#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৭২]
সময় আর কর্ম শব্দ দুটো সাধারণ হলেও এর শক্তি বা ক্ষমতা ভাষায় বোঝানো কঠিন। মানুষকে কখন যে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় আগে থেকে বলা মুশকিল। দেখতে দেখতে মাস খানেক পেরিয়েছে। গ্ৰামের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন আগের নিয়মেই চলছে। বদলেছে শুধু শাহ বাড়ির সদস্যদের জীবনধারা। সেদিন নাজিরের কথায় প্রভাবিত হয়ে ব্যবসার হাল ধরেছে পারভেজ। বেঁচে থাকাকালীন আমিরুল শাহ নিজে দাঁড়িয়ে ছেলেকে সব শিখিয়েছেন। ছোটো ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বরাবরই তিনি চিন্তিত ছিলেন।
নাজির রোজ নিয়ম করে একবার মিল্টনকে দিয়ে ফরিদা বানুর জন্য শাহ বাড়িতে বাজার পাঠায়। সে ছাড়া আর কে আছে তাকে দেখার? মহিলা এত তাড়াতাড়ি মরুক নাজির চায় না। সে চায় ফরিদা বানু বাঁচুক, একাকিত্ব নিয়ে বহু বছর বাঁচুক, শত্রুর ছেলের দয়ায় বাঁচুক।
গত মাসেই নাজমুল, শাহরিয়ারকে পুলিশ গ্ৰেফতার করেছে। শ্রীপুরে এক বন্ধুর বাড়ি ঘাপটি মেরে ছিল। সেখান থেকেই ধরে নিয়ে তাদের আদালতে পেশ করা হয়েছে। বর্তমানে তারা জেলে। মুমিনুল শাহকে বেশিদিন আটকে রাখা যায়নি। সপ্তাহ খানেক আগে জামিনে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। তাঁর পরিচিত কেউই সাহায্য করেছে। সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলেন তিনি। লোক মারফত সমস্ত ঘটনাই শুনেছেন। তাই গ্ৰামে ফেরা আপাতত ঠিক হবে না মনে করেই স্ত্রীর মান ভাঙিয়ে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু শ্বশুর বাড়িতে ঢুকে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেননি। মর্জিনা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে অনিচ্ছুক। ভাইদের মাধ্যমে জানিয়েছে, বেঁচে থাকতে শাহ বাড়ি তিনি আর ফিরবেন না। প্রয়োজনে শেষ বয়সে এসেই স্বামী নামক জালেমের থেকে তালাক নেবেন।
মুমিনুল শাহ মনে দুঃখ পেলেন। গোটা পৃথিবীর কাছে অমানুষ হলেও স্ত্রীর প্রতি তিনি সর্বদা বিশ্বস্ত ছিলেন। অথচ সেই স্ত্রী আজ তাঁর মুখদর্শন করতে চাইছে না? মানুষ হারানোর মতো কষ্ট কী আর দুটো আছে? তার ঠিক দু’দিন পরেই একটা কাজে শহর থেকে ফেরার পথে লোকটা দুর্ঘটনার কবলে পড়লেন। যেই গাড়িতে উঠেছিলেন সেই গাড়িটাই প্রবল বর্ষণে মাঝরাস্তায় এসে উল্টে পড়ল খালে। চারিদিকে তখন বানের জল থৈ থৈ করছে। লোকমুখে নাজির শুনেছে, এখন নাকি হাসপাতালে তিনি ভর্তি।
১৫ আশ্বিন, ১৪০৪ বঙ্গাব্দ।
