#মেঘ_কুঁঞ্জের_ইলশেগুঁড়ি❤️🩹
#Mishka_Moon {লেখনীতে}
||পর্ব_২১||
ইচ্ছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মশা মা’রছে। বিরক্ত লাগছে এখন এই লোক কেনো তাকে ছাদে এনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে মাথায় ঢুকছে না। অনুভব টাউজারে পকেটে হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। পাশে যে কেউ দাঁড়িয়ে আছে এটা বোধহয় সে ভুলেই গেছে। ইচ্ছে এবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
” দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ম’রে টরে গেলেন নাকি??
অনুভব সেখানে দাঁড়িয়েই মাথা কাত করে ইচ্ছের দিকে তাকালো। এতোক্ষণ সে কিছু একটা ভাবছিল। তবে এবার বলার সময় এসেছে। আবারও আকাশের দিকে তাকিয়েই প্রশ্ন করল,
” অহি রঙ্গনকে ভালোবাসে?”
ইচ্ছে চমকে উঠলো। এমন প্রশ্ন করবে সে আশা করে নি। কি বলা উচিত ভাবতে লাগল। অনুভব আবার বলল,
” শোনো মেয়ে একদম মিথ্যা বলার চেষ্টা করবে না।
ইচ্ছে বুঝলো এই লোক সব জানে। গোপন করে লাভ নেই। তাই একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলল,
” বাসতেই পারে দোষের কি?
অনুভব গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” অবশ্যই দোষের।”
“ভালোবাসা কি যাচাই বাছাই করে হয়?”
অনুভব থামলো না উত্তর করল,
“শোনো অপাত্রে ভালোবাসা দান করলে কষ্টই পেতে হয়।”
ইচ্ছে কিছু সময় চুপ থেকে বলল,
” রঙ্গন ভাইয়া কেনো জানি না আমার খারাপ মনে হয়না।”
অনুভব চুপ হয়ে গেলো। ইচ্ছের দিকে আঁড়চোখে তাকালো। তার একটাই কথা মনে হলো, আপন মানুষ যতই খারাপ হোক তাদের আমরা খারাপ ভাবতে পারিনা। তবে প্রকাশ করল না। অনুভব জানে না রঙ্গন কি এখন শুধু বখাটেদের মতোই চলাফেরা করে নাকি আরও খারাপ অভ্যাসও গড়ে তুলেছে!! তবে এবার খোঁজ নিতেই হবে। থমথমে গলায় জবাব দেয়,
“কয়েক দিন দেখেই বলে দিলে সে ভালো?”
ইচ্ছে এ প্রসঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে না তাই কথা ঘুরাতে বলল,” অহির ক্ষ’তি হবে এমন কিছুই আমি করতে দিবো না। বিশ্বাস রাখতে পারেন।”
“আচ্ছা যাও এখন।”
ইচ্ছে গেলো না। সে অন্য কিছু জানতে চায়। সেদিন অনুভব ফোনের রাখার পরে ইচ্ছে দাদাজানের রুমে যায়। কিন্তু ভেতরে ঢুকার আগেই শুনতে পায়। তার দাদাজান আর দাদিজান ইচ্ছের বিয়ের কথা বলছে তাও অনুভবের সাথে। দুই দুই চার মিলাতে তার বেশি সময় লাগলো না। তার মানে এই খুঁইসটা লোক তাকে ইচ্ছে করে কাঁদালো? এর শোধ তো সে তুলবেই। তাই তো সেই রাগ তুলতে অনুভবকে কল করে অনেক কিছু বলে ব্লক করে রেখেছিল। কিন্তু এই লোক ওটা নিয়ে কেনো কিছু বলছে না! তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনুভব ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“যাচ্ছো না কেনো?”
“আপনি আমায় বিয়ে করবেন?
” হুম সেই জন্যই তো প্রস্তাব দিয়েছি।
“আমি যদি রাজি না হই।
” হবে।
“আমি রাজি হবো কেনো মনে হলো আপনার?
অনুভব মুচকি হেসে বলল,
” তুমি যে জিনিস! রাজি না থাকলে এতো সময় তুলকালাম বাঁধিয়ে দিতে সে আমি জানি।”
ইচ্ছে থতমত খেয়ে গেলো। অপমান বোধ করে বলল,
” আপনি কেনো আমায় বিয়ে করতে চান?
” ভালোবাসার জন্য।
ইচ্ছে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইল। এই লোকের সহজ জবাব সে আশা করেনি। উশখুশ করতে লাগলো। একবার চুল ঠিক করতে লাগলো তো আরেকবার ওড়না ঠিক করতে লাগলো। কিছু একটা বলতে চেয়েও বার বার থেমে যাচ্ছিল। অনুভব তাকে বলার সময় দিলো সে বেশ রয়েসয়েই
বলল,
“আচ্ছা একটা কথা বলুন তো!”
