স্নিগ্ধ আবেশে তুমি পর্ব -০১

0
59

আমার ননদীনি বলে উঠলো,
উফফ, ভাবি তোমাকে যা লাগছে না কি বলবো আর! তূর্য ভাইয়া দেখলে তো ,,

হুম, ঠিক বলেছিস।

জানতে পারলাম তার নাম তূর্য! তাসকিন মাহমুদ তূর্য!

বিয়ের সকল নিয়ম মেনেই আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো।
মুনকে মাত্র একবার দেখেছি ওর মন অনেক খারাপ। কিছুক্ষণ থেকে ও চলে গেছে। যাক ও এসেছিল তো এটাই বেশি। বিয়ের পর বরের যাওয়ার সময় মেয়েরা নাকি খুব কান্না করে কিন্তু আমার কান্না আসছে না। শুধু মাত্র ছোট বোন মধুর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে! আমাকে এসে জরিয়ে ধরে বললো,

আমায় ছেড়ে চলে যাবি আপুই? আমি একা কি করে থাকবো?

এখন আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। মা বাবাও অনেক কাঁদলেন। আমি অবাক হয়ে চেয়ে থাকলাম। আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলে এখন আবার কাঁদছো? কেন?

আমাদেরকে বিদায় দেওয়া হলো। গাড়ি চেপে তাদের বাড়ির দিকে অর্থাৎ শহরের দিকে রওয়ানা হলাম। শুনেছি তারা নাকি এই গাঁয়েরই লোক কিন্তু এখন শহরেরই থাকে। গাড়িতে বসে খুব কান্না আসছে কিন্তু কাঁদতে পারছি না। আমার বর স্পষ্ট বলে দিয়েছেন,
যদি কান্না করি তাহলে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যাবেন। তার
কন্ঠের মায়ায় পড়ে গেলাম! এক সুমিষ্ট আওয়াজে আমাকে শান্ত হতে বললেন তিনি। কিন্তু আমি একবারও দেখি নি তাকে। বুঝতে পারলাম তার দৃষ্টি আমাতেই নিবন্ধ, কিছু বললাম না।

রাত প্রায় দশটা! তাদের বাড়িতে চলে আসলাম। বাড়িটা দেখেই বুঝতে পারলাম তারা কতটা বড়লোক! এক বিশাল এলাকা জুড়ে তাদের বাড়িটা! চারপাশে গাছগাছালির সমাহার। বাড়ির আশেপাশে ততটা বাড়ি নেই। একেবারে শান্ত পরিবেশ। বোধহয় এলাকাটা পুরোই তাদের দখলে!
বাড়িতে প্রবেশ করার পর আমাকে একটা সুসজ্জিত কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘরটা বেশ পরিপাটি করে গুছানো। চারিদিক ফুলের সুবাসে মুখরিত।
রাত প্রায় ১২ টা!
খাটের উপর বসে আমার বরের অপেক্ষায় বসে আছি। আর বসতে পারছি না! খুব ঘুম পাচ্ছে আমার। সচরাচর রাত দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস আমার।দুদিনের ক্লান্তিতে আমার অবস্থা খারাপ, কাল রাতে ঘুম হয় নি। বসে বসে ঘুমোচ্ছি আমি! হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম। আমি নড়েচড়ে বসলাম, বুঝতে পারলাম সে এসেছে! চুপ করে বসে আছি আমি। সে এসে আমার পাশে বসলো। আমি কিছু বলতে যাবো এর আগেই তিনি বললেন,

মেহু! খুব ঘুম পাচ্ছে তোমার?

আমি চুপ করে থাকলাম। সে আমার থুতনির উঁচু করে তুললেন,

মেহু! এদিকে তাকাও।

তার দিকে তাকানোর কোন ইচ্ছেই আমার ছিল না তবুও দেখলাম। তার দিকে চেয়েই থাকলাম। এক অন্যরকম সৌন্দর্য তার! এক সুদর্শন সুপুরুষ যাকে বলে! ফর্সা চেহারায় ছোট ছোট দাঁড়ির আবির্ভাব! গোলাপি ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে কথা বলছে আমার সাথে। গায়ে তার কালো রঙের সেরোয়ানি। পলক যেন পরছে না তার থেকে! সে হাসছে! উফ আরো বেশি সুন্দর লাগছে এখন!

সে আমার সামনে হাত নাড়ালো। আমার ধ্যান ভেঙে গেল। সে হেসে বললো,

মেহু! আমাকে দেখার অনেক সময় পাবে। আপাতত তুমি পড়াশোনায় মন দাও। কয়েকদিন পর রেজাল্ট আসবে, কলেজে ভর্তির প্রিপারেশন নাও। আর হ্যাঁ এখন ঘুমাও। আমি সোফাতে ঘুমোচ্ছি। কোন সমস্যা হলে আমাকে ডাক দিও।

তার ব্যবহারে আমি আরো বেশি আশ্চর্য হলাম!

