সুপ্ত অনুভূতি পর্ব ৬

0
76

#সুপ্ত_অনুভূতি
#মেহরাফ_মুন (ছদ্মনাম)
#পর্ব ৬

সাদা কাপড়ে মোড়ানো মৃত দেহটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল লিয়া। সে ভাবেওনি মুন এভাবে তাঁকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যাবে। লিয়া এক নজর তাঁর কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে পাশেই মুনের মৃত দেহটির দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো। বাচ্চাটি কী সুন্দর করে লিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে! আজ যদি মুন বেঁচে থাকতো তাহলে এই দিনটা সবচেয়ে বেশি খুশির দিন হতো। মুন আর আদ্রাফের চেহেরা নিয়েই বাচ্চাটার চেহেরা। মুনের মেয়ে হয়েছে। মুনের ইচ্ছে ছিল তাঁর প্রথম সন্তান যেন মেয়ে হয়। কতই না কষ্ট পেয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল মুন। মুনের কন্ডিশন ভালো না থেকে আট মাসেই ডাক্তাররা রিস্ক নিয়ে অপারেশন শুরু করে দিয়েছিলেন। ডাক্তার থিয়েটার থেকে বের হয়েই লিয়ার হাতে মেয়েটাকে তুলে দিল। লিয়া মুনের কথা জিজ্ঞেস করতেই তাঁর চোখ আটকে গেল। মুনের নিথর দেহটি দেখে। মেয়েটার কী ভাগ্য, সবার জন্য কতই না কষ্ট করেছিল অথচ মেয়েদের এই মা হওয়ার সুখের সময়টাতেই হারিয়ে গেল। এসব ভাবতেই ডুকরে কেঁদে উঠলো। সকাল হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই
।এম্বুলেন্সটি আশ্রমের গেট দিয়ে ঢোকাতেই সব বাচ্চারা ছুটে আসলো। মুনের দেহটি বের করতেই তারা থমকে গেল। কথা ছিল মুন মা তাঁদের জন্য আরেকটা সঙ্গী আনবেন। তাঁদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তাঁদের মুন মা আর কোনোদিন আসবে না, খেলবে না।


মুনের সব কার্য সম্পন্ন হওয়ার পর লিয়া বাচ্চাটিকে নিয়ে রুমে ঢুকলো। সে বুঝছে না কীভাবে তাঁর মুন আপুর এই শেষ অস্তিত্বকে রাখবে অবশ্য ডাক্তাররা সব বুঝিয়ে দিয়েছে তবুও একটা ভয় আছে, মা ছাড়া বাচ্চার একটা এক্সট্রা কেয়ার এর কথা বলে দিয়েছে ওরা। লিয়া রুমে ঢুকতেই একরকম শূন্যতা অনুভব করল। কালকেও তাঁর আপু এখানে ছিল, কালকে রাতেও কতই না হাসি-খুশি ছিল। কী নিস্তব্ধ হয়ে আছে রুমটা! এই রুমটাই তাঁর আর মুন আপুর কত হাসি-খুশির সাক্ষী। এখন একেবারে সবকিছু থেকেই মুক্তি নিয়ে পাড়ি জমালো না ফেরার দেশে। আর কোনদিন আসবে না তাঁর মুন আপু। এসে ‘লিয়ু’ বলে আর কোনোদিন ডাকবে না। বাচ্চাটিকে কোল থেকে নামিয়ে বিছানার উপর রাখলো, কী সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে। আজ এই জায়গায় মুন আপু থাকলে কী করতো! লিয়ার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।
লিয়া উঠে আলমারির সামনে গেল। আলমারি খুলেই মুনের কাপড়-চোপড় গুলো নেড়ে দেখছিলো। হঠাৎ একটা দুইটা দিকে চোখ পড়লো লিয়ার। লিয়া খুব যত্ন সহকারে চিতিগুলো নিলো। তাঁর মুন আপুর লেখা চিঠি। অথচ আজ সে বহুদূরে।

লিয়া চিঠি দুইটা হাতে নিলো। একটার উপর লিয়া আর আরেকটার উপর ‘মুনের আদ্রাফ’ দেওয়া। লিয়া তাঁর নামের চিঠিটা খুলে পড়া শুরু করল,

