রোদেলা লেখা : #মাহাবুবা_মিতু ৮৩

0
32

#রোদেলা
লেখা : #মাহাবুবা_মিতু
৮৩.

এরপরে সময় গুলো কেটেছে দ্রুত। ফুরফুরে একটা আমেজ নিয়ে রাজশাহী থেকে ফেরার পর রোদেলা কোন রকম অশান্তিতে পরতে চায় নি। এজন্য অস্বস্তিকর কিছু ঘটলেও নিজের পিঠ বাঁচিয়ে চলেছে ও। এত বছরে ও বুঝে গেছে ওর মা কিছুতেই বদলাবে না। সাইকোয়েট্রিকস এর কাছে কাউন্সিলিং করে যদিও কিছুটা উন্নতি হয়েছিলো নাসিমার আচরণে। যার প্রভাব দেখা গিয়েছিলো রাজশাহীর দিন কয়েকটাতে।

তার কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন। দ্বিতীয় সেশনে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ডেট আসতেই রোদেলা নিজে আরেকবার তাকে কাউন্সিলিং নিয়ে যেতে আসে কৃষ্ণচূড়ায়, আপত্তি জানায় নাসিমা । কি জানি কি বুঝলেন তিনি। অথচ ফুল সেশনের পেমেন্ট এডভান্স করা। না গেলে টাকাগুলো গচ্চা যাবে।

পাশে বসে থাকা রোদেলার বাবা বললেন –
: ” কাউন্সিলিং আর ঔষধ কেন, ডাক্তারও যদি বেটে খাওয়াস তোর মা-কে তাও কাজ হবে না। ভেতরের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার সব অটো হয়ে গেছে”

পাশে বসে টিভি দেখতে থাকা নাসিমা কটমট রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় রোদেলার বাবার দিকে। হঠাৎ রাগ দেখিয়ে বিরক্ত হয়ে চলে যায় বাবা-মেয়ের সামনে থেকে।

নাসিমা চলে গেলে রোদেলার বাবা বলেন-
: ” শোন কিছু মানুষকে আল্লাহ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন এলেমেলো, দিশেহারা ভাবে, তারা ভয়ংকর রকমের খারাপ থাকে, তবে জীবণের একটা সময় আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াত দান করেন, তারা ভালো হয়ে যায়, আল্লাহর পথে ফিরে আসেন। আর এক শ্রেণীর মানুষের কপালে সিল মারা থাকে, এরা যত কিছুই হোক, নামায কালাম যতই পড়ুক না কেন জীবণেও বদলায় না। তোর মা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক। ও বদলাবে না জীবণেও ”

কথাটা শুনে বাবার দিকে আহত চোখে তাকায় রোদেলা। মা সম্পর্কে এমন কথা তিনি তার মুখ থেকে শুনবেন তা আশা করেন নি। কারন তিনিও তো “দুধে ধোঁয়া তুলসি পাতা” না

মায়ের সব জেনেও রোদেলা শান্ত ভঙ্গিতে বলে-
” একটাবার ভাবো তো সারাটা জীবণ এ মানুষটা কিসের ভিতর দিয়ে গেছেন? এর জন্য কে দায়ী? ”

মেয়ের এমন কথার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না রোদেলার বাবা রোহিজ উদ্দিন। মেয়ের চোখে চোখ রাখতে পারলেন না তিনি, ব্যাস্ত ভঙ্গিতে নামিয়ে ফেললনে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা চোখ জোড়া। রোদেলা কিছু সময় বিরতি নিয়ে বলে

” এসবের জন্য কিন্তু তুমিই দায়ী আব্বা, কথাটা একবার ভেবো দেখো, আমাদের জীবণটা কিসের ভিতর দিয়ে গেছে আমরাই কেবল জানি, তুমি তো সরে গিয়েই বেঁচে যেতে। সাগরে পরতাম আমরা। সত্যিকারের সাগর হলে ম*রে গিয়েও বেঁচে যেতাম । কিন্তু তুমি আমদেরকে সারা জীবণ ব্যাপ্তি যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে নিয়ে গেছো।”