বেশি কিছু না ভেবেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

ফ্ল্যাশব্যাক
কাল আমার বিয়ে মুন!
কি বলছিস রোজ!
হ্যাঁ, ঠিক বলছি। বাবা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবে রে,
কেন? কি হয়েছে?
বাবার নাকি ছেলে খুব পছন্দ হয়েছে।
তুই না পড়াশোনা করতে চাস?
সবার কপালে সব কিছু সয় না রে, হয়তো আমারও তাই।
গরিবের ঘরে জন্মেছি, কষ্ট তো করতে হবেই। এসএসসি পরীক্ষার পরই মা বাবার কাছে বোঝা হয়ে গেলাম, বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে।

মুন আমাকে জরিয়ে ধরে বললো,

এভাবে বলিস না, আমার খুব কষ্ট হয়। আচ্ছা বাবাকে আঙ্কেলের সাথে কথা বলতে বলি।

না রে, বাবা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন এ বিয়ে হবেই। ছেলে নাকি খুব ভালো, বড়লোকও বটে। সে নাকি বিলেত ফিরত ইন্জিনিয়ার, বাবা তাকে হাতছাড়া করবেন না।

কি!! ইন্জিনিয়ার? বয়স কত?

আমি মাথা নিচু করে বললাম,

৩০ বছর হবে,

কি বলছিস রোজ!

তোর তো সবে মাত্র ১৭!

আমার চোখ থেকে চু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

সবই আমার কপাল রে মুন।

মুন স্তব্ধ হয়ে বসে পড়ে।

আমাকে বাড়ি যেতে হবে মুন। আর থাকতে পারবো না। তুই কিন্তু অবশ্যই আসবি।

মুনের চোখ থেকেও জল গড়িয়ে পড়ছে। ও আমাকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে দিল। আমিও কাঁদতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর মুনের থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি পথে রওয়ানা দিলাম।

আমার পরিচয়ে, আমি হচ্ছি মেহেরীমা মেহরোজ। সবাই রোজ বলেই ডাকে আমায়। সবে মাত্র এসেসসি পরীক্ষা দিলাম, এর মধ্যেই বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। ঠিক হওয়ারই কথা, আমি গরিব পরিবারের মেয়ে। ভালো একটা জায়গা দেখে আমায় বিয়ে দিতে পারলেই বাবা বাঁচেন। ভালো একটা সমন্ধ পেয়েও গেলেন। শুনেছি সে নাকি বিলেত ফিরত ইন্জিনিয়ার। শহরের খুব নামিদামি ব্যক্তি সে। এমন পাত্র বাবা কিছুতেই হাতছাড়া করবেন না। তার সম্পর্কে এর থেকে বেশি কিছুই জানি না। এমনকি তার নামটাও আমার অজানা। আমার জানারও কোন আগ্ৰহ নেই! যেই বিয়েতে আমার মতের কোন মূল্য নেই সেখানে জেনেই বা কি হবে? আর যার সাথে কথা বলছিলাম সে হচ্ছে তাসনিমা তাইমুন। আমি মুন বলেই ডাকি। সেই ছোটবেলার থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। ছোট থেকেই একসাথে বড় হয়েছি আমরা। এখন এই নতুন বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দূরে চলে যেতে হবে। আগের মতো হয়তো আমায় কাছে পাবে তাই সে কাঁদছে! এতক্ষণ আমরা আমাদের স্কুলের সামনের বেলিতলায় বসে বসে কথা বলছিলাম। এখন বাড়ি যেতে হবে। কাল বিয়ে আজ আমি বাড়ি থেকে বের হয়েছি এটা শুনলে তো আমার রক্ষে নেই। তাই তাড়াতাড়ি করে বাড়ি পথে রওয়ানা দেই। বিকেলে পথের ধারে হাঁটছি। শরতের ছোঁয়ায় সর্বত্র কাশফুলের রাজ্য। হাতে একটা কাশফুল নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি প্রবেশ করলাম। বাড়িতে ঢুকেই দেখলাম মা সদর দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমাকে দেখেই এগিয়ে আসেন।

রোজ তোর কি বুদ্ধিসুদ্ধি নাই? কালকে বিয়া আজকে তুই বাইরে ঘুরোছ?

মুনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম,

মা আর কিছু বললেন না।

ভিতরে যা, একটু পরে হলুদ।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভিতরে চলে এলাম। ভিতরে যেয়ে অবাক হলাম আমি বাদে সবাই রেডি! সবাই এতো খুশি এই বিয়েতে? আমি কেন খুশি হতে পারছি না?
আমার চাচাতো বোন মীম এসে বললো,

চলো রোজ আপু তোমাকে রেডি করে দেই।

আমার মাও চলে এলেন। মা বললেন,

দেখ রোজ, ছেলেটা খুব ভালো। এমন ছেলে লাখে একটা। তুই কোন ঝামেলা করিস না। তোর বাবাকে তো চিনিস।

আমি শুধু “হুম” বলে কাটিয়ে যাই। মনে মনে বলতে থাকি, একটা মেয়ের মতামত না জিজ্ঞেস করে বিয়ে করতে চাইছে? এ কেমন ভালো ছেলে? যাই হোক সবাই‌ মিলে আমাকে রেডি করে দিচ্ছে। আমি গ্ৰামের একটা মেয়ে। ততটা সাজগোজ আমি করি না আর ইচ্ছেও নেই! তবুও আমাকে মুখ ভর্তি মেকআপ দিয়ে সাজিয়ে দিচ্ছে সবাই। শুনেছি আমার হবু শাশুড়ি নাকি আজ হলুদ দিতে আসবে। তার যত্নে যাতে কোন ত্রুটি না হয় এসব বলাবলি করছে সবাই। দেখতে পেলাম বাবার চোখেমুখে বিশ্ব জয়ের উল্লাস। এতোটা খুশি? আমি আর কিছু বললাম না। নিরবে সবার কথা শুনে গেলাম।
আমার বাবারা তিন ভাই। আমরা সকলে এক বাড়িতেই থাকি কিন্তু তিন ভাইয়ের জন্য তিনটে ঘর। বড় চাচা আর মেজ চাচার ঘর দুটো দেয়াল করা। মাঝে একটা ছোটখাটো উঠান এখানেই সব আয়োজন করা হয়েছে।

সবার অনেক আনন্দ উল্লাসের মাধ্যমে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হলো। অনুষ্ঠানের শেষে শাশুড়ি বললেন,

মা রে, আমার পাগল ছেলেটাকে সামলে রাখিস। তোকে অনেক ভালোবাসে। জানিস ওর জীবনটা অনেক বেশি কষ্টের।

আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। কিন্তু তার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। কি বলছেন উনি?

রাতে না খেয়েই শুয়ে পড়লাম। সারা শরীর আমার হলুদ মাখানো। গ্ৰামের নিয়ম অনুযায়ী সকাল ছাড়া নাকি গোসল করতে পারবো না। প্রচুর বিরক্ত লাগছে তবুও চোখ বুজে শুয়ে রইলাম।

মুন আমার হলুদ সন্ধ্যায় আসে নি, জানি না কি হয়েছে?বিয়েতে আসবে তো? কিছুই ভালো লাগছে না। মুন আমার এমন একজন বন্ধুবী যার সাথে আমি সব কথাই শেয়ার করি, ওই একমাত্র ব্যক্তি যাকে আমি পরিবারের লোকজন থেকেও বেশি বিশ্বাস করি। আমাদের দুইজনকে একসাথে দেখলে মনে হবে আমরা দুই বোন।

শহর থেকে তারা সবাই চলে এসেছেন। দুটো মেয়ে এসে আমার কাছে বসেছে। একজন আমার থেকে বড় আর একজন আমার সমবয়সী! দুজনে মিলে আমায় সাজিয়ে দিচ্ছে আর কথা বলছে। জানতে পারলাম দুজনেই আমার ননদ। যাকে আমার সমবয়সী বলে মনে হয় সে আমার বরের আপন বোন। তার নাম তাসনুভা মাহমুদ মিফতা। সে নাকি নাইনে পড়ে যাক আমার থেকে ছোট তাহলে। আর বড়জন হচ্ছে তার ফুফাতো বোন‌ আলিশা রহমান। সে বিবাহিত একটা ছেলে আছে তার। কিন্তু দেখে তো তা মনে হয় না। এই বিভিন্ন কথা বলছে তারা। কথা বলতে বলতে আমাকে সাজানো শেষ করলো‌ তারা। গায়ে জুড়ে দিল একটা মেরুন রঙের ল্যাহাঙ্গা শাড়ি। আমার মেহেদী রাঙা হাতগুলোতে খয়েরি রঙের চুরির সমাহার। ঠোঁট রাঙানো লাল লিপস্টিক! চোখে গাঢ় করে কাজল মাখা! গাঁ ভর্তি ভারী গহনা!

সকালে উঠে যা দেখলাম,,,,,,,

#স্নিগ্ধ_আবেশে_তুমি
#তানজিনা_তিহা (লেখনীতে)
#সূচনা_পর্ব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here