রোদেলা লেখা: মাহাবুবা মিতু ৭৭

0
45

রোদেলা
লেখা: মাহাবুবা মিতু
৭৭.

দুপুরে সিমির ননদের বাড়ি থেকে পাঠানো খাবার নিয়ে টেবিলে খেতে বসে ওরা, খেতে খেতে নানান কথা হয় দুজনে, সিমি রোদেলাকে এটা জিজ্ঞেস করে ওটা জিজ্ঞেস করে। কত কি জানার আছে ওর রোদেলার থেকে। রোদেলাও খুশি এমন একজন মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে। এতটুকু বিরক্ত ও হচ্ছে না এসব উত্তর দিতে। বরং এমন একজনই হয়তো খুঁজছে ওর মন ভিতরকার জমে থাকা সব বাষ্প উগ্রে দিতে। ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে ছিলো। মন খুলে কথা বলে হালকা লাগছে ওর। এমন করে মনের আনাচে কানাচের সব কথা নির্দ্বিধায় বলাতে পারা লোকের সংখ্যা খুবই কম ওর জীবণে।

খাওয়া শেষ করে পায়েসের বাটি হাতে নিয়ে বারান্দায় বসলো রোদেলা। সিমি চা বানাতে রান্নাঘরে গেলো। চা ছাড়া ওর দুনিয়া যেন অন্ধকার। রোদেলা কোণের একটা চেয়ারে বসে পায়েসের বাটিটা হাতে নিলো। পায়েসটা খুব ভালো বানিয়েছেন তাঁরা দেখেই বোঝা যাচ্ছে । ঘি এর ঘ্রানে ম-ম করছে, ডেকোরেশনটাও সুন্দর হয়েছে। জাফরান, কিশমিশ, আর কাজু বাদাম দিয়েছে টপিংসে। বড় মামী ঠিক এমন স্বাদের পায়েস বানাতেন। পায়েস মুখে দিতেই তার চেহারাটা ভেসে উঠেছে রোদেলার চোখে। সদাহাস্যজ্বল, স্বাস্থ্যবতী, সুন্দরী, ঘন চুলের বিশাল এক খোপার আটপৌরে এক রমনীর মুখ। রোদেলা ও জীবণে এমন মানুষ কমই দেখেছে। অসম্ভব ধৈর্যশীল একজন মানুষ। কত বিবাদ তাকে নিয়ে, তবুও তিনি বিবাদহীন। কারো সাতেপাঁচে নেই। নিজে নিজের কাজে ব্যাস্ত।

এক কথায় কেউ যদি তাকে বর্ণনা করতে বলে, তবে রোদেলা বলবে- সদা হাস্যজ্জ্বল বর্ণচোরা
এক রমনী। মুখে হাসি লেগেই থাকতো। অথচ দুঃখ কষ্টের পাহাড় তার বুকে। মা মা*রা গেলেন জন্ম দিয়ে, বাবা মা*রা গেলো আট বছর বয়সে, এত বড় পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও পড়াশোনা বেশীদূর করা হয়নি তার, চাচা-চাচী অল্প বয়সে বিয়ে দিলো নিজের দ্বিগুণ বয়সী একটা লোকের সাথে। তাদের পরিবারে কষ্টে কাটিয়ে তিনি ভেবেছিলেন জাহান্নাম হতে মুক্তি হলো হয়তো।

কিন্তু স্বামী কখনোই চার আনা পয়সার দাম দিতো না তাকে, শ্বশুড় বাড়ির এত বড় সংসার সামলে কখনোই মন পায় নি শ্বশুরী নামক আত্মীয়ের কাছে। ননদরাও লেগেই ছিলো পিঠ পিছনে। একমাত্র ছেলে সেও নিজের বুঝ বুঝে দূরে চলে গেলো। চলে গেলো বললে ভুল বলা হবে, বড় মামী নিজে দূরে সরে গেছে ছেলের কাছ থেকে। অথচ কেও বুঝবে না এত দুঃখ সওয়া লোক তিনি।

একদিন সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডায় হাসতে হাসতে তিনি তার বাবার মৃ*ত্যু*র গল্প বলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার স্কুল শিক্ষক বাবাকে পাকিস্তানিরা কি নৃশংসভাবে হ*ত্যা করেছিলো সেই গল্প। তার হাসি মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই কত ভয়াবহ কাহিনি তিনি বলছেন, অথচ সে গল্প শুনে সবাই কেঁদেছিলো। রোদেলার মনে আছে ও নিজেও ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলো। ছোট বেলা হতে একটার পর একটা কষ্ট তাকে আঁকড়ে রেখেছে জীবনভর। কষ্ট,অপমান, বিচ্ছেদ,দৈন্যতা, শোক কি নেই তার জীবনে। তাই তো তিনি পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ তার মুখ হাসি হাসি সবসময়। মানুষটা শেষ জীবণেও কষ্ট পেয়ে গেলেন। প্রিয়জন হারাবার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা তার ছিলো না হয়তো। তাই তো তিনি চলে গিয়েছিলেন যে বর্ষায় বড় মামা চলে গেলেন সেই বছরেরই শীতের এক সকালে। ঠিক যেন পিঁছু নেয়া বড় মামার।

