আমার_বোবাফুল(অন্তিম’২) –®তৃপ্তি এহসান নাওরাহ্

0
68

#আমার_বোবাফুল(অন্তিম’২)
–®তৃপ্তি এহসান নাওরাহ্

আইজা এদিক ওদিক নজর লুকিয়ে বললেন, “ মা আপনি তো অসুস্থ ছিলেন সেসময়? হসপিটালে যেতে পারেননি। সেদিন জোড়া বাচ্চা হয়েছিল আমার।”- কী যেন ভেবে হড়বড়িয়ে বলল, “রিকাজ সম্পর্কে জানেন নিশ্চয়ই?জ-জন্মের দিনই রণকে চুরি করে নিয়ে গেছিল স-সে।”

হানিফা বেগম বিশ্বাস করলেন বলে মনে হলো না। হসপিটালে মায়ের বুক থেকে একজন বাচ্চা চুরি করে নিয়ে গেল- আর মা এতো বছর চুপ ছিল?কোন আহাজারি নেই!কোন আর্তনাদ নেই!

“কী লুকাইতেছো আমার থেকে বউমা?”

“যা লুকাচ্ছি তা আপনি কখনো জানবেন না মা।আর না আমার বর্ণ’টা জানতে পারবে।”-বিড়বিড় করে আইজা পরক্ষণে বড় করে বললেন, “ কিছুই লুকাচ্ছি না মা। আমার জোড়া বাচ্চার কথা আমি নিজেও জানতাম না।পরে প-পরে জানতে পেরেছি। যতক্ষণে জানতে পেরেছি তখন খুব দেরি হয়ে গেছে মা। আমার বাচ্চা আমার ধরা ছোঁয়ার অসাধ্যে চলে গিয়েছিল।” ঠোঁট কামড়ে দমিয়ে রাখতে চাইলেন কান্না গুলোকে।কথা বের হচ্ছিল না গলা দিয়ে।পরে আযাদ সাহেব এসে মাকে বুঝিয়ে দিয়ে বিশ্বাস করালেন যে- ‘আব্রাহাম রণ’ তারই সন্তান। কীভাবে কী বলে সবাইকে বুঝ করেছে তা আইজা জানেন না। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে বসে রইলেন।কতো বছর প্রতীক্ষার পর অবশেষে ছেলেটার সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি। ছুঁতে পারছেন। তিনি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন একসময়।

রণ’র চেহারা জোসেফের সাথে ছিটেফোঁটাও মিল নেই এখন। আবার টুইন হওয়ার খাতিরে বর্ণ’র সাথেও না। আসফিয়ান বর্ণ কী বোকা? জীবদ্দশায় তার জেরক্স কপি তৈরিতে সম্মতি প্রদান করবে কখনো, স্বেচ্ছায়?এক দেখায় রণকে যে কেউ বলবে সুদর্শন পুরুষ।চোখের মণিও কুচকুচে কালো। অবশ্য আগে নীল মণি হওয়ার রহস্য -আলগা লেন্স।

বর্ণ’র চোখে যত বিরক্তি। ভেতরের আত্মাটা প্রতিহিংসায় জ্বলছে দাউদাউ। রণ’র প্রতি সবার এতো ভালোবাসা চোখের সামনে সহ্য হচ্ছে না আর।দ্যাখো কেমন ঘিরে রেখেছে সবাই!তড়াক করে ভ্রু উঁচাল বর্ণ।তার মনোভাবে ছোটবেলার বাচ্চামো দেখা দিচ্ছে নাকি?ওকে আদর করছে আমায় কেনো করছে না, এমন?গলা খাঁকারি দিয়ে বিতৃষ্ণা নিয়ে আড়চোখে তাকাল। সুখকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, গেল মেজাজটা বিগড়ে। এগিয়ে তার হাতটা টেনে ধরে সোজা বাড়ির বাহিরের দরজার দিকে হাঁটা ধরল।এসব আর নেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে জোসেফ… নাহ্ এখন তো সে রণ।সবার মধ্য থেকে উঁকি দিয়ে বর্ণকে ইশারায় বুঝিয়ে দিচ্ছিল- ‘তোর সব ভালোবাসায় এবার থেকে ভাগ বসাবো আমি, পারলে আটকে দেখা।লেটস্ স্যি ইয়্য স্টপ ইট।অল দ্য বেস্ট!’

দাঁতে দাঁত চেপে বর্ণ অস্ফুট ঠোঁট নাড়ায়, “আমার বেড়াল আমাকেই বলে ম্যাও। ইন্ট্রেস্টিং !”