টিনের চালে ঝুমঝুম রবে বৃষ্টি পড়ছে। ঝড়ের দাপটে মটমট শব্দে ভেঙে পড়েছে কোনো এক গাছের ডাল। তখনি দূরে কোথাও বাজ পড়ার শব্দ হলো। মুহূর্তেই বিদ্যুৎ চলে গেলো। মাতৃত্বকালীন যন্ত্রণায় ঘুম ভেঙে গেলো মিছরির। ছটফট করতে করতে শোয়া থেকে উঠে বসলো সে। ঘেমেনেয়ে শরীর ভিজে উঠেছে। অনেক কষ্টে পাশ হাতড়ে ছুঁতে পারলো শক্তপোক্ত দেহ। ঢোক গিলে ডাকলো,“শুনছেন, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে! নাড়ি ছিঁড়ে যাচ্ছে।”
টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে, মৃদু ঠান্ডায় নাজির গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাই স্ত্রীর ডাক শ্রবণালীতে পৌঁছালো না। ব্যথায় মিছরি কাঁদতে লাগলো। খেয়াল করল, রক্ত বের হচ্ছে। এক হাতে গর্ভ চেপে ধরে অপর হাতে স্বামীর বাহু খামচে চেঁচিয়ে উঠলো,“মরে যাচ্ছি আমি, উঠুন না।”
বাহুর নরম চামড়ায় আঘাত লেগে ঘুম ভেঙে গেলো নাজিরের। “কী হইছে? কার কী হইছে?” বলতে বলতে শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠলো। ঘরে বিদ্যুৎ নেই। আকাশ মেঘলা হলেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ললাটে চিন্তার ভাঁজ ফেলে পাশ হাতড়ে বালিশের কোণায় টর্চ পেয়ে জ্বালানোর চেষ্টা করল নাজির। এতেও চার্জ নেই। তাই বাধ্য হয়েই অন্ধকারের মধ্যে বিছানা থেকে নেমে গেলো সে। শাশুড়ি প্রতিদিন কেরোসিন তেল ভরে একটা হারিকেন রেখে যায় ঘরে। অন্ধকারে তা খুঁজতে খুঁজতে নাজির উদ্বিগ্ন স্বরে বললো,“তুমি ঠিক আছো, বউ? নড়াচড়া কইরো না, এহনি আমি আলো জ্বালাইতাছি।”
মিছরি কাঁদছে। মৃত্যুসম যন্ত্রণা সহন করা তার পক্ষে অসম্ভব। বিছানার চাদর শক্ত করে খামচে ধরলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই হারিকেনের হলদে আলোয় ঘরের সমস্ত অন্ধকার বিলীন হলো। নাজির স্ত্রীর কাছে ছুটে এলো। বিছানায় রক্ত দেখে আতঙ্কিত হয়ে বললো, “হায় আল্লাহ, এত রক্ত ক্যান?”
“কাউকে ডাকুন, আমি আর পারছি না।” বহু কষ্টে এই কটা শব্দই সে উচ্চারণ করতে পারলো।
নাজির যা বোঝার বুঝে গেলো। গর্ভকালীন সাড়ে নয় মাস চলছে মেয়েটার। দাদী বলেছেন, এ সময়ে যখন যা ইচ্ছে হতে পারে। স্ত্রীকে খাটের মাঝখানে বসিয়ে গালে হাত ছুঁইয়ে বিচলিত কণ্ঠে বললো,“আরেকটু সহ্য করো, বউ। আমি সবাইরে ডাইকা আনতাছি।”
দরজা খুলে নাজির ছুটলো। পাশের ঘরেই শ্বশুর- শাশুড়ি থাকে। তাই বিলম্ব না করে দরজায় জোরে জোরে বেশ কয়েকবার ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো কাশেম আলীর ঘুমন্ত কণ্ঠস্বর,“কেডা রে? এই মাঝরাইতে কী শুরু করলি, বাপ?”
