সুপ্ত অনুভূতি পর্ব ৩

0
74

#সুপ্ত_অনুভূতি
#মেহরাফ_মুন (ছদ্মনাম)
#পর্ব ৩

আদ্রাফ সেই রুমটাতে ঢুকেই স্তব্ধ হয়ে গেল। টেবিলের উপরে মুনের প্র্যাগনেন্সি রিপোর্টটা ঝলঝল করে উঠলো। ঐটা হাতে নিয়েই মেঝেতে ধপ করে বসে পড়লো। হঠাৎ করে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো, সবকিছুই যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মুন এভাবে আদ্রাফকে ফেলে চলে যাবে তা কোনোদিন কল্পনাও করেনি। অবশ্য এটাই তো চেয়েছিলো আদ্রাফ , যাতে মুন তাঁকে ঘৃণা করে ফেলে চলে যায়। তবুও কী যেন নাই নাই মনে হচ্ছে। মেয়েটা কই গেল, এই জীবনে মেয়েটার তো আপন-জন কেউই নেই। মুনের সাথে সাথে তাঁর অস্তিত্বকেও হারিয়ে ফেলল আদ্রাফ। এই সময় মেয়েদের পাশে তাঁর সব আপন-জন্ থাকে কিন্তু কী দুর্ভাগ্য মুনের, মেয়েটার পাশে কেউ নেই আরও একা হয়ে পড়েছে। মুনের কথা ভাবতেই চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। পুরুষ মানুষের না-কি কাঁদতে নেই! কে বলেছে এই কথা? কষ্ট পেলে ঠিকই কান্না আসে, তাঁদের মনেও তো ঠিকই কষ্ট পায়। আজ তাঁর অস্তিত্বকে সে হারিয়ে ফেলল। কিন্তু এইটা ছাড়াও যে আর কোনো উপায় ছিল না আদ্রাফের। সে তো চায়নি মুনকে হারাতে। নিয়তি যে বড়ই নিষ্ঠুর। আদ্রাফ রিপোর্ট নিয়েই রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। আর ওর যাওয়ার পানে নেহা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। নিয়তি এমন কেন?

————————–

মুনের আশ্রমে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর ঘনিয়ে এলো। এই জায়গাটা শহর থেকে একটু দূরেই। একটু নীরবই বলা যায়। মুন আশ্রমের গেট দিয়েই ঢুকতেই প্রায় ২০-২৫টা বাচ্চা মুনের দিকে এগিয়ে এলো। বাচ্চাগুলো ‘মুন মা’ বলে হাঁক ছেড়ে দৌড়ে জড়িয়ে ধরলো মুনকে। মুনকে একে একে সব বাচ্চা নালিশ দিতে লাগলো, মুনের উর্দুমানে কে কাকে মেরেছে, কে কাকে খেলায় নেয় নাই, সব কথা নিয়ে বাচ্চাগুলো মুনকে ঘিরে ধরলো। বাচ্চাগুলো এমনই করে মুন আসলে, একদিনেই সব নালিশ দিয়ে ফেলবে, আর মুনও শান্তি মাথায় তা বোঝায় ওদের। ওরা যে মুনকে আরেকটা মা হিসেবে মানে। মেহু আশ্রমের বাইরে গেটের দারে মুনকে দেখেই বাচ্চাগুলোকে খাওয়াতে পাঠিয়ে দিল। লিয়া মুনের কাছে ব্যাগ দেখে বলে উঠলো,

-‘আরে আপু যে! এই অসময়ে তো আপনি আসেন না আপু। আজকে থাকবেন এখানে, ব্যাগ নিয়ে আসছেন যে আপু?’

-‘হ্যাঁ, আজ থেকে এটাই আমার একমাত্র আশ্রয়স্থল মেহু।’ মুন অদূরেই তাকিয়ে মলিন হেসে বলে উঠলো।

লিয়া কিছু বুঝতে না পেরে মুনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মুন তাঁর চাহনি দেখে বলে উঠলো,

-‘পরে বলবো সব। এখন আমাকে কী এখানেই দাঁড়িয়ে রাখবে লিয়া?’

