সুপ্ত অনুভূতি পর্ব ৫

0
69

#সুপ্ত_অনুভূতি
#মেহরাফ_মুন (ছদ্মনাম)
#পর্ব ৫

মাস তিনেক পেরিয়ে গেছে। সেদিন এক বৃষ্টিস্নাত সতেজ গৌধূলি বিকেল। মন মাতানো বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টির সময় হাত দিয়ে বৃষ্টির পানি ছোঁয়া মুনের অভ্যাস। সদ্য বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যাওয়া পিচঢালা কালো রাস্তাটা চকচক করছে অবিরাম। শিউলি ফুলের গাছের পাতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে শিশিরকণার ন্যয় টপটপ ঝরছে বর্ষণের শীতল বৃষ্টি।মন জুড়িয়ে যায় এমন দৃশ্য দেখলে। এসব দেখতে দেখতেই হঠাৎ করে মনটা খারাপ হয়ে গেল মুনের। এই দুইবছরে বৃষ্টি আসলেই মুন জানালার ধারে এসে হাত মেলিয়ে দিতো বৃষ্টির পানিতে আর আদ্রাফ মুনের এই খুশি পাশেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে উপভোগ করতো। আজ নিয়ে সাড়ে আট মাসেরও বেশি আদ্রাফের দর্শন পায়নি মুন। ইদানিং একটু বেশিই মিস করে আদ্রাফকে। আচ্ছা, আদ্রাফ কী মুনকে একটুও মিস করে না? মুন চলে আসার পর কী খুঁজেছিলো আদ্রাফ? মুন তো বড্ড মিস করে তাঁর আদ্রাফকে। আজকাল সময়গুলো ভালো যায় না মুনের। দিনটা কোনোমতে গেলেও রাতটা যেন কাটতেই চায় না, রাত হলেই সব অনুভূতিগুলো চোখের পানি আকারে বেরিয়ে আসে মুনের। মুন মলিন চোখে আকাশের দিকে তাকালো, বৃষ্টি থেমে গেছে অনেক আগেই। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, আস্তে আস্তে আকাশে তারা গুলো ভেসে উঠে তাঁদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে চলেছে। বৃষ্টির পরও আকাশটা কী পরিষ্কার হয়ে গেল। তাঁর জীবনটাও যদি এমন হতো, এই সবকিছু যদি স্বপ্ন হতো?চোখ খুলেই পাশে আদ্রাফের বাহুর মধ্যে যদি নিজেকে আবদ্ধ পেতো! কী হতো এসব মিথ্যা হলে? আগে মাঝরাতে স্বপ্নে যখন দেখতো আদ্রাফ মুনের চোখ ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে তাহলে তখনই ঘুমের মাঝে চিৎকার করে উঠে বসতো মুন আর তখনি আদ্রাফ পাশ থেকে উঠে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে নিজের বুঁকের মাঝে মুনকে আবদ্ধ করে এসব মিথ্যা প্রমান করে দিতো। কী হতো এই আটমাসও যদি মিথ্যা প্রমান করে দিতো আদ্রাফ! মুনের হঠাৎ করেই ভীষণ খারাপ লেগে উঠলো, নিজের পেটের উপর হাত রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো। ‘আমার বাচ্চা’ বলেই চোখ বন্ধ করে ফেললো।

-‘আপু?’ লিয়া রুমের দরজা থেকেই এতক্ষন মুনকে দাঁড়িয়ে দেখছিলো। দরজার পাশেই লাইট দিয়ে মুনের দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠলো।

লিয়ার ডাকে মুনের খেয়াল হলো। সে চোখ মুছেই হাসি মুখে লিয়ার দিকে ফিরলো।

-‘ভেতরে আসো, ওখানে কেন?’

-‘আপু অন্ধকার রুম করে আছেন যে?’

‘আমার জীবনটাই তো এখন অন্ধকারে ঢাকা আর আলো দিয়ে কী করব লিয়ু?’ মুন বিড়বিড় করে বলে উঠলো।

লিয়া তা বুঝতে না পেরে মুনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। লিয়ার তাকানো দেখে মুন মুখে হাসি টেনে বলে উঠলো,

-‘অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে ভালো লাগে তাই, সব তারাগুলো যখন মিটিমিটি জ্বলতে থাকে, কী সুন্দর লাগে! আকাশটাকে তখন পরিপূর্ণ মনে হয়, তারা না থাকলে অপূর্ণ লাগে, মনে হয় কী যেন নেই নেই, তাই না লিয়ু?’

