#প্রেমনগরে_প্রশান্তির_ভেলা পর্ব৩

0
91

#প্রেমনগরে_প্রশান্তির_ভেলা পর্ব৩
#আফসানা_মিমি

নিস্তব্ধতায় ঘিরে আছে চারিপাশ। রুপের চোখ যেন এবার কোটর থেকে বের হয়ে আসবে। রুপ কান থেকে ফোন নামিয়ে নেয়। বিছানার উপর পড়ে থাকা কার্ডটি আবারও হাতে নিয়ে নাম্বার মিলিয়ে নেয়। না নাম্বার ঠিক’ই আছে। অপরপাশ থেকে কথার আওয়াজ ভেসে আসছে। রুপ আবারও ফোন কানে নেয়।

” কাকে বউমা বলছেন আঙ্কেল? আমি রুপ!”

এদিকে আয়েশা আজাদ স্বামীর দুরন্তপনা দেখে ললাটে হাত দ্বারা আঘাত করে। রক্ত চক্ষুদ্বয় আজাদ সাহেবের দিকে ছুঁড়ে ফেলে। আজাদ সাহেব পড়েছেন মহা ফেসাদে। নিজের স্ত্রীর হট মাথা কুল করবেন! নাকি ফোনের অপরপাশে ছোট ছেলের হবু বউমাকে মানাবেন।

” আরে কি বলছো কি! তোমাকে বউমা বলতে যাবো কেন? আমার বড়ো ছেলে নাবিল আছে না! তাঁর স্ত্রী, পোয়াতি। বাপের বাড়ি গিয়েছে। আমার এক কানে এক মোবাইলে ফাহিমা মানে বউমা ফোনকলে ছিলো আরেক কানে তোমার ফোনকল। তুমি দুপুরের মত এবারও আমাকে ভুল বুঝলে।”

আপরপাশে রুপ যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। ইনিয়ে বিনিয়ে কোন কথা না বলে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
” দুপুরে আপনার ছেলের সামনে মিথ্যা বলেছিলেন কেন আঙ্কেল?”

আজাদ সাহেব যেন এই প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলেন। চোখের ইশারায় আয়েশা আজাদকে বললেন যে, ‘ঘুঘুপাখি ফাঁদে পা দিয়েছে’।
আজাদ সাহেবকে শ্রেষ্ট অভিনেতার খেতাব প্রদান করলে যেন ভুল হবে না, একমাত্র আজাদ সাহেব’ই শ্রেষ্ট অভিনেতা হবেন। দুঃখভরা মুখ করে আজাদ সাহেব বলেন,

” আর বলিও না রুপ মা! আমার ছোট ছেলে নিবরাজ নাদিফ, এক নাম্বারের বদ রাগী স্বভাবের। আমি বাবা হয়েও ছেলেকে ভয় পাই। চশমা ছাড়া বাহিরে বের হয়েছি শুনলে ভাত জুটবে না কপালে। আর তুমি সাহায্য করেছো শুনলে দেখা যাবে বিনা অপরাধে তোমাকেও জেলে পাঠিয়ে দিবে।”

রুপ যেন ভয় পেলো, ভীষণ ভয়। রুপ অনুভব করল, জেলের নাম শুনে ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। রূপ শুকনো ঢুক গিলে প্রত্যুওরে বলল,

” আমি জেলে যেতে চাই না আঙ্কেল! ভালো করেছেন মিথ্যা বলে। আমি এখন রাখছি। আসসালামু আলাইকুম।”

” আরে আরে শুনো মা! তোমার বিপদ শেষ হয়নি।”

রুপ ফোন কান থেকে নামিয়েও নামায়নি। বিপদের কথা শুনে ফোন আবারও কানে নিলো।

” বিপদ! কিসের বিপদ?”

