সুপ্ত অনুভূতি পর্ব ৪

0
73

#সুপ্ত_অনুভূতি
#মেহরাফ_মুন (ছদ্মনাম)
#পর্ব ৪

কেটে গেল তিন তিনটে মাস। সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। সে নিজের মতোই বহমান। মুন তাঁর জীবনকে গুছিয়ে নিয়েছিল ঠিকই কিন্তু আস্তে আস্তে তাঁর চলা-ফেরার কষ্ট হয়। অন্যদের মত স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না মুন। হাটতে-ফিরতে ভীষণ কষ্ট হয়।
সেইদিনের পরদিনই মুন চাকরির খোঁজে বেরিয়েছিল। পথিমধ্যে ওকে একা পেয়ে অনেকেই কুপ্রস্তাব দিয়েছিলো ঠিকই কিন্তু মুন এসবকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে চলেছিল। সে জানতো, সমাজে এভাবের থাকতে হলে লড়াই করেই এগিয়ে যেতে হবে। অনেক খোঁজার পর এক অফিসে চাকরি পেয়েছিলো, ঐখানের বস বাবার মত করেই মুনকে শ্রদ্ধা করতো। এটা দিয়ে সে নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছিলো। কিন্তু দিন যতই যায় তাঁর শরীরের অবস্থা ততই খারাপ হতে থাকে। ডাক্তার বলেছিলো, এই সময়ে একজন মায়ের ঠিকমতো খাবারের প্রয়োজন, ফল-ফ্রুট ভালোমতো খেতে হবে,রেস্টের প্রয়োজন, কেয়ারের প্রয়োজন। মুনের শরীরে এসব কিছুরই ঠিক নেই, তাঁর উপর এই অবস্থায় অফিস, জার্নি সব মিলিয়ে অনেক কষ্ট হয় মুনের। বাচ্চার কন্ডিশনও বেশি ভালো না। এই অবস্থায় রাস্তা-ঘাটে চলার জন্য বাইরের মানুষের কানা-ঘুষা তো আছেই। কিন্তু এর ভিতরেও মুনের এসব করতেই হবে কারণ ওর উপর পুরো একটা আশ্রমের নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো নির্ভরশীল।

—————————

মুন চলে যাওয়ার পরদিনই আদ্রাফ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যেও সে নেহাকে সাথে করে মুনের সব চেনা-জানা জায়গায় গিয়েছিল কিন্তু কারো কাছ থেকেই মুনের খোঁজ পায়নি আদ্রাফ। এরপর এসেই আদ্রাফ আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। রুমে ঢুকতেই শুধু মুনের স্মৃতি তাঁকে ঘিরে ধরতো। আদ্রাফের নিজের জন্য কোনো চিন্তা নেই সব চিন্তা মুনকেই ঘিরে। মুনের কথা ভাবতেই তাঁর ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সেই রাতের মাঝেই আদ্রাফ অতিরিক্ত মাথা ব্যথায় সেন্স হারায়। একসপ্তাহ হাসপাতালে থেকে এরপরেই ডাক্তাররা আদ্রাফকে ইমার্জেন্সি দুইরাতের ভিতরেই অন্যদেশে উন্নত চিকিৎসা উপলক্ষে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। আস্তে আস্তে আদ্রাফের অবনতি হতে থাকে। তবুও ডাক্তাররা আশায় আছে আদ্রাফ হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবে কারণ সে ফার্স্ট স্টেপেই সব জেনে গিয়েছিল আর চিকিৎসাও শুরু করেছিল।

