সেই_আদুরে_দিন পর্বঃ০৪

0
227

সেই_আদুরে_দিন
পর্বঃ০৪
#Arshi_Ayat

শুদ্ধতা ট্রেডমিলে হাঁটতে হাঁটতে রৌদ্রুপকেই খেয়াল করছিলো।খালি গায়ে মুক্তোর মতো ঘামের ফোঁটাগুলো চকচক করছে।কপাল দিয়েও দরদর করে ঘাম ঝরছে।আকর্ষণীয় লাগছে খুব!এটা মনে হতেই শুদ্ধতা লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকালো।যদিও রৌদ্রুপ সেটা খেয়াল করলো না সে পুশআপ করতে ব্যাস্ত।

ব্যায়াম শেষ করে টাওয়াল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে শুদ্ধতার সামনে এসে বলল,’হয়েছে চলুন এবার।এতো আলসি তুমি!বুঝেছি আমারই তোমাকে ঠিক করতে হবে।আজ প্রথম বলে কিছু বলি নি।কাল থেকে আর ছাড় নেই।এখন চলো গোসল করতে হবে।’

‘চলুন না সুইমিংপুলে গোসল করি।’শুদ্ধতা একগুচ্ছ চঞ্চলতা মাখা কন্ঠে আবদার করলো।

রৌদ্রুপ এক ভ্রু উঠিয়ে বলল,’শিউর?’

‘ওভার শিউর।’শুদ্ধতার কন্ঠে উচ্ছ্বাস।

‘আচ্ছা তবে চলো।’
রৌদ্রুপ মুচকি হেসে বলল।শুদ্ধতা তো সেই খুশী।তার সুইমিংপুল ভালো লাগে।কিন্তু তাদের বাড়িতে নেই।বড় জ্যাঠাদের বাড়িতে আছে।যতোবারই ওই বাড়িতে গেছে ততবারই সমবয়সী জ্যাঠাতো বোন সুরমার সাথে গোসল করেছে।

শুদ্ধতা সুইমিংপুলে নেমে সেই কি খুশি!রৌদ্রুপ ওর হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে চেয়ে এই খুশিটা উপভোগ করছে।তারচেয়েও বেশি মোহিতে করছে মেয়েটির সিক্ত বসনের ওপর পরিস্ফুটিত দেহের সুক্ষ্ম ভাজগুলো।রৌদ্রুপের দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে আছে মেয়েটির ওপর।বুকের বা পাশটা চিলিক দিয়ে উঠছে।

সত্যিই নারী বিধাতার এমন এক সৃষ্টি যার প্রতি পুরষ আকৃষ্ট হবেই।তবে যে পুরুষ বহু নারীতে মজেছে সে কাপুরুষ,যে পুরুষ এক নারীতে আজীবন মজে থাকে সে মহাপুরুষ,আর যারা কোনো নারীতে আসক্ত হতে পারে না তারা সন্যাসী।

শুদ্ধতা নামক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রৌদ্রুপ মনে মনে বলল,’সন্যাসী হতে চেয়েও পারলাম না তোমার জন্য!এবার যদি মরুভূমির মতো খরায় একটু ভালোবাসার বৃষ্টি পাই তবে এ অশান্ত মন শান্ত হবে।তুমি কি ভালোবাসবে আমায়!’

গোসল সেরে শুদ্ধতা আর রৌদ্রুপ ঘরে চলে এলো।প্রথমে রৌদ্রুপ চেঞ্জ করলো তারপর শুদ্ধতা।চেঞ্জ করে রুমে আসতেই দেখলো ঘরে রৌদ্রুপ নেই।নিশ্চয়ই বাইরে গেছে।যাক!তাতে আমার কি!শুদ্ধতা ডোন্ট কেয়ার মাইন্ডে নিচে চলে এলো কিচেনে যাওয়ার জন্য।নাস্তা খেতে হবে।তখন থেকে পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।কিচেনে এসে শুদ্ধতা অবাক।রৌদ্রুপ রুটি সেকছে।শুদ্ধতাকে দেখে বলল,’আলু ভাজতে পারো?’