ভাইয়া আর ভাবির মাঝে জেসির ভালোয় কেটেছে এই কয়দিন।আজ মেহরাব আসবে।তবে চলে যাবে না।সেও দু’দিন থাকবে এখানে।জেসি দু’হাতে হাঁটু জড়িয়ে কী ভেবে পেটে হাত রাখে। মূহুর্তেই ঠোঁটে হাসির রেখা ফোঁটে।একটা সুখানুভূতি ঘিরে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে। ভাবতেই অবাক লাগে- সেও আর পাঁচটা নারীর মতোই মা হওয়ার সাধ গ্রহণ করবে!জেসির কল্পনা বুনতে ইচ্ছে হলো হুটহাট। কিন্তু কী নিয়ে বুনবে?বালিশটা বুকে চেপে সেদিনের ভাবনায় ডুব দেয় সে।এক রাতে গা কাঁপিয়ে খুব জ্বর এসেছিল তার।জ্বরের তোড়ে চোখ মেলতেও কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছিল। মেহরাব একহাতে জড়িয়ে রেখে তাকে খাইয়ে দিচ্ছে কিন্তু সে ওসব খাবে না।চুমু আর আদর খাবে।জ্বরের ঘোরে অবচেতন মনে আদর নেওয়ার জন্য মেহরাবকে অস্থির করে তুলছিল অথচ মেহরাব নিজের সাথে যুদ্ধ করে বহুকষ্টে নিজেকে দমিয়ে রাখার চেষ্টায় নিমগ্ন।জেসি তখন নাছোড়বান্দা!তার আদর লাগবেই লাগবে।সেই রাতের মধ্য-প্রহরে মানুষটা হার মেনে নিল।জেসিকে অনেক অনেক আদরে ভরিয়ে দিল, গভীর স্পর্শে কুপোকাত করে দিল তার ছোট্ট তনু।কানের নিকটে মুখ নিয়ে তার অগোচরে অভিযোগ করল, “নিজের মায়ায় এতো বিভৎস ভাবে না বাঁধলেও পারতে মিসেস।এখন মুক্তির কী উপায়?”

সেই রাতের একান্ত মূহূর্তের দৃশ্যগুলো কল্পনা করে আজো লজ্জায় নুইয়ে পড়ে জেসি।র/ক্তাভ দু’গাল লুকাতে বালিশে মুখ গুঁজে দেয় তড়িঘড়ি করে।বুকটা টিপটিপ করছে।গলা শুকিয়ে আসে। ফোনের শব্দে ধ্যান ভঙ্গ হয় জেসির। স্ক্রিনে মি.অ্যারোগেন্ট নামটা দেখে দ্বিগুণ লজ্জা ঘিরে ধরে। রিসিভার তুলে ধীরস্থির কানে চাপতেই ওপাশ থেকে মেহরাব বলল, “কী ম্যাডাম?ভাইয়ের কাছে গিয়ে বরের কথা ভুলে গেলে?”

জেসি নড়েচড়ে বসে নিজেকে স্বাভাবিক করে জবাব দেয়, “বরের বাড়ি থাকলে যখন ভাইকে ভুলে থাকতে হয়, তবে ভাইয়ের কাছে এসে বরকে ভুলে গেলে কেনো এতো আপত্তি, স্যার?”

“ অভিযোগ দেখিয়ে ভুল করলাম বলছো?”
“অফকোর্স!”

বিনিময়ে মেহরাব হাসল।গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বলল, “ কী খাবে?”

“উম… তেঁতুল, আচার, বার্গার, পিৎজা, আইসক্রিম, ফুচকা, তারপর…”–এক নিঃশ্বাসে সব বলে সে ভাবুক হলো অল্প।এরই মাঝে মেহরাব গম্ভীর গলায় দমন করে দিল তাকে, “নো!এই অবস্থায় এসব খাওয়া ভালো হবে না।”

অবিলম্বে মুখ কুঁচকে গেলো জেসির, “জিজ্ঞেসও করবেন, আবার যা বলবো তা খেতে নিষেধও দিবেন। অসহ্য !”

“এরপরও মুখ বুজে সহ্য করে নিতে হবে মিসেস।”

“এটাই যে কপালের লেখ–ন।”

মেহরাব দুঃখ প্রকাশ করে, “হোয়াট অ্যা পিটি!”

তুহফা বই পড়ছিল বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে। অবসরে উপন্যাস পড়ার বদভ্যাস শুরু থেকেই ছিল তার।খানিক আগেও পাশে তার ননদ‌ ছিল।এখন ঘুমাতে চলে গেছে।মাস খানেক পর ননদের বিয়ে।তাই যথাসম্ভব ভাবির সাথে সময় কাটিয়ে নিচ্ছিল। পরবর্তীতে এমন সুযোগ নাও আসতে পারে।মাহির নেই বাড়িতে।

তুহফা একমনে পড়ছে টান টান উত্তেজনা নিয়ে।শোয়া থেকে উঠে বসে গেল প্রায়।বইয়ের ভেতর নজর এতোটা ডুবে, পারলে ওখানে স্বয়ং ঢুকে পড়ে।কখন মাহির দরজা ভিড়িয়ে রুমে এলো আর তার হাবভাব পরখ করে কখন বাথরুমে ঢুকল বুঝতেই পারল না।

আকম্মাৎ কোলে কেউ মাথা রেখে কোমর ঝাপ্টে ধরতেই কেঁপে উঠলো মেয়েটা। ঢোক গিলে মাহিরকে দেখে বলল, “এভাবে না বলে কয়ে কেউ ঝাপ্টে ধরে?”–পরক্ষণে বুকে ফুঁ দিল।

প্রত্যুত্তরে মাহির একটানে বই কেড়ে নিয়ে সেন্টার টেবিলে ঢিল মারার মতোন ছুঁড়ে রাখল।

“ আরে আরে পড়ছিলাম তো। ভীষণ ইন্ট্রেস্টিং কাহিনী।”

মাহির মৃদু হাসলো। আবারো কোমর জড়িয়ে ধরে টুপ করে পেটে চুমু খেল শব্দ করে।বলল সন্দিহান সুরে, “আমার চেয়েও ইন্ট্রেস্টিং?”

