স্নিগ্ধ অনুভব পর্ব ১৪+১৫+১৬

0
102

#স্নিগ্ধ_অনুভব
#পার্ট:১৪
#পিচ্চি_লেখিকা

পিটপিট করে চোখ মেলতেই দেখি আমি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি। আমার পাশে একজন নার্স দাঁড়িয়ে আছে। সামনে ১ জন ভদ্র মহিলা আর ১ জন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কাউকেই চিনি না আমি। আমাকে চোখ মেলতে দেখে পাশ থেকে ডক্টর বললো,,
“ফাইনালি মিস আপনি চোখ মেললেন।”
আমি ডক্টরের দিকে তাকাতেই উনি মৃদু হাসলেন। আমি উঠে বসতে যাবো তখনই ওই মহিলা আমাকে ধরে বললেন,,
“আরে আরে কি করছো? ব্যাথা পাবে তো।”
আমি উনার দিকে এক পলক তাকিয়ে বললাম,,
“আমি ঠিক আছি। কিন্তু আমি হসপিটালে কি করে এলাম? আর আপনারাই বা কে?”
উনার পাশে যে লোক ছিলো উনি বললো,,
“তুমি তো আমাদের চিনবা না মা। অবশ্য আমরাও তোমাকে চিনি না। সেদিন তুমি আমাদের গাড়ির সাথেই এক্সিডেন্ট করেছিলে তাই আমারই তোমাকে নিয়ে এসেছি।”
‘”অনেক ধন্যবাদ আঙ্কেল।”
“ইটস ওকে মামুনি। বাট তুমি হঠাৎ করে গাড়ির নিচে কিভাবে আসলে? ঘটনা হঠাৎ হয়ে যাওয়ায় আমরাও ব্রেক করতে পারিনি।”
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগে ডক্টর বললো,,
“থামুন থামুন। এতদিন পর উনি কোমা থেকে ফিরেছে উনাকে এখনি এত চাপ দিবেন না নয়তো উনার শরীর আরো খারাপ করবে।”
ডক্টরের কথার আগা মাথা না বুঝে জিজ্ঞেস করলাম,,
“কোমা থেকে ফিরেছে মানে? আর এতদিন? বুঝলাম না কিছু।”
পাশ থেকে আন্টিটা বলে উঠলো,,
“মানে তুমি এতদিন কোমাতে ছিলে। আজ দীর্ঘ ৮ মাস পর তুমি স্বাভাবিক হলে!”
উনার কথা শুনে যেনো আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এসব কি বলে? আমি তো ভেবেছিলাম হয়তো ২ বা ৩ দিন হবে এর বেশি না। এ তো পুরোই উলটো!
“আপনার ভাগ্য ভালো যে এত মারাত্মক ভাবে আঘাত পাওয়া স্বত্বেও শুধুমাত্র ৮ মাস কোমায় ছিলেন।এমন অনেক মানুষ আছে যারা সামান্য আঘাত পাওয়ায় কোমায় চলে যায়। কেউ কেউ ৮ বছর ৬ বছরও কোনো রেসপন্স করে না। বাট আপনার কেস টা অনেকটা আলাদা। আপনি কয়েকদিন বেড রেস্ট নিলেই সুস্থ হয়ে যাবেন। আর হ্যাঁ মাথায় বেশি চাপ নিবেন না। এমনিতেই আপনার মাথায় স্নায়ুর পাশে ক্ষত হয়েছে একটু এদিক ওদিক হলেই মেমোরি লস হতে পারে। হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড!”
ডক্টরের কথায় মাথা নাড়িয়ে বুঝালাম “হুম”
“এক্সকিউজ মি!”
ডক্টর চলে গেলেন। আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না ৮ টা মাস জিবন থেকে চলে গেছে। এজন্যই হয়তো বলে সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। সময় স্রোতের মতো বয়ে চলে গেছে। আচ্ছা অনুভব কেমন আছে? ও কি মনে রেখেছে আমাকে? নাকি ভুলে গেছে? ও কি আমাকে খুজেছে? দুরে চলে এসেছি বলে কি ভুল বুঝেছে? আর মামুনি? তারা কেমন আছে? আজও কি মামুনি আমাকে অপয়া ভাবে? মামুনির কথা ভাবতেই চোখ থেকে ২ ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। সাথে সাথে ওই আন্টিটা বললো,,
“একি তুমি কাঁদছো কেন?”
আমি চোখের পানি মুছে বললাম,,
“কাঁদছি না আন্টি। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনারা আমাকে চেনেন না জানেন না অথচ প্রায় ৮ টা মাস আমার খেয়াল রেখেছেন। আপনাদের ধন্যবাদ দিলেও কম হবে।”
“ধুর পাগলি। কে বলেছে এসব? জানো তোমার মুখ দেখলে আমার মেয়ের কথা মনে পড়ে যায়। তোমার মুখে স্নিগ্ধ ভাবটা আমার মেয়েটার মুখেও ছিলো।”
আন্টিটা কথা বলার সময় তার চোখ ছলছল করছিলো। সেইটা আমার চোখ এড়ায়নি। ভিষন মায়াময় মুখ আন্টি টার। ইসস উনার মেয়ে উনার থেকে দুরে,,কিন্তু কেন? থাক এখন আর জিজ্ঞেস করবো না। তাই চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইলাম।
“বাদ দাও এসব। তুমি একটু বসো আমি তোমার জন্য খাবার আনি।”
আন্টি খাবার আনতে গেলো আর আঙ্কেল টা আমার পাশেই বসে ছিলো। আঙ্কেল আমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,,
“এখন কেমন লাগছে মামনি?”
আমি মৃদু হেঁসে বললাম,,
“জ্বি আঙ্কেল ভালো।”

খাওয়া দাওয়া করে বেডে হেলান দিয়ে বসে আছি। এক মুহূর্তে জিবনের সমীকরণ পালটে গেলো। আজ সব ঠিক থাকলে আমি আর অনুভব এক সাথে থাকতাম। আচ্ছা অনুভব আমাকে না পেয়ে কি আবারও বিয়ে করে নিয়েছে? এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছি্।

কেটে গেছে আরো ৪ দিন। এখন আমি পুরোপুরি সুস্থ। আজকেই রিলিজ দিয়ে দেবে। কিন্তু যাবো কোথায়? জানি না। আমি গেলে যদি মামুনি আবারও কিছু বলে সহ্য করতে পারবো তো? অনুভব? সে কি মানবে আমায়? নাকি নতুন করে কাউকে নিজের জিবনে জড়িয়েছে সে? আর যদিি জড়ায়? তাহলে? তাহলে আমি কি করবো? ওদের মাঝে কিভাবে আসবো?
আমার ভাবনার মাঝেই কেউ আমার মাথায় হাত রাখলো। তাকিয়ে দেখি আন্টি দাঁড়িয়ে আছে। আন্টিকে দেখেই মুখে হাঁসি ফুটলো। এখন এই আঙ্কেল আন্টিই আমার অনেক আপন হয়ে গেছে। কি অদ্ভুত জিবন? যারা চেনে না তারাই আপন করে নিয়েছে আর যারা চেনে তারা নিজের স্বার্থ বোঝে।
“কি ভাবছিস মামনি?”
“না আন্টি কিছু না। বসো।”
“হুম। আচ্ছা মামনি কোথায় যাবি তুই? বাড়ি কই তোর?”
আন্টির কথায় মলিন হেঁসে বললাম,,
“কোথায় যাবো জানি না। নিজের ঘর নেই যাদের কাছে ছিলাম তাদের কাছে অপয়া তাই তাদের কাছে তো যেতে পারবো না।”
আন্টি আমার কথা শুনে অবাক হয়ে বললো,,
“এসব কি বলছিস? নিজের ঘর নেই মানে? কাদের কাছে থাকিস তুই? আর অপয়া মানে? ক্লিয়ার বল তো মামনি সবটা!”
“হুম বলছি…………

