স্নিগ্ধ আবেশে তুমি পর্ব -০৩

0
51

#স্নিগ্ধ_আবেশে_তুমি
#তানজিনা_তিহা (লেখনীতে)
#পর্ব_০৩

তূর্যের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। কি এমন করেছি আমি যাতে তার মনে হচ্ছে আমি বড় হয়ে গেছি।

আমার দৃষ্টি প্রয়োগ করে সে মুচকি হাসছে। আমার মাথায় এসবের কিছুই ধরছে না।

মেহু! তুমি এখনো ছোট, নিজের মাথায় বেশি প্রেসার নিও না।

এবার আরো বেশি অবাক লাগছে। এ কেমন কথা? একবার বলছে আমি বড় হয়ে গেছি আবার বলছে আমি ছোট। কিছুই বুঝতে পারলাম না। ঠোঁট উল্টে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তূর্য আমার ঠোঁট উল্টানো দেখে শব্দ করে হেসে বললেন, আমার কথা তুমি বুঝবে না, এই পিচ্চি মাথায় প্রেসার দিও না। রুমে যাও।

আমি কিছু না বলে রুমে চলে এলাম। রুমে এসে দেখলাম খাটের উপর একটা বক্স। বক্সটা হাতে নিয়ে দেখলাম এর উপর খুব সুন্দর করে লিখা আছে মেহুপরি। বেশ অবাক হলাম। এটা কি তূর্য এনেছেন? বেশ কৌতূহল নিয়ে বক্সটা খুলে ফেললাম। আমি আশ্চর্য হলাম এর ভিতরে অনেক ধরনের চকলেট। কিন্তু মুহূর্তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল আমি তো চকলেট খাই না। চকলেট খেলে দাঁত প্রচুর পরিমাণে ব্যথা করে। বক্সটা খাটে রেখে দিলাম।

খুশি হও নি?

বক্সটা হাতে নিয়ে পিছন ফিরে তাকালাম। তূর্য!

আমি চকলেট খাই না, ডাক্তার নিষেধ করেছেন। আমার দাঁতে প্রচুর ব্যথা হয়।

হুম, এটা তো আমি জানি।

আপনি কিভাবে জানলেন?

তোমার এতো জেনে লাভ নেই।

এগুলো এনেছেন কেন?

তুমি বলো এগুলো কেন এনেছি?

আপনি আনলেন, আমি কিভাবে জানবো?

জানা লাগবে না, এগুলো রেখে দাও।

কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি চকলেট গুলো নিয়ে ড্রয়ারে রেখে দিলাম।

মেহু!

জ্বি, বলেন।

আর যাই করো, মিফতার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করো না। ও আমার একমাত্র ছোট বোন, আমার দুনিয়া ওকে ঘিরে। হয় তো ওর জন্যই এখনো আছি। আমি না থাকলেও তুমি মিফতার সাথে থাকবে তো?

আমি তার কথায় আশ্চর্য হলাম। আর হবো নাই বা কেন? কি বলছেন উনি? উনি কোথায় যাবেন?

আপনি আবার কোথায় যাবেন? কি বলছেন এগুলো?

কোথাও না, এই বললাম আরকি। ওকে নিজের বোনের মতো দেখো কেমন!

বলেই তূর্য রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি তার যাওয়ার পানে চেয়ে রইলাম। লোকটা এমন কেন? তার কথার কোন আগাগোড়া আমার বুঝে আসে না কেন?

দুপুর গড়াতেই মিফতা চলে এলো। আমি তখন ড্রইং রুমটা গোছাতে ব্যস্ত। রেহানা চাচি রান্না করছে এই ফাঁকে আমিও টুকিটাকি কাজ করছি। মিফতা এসেই আমাকে জরিয়ে ধরলো।

কি করছো সুইট ভাবি মণি?

তুমি চলে এসেছো? স্কুল শেষ?

হ্যাঁ,

যাও, গোসলটা সেরে নাও। খাবার খাবে,

হুম।

মিফতা চলে গেল। আমি ঘরটা গুছিয়ে সোফাতে গিয়ে বসলাম। মানুষটা সেই যে বের হলো এখনো আসার কোন নাম গন্ধ নেই। কোথায় সে? এখনো আসছে না কেন? কাল যে এলাম বাবা মায়ের সাথেও একটা বার কথা হলো না। সব মিলিয়ে মনটা বেশ খারাপ। মন খারাপ করে বসে আছি আমি।

মন খারাপ কেন? বউ মণি,

কই না তো চাচি,

আমি বুঝি মা, বাবা মার সাথে কথা বলতে চাও

হুম,

আচ্ছা, তূর্য বাবা কোথায়?

আমি জানি না তো,

তোমারে বইলা যায় নাই?

না তো

আচ্ছা।

চাচির সাথে কথা বলতে বলতে ই মিফতা চলে এলো।

ভাবি মণি কি করছো?

এই তো বসে আছি।

তা দিন কেমন কাটলো, কোন সমস্যা হয় নি তো?

নাহ, কোন সমস্যা হয় নি। তোমার স্কুল কেমন গেল? স্যার বকেছে?

নাহ, ভাইয়া নাকি স্যারকে ফোন করেছিল‌।

ওহ্, চলো খাবে না?