‘লিয়ু আমার ছোট বোন,
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমি আর বেশিদিন নেই। ডাক্তার বলেছে আমার আর বেবির কন্ডিশন তেমন একটা ভালো না। ছয় মাস চলাকালীন সময়ে ওয়ার্নিং দিয়েছিলো, কিন্তু আমি বসে থাকতে পারিনি। এতগুলো নিষ্পাপ বাচ্চাকে আমি যখন ফুটফাত থেকে তুলে এনেছিলাম তখনই শপথ করেছিলাম এই এতিম বাচ্চাগুলোকে কোনোদিন কষ্ট দিব না। এখন যদি আমি চাকরি ছেড়ে দিই তাহলে ওরা বাঁচবে কীভাবে? মাঝপথে কীভাবেই বা তাঁদের ছেড়ে দিই? আমার অনেক ইচ্ছে ছিল এই আশ্রমটা একদিন অনেক বড় করব কিন্তু দেখো হয়তো বা আর কিছুদিন পরে আমার কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। তুমি আপুর জন্য অনেক করেছো। যদি কখনো আমি না থাকি তাহলে আশ্রমটাকে নিজের মত করে গুছিয়ে নিও। তুমি একবার বলেছিলে না? আমি হঠাৎ করে এত চেঞ্জ হয়ে গিয়েছি কেন? এটার উত্তর কী জানো? ওইদিন আমি চেক-আপের জন্য গিয়েছিলাম, ডাক্তার বলেছিলো আমার মেয়ে হবে, আমি মেয়ের মা হবে, ওইদিন আমার সবচেয়ে খুশির দিন হবার কথা ছিল কিন্তু ডাক্তার এরপর বলেছিল আমার লাইফ রিস্ক হবে যদি এভাবেই চলতে থাকি। কিন্তু আমার তো কিছুই করার ছিল না। আমি যদি না থাকি আমার মেয়ের নাম দিও তুমি ‘আদ্রিয়া’। আদ্রাফের নামের সাথে মিলিয়ে রেখো। যদি কোনোদিন আদ্রাফকে দেখো তাহলে আমি আরেকটা চিঠি রেখে গেছি ঐটা দিও আর নেহাকে দেখলেও বলিও ক্ষমা করে দিয়েছি, সে তো আমাকে ছোট থেকেই বোনের মত আগলে রেখেছিল তাঁর উপরে কীভাবে রাগ করে থাকতে পারি? আর আমার একটা অনুরোধ, আমার মেয়েটাকে তুমি আগলে রেখো লিয়ু,ভালো থেকো নিজের খেয়াল রেখো, আশ্রমের বাচ্চাগুলোকে একটু দেখিও ওদের তো আর আমরা ছাড়া কেউ নেই। আল্লাহ হাফেজ।’

লিয়া চিঠিটা পড়েই ডুকরে কেঁদে উঠলো। ‘যাওয়ার সময়ও আমাদের কথাটাই ভেবে গেলে আপু, নিজের কথাটা একটু ভাবলেও না ‘ বিড়বিড় করেই লিয়া কেঁদে উঠলো। লিয়া বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাটির মাথায় হাত বুলিয়ে কান্নারত মুখেই মলিন হেসে বলে উঠলো,

‘আদ্রিয়া, মুন আপুর আদ্রিয়া’

———————-

আদ্রাফ যেখানেই পারে মুনকে খুঁজতে থাকে কিন্তু আপসোস মুনের চিহ্নও পায় না কোথাও। অপরাধবোধ প্রতিনিয়ত ঘিরে ধরে তাঁকে। দিন-কাল আর ভালো লাগে না তাঁর। এই সবকিছু থেকে আদ্রাফকে একমাত্র তাঁর মুনপাখিই বের করতে পারবে কিন্তু তাঁর মুনপাখির খোঁজ কোথায় পাবে সে? তাঁর যে মুনপাখিকে ছাড়া চলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ইদানিং মাথা ব্যথাটা আবার উঠে তাঁর। আদ্রাফ ভাবে বেশি চাপের ফলে হয়তো এমন হচ্ছে।
আদ্রাফ ঠিক করল কাল সকালে আবারও যেতে হবে এখানকার হাসপাতালে ডাক্তারটার কাছে। আর কিছু না ভেবে আদ্রাফ ওষুধ খেয়েই শুয়ে পড়লো।

——————————

আদ্রিয়ার গা-কাঁপানো জ্বর উঠছে। লিয়া কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। এত ছোট বাচ্চার এত জ্বর! এমনিতে মা ছাড়া তাঁর উপর এমন জ্বর। লিয়া ওই রাতেই হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। ওখানে গিয়েই আদ্রিয়াকে ডাক্তাররা ভর্তি করিয়ে ফেলল কারণ অবস্থা খারাপ আদ্রিয়ার। লিয়ার তো ভীষণ কান্না পাচ্ছে এই ভেবে যে তাঁর মুন আপুর অস্তিত্বকে সে ভালোভাবে সামলে রাখতে পারছে না।

