স্নিগ্ধ অনুভব পর্ব ৫+৬

0
94

#স্নিগ্ধ_অনুভব
#পার্ট:৫
#পিচ্চি_লেখিকা

অনুভব ভাইয়া হুট করেই আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। উনার এই কাজে তো আমি আকাশ থেকে পড়লাম। থ মেরে চুপটি করে উনার বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছি।
“স্নিগ্ধবতীর মুখে হাসিটাই ভালো মানায় কান্না নয়। স্নিগ্ধবতীর হাসিতে বারং বার মরতে রাজি কিন্তু তার চোখের পানি মোটেও সহ্য হয় না।”
উনার কাজে তো এমনিই আমি থ মেরে গেছি তার উপর এসব কথার কোনোটাই মাথাতে নিতে পারলাম না। কে স্নিগ্ধবতী? কার চোখের পানি তার সহ্য হয় না? কার হাসিতে উনি বারং বার মরতেও রাজি? আমার? না! উনি আমাকে সহ্যই করতে পারে না উনি কি না আমাকে তার স্নিগ্ধবতী ভাববে? এটা ভাবাও হয়তো আমার জন্য বোকামি। আমি মুখটা উনার বুকের মাঝে নিয়ে চুপটি করে তার ঘ্রাণ নিচ্ছি।

কয়েক মিনিট যেতেই অনুভব ভাইয়া আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে মুখ ঘুড়িয়ে নিলো। ধাক্কা মারার জন্য মাথায় একটু ব্যাথা পাইছি। তার থেকেও বেশি অবাক হয়েছি উনার ব্যবহারে। কয়েক সেকেন্ড ভাবতে লাগলাম কি হলো এতক্ষণ আর কেনই বা কাছে টেনে আবার দুরে সরিয়ে দিলো? কয়েক সেকেন্ড লাগলো সবটা বুঝতে। নিজের প্রতিই নিজের তাচ্ছিল্যের হাসি আসতেছে। কেন করছে উনি এমন জানি না! যদি দুরে ঠেলে দেওয়ারই হয় তবে কাছে আসা কেন? আর যদি কাছে আসার হয় তবে দুরত্ব কেন? সে কি বোঝে আমার এই দুরত্ব মোটেও ভালো লাগে না আমার যে তার গভীরত্ব দরকার। তার ভালোবাসায় নিজেকে মুড়িয়ে রাখতে চায়। হয়তো সে বোঝে না।
অনুভব ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে দেখি উনি এখনো ওপাশ ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি একটু দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম,,
“যদি দুরত্ব ধরে রাখার হয় তবে সেটা যেন দুরত্বই থাকে..একবার কাছে টেনে আবার দুরত্ব দেওয়া মোটেও সহ্য হয় না। পোড়ায় খুব!”
এটুকু বলেই আর দাঁড়ায় নি। সোজা ছাদে এসে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

