স্নিগ্ধ আবেশে তুমি পর্ব -০২

0
59

#স্নিগ্ধ_আবেশে_তুমি
#তানজিনা_তিহা (লেখনীতে)
#পর্ব_০২

সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি অবাক! তূর্য আমার ডান হাত আঁকড়ে ধরে পাশেই বসে ঘুমিয়ে আছেন। তার ঘুমন্ত চেহারাটা খুব মায়াবী লাগছে এখন। সিল্কি চুলগুলো কপালটায় নেমে এসেছে। সুদীর্ঘ আঁখি পল্লব বন্ধ করে শুয়ে আছেন‌। মনে হচ্ছে একটা বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে। তার মুখশ্রীতে ক্লান্ত ভাব স্পষ্ট। আমার বেশ অস্বস্তি লাগছে এই মুহূর্তে। একে তূর্য এভাবে হাত ধরে রেখেছেন, আরেক দিকে আমার শাড়ি এলোমেলো হয়ে আছে। তূর্য ঘুম থেকে উঠে দেখলে কি হবে। আমি খানিকক্ষণ চেষ্টা করেও তার শক্ত হাতের বাঁধন খুলতে ব্যর্থ হলাম। সে আমার হাত সযত্নে বুকে আগলে গভীর ঘুমে মগ্ন। এখন কি করবো আমি? তাকে ডাক দিতেও অস্বস্তি লাগছে। এক হাত দিয়ে বার বার শাড়ি ঠিক করার চেষ্টা করছি কিন্তু কোন মতেই সম্ভব হচ্ছে না। কোন উপায় না বুঝে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাকে ডাক দিলাম।

এই যে, হাতটা ছাড়ুন।

আমার আওয়াজ শুনে তূর্য চোখ খুলে তাকালো। সে এক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, অপলক দৃষ্টিতে! তার দৃষ্টি এক রহস্যময় দৃষ্টি। কেন এভাবে তাকিয়ে আছেন তিনি? আমার বোধগম্য হলো না। আমি তার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। হঠাৎ তূর্য আমার হাত এক জাটকায় সরিয়ে দিলেন। মুহূর্তেই হনহন করে ওয়াসরুমের দিকে চলে গেলেন। তার চেহারায় রাগ স্পষ্ট।এমন কেন হলো আমি বুঝতে পারলাম না। তার এহেনকান্ডে হতবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলাম না।

কিছুক্ষণ পর তূর্য ওয়াসরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। আমি তার দিকে তাকাতেই সে চোখ সরিয়ে নিলেন। ড্রয়ার খুলে দিয়ে বললেন,

এখানে তোমার জামাকাপড় আছে, শাড়িটা চেন্জ করে আসো।

বলেই সে রুমের বাইরে চলে গেলেন।
ড্রয়ারে হরেক রকমের কাপড়ের বাহার দেখে বেশ অবাক হলাম। আমি খয়েরি রঙের একটা শাড়ি নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলাম।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বার বার শাড়ি ঠিক পড়ার চেষ্টা করছি আমি, কিন্তু বরাবরের মতোই ব্যর্থ হচ্ছি আমি। গ্ৰামে বড় হলেও শাড়ি পড়ার অভ্যাস আমার নেই। আমি কখনো শাড়ি পড়ি নি। শাড়ির কুচি ঠিক করতে গেলে আঁচল সরে যাচ্ছে আবার আঁচল ধরলে কুঁচি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কি করবো মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ শুনতে কেউ চিৎকার করে বলছে,

মেহু!!!!!!!!!

পিছন ফিরে দেখলাম তূর্য রক্তচক্ষু নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এখনই আমাকে খেয়ে ফেলবেন!

আমি তাড়াতাড়ি শাড়িটা কোনরকম গাঁয়ে জরিয়ে নিলাম। সে আমার কাছে এসে আমার কোমর জড়িয়ে আমার থুতনি চেপে ধরলেন। দাঁতের সাথে দাঁত চিবিয়ে আমাকে বললেন,

এভাবে দরজা জানালা খুলে শাড়ি পড়ছো কেন? কোন কমনসেন্স নেই তোমার? আমি এসেছি, অন্য কেউ এলে কি করতে?