এতে করে লজ্জায় গুঁড়িয়ে গেলো তুহফা।সেই প্রথম দিনের মতোই আজো তার লজ্জা লাগে এই পুরুষটি ছুঁয়ে দিলে।তবে আগের মতো অত্যাধিক নয়।

“নিবাস থেকে ফিরছি।”

মাহিরের কথায় তুহফা’র চোখ চকচক করে উঠল। নিবাসে নতুন একজন সদস্য যুক্ত হয়েছে সেটা সে জানে। তবে এখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি;তাই সরাসরি দেখা হয়নি।ননদের বিয়ে নিয়ে দু’পক্ষের আসা-যাওয়া, আলোচনা, অতিথি সামলানো এসবে মহা ব্যস্ত। উপরন্তু সংসারের বড় বউ সে। দায়িত্বের ভার বেশি। বিকেলে সুখের সাথে কথা হয়েছিল।তাকে নিবাস থেকে ~বর্ণ’স ক্যাসেল~ এ নিয়ে গিছে বর্ণ ছয়দিন পেরোলো।এখনো নিবাসে নিয়ে যাইনি।

শাড়ির আঁচল গলিয়ে উন্মুক্ত পিঠে পুরুষালী আঙুলের স্পর্শে শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল যেনো। দম আটকে মাহিরের মাথার চুল খামচে ধরে তুহফা। চেহারার অবস্থা নাজেহাল।মাহির হাসলো।একহাতে তুহফার ঠোঁট ছুঁয়ে আবেশিত কন্ঠে শুধাল, “যাবে ও বাড়ি?”

যাওয়ার বায়না ধরার আগেই মাহির প্রশ্নটা করে ফেলল।তুহফা উপরনিচ মাথা ঝাঁকায়।

মাহির বলল, “তাহলে তো আমি যা চাই তা দিতে হবে জান।”

মাহিরের হাবভাব দেখে ঢোক গিলল তুহফা। নজর নামিয়ে ঠোঁট টিপে হেসে প্রশ্ন করে, “কী চান?”

আলো নিভে গেলো ফট করে।মাহির তুহফাকে শুইয়ে দিয়ে নিজের ভার ন্যস্ত করে তার উপর। ঠোঁট ঠোঁট রেখে প্রলম্বিত চুম্বন এঁকে গলায় মুখ ডুবিয়ে কানে কানে বলল, “এই মূহুর্তে তোমাকে!”

একটা ছোট্ট বেবীর আবদার করতে চেয়েও সাহসের অভাবে করা হলো না আর। অনেক আগে থেকেই দুজনে কম চেষ্টা করেনি।মাঝে মিসক্যারেজ হয়েছে দু বার।তুহফা নিজেও এই নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে।মাহিরের দিকে তাকাতেই সময় সময় বুকটা খা খা করে। কিন্তু তার যে কিছু করার নেই।সব সৃষ্টিকর্তার নিয়ন্ত্রণে,যদি তিনি চায়…।

সেদিন বর্ণ তপ্ত মেজাজ নিয়ে নিজ রুমের ব্যলকনিতে ছিল। মেজাজটা ছ’গুন চড়িয়ে দিতে রণ এসে দাঁড়ায় সেখানে।বর্ণ শক্ত গলায় দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ পার্মিশন ছাড়া রুমে ঢুকেছিস কোন সাহসে?দ্যেয়ার ওন্ট বি অ্যা সেকেন্ড ওয়ার্নিং!”

মাথা চুলকে রণ হাসল প্রসস্থ ঠোঁটে। বর্ণ’র রাগী রাগী কঠিন মুখাবয়ব উপভোগ করতে খারাপ লাগছে না।বলল, “ দেখেছিস মম তোর চেয়ে আমায় বেশি ভালোবাসে!কদিন পর আমার সামনে তোকে চিনতেই পারবে না।”

হাত মুঠোবন্দী করে চুপ করে রইল বর্ণ। রেলিংয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাতটা আলতো চাপড়ে রাগ সংবরণের চেষ্টা করছে। আড়চোখে সেই চঞ্চল হাতের দিকে চেয়ে রণ ফের বলল, “ তার উপর যদি মুখোশের আড়ালে থাকা তোর অন্য রূপটা টেনে হিচড়ে সামনে আনি। তখন মমের রিয়্যাক্ট কেমন হবে ভাব একবার।”

“খুন করবো।*

থমথম খায় রণ। অপ্রস্তুত গলায় বলল, “হুজ?”

মূহুর্তেই অপরপক্ষের মুষ্টিবদ্ধ হাতটা সোজা নাক বরাবর এসে লাগলো রণ’র। মৃদু আর্তনাদ করে এক ধাপ পিছিয়ে গেল সে। ঠোঁটের উপর হাত উঠে যায় আপনাআপনিই। ঠোঁট ফেটে র-ক্ত বেরিয়ে এসেছে।বর্ণ অগ্নি দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে।পারলে চোখের পাবকে এখনি ভষ্ম করে দেয় রণ’কে।

রণ’টা জিভে দিয়ে ঠোঁটের আশেপাশে র/ক্ত চেটে বলল ব্যথাতুর গলায়, “ আই ওয়াজ জাস্ট কিডিং ইয়ার!”