তারপর আঙ্কেল আর আন্টি কে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটাই বললাম। শুধু অনুভব যে মারতো এটাই বলিনি। আমি চায় না আমার অনুভবকে কেউ খারাপ বলুক। আঙ্কেল আন্টি আমার কথা শুনে থ মেরে গেছে। হুট করেই আন্টি আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলো। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখলেও এখন আর না পেড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলাম। আপন মানুষদের থেকে পাওয়া কষ্ট কত বড় হয় তা তারাই জানে যারা পেয়েছে! আন্টি আমাকে শান্ত করে বললো,,
” কাঁদিস না। যা হয়েছে ভুলে যা। তুই যদি ওখানে ফিরতে না চাস তো তুই আমাদের সাথে আমাদের বাড়ি চল।”
“না আন্টি তোমরা আমার জন্য অনেক করেছো আর না। আমি ঠিক কোথাও না কোথাও চলে যাবো। একটা জব খুজে নিয়ে কোথাও থেকে যাবো।”
পাশ থেকে আঙ্কেল মাথায় হাত দিয়ে বললো,,
“আমি জানি মামনি সবারই আত্মসম্মান থাকে তোমারও আছে। তুমি চাইলে জব করতেই পারো বাট তোমার সার্টিফিকেট? সেইটা ছাড়া কোথাও জব পাবে না।”
“তবুও আঙ্কেল চেষ্টা তো করতেই পারি!”
আঙ্কেল আমার কথা শুনে কিছুক্ষণ কি যেনো ভেবে বললেন,,
“আমি তোমাকে জব দিলে করবে?”
আমি আঙ্কেলের কথায় চমকে তাদের দিকে তাকায়। এই মানুষগুলো কত করছে আমার জন্য! এখন আবার জবও দিতে চান।
“কিন্তু আঙ্কেল…..
” কোনো কিন্তু আমি জানি না। তুমি জব করতে চাও আমার অফিসে করতে পারো। বাট থাকতে তোমার আমাদের বাড়িতেই হবে!”
আঙ্কেল আর আন্টির জোড়াজুড়িতে তাদের সাথে থাকতে বাধ্য হলাম। হসপিটাল থেকে সোজা তাদের বাড়ি চলে এলাম। বাহিরে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা “চৌধুরী মঞ্জিল”। বিরাট বড় বাড়ি। বাড়ির সামনে একটা বাগান। তার সাথেই মাাঠের মতো ছোট একটা জায়গা। সেখানে ৪ বছরের একটা শিশুর সাথে বড় একটা মেয়ে খেলা করছে। পিচ্চি বাবুটা বার বার মেয়েটাকে ধরার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। আমি ওদের কান্ড দেখে ওদের কাছে একটু এগিয়ে গেলাম। আমাকে দেখেই বাবুটা ছুটে ওই মেয়েটার কাছে গিয়ে বললো,,
” ফুতুমনি দেকো কে এতা?”
বুঝলাম মেয়েটা এই বাবুর ফুপি হয়। মেয়েটা একবার আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে বললো,,
“কে আপনি? কাউকে চায়?”
মেয়েটা ভিষন নরম স্বরে কথা গুলো বললো। অন্য কেউ হলে হয়তো অচেনা কাউকে দেখে রাগ দেখাতো। আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই আন্টি ডেকে বললো,,
“এই স্নিগ্ধা ভেতরে আয়।”
আমি একবার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললাম,,
“আন্টির সাথে এসেছি আপু।”
এটুকু বলেই ভেতরের দিকে পা বাড়ালাম। মেয়েটাও আমার পিছু পিছু আসলো। আন্টি আমাকে নিয়ে ভেতরে এসে সোফায় বসালো। লিভিং রুমে কয়েকজন ছিলো তারাই আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। হয়তো চিনার বুঝার চেষ্টা করছে। এনাদের সবাইকে দেখে মনে হলো এবাড়িতে বেশি কেউ থাকে না। হাতে গুনে ৫ বা ৬ জন। আন্টি সবাইকে বললো,,
“আজ থেকে স্নিগ্ধা এবাড়িতেই থাকবে।”
আন্টির কথা শুনে একটা ছেলে ভ্রুকুচকে বললো,,
“বাট ও কে আম্মু?”
আঙ্কেল বললো,,
“ও আমার বন্ধুর মেয়ে। ওর বাবা আর মা মারা গেছে তাই ও এখন থেকে এখানেই থাকবে।”
আঙ্কেলের কথা শুনে হা করে উনার দিকে তাকিয়ে আছি। আঙ্কেলের কথা শুনে ভাইয়াটা বললো,,
“ওকে আব্বু নো প্রবলেম। আমি অফিস যাচ্ছি।”
ভাইয়াটা যাওয়ার সময় ওই পিচ্চি বাবু টা কে আূর করে গেলেন। উনারই বোধহয় ছেলে। আঙ্কেল আন্টি আমাকে আমার রুমে দিয়ে চলে আসলো। আমি ফ্রেশ হয়ে এসে বারান্দায় গিয়ে এক কোণে বসে পড়লাম। খুব মনে পড়ছে সবাইকে। সবাই কি আমাকে ভুলে গেছে? কিছুক্ষণ বসে থাকতেই মনে হলো কেউ দরজায় নক করলো৷ উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলাম ওই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। হাঁসি মুখে বললো,,
“ভেতরে আসতে পারি?”
“আপনাদের বাসাই আপনিই পারমিশন নিচ্ছেন?”
মেয়েটা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,,
“এটা আমাদের বাসা হলেও এটা তো তোমার রুম। তাই পারমিশন নিয়েই ঢুকলাম। যায় হোক ছাড়ো সেসব। তোমার নাম স্নিগ্ধা তাই না?”
“হুম।”
“এটা কি হলো? জাস্ট হুম! আমি তোমার নাম বললাম আর তুমি আমার নাম জিজ্ঞেস করলে না?”
আমি মৃদু হেঁসে বললাম,,
“আচ্ছা আপনার নাম কি?”
“আমার নাম! আইদা।”
“মানুষটার মতোই নামটাও সুন্দর।”
“ওই তুমি ছেলে মানুষ যে আমাকে পাম দিচ্ছো?”
“এমা আমি আপনাকে পাম কেন দিতে যাবো?”
“ধুর আপনি আপনি কেন করছো? আমি তো তোমার ছোট। মাত্র অনার্স ১ম বর্ষে। তুমি করেই বলতে পারো।”
“আচ্ছা।”

বেশ কিছুক্ষণ আমি আর আইদা আড্ডা দিলাম। বেশ মিল হয়ছে দুজনের। আইদার থেকে জানলাম ওরা এই বাড়িতে ৬ জন থাকে। আঙ্কেল,আন্টি, ভাইয়া-ভাবি, উনাদের ছেলে সিফাত আর আইদা।