মুখমন্ডলে বিরক্তি নিয়েই কাঠের দরজা খুলে দিলেন কাশেম আলী। দরজার সম্মুখে জামাতাকে দেখে অবাক হলেন। কিছু জিজ্ঞেস করার পূর্বেই নাজির এলোমেলো বাক্যে বলে উঠলো,“মিছরির হঠাৎ কইরা বিষ উঠছে। রক্ত বাহির হইতাছে…অনেক কানতাছে। আমার মাথা কাজ করতাছে না। ওরে হাসপাতালে নিতে হইবো।”
“বিষ উঠছে মানে? কী কস?” অবাক হলেন তিনি। উঁকি দিয়ে বাইরে দেখে বললেন,“এই বৃষ্টি বাদলের মাঝে কেমনে হাসপাতালে নিমু? রাস্তাঘাটে পেক জমছে এতক্ষণে, গাড়িও তো পাওয়া যাইবো না। তুই ওর কাছে যা, আমি তোর হড়িরে লইয়া আইতাছি।”
নাজির যেভাবে এসেছিল সেভাবেই দৌড়ে গেলো ঘরে। ব্যথার দাপটে মিছরি জ্ঞান হারাবার পথে। মেয়েটার মুখমন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। রক্তে বিছানা মাখামাখি হয়ে গিয়েছে। নাজির তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যথার বদলে সান্ত্বনা কী কাজ করে?
বৃষ্টির দাপট বেড়ে চলেছে। থামবে বলে মনে হয় না। আরো একটি বাজ পড়ল। দালান হালকা কাঁপলো তাতে। স্বামীর ডাকে পারুল লাফিয়ে উঠলেন। মেয়ের গুরুত্বর অবস্থা দেখে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই এই দালান থেকে ওই দালানে বড়ো জা আর জেসমিনকে ডেকে তুলতে ছুটলেন। হাঁকডাকে লাঠিতে ভর করে উঠে এলেন সৈয়দুন নেছাও। গ্ৰিল ধরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“এত রাইতে কার কী হইলো, ছুডো বউ?”
“মিছরির পানি কাটছে, আম্মা। লগে প্রসব বেদনা উঠছে। আর সময় পাইলো না। এত রাইতে দাই পামু কই?”
“কী কও! এই মাঝ রাইতে? বিহালেও তো ঠিক আছিলো।”
“হ, আম্মা। বুবু গো, তাড়াতাড়ি আইয়ো।”
“তুই যা, আমি আইতাছি। বড়ো বউ, এই নতুন চাদর আর গামছা দুইডা লইয়া খালি ঘরে বিছাও। গোছান শেষ হইলে জামাইরে কইবা মিছরিরে ওই ঘরে লইয়া যাইতো।”
পারুল মেয়ের ঘরের দিকে হাঁটা ধরলেন। শাশুড়ির হাত থেকে চাদর, গামছা নিয়ে জেসমিন ছুটলো কাশেম আলীর দালানে খালি পড়ে থাকে ঘরে। নাজিরের দেহের ক্ষত প্রায় শুকিয়ে এসেছে। তবে ব্যথা এখনো কমেনি। সেই অবস্থাতেই স্ত্রীর ভারী দেহখানা কোলে তুলে নিলো সে। নিজের সব ব্যথা গিলে বললো,“আল্লাহরে ডাকো, কিচ্ছু হইবো না।”
পারুল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,“ওরে এই ঘরে লইয়া আইয়ো, বাবা।”
“ওরে হাসপাতালে নিতে হইবো। বিষে কানতাছে, রক্ত পড়তাছে।”
“এই ঝড়ের রাইতে হাসপাতাল নেওয়া যাইবো না। পথে কিছু হইয়া গেলে? তুমি ওরে লইয়া আইয়ো। সন্তান প্রসব আমরা করামু।”
নাজির আঁতকে উঠলো। বাড়িতে প্রসব করাবে মানে? এসবে সে ভয় পায়। পাছে স্ত্রীর কিছু হয়ে গেলে? এত কম বয়সে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় ডাক্তার সেবার অনেক কথা শুনিয়েছিল। এতে যে প্রাণ ঝুঁকি আছে তাও জানিয়েছিল। এসব জানা স্বত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ একটা কাজ নাজির বাড়িতে করতে দেবে? দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো,“আমার বউয়ের কিছু হইয়া গেলে হেই দায় কেডায় নিবো? ওরে আমি হাসপাতালেই লইয়া যামু।”
তালেব রাগত স্বরে বললো,“দেখ নাজির, এহন পাগলামি করিস না। ঝড় বৃষ্টি না থাকলে একটা কথা আছিলো। আমার মাইয়াও বাড়িত হইছে। কারো কিছু হইছে?”