বর্ণ নিশ্চুপ। পূর্ণ দৃষ্টি মেলে অদৃশ্যে চেয়ে ফুঁসছে।খানিক পর রণ আবদার রাখে, “আমার ক্ষমতা তো শেষ। তোর তো বেঁচে আছে এখনো।যা না আমার বাচ্চা গুলোকে নিয়ে আয়? নারীদের প্রতি কোনো ইন্ট্রেস্ট নেই আর। ভবিষ্যতে মমের পছন্দ মতো একজন…”

বর্ণ’র দৃষ্টি প্রত্যক্ষ করে থেমে গেল সে।গলা পরিষ্কার করে বলল, “ মম বলে দিয়েছে আমি তোর আড়াই মিনিটের বড়। এভাবে বাঘের মতো তাকাস কেনো?”

বর্ণ এই পর্যায়েও মুখ খুলল না তবে ফোনে দেখাল কিছু একটা। এরপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, “ পথে ঘাটে বিয়ে করে বাচ্চা জন্ম দিয়ে এসেছিস।যাহ্ বাবার দাবি নিয়ে। সোজা এনকাউন্টারে মরবি।”

রণ’র মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।লোকে বলে- রক্তের টান চম্বুককেও হার মানায়। আসলেই বাচ্চার মা-য়েদের প্রতি তার কোন কালেই তেমন আগ্রহ না থাকলেও চার সন্তানের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না সে। প্রভাবশালী বাপের মেয়েদের জীবনসঙ্গী করেছিল। ঠেকিয়েছে, মিথ্যে পরিচয়ে বিয়ে করেছে এই অপরাধে না জানি কতো রকমের কেস ঠুকেছে। অন্যান্য বিষয়ে আর যাইহোক, এই মহা বিশ্বে নারী’ বিষয়ক আইন ভীষণ কড়া।

রণ ঠিক করল বর্ণর হাতে পায়ে ধরে বাচ্চাদের তার কাছে চুরি করে হলেও এনে দিতে বলবে। কিন্তু কোন পরিচয়ে?তার অতীত তো বড্ড তিক্ত। সেসব শুনলে সবাই থু ছিটাবে নিঃসন্দেহে।

দু’ভায়ের কথায় কথায় এক পর্যায়ে বর্ণ পুণরায় আক্রমণাত্মক হয়ে হাত উঠাতেই আইজা পিছু থেকে আর্তনাদ করে উঠলেন, “কী করছো বর্ণ?ওকে মারছো কেনো?”

আইজা কাছে এসে রণকে দেখতেই আঁতকে উঠে। ঠোঁট ফুলে লাল হয়ে গেছে তার। ভদ্রমহিলার কেনো যেনো মনে হলো ইতোপূর্বে বর্ণ একদফা রণ’র গায়ে গা তুলেছে। তপ্ত শ্বাস ছেড়ে হতাশ চোখে একপলক বর্ণকে দেখে রণকে টেনে নিয়ে চলে গেলেন তিনি।যেই দৃশ্যটা বর্ণ’র চোখে জ্বালা ধরিয়ে দিল।এর কিছু মূহুর্ত পরই সুখকে আঁকড়ে ধরে নিবাস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে বর্ণ।আজো ফিরেনি।আইজা কাঁদতে বসেছেন। আযাদ সাহেবকে অনুরোধ করছেন ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন।

“ চাপ নিও না।সে শিঘ্রই ফিরবে।”

বর্ণ কথা বলছিল কারো সাথে।সুখ তখন রুমে। ভিডিও কলে আম্মু।আম্মুর আশেপাশে থেকে স্ক্রীনে উঁকি ঝুঁকি মারছে নূরা।ওবাড়ি ফেরার সময় তার জন্য কী কী নিতে হবে তার- লম্বা লিস্টও পেশ করেছে ইতোমধ্যে।যার অধিকাংশই স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট। এই বয়স থেকেই রূপচর্চায় ভারী সচেতনতা অবলম্বন করে সে।সুখ হাসি মুখে মেনে নিচ্ছে সব।

দীর্ঘালাপ শেষ করে ফোন রেখে ব্যলকনিতে একবার উঁকি দিল।নাহ্ বর্ণ’র কথা এখনো শেষ হয়নি।পাশে আইস কিউবে নজর যেতেই দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়।একটা কিউব তুলে নিয়ে পা টিপে টিপে বর্ণ’র পিছু এসে দাঁড়াল নিঃশব্দে।তার পরিকল্পনা ছিল বর্ণ’র শার্টের ভেতরে কিউব ছেড়ে দিয়ে সোজা পালিয়ে চলে আসবে। কিন্তু বিধিবাম!চাহিদা মতো বর্ণ’র পড়নের শার্টের ভেতরে কিউব ছেড়ে পালিয়ে আসতে নিলেই হাতের কব্জি চেপে ধরে লোকটা। সুখের অবস্থা ছেড়ে দে বর, কেঁদে বাঁচি! বহুকষ্টে ছটফট করে, হাত পা সব টানাটানি-ছুড়াছুড়ি করেও নিজেকে ছাড়াতে পারল না। অন্যদিকে বর্ণ’র প্রতিক্রিয়া নির্বিকার।সে যে সুখের হাত আঁকড়ে আছে, সেটা নিজেও জানে না, –ভাবটা এমনি। দিব্যি ফোনে কথা বলছে এক ধ্যানে।