তার কথায় নিজেকে হাজারটা বকা বাধ্য করলাম। ইস! একটুও খেয়াল হচ্ছিল না যে দরজাটা খোলা ছিল।

কি হয়েছে? কথা বলছো না কেন? লোকেদের নিজের শরীর দেখানোর চেষ্টা করছো নাকি?

তার কথায় আমার চক্ষু বাহিরে বের হওয়ার উপক্রম। কি বলছেন উনি এসব? কাল রাতের ব্যবহারের সাথে তো এর কোন মিল নেই!

কি হয়েছে? আমি তো কিছু বলছি? আনসার মি ফাস্ট!

আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমতা আমতা করে বললাম, আসলে খেয়াল ছিল না দরজাটা যে খোলা, আর শাড়িটাও পড়তে পারছিলাম না তাই,,,

কি? না পড়তে পারলে পড়তে নিয়েছো কেন? ড্রয়ারে কি শুধু শাড়িই ছিল নাকি?

মানে,,

তার ব্যবহারে এখন খুব কান্না পাচ্ছে আমার। কি জানি কেন এমন হচ্ছে। আমার সাথে এতটা খারাপ করে কেন কথা বলছেন উনি? নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তূর্য হয় তো সেটা খেয়াল করলেন। দেখলাম তার মুখখানা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেছে, ক্রমেই আমায় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি। নিজ হাতে খুব যত্নে আমায় শাড়ি পড়িয়ে দিচ্ছেন উনি। আমি ভয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছি। কিছু বলার সাহস হচ্ছিল না আমার। আবার কি না কি বলে। তূর্য শাড়ির কুচি গুলো ঠিক করে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন।

বাকিটা তুমি নিজেই ঠিক করতে পারবে। আমার কাজ আছে নিচে যাই। আর হ্যাঁ, স্টুপিড! এবার দরজা আটকে নেও।

আমি মাথা নিচু করে সম্মতি জানালাম। কিছুক্ষণ পর শাড়ি ঠিক করে নিচে চলে এলাম। ছোট থেকেই গ্ৰামের ছোট কুটিরে আমার বসবাস, কিন্তু এই বাড়ি কোন অংশে মহল থেকে কম নয়। বিলাসবহুল এই বাড়িতে কোন জিনিসের কমতি নেই। কেউ পরম যত্নে নিজ হাতে সাজিয়েছেন এই মহল। অপূর্ব সুন্দর এই বাড়িতে শ খানেক লোক বেশ আরাম আয়েশে থাকতে পারবে। উপর তলায় তূর্যের ঘরটা এখন এতে আমারও সমান অধিকার। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে দেখলাম মিফতা টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখছে। আমাকে দেখে একটা সৌজন্য মূলক হাসি দিলো সে।

ঘুম কেমন হয়েছে ভাবি মণি?

হ্যাঁ, ভালো।

এসো নাস্তা করবে।

মা বাবা তারা কোথায়?

দেখলাম মিফতার মুখখানা কালো হয়ে গেছে।

কি হয়েছে? মিফতা

ভাবি মণি! আমাদের মা নেই। মা ছয় বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।

তো পরশু হলুদে যে গেল সে কে?

ওটা তো আমাদের ফুফু। আমাদের অনেক আদর করে।

তো বাবা?

এবার খেয়াল করলাম মিফতার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। কেন এই অশ্রু তা আমি বুঝতে পারলাম না।

বাবা আমাদের এখানে খুব কম আসে। মা মারা যাওয়ার পর বাবা আরেকটা বিয়ে করে নিয়েছে। সে এখন সেখানেই থাকে। সে আমেরিকা। আমরা তার কাছে বোঝা। আমরা দুই ভাই বোন আর রেহানা চাচি আবুল চাচা এ বাড়িতে থাকি।

আমি বেশ অবাক হলাম। আর অবাক হবোই না বা কেন? এ কেমন কথা? নিজের সন্তানদের বোঝা মনে করেন? কি বলছে ও,,

রান্না ঘর থেকে মধ্যবয়সী এক মহিলা বেরিয়ে এলেন।

বউ মণি, উঠে গেছো?

