সেই_আদুরে_দিন পর্বঃ১৭

0
266

সেই_আদুরে_দিন
পর্বঃ১৭
#Arshi_Ayat

গালটা চিন চিন করে উঠলো।শ্বশুরের সামনে মান সম্মান শেষ করে দিলো মেয়েটা।এখন আবার গাল ফুলিয়ে বসে আছে শিওর।

মেয়ে চলে যাওয়ার পর আরমান সাহরীফ হতাশ গলায় বললেন,’ছোটোবেলা থেকেই মেয়েটা এমনই।আমার সামান্য জ্বরও সহ্য করতে পারে না।তুমি প্লিজ কিছু মনে করো না।বোঝোই তো মা মরা মেয়ে।পৃথিবীতে ওর কেবল আমি আর তুমি ছাড়া কেউ নেই।ওকে একটু ওর মতো করে বুঝে নিও।’

‘না বাবা কিছু মনে করি নি আমি জানি ও আপনাকে কতোটা ভালোবাসে।আর ওকে না জানিয়ে এই কাজটা করায় ও অনেক হার্ট হয়েছে।সমস্যা নেই আমি ওকে মানিয়ে নিবো।আপনি রেস্ট করুন।আমি দেখি কোথায় আছে।’

এটা বলেই রৌদ্রুপ চলে গেলো শুদ্ধতাকে মানাতে।

এপার্টমেন্টের ছাদে দাড়িয়ে আছে শুদ্ধতা।উত্তপ্ত রোদে মাথার তালু,হাত,পা গরম হয়ে যাচ্ছে তবু নড়ছে না।ঠিক করেছে নড়বেও না।সাহস কি করে হয় এই কাজটা করার?আজকে যদি বাবার কিছু হয়ে যেতো!তাহলে?

একটু পর রৌদ্রুপও ছাদে এলো।নিঃশব্দে শুদ্ধতার পাশে এসে দাড়ালো।যদিও শুদ্ধতা সেটা খেয়াল করেছে তবুও কিছু বলে নি।বলবেও না কারণ সে রাগ করেছে আর রাগ করলে কথা বলা যায় না।

বেচারা রৌদ্রুপ চড় খেয়েও অপরাধী গলায় বলল,’সরি!’

কিন্তু এইটুকুন সরি তে চিড়ে ভিজলো না।বিশাল আকারের একটা সরি লাগবে বোধহয়।কিন্তু এখন তো সময় নেই বের হতে হবে।ওইদিকে ওরা অপেক্ষা করছে।যেতেই হবে।রৌদ্রুপ একপলক শুদ্ধতার দিকে তাকিয়ে চলে গেলো।ওকে চলে যেতে দেখে শুদ্ধতা বেক্কলের মতো চেয়ে রইলো।মাত্র একটা সরি!এতোই দায়সারা?সরি’র পর আর কিছুই বলার প্রয়োজন মনে করলো না?ঠিক আছে না বলুক!দরকার নেই বলার।ঠিক এমুহূর্তে শুদ্ধতার রাগ,অভিমান দুটোই হচ্ছে সাথে আবার অনুশোচনাও।চড়টা মারা বোধহয় ঠিক হয় নি!
——————
জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় নেওয়া হচ্ছে ওদের চারজন কে।

সেদিন ভিকিকে টর্চার করে ওকে দিয়ে ফোন করিয়ে ট্র্যাপে ফেলে ওদেরকে ধরা হয়েছে।মূলতঃভিকির ফোন পেয়েই ওরা আর সিনাতকে খোঁজে নি।ফোনে ভিকি গোয়েন্দাদের শেখানো কথাই বলেছিলো ফলে ওরা বিশ্বাস করে টোপ’টাও গিলে ফেলেছে।এতো বাজে ভাবে ধরা পড়ে যাওয়ায় নিক্স,রিভান,আনা কারোই মেজাজ ভালো নেই।ভিকির নির্বুদ্ধিতার জন্যই এমনটা হয়েছে।নিজে ধরা পড়ে বাকি সবাইকেও ধরা পড়িয়ে দিলো।প্ল্যানটাই আর সাকসেস হলো না।

প্রথমিক জিগ্যাসা বাদে জানতে পারলো ওরা রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফ এস বি’র গুপ্তচর।এফ এস বি’র সদর দপ্তর মস্কোতে।ওখান থেকেই ওদের পাঠানো হয়েছে রাষ্ট্রের গোপন তথ্য সংগ্রহ করার জন্য।

