সেই_আদুরে_দিন পর্বঃ০৩

0
298

সেই_আদুরে_দিন
পর্বঃ০৩
#Arshi_Ayat

শুদ্ধতা আস্তে আস্তে রৌদ্রুপের পকেটে হাত দিলো চাবি পাওয়ার আশায় কিন্তু একটা পকেটে চাবি নেই।চাবি কোথায় রেখেছে কে জানে!এখন চাবি ছাড়া তো শিকলের তালাও খোলা যাবে না।এ কোন বিপদ!শুদ্ধতা রৌদ্রুপের বালিশের নিচেও আস্তে আস্তে হাতড়ালো কিন্তু চাবি পাওয়া গেলো না।হতাশ হয়ে আবার শুয়ে পড়তেই রৌদ্রুপ বিদ্রুপের কন্ঠে বলল,’কি সোনা চাবি টা পেলে না?থাক থাক কষ্ট পায় না’

হঠাৎ রৌদ্রুপের কথা শুনে শুদ্ধতা ভয় পাওয়া গলায় বলল,’আপনি ঘুমান নি?’

‘তোমার মতো একটা বউ থাকলে কি ঘুম আসে আমার!তুমি আমার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছো।’রৌদ্রুপ একটু রোমান্টিক গলায় বলল।

রৌদ্রুপের এমন মশকরা টাইপ কথা বার্তা শুনে শুদ্ধতা বিরক্ত হয়ে বলল,’ধ্যাত!’এটা বলে উল্টো ঘুরে শুয়ে রইলো।শুদ্ধতাকে আরেকটু ইরিটেড করার জন্য রৌদ্রুপ ওকে পেছন থেকেই জড়িয়ে ধরলো।এবার চরম বিরক্ত নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,’আপনি কি বিরক্ত করা ছাড়া আর কিছু করতে পারেন না?’

‘হ্যাঁ পারি তো।ভালোবাসতে পারি।কিন্তু তুমিই তো দিচ্ছো না সুযোগ।’

‘প্লিজ,মাফ চাই।আমার উচিত হয় নি মাঝরাতে আপনার মতো আস্ত একটা পাগলকে জাগানো।’শুদ্ধতা আফসোসের গলায় বলল।

‘ঠিক বলছো!এখন যেহেতু জাগিয়েছোই সেহেতু ঘুম পাড়িয়ে নাহলে পাগল জ্বালালে কিন্তু কিচ্ছু বলতে পারবে না।’রৌদ্রুপ একটু আহ্লাদী গলায় বলল।

‘কি করতে হবে এখন আপনাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য?’

‘আমার দিকে ফিরে জড়িয়ে ধরবে একটু নড়াচড়া করা যাবে না।যতোবার নড়াচড়া করবে ততবার আমার গালে চুমু দিতে হবে।’

শুদ্ধতা ঢোক গিলে বলল,’এটা কেমন কথা।আমি পারবো না।এমনে ঘুমালে ঘুমান নাহলে নাই।’

‘আচ্ছা ঠিকাছে তুমি বললে আমি পাগল।তাহলে পাগলের পাগলামি সহ্য করো আর কি!’

শুদ্ধতা কিছু বলল না।রৌদ্রুপ ওকে জব্দ করার জন্য পিঠে বাঁধা ব্লাউজের ফিতে টা খুলে দিলো।শুদ্ধতা আঁতকে উঠে বলল,’কি করছেন!’

‘পাগলামি করছি।এখন তুমি ঘুম না পড়ালে পাগলামি জারি থাকবে।’

শুদ্ধতা বুঝে গেলো এই লোক চরম লেভেলের নাছোড়বান্দা।এখন যা বলল তা মানতে হবে নাহলে কি করে আল্লাহ জানে!তাই নিজের ভালো চেয়ে শুদ্ধতা মুখ ফুলিয়ে বলল,’আচ্ছা ঠিকাছে ঘুম পাড়াবো।’

‘এই তো গুড।দাড়াও ফিতে টা বেঁধে দেই।’

শুদ্ধতা না চাইতেইও ওকে জড়িয়ে ধরলো।এখন শুদ্ধতার অস্তিত্বের বিস্তৃতি শুধুই রৌদ্রুপের বক্ষস্থল জুড়ে।শুদ্ধতার শরীর জুড়ে অজানা এক শিহরণ বয়ে গেলো।অজানা অচেনা একটা ছেলের এতো কাছে, ওকে জড়িয়ে ধরে,ওর নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সংস্পর্শ পাবে এটা শুদ্ধতা ভাবে নি।রৌদ্রুপ ওকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে যেনো বুকের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলবে।এভাবে জড়িয়ে থাকতে থাকতে দুজনই কখন ঘুমিয়ে পড়লো কারোই খেয়াল নেই।
————-
বাদশার ন্যায় নির্মল অম্বরে নিজের দ্যুতি ছড়িয়ে আজকের দিনের সূচনা করলেন সূর্যদেব।দক্ষিণের বিশাল স্বচ্ছ কাঁচের জানালা দিয়ে তার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরময়।যার মসৃণ আলোয় সিক্ত হচ্ছে খাটের ওপরে নিদ্রাচ্ছন একজোড়া ভালোবাসার ওপর।

নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ভাঙলো রৌদ্রুপের।এই সময়টায় সে ঘুম থেকে ওঠে প্রতিদিন।তারপর নিয়ম অনুসারে ব্যায়ম,গোসল আর নাস্তা করে।ঘুম থেকে জেগেই খেয়াল করলো শুদ্ধতা ওর বুকের ওপর মাথা দিয়ে শুয়ে আছে।রৌদ্রুপ সযত্নে ওর মাথাটা বালিশে রেখে উঠতে গিয়েই চোখ আটকে পড়লো শুদ্ধতার গলায় থাকা গাড় তিলটার ওপর।তিলটা যেনো তিল না চুম্বক!এটা অদৃশ্য ভাবে রৌদ্রুপকে টানছে।এই চুম্বকের এত শক্তি যে নিজের শক্তিবলে ওকে সম্মোহিতের মতো টেনে নিচ্ছে নিজের কাছে।

হঠাৎ শুদ্ধতা ঘুম ভাঙতেই দেখলো রৌদ্রুপ ওর গলার দিকে ঝুঁকছে।ভয়ে ও চিল্লিয়ে উঠতেই রৌদ্রুপের হুশ ফিরলো।দ্রুত সরে করে গেলো।শুদ্ধতা ভয় পাওয়া গলায় বলল,’এই আপনি কি করছিলেন?’

‘কই কিছু করি নি তো!’রৌদ্রুপ একদম স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলো।

‘একদম মিথ্যা বলবেন না।আমি দেখেছি আপনি আমার গলায় একদম ঝুঁকে পড়ছিলেন।অসভ্য কোথাকার!মেয়ে দেখলেই হুশ থাকে না তাই না?’শুদ্ধতা রেগে রৌদ্রুপকে ঝেড়ে দিলো।

রৌদ্রুপ ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,’হ্যাঁ এখন সব দোষ আমার।তোমার গলায় যে চুম্বক লাগিয়ে বসে আছো সেদিকে খেয়াল নাই।এখন আমি কাছে আসলেই দোষ।’

শুদ্ধতা রৌদ্রুপের কথা বুঝলা না।গলায় চুম্বক আসবে কোথা থেকে।রৌদ্রুপের কথা বোঝার জন্য বলল,’মানে?’

‘মানে হলো তোমার গলায় যে তিলটা আছে সেটা আস্ত একটা চুম্বক।এটা যেকোনো পুরুষ কে টানার ক্ষমতা রাখে।তাই তুমি এখন থেকে হিজাব অথবা গলায় ওড়না পেঁচিয়ে রেখো যেনো অন্তত ওটা আমাকে ছাড়া আর কাউকে টানতে না পারে।আমি চাইনা যেনো একমাত্র আমি ছাড়া অন্যকেউ আকর্ষিত হয় এটার ওপর।’

‘যদি না পরি?’রৌদ্রুপের মনোবল বোঝার জন্য বললেও শুদ্ধতা সবসময়ই এই তিলটা হেফাজতে রাখে।কখনো হিজাব অথবা কখনো ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখে।

রৌদ্রুপ হালকা হেসে আলমারি খুলে রিভালবারটা বের করে বলল,’না পরলে….’

বাকিটা আর ওকে বলা লাগলো না শুদ্ধতাই তড়িঘড়ি করে বলল,’জানি, জানি না পরলে আমার মাথার খুলি উড়িয়ে দিবেন।’

রৌদ্রুপ মিষ্টি করে হেসে বলল,’এই তো তাড়াতাড়ি বোঝার জন্য ধন্যবাদ।’
তারপর রিভালবারটা রেখে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো।শুদ্ধতা বিরস মুখে কাঁচের জানার কাছে এসে দাঁড়াতেই লক্ষ করলো নিচে সুন্দর একটা সুইমিংপুল।একমুহূর্ত দেরি না করে চঞ্চলাবতী শুদ্ধতা রুম থেকে বেরিয়ে নিচে চলে এলো।তারপর সদর দরজা খুলে বাড়ির পেছনে সুইমিংপুলটা চলে এলো।এখানেই গোসল করতে ইচ্ছে করছে কিন্তু আবার নামতেও ভয় করছে।

এদিকে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে শুদ্ধতাকে না পেয়ে রৌদ্রুপ নিচে চলে এলো।নিচে এসে দেখলো সদর দরজা খোলা।ভিষণ ভয় পেয়ে গেলো সে।দ্রুত বাইরে এসে বাগানে খুঁজলো কিন্তু শুদ্ধতা নেই।খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির পেছনে আসতেই দেখলো সুইমিংপুলের সামনে দাড়িয়ে আছে সে।রৌদ্রুপ রেগে গিয়ে পেছন থেকে ওর হাত টেনে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,’হুটহাট যেখানে সেখানে চলে যাও কেনো?বলে আসতে পারো না?টেনশন দিতে ভালো লাগে?’

