কনফিউশন পর্ব ২

0
231

#কনফিউশন পর্ব ২
#লেখকঃ মৌরি মরিয়ম

তিরা যখনই নিচে যায় দেখে কাব্যর ফ্ল্যাটে তালা ঝোলানো। কাব্য বাসায় কখন থাকে এটাই সে বুঝতে পারছে না। এদিকে সাহিল ভাইয়ার ফোন থেকেও নাম্বার চুরি করাটা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাটা ঘটলো শুক্রবার। শুক্র শনিবার সাহিলের অফিস নেই। তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। গত শনিবার স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে আসার পর আর দেখতে যাওয়ার সময় পায়নি। তাই শুক্রবার সকাল সকাল স্ত্রীকে দেখতে চলে গেলো। ১০ টার দিকে তিরা গেল আরশির কাছে। আরশি ফ্রিজ থেকে কাঁচা মাছ তরকারি বের করছিল। তিরা অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
“আরু.. একী করছিস?”
“রান্নার আয়োজন করছি।”
“একটু পরে কর না, আমি তোকে সাহায্য করব।”
“কেন? দুপুরবেলা রান্নাঘরে গরম লাগে, সকাল সকাল রান্নাটা সেড়ে ফেললেই ভাল।”
“আচ্ছা যা পুরো রান্নাটাই আজ আমি করব।”
“ঘটনা কী? যাকে দিয়ে ভুতেও একটা কাজ করাতে পারে না সে আজ রান্না করতে চাইছে!”
“এখন কাব্যর বাসায় যাব সেজন্য। অন্যদিন থাকে না আজ নিশ্চয়ই থাকবে।”
“ও এই ব্যাপার! তো যা না। তাতে আমার রান্না আটকাবে কেন?”
“আরে বাবা একা যাব নাকি ওরকম একটা জোয়ান ছেলের কাছে? দুজন মিলে গেলে চিন্তা নেই। তোর ছোটো বোনের সেফটির দায়িত্ব তো তোরই তাই না?”
আরশি হেসে বলল,
“যাতে মাতাল তালে ঠিক। আচ্ছা চল।”
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তিরা জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা আরু.. তুই কাব্যকে এর আগে কখনো দেখেছিস?”
“না।”
“ও হ্যাঁ এজন্যই তো সেদিন কাব্য জিজ্ঞেস করছিল তুই কে। পরিচয় থাকলে তো আর করতো না।”
“তবে অনন্ত ভাইয়াকে দেখেছি। যখন সে ঢাকায় সাহিল ভাইয়ার সাথে একসাথে পড়াশোনা করতো তখন অনেকবার আমাদের বাসায় এসেছিল। অনেক আগের কথা অবশ্য।”
“ওহ। দেখ কাব্য আজ বাসায়।”
খুশিতে তিরার দাঁতগুলো সব বের হয়ে গেল। সামনে তিরা, পেছনে আরশি। দরজায় টোকা দেয়ার পরপরই কাব্য দরজা খুললো।