কেটে গেছে আরো ২ দিন আজকেই আমরা ওই ফ্ল্যাটে শিফট করবো। মন খারাপ করে কাপড় গুছিয়ে নিচ্ছি এমন সময় হন্ত দন্ত করে রুমে ঢুকলো অনুভব ভাইয়া। ঢুকে সোজা ওয়াশরুম। আজব লোক!☹️ কখন কি করে কে জানে? আমি আমার মতো কাপড় গুচাচ্ছি। মনটা একদম ভালো না আজ মামুনি কে ছেড়ে যেতে হবে।
“এমন পিপড়ার মতো আস্তে আস্তে কি করিস?”
অনুভব ভাইয়ার কথা শুনে পিছনে তাকালাম। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললাম,,
“কি আর করবো? আপনার তো বড় বড় আদেশ আজকেই চলে যেতে হবে তাই সব গুছিয়ে নিচ্ছি।”
“তোর যা যা লাগবে নে! বই গুলো আমি কালকে নিয়ে গিয়ে দেবো তুই আজ দরকারী গুলো নে।”
“আচ্ছা! একটা কথা বলবো ভাইয়া?”
“বল!”
“ইয়ে মানে..বলছি যে আমরা না গেলে হয় না? কি এমন দরকার যে…
আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,,
” না গেলে হয় না। আর তাছাড়া ওই বাড়িতে গেলে অনেক সারপ্রাইজ পাবি তুই।”
অনুভব ভাইয়া আমার দিকে এগিয়ে এসে গালে স্লাইড করতে করতে বললো,,
“অনেক হিসাব বাকি তোর সাথে বউ! তুই শুধু রেডি থাক।”
উনি আমাকে ছেড়ে সোফার ওপর লেপটপ নিয়ে বসে পড়লো। উনার শান্ত গলার হুমকি খুব ভালো ভাবেই বুঝলাম। কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য কে জানে? সব কাপড় গুছিয়ে রেখে একটু ছাদে গেলাম। ছাদের এক কোণায় বসে একবার আকাশ দেখছি তো আরেকবার নিচে তাকাচ্ছি। আজকে রোদ নাই আকাশে মেঘ জমেছে খুব হয়তো বৃষ্টি আসবে!
“কি রে একা একা এখানে কি করিস?”
তিশা আপুর কন্ঠ শুনে একবার ওদের দিকে তাকিয়ে আবারও মাথা নিচু করে নিলাম। তিশা আপু আর তুষার ভাইয়া আসছে। আমার উত্তর না পেয়ে তিশা আপু আবার বললো,,
“কি রে কথা বলছিস না কেন? মন খারাপ? নাকি শরীর খারাপ?”
তখনো কোনে উত্তর না দিয়ে বসে আছি। তুষার ভাইয়া বললো,,
“এই তিশু এই স্নিগ্ধুরে কি বোবাই ধরলো নাকি?”
“ধুর ভাইয়া কি যে বলো না! এই স্নিগ্ধু কিছু তো বল! অনুভব ভাইয়া কিছু বলছে তোকে? নাকি এই বাড়ি থেকে যাবি বলে মন খারাপ কোনটা?”
“আমি যাবো না আপু🥺..”
“তাহলে অনুভব ভাইয়াকে গিয়ে বল!”
“তোমার এ….দাড়াও আগে দেখো আশে পাশে কেউ নেই তো নাকি?”
“কেন বল তো?”
“ধুর আগে দেখোই না!”
“কেউ নেই এবার বল..”
“তোমার ওই এলিয়েন ভাই আমাকে জোড় করে নিয়ে যাচ্ছে। খচ্চর একটা! অভিশাপ দিলাম তোমার ভাইয়ের কপালে শাঁকচুন্নি বউ জুটবে।”
“কি বলিস তুই? তুই ই তো ভাইয়ার বউ। তাহলে কি তুই শাঁকচুন্নি?”
“এহহহ না না..আমি তো ভুলেই গেছিলাম অনুভব ভাইয়ার সাথে বিয়ে হয়ছে আমার। আচ্ছা যাও এই অভিশাপ কেন্সেল।”
“আরে চিল তুই ঠিকই বলেছিস। ভাইয়া একটা শাঁকচুন্নি বউ পাবে..পাবে কি রে পেয়েও গেছে! তুই তো শাঁকচুন্নির চেয়ে কোনো অংশে কম না।”
এটুকু বলেই তুষার ভাইয়া আর তিশা আপু হাসতে লাগলো।
“ওই ধুর হাসি থামাও..অনুভব ভাইয়াকে বলো না যেন না যায়!”
তুষার ভাইয়া আমাকে থামিয়ে বললো,,
“এই থাম থাম! আচ্ছা তিশু অনুভব কে স্নিগ্ধু ভাইয়া বললো?”
“হুম তাই তো শুনলাম!”
“আচ্ছা স্নিগ্ধু তোদের বাচ্চা হলে অনুভব কে কি ডাকতে বলবি? মামা নাকি বাবা? আর তোকে কি ডাকতে বলবি মামি নাকি মা?
বলেই হো হো করে হেসে দিলো দুজনে। আমি থতমত খেয়ে বললাম,,
“ইয়ে মামা ডাকও শিখাবো না বাবা ডাকও শিখাবো না আঙ্কেল ডাক শিখাবো,,হুহ।
আমার কথা শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে আবারও হাসতে শুরু করলো। আমি আর না থেকে সোজা রুমে চলে এলাম। ভালো লাগে না! এলিয়েন টা রুমেই আছে। এনাকন্ডা একটা। টিকটিকির বড় ভাই। মনে মনে হাজারটা গালি দিতে দিতে রুমে ঢুকতে যাবো তখনই হোচট খেয়ে পড়তে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। হোচট কেমনে খায়লাম আজব!
” মনে মনে আমাকে গালি না দিয়ে আল্লাহ চোখ দিছে সেগুলো কাজে লাগা।”
অনুভব ভাইয়ার কথা শুনে অবাক হয়ে গেছি। আমি যে বকেছি এটা উনি কিভাবে বুঝলেন?
“আমি মোটেও আপনাকে বকি নি। সব সময় অদ্ভুত কথা বলেন।”
আমার কথা গুলো একটু জোড়ে হয়ে গেছে। রাগে আছি খুব তাই বুঝতে পারিনি। আমার জোড়ে বলা কথা গুলো শুনে উনি এসে আমার গাল সজোড়ে চেপে ধরলো। আমি তো হা হয়ে তাকিয়ে আছি।
“সব সময় গলা নামিয়ে কথা বলবি নয়তো…”
অনুভব ভাইয়া আমাকে ছেড়ে দিয়ে বাইরে চলে গেলো। ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়লাম। এতো রুপ কেন এই লোকের? গিরগিটির মতো রুপ পাল্টায় সব সময়! এক বার আঘাত করে তো আরকবার কাছে টেনে নেয়। উনার তো ভিলেন হলে ভালো হতো হুহ।