শুদ্ধতা ভ্রু কুঁচকে বলল,’আমি তো জানালা দিয়ে সুইমিংপুলটা দেখেই এলাম।আর আপনি ওয়াশরুমে ছিলেন তাই তো বলতে পারি নি।’

‘তাহলে অপেক্ষা করতে।’

‘তো এতে হাইপার হওয়ার কি আছে।আমি তো বাইরে কোথাও যাই নি।সামান্য সুইমিং পুলে এসেছি।আর আপনি তো বাড়ির গেটে তালা দিয়ে রেখেছেন যাবো কিভাবে?’

রৌদ্রুপ কিছু বলল না।তার মনে তো অন্য ভয়।শুদ্ধতার দিকে চেয়ে থমথমে গলায় বলল,’এখন থেকে যেখানে যাবে বলে যাবে।ওয়াশরুমে গেলেও বলে যাবে।গট ইট?’

‘আপনি এমন কেনো?এখন আপনার জন্য আমি কিচ্ছু করতে পারবো না।সব সময় কৈফিয়ত দিতে হবে।’

‘আমি কিন্তু কৈফিয়ত দিতে বলি নি।আমি বলেছি বলে যেতে যেনো টেনশনে না থাকতে হয়।’

‘এতো টেনশন কিসের আপনার?এই তো কাল দেখা হলো এর মধ্যেই আমার জন্য এতো টেনশন!’

রৌদ্রুপ রহস্যময় হেসে বলল,’কাল তো তুমি দেখলে আমি তো কবে থেকেই দেখতাম।’

শুদ্ধতা সন্দিহান গলায় বলল,’মানে?’

‘মানে কিছু না এখন চলো তো!’

‘কোথায়?’

‘গেলেই বুঝবে।’
রৌদ্রুপ দোতলায় শুদ্ধতাকে নিয়ে একটা ঘরে গেলো।জীম ঘর এটা।শুদ্ধতা এতো বড়ো জীম ঘর দেখে বলল,’আপনার বাড়িতে জীমও আছে।বাহ!আপনি কি এখন জীম করবেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে আমাকে এনেছেন কেনো?’

‘জ্বালাতে।’এটা বলেই রৌদ্রুপ দাঁত কেলালো।শুদ্ধতা চলে যেতে নিলেই জীমের দরজাটা আটকে লক করে দিলো রৌদ্রুপ।শুদ্ধতা চরম আক্রোশে ফেটে পড়লো।বলল,’আটকে রেখেছেন কেনো?আপনি জীম করুন না!আমাকে কেনো আটকে রাখতে হবে?আমি কি এখানে কুত কুত খেলবো?’

‘আমার সাথে আপনিও করবেন মিসেস শুদ্ধতা সাহরীফ।’

‘কেনো?আমি কি মোটা হয়ে গেছি নাকি?’

‘মোটা হলে মানুষ জীম করে নাকি?ফিট থাকার জন্য,ভালো থাকার জন্য করে।এখন থেকে তুমিও করবে।’

শুদ্ধতা ভাবুক হয়ে বলল,’আপনি নিশ্চয়ই ডাক্তার তাই না?’

‘আমি তোমার মাথা।চুপ করো।আর এই জগিং স্যুট’টা পরো।’

রৌদ্রুপ একটা স্যুট শুদ্ধতাকে এগিয়ে দিয়ে বলল।শুদ্ধতা বলল,’এটা আবার কবে আনলেন?’

‘কাল খাবার আনার সময়।এখন যাও দ্রুত পরে আসো।’

শুদ্ধতা বিড়বিড় করতে করতে ওয়াশরুমে গেলো চেঞ্জ করতে।চেঞ্জ করতে করতে মনে মনে বলল,’শুদ্ধতা তোর খারাপ সময় শুরু এই লোক তোর মাথা এমন ভাবে চিবিয়ে খাবে যে তুই নিজেই তোর মাথা খুঁজে পাবি না।কোন পাপ যে করেছিলাম আল্লাহ জানে যে এমন বজ্জাত এসে জুটলো।বোধহয় বিনা দাওয়াতে মানুষের বিয়ে খাওয়ার কুফল এটা।আজ পর্যন্ত যাদের বিয়ে খেয়েছি এভাবে তারা সবাই মিলে বদদোয়া দিয়েছে বলেই এই হাল।’

চলবে…
(ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here