রোদেলা লেখা: মাহাবুবা মিতু পর্ব: ৮৪

0
31

রোদেলা
লেখা: মাহাবুবা মিতু
পর্ব: ৮৪

খুব সকাল সকাল উঠে পরেছে রোদেলা। পাশে তাকিয়ে দেখে সুফিয়ান তখনো ঘুমুচ্ছে। সাবধানে গা থেকে কম্বল সরিয়ে খাট থেকে নিচে নামে ও। উঠেই প্রথমে যে কাজ করেছে তা হচ্ছে হ্যান্ডব্যাগ গুছগাছ। সন্ধ্যা নাগাদ বের হতে হবে। রেজওয়ান, সুফিয়ান আর রোদেলার পাসপোর্ট, টিকিট সব রোদেলার কাছেই। প্রিসিলার পাসপোর্ট করা হয়েছে ওর বিয়ের পরপরই। সে পাসপোর্ট টাও ওর কাছে। চারটা পাসপোর্ট একসাথে রেখে ছবি তুললো রোদেলা। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ চাইলে এই পাসপোর্ট গুলোর মতো একসাথে থাকবে ওরা। এটাই সবচেয়ে খুশির কথা ওর জন্য।

সুফিয়ান বলেছে সবকিছু মিলিয়ে মাস তিনেকের ব্যাপার। ওরা খুব চেষ্টা করেছে প্রিসিলাকে ওদের সাথেই নিয়ে যেতে। কিন্তু কাগজপত্রের জটিলতায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

ছবি তোলার পর কেমন থুম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে রোদেলা। আনমনে কিছু ভাবছে যেন। হঠাৎ কাঁধে হাত রাখে সুফিয়ান। আচমকা পিছন ফিরতে সুফিয়ান খেয়াল করো ওর চোখ দুটো ভেজা। খুব যত্ন করে চোখের পানি মুছে দেয় সুফিয়ান। রোদেলা অবাক হয় ও জানেই না চোখ ভিজেছে ওর। এটা কেমন করে হলো। এরপর সুফিয়ান জিজ্ঞেস করে –
: ” চলে যেতে হচ্ছে বলে মন খারাপ?”
কি বলবে উত্তরে?এ প্রশ্নের জবাব নেই ওর কাছে,
: “তুমি এমন ভার হয়ে বসে আছো রোদ, প্রিসির অবস্থাটা ভাবো একবার”
: ” আমি ওর কথাই ভাবছি”
: “মাত্র তো তিন-চার মাস, এরপর ‘হাম সাথ সাথ হে’ ”
সুফিয়ানের এ কথা বলার ভঙ্গি দেখে হেসে দেয় রোদেলা।
: ” জলদি রেডি হও, আমরা আজ বাইরে নাশতা খাবো”
ঘর থেকে বের হয়ে অনিমা, নাতাশা, পিয়াস আর নোভেলকে ডাক দেয় ও, পিয়াসকে বলে প্রিসিলাকে ডেকে তুলতে। অনিমা গত রাতে এসেছে এ বাড়িতে, ওর বর আসবে বিকেলে।

নাসিমাকে বাইরে যাবার ব্যাপারটা বলতে যায় ও। ঘরে না পেয়ে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে নাসিমা রসুনের কোয়া গুলোর খোসা ছাড়াচ্ছে এক এক করে, ছাকনিতে ধোয়া কালো জিরা। তারমানে কালোজিরা ভর্তা হবে । চুলায় বিশাল পাতিলে কি যেন রান্না করছেন তিনি, পাশের চুলায় দুটো গোল বেগুন পুড়ছেন। এরমধ্যেই তিনরকমের ভর্তা তৈরী শেষ। এ অবস্থায় কথাটা কিভাবে বলবে ও তাকে? বললে কোন কিছু না শুনে না বুঝেই নিশ্চিত রেগে যাবেন তিনি। তাই রোদেলা সে ঘর থেকে কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলো নিঃশব্দে। খুব সম্ভববত খুদে ভাত তৈরী করেছেন তিনি সবার জন্য ।

ঘরে এসে সুফিয়ানকে জানাতেই বললো-
: ” ওদেরকে তো বলে ফেলেছি বাইরে খাওয়ার কথা, এক কাজ করি ওদেরকে নিয়ে যাই, হালকা পাতলা না হয় আমরা খেলাম, পরে দশ-এগারোটার দিকে আবার….. ”
: “যাওয়ার কথা আমি মাকে বলতে পারবো না বাবা…!”
: “সমস্যা নেই, আমি বলছি”