কেটে গেছে আরে ১০ দিন। এখন আমি অফিসে যায় প্রতিদিন। এই বাড়ির সবার সাথেই অনেক ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। হয়তো এনাদের থেকেই শিখা উচিত একটা অচেনা মেয়েকে কিভাবে ভালোবেসে বাড়ির মেয়ের মতো করা যায়। যেহেতু একই শহরে থাকি তাই এই ১০ দিনে একবার সাহস করে অনুভবের হসপিটালে গেছিলাম বাট সেখানে ওকে পায়নি। মুখ ঢেকে গেছিলাম যাতে কেউ চিনতে না পারে। বাড়ির দিকটাইও গেছিলাম বাট অনুভবকে না দেখে নিরাশ হয়ে ফিরেছি। আচ্ছা ওই এক্সিডেন্টে অনুভবের কিছু হয়নি তো? জানি না। বুঝতে পারছি না কিছু্। আজকে অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলাম তখনই ভাবি আর আইদা আসে আমার রুমে,,
“কি ব্যাপার ২ নাম্বার ননদিনী? অফিস যাচ্ছেন বুঝি?”
“জ্বি ভাবি।”
“এই স্নিগ্ধা আপু ছাড়ো এগুলা! চলো আজ একটু হসপিটাল যাবো!”
আমি আইদার দিকে ভ্রুকুচকে তাকাতেই বললো,,
“আরে আরে এভাবে তাকিয়ো না। সিফাত কে নিয়ে যাবো। ভাবি আর আমি যাচ্ছি তুমিও চলো।”
“তোমরা তো ২ জন আছো। তোমরাই চলে যাও।”
“আরে তুমি গেলে কি সমস্যা? আমি আব্বুকে বলে দিয়েছি আজ তুমি অফিস যাচ্ছে না। আমাদের সাথে যাচ্ছো। সো ঝটপট যা করার করো আমরা আসছি।”
এটুকু বলেই ২ জন গটগট করে বেরিয়ে গেলো। আমাকে কিছু বলার সুযোগও দিলো না। অগত্যা ওদের সাথে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে মুখ আটকে নিলাম।

আইদা, ভাবি, সিফাত আর আমি হসপিটালে এসেছি। সিফাতের কি যেনো টেস্ট করাবে তাই ওরা ভেতরে গেছে। হসপিটাল টা খুব বেশি বড় না। তবে শহর থেকে প্রায় অনেকটাই দুরে। আঙ্কেলদের বাড়ি থেকে এটাই কাছে। তাই এখানেই আসলো। আমি ঘুরে ঘুরে হসপিটাল দেখছিলাম। যদিও হসপিটাল দেখার কিছুই নেই তবুও দেখছিলাম। দেখতে দেখতে একটা কেবিনের কাছে যেতেই একটা পাগল টাইপের লোক এসে আমাকে ধরলো..ভয়ে তো আমিই চিৎকার দিতে লাগছিলাম কিন্তু লোকটা আমাকে কিছু না বলে এসে আমার পেছনে লুকালো। আর কয়েকটা নার্স তার পিছে আসছিলো……..
#স্নিগ্ধ_অনুভব
#পার্ট:১৫
#পিচ্চি_লেখিকা

