স্নিগ্ধ আবেশে তুমি পর্ব -১৩

0
54

#স্নিগ্ধ_আবেশে_তুমি
#তানজিনা_তিহা (লেখনীতে)
#পর্ব_১৩

খালা মণি, তূর্য ওই মেয়েটার সাথে কেন? আমি ওকে ছাড়বো না।

বলেই ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে শুরু করলো আদ্রিজা। একে একে ভেঙে ফেললো সব। রাইমা মাহমুদ তাকে আটকে রাখতে রাখতে পারছে না। তিনি তার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেই যাচ্ছেন। একসময় নিজেকে শান্ত করে সে বললো, খালা মণি তূর্য তূর্য তূর্য,,,,

রাইমা মাহমুদ বললেন, কুল ডাউন বেবি। তূর্য তোরই, আর আমি আজই সব ব্যবস্থা করবো।

আমি কিছু জানি না আমি ওকে চাই‌।

তার জন্য তো তোমায় অনেক কিছু করতে হবে।

কি করতে হবে?

ওর মাকে যেভাবে সরিয়েছি সেভাবেই সরাবো।

মানে? কিভাবে?

বলছি, শোন।

.
.
.
.
.
.
.
.
.

মেহু তোমার হাতটা দাও।

আমি তার দিকে হাতটা বাহিয়ে দিলাম। সে আমার হাতটা শক্ত করে ধরলো এরপর বললো, তোমার মনে অনেক প্রশ্ন তাই না মেহু?

আমি মাথা নাড়ালাম। সে আমার একদম পাশ ঘেঁষে বসে বললো আজ তোমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি দিবো। আর কোন জট তোমার মনে থাকবে না।

আমি তার দিকে চেয়ে থাকলাম। এরপর তিনি বলতে শুরু করলেন, আমি মি. তাওহিদ মাহমুদ আর দিলরুবা মাহমুদের প্রথম সন্তান। আর মিফতা আমার ছোট বোন এটা তো জানো।

হুম, জানি।

মিফতা আমার আসল বোন না মেহু!

আমি খুব আশ্চর্য হলাম। কি বলছেন উনি? এসব কি বলছেন? যাকে সে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে সে তার বোন না। আমি হা হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।

এরপর তিনি বললেন, বেশ অবাক হচ্ছো তাই না? আসলে অবাক হওয়ারই কথা। আজ থেকে পনেরো বছর আগের ঘটনা। আমার মা দিলরুবা মাহমুদ তখন গর্ভবতী ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিতে যাচ্ছিলেন তখন। কিন্তু হঠাৎ এক বাস দুর্ঘটনায় আমার ভাই/বোন এই দুনিয়ায় আসার আগেই মারা যায়। এই ঘটনায় আমার মা মা হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু একটা মেয়ের খুব শখ ছিলো তার।

আমি তার পানে চেয়ে আছি। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, জানো এর পরের বছর ব্যবসা সুবাদে বাবা দেশের বাহিরে ছিলেন। আমি তখন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের একজন ছিলাম। একদিন পরীক্ষা দিয়ে আসার সময় রাস্তার এক ডাস্টবিনে এক বাচ্চা শিশুকে দেখতে পাই। আমার মা জানো খুব মায়াবতী ছিলেন। তিনি সেই ছোট্ট মেয়েটিকে নিজের সাথে আগলে নিয়েছিলেন। সেই শিশুর মায়াবী মুখটা সরাতে পারলেন না নিজের মন থেকে। আর সেই শিশুটিই হচ্ছে মিফতা। বাবা বিদেশ থেকে ফিরলে তাকে সব জানাই আমি আর মা। তখন তিনিও কোন দ্বিমত করেন নি। এরপর তাকে আমার বাবার পরিচয় বড় করেছি আমরা। কিন্তু হঠাৎই,,,

বলে উনি চুপ হয়ে গেলেন।

হঠাৎ কি? বলুন,,

তিনি বললেন, জানো রাইমা আন্টি মানে আমার সৎ মা তাকে আমরা ছোট থেকেই চিনি। বাবার বিজনেসের অংশিক ছিল তার দখলে। সেই সুবাদে সেও মাঝেমধ্যে আমাদের বাড়িতে আসতো কিন্তু বুঝতে পারি সে কি চায়।