এ বলে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দেয় সুফিয়ান। রোদেলা মনে মনে ভাবে মা সুফিয়ানকে নিশ্চয়ই কিছু বলবেন না। রোদেলার জীবণের এমন ছোট-বড় সকল সমস্যার সমাধানের একমাত্র নাম “সুফিয়ান”। এই এক ব্যাপারে খোদা দু হাত খুলে দিয়েছেন ওকে, এজন্য ও সবসময় কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে।
“আলহামদুলিল্লাহ…!
আল্লাহুমা বারিক লাহা”

ওরা সবাই মিলে চলে যায় পুরান ঢাকার এক হোটেলে। সেখানে ফজরের আযানের আগ থেকে খাসীর নেহারী বিক্রি শুরু হয়, সাতটা বাজলে নাতশা শেষ হয়ে যায়। ওরা সবাই বের হতে হতে ঘড়িতে এখন ছয়টা বিশ। রিকশা করে সবাই রওনা দিলো। প্রিসিলার মুখ ভার, ও বলেছিলো যাবে না, কিন্তু রেজওয়ান ওকে বুঝিয়ে সাথে করে এনেছে।

ওরা সবাই যখন পৌঁছালো নাশতা তখন শেষের দিকে। পিয়াস বললো এত সকালে এলাম তবুও শেষের দিকে!
পরিচিত দোকানী হওয়ায় এবং সুফিয়ানকে দেখেই চিনতে পেরে ওদেরকে অনেক খাতির করলো দোকানী । অনেকদিন পর এলো এখানে, আগে এখানে প্রায়ই নাশতা খেতো সুফিয়ান।

নাশতা খাওয়া শেষে ওরা ঘুরতে বেরুলো একটু পুরান ঢাকায়। শুক্রবার হওয়ায় রাস্তাঘাট ফাঁকাই বলতে গেলে। আশ্চর্যের কথা নাশতা খাওয়ার পর রেজওয়ান আর প্রিসিলা উধাও। সবগুলো রিকশা সুফিয়ান নিজে ঠিক করলো কিন্তু মাঠা খেতে নেমে দেখে ওরা দুজন নাই। রোদেলা ফোন করে খোঁজ নিতে চাইলে সুফিয়ান বলে-
” তুমি তোমার বোনটাকে আর বড় হতে দিলা না, ও কার সাথে আছে? ওর বরের সাথেই তো? এত ভাবার কি আছে আজব!

সত্যিই তো! ও ওর বরের সাথেই আছে, তাহলে এত ভাবার কি আছে। এখানে সবার সাথে দলাদলি না করে একান্তে সময় কাটাতে গেছে দুজনে। আবার কবে দেখা হয় দুজনে, ”
: “ভালোই করেছে ভেগেছে এখান থেকে ” বলে সুফিয়ান।
: “হুম, তা ঠিক,
: “আমরা সবাই হেঁটে বাড়ি ফিরবো কিন্তু, বাসার খুদে ভাত খেতে” সুফিয়ান আওয়াজ করে কথাটা বলতেই হেসে উঠে সবাই।

নাশতা খাবার পর হোটেল থেকে বেরিয়ে সবাই ঘুরতে রিকশা নিলো। ইসলামপুরের মোচড় ঘুরে সবগুলো রিকশা যখন ডানে মোচর নিলো রেজওয়ান তখন রিকশাওয়ালাকে বললো বামে যান মামা। প্রিসিলা বললো বামে না তো ওরা সবাই তো ডানে গেলো। প্রিসিলার হাত শক্ত করে ধরে রেজওয়ান বললো বামেই যান মামা। প্রিসিলা তাকিয়ে থাকে রেজওয়ানের দিকে, রেজওয়ান ব্যাস্ত ড্রাইভারকে ডাইরেকশন বলতে। যেন রিকশাওয়ালা রাস্তাঘাট কিছুই চিনে না। তাঁতি বাজারের গলি দিয়ে ঢুকে রিকশা জজকোর্টের পাশের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে আবার বামে মোচড় নিলো। রায়সাহেব বাজার রোড ধরে পৌঁছে গেলো ওয়ারী বলধা গার্ডেনে। রিকশা যেন একটানে পৌঁছে গেলো এখানটায়। রিকশা ভাড়া দিয়ে ওরা ভিতরে ঢুকলো। এখানটায় এর আগেও একবার খুব ছোট্ট বয়সে এসেছিলো প্রিসিলা। নাতাশা যখন সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজে পড়তো তখন।
রেজওয়ান তখনো প্রিসিলার হাত শক্ত করে ধরা, যেন প্রিসিলা কোন বাচ্চা মেয়ে, হাত ছাড়লেই হারিয়ে যাবে।