“বলো?
“ভালোবাসা পরিমাপ করা যায়?”
“হুম যায়।”
“তাহলে বলুন ভালোবাসার ওজন কত?”
“তোমার ওজন কতো?
” আটচল্লিশ একটু এদিক সেদিক হবে হয়তো। কেনো?”
“আমার ভালোবাসার ওজন আটচল্লিশ কেজি।”
“কেনো?
“তোমার ওজন আটচল্লিশ কেজি তাই।”
“আপনি আমায় সত্যি ভালোবাসেন?”
“কোনো সন্দেহ আছে?”
“অবশ্যই আছে।”
অনুভব কিছু সময় চেয়ে থেকে মুচকি হেসে বলল,
“শোনো মেয়ে তুমি চাইলে তোমার সন্দেহ দূর করতে এখন বিয়ে করতেও রাজি। যাবে নাকি কাজী অফিস?”
ইচ্ছে কিছু না বলে দৌঁড়ে পালালো। অহির রুমের সামনে এসে হাঁপাতে লাগলো। রুমে ঢুকে হাত পা না ধুঁয়েই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিছু সময় চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। কিছু সময় পরে চোখ খুলে উঠে বসলো। তার অবশ্য কারণ আছে হাত পা না ধু্ঁয়ে বিছানায় উঠলে অহি অনেক রেগে যায়। কিন্তু এখন কিছু বলল না কেনো? ইচ্ছে তাকিয়ে দেখলো অহি টেবিলে বসে কিছু একটা দেখছে। আশেপাশে কোনো খেয়াল নেই। কৌতুহল নিয়ে উঠে দাঁড়াল সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখলো রঙ্গনের দেওয়া সেই গিফট। ইচ্ছে বিরক্ত হয়ে অহির মাথায় চাঁটি মে’রে বলল,
” এটা এখনো খুলিস নি কেনো?
অহি নাক থেকে চশমা টেনে ভালো করে পরে নিলো। অতঃপর বলল, ” ভাল্লাগে না মা’রলি কেন? আমি তো তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
ইচ্ছে খুশি হয়ে গেলো। অহিকে টেনে তুলে জড়িয়ে ধরে বলল,” মা’রিনি কলিজা তোকে কি আমি মারতে পারি বল?চল এখন গিয়ে খুলি।
বিছানায় গিয়ে বসে দুজনেই টেনে টেনে প্যাকেট খুলতে লাগলো। খুলতেই দুজনের চোখ কপালে উঠে গেলো। একটা নয় দুটো নয় পাঁচটা শাড়ি। বড়সড় প্যাকেটটা দেখেই বুঝেছিল অনেক কিছু আছে তাই নিতে চায়নি। ভাগ্যিস অনুভবকে দেখেই দরজার পেছনে লুকিয়ে ছিল। নইলে আজকে কপালে দুঃখ ছিল। অনুভব আর ইচ্ছে চলে যাওয়ার পরে সে গিয়ে নিয়ে এসেছে। ইচ্ছে মাথায় হাত দিয়ে বলল,
“এতো শাড়ি, চুড়ি, ঝুমকা, গাজরা কেনো দিয়েছে? ভাইয়া কি জানে না! তুই এসব পড়িস না?
অহি ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলল,” আমি কি তাকে এসব দিতে বলেছিলাম নাকি?
ইচ্ছে হেসে বলল,” আরে তুই তার সাথে কথা বলছিস না জন্য এগুলো দিয়েছে। আয়হায় দেখেছিস ভাইয়া কত বুদ্ধিমান?”
অহি সেগুলো গুছাতে গুছাতে বলল,” ছাই বুদ্ধিমান আমি তাকে ভালো মানুষ হতে বলেছি শরাইখানা খুলতে বলিনি।”
হঠাৎ শাড়ির ভাজ থেকে একটা চিরকুট নিচে পড়ল। ইচ্ছে চট করে তুলে নিয়ে বলল,” আরে এটা কি? তোকে চিঠি লিখেছে মনেহয় পড় পড় আমি শুনতে চাই।
অহি এবার অবাক না হয়ে পারলো না। সে ভাবতে পারছে না রঙ্গনের মতো লোক চিঠি লিখতে পারে। কোনো কথা ছাড়াই কাগজের ভাজ খুলে সামনে ধরলো। কিন্তু যা লেখা আছে তা দেখে মেজাজ বিগড়ে গেলো। ইচ্ছে হাসতে হাসতে শুয়ে পড়ল। গড়াগড়ি খেতে খেতে চিঠিতে লেখা বাক্য বলতে লাগলো,
” কি ভেবেছিস তোকে চিঠি লিখেছি? শোন ওসব আমি পারিনা। ভালোই ভালোই আমার ফোন রিসিভ করবি নইলে মে’রে তোকে আর তোর ভাইকে উগান্ডা পাঠিয়ে দিবো।”
!!