আদ্রাফ বাহিরের দেশে একটা হাসপাতালের ক্যাবিনে শুয়ে আছে। এখানে তাঁর চেনা-জানার মধ্যে এক ডাক্তার আঙ্কেল নিয়ে এসেছিলো। তাঁর চোখগুলো বাইরের থাই গ্লাসের জানালা দিয়ে আকাশের দিকে স্থির। আদ্রাফের এই ক্যাবিনটা সম্ভবত চার-পাঁচ তলায় হবে। আদ্রাফ শোয়া থেকেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তাঁর হঠাৎ করেই ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মুনের জন্য। মেয়েটা কেমন আছে কী জানি? এই সময়ে হয়তো আরও গুলুমুলু হয়ে গিয়েছে। মুনেরই প্রতিচ্ছবি ভাসতে থাকে আদ্রাফের চোখে। ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে তাঁর। আচ্ছা, আদ্রাফের এই অবস্থা মুন যদি জানতে পারে, তখন কী করবে? মেয়েটা কী আদ্রাফের জন্য কাঁদবে? হয়তো হ্যাঁ আবার হয়তো না। ডাক্তার যেদিন আদ্রাফকে তাঁর এই অবস্থার কথা বলেছিলো সেদিন মুনের জন্য ভীষণ খারাপ লেগেছিলো আদ্রাফের। আদ্রাফ জানতো তাঁর অনুপস্থিতে মুন তাঁর জীবন কোনোদিন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না কারণ সে যে আদ্রাফকে ভীষণ ভালোবাসে। আর আদ্রাফও চেয়েছিলো তাঁর অনুপস্থিতে মুন যেন কিছু একটা করে সামনে এগিয়ে যেতে পারে, মেয়েটা মনের দিক থেকে ভীষণ নরম, সে যেন শক্ত হতে পারে তাই তো আদ্রাফ সেদিন থেকেই মুনকে ইগনোর করা শুরু করেছিল। মুনকে ইগনোর করে চলতে আদ্রাফের নিজেরও ভীষণ খারাপ লাগতো তবুও যে সে চেয়েছিল মুন তাঁর নিজের জীবনে সাফল্য আনুক, আদ্রাফের এই ধোঁকায় যেন মুন অনেক শক্ত হয়ে যায়। সহজে আর কাওকে যেন বিশ্বাস না করে। তাই তো সে নেহার সাহায্য নিয়েছিল এতেও ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। সে যে মুনকে কষ্ট দিতে চায় নাই, নেহাকে যেদিন বউরূপে অভিনয় করে ঘরে এনেছিল সেদিন মুনের কান্নারত চোখের দিকে তাকাতেই আদ্রাফের এক মুহূর্তের জন্য ইচ্ছে হয়েছিল মুনকে তাঁর বুকে জড়িয়ে নিতে। কিন্তু নিয়তি! সে মুনের ভালোর জন্যই এমন করেছিল। সে মনে করেছিল মুন তাঁকে ছেড়ে কোনোদিন যাবে না, গেলেও কয়েকদিনের জন্য তাঁর কাছের বান্ধবীগুলোর কাছেই যাবে। কিন্তু আদ্রাফ আজ বুঝতে পেরেছে কত্ত বড় ভুল ছিল এটা তাঁর। মেয়েটা যে একেবারের জন্যই হারিয়ে গিয়েছে, আদ্রাফের থেকে নিজেকে অনেক গুটিয়ে নিয়েছে। সে তো এমন হোক চায়নি। না জানি কেমন আছে মুন! আর তাঁর বাচ্চা? বাচ্চার কথা মনে পড়তেই আদ্রাফ তাঁর কাঁপা কাঁপা হাতটা তুলে নিয়ে আঙ্গুল চালাতে চেষ্টা করল। ভীষণ দুর্বল লাগে। তবুও চেষ্টা করে গুনে দেখল আজ ছয়মাস হবে হয়তো মুনের। সে নিজেও হাসপাতালে আছে আজ তিনমাস। এই অসুস্থতার পরেও আরও অনেক রোগ পেয়েছে এখন। জানে না সে বেঁচে ফিরতে পারবে কী-না মুনের কাছে! কিন্তু সে যে মনে-প্রাণে চায় বাঁচতে। এই হাসপাতাল, ভিন্ন দেশ তাঁর আর ভালো লাগে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল কতগুলো নাম না জানা পাখি পুরো আকাশ জুড়ে বিচরণ করছে মুক্তভাবে। আদ্রাফেরও ইচ্ছে হয় এমন ভাবে বাঁচার। তাঁর এখন নিজেকে শিকলে বন্ধি বন্ধি মনে হয়। সবসময় মুনের সাথে কাটানো মুহুর্ত গুলো চোখে ভাসে। কতই না সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো। আজও কী ফিরে পাবে দিনগুলো আদ্রাফ? তাঁদের নিয়তি এমন কেন হলো? আদ্রাফ যদি সুস্থ থাকতো তাহলে আজকের এই দিন তাঁদের দুজনের মধ্যে কাওকেই দেখতে হতো না। কতদিন পর এই সুখের সময়টা আসলো। অথচ এই সুখের সময়ে মুন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। নেহা খোঁজ নিচ্ছে সব জায়গায় কিন্তু মুনের খোঁজ সেও আর পায়নি। কই আছে মুন? কেমন আছো আমার মুনপাখি? আমার যে এখানে আর ভালো লাগে না, ইচ্ছে করে সব ছেড়ে-ছুড়ে তোমার কাছে ফিরে গিয়ে বুঁকের ভিতর বেঁধে রাখি চাঁদ। এসব ভাবতেই ভাবতেই আদ্রাফের চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। সে যে তাঁর মুণপাখিকে ভীষণ মিস করছে, তাঁর চাঁদ। আজ কতদিন সে তাঁর চাঁদকে এক পলকের জন্যও দেখে না। ‘ আমার চাঁদ ‘ বলেই বিড়বিড় করে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়েই মলিন হাসলো আদ্রাফ। এখন মনে হচ্ছে, আকাশেও তাঁর মুণপাখির প্রতিচ্ছবি ভাসছে। সেদিকেই এক ধ্যনে তাকিয়ে রইল আদ্রাফ।