ফোনের ওপারের কাজে সমাপনী ঘোষণা করে সুখকে নিকটে টেনে এনে রেলিংয়ে চেপে ধরে দুহাতে বন্দিনী করে নিল বর্ণ। দুষ্টু হেসে বলল খোঁচা দিয়ে,

“ সুইটহার্ট!কী মতলব? এমন সুদর্শন একজনকে রুমে একা পেয়ে ইভটিজিং করার লোভ সামলাতে পারছিলেন না বুঝি?নট ব্যাড।”

সুখ আর ছটফট করছে না এবার। এদিক ওদিক নজর লুকাচ্ছে।বর্ণ একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে থাকতে ভ্রু সংকুচিত করে নিল। সুখের শুকনো চঞ্চল চোখটা সহ্য হচ্ছে না। নিঃশব্দে ফুলের গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো পুরুষটা।সুখ শ্বাস আটকে খেই হারিয়ে দুহাতে জাপটে ধরে তার গলা।এতে বর্ণ আরো উম্মাদ হলো। ঠোঁট চেপে ধরল সুখের উন্মুক্ত ঘাড়ে। ঝরঝর চুলের মাতোয়ারা ঘ্রাণে নেশাগ্রস্তর মতো শ্বাস টেনে বলল,

“কী এমন মাখিস চুলে, যা পৃথিবীর সব নেশাকে পিষ্ট করে দেয় মূহুর্তেই?উম্ম কী মিষ্টি গন্ধ।”

বলার ফাঁকে একসময় ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে দিতেই কঁকিয়ে উঠে সুখ খামচে ধরে শক্ত করে,এতে নখ বিঁধে যায় বর্ণ’র ঘাড়ের পিছে, অথচ পুরুষটার কিছু এলো গেলো না বিশেষ। দাঁত বসিয়ে দেওয়া জায়গায় ভেজা চুমু দিয়ে মুখ তুলল। ততোক্ষণে সুখের চোখ ভিজে উঠেছে। অশ্রুতে টলটল করছে দু’চোখ।বর্ণ সেদিকে তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো চেয়ে রয়, চেয়েই রয় অপলক।ওই চোখের গভীরে সে বারেবারে ডুবে যায়। একবার ওই চোখের কথা স্মরণ হলে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য ফিকে হয়ে আসে নিমেষেই।তখন হারিয়ে ফেলে পথ, ভুলে যায় গন্তব্য। অথচ সে চেয়েছিল- ফুল একাই ডুবুক তার মাঝে, তাকে ভালোবেসে দিশাহারা হোক, গন্তব্য ভুলে যাক, ছটফট করুক অব্যক্ত যাতনায়।আর সে দূর থেকে তার ভালোবাসার অথৈ সাগরে ফুলের ডুবে মরা দেখে উপভোগ করবে, তৃপ্তির হাসি ফোটাবে ঠোঁটে। অথচ সময়ের পরিক্রমায় সব চাওয়া তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করল।বোবাফুলের মাঝে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলল পুরোপুরি ভাবে।ফিরে আসার কোনো পথ অবশিষ্ট নেই।

সুখের চোখে পাহাড় সম অভিযোগ, অভিমানেরা ছুটোছুটি করছে তখন। নিশ্চুপে অশ্রুসিক্ত চোখের গড়িয়ে পড়তে চাওয়া পানি ঠোঁটের স্পর্শে চুষন করে নিয়ে বর্ণ আকম্মাৎ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সুখকে। এতোটা শক্ত ভাবে যে, সুখের দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। ক্ষমতাবলে যদি এই মুহূর্তে ফুলকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে বন্দি করে রাখা যেতো, বর্ণ বোধহয় তাই করতো।

ছেড়ে দিয়ে দুহাতে তার মুখটা আঁজলায় তুলে কপালে কপাল ঠেকায় বর্ণ। সম্মোহনী সুরে এতোক্ষণে মুখ খুলল,

“ চোখে এতো মায়া নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াতে বুক কাঁপে না, না? ইচ্ছে তো করে তোকে লকেট বানিয়ে বুকের বাঁ পাশে রেখে দিই। ভালো হতো না তখন? দূরে গিয়েও হুটহাট তোকে একঝলক দেখার সাধ হলে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে আসতে হবে না। একটু ছুঁয়ে দেওয়ার অবাধ্য যন্ত্রণায় হৃদয়ও ছটফট করবে না ‌। সেদিনের এইটুকু বাচ্চা- কী হাল করে ছেড়েছিস আসফিয়ান বর্ণ’র, একবার চোখ মেলে চেয়ে দেখ।”

পুণরায় সুখের চোখে অশ্রু জমে।এটা ব্যথার বহিঃপ্রকাশ নয়, এর নাম আনন্দশ্রু। বর্ণ বুড়ো আঙ্গুলে অশ্রু মুছে দিয়ে হুঁশিয়ারি দিল,

