সেই_আদুরে_দিন পর্বঃ১১

0
204

সেই_আদুরে_দিন
পর্বঃ১১
#Arshi_Ayat

অনেক্ক্ষণ বাদে রৌদ্রুপের ঘুম ভাঙলো।শুদ্ধতার মসৃণ পেট থেকে মাথাটা তুলে ওর দিকে চেয়ে দেখলো ও ঘুমিয়ে আছে।রৌদ্রুপ মুচকি একটু হেসে ওর পেটে আলতো একটা চুমু খেয়ে পেট’টা ঢেকে দিয়ে উঠে পড়লো।

এখন রাত বারোটা।সন্ধ্যাবেলা ঘুমানোর কারণে এই রাতে আর ঘুম আসবে না কারোই।অবশ্য রৌদ্রুপের ঘুম ভাঙলেও শুদ্ধতার দ্বিতীয়বারের ঘুমটা এখনো ভাঙেনি তবে আশা করা যায় তাড়াতাড়িই ভাঙবে ঘুমেরও তো একটা লিমিটেশন আছে সব ঘুম ফুরিয়ে গেলে শত চেষ্টা করেও একফোটা ঘুমও আসে না।

রৌদ্রুপ ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখলো শুদ্ধতা আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসেছে।আধভেজা লম্বা কালো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পিঠময় ছড়িয়ে আছে।ওকে দেখতে পেয়েই শুদ্ধতা বলল,’এখানে কি নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়?’

‘না এখানে নেট পাওয়া যায় না।কেনো?’

‘বাবার সাথে তিনদিন ধরে কথা হয় না।’শুদ্ধতা মন খারাপ করে বলল।রৌদ্রুপ ওর পাশে এসে বসে বলল,’চিন্তা করো না আর কয়েকটা দিন এরপর আমরা তোমার বাবার সাথে দেখা করে আসবো।’

‘আচ্ছা।’মলিন মুখে শুদ্ধতা জবাব দিলো।
ওর মন ভালো করতে রৌদ্রুপ বলল,’কফি খাবে?’

শুদ্ধতা কিছু বলল না শুধু মাথাটা হেলিয়ে সায় দিলো।রৌদ্রুপ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে কফি বানাতে চলে গেলো।
ও যাওয়ার পর শুদ্ধতা ফ্রেশ হতে চলে গেলো।হাতমুখ ধুয়ে এসে চুলগুলোকে হাতখোপা করে বারান্দায় চলে এলো।এখানে আলাদা করে আলোর ব্যবস্থা নেই তবে ঘর থেকে আসা আলোয় অনেকটাই স্পষ্ট বারান্দাটা।এই বারান্দায় গ্রিল নেই।একেবারে খোলা বারান্দা।শুদ্ধতা দরজার পাশের দেয়ালটায় ঠেস দিয়ে বাইরে মুখ করে দাড়িয়ে রইলো।অবশ্য রাত্রির অমানিশায় গাছের কালো কালো মূর্তি আর মেঘাচ্ছন্ন কালো আকাশটা ছাড়া বিশেষ কিছুই চোখে পড়ছে না তবুও শুদ্ধতা বাইরেই চেয়ে আছে।রৌদ্রুপ কফি করে এনে শুদ্ধতাকে এক মগ দিয়ে ওর পাশাপাশি দাঁড়ালো।
——————–
সবেই চোখ লেগে এসেছিলো সিনাতের মানে কাঁচাঘুম যাকে বলে তবে এখনো চেতনা আছে ওই ঘুমেই বুঝতে পারলো ঘরে কেউ এসেছে!কিন্তু রুমের দরজা তো লাগানো!আসবে কিভাবে?নাকি হ্যালুসিনেশন!সন্দেহ দূর করতে সিনাত চোখ খুললো অন্ধকারে চোখ বুলাতেই একটা কালো ছায়ামূর্তি!আতংক গ্রাস করলো ওকে!গলা ফাটিয়ে চিৎকার করার পূর্বেই ওটা ওর ওপর ঝাপিয়ে পড়লো।তারপর সব অন্ধাকার!

