সেই_আদুরে_দিন পর্বঃ০৬

0
237

সেই_আদুরে_দিন
পর্বঃ০৬
#Arshi_Ayat

গুলির শব্দে শুদ্ধতার মনে হলো একমুহূর্তের জন্য ওর আত্মাটাই উড়ে গেলো।যেনো গুলিটা ওর হৃৎপিণ্ড ফুটো করে বেরিয়ে গেছে।একদম ভয়ে তটস্থ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।শুদ্ধতার ভীতি টের পেয়ে রৌদ্রুপ বলল,’ভয় পেয়ো না শুদ্ধ।আমি থাকতে কিচ্ছু হবে না তোমার।সাহস রাখো।’

রৌদ্রুপ শুদ্ধতার একহাত শক্ত করে ধরে দৌড়ানো শুরু করলো।এই সাইডটা বাড়ির পেছনের সাইড।এখানে পর পর কয়েকটা বাড়ি কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে।কয়েকটা অর্ধনির্মিত আরো কয়েকটার কাজ শুরু হয়েছে।রৌদ্রুপ শুদ্ধতাকে নিয়ে বাড়িরগুলোর ভেতর দিয়ে যাওয়া শুরু করলো।কয়েকটা বাড়ি পেরুনোর পর একটা বাড়িতে এসে থামলো।এই বাড়িটাও অর্ধনির্মিত।এখনও বিল্ডিং এর কাজ চলছে।মধ্যরাত হওয়ায় বাড়ির ভেতরে পুরো অন্ধকার।রৌদ্রুপ শিস দিতেই দোতলা থেকে একটা লোক বেরিয়ে এলো।লোকটার হাতে টর্চ ছিলো।রৌদ্রুপ ওকে দু’টো পেনড্রাইভ দিয়ে বলল,’এটা টমস’কে দিবে।আর বলবে সিশা’কে পৌঁছে দিতে।’

‘ওকে।তুমি কবে ফিরছো?’

‘খুব শীঘ্রই।’
কথা বলতে বলতেই লোকটা রৌদ্রুপের পেছনে দাড়িয়ে থাকা শুদ্ধতার দিকে লক্ষ্য করে বলল,’ও কে?’

‘ফিরে বলবো।’

‘ওকে।সিশা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে তাড়াতাড়ি ফিরো।’এটা বলেই লোকটা দ্রুত চলে গেলো।এরপর রৌদ্রুপ শুদ্ধতাকে নিয়ে বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এর পাশে দিয়ে যাওয়া সরু গলিটা দিয়ে ঢুকে পড়লো।
————–
রৌদ্রুপের সারা বাড়িতে আলো জ্বলছে।নির্দিষ্ট পোশাক পরা চারজন লোক প্রতিটা রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কাউকে পায় নি।শেষে ওর ঘর থেকে কম্পিউটার আর একটা চিরকুট পেলো ওদের মধ্যে একজন।সেটা এনে দলপতি গোছের একজনকে দিয়ে বলল,’নিক্স, ওর ঘর থেকে এগুলোই পাওয়া গেছে।’

নিক্স নামক লোকটা কম্পিউটারটা হাতে নিয়ে ওপেন করলো।পুরো কম্পিউটার ব্লাঙ্ক!মনে হয় সদ্য কেনো কম্পিউটার এটা।কিছুই সেটআপ দেওয়া নেই।তার মানে রৌদ্রুপ যাওয়ার সময় এটা ফ্ল্যাশ দিয়ে গেছে।কম্পিউটারটা সজোরে বন্ধ করে লোকটা চিরকুট’টা খুললো সেখানে লেখা আছে

‘ইউর গেম ইজ ওভার বি প্রিপেয়ার ফর দ্য আউটকাম।'(তোমার খেলা শেষ এবার পরিণতির জন্য প্রস্তুত হও।)

তীব্র আক্রোশে চিরকুট’টা ছিড়ে কুটিকুটি করে ফেললো নিক্সন।হুংকার দিয়ে বলল,’রিভান যাও আনা আর ভিকি’কে ডাকো এক্ষুনি।’

নিক্স এর নির্দেশ পেয়ে রিভান ওই দুইজন সঙ্গীকে ডাকতে গেলো।প্রায় সাথে সাথেই আনা আর ভিকি হাজির হলো সাথে রিভানও।নিক্স ঘাবড়ে গেলেও সাথীদের সামনে নিজের অভিব্যক্তি লুকিয়ে বলল,’পুরো বাড়ি কি খুঁজেছো তোমরা?’