বলধা গার্ডেনে ঢুকতেই একটা পুকুর আছে, সেখানটা ঘেঁষে সুন্দর একটা জায়গায় বসলো ওরা। অনেক মানুষ এখানে মর্নিং ওয়াক করতে আসে। তাদেরকে দেখতে ব্যাস্ত প্রিসিলা। যেন বলার কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না ও।

রেজওয়ান ওর হাত দুটো ধরলো, প্রিসিলা তাকালো ওর দিকে, চোখ দুটো পানিতে পূর্ণ পলক ফেললেই গড়িয়ে পরবে তা। একটা মুচকি হাসি হাসলো রেজওয়ান ওর চোখে চোখ রেখে। বললো –
: তুমি এমন ভাব করছো যেন আমি সারাজীবনের জন্য চলে যাচ্ছি, আমাদের আর দেখা হবে না।
নিশ্চুপ প্রিসিলা চোখ ফিরিয়ে ওড়নার এক কোণা দিয়ে চোখ মুছে। রেজওয়ান তখনো তাকিয়ে ওর দিকে, রেজওয়ান দু হাত দিয়ে ওর মুখটা ধরে ওর দিকে ফিরায়, চোখ দুটো বন্ধ প্রিসিলার। অশ্রু লুকানোর ব্যার্থ চেষ্টা।
: আচ্ছা, এমনও তো হয় কতো, উপার্জনের জন্য বউ রেখে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বামীরা প্রবাসে যায়, যায় না?
তাদের কথা ও ভাবো একটু, তিনটে মোটে মাস। দেখবে চোখের পলকে চলে যাবে। তাছাড়া তুমি কি ভেবেছো তোমাকে ছাড়া থাকতে আমার বুঝি কষ্ট হবে না…?
আমি তো ভেবেই মরছি এ তিন মাস গুগল খুঁজে খুঁজে রিসার্চের ইনফরমেশন খোঁজর কাজগুলো আমাকে কে করে দিবে?” বলেই হেসে দেয় রেজওয়ান।
প্রিসিলা হেসে ওর পিঠে কিল দেয়, বলে – “এই আপনার
মিস ইউ…!”

আরেহ্ লাগছে তো, খাওয়াদাওয়া করো না গত তিনদিন, এত শক্তি আসে কোত্থেকে?
মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে ও। রেজওয়ান বলে-
: “আমি তোমাকে কতটা মিস করবো তা আমি প্রকাশ করতে পারবো না হয়তো, কিন্তু তাই বলে করবো না তা কিন্তু না। আমার জীবণে প্রেম ভালোবাসা সব ঐ পড়াশোনার সাথেই ছিলো এতদিন । তুমিই আমার জীবণের একমাত্র প্রেয়সী, সে দিক দিয়ে তুমি কিন্তু সেই লেভেলের ভাগ্যবান। আনকোরা মনের একটা স্বামী পেয়েছো”
: “আর আপনি বুঝি ভাগ্যবান নন?”
: “কে বলেছে সে কথা! আমিও ভাগ্যবান, মিষ্টি একটা বাচ্চা মেয়েকে বউ হিসেবে পেয়েছি, যাকে ভালোবাসা ‘অ আ ক খ’ এর মতো শিখাতে পড়াতো হচ্ছে। তবে তুমি তো আমার আগেও মন অন্য একজনকে দিয়েছিলে, এই এক দুঃখ”
এবারও হেসে প্রিসিলা কান টানতে যায় রেজওয়ানের। বলে-
: আজব! কি এক কথা শুনছে, এখনো তা রেকর্ডের মতো বাজায়, বাজে লোক…”
: “কেন ছোট খালামনি বললো না সেদিন, তার কোন ননদের ছেলে নাকি ছোটবেলায় বলেছে বিয়ে করবে তোমাকে, তুমিও নাকি ভালোবাসিস ওকে? জিজ্ঞেস করলে হ্যা বলতে”
: “আরে গাধা উনি আমার চেয়ে কম করে হলেও পনেরো-বিশ বছরের বড় ছিলো তখন, আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে তাই বলতাম, তার মানে কি এই হলো?
: “ঐ একই হলো”
: ” ধ্যাত…!”
বলেই উঠে পরতে নেয় প্রিসিলা, রেজওয়ান ওর হাতটা ধরে ফেলে উঠবার আগেই, বলে-
: “রাগলে তোমার নাকমুখ লাল হয়ে যায় জানো? তখন তোমাকে দেখতে ভীষণ মিষ্টি লাগে”
: “হয়েছে…, আর আহ্লাদ দেখাতে হবে না”
: কি দেখাবো তাহলে?
আচ্ছা এক কাজ করি আমি যে কত দীর্ঘ চুমু খেতে পারি তা আজ দেখাই তোমাকে, কাছে আসো…
: ” ছিঃ রেজওয়ান! আপনি ভীষণ অসভ্য, আপনাকে আমি ভদ্র লোক ভেবেছিলাম ”
: ” আমি তো ভালো লোকই, খারাপের কি দেখলে? আর আমি যদি অভদ্র হই, তাহলে আমার বাবা-মা, তোমার বাবা-মা, এ পৃথিবীর সকল বাবা মা-ই অভদ্র, ”
কেমন চোখে তাকায় যেন প্রিসিলা, তারপর বলে-
: “আপনার রিসার্চার না হয়ে এডভোকেট হওয়া উচিত ছিলো”
: ” তাই!”
: ” হুম”
: ” আমি কিছুই হতে চাই না এখন, আমি শুধু তোমার স্বামী হতে চাই প্রিয়, কাছে এসো ”
ওকে দূরে রেখে খিল খিল করে হাসে প্রিসিলা। এসব যে ওর মন ভালো করার কৌশল তা বুঝতে পারলো না ও।
রেজওয়ানের এমন বাচ্চামী বাইরের কেউ বিশ্বাস করবে না। বাইরের সবাই জানে ও গুরুগম্ভীর একটা মানুষ। কিন্তু ভেতরটা বাচ্চামিতে ভরা। বিয়ের বয়স পাঁচ মাস হওয়া সত্ত্বেও পুরোটা সময় কেবল প্রিসিলাকেই বোঝারই চেষ্টা করেছে। বন্ধু হয়ে কাছে এসেছে ও, কোন তাড়হুড়ো করে নি ও স্বামীগিরি ফলাতে৷ সবাই যদিও মনে করে ওদের প্রেমের বিয়ে, কিন্তু সত্যিকারের প্রেম ওদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিয়ের পরে। প্রিসিলা যেমন বাচ্চা মানসিকতার তেমনি বাচ্চা হয়ে গেছে ও প্রিসিলার কাছে। শরীরের বোঝাপড়ার চেয়ে মনের বোঝাপড়ার দিকটা মজবুত করেছে ও।