ভিকি সিনাতকে কাঁধে নিয়ে বারান্দা দিয়ে নেমে গেলো।নিচে আনা আর রিভান অপেক্ষা করছে গাড়ি নিয়ে।রাত বেশ হওয়ায় সিনাতকে অপহরণ করতে বেশি একটা সমস্যা হয় নি ওদের।

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন মাথাটা ব্যাথা করতে লাগলো সিনাতের।আস্তে আস্তে চোখ খোলার পর দেখতে পেলো বড়ো একটা গোডাউনের মাঝখানে ওকে বেঁধে রাখা হয়েছে।সিনাত ভয় পেয়ে যায় তড়িঘড়ি করে নিজের শরীরের দিকে তাকায়।নাহ!জামা কাপড় ঠিকই আছে।খারাপ কিছু হয় নি।কিন্তু কারা এভাবে তুলে আনলো ওকে!
—————-
সকালের মিষ্টি রোদ আর স্নিগ্ধ হওয়ায় জুড়িয়ে যাচ্ছে ঘুমন্ত দু’টি দেহ।ছেলেটা সযত্নে মেয়েটাকে বুকের ভেতর আগলে রেখে ঘুমচ্ছে আর মেয়েটাও নিজের বাসভবন মনে করে তৃপ্তি নিয়ে নিদ্রাযাপন করছে।

কাল সারারাত কেউই ঘুমাই নি কাটিয়েছে কিছু একান্ত নিরিবিলি সময়।কখনো মুখ দিয়ে কথা ফুলঝুরি বেড হচ্ছিলো তো কখনো চোখে চোখে প্রেমনিবেদন হচ্ছিলো শেষে রাতের অন্তিম প্রহরে ভালোবেসে কাছে এসেছিলো দুজনেই তবে প্রকাশটা এখনো উহ্যই!

শুদ্ধতার ঘুম ভাঙতেই সে সন্তপর্ণে রৌদ্রুপের বুক থেকে নিজের মাথাটা তুলে নিলো ওর ঘুমন্ত চেহারার দিকে একবার চাইতেই আবিষ্কার করলো ছেলেটা ঘুমিয়েও হাসে।একটা মিষ্টি হাসির রেশ ঠোঁট জুড়ে লেগে আছে।ওর ভিষণ ইচ্ছে করলো ঠোঁট’টায় আলতো একটা চুমু খেতে।না না ইচ্ছে না কেবল রীতিমতো লোভ লাগছে!কিন্তু যদি উঠে পড়ে তাহলে তো লজ্জায় মুখও দেখানো যাবে না।আবার এদিকে ক্রমেই লোভটা বেড়ে যাচ্ছে।কি আর করার চোখ বন্ধ করে দিয়েই দিলো কিন্তু বিপত্তি ঘটলো তখন যখন ওষ্ঠজোড়া মিলিয়ে ও চোখ খুলতেই রৌদ্রুপের নয়নে নয়ন পড়লো।সে কি লজ্জা!মনে হচ্ছে কোনো কিছু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছে।শুদ্ধতা তড়াক করে উঠে বসে লজ্জায় লাল হয়ে অন্যদিকে চেয়ে রইলো।
—————-
সিনাতের দৃষ্টি বরাবর একটি মেয়ে বসে আছে।ওর মুখ ঢাকা বলে চাহারা দেখা যাচ্ছে না তবে তীক্ষ্ণ দু’টি চোখের একমাত্র লক্ষ্যবস্তু সিনাত।মেয়েটা কাট কাট গলায় প্রশ্ন করলো,’শুদ্ধতা সাহরীফ নামের কাউকে চেনেন?’

সিনাতের ভ্রু কুঁচকে গেলো।ওর শুদ্ধতার খোঁজ করছে কেনো?সিনাত আগামাথা খুঁজে পাচ্ছে না।কিডন্যাপ করেছে ওকে অথচ খুঁজছে শুদ্ধতাকে!স্ট্রেঞ্জ!

‘হ্যাঁ।’সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো সিনাত।

‘কে হয় আপনার ?’

বিরক্ত লাগছে সিনাতের।এসব ফর্মালিটি কেনো করছে?যা বলার যার জন্য এনেছে তা বললেই তো হয়।নেহাৎ কিছু না জেনে অবশ্যই কিডন্যাপ করে নি।মনে মনে বেশ বিরক্ত হলেও সিনাত স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,’আমার বান্ধবী।’

‘সে এখন কোথায় বলতে পারেন?’

‘যেহেতু বিয়ে হয়েছে সেহেতু শ্বশুরবাড়িই থাকবে।’

‘কবে বিয়ে হলো?’