বিকালবেলা__________

চলে যাবো একটু পরই। মামুনি কান্না করেই যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও কেউ থামাতে পারছে না। কতবার যে বললাম ২ দিন পর আবার আসবো দেখা করতে এছাড়াও মাঝে মাঝেই আসবো কিন্তু কে শোনে কার কথা? সেই কেঁদেই যাচ্ছে। যদিও আমারও অনেক কান্না পাচ্ছে কিন্তু ওই যে আমার ভিলেন নাম্বার 1 বর আছে না উনি বলে দিয়েছে,,
“তোর চোখে এক ফোটা পানি দেখলেও ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবো আর নয়তো চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেবো।”
উনার এত বড় কথা শোনার পর আর সাহস হয়নি কান্না করার। অনুভব ভাইয়া এসে বললো,,
“আম্মু তুমি এখনো কান্না করতেছো? তুমি এভাবে কাঁদলে আর আসবো না আমরা এই বাড়ি!”
এই কথা শুনে মামুনি আরো জোড়ে কান্না জুড়ে দিলো। অনুভব ভাইয়া কাছে গিয়ে আদুরে গলায় বললো,,
“আম্মু আমি প্রতিদিন আসবো তোমার কাছে প্লিজ আর কেঁদো না।”
অনেক কষ্টে মামুনি কে শান্ত করে গাড়ির দিকে এগোচ্ছি আমরা। কিছুতেই যেতে ইচ্ছা করছে না। মনে হচ্ছে আমার জিবনে অনেক বড় ঝড় আসতে যাচ্ছে। কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। অনুভব ভাইয়ার দিকে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এগোতে গেলেই হাতে টান পড়লো। পিছনে তাকিয়ে দেখি তিশা আপু।
“কি গো আপু?
আপু কিছু না বলে আমাকে একটু সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বললো,,
” তোরা চলে যাচ্ছিস অনেক খারাপ লাগতেছে। কিন্তু তোকে কিছু বলার আছে!”
“হ্যা বলো!”
“দেখ আমি জানি অনুভব ভাইয়া তোকে অনেক মেরেছে এতদিনে। কিন্তু ভাইয়া তোকে অনেক ভালোবাসে স্নিগ্ধু। তোর প্রতি ভাইয়ার অনেক রাগ! কেন এত রাগ জানা নেই আমার। তবে এই রাগের কারন আর তোর প্রতি ভালোবাসা ২ টাই তোর খুজে নিতে হবে স্নিগ্ধু। আর হ্যাঁ এসব ভাইয়া টাইয়া ডাকা বাদ দে। তোর অধিকার তুই বুঝে নে। বুঝতে শিখ অনুভব ভাইয়া কে। তোর জানা অজানায় অনেক কিছু আছে তা তোরই বের করতে হবে। আর সব থেকে ইম্পর্ট্যান্ট যেটা সেইটা হলো অনুভব ভাইয়া তোর স্বামী তাই তোর আর অনুভব ভাইয়ার মাঝে কাউকে আসতে দিবি না হুম।”
তিশা আপুর সব কথা মাথার ৪ হাত উপর দিয়ে গেলো। সব ভাবা বাদ দিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। অনুভব ভাইয়া নিজের মতো করে গাড়ি চাালাচ্ছে আর আমি আপুর বলা কথা গুলো ভাবছি। কিছুতেই কিছু মিলাতে পারছি না।