আজাদ সাহেব আগের থেকেও ভরাট কন্ঠস্বরে বললেন,
” আমার ছেলেকে যে বলেছি, তুমি আমাদের উপরের তলায় ভাড়া নিয়েছো!”
” কিন্তু আমি যে এমন কিছু বলিনি!”
” বলোনি, কিন্তু ঐ যে আমি যে নিজেকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যা বলেছি!”

রুপের অবস্থা এখন নাজেহাল। ওড়না দিয়ে পরপর ললাটের ঘাম মুছে নিচ্ছে। রুপের এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে রাইসা এগিয়ে আসে। চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করে, ‘কি হয়েছে?’ প্রত্যুওরে রুপ করুন চোখে বলে,’ আমার আর তোর কপাল পুড়েছে।’
রাইসা যেন রুপের কথার মানে বুঝলো না। রুপকে ভেংচি কেঁটে ঘরে বের হয়ে গেলো।

” শুনতে পারছো মা?”
রুপ এবার চাপা নিশ্বাস ত্যাগ করে বলে,
” বলুন আঙ্কেল। এখন আমার করণীয় কী?”
আজাদ সাহেব যেন পারছেন না নাচতে। আয়েশা আজাদকে ইশারায় বললেন কাছে আসতে।
” তোমার এখন আমার বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে আসতে’ই হবে। নয়তো তোমার’ই সমস্যা।

রুপ এবার মহা চিন্তায় পড়লো। তিনটে টিউশনি করে যত টাকা আসে তাতে আজাদ সাহেবের বাড়িতে থাকা কষ্টের হবে।
” আমার সামর্থ্য নেই আপনার বাড়িতে থাকার। আমি এতিম।”

রুপের কথা শুনে কট করে আজাদ সাহেব বলে উঠলেন,

” তোমার থাকতে কোন টাকা লাগবে না। তুমি শুধু রাজি হয়ে যাও আমার ছেলের জন্য!”

” মানেহ!”

আজাদ সাহেবের মুখের কথা শেষ হতে’ই আয়েশা আজাদ স্বামীর মোটা পেটে চিমটি কাঁ’টে যেখানে কিছুক্ষণ আগে শুঁটকি আর পাট শাক ঢুকিয়েছে।
রুপের কাছে আজাদ সাহেবকে বদ্ধ উন্মাদ মনে হচ্ছে। যখন খুশি উল্টা পাল্টা বকেই যাচ্ছে।

” বলছি যে, জান বাঁচাতে চাইলে তোমার সকল জিনিসপত্র নিয়ে আগামীকাল সকাল চলে আসো। টাকা পয়সার লেনদেন তখন তোমার মন মত করে নিবো। এখন রাখছি বউমা।”

আজাদ সাহেব রুপকে আর কিছু বলতে দিলো না। ফোন কেঁ’টে দিলো। আয়েশা আজাদ আজ বেজায় খুশি। এতদিনে স্বামী একটা ভালো কাছ করেছে।

” কে পোয়াতি? আমি কবে পোয়াতি হলাম বাবা! আপনার ছেলে কি আরেকটা বিয়ে করেছে?”

এক ঝামেলা সমাপ্ত করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগেই আজাদ সাহেব আরেকটা ঝামেলা রটিয়ে ফেলল। বড়ো ছেলে নাবিলের স্ত্রী ফাহিমা, আজাদ সাহেবের কাছে উওর পাবার আশায় উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এদিকে আজাদ সাহেব পড়েছেন জোয়ার ভাটার মাঝে। দেখা যাক এই সমস্যার সমাধান আজাদ সাহেব করেন কীভাবে?

—————

সকাল হয়েছে গো! সকাল হয়েছে। মোয়াজ্জিন আযান দিয়েছেন যে কিছুক্ষণ আগে! মুসল্লিরা নামাজ পড়ে বের হয়েছেন মসজিদ থেকে। পাড়ার ছেলে-মেয়েরা মসজিদে যাচ্ছে মক্তবে পড়বে বলে। আনন্দকের এতিমখানা আজ নীরব, নিস্তব্ধ। ছোট ছোট বাচ্চারা একটি ঘরের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। রাইসা এবং রুপের সব গোছগাছ শেষ। এখন শুধু বিদায়ের পালা। ছোট বাচ্চাদের সামনে এসে সকলের হাতে একটা একটা লজেন্স দিয়ে দিলো রুপ। বাচ্চারা লজেন্স পেয়ে কি যে খুশি! সকলে রুপের গালে চুমু খেয়ে দৌঁড়ে চলে যায় যার যার কক্ষে।

” আমাদের সাথে ভালো কিছু হবে তো!”