——————————

মুনের শরীর এখন আরও অবনতি হচ্ছে। সারাদিন অফিস করে এসেই এখন মুন শুয়ে পরে। আগে যেই মুন বাচ্চাদের সাথে একদিন না কাটিয়ে থাকতে পারতো না, সব বাচ্চাদের নিয়েই খেলা করতো,সেই মুন এখন আর বাচ্চাদের সাথে গিয়ে বসে না।বাচ্চারাও তাঁদের মুন মার দিকে তাকিয়ে থাকে। অফিস করে এসেই রুম বন্ধ করে শুয়ে পরে। লিয়া প্রথমদিন মনে করেছিল হয়তো বেশি ক্রান্ত তাই এমন করেছে। কিন্তু দিন যতই যায় মুন আর তেমন কথা বলে না অপ্রয়োজনীয়। এখনের মুন আর আগের মুনের মধ্যে বিস্তর তফাৎ। আগের মুন কত চঞ্চল, হাসি-খুশি ছিল। অফিস শেষ করে এসে ফ্রেশ হয়েই বাচ্চাদের নিয়ে বসতো কিন্তু এখন আর এসব করে না। এখন মুন শুকিয়ে গিয়েছে, চোখের নিচে গাঢ় ডাক পরে গিয়েছে। ডাক্তার বলেছিলো, বাচ্চার কন্ডিশনও তেমন ভালো না, ফল-ফ্রুট ভালো মত খাওয়ার জন্য। কিন্তু মুন মাস শেষে অফিস থেকে যা টাকা পায় সব আশ্রমেই খরচ করে ফেলে। ডাক্তার বলেছিলো ঠিকমতো চেক-আপ করানোর জন্য। কিন্তু মুনের টাকা একদম সীমিত। লিয়ার খারাপ লাগে ভীষণ। তাঁর এই মা সমতুল্য বোনটার জন্য কিছু একটা করতে ইচ্ছে হয় ভীষণ। কিন্তু মুন চাকরি করার পর থেকে লিয়াকে আর কোনো চাকরি করতে দেয় না। তাঁর দায়িত্ব শুধুই বাচ্চাগুলোর কেয়ার করা। মুন যতদিন আছে ততদিন লিয়াকে কোনো কষ্টই করতে দিবে না এটা মুনের কথা। তবুও চিন্তা হয় তাঁর, মুন আপুর বাচ্চাটার কন্ডিশন ভালো না, মুন আপুও প্র্যাগনেন্সিতে অনেক কষ্ট করছে তাঁর উপর অনেক রোগাও হয়ে গিয়েছে। আদ্রাফ ভাইয়া কী মুনআপুকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেল? কীভাবে পারলো? সে কী মুন আপুকেও একটুও মিস করে না?এর শেষ কোথায় হবে তা লিয়ার জানা নেই।

#চলবে ইনশাআল্লাহ
(ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন দয়া করে, ধন্যবাদ 💙)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here