‘হ্যাঁ পারি।’

‘ভেজে ফেলো।আমি আলু কেটে রেখেছি।’

শুদ্ধতা ফ্রাইপ্যানে আলুভাজি করতে লাগলো।ভাজা শেষে দু’জনই নাস্তা করলো।নাস্তা করতে করতে হঠাৎই শুদ্ধতার মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিলো।আচ্ছা এতো বড়ো বাড়িতে লোকটা একা থাকে?এর বাবা মা নেই?শুদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চেয়ে বলল,’আচ্ছা আপনার বাবা মা নেই?’

‘এক্সিডেন্টে বাবা,মা,বোন মারা যায় আমিই শুধু বেঁচে আছি।চারবছর বয়সেই একা হয়েছি।’রৌদ্রুপ ম্লান কন্ঠে জবাব দিলো।শুদ্ধতার কষ্ট হলো।একটু হলেও রৌদ্রুপের কষ্ট’টা আচ করতে পারছে সে।নিজেও তো জন্মের পর থেকে মা’কে পায় নি।শুধু বাবাকেই পেয়েছে।সেই হিসেবে রৌদ্রুপের চেয়ে সে ভাগ্যবান।সে তো বাবাকে পেয়েছে কিন্তু মানুষটা তো কাউকেই পায় নি।শুদ্ধতা দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে রৌদ্রুপের দিকে তাকালো।কেমন একটা বিষাদে ছেয়ে আছে মুখটা।ভালো লাগছে না।এই গুমোট ভাবটা কাটাতে শুদ্ধতা বলল,’আচ্ছা আপনি কয়টা প্রেম করেছেন?’

‘হিসেব নেই অনেকগুলো।’

‘কি!আপনি প্লে বয় ছিলেন?’শুদ্ধতা ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করলো।

‘না তবে কাজ হাসিলের জন্য করতে হয়েছে।’

‘কি এমন কাজ যে প্রেম করতে হলো!’

‘জানবে আস্তে আস্তে।’

শুদ্ধতা মনে মনে একটা ভেংচি কাটলো।তারপর বলল,’ভালোবেসেছেন কাউকে?’

রৌদ্রুপ হাসলো।তারপর শুদ্ধতার দিকে চেয়ে বলল,’তোমার কি মনে হয়?’

‘আমার মনে হয় আপনি ছ্যাঁকা খেয়েছেন।’কিছুটা দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল শুদ্ধতা।

শুদ্ধতার কথা শুনে রৌদ্রুপ উচ্চস্বরে হাসলো।তারপর বলল,’না যাকে ভালোবাসি সে এখন আমার।আমাকে ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই তার।’

মনে মনে হলো কথাগুলো ওকেই ইঙ্গিত করে বলেছে রৌদ্রুপ তবে শিউর না!একটা মেয়েকে কাল দেখেই ভালোবেসে ফেলেছে কিভাবে?এটা নিতান্তই ফ্লার্টিং ছাড়া কিছুই না যেহেতু এতগুলো প্রেম করেছে সেহেতু এগুলো ব্যাপার না।শুদ্ধতা পাত্তাই দিলো না এদিকে রৌদ্রুপের অনুভূতিগুলো যে সত্যি ছিলো তা টেরই পায় নি সে।

একবার চেয়েছিলো নিজের বাড়িতেই পার্টিটা এরেন্জ করবে কিন্তু পরে কিছু একটা ভেবে একটা ক্লাবেই করাটাই ঠিক মনে করলো রৌদ্রুপ।আরমান সাহরীফকেও জানিয়ে দিলো।এখন বেশ কিছু কাজ আছে তাই শুদ্ধতাকে বলল,’শোনো শুদ্ধ আমার একটু কাজ আছে।আমি কাজটা শেষ করেই ফিরবো।তুমি বাড়ির বাইরে যাবে না।আর কোনো সমস্যা হলে আমাকে ফোন দিবে।’

‘আচ্ছা।আপনার বাসায় বই নেই?’

‘শোনো এটা আমাদের বাসা।এখন থেকে আপনার বাসা,আপনার বাসা করবে না।বলবে আমাদের বাসা।হ্যাঁ আছে।’

‘কোথায়?’

‘চলো।দেখাচ্ছি।’

রৌদ্রুপ শুদ্ধতাকে নিয়ে নিচ তলার একটা ঘরে এসে ঢুকলো।ঘরটা শুধু বই দিয়ে সাজানো।অনেক বড় ঘর এটা।কম করে হলোও দশহাজার বই আছেই।শুদ্ধতা অবাকের চূড়ায় পৌছে গেলো।এই লোক এতো বই পড়ে!শুদ্ধতা সামনের সারির থেকে একটা বই নিয়ে বলল,’আপনি বইও পড়েন?’

