সুপ্ত অনুভূতি পর্ব ২

0
103

#সুপ্ত_অনুভূতি
#মেহরাফ_মুন(ছদ্মনাম)
#পর্ব ২

দরজা ধাক্কানো শুনে মুন দরজা খুলেই দেখতে পেলো আদ্রাফ ভাতের প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আদ্রাফকে দেখেই মুন মুখ ঘুরিয়ে নিলো।

-‘রাগ করেছো? রাতে খাবে না? তুমি জানো না, না খেলে শরীর খারাপ করবে? নাও, খেয়ে নাও।’আদ্রাফ বলল।

-‘এখন আমার কথা আর আপনার ভাবতে হবে না। অন্য কাওকে আমার সেই জায়গাটা দিয়ে ফেলেছেন। চলে যান আপনি।’ মুন কান্না আটকিয়ে বলে উঠলো।

আদ্রাফ কিছু না বলেই হাত ধুয়ে এসে মুনকে ধরে বিছানার উপর বসিয়ে দিল। খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়েই মুনের মুখের সামনে লোকমা ধরলো। মুন খাচ্ছে না দেখে ধমকে বলে উঠলো,

-‘তুমি জানো, আমার রাগ উঠলে নিজেকে আয়ত্তে রাখতে পারি না। খাবে না-কি কিছু একটা করব আমি?’

আদ্রাফের রাগ সম্পর্কে মুন আগে থেকেই অবগত। তাই চুপচাপ খেয়ে নিলো। খাওয়ার সাথে সাথেই মুন ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিল। মুনের দৌড়ে যাওয়া দেখেই আদ্রাফ তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো। আদ্রাফের হঠাৎ খারাপ লেগে উঠলো। মেয়েটা কী অসুস্থ? না, ওর তো এরকম প্রায় হয়। হয়তো বা এমনি জোর করে খাওয়ার জন্য হয়েছে।
বমি করে এসেই মুন শুয়ে পড়লো। আদ্রাফ সব পরিষ্কার করে এসে মুনের পাশে বসলো। মুন তা দেখে অন্যপাশে মুখ ঘুরিয়ে রাখলো। তা দেখেই আদ্রাফ মুচকি হেসে বলল,

-‘আমার দিকে তাকাতেও এখন ঘৃণা করে , তাই না?’

-‘আপনি আপনার ডিভোর্স লেটার ঠিক সময়ে পেয়ে যাবেন। আমি বুঝেছি, আপনি আপনার কথা রাখার জন্য আমাকে ডিভোর্স দেননি। কারণ আমার এই বাড়ি ছাড়া যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। আপনি একদিন বলেছিলেন, সারাজীবন আমার পাশে থাকবেন, এই হাত ধরেছিলেন কিন্তু আপনি আপনার এই সব কথা যখন রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন তাই ডিভোর্স এর জন্য কেন আর আটকে থাকবেন? বলুন।’

-‘তুমি চাইলে নেহার সাথে মিলেমিশে একসাথে থাকতে পারো। ডিভোর্স না দিয়েই।’

মুন তাচ্ছিল্যভরা হাসি দিয়েই বলে উঠল,
-‘হ্যাঁ, আমি চাইলে? কেন আপনি কী এখন আর আমাকে চান না?’

আদ্রাফ বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বলে উঠলো,
-‘উফফ মুন, তুমি সবসময় একটু বেশিই করে ফেলো।’

-‘আজকে আপনাদের বিয়ের প্রথম রাত। পাশের রুমে আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী আপনার অপেক্ষায় আছে, যান।’ মুন বেদনাভরা চোখে বলল।

আদ্রাফ মুনের কথা শুনেই মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসতে নিলেই দরজার সামনেই পেছনে থেকে মুনের কথা দাঁড়িয়ে গেল।

-‘অভিনন্দন জানানো হয়নি আপনাদের। অভিনন্দন দুজনের জন্য। দোয়া করি, সারাজীবন যেন একসাথেই বাঁচতে পারেন, কথা দিয়ে কথা রাখিয়েন। আশা করি সুখে থাকবেন। শুভকামনা রইল।’ এই বলেই মুন আদ্রাফের মুখোমুখি এসেই দরজা বন্ধ করে দিল।