“উঁহু বউ,নোপ!এই চোখ তখন তখনই ভিজবে যখন আর যেই মুহুর্তে আমি চাইবো।এই বাইরে এক বিন্দু অশ্রুও যেনো বরবাদ না হয়।খুন করে ফেলব কিন্তু।”

সুখ আজ ধার ধারল না এসব হুঁশিয়ারি। সামনের বেপরোয়া পুরুষটির বুকে হামলে পড়ে বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

“কাঁদতে মানা করেছি না?”–জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিয়ে থুতনিতে চুমু খেল বর্ণ।সুখ ইশারায় বুঝায়, “ হাতে হাত রেখে একসাথে স্বপ্নের পথে হেঁটে যাওয়ার ফাঁকে , মাঝরাস্তায় হাত ছেড়ে নেবেন নাতো?”

কথাগুলো বর্ণ’র বুকে গিয়ে ছুরিকাঘাতের মতো বিঁধল নাতো?কে জানে।তবে সে ঢোক গিলল। নিশ্চুপে বউয়ের পুরো মুখে অধরের বিচরণ চালিয়ে আদর দিয়ে তার মনে সৃষ্ট সংশয় ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। এরপর কোলে তুলে নিল নীরবে।ভালোবাসার সংজ্ঞা সে জানে না।কবি সাহিত্যিকের মতো ভালোবাসার উক্তিও জাহির করতে পারে না। শুধু এটুকুই বলতে পারে, “ইয়্যু আর অনলি মাইন।নো সেক্রিফাইস, নো গিভিং আপ!”

সুখকে কোলে রেখেই ক্যাসেল থেকে বেরিয়ে এলো বর্ণ।ডান দিকে হাঁটা ধরল। ক্যাসেলের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ইয়া বড়ো নদী। নদীর তীর ফুলে, বেলুনে, ঝিনুক বাতিতে সাজানো। আঁধার রাতে, চাঁদের নরম আলোয় খোলা আকাশের নিচে কী সুন্দর মনোরম দৃশ্য।চোখ জুড়িয়ে গেল সুখের। বিমুগ্ধ চেয়ে রইল।বর্ণ চোখ নামিয়ে একবার সুখের দৃষ্টি অবলোকন করে আবারো নজর সামনে স্থির করল। অন্যদিন হলে নির্ঘাত হুমকি দিয়ে উঠতো- “বউফুল! যন্ত্রণায় দগ্ধ হওয়ার সাধ জেগেছে? নিষেধ করেছি না- কোন জিনিসের দিকে এমন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকাবি না। হিংসে হয় আমার বুঝিস না?ওই দৃষ্টি শুধু এবং শুধুমাত্র আমার জন্যই বরাদ্দ।এতে কোন মানুষ বা জিনিসের হস্তক্ষেপ আফসিয়ান বর্ণ বরদাস্ত করবে না।”

তবে আজ এমন কিছুই বলল না কিন্তু মুখটা সুখের কানের গোঁড়ায় নামিয়ে লতিতে ইঁদুরের মতো কামড়ে দিয়ে সতর্ক করে দিল যেন।সুখ ঠোঁট উল্টায়। দৃষ্টি ঘুরায় বর্ণ’র মুখে। পুরুষটা ভীষণ অনুভূতিশূন্য আর নিষ্ঠুর। কখন না জানি সাজানো স্পটের সব ছিঁড়ে এক জায়গায় ছুঁড়ে মেরে তাকে সামনে বসিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বলে, “এখন আর নিষ্পলক চেয়ে থাকার মতো কোন জিনিস অবশিষ্ট নেই ফুল। এবার আমাকে দেখ। তাকিয়ে থাক, নজর সরাস না যেনো।”

পাগলামী গুলো খুব একটা বিরক্তি লাগে না সুখের।ভালো লাগে ভীষণ কিন্তু মানুষটা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালে আশেপাশের অক্ষত জিনিস চোখের পলকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেওয়ার রোগ আছে।যা ভীষণ ভয় পায় সুখ।

ঘাটে তরী বাঁধা আছে।তরীটা রূপালী ঝিনুক আলোয় তারার মতো মিটমিট হাসছে মনে হলো।বর্ণ সুখকে নিয়ে সেখানে উঠে, পরে তাকে নামিয়ে দেয়।সুখ আশেপাশে চেয়ে রেখে নৌয়ের এক কোণে বর্ণ’র গিটার, আর একগুচ্ছ গোলাপ দেখতে পায়।চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকায় সে।বর্ণ ততোক্ষণে গোলাপ গুচ্ছ হাতে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসেছে সামনে। ফুলগুলো এগিয়ে দিয়ে ধীরে বলল মৃদু হেসে, “হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে বউফুল।”

সুখ চমকায়, থমকায়।আজ তো ভালোবাসা দিবস নয়। চোখে প্রশ্ন রেখেই একরাশ উচ্ছ্বাস নিয়ে ফুল হাতে নেয় সুখ। দিবস না হোক। কিন্তু তার ঝুলি প্রতিটি দিন, প্রতি মূহুর্ত ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।বর্ণ বুঝে তার অব্যক্ত প্রশ্ন। সুখকে কাছে টেনে কোমর জাপটে ধরে উদরে মুখ গুঁজে।সয়ে নেয় সুখ।চুলে হাত রেখে বুলিয়ে দেয়।বর্ণ উন্মত্ত হয়ে বলল হঠাৎ-