এতিমখানা থেকে বের হয়ে রাইসার মলিনমুখে রুপকে ফলল। রুপ নির্বিকার। একটা রিক্সা ডেকে ব্লক সি এলাকার প্রেম নীড়ে যাবার কথা বলল।

সময় এখন প্রভাতের প্রথমাংশ। চা দোকানিরা মাত্র চা বসিয়েছে চায়ের পাত্রে। সকাল সকাল ডায়াবেটিস রোগীদের দেখা যাচ্ছে পালাক্রমে হাঁটতে যেন প্রতিযোগিতা করে হাঁটছে।
রাইসা,রুপ প্রেম নীড়ের সামনে দাঁড়িয়ে। দু’জনের হাতে মাঝারি আকারের ব্যাগ।

” তুই এই বাড়িতে থাকার কথা বলেছিস রে রুপ? এটা বাড়ি না তাজমহল? এত সুন্দর, দামি বাড়িতে থাকবি তুই? তোর টাকা কি গাঙ দিয়ে ভেসে এসেছে?”

রুপ ভীত দৃষ্টিতে রাইসার পানে তাকালো। রুপ এই বিষয়টির ভয় করেছে এতক্ষণ। এই মেয়ে যা ঢোল পিটানো, দেখা যাবে রুপের উওর না পেয়ে চিল্লিয়ে সাড়া পাড়ার মানুষ এক করে ফেলেছে।
রাইসাকে কিছু বলবে তার আগেই রুপের দেখা মিলে আজাদ সাহেবের দিকে। আজাদ সাহেব সবেমাত্র নামাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছেন। রুপ হাসিমুখে আঙ্কেল বলে ডাক দিবে তাঁর আগেই রুপের কর্ণধারে গতকালের রাগী লোকটার কন্ঠস্বর আসে,

” এই মেয়ে তোমার শরীর কি ইটল মিটি দিয়ে তৈরি? সকাল হতে না হতে’ই এখানে চলে এসেছো যে!”

রুপ স্তব্ধ,বিমূঢ়। কন্ঠনালী হতে কোন স্বর বের হচ্ছে না। লোকটির অবস্থান রুপের বিপরীত পাশে। এখন পর্যন্ত রূপ লোকটিকে দেখেনি। রাইসা হা করে লোটটাকে গিলছে।

“প্রেম নীড়ে কোন শিরনি বিতরণ করা হচ্ছে না যে সকাল না হতে’ই চলে এসেছো।”

রুপ আর অপমান সহ্য করতে পারছে না। রাগে কষ্ট আঁখিতে অশ্রুকণা চিকচিক করছে। রুপ কাঁদো কাঁদো মুখশ্রীতে লোকটির পানে তাকালো। একি! এ ছেলে না রাজপুত্র! ফর্সা চামড়ায় একদম ভিন্ন দেশী মনে হচ্ছে। মাথায় এক ঝাঁক চুল যা এলোমেলো ভাবে ললাটে পড়ে আছে। এজন্য’ই বুঝি রাইসা হা করে দেখছিলো লোকটিকে! পরক্ষণে রুপ নিজের ভাবনার উপর হাঁড়ি ভাঙে। আজাদ সাহেব বলেছিলো উনার ছোট ছেলে বদ রাগী স্বভাবের। যার প্রমাণ এই যে।

” নাদিফ!সকাল সকাল মেয়েদের পিছনে পড়েছিস কেন! কাহিনী কি?”