“একী আপনারা! আসুন আসুন, কি সৌভাগ্য।”
তিরা আরশি ভেতরে ঢুকলো। কাব্য তাদেরকে ড্রয়িং রুমে বসালো। তিরা বলল,
“আপনি কি সারাদিন বাইরেই থাকেন? এর আগেও এসেছিলাম আপনাকে পাইনি।”
কাব্য একবার আরশির দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে তিরার দিকে তাকিয়ে বলল,
“না না আমি এই দুদিন আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম। এমনিতে বেশিরভাগ সময় বাসাতেই থাকি। আমি একটু ঘরকুনো স্বভাবের লোক।”
আরশি কোনো কথা বলছে না। এদিক ওদিক দেখছে। কাব্যর চোখ বারবার তিরাকে পার করে চলে যাচ্ছে আরশির দিকে। সে খুব সাবধানে সেই চোখ আবার তিরার দিকে নিয়ে আসছে। কারণ কথা তিরার সাথে হচ্ছে। তিরা অবশ্য ব্যাপারটা ধরতে পারলো না। বলল,
“আপনি কী করেন?”
“আমি ফাইনাল ইয়ারে পড়ছি। পাশাপাশি ছোটোখাটো একটা জবও করছি।”
“কি জব করেন?”
“রেডিওতে।”
“আপনি আরজে?”
কাব্য হেসে বলল,
“আপনার কি ধারণা রেডিওতে আরজে ছাড়া আর কেউ কাজ করে না?”
“না তা নয়।”
আরশি এবার উঠে গিয়ে কাব্যর বিশাল এক বুক শেল্ফের সামনে দাঁড়ালো। খুব মনোযোগ সহকারে বইগুলো দেখছিল। কাব্য আরশিকে একনজর দেখে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো। তিরাকে বলল,
“আমি সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের কাজ করি।”
“ওহ আচ্ছা।”
“আপনারা কী পড়ছেন?”
“আমরা দুবোন এবার ভার্সিটিতে এডমিশন নেব।”
“দুজন একসাথেই পড়েন?”
“হ্যাঁ আমাদের সবকিছুই একসাথে।”
“দুজন সমবয়সী?”
“হ্যাঁ।”
“কে বড়?”
“আরশি আমার থেকে এক মাসের বড়।”
“আচ্ছা তিরা একটু অপেক্ষা করুন। আমি চা করে আনি।”
“আপনি চা করবেন কেন? আমাদের চায়ের রানী চা করবে। আরশি যেখানে যায় সেখানে কেউ চা করার দুঃসাহস করে না।”
আরশি ছোটো করে একটা ধমক দিল,
“তিরা!”
কাব্য বলল,
“আমি তাহলে দুঃসাহস টা করেই ফেলি। গেস্টদের দিয়ে কাজ করাই না আমি।”
“সর্বনাশ। আপনি যদি ওর হাতের চা না খান তাহলে জীবনের সবচেয়ে বড় মিস টা কিন্তু করে ফেলবেন।”
“আপনাদের বাসায় গিয়ে ওনার হাতের চা খাব। আপাতত আপনারা আমার বাসায় গেস্ট, আমার হাতের টাই খাবেন।”
“ওকে।”