কথা খুঁজে পাচ্ছেন না যেন রোহিজ উদ্দীন। অগত্যা উঠে গেলেন তিনি। কথাগুলো বলা প্রয়োজন করলো রোদেলা কারন এই দুটো মানুষ একজন আরেক জনের প্রতি এমন মনোভাব নিয়ে একসাথে বাস করতে পারবেন না। তাই ও সব জেনেও তাই নাসিমার পক্ষই নিলো। যাতে বাবা তার ভুলটাও বুঝতে পারে।

যদিও ব্যাক্তিগত ভাবে তিনিও অসুখী নাসিমাকে নিয়ে। স্বামী হিসেবে কখনোই প্রাপ্য সম্মানটুকু পান নি তিনি। এমনও হয়েছে ঝগড়ার মধ্যে সবার সামনে নাসিমা বলেছে- “এক স্বামী গেলে আরেক স্বামী পাওয়া যাবে, মার পেটের ভাই চলে গেলে ভাই পাওয়া যায় না” এ কথা বলা মানে প্রকাশ্যে স্বামীকে অপমান করা। এ জিনিসটা কোন দিনও বুঝেন নি নাসিমা । স্বামী আর ভাই দুটোই জীবণের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক । কেওই ফেলনা নন, অসম্মানের নন। স্বামীকে কেন ভাইদের কাছে ছোট করবে, আবার ভাইদেরকে কেন অন্যদের কাছে?
সবসময় এই জিনিসটাই করেন নাসিমা। সংসার আর আত্নীদের মধ্যে সীমারেখা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

দিনের পর দিন ভাই বোনদের সাথে নিজের সংসার আর সন্তানদেরকে গুলিয়ে ফেলেছেন । এখনো চলছে তা-ই। তারা একসময় অনেক করেছেন ওদের জন্য তাই বলে সারা জীবন স্বামী-মেয়েদের এমন হেয় করতে পারেন না তিনি, তাছাড়া ওরাও অন্যভাবে তাদের জন্য ও অনেক করেছেন, ভালোবেসেছে অকৃত্রিম ভাবে, কৃতজ্ঞত থেকেছে সারাটা জীবণ। তা কিন্তু কেউ বলেও না, তারা শুধু যেটা করেছে তাই বলে।

এই তো সেদিন নাসিমার ছোট বোন অকপটে বলে ফেললো গ্রাম থেকে এক আত্নীয়ের সামনে, বুঝলেন খালা – কম তো করলাম না সবার জন্য, হাতেপাতের সব দিলাম, দিন শেষে বিপদে পরে মানুষ চিনলাম।

তিনি তার স্বামীর জেলখানায় যাওয়ার ব্যাপারটা ইঙ্গিত করে বলেছিলেন এ কথা। পাশে বারান্দায় শুকানো কাপড় নিতে এসে এ কথা শুনতে পায় নাসিমা । অথচ তাদের ঐ দুর্দিনে নাসিমা তাদের পাশে ছিলেন, সকাল বিকাল দু’বেলা যেতেন বোনের বাসায়। সে-সব দিনগুলোতে ঘরের বাজার, বাসা ভাড়া নাসিমা আর ওর মেয়েরাই ব্যাবস্থা করেছেন। সেই তিনিই কেমন করে কথাগুলো বললেন বাইরের লোকদের সামনে৷ এ কথা শুনে নাসিমা রেগে আগুন। সেই রাগ ঝাড়লেন তিনি প্রিসিলার উপর। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও কি এক ছুঁতোয় বকেছিলে প্রিসিলাকে অকথ্য ভাষায়। মেয়েকে মেরে বোনকে বোঝানো আরকি।

কথাগুলো ছোট খালামনি বলেছেন বড় থাকার জন্য। যে সারাজীবন মানুষকে সাহায্যই করলেন, কিন্তু নিজে এত বিপদে পরা সত্ত্বেও কারো সাহায্য নেন নি। এমন একটা ভাব ফুটে উঠেছে তার কথায়।