আগের রাতে নাতাশাকে বলেছিলো নিশাদকে নাকি তার দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। নাতাশা খুব অবাক হয়েছিলো তার মুখে নিশাদের কথা শুনে। কারন তিনিই নিশাদের নাম নিতে বারন করেছিলেন কৃষ্ণচূরায়। সেই তিনি,

নাতাশার মনে কু ডেকেছিলো, তাই ও সেদিন মায়ের সাথে ঘুমিয়ে ছিলো। ম*রা*র ঘুম বলে এক ঘুম নাকি আছে, সেই ঘুম ঘুমিয়েছিলো সেদিন নাতাশা।

শীতের সকাল তাই দেরিতে উঠে বাড়ির সবাই। নাতাশাদের বাড়িতে কারো স্কুলে, কলেজ, অফিস যাওয়ার তাড়া ছিলো না।

নাতাশা সেদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে জায়নামাজে ওর মা সেজদায় উপুড় হয়ে আছে। প্রথমে ভেবেছিলো নামাজ পড়ছে হয়তো। ওয়াশরুম ঘুরে এসেও যখন নাতাশা দেখলো তিনি উঠছিলেন না, তখন নাতাশা কাছে গিয়ে ডাকতেই বড় মামীর শরীর এলিয়ে পরে জায়নামাজে।

সারা জীবণ কষ্ট সহ্য করা মানুষটা কাওকে কিছু বললো না, কাওকে কোন কষ্ট, যন্ত্রণা, অসুস্থ তার সেবা করার সুযোগ কিচ্ছু দিলো না, চলে গেলেন পরপারে, একেবারে নিভৃতে।

মনটা উদাস হয়ে গেলো ওর এসব ভেবে। গলাটা ধটে এলো রোদেলার। গলা দিয়ে আর এক চামচ পায়েসও নামলো না। আধখাওয়া পায়েসের বাটিটাকে টেবিলে রেখে আকাশের দিকে তাকালো ও। আনমনে বললো – আল্লাহ তুমি আমার বড় মামীকে জান্নাতবাসী করো, বড্ড অভাগা ছিলেন তিনি।
আমীন….

হঠাৎ বারান্দায় রাখা পাখিটা তারস্বরে ডেকে তার অস্তিত্বের জানান দিলে । এর আগের বার খেয়ালই করে নি পাখিটাকে। তাই হয়তো এভাবে ডেকে উঠলো সেটা, পরিচিত হতে। উঠে দাড়িয়ে খাঁচার কাছে গেলো রোদেলা।

বারান্দাটা সুন্দর , এককোণে প্লাস্টিকের স্টাইলি ভেন্ট্রাল আর্ম চেয়ার রাখা, তার মাঝখানে রাউন্ড সেন্টার টেবিল তার টপিং এ গ্লাস। ফ্লোরে আর্টিফিশিয়াল ঘাসের কার্পেট,গাছগুলো বারান্দার রেলিং এ ঝুলানো। সিমিকে তখন জিজ্ঞেস করায় ও বলেছিলো ওর ছেলের যন্ত্রণায় নিচে গাছ রাখা বাদ দিয়েছে ।

এমন সময় ফোনটা বেজে উঠলো। সুফিয়ানের ফোন। মাত্র কাজ শেষ করে বের হয়েই ফোন করলো রোদেলাকে। মামলার রায় আগামীকাল দিবে। সবকিছু বিবেচনা করে সুফিয়ান বললো- ইনশাআল্লাহ, রায় আমাদের পক্ষেই হবে। আগামীকাল রাতেই রওনা দিবে, পরশু সকালে ঢাকা পৌঁছাবে ও তাও জানালো। রোদেলা বললোও এখনো ও সিমিদের বাসায়ই আছে। সন্ধ্যার আগে বাড়ি পৌছে যাবে। মন খরাপের তারটা কেটে দিলো সুফিয়ানের মোবাইল কলটায়। ততক্ষণে সিমি চা নিয়ে হাজির। সুন্দর এই বারান্দায় বসে সিমির সাথে আরেক দফা গল্প জুড়লো রোদেলা। চা খেতে খেতে সিমিও বললো ওর যাপিত জীবণের গল্প। ওর মামাতো ভাইকে ও পছন্দ করতো, কিন্তু বিয়েটা হলো অন্য করো সাথে। একপ্রকার বাধ্য হয়ে এ বিয়েটা করেছিলো সিমি। সে গল্প রোদেলার জানা। বর মানুষটা অনেক ভালো, তবে বড্ড সন্দেহ প্রবণ।

কথা বলার মাঝে এক ফাঁকে আঁকিবের কথা উঠলো। ও দেশে ফিরে এখন বেসরকারি এক ভার্সিটিতে পড়ায়। বিয়ে করেছে, ছেলেও হয়েছে একটা। এসব খবর রোদেলার অজানা। ভালো আছে এই তো ভালো খবর।
এসব অতীত ও ভাবতে চায় না।

সিমি কি ভেবে যেন হঠাৎ জানতে চাইলো শোভনের কথা। বললো-
: নাতাশার এক দেবর, কি যেন নাম, তোকে যে বিয়ে করতে চেয়েছিলো, দেশে ফিরে দেখা হয়েছে?

