ্ছে দীর্ঘশ্বাস, ভালোবাসা মানে অপূর্ণতা, ভালোবাসা মানেই মুন-আদ্রাফ। সবার ভালোবাসা পূর্ণ পায় না তেমন মুন-আদ্রাফেরটাও পায়নি হয়তো বা নিয়তি সহায় হয়নি তাই তো দুজন দু’প্রান্ত থেকে এত ভালোবাসার পরও পূর্ণ পেলো না।লাভ দ্যট মিন্স,

L=lake’s of sorrows(দুঃখের সাগর)
O=Ocean of tears (অশ্রু মহাসাগর)
V=valley of death (মৃত্যু উপত্যকা)
E=End of life (জীবন শেষ)

–সমাপ্ত—-
(আসসালামু আলাইকুম। সম্পূর্ণ গল্পটাতে যাঁরা সাপোর্ট দিয়েছেন তাঁদের জন্য অসংখ্য ভালোবাসা 💙 কেমন হয়েছে জানাবেন। আমার অনুসারে গল্পটার এন্ডিং এভাবেই সুন্দর। দেখা হবে খুব তাড়াতাড়ি নতুন গল্পে ইনশাআল্লাহ। ভালো থাকবেন )

1 COMMENT

  1. গল্পটা পড়ে আমার চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছে 😭😭😭😭😭😭😭 আমি আরও অনেক অনেক গল্প পড়েছি কিন্তু এইটা সবগুলোর থেকে আলাদা একবারে আলাদা। খুব সুন্দর হয়েছে গল্পটা ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here