ইচ্ছে আর অহির ভর্তির কাজ শেষ করে অনুভব কাজে চলে গেছে। যদি তাদের দুজনকে তার ফ্ল্যাটে নামিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু তারা যায়নি। তার অবশ্য কারণ আছে জিনিয়া আর জিহানের সাথে দেখা করা। তারাও আজকে ভর্তি হতে এসেছে। জিহান আর তাদের সাবজেক্ট মিলে গেলেও জিনিয়ার এসেছে আলাদা সাবজেক্ট। এটা নিয়ে বেচারির দুঃখের শেষ নেই। ফোন দিয়েও বেশ কয়েকবার শোক প্রকাশ করেছে।
দূর থেকে ইচ্ছেদের দেখতেই দৌঁড়ে আসল জিনিয়া দুজনকে এক সাথে জড়িয়ে ধরে বলল,
“দোস্ত তোরা আমাকে ভুলে যাবি না তো?
অহি মন খারাপ করে বলল,” এসব কি বলছিস?ভুলে যাবো কেনো?
“তোদের থেকে আলাদা হয়ে গেলাম এই জন্য।”
ইচ্ছে হাসতে হাসতে বলল,” তোর মতো বদ মহিলাকে আমরা জীবনে ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারবো না।
সবাই হেসে উঠলো। জিনিয়া মুখ ফুলালো। তা দেখে জিহান বলল,” দোস্ত এইডা কোনো কথা বলত! কারো সাইন্সের সাবজেক্ট আসলো না। কি এসেছে ইংরেজি!! আরে শা’লার ইংরেজি পড়তে পড়তে তো দেখি ব্রিটিশদের মতো হয়ে যাবো। বাংলা বলতেই ভুলে যাবো।
ইচ্ছে আবারও হেসে বলল, ” কেনো জিনিয়ার তো বাংলা এসেছে ও আমাদের মনে করিয়ে দিবে।
অহি ছোট ছোট করে তাকিয়ে না বোঝার মতো করে বলল,”কিন্তু সব কিছু তো ইংরেজিতেই পড়তে হবে সে যে সাবজেক্টই আসুক।”
জিহান মুখ ভেঙচি দিয়ে বলল, ” তুই তো বেডি কার্টুন তোর এতো বোঝা লাগবে না।”
ইচ্ছে সবাই কে থামিয়ে দিয়ে বলল,” থাম তোরা! মাথা ধরেছে কফি বা চা খাবো চল সবাই। সবাই সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
!!
শফিক সাহেব চা খেতে খেতে গুনগুন করেছিলেন। আনোয়ারা বেগম এসে তার পাশে বসলেন।
“তুমি চা খাবে না?
” না ইচ্ছে করছে না।
” তোমার আর কি ইচ্ছে করে? মাঝে মাঝে তো আমার হাত দুটো ধরে বলতেও পারো! ভালোবাসি। নাকি বুড়ো হয়ে গেছি জন্য আর ভালো লাগে না।
আনোয়ারা বেগম চোখ রাঙিয়ে বললেন,
” আবার এসব কথা কোনো? বয়সের খেয়াল আছে?
শফিক সাহেব আফসোসের সুরে বললেন,
” বুড়ো হলে ভালোবাসার কথা বলা যাবে না এটা কোথায় লেখা আছে?
“আমার মাথায়।
” হুম বুঝেছি। আর তো কিছু নেই।
“কিহ বললে?
” না কিছু না।
দুজনেই চুপ হয়ে গেলো। কেউ কিছু বলছে না। স্ত্রী কিছু বলতে যাচ্ছে বুঝে শফিক সাহেব নিজেই প্রশ্ন করলেন,” কিছু বলবে??
“তোমার মনে আছে কালকের কথা?
শফিক সাহেব মুচকি হেসে বললেন,” কালকের দিনে আমরা ইচ্ছেকে পেয়েছিলাম।”
আনোয়ারা বেগম এবার নিজেও হাসলেন।
“দেখতে দেখতে মাইয়াটা কত বড় হয়ে গেলো। আমার কিছু না পাওয়ার পূর্নতা ইচ্ছে। সৃষ্টি কর্তা কাউরে নিরাশ করেন না।
শফিক সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললে,” ওসব কথা কেনো তুলছো?
“আজকে বড্ড সেই রাতের কথা মনে পড়ছে।”
#চলবে….
|| গত পর্বে অভিযোগ ছিল অনুভব কেনো নেই! আজকে পুরোটাই অনুভবময় করে দিলাম! এবার খুশি? 🤭||