“আমি মিল্টনরে ডাইকা আনতাছি। ওয় পিকআপ বাহির করবো। হাসপাতাল যাইতে আর কতক্ষণ লাগবো? আমি এই ব্যাপারে কাউরে বিশ্বাস করি না। ভুলচুক কিছু হইলে আমার বউ পামু কই?”
তার পাগলামিতে সবাই বিরক্ত হলো। মিছরি আর্তনাদ করে উঠলো,“আআর….পারছি…না..
খুশবুর সাহায্যে সৈয়দুন নেছাই শেষে বৃষ্টির মধ্যে ছুটে এলেন। বুঝিয়ে বললেন,“আল্লাহরে ডাক, ব্যাডা। মরণ আইলে ওই হাসপাতালে নিলেও কাম হইবো না। দেখ, মাইয়াডা কী কষ্ট পাইতাছে! দেরি হইলে আরো বড়ো কোনো বিপদ হইতে পারে। লইয়া আয় ওরে। আমার বড়ো বউ এইসবে পারদর্শী। মাসুম, মিছরি, সুজাতা, বেলী সব হের হাতে হইছে। আয় দেহি।”
নাজিরের মন মানে না। স্ত্রীর ব্যথাতুর ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে বাধ্য হয়েই ঘরটায় নিয়ে তাকে শুইয়ে দিয়ে এলো সে। তৎক্ষণাৎ ভেতর থেকে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। ওখানেই দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। ছলছল চোখে মেঘাচ্ছন্ন আকাশে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলো।
“আল্লাহ, আমি আর কহনো তোমার অবাধ্য হমু না। আমার সব পাপ মাফ কর, আল্লাহ। আমার পাপের শাস্তি আমার বউ পোলাপাইনরে দিও না। আমি এমনিতেই দুঃখী মানুষ, আর দুঃখ দিও না।”
কাশেম আলী তার কাঁধে হাত রাখলেন,“চিন্তা করিস না, সব ঠিক হইয়া যাইবো।”
নাজির প্রত্যুত্তর করল না। নিজেকে তার অসহায় লাগছে। ভেতর থেকে ভেসে আসছে মিছরির আত্মচিৎকার। বাইরের তুমুল ঝড়ের সাথে ভেতরের ঝড়ও অনেক সময় ধরে চললো। মনে হলো, এই রাত তার জীবনের আরো একটি ভয়াবহ রাত। জীবন, মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এক কিশোরী এবং তার গর্ভের সন্তানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ।
বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হলো। দূরে ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। বাড়ির ছোটো বড়ো সবার ঘুম ভেঙে গেছে। সৈয়দুন নেছা বৃষ্টির পানিতে ওযু করে নামাজে বসে পড়েছেন। দুই হাত তুলে চোখের পানি ছেড়ে নাতনির জন্য রবের নিকট দোয়া করছেন। টুপি মাথায় দিয়ে নাজিরও নামাজ পড়তে ভুললো না।
হঠাৎ ভেতর থেকে ভেসে এলো নবজাতকের কান্নার শব্দ। উপস্থিত সকলে সমস্বরে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো। কাশেম আলী আনন্দে চিৎকার করে বলে উঠলেন,“আমি নানা হইয়া গেছি! আম্মা, আমি নানা হইয়া গেছি। আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শোকরিয়া।”
নাজির মুখ দিয়ে শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো না। তার বুক কাঁপছে, কাঁপছে হাত দুটোও। সুজন পাশে দাঁড়িয়ে বললো,“এইবার অন্তত হাসি দে। বাপ হইয়া গেছোস।”