বলুন,

রাইমা আন্টি আমাদের বেশিরভাগ সময়ই বাবার অনুপস্থিতিতে অফিস দেখাশুনা করতো। আমাদের বাসায় আসতো যেতো। আমার বাবার প্রতি তার এক অন্যরকম আকর্ষণ ছিল। মা বিষয়টাকে তেমন ভাবে নিতেন না। আমাদের বিশাল সম্পত্তিতেও তার নজর পরে। একসময় সে বাবাকে নানা ভাবে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। তার হাঁটাচলা কথাবার্তা ইত্যাদির মাধ্যমে। এরপর তিনি এক অন্য কৌশল আঁটেন‌। বাবাকে বলেন যে মা মা আমার মা,,,

বলেই তূর্য কান্না করে দিলেন। অনেক জোরে জোরে কাঁদতে লাগলেন তিনি। আমি তাকে শান্তনা দিচ্ছি।

এরপর তিনি বলতে শুরু করলেন, তিনি বাবাকে বললেন যে মিফতা নাকি আমার মায়ের সন্তান। সে নাকি পরপুরুষের সাথে,,,,,

তূর্য আর কিছু বলতে পারলেন না কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আমার কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন তিনি। এরপর বললেন, জানো আমার মা সবকিছুই সহ্য করতে পেরেছে কিন্তু বাবার অবিশ্বাস না মা নিতে পারে নি। রাইমা আন্টির কথায় না বাবাও মাকে সন্দেহ করতো। মায়ের উপর সবসময় নজর রাখতো। মা বিষয়টা খেয়াল করতেন না। একসময় এই সন্দেহ তীব্র আকার ধারণ করে। বাবা মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করে দেয়। তাকে অনেক গালমন্দ করে। আর রাইমা আন্টির সাথে অন্যরকম সম্পর্কে লিপ্ত হয়। মা প্রথমে বিশ্বাস করতে না চাইলেও নিজের চোখে দেখার পর আর সে থাকতে পারে নি।

বলে তিনি আবার কাঁদছেন। নিজেকে শান্ত করে তিনি আবার বললেন, জানো আমার বাবা মায়ের পঁচিশ তম বিবাহবার্ষিকীতে বাবা বলেছিলেন তিনি নাকি অফিসের কাজে ব্যস্ত তাই আসতে পারবেন না। আর নানা ভাই আর নানুও বেশ করে তাদের ওখানে যেতে বলেছিলেন। তাই বাবাকে বলে আমি, মা, আর মিফতা নানা বাড়ির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই মা বলেছিলেন বাবা তাকে এবার বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে যেই শাড়িটা কিনে দিয়েছিলো সেটা আনা হয় নি। তাই গাড়ি আবার বিপরীতে আনা হয়। বাড়িতে এসে রুমে ঢুকে মা যা দেখলো তাকে নিজেকে সে আর বেঁধে রাখতে পারলো না। রাইমা আন্টির সাথে বাবা,,,,

সে চুপ হয়ে গেল। আমি তার কথায় শিউরে উঠলাম।

সেদিন জানো মা আর বাবার মধ্যে খুব ঝগড়া হয়েছিলো। মা আমাকে আর মিফতাকে নিয়ে নানা বাড়িতে রওয়ানা দিলেন। কিন্তু পথে হঠাৎ একটা ট্রাক আমাদের দিকে হানা দেয় আমাদেরকে বাঁচাতে গিয়ে মা,,,

এবার আর তিনি বলতে পারলেন না এবার তিনি কাঁদছেন। মন প্রাণ উজাড় করে কাঁদছেন। আমিও কিছু বলছি না তার চাপা কষ্ট গুলো হয় তো হালকা হবে। এতোটা কষ্ট এই মানুষটার মাঝে আগে তো জানা ছিলো না। এই মানুষটা আসলেই অন্যরকম।

তখন তো আমি বড়ই ছিলাম কিন্তু কি জানো মায়ের আদরের ছিলাম তাই বড় হলেও অনেক বিষয়কে পাত্তা দিতাম না। বাস্তবতা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে মেহু।

আমি নির্বাক!