লিয়া তা শুনেই লজ্জায় কুঁকড়ে গেল, তাড়াতাড়ি মুনের কাছ থেকে ব্যাগ নিয়ে বলে উঠলো, ‘আসেন আপু।’

লিয়া মেয়েটার কেউ নেই। ভার্সিটিতে পড়াকালীন মেয়েটার সাথে পরিচয় মুনের। বাবা-মা কেউই নেই। ছোট থেকেই আশ্রমে বড় হয়েছিল। এরপর দুই-তিনটা টিউশন করে একটা হোস্টেলে থাকতো। মুন যখন অনার্স ফাইনাল দিবে তখন লিয়া মাত্রই অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে এডমিট হয়েছিল। একই কলেজের হওয়ার সুবাদে আদ্রাফও চিনতো লিয়াকে মুনের জন্য। আদ্রাফকেও ভীষণ সম্মান করতো লিয়া ভাইয়ের মত করে আর আদ্রাফ বোনের মত লিয়াকে স্নেহ করতো। তাঁদের সম্পর্কটাও ভাই-বোনের মত অনেক সুন্দর ছিল। তখন থেকেই একটু-আধটু কথা বলতে বলতে তাঁদের মধ্যে বোনের মত একটা সম্পর্ক এসে গিয়েছিল। ভীষণ ভালো মনের মেয়েটা। এরপর মুনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও লিয়ার সাথে যোগাযোগ ছিল কিন্তু আদ্রাফের ব্যস্তটার কারণে ওর সাথে আর হয়নি। মুন যখন আশ্রম খুলল তখন লিয়াকে বলল এই ব্যাপারে, লিয়াও রাজী হয়ে গেল। এরপর আশ্রমের দেখা-শোনা সব লিয়াই করতো। সেও পড়ালেখার ফাঁকে একটা পার্টটাইম চাকরি করতো, ওখান থেকে কিছু টাকা আশ্রমের বাচ্চাদের জন্য খরচ করতো আর বাকিটাকাগুলো মুনই দিতো প্রতি মাসে মাসে।

মুনকে লিয়ার ছোট রুমটাতে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বলল ফ্রেশ হয়ে নিতে, সে খাবার আনছে। মুন গিয়ে বিছানার উপর বসলো। ভাবতেই এক অন্যরকম লাগছে মুনের, আদ্রাফকে আর দেখা হবে না। প্রতিদিন আদ্রাফ অফিস থেকে এসে মুনের খোঁপায় বেলি গুঁজে দিবে না, আদ্রাফের কাছে আর কোনোকিছুর আবদার করতে পারবে না। আজকের পর প্রতিটা রাতই আদ্রাফকে ছাড়া থাকতে হবে। আজকের পর আর কেউ তাঁর অভিমান ভাঙাতে আসবে না। সে কী আদ্রাফকে কোনোদিন ভুলতে পারবে? তাঁর এখনো মনে হচ্ছে আদ্রাফ তাঁকে ভালোবাসে, নাহলে কাল রাতে খাবার আনতো না। মুন একটা মলিন হাসি দিয়ে আপন মনেই বিড়বিড় করে উঠলো,’হয়তো এতদিনের মায়া ভুলতে পারেনি।’ কী হবে তাঁর বাবুর? সে কী তাঁর বাবুকে বাঁচাতে পারবে এই সবকিছু থেকে? এসব ভাবতে ভাবতেই সব কান্নারা যেন গলায় এসে আটকে গেল। মাথাটা ভার হয়ে আসছে। গা গুলিয়ে উঠলো, সে মুখ চেপে ধরেই ওয়াশরুমের দিকে ছুট লাগালো।

লিয়া খাবার নিয়ে এসেই দেখতে পেলো মুন ওয়াশরুমের দরজা হেলান দিয়ে বসে আছে আর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, মুখটা কেমন জানি ফোলা ফোলা লাগছে। লিয়া দৌড়ে এসেই মুনের কাছে বসে পড়লো,’আপু কী হলো আপনার?’