তাকে চিনতে পারলাম না। তারপরও হাসির মাধ্যমে জবাব দিলাম, হুম। মিফতা হয় তো বুঝতে পারলো ব্যাপারটা।

ভাবি মণি এ হচ্ছে রেহানা চাচি। মা মারা যাওয়ার পর থেকে রেহানা চাচি আর আবুল চাচার সাথেই আমরা থাকি। এই আমাদের সংসার, আর এখন থেকে এটা তো তোমার সংসার। তুমি নিজ হাতে সাজিয়ে নিও।

তাদের সবার কথায় কিছুটা রহস্য আন্দাজ করতে পারলাম। এভাবে কথা বলছে কেন তারা, কিছু একটা কি বলতে চাচ্ছে না আমাকে?

বউ মণি, তূর্য বাবা কোথায়?

সে তো ঘরে নেই। কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেল বললো কাজ আছে নাকি তার।

ওহ্,

আচ্ছা ভাবি মণি আসো নাস্তা করবো। খুব খিদে পেয়েছে আমার। তোমার সাথে খাবো বলে বসে আছি।

মিফতার কথায় বেশ ভালো লাগলো। মেয়েটা ছোট হলেও বেশ বুদ্ধিমতী আর চাপা স্বভাবের।

মিফতা রেহানা চাচি আর আমি তিনজনে মিলে নাস্তা সেরে নিলাম। নাস্তা শেষ করে মিফতা বললো,

ভাবি মণি, আমি স্কুলে যাই, তিন দিন ধরে যাই নি। আরো বন্ধ দিলে স্যার প্রচুর পরিমাণে বকবে।

আচ্ছা, যাও। সাবধানে যেও নিজের খেয়াল রেখো আর তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসো কেমন,,

বুঝতে পারলাম আমার কথায় মিফতা খুব খুশি হয়েছে। তার চোখ দুটো দিয়ে আনন্দ অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। সে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল আর বললো, ভাবি মণি মামণি যাওয়ার পর আমাকে না কেউ এভাবে বলে নি।

মিফতার কথার নিজের মাঝেও খারাপ লাগা কাজ করছে। কি জানি কেন এমন হচ্ছে, আমি তো মাকে ছাড়া আজ এই প্রথম এ বাড়িতে থাকছি আমি বুঝতে পারছি মা কি জিনিস যতই হোক মা তো সে! অন্যদিকে এই মেয়েটা ছয়টা বছর মাকে ছাড়া থাকছে। জানি না কত কষ্ট এর মাঝে।

আমি মিফতার মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, তুমি একা যাবে নাকি?

না আবুল চাচা দিয়ে আসবে, স্কুল বেশি একটা দূরে না। আমি দুপুরেই ফিরে আসবো কেমন? তুমি নিজের খেয়াল রেখো। আর কিছু লাগলে ভাইয়া আর রেহানা চাচি তো আছেই। বিকেলে দুজনে মিলে আড্ডা দিবো।

বুঝতে পারলাম না দুটি নয়ন এই মুহূর্তে আমাকে দেখে আনন্দ তৃপ্তে হাসছে। মিফতা কে বিদায় জানিয়ে রেহানা চাচির সাথে হাতে হাতে দুই একটা কাজ করলাম আর কথা বললাম। তিনি তো আমাকে কোন কাজই করতে দিতে চাইছিলেন না তবুও আমি করলাম। গ্রামের মেয়ে আমি বাড়ির প্রায় সব কাজই আমি পারি রান্না থেকে শুরু করে কাপড় কাচা বাসন মাজা সব। কোন কাজই আমার অজানা ছিল না তাই আমার কোন সমস্যা হলো না।

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশ পানে চেয়ে আছি আমি। এতক্ষণ খানিকটা ভালো লাগলেও এখন খুব করে কান্না পাচ্ছে আমার বাবা মা এর কথা খুব মনে পড়ছে, তাদের থেকে দূরে আর কখনো থাকি নি আমি। মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছি আমি। হঠাৎ কেউ বলে উঠলো,

মেহু! বয়স কম হলেও তুমি কিন্তু বড় হয়ে গেছো।

পিছন ফিরে দেখলাম তূর্য কথা বলছেন।

চলবে,,,,,,,

(।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here