লিয়া মুনের পাশে এসে এক পলক আকাশের দিকে তাকিয়ে মুনকে জড়িয়ে ধরলো। লিয়া বুঝে গিয়েছে মুন তাঁর কান্না ঢাকার জন্যই এসব বলছে। লিয়ার জড়িয়ে ধরা দেখে মুন মুচকি হেসে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

-‘কী হলো হঠাৎ?’

-‘আপু আপনার ভীষণ কষ্ট হয়, তাই না?’ লিয়া কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল।

-‘দুরু পাগলী! কীসের কষ্ট? এত সুন্দর একটা পরিবার আছে তাহলে কীসের কষ্ট?’

-‘সারাদিন অফিস করো এই অবস্থায় জার্নি।’

-‘আরে না! একদম না।’ মুন লিয়ার গাল টেনে বলে উঠলো।

-‘আমি তো বলছি আপু, চাকরি নাহয় আমি করি?’

-‘উহু, তুমি এই বয়সে অনেক কষ্ট করেছো লিয়ু। এখন আপু যতদিন আছি ততদিন মন দিয়ে পড়াশোনা করো, তারপর ভালো চাকরি পাবে। তখন আপু তোমার ঘাড়ে বসে বসে খাবো, তখন আপুকে চাইলেও তোমার বাসা থেকে বের করতে পারবে না,কোথাও যাব না তোমাকে ছেড়ে,হু।’মুন হেসে বলে উঠলো।

মুনের কথায় লিয়াও হেসে বলে উঠলো,
-‘আমিও ধরে-বেঁধে রেখে দিব, কোথাও যেতে দিব না এই লিয়াকে ছাড়া।’

মুন হেসে উঠলো। এই মেয়েটা এত ভালো কেন, তাঁর নিজেরই রক্তের সম্পর্কের বোন তাঁকে অপছন্দ করতো, প্রতিনিয়ত মুনকে অত্যাচারে রাখতো মুন কাছে টেনে নিতে চাইলে আরও দূরে টেলে দিতো অথচ এই মেয়েটা! কত সহজে নিজের মত করে মিলেমিশে থাকছে। আসলেই এই দুনিয়ায় একেকজনের একেকরূপ।

-‘আপু, খাবেন না? আসুন।’ লিয়া বলল।

-‘বাচ্চারা খেয়েছে?’

-‘না এখনো খায়নি, আজ আপনাকে ডাকতে আসলাম একসাথে খাওয়ার জন্য। অনেকদিন তো ওদের সাথে একসাথে খাননি, আজ খাবেন।’

মুন মলিন হেসে সম্মতি জানিয়ে বলল,
-‘আচ্ছা, চলো।’

—————————-

আদ্রাফ এখন মোটামুটি সুস্থ। তাঁর অপারেশন সাকসেসফুল। তবুও ডাক্তার আদ্রাফকে নিয়ে এখনো চিন্তিত কারণ ব্রেইন টিউমার রোগীদের মধ্যে প্রায় রোগীর অপারেশন সাকসেসফুল হয় কিন্তু দেখা যায় কয়েকমাস না যেতেই পুরোপুরি সুস্থ রোগী হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়ে আবার। তবুও ডাক্তার আদ্রাফকে নিয়মিত খাবার জন্য কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছে, যেগুলো নিয়ম মাফিক খেতে হবে। একদিনও বাদ দেওয়া যাবে না। আর মাথায় বেশি চাপ নেওয়া একদম বারণ করে দিয়েছে ডাক্তার। চাপ নিলে হীতে বিপরীত হবে।
আদ্রাফ আজ দেশে ফিরবে। কতমাস পরে সে নিজের দেশে ফিরছে সুস্থরূপে। তাঁর এখন ভীষণ আপসোস হচ্ছে মুনের জন্য। মেয়েটাকে সে খুঁজে বের করবেই, দরকার হলে পায়ের উপর পরে থাকবে তবুও ক্ষমা চাইবে। আদ্রাফের বিশ্বাস মুন কোনোদিন তাঁর থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকতে পারবে না।


নিজের বাড়িতে ঢুকেই মায়ের সাথে কথা বলে নিজের রুমে ঢুকতেই একটি অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল মনের মধ্যে আদ্রাফের। একদম ফাঁকা, মুন যাওয়ার পর পরই আদ্রাফ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালেই কাটিয়েছিল এতমাস। আজ রুমে ঢুকেই বুঁকের কোথাও একটা সুক্ষ ব্যথা অনুভব হচ্ছে। আদ্রাফ ফ্রেশ হয়েই এসে ওষুধ খেয়েই শুয়ে পড়লো । মাথার ব্যথা এখনো ঠিক কমেনি। আদ্রাফ শুয়েই বিড়বিড় করে উঠলো, ‘আমি ফিরে এসেছি মুনপাখি, তোমায় খুঁজে বের করবোই।’