অবাক হলো রোদেলা। এসব ব্যাপার সিমির জানার কথা না। শোভন ওর জীবণে মোটা দাগে অস্তিত্ব নেয়া একজন। সত্যি বলতে মনের ভিতরে একটু একটু করে ওর প্রতি ভালোবাসার জন্ম হতে শুরু হচ্ছিল তখন। রোদেলা আজও হঠাৎ হঠাৎই ভাবে শোভনের সেইসব পাগলামীর কথা, একা একা হাসে মাঝে মাঝে। শোভন রোদেলাকে সত্যি ভালোবাসতো তা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি রোদেলা এখন ভালোবাসে সুফিয়ানকে সত্যি তাও। নদীর গতিপথ যেমন বদলে যায় দূর্যোগে তেমনি শোভনও ওর জীবণের গতিপথ বদলে ফেলেছে। এতে কোন দোষ দেখেনা রোদেলা। কারন ঐ সম্পর্কে যা কিছু ছিলো সব একতরফা। তাই দোষ নেই জীবণের এই গতিপথ বদলানোয়।

দেশে ফিরার পর দেখা হয়েছিল একদিন শোভনের সাথে। কোন প্লানিং দেখা করা না, হঠাৎ দেখা টাইপ। এক বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান শাখায় টাকা তুলতে গিয়েছিলো ও। সেখানেই হঠাৎ দেখা ওর সাথে। আগে থেকেই লাইনে দাড়িয়ে থাকা শোভন নিজ থেকে এসে ওর কাজটাও করে দিয়েছিলো সেদিন । ফিরবার পথে এক কাপ কফির দাওয়াত দিয়েছিলো রোদেলা নিজেই, কৃতজ্ঞতা প্রকাশে, শোভন সেটা সাদরে গ্রহণ করেছে। একটা ক্যাফেতে বসে কফি খেয়েছিলো দুজনে। বলেছে অনেক না বলা কথাও। কথাগুলো বলা জরুরী মনে করেই এ সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছিলো রোদেলা। অকপটে বলেছিলো ওর ভালোবাসা যে সত্যি ছিলো তা জানা সত্ত্বেও কেন রোদেলা ফিরিয়ে দিয়েছিলো শোভনকে৷ প্রথম ধাক্কায় কিছুই বলে নি শোভন। মাথা নিচু করে কেবল শুনেছিলো। রোদেলার জীবণের এমন দূর্দশা এসেছিলো ওর হাত ধরেই। তাই ও অপরাধী ভাবতো নিজেকে। নিজের এ কথাগুলো বলতেই রোদেলা উল্টো ধন্যবাদ দিয়েছিলো শোভনকে। বলেছিলো তুমি না জেনেই আমার জীবণের অনেক বড় একটা পরিবর্তন করে দিয়েছো। ইশ্বরের হয়তো এটাই ইচ্ছে ছিলো যে তিনি আমার জীবণের খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালটা তোমাকে দিয়েই দেওয়াবেন।

শোভনের সাথে দেখা হওয়ার কথা সুফিয়ান জানে। রোদেলা নিজ থেকেই বলেছে ওকে। কারন ও চায় না ওদের সম্পর্কের মধ্যে কোন রকম ফাঁক-ফোঁকর থাকুক। সিমিকে শোভনের কথাগুলো বলে স্মৃতি চারণ করলো রোদেলা । ভালো আছে ও নিজে সুফিয়ানকে পেয়ে। শোভনও ভালো থাকুক সারাকে নিয়ে।

কথায় কথায় বেলা বয়ে গেলো। রোদেলাকে ফিরতে হবে সন্ধ্যার আগে। সুফিয়ান বাড়িতে নেই, তাছাড়া ও সুফিয়ানকে বলেছে সন্ধ্যার আগে ফিরবে। তাই বাকী কথা তুলে রেখে সিমিকে ওদের বাড়িতে যাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে বিদেয় নেয় রোদেলা।

ফিরবার সময় ভীষণ ভালো লাগে ওর। দিনের এ সময়টায় রিকশায় চড়ার মজাই অন্যরকম। এর আগে বহুবার হয়তো এমন সময়ে রিকশায় চড়েছে ও। কিন্তু এমন ভালোলাগা এর আগে উপলব্ধি হয়নি কখনো। ফোনটা বের করে কোন কারন ছাড়াই একটা টেক্সট করে সুফিয়ানকে-
“অনেক ভালোবাসি তোমাকে প্রিয়”

মিনিট তিনের মধ্যেই প্রতিত্তোরে সুফিয়ান লিখেছিলো- “আমিও”

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here