কাব্য চা করতে রান্না ঘরে যেতেই আরশি তিরার মাথার চুল টান মেরে বলল,
“আমার কথা বলছিস কেন? নিজের কথা বল।”
“আরু দেখ তোর দুলাভাই কত গোছানো! ব্যাচেলর বাসা এত সুন্দর হয় আগে জানতাম না।”
আরশি মুখে বিরক্তি এনে আবার বই দেখতে লাগলো। তিরাও ঘুরে ঘুরে বাসাটা দেখে ফেললো। একফাঁকে বেডরুমও ঘুরে এলো। এরপর আবার ভদ্র মেয়ে সেজে সোফায় বসে রইলো।

কাব্য চা নিয়ে এসে প্রথমে তিরার হাতে চা তুলে দিলো। এরপির আরেকটা কাপ নিয়ে আরশির কাছে গেল। চায়ের কাপ এগিয়ে দিতেই আরশি কাপটা নিয়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ।”
কাব্য মাথা নেড়ে বলল,
“ওয়েলকাম।”
এরপর আবার ফিরে এলো তিরার কাছে। তিরা চায়ে চুমুক দিয়েই বলল,
“চা তো অসাধারণ হয়েছে। এত ভাল চা আমিও বানাতে পারি না।”
কাব্য হেসে বলল,
“থ্যাংকস।”
আরশি বুকসেল্ফের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চা খেল। ওদের আড্ডায় একবারের জন্যও এলো না। এদিকে তিরার আগ্রহের শেষ নেই, একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।
“আপনার বাড়ি কোথায়?”
“কক্সবাজার।”
“আপনি কত ভাগ্যবান চাইলেই সমুদ্র দেখতে পাবেন!”
“আমার সমুদ্র ভালো লাগে না। হয়তো ছোটোবেলা থেকেই জিনিসটা এভেইলেবল ছিল সেজন্য। তবে আমার পাহাড় পছন্দ।”
“আমার সমুদ্র বেশি পছন্দ। আচ্ছা আপনার ফ্যামিলি কি কক্সবাজারেই থাকে? না এখানে একা থাকেন তাই জিজ্ঞেস করছি।”
“হ্যাঁ আমার ফ্যামিলির সবাই ওখানেই থাকে।”
“আপনার ফ্যামিলিতে কে কে আছে?”
“বাবা, মা, দাদু, চাচ্চু, বড় ভাই, ছোটো ভাই, ভাবি।”
“জয়েন ফ্যামিলি?”
“হ্যাঁ বলতে পারেন। আপনাদের ফ্যামিলি?”
“আমার বাবা-মা আর ছোটো ভাই খুলনা থাকে। বড় আপুর বিয়ে হয়ে গেছে সে অষ্ট্রেলিয়া থাকে। এখানে সাহিল ভাইয়া, ভাবি, আরশি আর আমি থাকি। মামা মামী তো নেই বেশ কয়েকবছর আগে মারা গেছেন।”
আরশি কড়া চোখে তাকালো তিরার দিকে। তিরা অস্বস্তিবোধ করছে, এভাবে কথাটা বোধহয় বলা উচিত হয়নি। আরশি যে এখানে আছে সেকথা খেয়ালই ছিল না তার। কাব্য বলল,
“সরি।”

আরশি বুকসেল্ফের সামনে দাঁড়িয়েই কাব্যর দিকে ঘুরে বলল,
“আমি কি ‘ফ্রিডম এট মিডনাইট’ বইটি ধার নিতে পারি?”
“শিওর। কেন নয়?”
“বইটি অনেকদিন ধরে খুঁজছি। নীলক্ষেতের কোনো দোকানেই নেই।”
“এটা খুব সম্ভাবত এখানে কোথাও পাবেন না। আমি কলকাতা থেকে এনেছিলাম।”
“ওহ আচ্ছা।”
আরশি বইটি নামাতে চেষ্টা করছিল কিন্তু অনেক উঁচুতে থাকার কারনে সে নাগাল পাচ্ছিল না। কাব্য গিয়ে বইটি নামিয়ে দিয়ে বলল,
“এখানে এরকম আরো অনেক এক্সক্লুসিভ সব বই পাবেন।”
“হ্যাঁ তাই দেখলাম।”
“আপনার যখন ইচ্ছে নিয়ে পড়বেন।”
“থ্যাংক ইউ।”
তিরা দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এত বই কীভাবে পড়েন আপনারা?”
কাব্য বলল,
“কেন আপনি বই পড়েন না?”
“নাহ এত বোরিং জিনিসের সাথে সময় কাটানোর ধৈর্য আমার নেই।”
কাব্য অবাক হয়ে বলল,
“সিরিয়াসলি!”
“হ্যাঁ।”
আরশি বলল,
“তিরা এবার চল আমরা উঠি।”
“এখনই চলে যাব মাত্রই না এলাম?”
“তাহলে তুই থাক আমি যাই, রান্না করতে হবে। বুয়া আসার আগে রান্না শেষ না করতে পারলে ওকে দিয়ে আর রান্নাঘর পরিস্কার করানো যাবে না। পরে শেষে আমাকে করতে হবে।”
“আচ্ছা ঠিকাছে চল যাই।”
সিঁড়ির কাছে গিয়ে তিরা বলল,
“আপনার ফেসবুক আইডিটা দেয়া যাবে?”
কাব্য হেসে বলল,
“আফনান কাব্য।”
তিরা হেসে বলল,
“তিরা মেহজাবিন।”
কিন্তু ততক্ষণে আরশি দোতলার সিঁড়িতে উঠে গেছে। তার আইডি নামটা আর জানা হলো না কাব্যর।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here