স্নিগ্ধ আবেশে তুমি পর্ব -০৯

0
51

#স্নিগ্ধ_আবেশে_তুমি
#তানজিনা_তিহা (লেখনীতে)
#পর্ব_০৯ (সারপ্রাইজ পর্ব)

তূর্য বিরিয়ানি খেতে খুব বেশি পছন্দ করেন তাই আমি বিরিয়ানি তৈরি করবো বলেই ঠিক করলাম। রান্না ঘরে গিয়ে দেখলাম রেহানা চাচি রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে আমি গিয়ে তার পাশে দাঁড়ালাম।

কিছু বলবে বউ মণি?

হুম,, চাচি আজকে আমি রান্না করি?

সে আমার কথায় মুচকি হাসলেন। এমনিতেও প্রায় সময়ই রান্না করে থাকি তবে জিজ্ঞেস করায় সে বেশ অবাক হলেন।

কি রান্না করবে?

বিরিয়ানি।

তূর্য বাবা বিরিয়ানি খেতে অনেক পছন্দ করেন। এই বলে তিনি মুচকি হাসলেন। আমি মাথা নিচু করে রাখলাম। সে বললো, কোন দরকার হলে আমাকে ডেকো। আমি পাশেই আছি। চাচি চলে গেলেন। আমি ওড়নাটাকে ভালো করে গায়ে পেঁচিয়ে রান্নার আয়োজন শুরু করলাম।

.
.
.

আমার দিকে রক্তিম দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন তূর্য। আমি চুপচাপ বসে আছি তার সামনে বাক শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছি আমি। পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিফতা, রেহানা চাচি আর আবুল চাচা। কারো মুখে কোন টু শব্দটিও নেই। আর করবেই বা কি করে তূর্যের গর্জনে সকলে স্তব্ধ। কিছুক্ষণ আগের ঘটনায় তিনি সন্তুষ্ট নন। তার জন্য শখের বসে রান্না করতে গেলেও নিজের হাতটাকেই পুড়িয়ে ফেলেছি।
তূর্য রাগে গজগজ করতে করতে আমার হাতে মলম লাগিয়ে দিচ্ছেন। আমি ভয়ে নিশ্চুপ।

এই স্টুপিড গার্ল, তোমাকে রান্না করতে বলেছে কে?

আমি মাথা নিচু করে চুপ করে রইলাম।

কথা বলছো না কেন? কোন সাহসে রান্না ঘরে গেলে?

আমি এবারও চুপ থাকাটাকে শ্রেষ্ঠ মনে করলাম। এবার তিনি আমার মাথা উঁচু করে ধরলেন। আমি তার রাগে লাল হওয়া মুখশ্রী পর্যবেক্ষণ করে সাথে সাথেই চোখ সরিয়ে নিলাম।

তোমাকে রান্না করতে বলেছে কে? উত্তর দাও। (বিকট শব্দে)

আমি ভয়ে জড়সড় হয়ে বললাম, না মানে চেষ্টা করছিলাম আরকি। আমি তো পারি কিন্তু আজ এমন হবে বুঝতে পারি নি।

বুঝতে পারো নি, যা পারো না তা করো কেন?

আসলে আপনি পছন্দ করেন তাই,,

তাই কি? হু,,

আমি চুপ করেই থাকলাম।

সেও খানিকক্ষণ চুপ থেকে নরম কন্ঠে বলে উঠলেন,

মেহু! আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস তুমি। তোমার কিছু হলে তা আমি মানতে পারবো না। প্লিজ এমন কোন কাজ করো না যাতে আমি কষ্ট পাই।

আমি বিস্মিত হলাম। তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস আমি?