দ্বিতীয় দফায় আবারো জিগ্যাসা বাদ আর টর্চার করার পর আরো অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।ইতিমধ্যে সংবাদ মাধ্যমেও ছড়িয়ে গেছে খবরটা।সাংবাদিক,মিডিয়া এগুলোকে সামলাতে অবস্থা খারাপ।ওদের কি করবে এ নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত আসে নি।তবে শীঘ্রই আসবে।পুরো আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণেও বিষয়টা ছড়িয়ে পড়েছে।বিভিন্ন দেশ থেকে নিন্দা জানাচ্ছে রাশিয়ার প্রতি।
——————
কাজ শেষ করে আসতে অনেক রাত গেলো।প্রায় দুইটা বাজে।রৌদ্রুপ ভেবেছে শুদ্ধতা ঘুমিয়ে পড়েছে।তাই এক্সট্রা চাবি দিয়ে ঘরে ঢুকে একবার শুদ্ধতার বাবার ঘরে উঁকি দিলো।উনি ঘুমাচ্ছেন।তারপর পাশের ঘরে গিয়ে দেখলো শুদ্ধতা বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে,ঘর অন্ধকার।ও ঘুমাচ্ছে ভেবে আর লাইট না জ্বালিয়ে ল্যাম্প জ্বালালো।ল্যাম্পের আলোতে শুদ্ধতার অভিমানী মুখটা স্পষ্ট!হঠাৎ করে ভূতের মতো শুদ্ধতা চোখ খুলে ফেললো।রৌদ্রুপ খানিকটা চমকালেও বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,’ঘুমাও নি এখনো?’

শুদ্ধতা ওর কথার উত্তরে কিছু বলল না।শুধু থমথমে গলায় বলল,’ফ্রেশ হয়ে আসুন।খিচুড়ি রান্না করেছি।গরম করে দিচ্ছি।’

‘তুমি খেয়েছো?’

শুদ্ধতা কিছু বলল না।বিছানা থেকে নেমে গটগট করে হেটে চলে গেলো।রৌদ্রুপ সামান্য একটু হেসে শাওয়ার নিতে চলে গেলো।গোসল করে বেরিয়ে এসে দেখলো শুদ্ধতা একপ্লেট খিচুড়ি নিয়ে এসেছে।রৌদ্রুপ টাওয়াল দিয়ে চুল মুছে শুদ্ধতার পাশে গিয়ে বসলো।খিচুড়ি প্লেট’টা নিয়ে এক লোকমা তুলে শুদ্ধতার মুখের সামনে ধরলো।ও অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।রৌদ্রুপ ক্লান্ত গলায় বলল,’শুদ্ধ!আমি খুব ক্লান্ত।প্লিজ খেয়ে নাও।তুমি খেলেই আমি খাবো।খাওয়ার ওপর রাগ করো না।তোমার রাগ তো আমার ওপর!তাহলে আমার ওপরই রাগ দেখাও।বেচারা খাবার কি দোষ করলো?’

রৌদ্রুপ নরম গলা শুনে শুদ্ধতা কিছুটা গলে গিয়ে রৌদ্রুপের হাত থেকেই খেয়ে নিলো।স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই খাওয়া শেষ।রৌদ্রুপ হাত ধুতে গেছে আর শুদ্ধতা প্লেট রাখতে!

শুদ্ধতা রুমে এসে দেখলো রৌদ্রুপ শুয়ে পড়েছে।সেও ওর পাশে দূরত্ব বজায় রেখে শুয়ে পড়লো।কিন্তু বেশিক্ষণ দুরত্ব থাকলো না।রৌদ্রুপ ওকে জড়িয়ে ধরেছে পেছন থেকে।শুদ্ধতা ধাক্কাধাক্কি করলেও লাভ হলো না।একপর্যায়ে রৌদ্রুপ বলল,’শুদ্ধ!আমার ঘুম পাচ্ছে প্লিজ এমন করো না।তুমি এমন করলে আমার ঘুম আসবে না।’

‘তাহলে ছাড়ুন।আমি অন্যরুমে যাচ্ছি।আপনি ঘুমান।’

‘না তুমি আমার কাছে না থাকলেও আমার ঘুম আসবে না।’

‘কেনো?’