“আগে আমার বউরে সুস্থ অবস্থায় দেইখা লই।”
কিছুক্ষণ পর বন্ধ দরজা খুলে গেলো। রঙিন কাঁথায় মুড়িয়ে ছোট্ট এক শিশুকে নিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন দিলারা। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন,“পোলা হইছে।”
মাসুম দৌড়ে এলো। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,“আমি মামা হইয়া গেছি! আমার ছুডো মিছরি কত বড়ো হইয়া গেছে! মাশাআল্লাহ, ভাগ্নেরে আমার কোলে দেও।”
দিলারা দিলেন না। সরে গেলেন,“আগে বাপে কোলে নিবো। নেও জামাই, ধরো। তোমার পোলা এইডা। তোমার নিজের রক্ত।”
নাজিরের বুকটা ধুকপুক করছে। ভালো করে হাত জোড়া ধুয়ে মুছে এলো সে। দিলারা বেগম বাচ্চা তার কোলে দিলেন। ছোট্ট ছানাকে বুকে পেয়ে অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করল নাজির। ডাগর চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে ছেলেটা। ইতোমধ্যে কান্না থেমে গেছে। নাজির হেসে ফেলল। ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে অস্ফুটে স্বরে বললো,“আব্বাজান!”
সঙ্গে সঙ্গে দন্তহীন মাড়ি বের করে বাচ্চাটা হেসে উঠলো। নাজির চমকে গেলো। বুকের সাথে ঠেকিয়ে চোখ বুজলো। মনে হলো সে যেন তার বাবাকে ফিরে পেয়েছে। আচানক কাঁধে কেউ হাত রাখলো। চোখ মেলে তাকালো সে। কাশেম আলী দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন,“বাপেরে দেইখা কি খুশি পোলায়! নাম কী রাখবি? সুবহান রাইখা দে। প্রথম পোলা, বাপের স্মৃতি হিসাবে না হয়…
“না, শাহ বংশে দ্বিতীয় কোনো সুবহান আলী শাহ জন্মাইবো না। আমার পোলায় ওর বাপের মতো ঘেডি উঁচা কইরা বাঁচবো, আমার থাইক্যাও সুন্দর একটা জীবন অতিবাহিত করবো।”
“তাইলে?”
“ওয় আমার জীবনে ফজরের পর আগমন ঘটা ভোরের প্রথম সূর্য। তাই ওর নাম হইবো ইশরাক শাহ। ডাকনাম নক্ষত্র। আমার পৃথিবীর একমাত্র নক্ষত্র।”
নামটা পছন্দ হলো সবার। কাশেম আলী এবার তাড়া দিয়ে বললেন,“আগে নানা ভাইয়ের কানে আজান দিতে হইবো। ওরে আমার কাছে দে, আজান দেই।”
নাজির দিলো না,“বাপ থাকতে আমনে ক্যান দিবেন? নিজের পোলাগো কানে দিয়াও শখ মিটে নাই?”
কাশেম আলী নারাজ হলেন,“এক নম্বরের ঘাউড়া তুই। আমার বড়ো পোলার সময়ে আজান দিছিলো আমার শ্বশুর আব্বায়, ছুডোডার সময় দিছিলো আমার আব্বায়। কহনো হেগো মুখের উপর কিছু কই নাই। আমি শুধু দিতাম পারছি মিছরির কানে।”
তালেব মিনমিন করে বললো,“আমার মাইয়ার সময় আমনেই দিছিলেন, আব্বা।”
কাশেম আলী ছেলেকে চোখ রাঙালেন। ততক্ষণে নাজির সেখান থেকে দূরে সরে ছেলের কানে আজান দিয়ে দিলো। তা দেখে কাশেম আলী হতাশ হলেন। ভাবির দিকে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“আমার আম্মাজান কেমন আছে, ভাবি? খবর কী?”