এ ব্যাপার নিয়েও কথা কাটাকাটি হয়েছিলো রোদেলার সাথে নাসিমার রাজশাহী যাওয়ার আগে। এই মা-মেয়ে কথা বললেই মাসের ত্রিশ দিনে ষাট বার ঝগড়া হয়। নাসিমা নিজে যা ভাবে তাই ঠিক। এদিকে রোদেলা অকাট্য যুক্তি দিয়ে তার ভুল ধরিয়ে দিলো তো গেলো লেগে মা-মেয়ে। নাসিমার পা কাটার আগে যে এক মাস দশদিন কথা বন্ধ ছিলো মা-মেয়ে ও দেশে ফেরার পর সেটাই তাদের ঝগড়া না লাগার দীর্ঘ সময়। যত যাই হোক তার ভাইবোনই সঠিক। তাদেরকে কিছুই বলেন না তিনি, প্রতিবাদও করেন না। বলেন তিনি ওদের কাছে ধরা। ধরাধরির ব্যাপারটা ওর বাবা-মায়ের বোঝা। তা কেন ওরা বইবে। তবুও সারাটা জীবণ ওরা নত থেকে, কৃতজ্ঞ থেকে, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে, বাদীর মতো খেটে শোধ করার চেষ্টা করেছে। তবুও কিছুই করা হয় নি তাদের। এই এক কষ্ট

আরেক দিকে নাসিমা ভাবেন ” দুনিয়ার সাবই তাকে ভালোবাসে, ভালো জানে এক তার পরিবারের মানুষগুলো ছাড়া” এ ধরনাটা তার বদ্ধমূল। এটা আরেক কষ্ট।
হায়রে কষ্ট…….!

ওদের বন্ধুদের মধ্যে কারো স্বামী ভালো না, কারো ননদ শ্বাশুড়ি, কারো বর বা চরিত্রহীণ, কেও বা কুড়ে। কিন্তু রোদেলা প্রিসিলা ওদের দু-বোনের স্বামী, শ্বশুরবাড়ি সংক্রান্ত কোন কষ্ট, ঝামেলা কিংবা পেরেশানি নেই। ওদের যত কষ্ট ওর বাবার বাড়ির মানুষদেরকে নিয়ে।

ডাক্তারের কাছে না যাওয়ায় দুবোন ওদের বাড়িতে ফিরে আসে রিকশায় করে। রিকশায় রোদেলা ওকে বললো
: ” আমরা যাবার পর যতদিন সময় লাগে কাগজপত্র তৈরীতে ততোদিন না হয় তুই কৃষ্ণচূড়ায় গিয়ে থাকিস”
কথাটা শুনে যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পরে প্রিসিলার। ও একথা একবারের জন্য ও ভাবে নি। এ কথা শুনে বলে-
: ” না না, দরকার পরলে আমি একা থাকবো এ বাড়িতে, তবুও ঐ বাড়িতে যাবো না, তোরা চলে যাবি সে যন্ত্রণায় আমি কাতর থাকবো, তার উপর মায়ের এসব আমি নিতে পারবো না”
: “এভাবে বলিস না”
: ” আপা আমি এখন এসব সহ্য করতে পারবো না”
: ” বাবার বাড়ি এত কাছে থাকতেও তুই একা এত বড় বাড়িতে থাকলে মানুষ খারাপ বলবে লক্ষ্মী বোন আমার, মাত্র তো কয়েকটা মাসের ব্যাপার”

নিরুত্তর তাকিয়ে থাকে প্রিসিলা রোদেলার দিকে। রোদেলা ঠিক বুঝে রেজওয়ান চলে যাবে সে কষ্টে ও কাতর, তার উপর এমন কষ্ট ওকে দিতে চায় নি রোদেলা, কিন্তু উপায়ও তো নেই আর কোন।

সামনের শুক্রবার ওদের ফ্লাইট। দাওয়াত খাওয়ার পর্ব মোটামুটি শেষ হয়েছে। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়েছে ওরা।
ওরা সবাই চলে গেছে কৃষ্ণচূড়ায়। সেখান থেকেই যাবে এয়ারপোর্টে। প্রিসিলাকে সেখানে রেখে আসতেই এ কাজটা করে ওরা। যাতে ওরা চলে যাবার পর একা বাড়িতে খারাপ না লাগে ওর।