আদ্রাফ কিছুক্ষন মুনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর নিজের রুমে চলে গেল। তাঁর হঠাৎ করে ভীষণ খারাপ লেগে উঠলো। মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলতে চলেছে সে। মুনের জন্য ভীষণ খারাপ লাগছে তাঁর। মেয়েটা বিয়ের পর একটা রাতও আদ্রাফকে ছেড়ে থাকেনি আজ কীভাবে পারবে? হয়তো বা সারারাত কান্না করবে। কিন্তু আদ্রাফেরই বা এই ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাঁর ফাঁকা ফাঁকা লাগছে ভীষণ।

——————————

মুন দরজা বন্ধ করে এসেই মেঝেতে বসে পড়লো। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে তাঁর। আদ্রাফ কীভাবে পারলো এই কাজটা করতে? তাঁরই পাশের রুমে হয়তো বা আদ্রাফ এখন অন্য নারীতে নিজের সুখ খুঁজে নিচ্ছে। ‘অন্য নারীতে’ এটা ভাবতেই সব কান্নারা যেন গলায় এসে আটকে গেল। মুন কীভাবে থাকবে আদ্রাফকে ছাড়া? এই দিনটা দেখবে কোনোদিন কল্পনাও করেনি মুন। আর নেহা কীভাবে পারলো এভাবে বোনের সমান বান্ধবীটার সাজানো-গুছানো সংসারটা এক মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দিতে? এসব ভাবতে ভাবতেই মুনের চোখ গড়িয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। মুন চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। সে আর কাঁদবে না, কাঁদবে না বলে তবুও কান্না চলে আসে। মুন উঠেই আলমারি খুলল। তাঁর এখনো অনেক পথ চলার বাকি আছে। মুন নিজের পেটের উপর হাত রেখেই বিড়বিড় করে বলে উঠলো,’তুই চিন্তা করিস না সোনা, তোকে এসবের ছায়াও পরতে দিব না। অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাব তোর এই মা। মায়ের উপর ভরসা রাখ সোনা।’ বাচ্চার কথা ভাবতেই আবারও চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরতে লাগলো। মুন আলমারি থেকে আদ্রাফ আর তাঁদের বিয়ের বাঁধায় করা ছবিটা হাতে নিলো। হাজারো হলেও তিন বছরের ভালোবাসা তাঁদের। কেমনে ভুলবে এত সুখের সময়গুলো মুন? ওইরুম থেকে জিনিস আনার ফাঁকে এটাও নিয়ে এসেছিলো মুন। এটাও সাথে করে নিয়ে যাবে সে। প্র্যাগনেন্সি রিপোর্টটা রুমের টেবিলের উপর রেখে দিল। এটা আদ্রাফের দেখা উচিত। সবকিছু গুছিয়ে নিয়েই শেষবারের মত বাড়িটা দেখে নিলো মুন। হয়তো বা পাশের রুমেই আদ্রাফ মুনের এই বাড়ির প্রথম দিনের মত অন্য নারীর সাথে ভালোবাসাময় কতপকথন করছে। আচ্ছা, কাল সকালে যখন আদ্রাফ উঠেই মুনকে এই বাড়ি আর দেখবে না তখন কী তাঁর খারাপ লাগবে? না-কি খুশি হবে? আর নেহা আর শাশুড়িমাও বা কেমন করবে? হয়তো অনেক খুশি হবে, বলবে, যাক আপদ নিজে থেকেই বিদায় হলো। মুন তাঁর কাপড় আর তাঁদের বিয়ের ছবিটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল ওই বাড়ি থেকেই। মাত্রই ভোর ফুটতে শুরু করেছে। রাস্তায় এসেই শেষবারের মত বাড়িটাকে দেখে নিলো সে। মনে পড়ে গেল, এই বাড়িতে প্রথম দিনগুলো। কতই