হসপিটালে এসে এমন কিছুর সম্মুখীন হবো ধারণার বাইরে ছিলো। আমি আগে থেকেই পাগল টাইপের মানুষদের খুব ভয় পায়। এখানে ব্যাতিক্রম কিছু না। লোকটা কে দেখেই ভয়ে ঢোক গিলে কিছু বলতে যাবো তার আগেই দেখলাম লোকটা আমার পিছে লুকানোর চেষ্টা করছে। সামনে থেকে কয়েকজন নার্স এগিয়ে আসছে। পেছনে থাকার ফলে মুখটা দেখতে পারছি না। কিন্তু স্পর্শ টা কেন যেনো জানান দিচ্ছে লোকটা আমার কাছের কেউ। আমারও মুখ ঢাকা ছিলো তাই কেউ আমাকে চিনতে তো পারবে না বুঝতেছি। লোকটা আমার পিছনে লুকাতে লুকাতে বললো,,
“আমি যাবো না তোমাদের কাছে। তোমরা অনেক পঁচা। আমাকে শুধু মারো।”
লোকটার বাচ্চা সূলভ কথা শোনে যতটা অবাক হয়েছি তার থেকেও বেশি অবাক হয়েছি “আমাকে শুধু মারো” এটুকু শুনে। প্রথমত এটা কোনো মেন্টাল হসপিটাল না তাহলে এখানে মানসিক ভারসাম্যহীন লোক কেন রেখেছে? আজব! আর দ্বিতীয়ত লোকটা কে ভালো কোনো হসপিটালে না নিয়ে গেলেও বাসাই রেখে বা বড় কোনো হসপিটালে রেখে ট্রিটমেন্ট করতো বাট এরকম একটা হসপিটালে কেন? যদি তারা মধ্যবিত্তও হয় তাহলে তো মেন্টাল হসপিটালে রেখে আসতে পারতো! আর মারে মানে কি? মাথায় এমন উদ্ভট প্রশ্নের কোনো উত্তর পেলাম না। আমার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ খেয়াল করলাম লোকটা আমার হাত চেপে ধরেছে। সামনে থাকা ৩ জন নার্স তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমার ভয়টা একটু কেটেছে। লোকটা যে কোনো ক্ষতি করবে না তা তো বুঝলাম। লোকটাকে টানতে দেখে নার্স কে বললাম,,
“উনাকে এভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? ব্যাথা পাবে তো!”
একটা নার্স তেড়ে এসে বললো,,
“আপনি কে হ্যাঁ? পেশেন্টের কেউ তো নন আপনি তাহলে মাঝখানে কেন কথা বলছেন? যত্তসব।”
“এই যে মিস ভালো ভাবে কথা বলুন। আপনারা জনগণের সেবার জন্যই নিয়োজিত। তাই ভুল করলে সেটা সংশোধন করে দেওয়া আমার মতো নাগরিকের দায়িত্ব।”
হঠাৎ করেই লোকটা একট নার্স কে কামড় দিয়ে আর ২ টা কে ঝাড়া মেরে ফেলে দিয়ে দৌড়ে আমার কাাছে এসে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ওড়না দিয়ে নিজেকে ঢাকতে চেষ্টা করে। উনার এমন বাচ্চামো দেখে আমার পেট ফাটিয়ে হাঁসতে ইচ্ছা করছে কিন্তু কোনো রকম নিজেকে শান্ত করে লোকটার দিকে ঘুরে কিছু বলতে যাবো তখনই নার্স বললো,,
“দেখেছেন কত ভালো? আপনার সাথে কথা বলতে গিয়ে এই লোকটা আমাকে কামড়ে দিলো। কোথা থেকে আসেন বলেন তো আপনারা?”
আমি নার্সকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে লোকটার দিকে ঘুরে বললাম,,
“ঠিক আছেন আপনি? এভাবে কি কেউ কাউকে কামড়ায়? এগুলো কিন্তু একদম ঠিক না। আপনি উনাদের সাথে নিজের কেবিনে যান।”
লোকটা মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললো,,
“না না আমি যাবো না। ওরা আমাকে আবার মারবে!”
একটা নার্স রেগে বললো,,
“এই ছেলে এই চুপচাপ কেবিনে চল! যত্তসব আজাইরা পাগল দিয়ে হসপিটাল ভরায় রাখছে স্যার।”
আমি এবার রক্তচক্ষু নিয়ে নার্সটার দিকে তাকিয়ে বললাম,,
“যদি এতই বিরক্ত আপনারা পেশেন্টের প্রতি তবে জব কেন করেন? যত্তসব আজাইরা পেশেন্টরা না আপনারা। এটা কেমন হসপিটাল? একটা ডক্টর ও দেখিনি এখন পর্যন্ত।”
“দেখুন আপ….
” শাট আপ। চুপ থাকুন।”
এবার লোকটা কে উদ্দেশ্য করে বললাম,,
“আপনাকে কেউ কেন মারবে? কেউ মারবে না আপনাকে। নিজের কেবিনে যান!”
“না আমি যাবো না। আমি স্নিগ্ধবতীর কাছে যাবো।ওরা আমাকে নিয়ে যায় না স্নিগ্ধবতীর কাছে। আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?”
লোকটার মুখে স্নিগ্ধবতী শুনে থ মেরে গেছি। স্নিগ্ধবতী? এই টা অনুভব ডাকতো। হ্যাঁ আমার স্পষ্ট মনে আছে যখন ই রাগ করতাম বা কান্না করতাম তখনই অনুভব মিষ্টি করে বলতো “আমার স্নিগ্ধবতী বউটার এতো রাগ কেন?” আবার অনেক সময় বলতো “স্নিগ্ধবতীর স্নিগ্ধ চেহারায় কান্না নয় হাসিটাই মানায়” অনেক সময় জ্বালাতো এই স্নিগ্ধবতী বলে! লোকটা আমায় ঝুকিয়ে বললো,,
“নিয়ে চলুন না! আমি স্নিগ্ধবতীর কাছে যাবো!”
লোকটার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম। সেই চোখ, সেই কন্ঠ,, এতক্ষণ কন্ঠ খেয়াল না করলেও এখন করেছি। উনার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েই বুঝে গেছি উনি অনুভব। দাড়ি গুলে বড় বড় হয়ে গেছে। চুল গুলোও আগের ন্যায় অনেকটাই বড় উসকো খুসকো চুল। ওকে দেখেই মনের মধ্যে ঝড় উঠে গেছে। ইচ্ছা করছে এখনি চিৎকার করে কাঁদতে,,কিন্তু নিজেকে ধাতস্থ করে বললাম,,
“নিয়ে যাবো আপনার স্নিগ্ধবতীর কাছে এখন কেবিনে যান।”
নার্স রা এসে টানছিলো কিন্তু অনুভব যেতে নারাজ। কিছুতেই আমাকে ছাড়ছে না। শক্ত করে ধরে রেখেছে। আমারও ইচ্ছা করছে ওকে ধরে রাখতে কিন্তু আগে আমার সবটা জানতে হবে। এর মধ্যেই অনুভবের টানাটানিতে মুখের বাধা ওড়না টা সরে যায়। কয়েক সেকেন্ড পরই মুখের কাপড় তুলে অনুভবের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। অনুভবকে জোড় করে নিয়ে গেলো। একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম ওরা ওকে কি যেন ইনজেকশন পুশ করলো সাথে সাথেই নিস্তেজ হয়ে যায় অনুভব। আমি কিছুক্ষণ উনার দিকে তাকিয়ে থেকে রিসেপশনের দিকে হাঁটা লাগালাম। এগিয়ে এসে রিসেপশনিস্টকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম,,
“আপনার থেকে একটা ইনফরমেশন দরকার ছিলো!”
রিসেপশনিস্ট আমার দিকে কেমন করে তাকালো। এখানকার সব কিছুই কেমন অদ্ভুত। রহস্যময় একটা জায়গা।
“কি ইনফরমেশন?”
“এখানে কি অা……
আর কিছু বলতে পারলাম না তাার আগেই একটা মেয়ে এসে বললো,,
” আরে আপু তুই এখানে? আয় আয়।”
রিসেপশনিস্ট কেমন করে তাকালে তা দেখে মেয়েটা বললো,,
“আরে ম্যাম ও আমার বড় আপু৷ আমারই খোজ নিতে এসেছিল৷ আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম তাই আপনাকে জিজ্ঞেস করতে এসেছিলো!”
রিসেপশনিস্ট আর কিছু না বলে নিজের কাজে মন দিলে৷ এদিকে আমি হতভম্ব হয়ে গেছি মেয়ের কান্ডে! ওকে আমি জিবনে দেখছি কি না সন্দেহ আর ও কি না বলে আমি ওর বড় বোন। মেয়েটার মাথায় কি সমস্যা না কি? অবশ্য এই হসপিটাল টাই তো কেমন যেনো! মেয়েটা আমাকে টেনে বাইরে নিয়ে আসলো৷ বাইরে রাস্তায় গাড়ি চলাচল করছে। আমি মেয়েটার থেকে হাত ছাড়িয়ে বললাম,,
“কে আপনি? আমি তো আপনাকে চিনি না। তাহলে? নিজের বড় বোন কেন বললেন?”
মেয়েটা ফিসফিস করে হাসি মুখে বললো,,
“জায়গাটা আপনার জন্য সেইফ না। এটুকুই বলবো আমি আপনাকে চিনি। আপনি অনুভব স্যারের ওয়াইফ স্নিগ্ধা।”
আমি মেয়েটার মুখে আমার নাম শুনে অবাক হয়ে গেলাম। মেয়েটা আমাকে চেনে? কিন্তু কিভাবে? অনুভবকেও চেনে? আমি তো চিনি না।”
আমার ভাবনার মাঝেই মেয়েটা বললো,,
“আমি জানি আপনার মনে অনেক প্রশ্ন সেগুলোর উত্তর আমি আপনাকে দেবো তবে এখানে না। আপনি যতদ্রুত সম্ভব পালিয়ে যান। আপনাকে আমি বাদে এখানকার কেউ এখনো দেখে নি। আপনাকে রিকুয়েষ্ট করছি ভাবি অনুভবকে স্যারকে বাঁচান। ভেতরে যে ছিলো সে অনুভব স্যার। আমি তার সাথে দীর্ঘ ৬ মাস কাজ করেছি। আপনাকে আমি চিনি কিভাবে চিনি তা না হয় পরে বলবো। এখন এটুকুই বলবো হাতে সময় খুব কম। যে করেই হোক অনুভব স্যারকে বাঁচান। এখান থেকে যে করেই হোক নিয়ে যান নয়তো ওরা মেরে ফেলবে। আপনার ফোনে আমার নাম্বার দিয়ে দিয়েছি। আমি আজই এই শহর ছেড়ে চলে যাবে। এতদিন অনুভব স্যারের জন্যই এখানে ছিলাম। আর কিছু বলতে পারবো না। আপনি তাড়াতাড়ি এখান থেকে অনুভব স্যার কে বের করে নিয়ে যান নয়তো অনেক খারাপ কিছু হবে।”
মেয়েটা এবার মুখের কৃত্রিম হাসি বজায় রেখে বললো,,
“এই আপু তুই বাড়ি যা। আমি ছুটে নিয়ে চলে আসছি্।”
বুঝলাম মেয়েটা আমাকে বাঁচানোর জন্যই এমন করে কথা বললো। তার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ দেখেছি। তার কথা গুলো শুনে যেন আমার হাত পা অবশ হয়ে গেছে। মাথায় ছুটছে হাজারও প্রশ্নের পোকা। আমি তড়িঘড়ি করে ফোন নিয়ে আইদার কাছে কল দিলাম,,২ বার ঢুকতেই আইদা কল ধরে বললো,,
“ওই আপু কই তুমি? পুরো হসপিটাল খুজা শেষ আমার৷ ”
সমানে হাত পা কেঁপে চলেছে। গলা যেন ধরে আসছে,,কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,,
“আ..আইদা তাড়াতাড়ি বাইরে আসো ভাবি আর সিফাত কে নিয়ে।”
“কিন্তু আপু…..
ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কল কেটে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে উপস্থিত হয় আইদা, ভাবি আর সিফাত। ওদের পেছনেই রয়েছে সেই মেয়েটি। হাতে একটা ব্যাগ। মেয়েটা আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললো,,
” তাড়াতাড়ি যান এখান থেকে। কেউ আপনাকে চিনে ফেললে সমস্যা বাড়বে।”
আমি মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম,,
“আপনার নাম কি?”
মেয়েটা হয়তো এই সময় এমন প্রশ্ন আশা করেনি তাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললো,,
“আমার নাম সিমা। এগিয়ে চলুন সামনের মোড় থেকে আমি বাস নিয়ে চলে যাবো। এখানে সবাইকে এক সাথে কেউ দেখলে অনেক প্রবলেমে পড়তে হবে।”
সিমা আর কিছু না বলে সামনে হাঁটতে লাগলো। আইদা আর ভাবি ফ্যালফ্যাল করে একবার আমার দিকে তো আরেকবার সিমার দিকে তাকাচ্ছে।
“আপু এইটা কে?”
“বলছি আগে এখান থেকে চলো।”
তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে এসে সামনের মোড় থেকেই সবাই গাড়িতে উঠলাম। সিমা বাসে করে চলে গেলো। গাড়ির ভেতর বসে সব কথা ভাবছি। যে অনুভব সব সময় পরিপাটি থাকতো সে আজ কত অগোছালো। যে অনুভব রাগ, জিদ আর এটিটিউডের ডিব্বা ছিলো আজ সে বাচ্চাদের মতো করে ঠোট উল্টো কাঁদে। আচ্ছা অনুভব এখানে কেন? কি হয়ছে অনুভবের? এত বড় হসপিটাল+বাড়ি থাকতে এমন ছোট একটা হসপিটালে কেন? মামুনি বাবাই তিশা আপু ওরা সবাই কোথায়? কেউ কি অনুভবের বিষয়ে জানে না নাকি সবাই জেনে শুনেই ওকে এখানে রেখে গেছে? ভাবতে পারছি না আর। আমার ভাবনার মাঝেই আইদা জিজ্ঞেস করলো,,
“আপু,,বললে না তো মেয়েটা কে?”
“হুম,,উনি এই হসপিটালের একজন কর্মচারী।”
“তোমাকে চেনে কিভাবে?”
“চিনে কোনো এক ভাবে।”
“মন খারাপ কেন?”
“কই না তো। মন কেন খারাপ হবে?”
“এমন রোবটের মতো বসে আছো কেন তবে? বলোই না কি হয়েছে?”
আইদার সাথে সাথে এবার ভাবিও যোগ দিলো,,
“এই স্নিগ্ধু বলো তোমার কি হয়ছে? এমন মন মরা হয়ে আছো কেন?”
“কই?”
“দেখো আপু একদম লুকাবা না..বলো কি হয়ছে?
ওদের ২ জনের জোড়াজুড়িতে বলবো বললাম। তারপর ঘটে যাওয়া সবটাই ওদের বললাম। ২ জনেই হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওরাও আমার মতো মানতে নারাজ যে অনুভব পাগল হয়ে গেছে। আইদা আমাকে নিজের সাথে জড়িয়ে বললো,,
” চিন্তা করো না আপু। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। আর অনুভব ভাইয়ার ও কিছু হবে না। তুমি দেখো।”
আইদার সান্ত্বনা দেওয়া দেখে আরো বেশি কান্না পাচ্ছিলো তাই নীরবে চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের মাঝে এমন অনেকে আছে যারা কান্না করার সময় কেউ সান্ত্বনা দিলে আরো কান্না করে দেয়। আমিও তাদের মাঝেই একজন। আজ নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। আমি জানি আমার ভালোবাসার মানুষটা ভালো নেই। তার যে বিপদ তবুও আমি কিছুই করতে পারছি না। কিভাবে বাঁচাবো তাকে? আমি তো নিজের পরিচয় দিয়েই ওকে আনতে পারবো কিন্তু সিমা বলে দিয়েছে নিজের পরিচয় যেনো না দিতে যায়। আর যা করতে হবে তা দুর থেকে। বুঝতে পারছি না কি করা উচিত?