ফ্ল্যাটে এসে ফ্রেশ হয়ে বসে আছি। এ বাড়িতে শুধু কয়েকজন সার্ভেন্ট আছে। এর মাঝে একটা মেয়ে আছে অনা আমার বয়সী অনেক ভালো একটা মেয়ে। এই বাড়ি দেখলেও কেউ বলবে না এটা একটা ছোট ফ্ল্যাট। অনেক বড় । অনুভব ভাইয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন কথা বলছে। আমি অনেক ভেবে ঠিক করে নিয়েছি অনুভবের সবটা আমি জানবো বুঝবো। কেন দুরত্ব? কেন কাছে টেনে নেওয়া? কিসের এত রাগ উনার আমার প্রতি? সব জানতে চাই। নিজের ধ্যানে মগ্ন আছি। এমন সময় অনুভব ভাইয়া বলে উঠলো,,
“এখানে এমন সঙ সেজে বসে আছিস কেন? কিসের এত ভাবনা তোর?”
“যে ভাবনায় থাকুক আপনাকে কেন বলবো?”
“কেন বলবি মানে?”
“হুম কেন বলবো? কে হন আপনি?”
অনুভব ভাইয়া সাথে সাথে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আমার দিকে রাগী চোখ নিয়ে তাকালো। ভয় করছে অনেক তবুও আমি দমবো না।
“ওভাবে তাকানোর কি আছে? আজব!
” তোর সাহস একটু বেশি বেড়ে গেছে!”(দাতে দাত চেপে)
“সাহস বাড়ার কি আছে? সত্যি তো বলেছি! কে হন আমার? কেন আমি আপনাকে বলবো আমি কি ভাবছি? কোন অধিকারে জানতে চান? বিয়েটা তো ছেলে খেলা। যখন খুশি ভেঙে দিবেন। তাই কেউ হন ন….
আর কিছু বলতে পারিনি। উনি সাথে সাথে এক থাপ্পড় দিয়ে গলা চেঁপে ধরেছে। রাগে বেশ জোড়েই ধরেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। কোনো রকম উনার শার্টের দিকে হাত বাড়িয়ে বুকে ধাক্কা দিচ্ছি। উনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে দেয়ালে আঘাত করলো। আমার তো কাশতেই কাশতেই জান বের হয়ে যাচ্ছিলো। উনিই এক গ্লাস পানি বাড়িয়ে দিলো সাথে সাথে ঢকঢক করে পুরোটা শেষ করে কয়েকটা বড় বড় শ্বাস নিয়ে বললাম,,
” যে বিয়েটা আপনি মানেনই না সেইটার জন্য মারলেন আমাকে!কেন? যাকে বউ বলেই মানেন না তার ওপর কিসের এত অধিকার আপনার?”
“চুপ একদম চুপ। আর একটা কথা বললেও তোকে আমি সত্যি সত্যি মেরে ফেলবো। ভেবেছিলাম তোকে এখানে একটু ভালো থাকার সুযোগ দিবো! না আর না। শুরু হয়ে গেছে তোর জাহান্নামের জিবন। ওয়েলকাম টু হেল!”
#স্নিগ্ধ_অনুভব
#পার্ট :০৬
#পিচ্চি_লেখিকা