“ভাগ্যিস আজকের এইদিনে ভালোবাসার দাবি নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়েছিলি ফুল। ভাগ্যিস সেদিন অকপটে স্বীকার করেছিলি আমাকে ভালোবাসার ভুলটা করে ফেলেছিলিস।আমার নিরুত্তাপ হৃদয়ে তুই এসে জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি না করলে হয়তো ভালোবাসায় এতো সুখ আছে কখনো জানতেই পারতাম না।ভাগ্যিস তুই এসেছিলি ফুল।আমায় ভালোবাসা শিখিয়েছিলি।”

শুকিয়ে যাওয়া ঘাঁ টা যেনো পুণরায় থকথকে হয়ে উঠলো বহুদিন পর।চোখের সামনে সেদিনের দৃশ্যপট ভেসে উঠতেই দম আটকে শক্ত হয়ে দাঁড়াল সুখ। ছলছল চোখে দৃষ্টি অন্যত্র ঘুরিয়ে স্থির হয়ে রইল। বর্ণ’র মাথায় ভালোবেসে যত্ন নিয়ে বুলিয়ে দেওয়া হাতটা থেমে যেতেই সে মুখ তুলল।উঠে সুখের মুখোমুখি হলো।

বউয়ের অভিমানী মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল ফের, “গলার কাছে চাকু ধরেও বর্ণ’র মুখে নত স্বীকারের যেই একটিমাত্র শব্দ আজ পর্যন্ত কেউ ফোঁটাতে পারেনি।সে স্বেচ্ছায় প্রতিনিয়ত তোর সামনে হার মেনে নেয় ফুল।আজও বলছে সেদিনের জন্য…”– একটু থেমে, “স্যরি তো লক্ষ্মী বউ।”

সুখ প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ঠোঁট কামড়ে ধরে শান্ত দিঘির মতো স্তব্ধ হয়ে রইল কেবল।বর্ণ কাছে টেনে নিয়ে পরবর্তীতে বুঝিয়ে সুজিয়ে মানিয়ে নিলো অদ্ভুত কায়দায়।নারীদের এই এক সমস্যা। পুরুষ একটু ভালোবাসা দেখালেই তারা গলে যায় মোমের মতো।

জলে পা ডুবিয়ে বসল সুখ। পাশাপাশি তার একান্ত পুরুষের উপস্থিতি। বর্ণ’র হাতে গিটার। গিটারে আলতো হাতে একবার ছুঁয়ে দেয় সে। দীর্ঘ দেড় বছরের অবরুদ্ধ অন্ধকারের প্রতি মূহুর্তের সাক্ষী এই গিটার।তখন মাথায় হাত বুলিয়ে আঁচলের নিচে লুকিয়ে রাখতে মা ছিল না পাশে তার, বটবৃক্ষ হয়ে ছায়া দিতে বাবাও ছিল না, ভাই,বোন কিংবা ফুল –কেউ না। শুধু এই নির্জীব গিটারই তার সঙ্গী হিসেবে জড়িয়ে গিয়েছিল কীভাবে যেনো।বর্ণ ক্রুর হাসে ঠোঁট বাঁকিয়ে। আড়চোখে একবার গিটারের দিকে তাকায় সুখ।বর্ণ এই গিটারকে এতো আগলে আগলে কেনো রাখে সে জানে না।তবে নারীদের চেয়ে এই গিটারকে বড্ড হিংসে হয় সুখের।সময় সময় মনে হয় বর্ণ তার চেয়ে বেশী ওই নিষ্প্রাণ বস্তুটাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। ভাবনার মাঝে কখন যে বর্ণ’র বাহু জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখেছে বুঝলেই পারল না সুখ।চোখ নামিয়ে কাঁধে আঁচড়ে পড়া সুখের দিকে চেয়ে মাথায় ঠোঁট চেপে রাখে বর্ণ।এই বোবাফুলটাকে যতো আদরই করা হোক না কেনো, তৃষ্ণা কভু মিটে না তার।

হাওয়ায় মৃদু ছন্দ।মস্ত বড় আকাশে একটুকরো চাঁদ। ভূবনে সেই চাঁদের স্নিগ্ধ আলো। সবমিলিয়ে রোমাঞ্চকর এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।এসবের
সাথে তালে তাল মিলিয়ে গিটারে টুং টুং শব্দ ভেসে বেড়ায়।সেই সাথে আসফিয়ান বর্ণ’র শ্রুতিমধুর কন্ঠ~

“শেষ বলে যেনো কিছু নেই আছে অবশেষ,
এদেশের ও শেষে ঠিকি শুরু হবে কোন দেশ।
ভেঙে যাওয়া মনে খড়কুটো বুনে যে পাখি;
বাসা ছেড়ে তাকে উড়ে যেতে হয় একাকী!
এ পথে কোন ঝণ নেই,
ফেলে আসা দিন নেই,
শুরুতেই ফিরে এসো তুমিও।
ছেড়ে যাওয়া হাত নেই,
ভাসানেরও রাত নেই,
মাঝে অবসর পেলে ঘুমিও।
শুরুর খাতায় লেখা আছে তাই,
শুরুর পথে একা ফিরলাম।
যতো ভাঙন তুলে নিক এ-মন
বলতেই হবে বিসমিল্লাহ…!”