প্রিসিলাকে হাসতে দেখে রেজওয়ান ও খুশি হয় মনে মনে। অবাক চোখে প্রিয়সীর হাসি দেখে ও। কাছ থেকে আবার কবে এমন হাসি দেখার সুযোগ করে দিবে ইশ্বর তা কে জানে। হাসি থামিয়ে রেজওয়ানের কাঁধে মাথা রেখে প্রিসিলা বলে-
: ” আমার আপনাকে ছেড়ে থাকতে খুব কষ্ট হবে জানেন”
: ” আমার চেয়ে বেশী? তুমি তো আমাকে ভালোই বাসো না, বোনের কাছে থাকতে পারবে বলে….
(প্রিসিলা রোদেলার পাঁচ বছরের ছোট, আর সুফিয়ান রেজওয়ান এর দুই বছরের বড়। সেদিক থেকে রোদেলা সুফিয়ান দুজনের বয়সের পার্থক্যের চেয়ে, প্রিসিলা রেজওয়ান এর বয়সের পার্থক্য বেশী। যদিও ওদের দুজনকে বেশ মানিয়েছে, বয়সের পার্থক্য তেমন বোঝা যায় না, প্রকৃতি তো মেয়েদেরকে আগেভাগেই পরিণত করে দেন। সত্যি বলতে প্রিসিলা এ বিয়েতে রাজি হয়েছিল শুধুমাত্র বোনের কাছে থাকবে এই আশায়। এ কথাটা একবার কথায় কথায় বলেও ফেলেছিলো প্রিসিলা। তা নিয়ে রেজওয়ান খোঁচা দেয় মাঝে মাঝে ওকে)

রাগান্বিত চোখে তাকায় প্রিসিলা রেজওয়ান এর দিকে, বলে
: “আরেকবার এ কথা বললে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দিবো কিন্তু”
: “বাপ রে.! ভয় পেয়েছি আর কখনো বলবো না ”
বলবার ভঙ্গি দেখে হেসে দেয় প্রিসিলা, এরা দুই ভাইই এমন।

রেজওয়ান ওকে সিরিয়াস হতে দিতে চায় না বিধায় এমন মজাগুলো করে। এরপর কিছু সময় বসে থেকে উঠে পরে ওরা। ঘড়িতে সময় তখন সকাল আটটা।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here