নিক্সের প্রশ্নের উত্তরে আনা বলল,’ইয়েস,বাট হি ইজ নো হয়ার।’

‘আমি জানতাম ও পালাবে।ছাঁদে দেখেছো?’

‘হ্যাঁ সবটা দেখা শেষ।তবে কোনো গুপ্ত পথ দেখি নি।যেটা দিয়ে ও বের হবে।’ভিকি’র গলায় উত্তেজনা।

‘তাহলে জলজ্যান্ত একটা মানুষ এভাবে হওয়া হয়ে যেতে তো পারে না।নিশ্চয়ই কোনো কারসাজি ঘটিয়েছে।’নিক্স বলল।

‘একটা নয় দু’টো।’নিক্সের কথা শেষ হতেই রিভান সংশোধনী দিয়ে বলল।

‘মানে?’কথাটা ভিকি বললেও রিভান বাদে তিনজনের গলায় গাঢ় কৌতুহল।

‘ওর ঘরে মেয়েদের কাপড় পাওয়া গেছে।তারমানে ওর ঘরে ও ছাড়াও একটা মেয়ে ছিলো।আর ওরা দু’জন একসাথেই পালিয়েছে।’রিভান বলল।

‘ওটা সিশা নয় তো?’আনার কন্ঠে সন্দেহ।

‘নাহ!সিশা হবে না।ওরা এতো কাঁচা কাজ করবে না।অন্য কেউ হবে।’আনার সম্ভবনাকে উড়িয়ে দিয়ে নিক্স বলল।আর নিক্সের কথাটা সত্যিই।যেকোনো অপারেশনে সিশা আর রৌদ্রুপ একসাথে আসে না কখনোই।কখনো রৌদ্রুপ তো কখনো সিশা!

‘তাহলে কে হবে মেয়েটা?মেয়েটাও কি সংযুক্ত নাকি ওদের সাথে?’ভিকি বলল।

‘কিছু আন্দাজ করা যাচ্ছে না।তবে ওরা গেলো কোন দিক দিয়ে সেটাই বুঝছি না।’আনা হতাশ হয়ে বলল।

‘ও অনেক ধূর্ত!হয়তো আমরা ভাবতেও পারবো না এমন কোনো গুপ্ত রাস্তা বানিয়েছে।’রিভান বলল।

‘বাগানটা দেখেছো?’নিক্স প্রশ্ন করলো।

‘বাগানটা দেখতে হবে।ভিকি আর রিভান আমার সাথে আসো।আনা তুমি ওর ঘরে গিয়ে দেখো মেয়েটার আইডেন্টিটি পাওয়া যায় কি না!’

‘ওকে।’
নির্দেশ মেনে আনা রৌদ্রুপের ঘরের দিকে চলে গেলো।নিক্স,ভিকি আর রিভান বাগানে গেলো।
——————-
শুদ্ধতা প্রায় বসে পড়েছে।এতো জোরে কখনো দৌড়ায় নি সে।শরীরটা অস্থির!অস্থির! লাগছে।রৌদ্রুপ তো এতে অভ্যস্ত তাই তার তেমন একটা সমস্যা হয় নি তবে এখন মূল সমস্যা হলো কোনো ট্যাক্সি,সি এন জি বা বাস কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।তাও যা পাওয়া যাচ্ছে তারা কেউ থামছে না।অবশ্য রাত চারটায় কেই বা রিস্ক নিয়ে সি এন জি থামিয়ে ওদের উঠাবে।রৌদ্রুপ অনেক্ক্ষণ ধরে চেষ্টা করছে একটা সি এন জি থামানোর কিন্তু কেউই সাড়া দিচ্ছে না।

শুদ্ধতা নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাড়িয়ে বলল,’আমি একটু চেষ্টা করে দেখি!’

‘লাভ নেই থামবে না ওরা।’

‘চেষ্টা করতে তো দোষ নেই।’

‘এতক্ষণ তো আমি চেষ্টা করেছি কই থেমেছে?’রৌদ্রুপের গলায় তাচ্ছিল্য।

‘আচ্ছা আমি করি।আপনি একটু দূরে সরে দাড়ান।’

‘কেনো?’