‘এই তো পাঁচ/ছয়দিন হয়েছে।’

‘আচ্ছা।এই ছেলেটা কে চেনেন?’প্রশ্নটা করেই মেয়েটা সিনাতের দিকে রৌদ্রুপের ছবিটা বাড়িয়ে দিলো।ছেলেটাকে দেখে মন হচ্ছে না আগে এর সাথে দেখা বা কথা হয়েছে।এই প্রথমই দেখছে।মাথা নেড়ে না বোধক উত্তর দিলো সিনাত।ছবিটা রেখে দিয়ে মেয়েটা বলল,’আপনার বান্ধবীর যার সাথে বিয়ে হয়েছে তাকে আপনি চেনেন?’

‘নামটা ঠিক ঠাক মনে নেই।রাদিফ টাদিফ হতে পারে তবে লোকটা বুড়ো।’

‘ছবি দেখাতে পারবেন?’

‘হ্যাঁ তবে ছবি আমার ফোনে।আর ফোন তো বাসায়।’

মেয়েটা ওর জিন্সের পকেট থেকে একটা ফোন বের করে সিনাতের সামনে ধরতেই ফোনের লক খুলে গেলো।তারপর গ্যালারি তে গিয়ে রিসেন্ট ছবিগুলো দেখতেই শুদ্ধতাকে দেখতে পেলো এবং পাশে দাড়ানো একটা বুড়ো লোককেও দেখা গেলো।মেয়েটা ফোন ঘুরিয়ে সিনাতের দিকে ফিরিয়ে বলল,’এই লোকটাই আপনার বান্ধবীর বর?’

‘জ্বি হ্যাঁ।’
সিনাতের উত্তর শুনে আনা চিন্তিত হলো।আরো কিছুক্ষণ জিগ্যাসাবাদ শেষে আনা যখন চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাড়ালো তখন সিনাত বলল,’আমাকে এভাবে কিডন্যাপ করা হয়েছে কেনো?’

‘সময় হলে সব বুঝবে।’এটা বলেই ঘুরে দাড়ালো যাওয়ার জন্য।একটু এগুতেই একটা কল পেলো সে।নিক্সের ফোন।ফোনটা রিসিভ করে কানে রাখতেই সিনাতের চেহারার পরিবর্তন ঘটলো।দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো।কারণ এই মাত্র নিক্স বলল শুদ্ধতার বাবাকে নাকি পাওয়া যাচ্ছে না।রিভান একটু আগে গিয়ে দেখলো চেয়ারটা খালি পড়ে আছে।আশেপাশে খুজেও লোকটাকে পাওয়া যায় নি।ওই লোকটাকে ধরতে হবে।এইজন্যই নিক্স ফোন দিয়ে আনাকে সব জানালো।
————-
লজ্জায় এখন আর রৌদ্রুপের মুখের দিকে তাকাতেই পারছে না শুদ্ধতা এদিকে রৌদ্রুপ মজা নিচ্ছে এটা নিয়ে।না ওকে কিছু বলতে পারছে না সইতে পারছে।কেনো তখনই ওর ঘুমটা ভাঙতে হলো।ইশ!
আবার ওকে এড়ানোও যাচ্ছে না।কি মসিমত!মনে মনে নিজেকে হাজারটা গালি দিলো।ওকে শুনিয়ে শুনিয়ে রৌদ্রুপ বলতে লাগলো,’চুরি করে চুমু খাওয়ার মজাই আলাদা তাই না শুদ্ধ?’

রাগ হলো ওর।একটা ব্যাপার নিয়ে এমন মজা না নিলেই নয়!এবার শুদ্ধতা তেড়ে গিয়ে রৌদ্রুপের শার্টের কলার ধরে বলল,’বেশ করেছি দিয়েছি আরো দিবো।চুরি করে কেনো!প্রকাশ্যে আপনার সামনে দিবো।দেখবেন!’
এটা বলেই শুদ্ধতা উঁচু হয়ে রৌদ্রুপের গালে একটা চুমু খেলো।এদিকে রৌদ্রুপ মিটিমিটি হাসতে লাগলো।রেগে গেলে যে মেয়ে মানুষের হুশ থাকে না শুদ্ধতাই তার ছোটোখাটো প্রমাণ।

চলবে…
(ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here