অনুভবের বলা প্রত্যেকটা কথা সে ফলিয়েছে। হ্যাঁ আমার জিবনটা পুরোই জাহান্নামের মতো বানিয়ে দিয়েছে। কথায় কথায় থাপ্পড় তো আছেই এখন আরো মাইর যোগ হয়ছে। সেদিন আপুর বলা কথা গুলো সত্যি ভেবেছিলাম কিন্তু আজ আর ভাবি না। অনুভব আমাকে ভালোবাসে না। আচ্ছা ভালোবাসলে এভাবে মেরে ক্ষত বিক্ষত করা যায়? একটুও কি মায়া হয় না? অবশ্য ভালোবাসাটাই তো নেই। সেদিন ইচ্ছা করেই অনুভব কে রাগিয়ে ছিলাম কিন্তু তার ফলাফল কতটা খারাপ ভাবে ফলেছে তা তো বুঝতেছি। এই তো সেদিন ভার্সিটি থেকে আসতে লেইট হয়েছে বলে বেল্ট দিয়ে বাজে ভাবে মেরেছে। একবারও জিজ্ঞেস করেনি কেন লেইট করলাম? তারপর ৭ দিন থেকে ঘর বন্দী হয়ে আছি। মামুনির কাছেও নিয়ে যায় না। ওই বাড়িতে হয়তো কোনো বুঝ দিয়ে রেখেছে। এই সম্পর্ক আর আগে বাড়বে না তা খুব ভালো ভাবেই বুঝে গেছি।
“ভাবি আসবো?”
অনার কথায় ধ্যান ভাঙলো। ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললাম,,
“পারমিশন নিচ্ছো হঠাৎ? ”
“না এমনিই। সারাদিন রুমের মধ্যে কি যে করো তুমি! চলো আজ বাইরে যায় ঘুরতে।”
অনার কথায় মুখটা মলিন হয়ে গেলো। যখন ওই বাড়িতে থাকতাম প্রায়ই ঘুরতে যেতাম আমরা। মেঘু আর তন্নি তো আগে থেকেই পাগল।
“এই ভাবি কই হারিয়ে গেলে?”
“হ্যাঁ? কই না তো! কোথাও হারায় নি।”
“যাবে ঘুরতে?”
“না গো। তোমার স্যার যেতে দিবে না!”
অনা মন খারাপ করে বললো,,
“তাহলে থাক অন্য একদিন যাবো।”
“আচ্ছা অনা তোমার গল্প করো শুনি!”
“কি গল্প শুনবা?”
“তুমি পড়াশোনা করো না?”
“হুম করি তো! স্যারই করায়। আমার পড়াশোনার সব খরচ স্যার দেয়। আমার আব্বা এই বাসা দেখা শোনা করতো। সব থেকে পুরোনো স্টাফ ছিলেন উনি। আমার মা তো সেই কবেই মারা গেছে। আব্বার সাথে এখানেই থাকতাম। আব্বা মারা যাওয়ার পরও স্যার আমাকে বের করে দেননি বলেছে এখানেই থাকতে সব কিছুর দেখাশোনা করতে আর আমার পড়াশোনা ঠিক রাখতে।”
“তোমার বাবা……
আমার কথার মাঝেই ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি আননোন নাম্বার। এই সন্ধ্যা বেলা কে ফোন দিলো কে জানে? ফোনটা ধরবো কি না ভাবতে ভাবতেই কেটে গেলো। কয়েক সেকেন্ড পরই আবার বেজে উঠলো। এবার দ্বিধাবোধ না করে ধরে নিলাম। সালাম দিতেই ওপাশ থেকে বলে উঠলো,,
” হেই বেবি!”
“কে আপনি?”
“এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে? তোমার তো আমাকে ভোলার কথা না। আমাকে নিয়ে তো তোমার লাইফে অনেক স্মৃতি আছে। ”
কয়েক সেকেন্ড লাগলো তার কথার মানে আর তার কন্ঠ চিনতে । সিডর আসবে আমার লাইফে। এই লোকটা কি কখনো আমাকে ভালো থাকতে দেবে?
“আরে আরে চুপ করে গেলে যে। চিনতে পেরেছো বুঝি! তা শুনলাম তোমার নাকি বিয়ে হয়ে গেছে। ওই যে সেই অনুভবের সাথে তাই না। তা এত সহজে সুখ পাবে তো?”
“আ…আপনি আমাকে কেন ফোন করেছেন?”
“বিডি আসছি। ওয়েটে থাকো!”
এটুকু বলেই ফোন কেটে দিলো। এই ছেলেটা রাহাত। রাহাতের কথা মনে হতেই ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস আসলো।