বাড়িতে এসে দেখি আন্টি লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছেন। আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললো,,
“কি রে এত টাইম লাগে তোদের? সেই কখন গেছিস!”
পাশ থেকে ভাবি বললো,,
“আর বলবেন না মা ডক্টর নাকি পাগল সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। আর যাবোই না ওখানে!”
“তুমি রুমে যাও আগে,,সিফাতকে শুইয়ে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নাও। ওকে আর কতক্ষণ কোলে রাখবা!”
“আচ্ছা মা যাছি্।”
আমি কোনো কথা না বলে চলে আসতে লাগলাম। পেছন থেকে আন্টি বললো,,
“স্নিগ্ধা…
” হুম আন্টি।”
“কি হয়….
আন্টিকে থামিয়ে আইদা বললো,,
” আম্মু ওকে যেতে দাও। ও ফ্রেশ হয়ে আসুক। স্নিগ্ধা আপু তুমি যাও।”
আমি মাথা নাড়িয়ে চলে আসলাম রুমে। আইদা হয়তো আমার অবস্থা বুঝতে পেরে আন্টিকে আর কিছু বলতে দিলো না। হয়তো সে নিজেই বলবে নয়তো পরে আমাকে জিজ্ঞেস করতে বলবে। রুমে এসে ওয়াশরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ শাওয়ার নিলাম। মাথাটা এখন হালকা লাগছে। ভালো লাগছে না কিছুই। সব কেমন অসহ্য লাগছে। মাথায় হাজারো চিন্তার পোকার নাড়া দিচ্ছে। আমি চলে আসার পর কি হয়েছিলো? কেন অনুভব পাগল? কিভাবে সে একজন মানসিক রোগী হয়ে গেলো? এত ছোট একটা হসপিটালে কি করছে অনুভব? আর মামুনি বাবাই তারাই বা কোথায়? তারা কেন অনুভবকে এমন একটা জায়গায় থাকতে দিয়েছে? কে বা কারাই চায় অনুভব কে মারতে? কেন মারতে চায়? কি এমন হয়েছে এই ৮ মাসে? সিমা আমাকে চিনে কিভাবে? সিমার কথা কি সত্যি? নাকি সেও মিথ্যা বলছে? না তার চোখে এক ফোটা মিথ্যাও আমি দেখিনি। সব কিছুর শেষে আমি অনুভবকে ওখান থেকে বের করবো কিভাবে? না জাস্ট ভাবতে পারছি না। এক এক করে সব কিছু মেলাতে লাগলাম। সব প্রশ্ন এক করলাম। এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে অনুভবকে আমার আগে সেইফ রাখতে হবে। আরো একবার সাহায্যের জন্য হাত পাততে হবে। আমি কিছু ভেবে উঠে গিয়ে লিভিং রুমে গেলাম। সেখানেই আন্টি মন মরা হয়ে বসে আছে। আমাকে দেখেই আন্টি হাতের ইশারাই তার কাছে ডাকলেন। আমি গিয়ে তার পাশে বসলাম,,
“আমাকে সবটাই বলেছে আইদা,,তুই এতটুকু বয়সে কতকিছু সহ্য করছিস মা,,আল্লাহ তোকে ধৈর্য আর সহ্যশক্তি দান করুক। চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,,
“হুম আন্টি। সব কিছু ঠিক করতে আমার আগে সেইফ করতে হবে। কি করে ওকে ওই হসপিটাল থেকে বের করবো বুঝতে পারছি না আন্টি।”
“মাথা ঠান্ডা করে ভাব সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আমি আন্টির হাত চেপে ধরে বললাম,,
“আন্টি তুমি আমাকে অনেক সাহায্য করেছো,,মেয়ের মতো আগলে রেখেছো,,ভালোবেসে বুকে ঠায় দিয়েছো। আন্টি গো আমার আর একটা উপকার করবে আন্টি?”
আন্টি আমার হাত আলগা করে নিলো……..
#স্নিগ্ধ_অনুভব
#পার্ট:১৬
#পিচ্চি_লেখিকা