~সমাপ্ত~

বর্ধিতাংশ/—

মায়রার প্রচুর কাজ বেড়েছে ইদানিং।জেসি মা হতে যাচ্ছে।খুব বেশি দেরি নেই আর।এইতো সামনের মাসের ২৪ তারিখ ডেলিভারি ডেইট দিয়েছে ডক্টর।তাকে সাবধানে সামলে রাখতে মাথায় কতো দায়িত্ব, দুশ্চিন্তা। সংসারের ভার তো আছেই।উপরন্তু মেয়ে বড় হচ্ছে।

জেসিকে যথাসাধ্য হাঁটা চলায় থাকতে বলা হয়েছে। ড্রয়িং রুমে ঈষৎ উঁচু পেট নিয়ে ছোট ছোট কদম ফেলে হাঁটছে সে। বিড়বিড় করে নিজ মনে বাবুর সাথে কথাও বলে ক্ষণে ক্ষণে।মায়রা রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো ডোর বেলের শব্দে। ব্যস্ত হাতে দরজা মেলে সামনের অপরিচিত পুরুষালী মুখটা চিনতে পারলো না সঠিক। সৌজন্য হেসে গম্ভীর গলায় জানতে চাইল, “আপনাকে ঠিক চিনলাম না।কাকে চান?”

অথচ সম্মুখের পুরুষটির মুখ থেকে রা বের হলো না। কেবল অপলক চেয়ে আছে ক্লান্ত ঘর্মাক্ত মায়রার মুখশ্রীতে। যথাযথ জবাব না পেয়ে বোধহয় বিরক্ত হয় মায়রা।তাইতো কুঞ্চিত কপালের ভাঁজ আরো দৃঢ় হলো –যা মুখোমুখি মানুষটারো নজর এড়ায়নি।এবার কিছু বলার মনস্থির করল আগন্তুক।তবে এর আগেই মায়রার পিছু থেকে সাড়ে চার বছরের মীরাভ উচ্ছ্বাসিত গলায় বলল,

“ আঙ্কাল তুমি আমার পাপা’র খোঁজ এনেছো, না?জানো আমার পাপা’টা ভীষণ পঁচা।আমার কাছে আসে না, আদরও দেয় না।মাম্মি বলে ‘পাপা দূর দেশে গেছে আমার জন্য চকলেট আনতে’। কিন্তু আমার এসব চাইনা তো!আমি শুধু পাপাকে চাই।একবার আসুক শুধু, ছেলেটাকে খুব বকে দেবো।”

একেকটা শব্দ আগন্তুকের বুকে তীরের মতো গেঁথে গেল কী না বুঝা দায়।তবে রোদ চশমার আড়ালে থাকা সূচালো চোখ দুটো ছলছল করে উঠে।দম আটকে আসা একটা অনুভুতি হানা দেয়। সজোরে ঢোক গিলল সে।

মায়রা অবাক হলো না।মেয়েটা রোজ পাপার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকে। অপরিচিত কোন মুখ এসে বাড়ির দোর গোড়ায় দাঁড়ালেই প্রথমে উচ্ছ্বাস নিয়ে জানতে চায়, “পাপার খোঁজ এনেছো?”

মেয়ের এসব অবুঝ পনায় পাঁজরটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায় মায়রা’র।চোখের পানি তখন বাঁধ মানে না –যতোই সে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে। জোসেফের জন্য ঘৃণা’র পারদ বাড়তে বাড়তে তখন আকাশচুম্বী হয়।

চাপা শ্বাস ছেড়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মায়রা।নিজেকে অপরাধী মনে হয় এসব দেখলে।

“আমার সোনা!মামানির কাছে যাও।উনি পাপার খোঁজ নিয়ে আসেনি।”

মায়রা নজর সরিয়ে নেয় অতিদ্রুত। পরবর্তীতে মীরাভের চুপসে যাওয়া ব্যথাতুর মুখশ্রী আর অশ্রুসিক্ত চোখে চোখ রাখার সাহস নেই যে। ঠোঁট উল্টেপাল্টে ফুঁপিয়ে উঠে বাচ্চাটা। আগন্তুকের দিকে অভিমানী চোখে চায়।কেনো পাপার
খোঁজ আনতে পারলো না আঙ্কেলটা?

আঙ্কেলটা তাকে ছুঁতে হাত বাড়ানোর আগেই খালি হাতে ফিরে যাওয়ার মতো ছুটে চলে গেলো মীরাভ।মেয়ের আকস্মিক কাণ্ডে স্যরি বলল না মায়রা। স্বর গম্ভীর করে বলল শুধু,

“ছোট বাচ্চা।ওর কথায় কিছু মনে করার প্রয়োজন নেই মিস্টার।আঃ আপনি কাকে চান এবার বলুন?”

পুরুষটা মেকি হেসে জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে নিজের পরিচয় দিল,

“ আমি আব্রাহাম রণ। রকস্টার আসফিয়ান বর্ণকে চিনেন হয়তো?তার ভাই। ভেতরে ঢুকে কথা বলতে পারি মিস?”

~ °°°°°°°°°°°~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here