তিনি এরপর বললেন, চাচি আজ থেকে ওর রান্নাঘরে যাওয়া একেবারে বন্ধ।

রেহানা চাচি সায় দিলেন। এরপর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আর কখনো রান্না ঘরে দেখতে পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।

আমি চুপটি করে থাকলাম।

রাতে ঘুমের মধ্যে বুঝতে পারলাম আমার হাতের উপর কেউ পরম যত্নে চুমু খাচ্ছে। চোখ খুলে দেখলাম তূর্যকে। উনি আমার হাতের যে অংশ পুড়ে গেছে তার উপরই আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর ছোট ছোট চুমু খাচ্ছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম হয় তো তিনি এটা খেয়াল করলেন না।

মেহুপরি! তোমাকে ছাড়া আমি শূন্য। তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। তোমাতেই আবদ্ধ আমি। তবু কেন আমাকে কষ্ট দাও বলতো? আমাকে কষ্ট দিতে খুব ভালো লাগে তাই না? যখন থাকবো না তখন বুঝবে।

এই বলে তিনি আমার হাত আঁকড়ে খাটের উপর মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লেন। তার কথায় বেশ অবাক হলাম। খানিকক্ষণ পরে তূর্যের কোন শব্দ না পেয়ে উঠে বসলাম। তূর্য চোখ বন্ধ করে আছেন। আমি তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে উনি চোখ খুলে তাকালেন। তবে কি উনি ঘুমান নি?

মেহু! কি হয়েছে? হাত জ্বালাপোড়া করছে? বেশি ব্যাথা করছে?

তার অস্থির কণ্ঠের উচ্চারিত ধ্বনি গুলো আমায় বেশ অবাক করছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে তার চাহনিকে বোঝার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমি ব্যর্থ। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি মুচকি হাসলেন। এরপর আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন।

মেহু! আমার না ঘুম আসছে না।

কেন?

জানি না, আমি ঘুমোতে পারছি না। মাথাটা প্রচুর ব্যাথা করছে।

তার কথা শুনে আমার মনের ভিতরে উত্তাল পাতাল ঢেউ বইতে শুরু করলো।

আমার সুস্থ হাতটা দিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। তিনি চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন। এক পর্যায়ে তিনি ঘুমিয়ে গেলেন।

———————————

আজ রেজাল্ট দিবে! আমার মাঝে বেশ উত্তেজনা কাজ করছে অনেক ভয়ও লাগছে। কি না কি করেছি পরীক্ষায়, রেজাল্ট ভালো আসবে তো। আমার হাত পা কাঁপছে, ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। তূর্য আমার পাশে বসে অনলাইনে রেজাল্ট দেখার চেষ্টা করছেন আর আমাকে শান্ত হতে বলছেন। কিন্তু আমি কি আর শান্ত হই? মনে মনে বারবার আল্লাহ কে ডাকছি আর কাঁপছি। কি হবে, কি হবে এই ভেবেই আমার অবস্থা খারাপ। একটা সময় তূর্য আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।

কি হয়েছে? আমার রেজাল্ট ভালো হয় নি? বলেই আমি কান্না করে দিলাম। তূর্য আমাকে শান্ত হতে বলছেন ।

আরে না পাগলি, তুমি গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছো।

এবার আমার কাঁদার শব্দ হু হু করে বাড়ছে। এ কান্না আগের মতো চাপা নয়। এ কান্না খুশির। আমি কাঁদছি তূর্য আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি আমাকে তার বুকের মাঝখানে নিয়ে নিয়েছেন। এ মুহূর্তে এর প্রতি আমার কোন হেলদোল নেই অন্যসময় হলে আমি ঠিকই লজ্জা পেতাম। তূর্য অনেক বার শান্ত হতে বললেও আমার কান্না থাকছে না। এবার তিনি আমাকে এক ধমক দিলেন।

এই মেয়ে একদম চুপ, আর একটা টু শব্দ করবে না। ইডিয়েট একটা, এই তোমার কি রেজাল্ট খারাপ হয়েছে নাকি জামাই মারা গেছে? এমন হাত পা ছেড়ে কান্না করার কোন মানে হয়? আর এক ফোঁটা পানি যদি চোখ দিয়ে পড়ে তাহলে তোমার এমন অবস্থা করবো যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

তার ধমক শুনে আমি চুপ হয়ে গেলাম। তিনি মাকে ফোন করে আমার রেজাল্টের কথা জানিয়ে দিলেন। সবাই বেশ খুশি, আমিও বেশ খুশি। কিন্তু আমাকে কি আর পড়াশোনা করতে দিবেন উনি?

.
.
.
.

সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন তূর্য। আমি তার নিকট এগিয়ে গেলাম। প্রশ্ন তো একটাই, আমাকে কি কলেজে ভর্তি করবেন? আমি তূর্যের আশেপাশে ঘুরছি। আমাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে তূর্য বললেন,

মেহু! কিছু বলতে চাও?