আন্টি হাত আলগা করে দিতেই বুকের মাঝে ধক করে উঠলো। এখন যদি আন্টিরা আমাকে সাহায্য না করে আমি যে শেষ হয়ে যাবো। আন্টি আঙ্কেল ছাড়া কেউ তো আমাকে হেল্প করতে পারবে না। এখন কি করবো আমি? অনুভবকেও তো বাঁচাতে পারবো না। হঠাৎ আন্টি আমার হাত ছেড়ে তার হাতের মুঠোয় ২ হাত নিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,,
“এটাও তোর বলতে হবে যে তোকে সাহায্য করবো কি না? তুই তো আমার আরেক মেয়ে তোকে সাহায্য করার কি আছে? শুধু বল কি করতে হবে?”
আন্টির কথা শুনে চোখ ছলছল করছে। এই কয়দিনেই মানুষগুলো কত আপন করে নিয়েছে আমাকে! এরকমও কি মানুষ হয় পৃথিবীতে? আন্টি আমাকে জড়িয়ে নিয়ে বললো,,
“কি রে কান্না করছিস কেন? তুই একদম চিন্তা করিস না। অনুভবের কিছু হবে না। বল না কি করতে হবে?”
“আন্টি আঙ্কেলের হেল্প লাগবে।”
“তা আঙ্কেল কি করতে পারে বলুন আপনারা?”
কারো কথা শুনে দেখি পিছনো আঙ্কেল দাঁড়িয়ে। এক গাল হেঁসে বললেন কথা টা। আমি আন্টিকে ছেড়ে আঙ্কেলের দিকে তাকালাম। তাকিয়ে থাকতে দেখে আঙ্কেল আমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো,,
“সব শুনেছি আমি। আজ ভালো লাগছিলো না বলে চলে এসেছিলাম এসেই সব শুনেছি। তোর কি হেল্প লাগবে বল?”
“আঙ্কেল তোমরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছো এই ঋন আমি শোধ করতে তো পারবো না। কিন্তু সারাজিবন কৃতজ্ঞ থাকবো।”
“এবার মার খাইতে না চাইলে বল কি করতে হবে?”
“আসলে আঙ্কেল কোনো ভাবে অনুভবকে ওই হসপিটাল থেকে বের করতে হবে। নয়তো ওরা অনুভবকে মেরে ফেলবে। কি করবো বুঝতে পারছি না।”
“বুঝলাম। কিন্তু আমরা তোকে কিভাবে সাহায্য করবো বল?”
কি কি করতে হবে আঙ্কেল আর আন্টিকে সব টা বললাম। বুঝানো শেষে আঙ্কেল বললো,,
“সব বুঝলাম কিন্তু এত কিছু আমি একা পারবো না তাই সাগরকে( আইদার ভাই) বলতে হবে। আমি জানি সেও তোকে হেল্প করবে৷ এখন এত চিন্তা না করে রুমে যা। যা করার আজই করতে হবে। আমি সাগরের সাথে কথা বলছি।”
আমিও কিছু না বলেই মাথা নাড়িয়ে রুমে চলে আসলাম। যেটা করছি তাতে কতটুকু কি হবে জানি না। তবুও এছাড়া যে কোনো উপায় নেই তাও উনারা বুঝেছে। কারণ ওরা বাবা মায়ের পরিচয়ে গেলেও কেউ বিশ্বাস করবে বলে আমার মনে হয় না আর এতে আঙ্কেল আন্টির বিপদও বাড়বে। তাই এই সিদ্ধান্ত। আঙ্কেলও বিনাবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ এত ভালো ভাবতেই অবাক লাগে। আমাকে না চিনে না জেনেও কতটা ভালোবেসে আগলে রাখছে। আমি চুপ করে এসে বেডে বসে রইলাম। একটু পর রুমে আইদা এলো।
“আসতে পারি?”
“হুম আসো।”
“এত চিন্তা করো না আপু। টেনশনে সব ঠিক হবে না। তুমি নিজেকে শক্ত করো। তোমাকে কিন্তু নিজ হাতে সব সামলাতে হবে।”
“হুম। কিন্তু মাথা কাজ করছে না। জানি না কিভাবে কি করবো?”
“ধ্যাত সারাদিন টেনশন করে মাথা খারাপ করো পরে তুমি আর অনুভব ভাইয়া মিলে গিয়ে এক সাথে পাগল হয়ে নেচো কেমন!”
আমি আইদার কথা শুনে ফিক করে হেঁসে দিলাম।
“তুমিও না! ভার্সিটি যাবে না কাল?”
“না গো আপু। পড়াশোনায় তো আমি পাক্কা ফাকিবাজ।”
“হুম বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দাঁড়াও আন্টিকে বলছি।”
“হুম হুম বলে ফেলো😁😁
” 😒😒
“আরে ওরকম করে কেনো? আচ্ছা বাদ দেও এসব। একটা জিনিস দেখবা?”
“কি জিনিস?”
“এই দেখো।”
সামনে একটা ফটো অ্যালবাম ধরে বলে। আমি ওর হাতে ফটো অ্যালবাম দেখে ভ্রুকুচকে জিজ্ঞেস করলাম,,
“অ্যালবাম? কিসের?”
“আরে কিসের আবার! আমাদের ফ্যামিলি ফটো। দেখবা??
” হুম দেখাও।”
ফটোর অ্যালবাম দেখতে দেখতে আইদা ওদের ছোটবেলা নিয়ে গল্প শুনাচ্ছে আমার তো হাসিতে গড়াগড়ি খেতে ইচ্ছা করছে। কত হ্যাপী ফ্যামিলি ওদের। অ্যালবাম দেখতে দেখতে চোখ আটকে যায় একটা ছবির দিকে। এই বাড়িতে আন্টি, আঙ্কেল, ভাইয়া, ভাবি, আইদা আর৷ সিফাত ছাড়া এই প্রথম অন্য কাউকে দেখলাম তাও ফটো তে। ভ্রু যুগল কিঞ্চিত কুচকে জিজ্ঞেস করলাম,,
“এরা কারা আইদা?”
“এরা! উনারা আমার চাচ্চু,চাচিমা আর তাদের ছেলে মেয়েরা।”
“উনারা তোমাদের সাথে থাকে না কেন?”
“সে তো অনেক বড় ঘটনা।”
“তুমি শর্টকাট করে শুনাও।”
“আচ্ছা বলছি। আমি যদিও নিজে দেখিনি কারণ তখন আমার জন্মই হয়নি। ভাইয়া আর আম্মু গল্প শুনিয়েছিলো। ভাইয়ার তখন ৭ বছর বয়স। তখন চাচ্চু আর চাচিমা রা এখানেই থাকতো। কিন্তু আমার চাচ্চুরা ছিল ভিষন লোভী। চাচ্চু রা নাকি আগে থেকে বাজে পথে ছিলো। এই যেমন ধরো নেশা করা, পড়াশোনা না করা, মারপিট করা, পড়াশোনা তো করতোই না। চাচ্চুদের এমন হাল দেখে দাদাভাই অনেক চিন্তায় পড়ে যান। আর এত চিন্তার ফলে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়। তার আগে সব সম্পত্তি আব্বুর নামে করে দিয়ে যান। চাচ্চুদের স্বভাব ভালো ছিলো না বলেই দাদাভাই এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। পরে চাচ্চুরা এসে সম্পত্তি দাবী করলে আব্বু সাফ সাফ বলে দেয় তোদের কিছু দেবো না যা দেবো তোর ছেলে মেয়েদের। কিন্তু চাচ্চুরা রেগে চলে যায়। তারপর থেকে তারা কেমন আরো বেশি বাজে হয়ে যায়। লোক ঠকানো শুরু করে। ভাইয়াকেও একবার মারার চেষ্টা করেছিলো। জানো আমার নাকি বড় আপুও ছিলো।”
“তাই! সে কোথায়?”
“জানি না গো। আম্মু বলে চাচ্চুরা নাকি আমার আপুকে জন্মের পর পরই কোথায় নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেছিল।”
আইদার কথা শুনে অনেক খারাপ লাগলো। তারপর আরো কিছুক্ষণ গল্প করে আইদা নিজের রুমে চলে গেলো। আর আমি ভাবতে থাকলাম কি করে কি করবো? কে হেল্প করতে পারবে? সব চিন্তার পোকারা যখন ঘিরে ধরেছে হঠাৎ করেই মাথায় আসে তন্নি, তামিম, মেঘু ওরাই তো আমাকে সাহায্য করতে পারবে। মেঘু এখন শ্বশুরবাড়ি তাও রাহাতের ভাইয়ের বউ। ওকে এখন কিছু জানানো যাবে না। যদি রাহাত কিছু করে তাহলে ও তো অনুভবকে মেরে ফেলবে। তামিম তো কোনো কিছুতেই সিরিয়াস না। আর ওর একটুতেই মাথা গরম হয়ে যায়। ঠিক করলাম প্রথমে তন্নির সাথে যোগাযোগ করবো। ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকলাম। কারণ এটা নতুন ফোন। এই ফোনে কারো নাম্বার নেই। আর তাছাড়া এতদিন পর ওদের নাম্বার মনে পড়ছে না। তাই ফেসবুকে ঢুকলাম৷ কিন্তু ফেসবুকের পাসওয়ার্ড ও তো ভুলে গেছি। কি করা যায়? এটা ওটা ভাবতেই ছুট লাগালাম আইদার রুমের দিকে। আইদা রুম ফাঁকা দেখে পারমিশন না নিয়েই ঢুকলাম। ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ আসছে। আমি চুপ করে বসে রইলাম বেডের এক কোণায়। একটু পর আইদা আমাকে হঠাৎ দেখে চমকে উঠে বলে,,
“আরে তুমি আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম।”
“সরি আসলে রুম পুরো ফাঁকা ছিলো তাই পারমিশন না নিয়েই ঢুকে পড়েছি।”
“আরে ইটস ওকে। হঠাৎ করে দেখায় ভয় পেয়ে গেছিলাম। বাদ দাও এসব এবার বলো হঠাৎ আমার রুমে? কোনো দরকার?”
আমি মাথা টা নিচু করে ছোট করে উত্তর দিলামম,,
“হুম..
” মাথা নিচু করে আছো কেন? বলোই না কি দরকার?”
“আসলে আইদা আমমি তোমার ফোন থেকে তোমার ফেসবুকটা একটু ইউজ করতে পারি? আসলে আমার ফেসবুক পাসওয়ার্ড আমি গিলে খেয়ে বসে আছি।”
“হাহাহা এই ব্যাপার। নিতেই পারো বাট বলো কি দরকার?”
“আমার একটা ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলা খুব দরকার।”
“আচ্ছা নাও।”
আমি আইদার ফোন নিয়ে তন্নির আইডি খুজতে লাগলাম। ওর প্রোফাইলে যে ওর ৩২ টা দাঁত বার করা পিক থাকবে তা ভালো ভাবেই জানি। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলাম ওর আইডি। হ্যাঁ যা ভেবেছিলাম তাই ৩২ টাা দাঁত বের করে ফোকলা হাসি দিয়ে আছে। ওর আইডি তে রিকুয়েষ্ট দিয়ে মেসেজ সেন্ড করলাম,,
“তন্নি আমি স্নিগ্ধু তাড়াতাড়ি এক্সেপ্ট কর ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।”
এটুকু সেন্ড করেই মোবাইল পাশে রেখে সমানে পায়চারী করছি নয়তো নখ কামড়াচ্ছি। ৫ মিনিট পর টুং করে শব্দ হতেই দেখি তন্নির মেসেজ। হয়তো আমার ভাগ্যটা খুব ভালো তাই তো তন্নি এই সময় অনলাইন।
“স্নিগ্ধু কোথায় তুই? কেমন আছিস? বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গেলি?”
তোর মেসেজ দেখে আমি বললাম,,
“এত প্রশ্ন না করে শোন,,কাল আমার সাথে দেখা কর। এড্রেস পাঠিয়ে দিচ্ছি আর তোর নাম্বারটা দে। আর হ্যাঁ আমার যে তোর সাথে দেখা হয়ছে এই নিয়ে কাউকে কিছু বলিস না।”
“কিন্তু কেন?”
“আন্ডার জন্য। চুপ চাপ যা বলছি তা কর।”
তন্নি ওর নাম্বার টেক্সট করে দিলো আর আমি এড্রেস পাঠিয়ে আইদাকে ধন্যবাদ জানিয়ে রুমে এসে গা এলিয়ে দিলান।