———————-

আদ্রাফ সকালে উঠেই ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসতেই তাঁর মা এসে নাস্তা দিয়েই বলল,’ যত তাড়াতাড়ি পারিস মুনকে ঘরে নিয়ে আয় বাবা। আমার যে আর ভালো লাগে না এই ঘরে। দম বন্ধ বন্ধ লাগে।’

আদ্রাফ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাঁর মাকে ‘হ্যাঁ’ বোধক সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে পড়লো হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। যেতে যেতেই ভাবে এতদিনে বুঝতে পারলো মা মুন কী জিনিস ছিল।

আদ্রাফ হাসপাতালে পৌঁছেই গাড়ি পার্ক করে ঢোকার গেটেই লিয়াকে দেখতে পেলো। আদ্রাফ দ্রুত হেটে লিয়ার কাছাকাছি গিয়ে ডাক দিল।

লিয়ার হঠাৎ মনে হলো তাঁর নাম ধরে কেউ ডাকছে কিন্তু এখানে তো লিয়ার চেনা-জানা কেউ নেই তাই সে ভ্রম ভেবে পা বাড়াতে নিলেই আবারও সেই ডাক। লিয়া পেছন ফিরেই এতদিনে তাঁর আদ্রাফ ভাইয়াকে দেখে থমকে গেল। মানুষটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। চোখের নিচে গাঢ় কাল দাগ,চুলগুলো উস্কো-ফুস্কো, মনে হচ্ছে যেন অনেকদিন দাঁড়ি কাটেনি। এখন এই জায়গায় মুন আপু থাকলে নিশ্চই আদ্রাফ ভাইয়াকে বকা দিয়ে বলতো,’এ কী চেহেরার হাল করেছো? আগে সব ফিটফাট করে এসো নাহলে আমি আর কথা বলবো না ‘ এই বলে হয়তো বা মুখটা ঘুরিয়ে নিতো।

-‘আরে লিয়া?’

আদ্রাফের পরপর কয়েকবার ডাকে লিয়ার খেয়াল হলো। লিয়া এক নজর আদ্রাফের দিকে তাকিয়ে আবারও পা বাড়াতে নিলে আদ্রাফ তাঁর পথ আটকে ধরলো।

-‘কথা বলবে না ভাইয়ার সাথে? আচ্ছা রাগ করেছো খবর নিতে পারিনি বলে? জানো এই দুইবছর ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম তাই তো তোমার সাথে একবারও কথা বলতে পারিনি কিন্তু মুনপাখি ঠিকই তোমার খবর বলতো আমায়।’

-‘হ্যাঁ, এতোই ব্যস্ত ছিলেন যে আমার মুন আপুকেও ছেড়ে দিলেন?’

-‘মানে..?’

-‘কিছু না।’ এই বলেই লিয়া দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে আদ্রিয়াকে যে ক্যাবিনে রেখেছিলো ওখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উঠতে লাগলো। সে এখানে নিচের দোকান থেকে কিছু জিনিস নিতে এসেছিলো।
এদিকে লিয়ার কথাগুলো আদ্রাফ কিছুই বুঝতে পারছে না। সে প্রথমে মনে করেছিল এই দুইবছর লিয়ার খবর নেয়নি বলে সে রাগ করে কথা বলছে না কিন্তু তা না। আচ্ছা লিয়া মুনের কথা কীভাবে জানে? ওহ শীট! তাঁর মানে মুন লিয়ার সাথেই ছিল? সব জায়গায় মুনকে খুঁজলেও লিয়ার কথা আদ্রাফের মাথায় ছিল না। তাঁর মানে এতদিন পর সে তাঁর মুণপাখির খবর পাবে, দেখতে পারবে! কতদিন পর তাঁর চাঁদকে সে কাছে পাবে! এই ভেবেই সে লিয়ার পেছনে দ্রুত পায়ে হাঁটা ধরলো।

#চলবে ইনশাআল্লাহ।
(এক পর্বে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি কাল অন্তিম পর্ব দিব। ছোট হওয়ার জন্য দুঃখিত তবুও ১১০০শব্দের উপরে এখানে। ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন দয়া করে )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here