মুন লিয়ার দিকে তাকিয়েই লিয়াকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো।

-‘আমার নিয়তিটা এমন নিষ্ঠুর ক্যান হলো বোন?’

সব শুনে লিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ভাবেনি আদ্রাফ এমন। আদ্রাফ কেন এমন করল মুন আপুর সাথে? তাঁর নিজেরও এখন ভীষণ খারাপ লাগছে মুনের জন্য।

সেইদিনটা বাচ্চাদের সাথেই হাসি-খুশিভাবে কেটে গেল মুনের। রাতে মুন শোয়ার বিছানা গুছাতেই দেখল লিয়া মাথা নিচু করে হাত কচলে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো।

-‘কী লিয়া, শুবে না? আসো।’ মুন বলল।

-‘আসলে আপু…’ লিয়া নিচের দিকে তাকিয়েই হাত কচলাতে লাগলো।

মুন লিয়ার সামনে এসেই মুচকি হেসে বলল,
-‘হ্যাঁ বলো, কিছু কী বলতে চাও?’

-‘আপু, আশ্রমের বাচ্চাদের খাবার প্রায় শেষের পথে। আমি আপনাকে কল করতে চেয়েছিলাম কিন্তু দেখি আপনি চলে এসেছেন। আর কয়েকদিন হবে খাবারগুলো মাত্র। আপনিও এই অবস্থায়, খারাপ লাগছে ভীষণ।’ লিয়া মাথা নিচু করেই বলে উঠলো।

-‘আরে টেনশন করিও না, আপু আছি না। তুমি শুধু এদিকের দেখাশোনা ভালো করে করবে। আমি কালই চাকরির খোঁজে বের হবো। সার্টিফিকেট নিয়ে আসছি আমি।’ মুন মুচকি হেসে বলল।

-‘কিন্তু আপু, আপনি এই অবস্থায় চাকরি?’ লিয়া বলল।

-‘আরে সমস্যা নেই, দেখি কী হয়, তুমি শোও এখন। বাচ্চারা শুয়ে পড়েছে?’

-‘জি আপু।’

দুইজনেই শোয়ার পড়েই মুন ঐপাশে ফিরেই কেঁদে উঠলো। তাঁর নিয়তিটা এমন হবে ভাবেওনি। যতই লিয়ার সামনে মেয়েটার টেনশন কমানোর জন্য শক্ত থাকুক না কেন ভেতরে ভেতরে সে যে গুড়িয়ে যাচ্ছে একদম। কই খুজবে সে চাকরি? আর এখন বা কোনোমতে চলে গেলেও পাঁচ-ছয়মাসের সময় কী করবে সে? ঘুম যেন ধরায় দিচ্ছে না এসব ভাবতে ভাবতে। কী করবে সে? কেমন করে এই আশ্রমটা চালিয়ে নিবে মুন? চোখ বন্ধ করতেই দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো মুনের।

——————

আদ্রাফ সেই সকালে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছিল আর খুলেনি। রাতেও আর খেতে বের হয়নি। আজকের রাতটা সবচেয়ে বেশি ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। রুমের চারদিকেই শুধু মুনের স্মৃতি। এক পলকের জন্য যদি মেয়েটাকে দেখতে পারতো! এই দুইবছরে এই প্রথম তাঁর বুঁকের কোথাও শূন্যতা মনে হচ্ছে আদ্রাফের। এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মাথা ধরে শুয়ে পড়লো আদ্রাফ। আবারও ব্যথাটা বেড়েছে। আদ্রাফ উঠেই পাশের টেবিল থেকে ওষুধের বাক্সটা নিয়ে ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়লো। কাল সকালেই নেহাকে নিয়ে মুনের চেনা-জানা সব বান্ধবীদের কাছ থেকে খোঁজ নিবে। অন্তত দূর থেকে হলেও দেখে আসবে।

#চলবে ইনশাআল্লাহ।
(আসসালামু আলাইকুম। ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমার নজরে দেখবেন আশা করি। কেমন হয়েছে জানাবেন 💙)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here