সে আবার বললো, মেহু জানো আমার মায়ের মৃত্যু সবার কাছে এক্সিডেন্ট মনে হলেও আমার কাছে ছিলো রহস্য। এই রহস্য উন্মোচন করার জন্য আমি পুলিশের সঙ্গে আলাপ করি। জানো ওই রাতে ট্রাকের নাম্বারটা আমি স্পষ্ট না দেখতে পেলেও মানুষটাকে দেখেছিলাম। এই খানিক তথ্য নিয়েই জানো আমি সামনে এগিয়েছি হার মানি নি। আমি তো লন্ডনে ছিলাম কিন্তু আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। একে একে পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে সব তথ্য। ওই দিন ওই লোকটিকে রাইমা আন্টিই পাঠিয়েছিলো। আমার আমার মা কে এভাবে সে হত্যা করেছিলো। লালসা মানুষকে,,, মানুষকে,,, সে আর কিছু বলতে পারছে না। তার গলা ভেঙ্গে আসছে।

.

.

.

.

আদ্রিজা শোন,

বলো খালা মণি।

ওই মেহুটাকে একটা শিক্ষা দিবো।

কি খালা মণি?

বলছি শোন।

..
.
.
.
.

মেহু! বাড়ি যাবে না?

হুম,,

চলো,,,

আর একটু থাকি।

সে হেসে বললো, থাকবে? থাকো।

আমি তার কাঁধে মাথা রেখে বসে থাকলাম। সে বললো, আজ একটা প্রতিশোধের অন্তিম টানবো, চলো বাড়ি যাই।

আমি কিছু বুঝতে পারলাম না।

.

.

.

.

খালা মণি এবার তূর্য আমারই হবে।

হুম।

তূর্যকে ছাড়ুন লকাপে কিভাবে থাকবেন তার চিন্তা করুন।

হঠাৎ রাইমা মাহমুদ সামনে তাকিয়ে দেখলো পুলিশ টিম দাঁড়িয়ে আছে।

আপনারা এখানে কেন? কি চাই?

আপনাকে চাই,,,, মিসেস. দিলরুবা মাহমুদকে হত্যা করার অপরাধে আপনাকে গ্ৰেফতার করা হলো।

কি,,, কি,,,, বলছেন আপনি?

আমি ঠিকই বলছি।

রাইমা মাহমুদ চিৎকার দিয়ে তাওহিদ মাহমুদ কে ডাকলো। তাওহিদ মাহমুদ পুলিশ দেখে আসলেন।

কি হয়েছে? আপনারা কেন?

আমরা রাইমা তালুকদার উরফে রাইমা মাহমুদ কে গ্ৰেফতারের পরোয়ানা পেয়ে এসেছি।

মানে? কি বলছেন আপনি? আপনি জানেন কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন?

হুম জানি মি. মাহমুদ। আমরা আপনাকে বিস্তারিত বলছি।

সবকিছু শুনে তিনি বাকরুদ্ধ। রাইমা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাওহিদ মাহমুদ গিয়ে তার গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিলেন।

তুই এতোটা খারাপ। তোর জন্য আমি আমার সোনার সংসার ধূলিসাৎ করে দিয়েছি। আমি আমার দিলরুবাকে হারিয়েছি।

দিলরুবার নাম আপনার মতো মানুষের মুখে উচ্চারণ যোগ্য নয় মি. তাওহিদ মাহমুদ। (তূর্য)

তূর্য!

হুম,,, আমার মা তো এক খারাপ মহিলা তাই না মি. মাহমুদ।

তূর্য বাবা,, বলে তিনি কাঁদতে থাকলেন। তূর্য তার নিকট গিয়ে বললেন, আমার মাকে তুমি তো ভালোবাসতে তবে এমন কেন করলে? তোমাদের না লাভ ম্যারিজ ছিলো। একটুও বিশ্বাস করতে না তাকে? কেন বাবা? কেন?