রাতে একা একা থাই গ্লাস সরিয়ে তার ওপর হেলান দিয়ে বসে আছি। বাইরে ল্যাম্পপোষ্টের আলো তে সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এখনো আসেনি অনুভব। আজ আবার এসে কি করবে কে জানে? ভয় করে এখন। এই ক’দিনে এত মাইর খেয়েছি যে এখন খুব ভয় করে।
“ওখানে কি করিস?”
কারো কন্ঠ শুনে পিছনে তাকাতেই দেখি অনুভব। আমাকে চুপ থাকতে দেখে আবারও জিজ্ঞেস করলো,,
“কি করছিস ওখানে বসে?”
“কিছু না! ফ্রেশ হয়ে আসেন খেতে দিচ্ছি।”
“খায়ছি আমি। ঘুমাবো!”
অনুভব এটুকু বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। অদ্ভুত! এটাকে কি ভালোবাসা বলে? একবার জিজ্ঞেসও করলো না খেয়েছি কি না! হাহ নিজেরই নিজের প্রতি তাচ্ছিল্য আসছে। এই রুমে আমার ঘুমানো নিষেধ তাই পাশের রুমে গিয়ে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে পড়লাম।

সকালবেলা___________

আড়মোড়া কাটিয়ে উঠতে যাবো তখনিই চোখ পড়ে সোফার দিকে। ভুত দেখার মতো চমকে উঠে কাছে গিয়ে ভালো ভাবে দেখতে লাগলাম। হ্যাঁ এটা অনুভবই কিন্তু এই রুমে কেন? আর এমন বিড়ালের বাচ্চার মতো শুয়ে আছে কেন? উনি বিড়ালের বাচ্চার মতো শুয়ে থাকবে আর আমি বললেই দোষ হুহ। উনাকে দেখে উঠে আসতে গিয়ে আবার কি মনে করে পিছনে তাকিয়ে উনার পাশ ঘেষে বসে পড়ি। দেরী না করে কপালে নিজের ওষ্ঠ ছুইয়ে তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। দেখে ফেললে খবর আছে আমার।

ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি অনুভব ভাইয়া দুই পা তুলে সুন্দর করে বাবু মেড়ে বসে আছে। কি যেন ভাবছে! ভাবুক তাতে আমার কি? হুহ।
“আপনি এ রুমে কেন?”
“ফ্ল্যাট আমার রুমও আমার। আমার যেখানে ইচ্ছা থাকবো তোর সমস্যা?”
“আমার আবার কি সমস্যা হবে। যায় হোক হসপিটাল যাবেন না?”
“হুম যাবো।”
“আচ্ছা ফ্রেশ হয়ে আসেন আমি সার্ভ করে দিচ্ছি।”
“যা আসছি।”