আজাদ সাহেব তখনও রুপকে দেখেনি। দূর থেকে হাঁক ছাড়েন নাদিফের উদ্দেশ্যে।

” তোমার জন্য আজ প্রেম নীড়ের মান সম্মান কিছু’ই থাকলো না বাবা! শেষ পর্যায়ে হাঁটুর বয়সী!”

নাদিফ আরো কিছু বলবে তার আগেই রুপ হু হু করে কান্না শুরু করে দেয়। নাদিফ যেন মোটেও প্রস্তুত ছিলো না রুপে কান্নার।

এদিকে আজাদ সাহেব সন্নিকটে এসে রুপকে কান্না করতে দেখে থতমত খেয়ে যায়। আজাদ সাহেব জানেন তাঁর ছোট ছেলে নাদিফ একটা এলিয়েনের বাচ্চা। প্রেম নীড়ে যেখানে আনাচে কানাচে প্রেমের ছড়াছড়ি, সেখানে আজাদ সাহেবের ছোট ছেলে নিরামিষের কাণ্ডারী।

সকলের উপস্থিতিতে নাদিফ কান্ড করে বসলো। পর পর দুইটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো রুপের লাল টুকটুকে গালে।

” কথায় কথায় নাকে মুখে কান্না করা মেয়েদের আমার একদম সহ্য হয় না। এ বাড়িতে থাকতে হলে কান্না করা যাবে না। আর এই মেয়ে! আমার বাবার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকবে।”

নাদিফ ঝড়ের গতিতে দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলো। রাস্তায় রেখে গেলো বিস্ময়কর ভাবে দণ্ডায়মান তিনজন নারী পুরুষকে। যারা তিনজন তিনভাবে নাদিফের কথা মগজে ঢুকিয়ে নিয়েছে।
———-

খুব সুন্দর কামরায় বসে আছে রুপ। রুপের কাছে মনে হচ্ছে এটা কোন কামরা না রাজসভা।
এত বড় কামরা রুপ আগে কখনও দেখেনি। আজাদ সাহেব নিজে নিয়ে এসেছেন রুপ এবং রাইসাকে। রুপকে উপর তলার ঘরটিতে থাকার জন্য ভাড়া দেয়া হয়েছে। রুপের কাছে মনে হচ্ছে ভাড়া দেয়া যেন একটা বাহানা মাত্র। রুপের কাছ থেকে ন্যায্য ভাড়া দাবী করেনি বরঞ্চ চার ভাগের একভাগ ভাড়া চেয়েছে আজাদ সাহেব। রুপ খালি হাতে এখানে এসেছে কিন্তু ঘরে রুপের থাকার জন্য সকল আসবাবপত্র রয়েছে। খাট থেকে শুরু করে সোফা, আলমারি সব রয়েছে কামরায়। রাইসা এখন ঘুমুচ্ছে খাটে পড়ে।

রুপের টিউশনি দশটায়। সকাল সকাল এখানে চলে আসায় সময় আছে এখনও অনেক। কামরা থেকে বের হয়ে রুপ সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে গেলো। ছাদে প্রবেশ করতে’ই রুপের চোখের সামনে দৃশ্যমান হলো ছাদে উন্মুক্ত শরীরে পুষ আপ করা নাদিফের উপর। রুপ এই প্রথম কোন পুরুষের রুপের ঝলকানি দেখছে। চোখ বড়ো করে মুখ হা করে দেখছে নাদিফকে। কিয়ৎক্ষণ পর নাদিফের কন্ঠস্বর শোনা গেলো যে নাকি বুকের উপর এক টুকরো রুমাল চেপে ধরে বলছে,

” এই মেয়ে চোখ দিয়ে আমার ইজ্জত খেয়ে ফেলবে নাকি?”

চলবে…………

দারুন ছবিটি আমার প্রাণ প্রিয় Fahim Mahmud Adi ভাই উপহার দিয়েছেন। একরাশ ভালোবাসা ভাইয়ার জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here