————————-

অনেকদিন পর মুন আবারও বাচ্চাদের সাথে হেসে-খেলে রাতে খেলো। এতদিন তো অফিস থেকে এসেই রুম বন্ধ করে শুয়ে পড়তো। মুনের কেমন জানি, মায়া মায়া লাগছে সবকিছুতে। বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলেই মুন আর লিয়া রুমে চলে আসলো। বাচ্চারাও আজ ভীষণ খুশি ছিল কারণ তাঁদের মুন মা অনেকদিন পর আবারও তাঁদের সাথে হেসে-মেতে খাবার খেলো একসাথে। লিয়াও ভীষণ খুশি এর জন্য। মুনের মুখে অনেকদিন পর সত্যিকারের হাসি দেখেছে সে। কিন্তু মুনের ভেতরে ভেতরে ভীষণ খারাপ লাগছে। সব দুর্বলতা যেন ঘিরে ধরতে চাইছে, চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে বারবার। কেন জানি, ভীষণ কান্না পাচ্ছে তাঁর। আদ্রাফকে একবারের জন্য হলেও দেখার ইচ্ছে হচ্ছে, অন্তত মানুষটা ভালো আছে কি-না তা যদি দেখতে পারতো মুন। বুঁকের কোথাও ভীষণ ব্যথা হচ্ছে। মুনের এতমাসের মধ্যে আজকে বেশি মনে পরছে আদ্রাফকে। বড্ড ইচ্ছে হচ্ছে আদ্রাফ সব ছেড়ে-ছুড়ে মুনকে যেন এসে বলুক,’ মুনপাখি এই সব কিছুই মিথ্যা ছিল, এই আদ্রাফের হৃদয়ের কুঠুরিতে তো শুধুই তাঁর চাঁদ ছিল, আছে আর থাকবেও। তোমার নাম আমার হৃদয়ে কোদায় করা চাঁদ।’ মুনও তখন এই আটমাসের সবকিছু ভুলে আদ্রাফের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তো আর আদ্রাফও মুচকি হেসে মুনকে তাঁর বুকে আগলে নিতো। এসব ভাবতেই মুনের ঠোঁটের কোনায় মুচকি হাসির রেখা দেখা দিল।

লিয়া মুনের পাশে এসে শুয়ে পড়তেই মুনও শুয়ে পড়লো। আস্তে আস্তে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।


মাঝরাতে কারো গোঙানির শব্দে লিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। সে পাশ ফিরেই দেখতে পেল মুন গোঙাচ্ছে। মুন এক হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে অন্য হাতে লিয়াকে ডাকার চেষ্টা চালাচ্ছে, মুখ দিয়ে আওয়াজ বের করার শক্তিটুকু পাচ্ছে না।

লিয়া উঠে বিছানার দিকে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। লিয়া একটি মেয়ে এত রাতে কী করবে তা ভেবে পাচ্ছে না। তবুও এতকিছুর মাঝে তাঁর একমাত্র একটিই চিন্তা, মুনকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে যতো দ্রুতই সম্ভব। লিয়া আর উপায় না পেয়ে মুনকে ওই অবস্থায় রেখে দ্রুত বেরিয়ে গেল। এই মাঝরাতে কোনো গাড়িও তেমন নেই। কী করবে লিয়া তা ভেবে পাচ্ছে না। অবশেষে অনেক কষ্ট করে একটা গাড়ি পেয়েছে ঐটা করেই মুনকে হাসপাতালে নিয়ে গেল লিয়া। হাসপাতালে মুনের কন্ডিশন দেখে ডাক্তাররা ইমার্জেন্সি অপারেশন টিয়েটারে নিয়ে গেল। মুনকে নিয়ে যাওয়ার পথে লিয়া তাঁর হাত ধরে রেখেছিলো। টিয়েটারে মুনকে ঢুকে নেওয়ার পর পরই ডাক্তাররা সবকিছু শুরু করে দিল। মুনের কী আর আদ্রাফের হাতের বেলি ফুলের মালা মাথায় গুজা হবে না? আর কী কোনোদিন আদ্রাফের কাছে কিছুর আবদার করা হবে না? আর কী কোনোদিন একসাথে চন্দ্রবিলাস করা হবে না? শেষবারের মত আদ্রাফের মুখচ্ছবি তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠতেই মুনের কান্নারত মুখেই ঠোঁটের কোনায় এক চিলতে হাসি দেখা গেল।’ভালো থেকো আদ্রাফ ভীষণ ভালোবাসি ‘বলে মুন বিড়বিড় করে উঠলো। চোখ বন্ধ অবস্থায় দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো মুনের।

#চলবে ইনশাআল্লাহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here