ডাইনিং এ বসে অনুভবের জন্য অপেক্ষা করছি কিন্তু সাহেবের তো খোজই নেই। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। এত সকালে কে আসলো? বিরক্তি! বিরক্ত নিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখি একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওয়েস্টার্ন ড্রেস, চুল গুলো কাধ অবদি কেটে ছোট করা, চোখে সানগ্লাস। পা থেকে মাথা অবদি পর্যবেক্ষণ করে কিছু বলতে যাবো তার আগেই মেয়েটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়লো। মেয়েটার এহেন কাজে আমি তো অবাক। মেয়েটা আমাকে উপেক্ষা করে ডাকতে লাগলো,,
“অনুভব এই অনুভব কই তুমি?”
বেশ জোড়েই ডাকছিলো। আমার সামনে আমারই স্বামী কে ডাকছে তাও আমাকে উপেক্ষা করে।
“অনুভব রুমে। আপনি কে?”
মেয়েটা আমার দিকে একবার তাকিয়ে বললো,,
“থার্ডক্লাশ মেয়ে যত্তসব। তুমি কে? অনুভবের বাসাই কি করো?”
“আমি কে মানে? আমি….
আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে অনুভব এসে বললো,,
” ও স্নিগ্ধা মিরা। আমার খালা মনির মেয়ে।”
উনার পরিচয় দেয়ার ভঙ্গি দেখে কিছুক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে আবারও মাথা নিচু করে নিলাম। অজান্তেই চোখের কোণা বেয়ে এক ফোটা নোনা জল গড়িয়ে পড়লো। নিজেই নিজেকে বললাম,,
“এটাই তো স্বাভাবিক স্নিগ্ধু। তুই কেন কষ্ট পাচ্ছিস? তুই তো জানিসই অনুভব তোকে মেনেই নেয়নি তাহলে তো তোর কষ্ট পাওয়া উচিত না। তুই তো ব্রেভগার্ল। সাহসী অনেক তুই। সব সহ্য করতে পারলে এটাও করে নে।”
যতই নিজেকে শান্তনা দেয় মন কি আর তা বোঝে। আমার স্বামী আমাকে অন্য একটা মেয়ের সামনে পরিচয় করিয়ে দিলো খালাতো বোন হিসেবে এর থেকে আর কি কষ্ট আছে। আমাকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনুভব বললো,,
“ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আয় খেয়ে নে। ভার্সিটি যাবি না?”
আমি উল্টো পাশ ফিরে চোখের পানি মুছে হাসি মুখ করে বললাম,,
“আমার খিদে নেই। আপনারা খান আমি রেডি হয়ে আসি ভার্সিটি যাবো।”
এটুকু বলেই চলে আসলাম। একটা বার অনুভব ডাকেওনি আমাকে। এটাই কি তার ভালোবাসা? এগুলোকেই বুঝি তিশা আপু ভালোবাসা বলেছিলো! ফ্লোরে বসে হাটুতে মুখ গুজে কাঁদছি। এছাড়া আছেই বা কি করার? মাথায় কারো হাতের ছোঁয়া পেয়ে চোখ তুলে তাকালাম। অনা এসেছে। তাড়াতাড়ি চোখ গুলো মুছে ওর দিকে হাসি মুখ করে তাকিয়ে বললাম,,
“তুমি এখানে? খাও নি? ভার্সিটি যাবে না?”
“তুমি কাঁদছো কেন ভাবি?”
“কাঁদছি না তো। আর বলো না চোখে কি যেন পড়েছে!”
“এগুলো বাংলা সিনেমার ডায়লগ বাদ দাও। স্যারের কথায় কষ্ট পেয়েছো তাই না? স্যার কেন এমন করে? তুমি তো উনার বউ তাহলে বোন বলে কেন পরিচয় দিলো?”
আমি মাথা নিচু করে চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছি। অনা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আমার সামনে বসে বলে,,
“ভালোবাসো স্যারকে! তাই না?”
ওর এটুকু কথায় আর দমিয়ে রাখতে পারিনি নিজেকে। ওকে ধরেই ডুকরে কেঁদে উঠলাম। অনা থামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না।
“চুপ করো ভাবি সব ঠিক হয়ে যাবে। কান্না করো না আর প্লিজ।”