তাওহিদ মাহমুদের কাছে আজ কোন জবাব নেই। তিনি কাঁদছেন সাথে তূর্যও।

পুলিশ রাইমাকে নিয়ে গেলো। আদ্রিজাও চলে গেল এক অজানা পাড়িতে সে বিদেশ পাড়ি দিল। তাওহিদ মাহমুদ নিজের কাজে আজ লজ্জিত। ছেলের আছে হাজারো বার ক্ষমা চেয়েছে সে। তূর্য সবটা মেনে নিতে না পারলেও স্বাভাবিকই আছেন।

রাত একটা বেজে গেছে তিনি এখনো বাড়ি ফিরেন নি। তিনি আর বাবা থানায় গিয়েছেন বলেছিলেন। কিন্তু এখনো ফিরেন নি। আমি আর রেহানা চাচি আবুল চাচা ড্রইং রুমে বসে আছি। মিফতা ঘুমিয়ে পড়েছে। দেড়টা নাগাদ তারা আসলো। আমি মুখ ভার করে বসে আছি। তূর্য আমার দিকে একটু পর পর দেখছেন আর চোখের ইশারায় জানতে চাচ্ছেন কি হয়েছে। আমি তো মুখ ফুলিয়েই আছি। সবার খাওয়া দাওয়া শেষে সব গুছিয়ে উপরে চলে গেলাম। বেলকনিতে গিয়ে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এতো দেরি করে ফেরার কি আছে?

খানিকক্ষণ বাদে তূর্য এলেন। রুমে এসে আমার অস্তিত্ব না পেয়ে তিনিও বেলকনিতে এলেন। আমাকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরলেন। আমি কোন কিছু বললাম না। এরপর তিনি বললেন, আমার পিচ্চি বউটা রাগ করেছে কেন?

আমি কিছু বললাম না।

সে আমাকে তার দিকে ফিরিয়ে বললেন।

মেহু! আমার সাথে অনেক রেগে আছো?

আমি কিছু বললাম না। সে একের পর এক প্রশ্ন করছে আর আমি চুপ দাঁড়িয়ে আছি। এরপর তিনি এক আশ্চর্য কাণ্ড করে বসলেন আমার অধরযুগল নিজের আয়ত্তে করে নিলেন। আমি বিস্মিত। কিছুক্ষণ পর আমাকে ছেড়ে দিলেন। আমি এবারো কিছু বললাম না। মুখ ফুলিয়ে থাকলাম। এরপর তিনি আমায় কোলে করে বিছানায় শুইয়ে দিলেন।

আজ কি আমার সাথে কথা বলবেন না?

আমি চুপ।

এরপর হঠাৎ তিনি বললেন, মেহু! আজ না মাথাটা প্রচুর ব্যাথা করছে।

তার কথায় আমার বুকের ভিতর উত্তাল পাতাল ঢেউ বইছে।

কোথায় ব্যাথা করছে? দেখি আমি হাত বুলিয়ে দেই।

দেখ না প্রচুর ব্যাথা করছে।

তূর্য হাতের আঙ্গুল দিয়ে চুলগুলো খুব টেনছেন। আমি তার কাছে গেলাম কিন্তু তিনি আমায় ছিটকে সরিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি প্রায় পাগল হয়ে গেলেন‌। পাগলের মতো চুলগুলো টানছেন। তার অবস্থা দেখে আমি বাহিরে এসে চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে লাগলাম।
আমার চিৎকার সবার কান অব্দি গেল কিনা জানি না। রেহানা চাচি বাবা সবাই দৌড়ে এলেন। আমি ঘরে গিয়ে দেখলাম তূর্য বিছানায় শুয়ে পড়েছেন। তার কোন সারা শব্দ নেই। আমি তার কাছে বসে তাকে ডাকতে লাগলাম। কিন্তু তিনি উত্তর দিচ্ছেন না। আমি তূর্য তূর্য বলে চিৎকার করে যাচ্ছি কিন্তু তিনি চুপ কেন? আমার ডাক কি শুনছেন না তিনি?

এক পর্যায়ে আমার শরীর তার উপর লুটিয়ে পড়লো!

চলবে…….

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here