লুকিয়ে আছি হসপিটালের দরজার সামনে। আমার সাথেই সাগর ভাইয়া, আইদা দাঁড়িয়ে আছে। হসপিটালে রেট করা হয়েছে। রেটের কারণ তাদের কাছে ইনফরমেশন আছে এখানে ডেইট এক্সপায়ার্ড মেডিসিন রাখা হয়। আরো অনেক চার্জ আছে। পুলিশ সব ডক্টর, নার্স এমনকি রিসেপশনিস্টকেও একটা কেবিনে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা বাদ করছে। এটাই আমাদের মূখ্যম সুযোগ। যদি এই সুযোগ কাজে না লাগাতে পারি তাহলে অনুভবকেহ হারিয়ে ফেলবো। কিন্তু কেন জানি পা গুলো আর এগোতে চাইছে না। পাশ থেকে সাগর ভাইয়া বললো,,
“এই স্নিগ্ধা দাঁড়িয়ে আছো কেন? যা করার তাড়াতাড়ি করো! নয়তো সবাই ধরা পড়া যাবো আর তখন কি হতে পারে বুঝতেই পারছো!”
“হুম ভাইয়া।”
আইদা কাঁধে হাত রেখে বললো,,
“নার্ভাস ফিল করলে চলবে না আপু। তুমি কিন্তু ভুলে যেও না এখন যদি সময়টা কাজে না লাগাও তবে তুমি……
” হুম চলো।”
জোড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সামনে এগোতে লাগলাম। ভয় কাজ করছে। যদি অনুভব না যেতে চায় তবে? তবে কি করবো আমি? চিৎকার চেঁচামেচি করলে বিপদ বাড়বে। না না স্নিগ্ধু তুই একদম ভয় পাবি না। তুই তো ব্রেভগার্ল। দ্রুত পায়ে কেবিনে ঢুকে দেখি অনুভব এলোমেলো ভাবে শুয়ে আছে। সাগর ভাইয়া দরজার কাছে বার বার উঁকি দিচ্ছে। আমি আর আইদা গিয়ে অনুভবের কাছে বসলাম। অনুভবকে হালকা ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগলাম,,
“অনুভব! শুনছেন আপনি?”
অনুভবের কোনো হেলদোল নেই৷ আমি মুখটা কানের কাছে নিয়ে গিয়ে একটু জোড়ে করেই বললাম,,
“উঠুনননননননন।”
কানের কাছে বিকট শব্দ পেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠলো অনুভব। চোখ ২ টা ছোট ছোট করে বললো,,
“আপনি কে? এভাবে চমকালেন কেন?”
“আমি কে সেইটা পরে বলবো। আগে বলেন,,আপনাকে তো এরা অনেক মারে? আপনি আমার সাথে যাবেন? সেখানে কেউ মারবে না!”
অনুভব বাচ্চাদের মতো করে বললো,,
“কেন যাবো? আম্মু বলে একা একা কোথাও যেতে নেই।”
“একা কোথায় যাবেন? আপনি তো আমার সাথে যাবেন!”
“না আমি যাবো না।”
অনুভব যাবে না যখন বলেছে তখন সে যেতে নারাজ। যাবে না মানে যাবে না। এখন কি করবো?
“স্নিগ্ধা তাড়াতাড়ি করো!”
সাগর ভাইয়ার ডাকে মনে হলো স্নিগ্ধবতীর কথা। আমি অনুভবকে বললাম,,
“আপনার মনে আছে আমি সকালে এসেছিলাম? আপনি বলেছিলেন স্নিগ্ধবতীর কাছে যাবেন!”
অনুভব এবার চট করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,,
“হুম স্নিগ্ধবতী।”
“আপনার স্নিগ্ধবতী আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনি যাবেন না তার কাছে?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ যাবো তো। কিন্তু কোথায় আমার স্নিগ্ধবতী?”
“আছে। আপনি আমার সাথে চলুন।”
“আপনি মিথ্যা বলছেন না তো?”
“না একটুও মিথ্যা বলছি না।”
“পাক্কা?”
মুচকি হেসে বললাম,,
“হুম পাক্কা।”
তারপর অনুভবকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ৩ জন বের হয়ে আসলাম। হসপিটালে সিসিটিভি ছিলো বাট আমরা আগেই সেইটা নষ্ট করে দিয়েছি। অনুভব তার স্নিগ্ধবতী বলতে এতটাই পাগল যে একবার বলতেই সে লাফিয়ে উঠে বললো যাবে।