অনুভব ড্রাইভ করছে আর আমি চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে আছি। পুরো রাস্তায় দুজনের মাঝে ছিলো পিনপতন নিরবতা। আমাকে নামিয়ে দিয়ে উনি চলে গেলেন। যাওয়ার দিকে তাকিয়ে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে ভার্সিটিতে ঢুকলাম। ৭ দিন পর আজ ভার্সিটি এসেছি। আগে জ্বর নিয়েও কত যে কলেজ আর ভার্সিটি এসেছি তার ঠিক নেই। ক্লাস করি বা না করি আড্ডা মিস যেতো না আমাদের। আমাকে ঢুকতে দেখেই মেঘলা আর তন্নি ছুটে আমার সামনে চলে আসলো।
“ওই শাঁকচুন্নি তুই এত দিন ভার্সিটি আসিস নাই কেন?” (তন্নি)
“এমনি!”
“ওই এনাকন্ডার বউ একদম মেরে নাক ফাঁটিয়ে দিবো বল আসিস নাই কেন?”
“একটু অসুস্থ ছিলাম রে!”
“স্নিগ্ধু তুই বলছিস এই কথা? যে মেয়ে গায়ে সর্বোচ্চ জ্বর নিয়েও ভার্সিটি এসে নাচতো সে কি না অসুস্থতার জন্য ভার্সিটি আসেনি। পৃথিবী কি মঙ্গল গ্রহে ঘুরে গেলো নাকি?”
তন্নির বকবক শুনে মেঘলা ওকে ধমকে থামিয়ে দিয়ে আমাকে নিয়ে ক্যান্টিনে আসে। তুষার তো আগে থেকে ক্যান্টিনে বসে মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করছিলো। এই তন্নি আর তুষারের মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট এই একটাই কাজ। ফ্লার্টিং করা। আমাকে দেখে তুষার এগিয়ে এসে মাথায় গাট্টা মেরে বলে,,
“কি রে রাক্ষসী বিয়ে করে কি বড়লোক হয়ে গেছিস নাকি? ভার্সিটিতেই আর আসিস না জামাই পাইয়া।”
“এই তোরা ২ টা মুখটা একটু বন্ধ করবি? সারাদিন প্যাক প্যাক করতেই থাকিস। ওকেও কিছু বলার সুযোগ দে! স্নিগ্ধু তুই বল আসিস নি কেন?”(মেঘলা)
” মেঘু আমার খিদে পেয়েছে।”
আমার কথা শুনে ৩ জনই হা হয়ে বসে আছে। কি জিজ্ঞেস করলো আর আমি কি বললাম। মেঘলা অবাক হয়ে বললে,,
তুই খেয়ে আসিস নি?”
আমি মাথা নাড়িয়ে বোঝালাম “না খায়নি”।
আমার মাথা নাড়ানো দেখে তুষার আর ১ মিনিটও না দাঁড়িয়ে সোজা ক্যান্টিনের দোকান থেকে খাবার এনে দিলো। ওদের বুঝতে বাকি নেই যে আমার কিছু হয়ছে। ওরা ৩ জন যতই জ্বালাক কিন্তু খুব ভালোবাসে। না খেয়ে আছি শুনে আর একটা প্রশ্ন না করে ওরা আমাকে খাওয়াতে ব্যস্ত অথচ যার এগুলো করার কথা ছিলো সে অন্য কোথাও ব্যস্ত। খুব ক্ষুধা পেয়েছে তাই টপাটপ খাইতে শুরু করলাম। আমার খাওয়া দেখে ৩ জনই হা করে তাকিয়ে আছে। তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার ফলে গলায় আটকে যায়। তাতেই বেদম কাশি শুরু হয়। মেঘলা পিঠে থাপড়াতে থাপড়াতে বলে,,
“তোর এত তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার কি আছে হ্যাঁ? খাওয়ার কি পালিয়ে যাচ্ছে নাকি! আর কয়দিন না খেয়ে আছিস বল তো!”
“ওরে কি ওর জামাই না খাওয়ায় রাখে নাকি?”(তুষার)
“জামাই তো বড়লোক। না খাওয়ায় কেন রাখবে?” (তন্নি)
“উফফ তোরা থামবি? এত কথা না বলে ওকে জিজ্ঞেস কর কাহিনি কি?”(মেঘলা)
” জিজ্ঞেস করলে কি ও বলবে?”(তন্নি)
“তা কেন বলবে? ওর তো চাপিয়ে রাখা অভ্যাস!” (তুষার)
ওদের কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে ওরা কতটা রেগে গেছে। আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। ওরা আমাকে এটা ওটা বলেই যাচ্ছে আর আমি চুপ করে শুনছি। হঠাৎ করেই কেউ দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here