ভাইয়া আসুক, ততক্ষণ আমরা গল্প করি চলো।

আমি মুচকি হেসে সায় দিলাম। মিফতা আমাকে টেনে বাড়ির বাহিরে নিয়ে এলো। ও আমাকে বাড়ির বাগানের দিকটায় নিয়ে গেল। বিশাল এলাকা জুড়ে বাগানটা, এতে রয়েছে অনেক রকমের ফুল ও ফল গাছ। খুব সুশৃঙ্খল সারিতে দাঁড়িয়ে আছে এগুলো। মিফতা আমাকে নিয়ে বাগানের এক কোণে বসানো দোলনায় বসিয়ে দিলো। সেও আমার পাশ ঘেঁষে বসে পড়লো। এরপর শুরু করলো স্কুলের আলাপ! শুনতে বেশ ভালো লাগছে, যা আন্দাজ করতে পারলাম মেয়েটা অনেক মিশুক প্রকৃতির। আমি মিফতার কথাগুলো বেশ মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম এরই মাঝে সুমিষ্ট এক কন্ঠের জোড়ালো আওয়াজ শুনতে পেলাম।

খাওয়া দাওয়া ছেড়ে এখানে বসে গল্প করা হচ্ছে কেন?

ভাইয়া চলে এসেছো, তোমার অপেক্ষায়ই তো ছিলাম।

আমি তো কখন এলাম, আপনাদেরই কোন সারা শব্দ নেই।

তা না, এমন করছো কেন? নতুন ভাবির সাথে একটু গল্প করছিলাম।

তা খাওয়া শেষ করে সারাদিন গল্প কর, কোন মানা নেই। এখন খেতে চল।

আচ্ছা, চলো।

আমার কিছু বলার সাহস হলো না। আমি চুপটি করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম, ভয়ে কিছুই বললাম না। কি জানি তাকে দেখলে বলার ভাষাই আমি হারিয়ে ফেলি! মিফতা আমার হাত টেনে নিয়ে এলো। আমি দেখলাম তূর্যের দৃষ্টি আমাতেই নিবন্ধ। আমার মুখের অবস্থা দেখে সে মিটিমিটি হাসছে।

খাওয়া দাওয়া শেষে তূর্য উপরে চলে গেলেন। আমি রেহানা চাচির সাথে টেবিল গুছিয়ে উপরে চলে আসলাম। মিফতা ঘুমোতে চলে গেছে। রুমে গিয়ে দেখলাম তূর্য চোখের উপর হাত রেখে খাটের উপর সটান হয়ে শুয়ে আছেন। মায়ের সাথে কথা বলার খুব ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু সামনে এগোনোর শক্তি বোধহয় হারিয়ে ফেললাম। পিছন ফিরে বেরিয়ে আসবো তখন শুনতে পেলাম সেই মোহনীয় কণ্ঠস্বর।

মেহু! কোথায় যাচ্ছো?

আমি কিছু বলতে পারলাম না। দেখলাম তার হাতখানা চোখের উপর এখনো। তাহলে সে আমাকে কিভাবে দেখলো? আশ্চর্য হলাম!

মেহু! কথা বলছো না যে? আমাকে ভয় পাও?

আমি কিছু বললাম না। তূর্য এবার চোখ থেকে হাত সরিয়ে উঠে বসলাম। হাতের ইশারায় আমাকে তার নিকট ডাকলেন। আমি এগিয়ে গেলাম। খাটের নিকট আসতেই সে আমার এক হাত টেনে আমাকে তার পাশ ঘেঁষে বসালেন। আমি যেন পাথর জমে গেলাম। তূর্য বললেন, মেহু! মা বাবার সাথে কথা বলতে চাও?

আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। সে মুচকি হেসে আমাকে বললেন, মেহু! আমি জানি এই বিয়েটা হয় তো তোমার অমতে হয়েছে আমি এমন কোন কাজ করবো না যা তুমি পছন্দ কর না। আমাকে বন্ধু ভাবতে পারো। নিজের সব প্রয়োজন আমার কাছে না বললে আমি বুঝবো কিভাবে?

আমি কিছু না বলে বসে থাকলাম। তূর্য আমার হাতে ফোনটা দিয়ে বললেন, নাও কথা বলো।

আমি আনন্দিত হয়ে ফোনটা হাতে নিলাম। মাকে কল করে তার সাথে কথা বলতে শুরু করলাম। যতই অভিযোগ অভিমান থাকুক না কেন, সে তো আমার মা! আমার জননী!

তূর্য আমার উল্লাসিত মুখটা দেখে মুচকি হাসছেন।

পিচ্চিটা অল্পতেই খুশি! প্রান খুলে হাসা তো তোমার থেকেই শেখা। তোমায় দেখলে কেন বারবার প্রেমে পড়ে যাই। কেন বারবার মন এই ছোট্ট পরীকেই চায়‌। তবে কি তুমিই আমার স্নিগ্ধপরী! ওই মায়াবী চোখে কি এমন আছে যা প্রতি মূহুর্তে আমাকে পাগল করে। তবে কি আমার #স্নিগ্ধ_আবেশে_তুমি শুধুই তুমি!

চলবে……

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here