“রক্ত পড়া বন্ধ হয় নাই এহনো। প্রসব করানোর পরে জ্ঞান হারাইছে। তালেবের মায় হাতে-পায়ে তেল মালিশ করতাছে।”
“কন কী, ভাবি! এহন এইডা জানানের সময় হইলো? খারাপ কিছু হইবো না তো?”
“চিন্তা কইরেন না তো। এমন একটু আধটু হয়। আমগো বড়ো বউয়ের সময়ও হইছিল।”
ছেলেকে নিয়ে ঘর থেকে বের হতেই নাজির শুনে ফেলল সেকথা। কাশেম আলীর কোলে সন্তানকে দিয়ে চাচী শাশুড়ির উদ্দেশ্যে বিচলিত কণ্ঠে বললো, “জ্ঞান নাই, রক্ত পড়তাছে আর আমনেরা নিশ্চিন্তে আছেন? আমার এত ঝুঁকি নেওয়ার দরকার নাই। এহন আর কোনো বাঁধাও নাই, ওরে হাসপাতালে নিমু আমি।”
“কিচ্ছু হইবো না, এই সময়ে টানা হ্যাঁচড়া করা উচিত হইবো না।”
নাজির আর কারো কোনো কথা শুনলো না। মাসুম নিজেও এবার এগিয়ে এসে বললো,“থাক চাচী, হাসপাতালে নিয়া যাওয়াই ঠিক হইবো। পরে কিছু হইয়া গেলে? তোরা তৈয়ার হ, আমি দেহি গাড়ি পাই কিনা।”
কাশেম আলীও সহমত পোষণ করলেন,“বৃষ্টি বাদলের আর সময় পাইলো না। ছাতাডা লগে লইয়া যা।”
“খালি মিল্টনরে গিয়া কইবি আমি গাড়ি বাহির করতে কইছি। তাইলেই হইবো।” নাজির বললো।
মাসুম আর দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করল না। ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তার সাথে গেলো রুহুলও।
দিনের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। মিল্টন ঘুমিয়ে ছিল। সেই ভোরেই বৃষ্টির মধ্যে তাকে ডেকে তুলে গাড়িসহ বাড়ির সামনে নিয়ে আসা হলো। নাজির পোশাক বদলে জ্ঞানহীন স্ত্রীকে পাঁজা কোলে করে তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। তার সাথে গেলো কাশেম আলী, মাসুম। বৃষ্টি থামলে বাচ্চাকে নিয়ে পারুল যাবেন তালেবের সাথে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টি কমেছে কিছুটা। তবে ঝড়ো হাওয়া থামেনি। রেডিওতে বার্তা চলছে, নতুন এক ঘূর্ণিঝড় প্রকট হয়েছে সাগরতটে। পিকআপে করে যাওয়ায় হাসপাতালে পৌঁছাতে তেমন একটা দেরি হলো না তাদের। সদ্য সন্তান প্রসবকৃত মায়ের অবস্থা দেখে এবং শুনে নার্স খেকিয়ে উঠলেন। মুখ দিয়ে যা এলো তাই বললেন। তার অসম্মানীয় কথায় নাজির কোনোরূপ প্রতিবাদ করল না। অন্য কোনো সময় হলে হয়তো কঠিন জবাব দিয়ে মহিলাকে থামিয়ে দিতো। হট্টগোলে একজন নারী চিকিৎসক এসে উপস্থিত হলেন সেখানে। নার্সকে ধমক দিয়ে রোগীকে কেবিনে পাঠালেন। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের থেকেও নার্সদের ক্ষমতা যেন বেশি।
মিছরির চিকিৎসা চলতে লাগলো। জ্ঞান ফিরতে ফিরতে দুপুর হলো। ভেতর থেকে নার্স বেরিয়ে এলেন। বললেন,“বাচ্চা কোথায়? মায়ের দুধ না খাওয়ালে বাঁচবে? তাকে নিয়ে আসুন দ্রুত।”
মাসুম জবাবে বললো,“ওরে আমার মায় আনতাছে। আমার বোইন এহন কেমন আছে?”