আমি আমতা আমতা করে বললাম, হ.. হুম।

বলো,

আমাকে কি কলেজে ভর্তি করবেন?

সে আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন, এই মুহূর্তে এই প্রশ্ন হয় তো তিনি আশা করেন নি।

হুম, অবশ্যই। তাসকিন মাহমুদ তূর্যের বউ অশিক্ষিত থাকবে? দেট’স ইম্পসিবল।

আমি চুপ থাকলাম কিন্তু মনে মনে অনেক আনন্দিত হলাম। সেখান থেকে চলে যেতে নিবো তখন তূর্য বললেন,

মেহু! হঠাৎ এই প্রশ্ন করলে যে?

এমনিতেই।

এমনিতেই মানে হাঁড়িপাতিল মাজার শখ নাকি? তোমার কি পড়ার ইচ্ছে নেই? ইচ্ছে থাকলে এই প্রশ্ন করতে না।

আমি অবাক হলাম।

সে আমার নিকট এলো আমার হাত ধরে টেনে আমাকে সোফায় বসিয়ে দিলো। এরপর তিনি আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। এরপর বললেন,

মেহু! খুব তাড়াতাড়ি তোমায় কলেজে ভর্তি করে দেবো।আমায় নিয়ে টেনশন না করে, তুমি পড়াশোনায় ফোকাস করো। তুমি এখনো অনেক ছোট, তোমাকে অনেক দূর এগোতে হবে আমি চাই তুমি নিজে প্রতিষ্ঠিত হও। নিজের স্বপ্ন পূরণ করো। নিজের পায়ে দাঁড়াও, অন্যের উপর কখনো নির্ভর হবে না।

আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম।

তিনি মুচকি হেসে বললেন, পিচ্চি একটা।

———————————-

আজ অনেক দিন পর স্বস্তি পেলাম। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে একটুও শান্তি নেই আমার। সাইন্সের স্টুডেন্ট হওয়ায় পড়ার চাপে আমার অবস্থা নাজেহাল। অনেকদিন পর আজকে একটু অবসর সময় পেলাম। তারও কারণ রয়েছে। গতকাল থেকে আমার ঠান্ডা জ্বর। তূর্য তো পাগল হয়ে গেছেন। ডাক্তারের সাথে কয় বার যে কথা বলেছেন তার কোন হিসেব নেই। বেচারা সারারাত জেগে ছিলো আমার জন্য। গতকাল রাতে এক মিনিটের জন্যও নিজের চোখের পাতা এক করেন নি তিনি। ফজরের আযানের পর একটু শুয়েছেন।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসলাম আমি। কিন্তু নিচে নেমেই দেখতে পেলাম এক আশ্চর্য কাণ্ড। ড্রইং রুমে সোফায় বসে আছেন এক ভদ্রলোক, তার পাশেই এক মধ্যবসয়ী মহিলা। পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবতী, হাঁটু অব্দি একটা ওয়েস্টার্ন ড্রেস পড়ে আছে সে। গায়ের রং ধবধবে সাদা। রেহানা চাচি পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
চাচি এরা কারা?

ভদ্রলোক বললেন, তুমি কে?

আমি কিছু বলতে যাবো এর আগেই তূর্যের কণ্ঠধ্বনি শুনতে পেলাম। তিনি সিঁড়ি বেয়ে নামছেন আর বলছেন,

মেহু! তোমার সাহস তো কম নয়, কাকে জিজ্ঞেস করে উঠেছো?

তিনি নিচে নামতেই যুবতী মেয়েটি দৌড়ে গিয়ে তাকে জরিয়ে ধরলো,

ওহ্, বেবি। কেমন আছো? কখন এলাম আর তোমার এখন সময় হয়েছে উঠার?

আশ্চর্য কাণ্ডে আমি স্তব্ধ, বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। চোখের কর্ণিশ বেয়ে দু ফোঁটা অশ্রু প্রবাহিত হলো।

তূর্য তাকে সরিয়ে দিয়ে বললেন,

উফফফফ, আদ্রিজা। দূরে সরো প্লিজ। এভাবে গায়ে পড়ো না।

চলবে…………..

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here