না সুখের ছিল সেই দিনগুলি। সময়ের ব্যবধানে সব হারিয়ে গেল। মুন বাড়িটার দিকেই তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো,’ক্ষমা করে দিলাম তোমাকে আদ্রাফ। ক্ষমা করে দিলাম আম্মা, নেহাকেও। আসলেই সব পরিস্তিতির চাপে হয়েছে। তোমাকে তো আমি কোনোদিনও ভুল বুঝতে পারবো না কারণ তুমিই যে আমার একমাত্র প্রথম আর শেষ ভালোবাসা। মন থেকেই দোয়া করি, ভালো থেকো আদ্রাফ। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, এই জীবনে তোমার সাথে যেন আমার আর দেখা না হয়। নিজের খেয়াল রেখো আদ্রাফ।’ কান্নাচোখে এসব বলেই মেইন রাস্তার দিকে অগ্রসর হলো মুন। একদম সকালেই একটা বাস যায় এদিকে। এটাও আদ্রাফের কাছ থেকে জানা। মুন তাড়াতাড়ি স্টেশনে গিয়ে দেখল বাসটা আছে, ছাড়বে কিছুসময়ের মধ্যেই। মুন উঠেই বসে পড়লো ওই গাড়িতে। এই প্রথম আদ্রাফকে ছাড়া একা কোথাও পাড়ি দিচ্ছে। এখন তাঁর একমাত্র আশ্রয়স্থল হচ্ছে ঢাকার অদুরেই একটা আশ্রম। এটা মুনের নিজেরই খোলা। যখন কোনো বাচ্চা হচ্ছে না তখন মুন অসহায় বাচ্চাদের জন্য এইটা বানিয়েছে দেড়বছরেই একটু একটু করে। এটার সম্পূর্ণ ক্রেডিটই আদ্রাফের। সে বিয়ের পর মুনকে ব্যাংক একাউন্ট খুলে দিয়েছিলো। নিজ দায়িত্বে আদ্রাফ তাঁর মাসবেতন থেকে মুনের একাউন্ট এ টাকা দিতো। মুন বারণ করলে আরও হেসে বলতো মেয়েদের অনেক কিছু করার ইচ্ছে থাকে,’ সব কী আর জামাইর থেকে পারমিশন নিয়ে করতে হয় না কি? তুমিও কিছু একটা করবে এই টাকা দিয়ে আমার বিশ্বাস।’ ঠিকই মুন করেছিল এটা, ভেবেছিলো বিয়ের দুইবছর বিবাহবার্ষিকীর পর আদ্রাফকে এখানে এনে সারপ্রাইস দিবে। আর এত্তোগুলো বাচ্চা যখন আদ্রাফ-মুনকে মা-বাবা ডাকবে তখন তাঁদের আর কোনোকিছুই অপূর্ণ অপূর্ণ মনে হবে না। এটা ঠিকই করেছিল কিন্তু আদ্রাফকে আর সারপ্রাইস দেওয়া হলো না। এখন থেকে ওই আশ্রমই মুনের বাড়ি। মুন এসব ভাবতে ভাবতেই চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে বাইরে থাকিয়েই তাঁর প্রিয় জায়গাটা শেষবারের মত দেখে নিলো।

——————————–

সকালে উঠেই আদ্রাফ স্বভাব অনুযায়ী তাঁর ডান পাশে তাকালো। তাকিয়েই দেখল জায়গাটা খালি, প্রতিদিনই এই জায়গায় মুনের মুখটা দেখা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তাঁর হঠাৎ করেই বুকটা চিনচিন করে উঠলো। ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো রুমটা। নেহা এসেই আদ্রাফের সামনে হাঁপাতে লাগলো। আদ্রাফকে মুন নেই বলতেই আদ্রাফ তাড়াতাড়ি করে উঠে সেই রুমে গেল। রুমে গিয়েই টেবিলের উপর চোখ পরতেই থমকে গেল। আদ্রাফ রিপোর্টটা নিয়েই মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লো। খুব বড়ো কিছু হারিয়ে ফেলছে মনে হচ্ছে আদ্রাফের। মুন এভাবেই তাঁকে ছেড়ে চলে যাবে ভাবেনি আদ্রাফ।

#চলবে ইনশাআল্লাহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here