অনুভবকে রুমে নিয়ে গিয়ে ফ্রেশ করিয়ে বেডে বসিয়ে দিলাম। অনুভব একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার রুমের দিকে তাকাচ্ছে।
“আমার স্নিগ্ধবতী কোথায়? আপনি তো বলেছিলেন আমাকে স্নিগ্ধবতীর কাছে নিয়ে যাবেন!”
অনুভবের সামনে একটু ঝুকে কাঁপা কাঁপা হাতে বললাম,,
“অ অনুভব আপনি আপনার স্নিগ্ধবতীকে চিনতে পারছেন না? দেখুন না আপনার স্নিগ্ধবতী আপনার সামনে!”
“কোথায় আমার স্নিগ্ধবতী? আর কে অনুভব?”
অনুভবের মুখে এই কথা শুনে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো৷ কি বলে এটা? অনুভব কে মানে কি?
“অনুভব কে মানে কি? আপনি ই তো অনুভব।”
“আমি এত কিছু জানি না। আমাকে স্নিগ্ধবতীর কাছে নিয়ে চলেন। নয়তো আমি কান্না করবো।”
“নিয়ে যাবো তো। সময় হোক। আপনি এখন চুপটি করে বসেন।”
“না আমি এখনি যাবো।”
চোখ গরম করে অনুভবকে ধমক দিয়ে বললাম,,
“অনুভব,,কি বাচ্চাদের মতো জেদ করছেন?”
অনুভব ধমক শুনে কেঁপে উঠে। বাচ্চাদের মতো ঠোট উলটে বলে,,
“আপনি আমাকে বকলেন?”
উনার তো মাথা ঠিক নেই। সব ভুলে গিয়েও তার স্নিগ্ধবতীকে সে মনে রেখেছে। তাই তো এখন জেদ ধরেছে। কি করে বোঝাবো যে আমিই তার স্নিগ্ধবতী!
আমাদের কথার মাঝেই রুমে ভাবি আর সিফাত আসলো। সিফাত আধো আধো গলায় বললো,,
“ফুতিমনি এতা কে?”
আমি সিফাতকে নিয়ে অনুভবের পাশে বসিয়ে গালটা টেনে বললাম,,
“এটা,,এটা তোমার আঙ্কেল হয় বুঝছো বাবা।”
“হুম বুততি। নাম কি তোমার আনতেল?”
অনুভব ড্যাবড্যাব করে সিফাতের দিকে তাকিয়ে আছে। আমিই বললাম,,
“তোমার আঙ্কেলের নাম অনুভব।”
“অনুতব। কতো বলো নাম!”
সিফাতের কথা শুনে হেঁসে উঠলাম। ভাবি বললো,,
“অনুভবের কি হয়েছে স্নিগ্ধা?”
“তেমন কিছু না ভাবি। জেদ করছে।”
“এখন কি করবে?”
“সেটাই ভাবছি।”
হঠাৎ করেই মাথায় একটা কথা আসাতেই অনুভবকে বললাম,,
“আপনি খেলবেন?”
অনুভবও উৎসাহ নিয়ে বললো,,
“হুম খেলবো। কিন্তু কি দিয়ে খেলবো?”
আমি সিফাতকে বললাম,,
“বাবু তুমি আঙ্কেলের সাথে খেলবা?”
“আনতেল বুজি এত বলো হয়ে আমাল সাথে খেলবে!”
“হুম খেলবে তো!”
“আনতেল তুমি আমাল সাথে খেলবে?”
অনুভব সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বললো,,
“হুম হুম খেলবো।”
ভাবি অনুভবকে দেখে বললো,,,
“এটা তো পুরাই ছোট বাচ্চা গো স্নিগ্ধা!”
“হুম। ভাবি ২ জনের খেলনা দিয়ে ওদের একটু সামলাও। আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।”
“আচ্ছা যাও।”

আমি চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে নিলাম। এ কেমন জিবন আমার? ভালোবেসে এত কাছে পেয়েও মানুষটা হারিয়ে ফেলেছি এখন যখন পেলাম তখন সে মানসিক ভাবে অসুস্থ,,ভাগ্যের কি অদ্ভুদ পরিহাস যে মানুষটা নিজের নামও ভুলে গেছে সে কি না শুধু তার স্নিগ্ধবতীর নাম টাই মনে রেখেছে। আচ্ছা এটাও কি সম্ভব? প্রকৃতির কি খুব দরকার ছিলো এত বড় শাস্তি দেওয়ার? অবশ্য আল্লাহ যা করেন বান্দার ভালোর জন্যই করেন। হয়তো এই সাময়িক কষ্টের জন্য হলেও অনেক সত্যের মুখোমুখি হবো। হয়তো সত্য গুলো খুব কঠিন হবে তবুও তার মুখোমুখি হতে আমি প্রস্তুত…….

চলবে…..
(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here