শেষের কটা দিন স্বাভাবিক থাকতে চেয়েছে রোদেলা সবার সাথে। সবাইকে ডেকে আনার জন্য নাসিমা তো রয়েছেই। মেয়ে চলে যাবে তাই সবাইকে ডেকে পাঠান তিনি। যাতে সবার সাথে কিছু ভালো সময় কাটে। বাড়ি ভর্তি মানুষ, নাসিমা ব্যাস্ত রান্নায়। কিছুটা সময় যে একান্তে কাটাবে মেয়ে-জামাইদের সাথে সে ভাবনা হয়তো তার মাথায়তেই নেই।

মন খারাপ করে বসে আছে রোদেলা। সবকিছু মিলিয়ে মন খারাপ ওর। কোন কারনটাকে দায়ী করবে? বসে বসে রাজশাহীর ছবিগুলো দেখছে ও। এত এত ছবি! হাই রেজুলেশন এর ছবি হওয়ায় এবারের রাজশাহী ট্যুরের সব ছবি ব্যাকাপ করতেই গুগল ফটোসের স্টোরেজ ফুল তবুও একটা ছবি নেই ওর মায়ের সাথে। এমনকি ওর কম্পিউটারে ও না। সব ছবি খুঁজলে ও পাওয়া যাবে না।

কথাটা খেয়াল হতেই দ্রুত খাট থেকে নেমে গেলো রান্নাঘরে। নাসিমা সেখানে সন্ধ্যার নাশতায় পাকোড়া আর কুমড়ো ফুলের বড়া ভাজছে ।

কি মনে করে যেন রোদেলা ফোনের ক্যামেরা অন করলো। রান্নাঘরে ব্যাস্ত নাসিমাকে বললো –
” মা তাকাও তো” ক্যামেরা সেলফি মোডে দিতেই পপ-আপ ক্যামেরাটা তৈরী হলো সেলফি তুলতে। বারান্দায় দাঁড়ানো নোভেল বললো- ” দাঁড়া আপা, আমরাও আসছি” নোভেলের এ ডাকে সবাই দৌঁড়ে এলো সে ছবিতে সামিল হতে। অসময়ে ছবি তোলা আর সবার এমন স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ নাসিমার চোখেমুখে আনন্দ আর বিরক্তির মিশ্রণে একটা অভিব্যাক্তি তৈরী হলো। বললো – কি রং শুরু করে দিলি তোরা? রোদেলার জীবণে আনপ্লানেড সবকিছুর মতো অসাধারণ সুন্দর হলো এ ছবিটাও।

জলন্ত চুলার সামনে খুন্তি হাতে পিড়িতে বসা নাসিমা তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরছে নোভেল। নাসিমা নোভেলকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, হাস্যজ্জ্বল নোভেল তার কাঁধে মাথা রাখা। নাসিমার বাম পাশে পিয়াস, ওর সাথে দাঁড়ানো প্রিসিলা নোভেলের মাথায় থাপ্পড় দিচ্ছে। যেন ছোটবেলার মতো
তাতে প্রকাশ পাচ্ছে – ” ছাড় আমার মাকে” এর বড় বেলার ভার্সন। দুই খালা মনির একজন দাঁড়িয়ে, আরেকজন শীতে গরম পোহাচ্ছে পাশের উনুনে, ছবিতে তার পিছনের দিক উঠেছে, মুখ দেখা যাচ্ছে না। সবাইকে এক ফ্রেমে ধরতে গিয়ে
আরেকটু দূরে সরে রোদেলা। সারাটা জীবণ যেমন দূরে ছিলো মায়ের কাছ থেকে , এ ছবিটাতেও একই ভাবে মায়ের কাছ থেকে দূরে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে তুললো ছবিটা।

এটাই ওর মায়ের সাথে তোলা জীবণের প্রথম এবং শেষ ছবি। একটাই ক্লিক হলো ফোনে। কারন তখনি ফোন এসেছিলো নাতাশার। যে এ ফ্রেমটাতে অনুপস্থিত। যার থাকাটা ছবিটাকে পূর্ণ করতো।

এ এক ছবি যেন রোদেলার পুরো জীবণের সারাংশ, সারমর্ম। অনেক দূরে দাঁড়ানো রোদেলা, মায়ের দখল নোভেলের , প্রিসিলা হাসি হাসি মুখে মাথায় থাপ্পড় দিচ্ছে নোভেলকে। আর বাকী সবকিছু অবজেক্ট।

চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here