‘বউ ছাড়া কোনো বিবাহিত পুরুষেরই ঠিকঠাক ঘুম আসে না।’

‘বউয়ের সাথে ঘুমের কি কানেকশন?’

‘তুমি বুঝবে না।’

‘এটা কি ম্যাথ যে আমি বুঝবো না!’

‘বুঝলে অবশ্যই জিগ্যেস করতে না।’

শুদ্ধতা কিছু বলল না।কাঠ হয়ে শুয়ে রইলো।রৌদ্রুপ নরম কন্ঠে বলল,’রাগ করেছো বউ?খুব বেশি রাগ?কি করলে রাগ যাবে?’

‘রাগ করি নি।’শুদ্ধতা অন্যদিকে ঘুরে ধরা গলায় বলল।কোনোমতেই সে কান্না করবে না কিন্তু চোখের পানি বাঁধ মানে না।রৌদ্রুপ ওর মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে চোখ মুছে বলল,’সরি লক্ষীটি!আর এমন করবো না।সবসময় তোমাকে সব কথা বলবো।কেঁদো না প্লিজ।আমার খারাপ লাগে।’

শুদ্ধতা চোখ মুছে রৌদ্রুপ বুকে মুখ গুঁজল।এইতো রাগ!অভিমান!সব পানি হয়ে গেছে।এবার রৌদ্রুপ একটু দুঃখের ভান করে বলল,’আমার গালটা এখনো জ্বলছে।’

শুদ্ধতা হেসে ফেললো।ওর গালে একটা চুমু দিয়ে হাত বুলিয়ে দিলো।
————–
অনেক রাতে ঘুমানোর ফলে সকাল আট’টা বেজে গেছে তবুও রৌদ্রুপের ওঠার নামগন্ধও নেই তবে শুদ্ধতা উঠে পড়লো।বাবা আর স্বামীর জন্য নিজের হাতে নাস্তা তৈরি করলো।বাবা কে চা দিয়ে রৌদ্রুপকে ডাকতে গেলো।ওকে কয়েকবার ডাক দিতেই ঘুমঘুম চোখ নিয়ে উঠে বসলো।আর আচমকাই হামলা চালালো শুদ্ধতার ঠোঁটে!শুদ্ধতা অবশ্য বিদ্যুৎ বেগে রৌদ্রুপের ঠোঁটে হাত চাপা দিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,’এসব কি?ব্রাশ না করে চুমু খাওয়া যাবে না।’

রৌদ্রুপ ওর হাত টা নিজের ঠোঁটের ওপর থেকে সরিয়ে বলল,’আর ব্রাশ না করে চুমু খেলেই তো টেস্ট লাগে।’

শুদ্ধতা ভ্রু কুঁচকে,মুখটাকে বিকৃত করে বলল,’ইয়াক!তাড়াতাড়ি যন ব্রাশ করুন।’

রৌদ্রুপ ওকে আবার ধরতে যাওয়ার আগেই শুদ্ধতা ভো দৌড় দিলো।হাসলো রৌদ্রুপ।ফ্রেশ হয়ে নিলো।ইতিমধ্যে শুদ্ধতা নাস্তা টেবিলেও সাজিয়ে ফেলেছে।আরমান সাহরীফ আর রৌদ্রুপও চলে এসেছে।ওরা সবাই একসাথে মাত্রই খেতে বসলো।এরমধ্যেই কে যেনো কলিং বেল চাপলো।শুদ্ধতা উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলো,’স্যুট,টাই পরা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’

ওকে দেখে আগুন্তকঃমেয়েটি বলল,’আপনি কে?’

‘আগে বলুন আপনি কে?’শুদ্ধতা পাল্টা প্রশ্ন করলো।’

‘আমার প্রশ্নের উত্তর দিন আগে।আপনি এখানে কেনো?রৌদ্রুপ কোথায়?কি হন আপনি ওর?’

‘আজব তো!আমি মিসেস রৌদ্রুপ ওয়াইফ ওফ মিস্টার রৌদ্রুপ।’

‘হোয়াট রাবিস!’আগুন্তকঃ মেয়েটি বাজখাঁই গলায় বলে উঠলো।এরমধ্যেই রৌদ্রুপও চলে এসেছে।

চলবে…
(ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here