‘সন্দেহ আছে?’

‘সন্দেহ না আমি তো ভাবতেই পারি নি আপনি বইও পড়েন।’

‘এমন অনেক কিছুই দেখবে সামনে যা তুমি ভাবতেও পারবে না কিন্তু ঘটবে।’রৌদ্রুপের ঠোঁটে রহস্যের এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো।

শুদ্ধতা কৌতুহলী গলায় বলল,’আচ্ছা মাঝে মাঝে আপনি এমন রহস্যজনক কথা বলেন যে আমি আগামাথা খুঁজে পাই না।’

‘পাবে।শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করো।আচ্ছা আসি।’এটা বলেই রৌদ্রুপ বেরিয়ে গেলো শুদ্ধতাকে কথা বলতে না দিয়েই।শুদ্ধতা ‘এঞ্জেলস এন্ড ডেমনস ‘ ড্যান ব্রাউনের এই বইটি নিয়ে বসে পড়লো।বই পড়তে বসলে শুদ্ধতার হুশঁ থাকে না।ওর সামনে মার্ডার অথবা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হলেও না।
————–
রৌদ্রুপ ফিরলো দুপুরের কিছু পরে।ফিরেই দেখতে পেলো শুদ্ধতা বইটা বুকের ওপর রেখে ঘুমিয়ে গেছে।রৌদ্রুপ মুচকি হেসে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো।তারপর ঘরে এসে আদুরে কন্ঠে শুদ্ধতাকে ডাক দিলো,’এই শুদ্ধ ওঠো।খাবে না?’

শুদ্ধতা ঘুম জড়ানো চোখে একবার রৌদ্রুপকে দেখে নিয়ে বলল,’কখন আসলেন?’

‘মাত্রই।’

শুদ্ধতা উঠে বসলো।খোলা চুলগুলো হাত খোঁপা করে বলল,’একটু আগেই চোখ লেগে গিয়েছিলো।’

‘আচ্ছা এখন হাতমুখ ধুয়ে আসো।খাবে।আমি খাবার এনেছি।’

‘আচ্ছা আপনার বাসায় সার্ভেন্ট নেই কেনো?এতো বড়ো বাড়িতে কোনো সার্ভেন্ট নেই?’

‘নাহ!আমি এই বাড়িতে থাকি না।সেইজন্য এখানে কোনো সার্ভেন্ট নেই।’

‘তাহলে আপনি কোথায় থাকেন?’

‘আজ রাতে জানবে।’রৌদ্রুপের কন্ঠে আবারও রহস্য।

শুদ্ধতার মস্তিষ্কে রৌদ্রুপ সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন জমা হচ্ছে।এই মানুষটা এতো রহস্যময় কেনো?
সবসময় রহস্য দিয়ে আবৃত রাখে নিজেকে।

দুপুরের খাওয়া শেষে শুদ্ধতা অসমাপ্ত বইখানা আবারো পড়া শুরো করলো আর রৌদ্রুপ চিন্তিত মুখে কম্পিউটারে কিছু একটা টাইপ করছে।হঠাৎ রৌদ্রুপের ফোন কল আসায় রিসিভ করলো।ওপাশ থেকে কেউ কিছু একটা বলতেই রৌদ্রুপ তড়িঘড়ি করে কম্পিউটারটা বন্ধ করে বলল,’ওকে।আমি আসছি।’

তারপর সোফা থেকে উঠে শুদ্ধতাকে বলল,’আরেকটা কাজ পড়ে গেলো।আমি সন্ধ্যার আগেই ফিরবো।তুমি প্লিজ কষ্ট করে একটু থেকো।’

এটা বলেই রৌদ্রুপ বেরিয়ে গেলো।শুদ্ধতা বেশ অবাক হলো।এমন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যাওয়ার রহস্যটা কি?রৌদ্রুপ সম্পর্কে প্রশ্নগুলো জেঁকে ধরেছে ওকে।এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।শুদ্ধতা বইটা রেখে রৌদ্রুপের আলমারি খুঁজতে লাগলো।

চলবে…
(ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here