‘আরে বাবা আমি পালিয়ে যাবো না।আপনার সাথেই যাবো।শুধু একটু দূরে গিয়ে দাড়ান।সি এন জি থামলেই চলে আসবেন।’

রৌদ্রুপ গম্ভীর গলায় বলল,’যাচ্ছি তবে আমি তোমার জামাই আর জীবনেও বাবা,ভাই বা হাবিজাবি কিছু বলবে না।’

‘এটা তো কথার কথা।’

‘যে কথাই হোক নো মিনস নো!’এটা বলেই রৌদ্রুপ শুদ্ধতার থেকে কিছুটা দুরত্বে দাড়ালো।শুদ্ধতা বিড়বিড় করে রৌদ্রুপ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে গিয়ে মেইন রাস্তায় নেমে দাড়ালো।দুরে একটা সি এন জি আসতে দেখে একটু স্টাইল করে দাড়িয়ে হাত দেখালো।ব্যাস কাজ হয়ে গেলো।সি এন জি থেমে গেলো শুদ্ধতার সামনে।ভেতরে কেউ নেই শুধু চালক ছাড়া।চালকটাকে দেখতে বদ লোক লাগছে।খুব বাজে ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে হলুদ দাঁত গুলো বের করে বলল,’ওঠেন!কই যাইবেন আপনে?’

শুদ্ধতা কিছু বলার আগেই রৌদ্রুপ চলে এলো।শুদ্ধতাকে নিয়ে সি এন জি তে উঠে বলল,’সোজা কমলাপুর স্টেশনে চলে যাও।’

‘আপনে উঠছেন কেন?এই আপা যাইবো।এই আপারে নিয়া যামু।আপনে নামেন।’

রৌদ্রুপ পকেট থেকে পয়েন্ট ফর্টিফাইভ কোল্ট রিভালবারটা বের করে পেছন থেকে চালকের চুলের মুঠি ধরে ওর রিভলবারটা ওর কাপলে ঠেকিয়ে বলল,’সোজা স্টেশনে যাবি।যদি হের ফের হয় সোজা উপরে চলে যাবি।’

রৌদ্রুপ অগ্নিমূর্তি আর রিভালবারের চেহারা দেখে চালক ভয়ে আর পিছনেই তাকালো না সোজা সি এন জি স্টার্ট দিলো।
————-
বাগানের ঝোপঝাড়ে খুঁজতে খুঁজতে ভিকি দেয়ালের শেষ মাথায় একটা সরু গেট পেলো।গেট’টা খোলা।এখান দিয়ে যে কেউ হামাগুড়ি দিয়ে যাতে পারবে।আর এটা এমনভাবে বানানো যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না এখানে একটা গুপ্ত রাস্তা আছে।

ওই মিনি গেইট’টা দেখতে পেয়ে ভিকি নিক্স আর রিভানকে ডাক দিলো।ওরাও এসে দেখলো।নিক্স এক হাত মুট করে আরেকহাতে ঘুষি দিয়ে ক্রোধিত গলায় বলল,’শীট!আমি এমনই কিছু আন্দাজ করেছিলাম।ও যা হারামি ওকে পেতে হলে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হবে।এর আগের বারও আমাদের সামনে দিয়ে ভিখিরি সেজে পালিয়েছিলো।’

‘হ্যাঁ সেইবার একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছিলো হারামিটা।’রিভান আফসোসের স্বরে বলল।

‘আমাদের একটা ভুল হয়েছিলো প্রথমেই একদমই উচিত হয় নি ওর বাড়ির সামনে গাড়িগুলো দাড় করানো।’ভিকি বলল।

নিক্স কিছু বলতে যাওয়ার আগেই আনা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো।তারপর উত্তেজনাপূর্ণ গলায় বলল,’গাইজ!লুক এটা দ্য এন আই ডি।’

নিক্স আনা’র হাত থেকে এন আই ডি টা প্রায় ছিনিয়ে দিয়ে দেখলো।এটা একটা মেয়ের এন আই ডি।ভিকি আর রিভানও দেখতে লাগলো এটা।

নামঃ শুদ্ধতা সাহরীফ
মাতার নামঃ অনিতা হাসান
পিতার নামঃ আরমান সাহরীফ
জন্ম তারিখঃ…./……/……
এন আই ডি নম্বরঃ………….

ভালো মতো শুদ্ধতার এন আই ডি দেখে নিলো চারজনই।তারপর নিক্স বলল,’এই মেয়ের খোঁজ নিতে হবে।হয়তো মেয়েটাই সাথে ছিলো ওর।এখন এই মেয়েটার সাহায্যেই ওর কাছে পৌঁছানো যাবে।’

নিক্সের কথায় সবাই সম্মতি দিলো।তারপর ওরা বেরিয়ে পড়লো রৌদ্রুপের বাড়ি ত্যাগ করে।

চলবে…
(ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here