নার্স উত্তর দিলেন না। ভেতরে যেতে যেতে বিড়বিড় করলেন,“সব একেকটা ডাক্তার হয়ে গেছে। গ্ৰামের মানুষদের এই এক সমস্যা, সবজান্তা।”
কিছুক্ষণ পরেই তালেব আর পারুল নবজাতককে নিয়ে উপস্থিত হলো হাসপাতালে। শাশুড়ির কোল থেকে ছেলেকে নিজের কোলে নিলো নাজির। ডাক দিতেই সেই নার্স এসে বাচ্চাকে সঙ্গে করে ভেতরে নিয়ে গেলো। বাচ্চাটা যে ক্ষুধার্ত।
নাজির মাথাভর্তি চিন্তা নিয়ে কেবিনের বাইরে বসে ছিল। রক্ত, স্যালাইন, ওষুধ আনা থেকে শুরু করে যাবতীয় সব কাজ তালেব আর মাসুম মিলে করেছে। বিকেলের দিকে তাদের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। সর্বপ্রথম ভেতরে গেলো নাজির। মিছরির এক হাতে এখন স্যালাইন চলছে। শরীর ভীষণ দুর্বল। পাশেই মাতৃদুগ্ধ পান করে ছোট্ট নক্ষত্র ঘুমিয়ে আছে। স্বামীকে দেখে হেসে উঠলো মিছরি, “সবাই ভেবেছিল মেয়ে হবে, কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ করে আমাদের ঘরে রাজকুমার এসেছে।”
“তুমি কেমন আছো? যন্ত্রণা কমছে?”
“হ্যাঁ, আমার বাবাটাকে দেখে কমে গেছে।” ছেলের দিকে তাকিয়ে পুনরায় চঞ্চল কণ্ঠে বললো,“হে হে, আমার ছেলে আমার মতো গুলুগুলু হয়েছে দেখুন।”
“সবাই তো কইলো বাপের মতন হইছে।”
“আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য সবাই মিথ্যে বলেছে।”
মলিন মুখে হাসি ফুটে উঠলো নাজিরের। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,“হ, একেবারে তালমিছরির মতন মিষ্টি হইছে। বড়ো হইলে ওর লাইগাও একটা মিছরি খুঁজতে হইবো।”
“পাবে না, মিছরি একপিসই। নেহাৎ ওর বাপের ভাগ্য ভালো ছিল।”
নাজির মনযোগ দিয়ে স্ত্রীর কথা শুনছে। রবের নিকট মনে মনে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছে। এই তবে ছিল তার ভবিষ্যৎ? অবশেষে নাজির শাহরও সুন্দর একটা পরিবার হলো। মিছরি বললো,“আমার বাবার নাম যেন কী? ইশরাক শাহ না?”
“ডাকনাম নক্ষত্র। নক্ষত্র কইয়া ডাকবা।”
“এটা কবে কবে ঠিক হলো?”
“আইজ, ওরে প্রথম কোলে নেওয়ার পর। জানো, আব্বা কইয়া ডাক দিতেই হাইসা দিলো। প্রথম আমার কোলে হাসছে।”
“হাসবেই তো, বাবাকে দেখেছে না? মহাবিশ্বে এত নক্ষত্রের মাঝে আমাদের ঘরে আরেকজন যোগ হলো।”
“মহাবিশ্বে অনেকগুলা থাকলেও পৃথিবীর লাইগা নক্ষত্র তো একটাই।”
মিছরি সরু চোখে স্বামীর দিকে তাকালো। পরক্ষণেই হেসে ফেলল।
চলবে ________
ফলো: উপন্যাস

